পাতা বাহার পর্ব-০৪

0
415

#পাতা_বাহার
লেখনীতে: #বেলা_শেখ
#পর্ব-৪
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)

আতিকুর ইসলামরা দুই ভাই বোন নেই । আতিকুর ও আশিকুর। বাবা মা বেঁচে নেই তাদের। আশিকুর রহমান চাকরি সূত্রে চট্টগ্রামে থাকেন পরিবার সহ। আশিকুর রহমান শ্বেদগাঁও (কাল্পনিক) থাকেন। বাবা মা বেঁচে না থাকায় তাদের মধ্যে দূরত্বও বেশ তৈরি হয়েছে। কালে ভাদ্রে দুই ভাই কথা বলে।একে অপরের সাথে যোগাযোগ খুবই ক্ষীণ। যেখানে ভাইয়ে ভাইয়েই যোগাবন্ধন নাজুক সেখানে দুই জা বাচ্চাদের সম্পর্ক আর কেমন হবে! সোসাল মিডিয়ায় খানিকটা হাই হ্যালোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ! তবে কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে যখন এক হয় সম্পর্কের টানটা যেন একটু হলেও দেখা যায়।
আতিকুর ইসলাম ও লুবমান ডায়নিং টেবিলে। লাবনী আক্তার বাবা ছেলের পাতে ঝড়ঝড়া খিচুড়ির সাথে কষা মুরগির মাংস ও একটা সিদ্ধ ডিম কেটে অর্ধেক করে দুজনের পাতে দিয়ে লেবু শসা কেটে দিল। আতিকুর রহমান এক গ্লাস পানি পান করে খাওয়া শুরু করলো। লুবমান কষা মাংস দেখে বলল,

-” পাতার টিফিন বক্সে দেখলাম ডিম আর খিচুড়ি! ওকে মাংস দাও নি?”

লাবনী আক্তার একটা চেয়ারে বসলেন। স্বামী ছেলেকে খাইয়ে বিদায় দিয়ে তবেই তিনি খাবেন। স্বামী কাচারি যাবে আর ছেলে? হয়তো আড্ডা দেবে বন্ধুদের সাথে নইলে চাকরির জন্য ইন্টারভিউ! আর সারাদিন বাড়িতে সে একাই থাকে। এতে অবশ্য তার কোনো সমস্যা হয় না। টিভিতে সিরিয়াল আর ঘরের টুকিটাকি কাজে সময় ভালোয় কাটে।

-” তখন মুরগি চড়াই ই নি! দেব কিভাবে! আর ডিম তো দিয়েছি!”

লুবমান শান্ত দৃষ্টিতে মায়ের দিকে চায়। সে তখন এস এস সি পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়ে ছিল সবে। একদিন হঠাৎ খালু আসে পাতা কে নিয়ে, হাতে লাগেজ। পাতা মাথা নিচু করে চুপটি করে দাঁড়িয়ে ছিল খালুর পাশে। চোখ ভেজা ছিল ওর। তখন পর্যন্ত সে জানতো পাতা তার খালাতো বোন। তারপর জানতে পারে পাতা তার মায়ের পেটের বোন। খালা খালু নিঃসন্তান ছিল বলে পাতাকে দত্তক নিয়েছিল এক মাস বয়সকালে। বেশ ভালোবাসতো পাতাকে। পাতার তিন বছরের মাথায় খালা সন্তান সম্ভাবা হয়। বছরের মাথায় একটা ছেলে সন্তানের জন্ম দেয় নাম পাবেল। খালা খালু খুশি হয়। পাতা পাবেলকে নিয়ে সংসার ভালোই চলছিল। এরপর পাতা যখন সিক্সে ওঠে খালার আরেকটা মেয়ে সন্তান জন্ম হয় নাম প্রিয়া। প্রিয়ার জন্মের পর খালা অনেক অসুস্থ হয়ে পড়েন। ছোট্ট পাতাই বোন প্রিয়াকে কোলে কোলে বড় করে। খালা খানিকটা সুস্থ হলেও প্রিয়ার দায়িত্ব পাতাকেই সামলাতে হতো। ছোট পাতা আরেকটা বাচ্চা সামলাতো। প্রিয়া বড় হলো। খালা খালু বেশ খুশি ছেলে মেয়ে নিয়ে। তবে পাতার জন্য ভালোবাসা আদর একটু একটু করে ফুরিয়ে যাচ্ছিল আগে থেকেই। পাতাও হয়তোবা বুঝতো। নিজেদের সন্তান পেয়ে ছোট পাতাকে হয়তো ভুলে যাচ্ছিল। খালুর ধানের ব্যবসা ছিল ।সেবার ঝড়ে তিনি ব্যাপক লস খেয়ে যান। অনেক ধার দেনা হয়। বড় যৌথ পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হতো। বাচ্চাদের লেখাপড়ার খরচ তো আছেই।পাতা নাইনে পড়ছিল বিজ্ঞান বিভাগে। তার টিউশনও বন্ধ হয়ে যায়। তাই খালু পাতাকে এবাড়িতে রেখে যায়। বাবাকে সব খুলে বলে। বাবা খানিকটা রেগে যায় সে রাখবে না পাতাকে। তার নিজেরও অভাবের সংসার। খালুও নিয়ে যাবে না। বেশ কথাকাটাকাটি হয়। কিশোরী পাতা সেদিন ভয়ে গুটিসুটি মেরে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছিল। খালু পাতাকে রেখে যায়। আর বাবাকে বুঝিয়ে বলে পাতা থাক কিছুদিন এখানে, ব্যবসার একটু উন্নতি হলে নিয়ে যাবে। খালুর ব্যবসা উন্নত হয়। যেটুকু লস হয়েছিল সেগুলো ভরপাই হয়ে অনেক লাভবান হয়, চালের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায়। সচ্ছলতা ফিরে ভালোই নামকরা ব্যবসায়ী হন তিনি। একটা চালের আড়তও খোলে। তবে পাতাকে আর নেয় না। বাবাকে বুঝিয়ে পাতার খরচ চালাতে থাকে। পাতা তার এক দেড় বছরের ছোট ! ধীরে ধীরে তাদের সাথে মানিয়ে নেয়। খালা খালু থেকে মা বাবাকে আব্বু মা ডাকা শুরু করে। তবে মেয়েটা সবার থেকে কেমন যেন গুটিয়ে থাকে।

-” খাচ্ছিস না কেন?”

বাবার ডাকে ধ্যান ভাঙল লুবমানের। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পাতে হাত দিয়ে বলে,

-” মা আব্বু তোমরা পাতার সাথে অন্যায় করছো! একটু ভালোবেসে, আদর করে বুকে টেনে নিলে কি হবে? তোমাদেরই মেয়ে। ভালোবাসার কাঙাল ও। তোমাদের কত ভালোবাসে।আর তোমরা এভাবে দূরে সরে রাখো কেন?”

আতিকুর ইসলামের কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। একদম স্বাভাবিক। লাবনী আক্তারের চাহনি একটু অশান্ত হয়।

-” ওকেও তো ভালোবাসি! দূরে ছিল বলে টানটা একটু কম এই যা! আর ও তো দূরে দূরেই থাকে।”

-” দূরে থাকে না তোমাদের নির্লিপ্ততায় নিজেকে গুটিয়ে নেয়! দূরে ছিল বলে টান কম না বরং বেশি হওয়ার কথা মা!”

আতিকুর ইসলাম পানি পান করে গ্লাসটা শব্দ করে রাখে ডাইনিং টেবিলে। লুবমান ও লাবনী আক্তার চকিত তার দিকে চায়। ঘাবড়েও যায়। তিনি না আবার রেগে যায়।

-” তাকে চাইনি সংসারে। তোর জন্মের পর আর বাচ্চা নিতে চাই নি। এক ছেলে এক মেয়েই যথেষ্ট ছিল। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবেই এসে যায়। সময় থাকতেই ব্যবস্থা নিতে চেয়েছিলাম। তন্মধ্যে পারুল এসে কান্নাকাটি করে বাচ্চাটা রেখে দিতে। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যেন তাদেরকে দিয়ে দিই। পারুলের স্বামী রহিমও বেশ অনুরোধ করে। তোমার মা বোনের কথায় গলে গিয়ে রাজি হয়। কথা হয় বাচ্চা হওয়ার একমাস পরেই নিয়ে যাবে। বাচ্চা হওয়ার পর তোমার মা একটু বেঁকে বসেছিল দেবে না পাতাকে। তবে পারুল পায়ে পরে কান্নাকাটি করে। তোমার মা দিয়ে দেয়।পাতার সব দায়িত্ব নিবে সারাজীবনের জন্য।কথাও রাখে সব ঠিকঠাক চলছিলই তো। হঠাৎ রহিম পাতাকে রেখে যায়। বলে কিছুদিনের জন্য অথচ আর নেওয়ার নাম নেই। এটা তো কথা ছিল না। পরে মাসে কিছু টাকা পাঠাতো। টাকা পাঠালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? মধ্যবিত্তের সংসারে দুটো বাচ্চার পড়ালেখা ভোরনপোষণেই আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যেত। সেখানে আরেকজনের টা কিভাবে টানতে হয়েছে! তবুও কখনো কিছু বলি নি। জন্ম দিয়েছি রাখছি, নিজের দায়িত্বও পালন করবো। পড়ালেখা করিয়েছি, ভালো চাকরি করছে। এখন একটা ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দিয়ে দায়িত্বের সমাপ্তি টানবো। এর চেয়ে বেশি আমার দ্বারা হবে না। এ নিয়ে যেন আর কথা না শুনি।”

কঠোর গলায় বলে আতিকুর রহমান। লুবমান মাথা নিচু করে খাবার খাওয়ায় মনোযোগ দেয়। বাবার কথার উপর কথা বলার সাহস নেই। লাবনী আক্তারও চুপচাপ বসে।

একেক মানুষের মনোভাব একেক রকম। কেউ চার পাঁচ বাচ্চার পরেও বাচ্চা হলে হাসিখুশি কোলে তুলে নেয় এই ভেবে যে রিজিকের মালিক উপর ওয়ালা। তিনি দিয়েছেন তিনিই দেখবেন। আর অনেকে একটা দুটো বাচ্চা নিয়ে আর নেয় না। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে এলেও কেউ কেউ রাখে আবার কেউ এবর্শন করায়! আবার অনেক দম্পতি আছে যারা নিঃসন্তান একটা বাচ্চার আশায় কত শতক আহাজারি তাদের!!

আতিকুর ইসলাম খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে রুমে যায়। কাচারিতে যাওয়ার জন্যেই রেডি হয়ে খেতে বসেছিলেন। খাওয়া শেষে রুমে গিয়ে ব্যাগটা নিয়ে আসে। মানিব্যাগ থেকে পাঁচশ টাকার নোট বের করে ছেলেকে দিয়ে বলে,

-” পাঁচশ দিলাম। আলতু ফালতু কাজে যেন খরচ না হয়। আর খারাপ , জুয়ারু, নেশাখোর বন্ধুদের সাথে দেখলে সেখানেই জুতা খুলে মারবো। পড়াশোনা করবি আর চাকরির খোঁজ খবর নিবি।”

লুবমানের ডান হাত এঁটো থাকায় বাম হাতেই নিয়ে পকেটে পুরে টাকা। মাথা নাড়িয়ে বাবার কথার সম্মতি জানায়। সে বুঝতে পারে জীবনে একবার খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে তার মান সম্মান কত খানি নষ্ট হয়েছে সাথে বাবা মায়েরও। তাই সকল প্রকার বন্ধু এড়িয়ে চলে এখন। নিজের মতোই থাকে। মানুষ একজন ভালো বন্ধুর হাত ধরে যেমন জান্নাত নসিব করতে পারে তেমনি অসৎ বন্ধু মানুষকে নরকের দিকে ধাবিত করে। তাই বন্ধু নির্বাচনে সর্বদা সাবধান!!!!
____

বেলা বারোটা। ব্যস্ত নগরীর কর্মজীবীর ব্যস্ত তার নিজ কার্যালয়ে। অরুণ সরকার নিজ অফিসের কেবিনে বসে ল্যাপটপে কিছু ডিজাইন দেখছে আর মার্ক করছে।গয়না অলংকারের ব্যবসা তাদের। বিভিন্ন অকেশনে, বড় বড় ট্রেডিশনাল বিয়ের অনুষ্ঠানে, বিভিন্ন ফাংশন, আধুনিক ও হিস্টোরিক সিনেমার গয়নার ডিজাইন করে ও বানিয়ে থাকে। বড় বড় জুয়েলারি শপে অধিকাংশ তাদের কম্পানির ডিজাইন করা গয়না। অরুণের পূর্ব পুরুষদেরা স্বর্ণকার ছিলেন। অরুণের দাদাও একজন স্বর্ণকার। তার বাবা দাদা মিলে নিজেদের পারিবারিক ব্যবসাকে বর্ধিত করতে সরকার ফ্যাশানেবল কম্পানি দাঁড় করায় এবং সফল হয়।অরুণ সরকার গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করলে তার বাবা ইন্তেকাল করেন আর দাদা দাদি অনেক আগেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। অরুণের বাবা একমাত্র সন্তান হওয়ার কারনে সমস্ত কিছু তার নামেই ছিল। তার সূত্র ধরে অরুণ, আরিয়ান ও আদুরি এই কম্পানির মালিক। আরিয়ান কম্পানি থেকে দূরেই থাকে তার এসবে ইন্টারেস্ট নেই। আর আদুরি তো ছোটই। তাই অরুণ সরকার বাবা দাদার কম্পানিতে জয়েন করে সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়। প্রথম প্রথম হিমশিম খেলেও এখন নিজেকে সামলে নিয়েছে। বাজারের দরদামে সে একজন সফল বিজনেসম্যান।
অরুণের কাজের মধ্যেই কেউ একজন কেবিনের দরজা নক করে। অরুণ খানিক বিরক্ত হয়েই বলে,

-” কাম ইন!

তবে ভিতরে প্রবেশ করা ব্যাক্তিকে দেখে বিরক্তি কেটে যায়। চোখ ছোট ছোট করে তার দিকে চেয়ে ল্যাপটপের সাটার ডাউন করে পরনের চশমা খুলে বলে,

-” শালা লং টাইম হুম?”

আগত লোকটি হেসে অরুণের ডেস্কের সামনের চেয়ারে বসে বলে,

-” ভেরি লং টাইম ইয়ার! কেমন আছিস?”

অরুণ চেয়ারে শরীর ছেড়ে দিয়ে রিল্যাক্সে বসে বলে,

-” আই এম গুড। তোর কি খবর? তোকে তো আজকাল পাওয়াই যায় না ব্যস্ত মানুষ কিনা!”

-” আর তোকে খুব পাওয়া যায়? আমরা সকলে দেখা না করলেও সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে যোগাযোগ রাখি! আর শালা তোকে তো সেখানে হারিকেন দিয়েও খুঁজে পাই না!”

অরুণের গম্ভীর মুখশ্রীতে হালকা হাসির রেখা ফুটে ওঠে। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,

-” সোশাল মিডিয়ায় আমি ওত একটিভ নই জানিসই তো। অফিস বাদে যতটুকু সময় পাই ছেলেকে ঘিরেই থাকি।থাক বাদ দে! বাড়ির কি খবর? বউ বাচ্চা সব ঠিকঠাক? নতুন সদস্য আসছে নাকি? গ্লো করছিস শুভ!”

লোকটি উঠে দাঁড়িয়ে কাঁচের কেবিনের গ্লাসে মুখ দেখে নিল। দাড়িতে হাত বুলিয়ে গ্লাসে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে বলে,

-” কই গ্লো করছি! বল বুড়িয়ে যাচ্ছি। আর এই তুই জ্যোতিষ বিদ্যা শিখলি কবে?”

অরুণও চেয়ার থেকে উঠে লোকটির সামনে গিয়ে কলার ধরে সোজা করে কলার ঠিক করতে করতে বলে,

-” মি. ফারদিন ইসলাম শুভ! দেটস মিন ভাবি প্রেগন্যান্ট!

-” হুম। থ্রি মান্থ। এন্ড আই এম ভেরি এক্সাইটেড ওলসো হ্যাপি ফর বিয়িং সেকেন্ড টাইম ফাদার। সো কনগ্রেটস মি?”

অরুণ খানিক হেসে তাকে জড়িয়ে ধরে। দুই বন্ধু খানিক সময় আবেগময় মূহুর্ত পার করে। অনেক দিনের জমিয়ে যাওয়া গল্প জুড়ে দেয়, দুজনে মশগুল হয়ে যায়।
গল্পের মাঝেই শুভ বলে,

-” ভোর কেমন আছে? অনেক দিন হলো দেখা হয় না! কি কিউট আমাদের ভোর! পুরাই চমচম!”

-” ভালোই আছে। সারাটা দিন দৌড় ঝাপ করবে। আর আগের মতোই আদর পাগল! ওকে যদি কিডন্যাপাররা বলে ‘ বাবু আসো আমরা কিডন্যাপার! তোমায় কিডন্যাপ করে অনেক আদর করবো?’ সে তার সাথেই চলে যাবে। আর এত পাকা পাকা কথা!”

-” সেটা ঠিক বলেছিস! ছেলেটা আদর পাগল। আদর করে তাকে ভুলানো পানির মতো সহজ।”

-“হুম।”

অরুণ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। শুভ বন্ধুর দিকে খানিকপল তাকিয়ে বলে,

-” অরু?”
অরুণ নাক মুখ কুঁচকে গম্ভীর রূপে ফিরে আসে।

-” ডোন্ট কল মি অরু! ইটস সাইন্ড লাইক লেডিস।”

শুভ হেসে বলে,

-” ওকে ভাই।তবে নাম টা সুইট অরু! স্যরি অরুণ সরকার।”

অরুণ চোখ রাঙানিতে শুভ খানিকটা সিরিয়াস হয়ে বসে,

-” মি. অরুণ সরকার! এখন ঠিক আছে? তুই কি আর বিয়ে করবি না? শোন এভাবে আর কতকাল থাকবি? ইউ নিড টু মুভ ওন! কাম ওন ইয়ার! তোর পুরো লাইফ পড়ে আছে। এভাবে একলা জীবন কাটানো যায় না। এন্ড আই থিংক ভোরের জন্য একটা মায়ের দরকার। প্লিজ ইয়ার নিজের জন্য ,ভোরের জন্য হলেও বিয়েটা কর?

অরুণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

-” ভয় হয় ভাই! ভালোবেসে ঘর বেঁধেছিলাম।সে ঘর পুড়েছে! আবার যদি? তাছাড়াও যে আসবে সে যদি ভোরকে না মেনে নেয়? ধর মেনে নিল কিন্তু মায়ের মতো ভালোবাসা দিতে পারবে? শুধু খানিকটা সহানুভূতি! সময়ের সাথে সেটাও ফুরিয়ে যাবে! ছেলেটা বাবার ভাগ্যই পেয়েছে দেখ!”

শুভ অরুণকে জড়িয়ে নেয়। তার বন্ধুটা জীবনে অনেক সহ্য করেছে।

-” ভাই সব ঠিক হবে। আর যদি সে তোর ছেলেকে মন থেকে মেনে নেয়? আদর্শ মায়ের মত ভালোবাসে? ভোরকে একটা ভালোবাসা যুক্ত সুন্দর জীবন উপহার দেয়? ভোরের সাথে ভোরের আব্বুর জীবনেও সুখ নামক চেরাগ হয়ে আসে?”

-” কেউ আসবে না ভাই!”
_____

ছোট ছোট বাচ্চারা মায়ের হাত ধরে নাচতে নাচতে স্কুলের মাঠ থেকে গেটের দিকে যাচ্ছে। মায়েদের কাঁধে তাদের ব্যাগ ঝুলছে। তাদের ক্লাস শেষ ছুটি হয়েছে। শুধু থ্রি টু ফাইভের বাচ্চার আছে। তাদের টিফিন পিরিয়ড। তারা খেলছে। কেউ কেউ স্লিপারে উঠছে নামছে তো কেউ দোলনায় দুলতে ব্যস্ত। কেউবা দড়ি খেলছে। ছেলেদের একদল, ক্রিকেট একদল ফুটবল। আবার কেউ কেউ ক্যান্টিনের সদাই, আইসক্রিম খাচ্ছে।পাতার তাদের দেখে নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে।স্কুলে পড়াকালীন সেও অনেক খেলেছে। গোল্লাছুট, জুতা বউছি, বউছি, ইচিং বিচিং, ডাংগুলি, মার্বেল গুটি, কানামাছি, একে ঋতু! একে ঋতু খেলতে গিয়ে একবার সে ধান ক্ষেতের কাদায় মাখামাখি হয়ে গিয়েছিল। একে ঋতু খেলায় একজন চোর থাকে সে উবু হয়ে হাত সটাং করে আঙুল পায়ের আঙ্গুলের সাথে লাগায়। হাঁটু ভাঁজ করা বারণ। তো চোরের পিঠে দু হাত রেখে ভর দিয়ে একে একে বাকিদের ডিঙিয়ে যেতে যেতে খেলার বুলি আওড়াতে হয় যেমন-‘ একে ঋতু ,দুইয়ে ডাবল টু, তিনে ঘোড়ায় চড়ি….’
পাতার বারি এলে সে চোরের পিঠে হাত রেখে তাকে ডিঙিয়ে যেতে নিলে চোরটি আচানক সরে যাওয়ায় পাতা মাটিতে উবু হয়ে পড়ে ক্ষেতের কাঁদায় গড়িয়ে পড়ে। সবাই হেসেছিল অনেক।ক্লাস মিস দিয়ে খেলতে গিয়ে টিচারের বকাও শুনেছে অনেক‌। ভাবতে ভাবতে পাতা টিচার রুমে যায় যেটা এখন ফাঁকা। সব টিচার ক্যান্টিনে খাবার খাচ্ছে। পাতার খেতে ইচ্ছে করছে না। খিচুড়ি দেখেই ক্ষিধে মরে গেছে। চেয়ারে বসে টেবিলে মাথা দিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে।

ভোর স্কুল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে টিচার্স রুমের সামনে উঁকি দেয়। মিস পাতাকে একা দেখে খানিকটা খুশি হয়। তার পিছনে আভারি তাকে বারণ করছে বার বার।

-” ভোর বাবা চলো? স্কুল ছুটি হইয়ে গেছে ! ড্রাইভারও আইসে পড়ছে!”

ভোর শোনে না। মাথা হালকা ভিতরে ঢুকে ভিতরে যাওয়ার পারমিশন চায়,

-” মে আই কাম ইন মিস?”

পাতা মাথা তুলে দরজায় তাকায়। ভোরকে দেখে বলে,

-” কাম ভোর! তোমার স্কুল তো ছুটি বাড়ি যাও নি?”

ভোর গুটি গুটি পায়ে ভিতরে ঢুকে পাতার টেবিলের সামনে দাঁড়ায়। ব্যাগটা আভারির কাঁধে। আভারি ভিতরে না ঢুকে বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকে‌। ভোর মিষ্টি হেসে বলে,

-” মিস বাড়ি যাবেন না? আমাকেও লিফট দিবেন কিন্তু?”

পাতার ভ্রু কুঁচকে যায়,

-” আমার এখনো ছুটি হয় নি। তিনটায় ছুটি হবে। তোমার গাড়ি আসে নি?”

-” এসেছে। কিন্তু আমার বাইকে চড়তে মন চাইছিল! আমি তিনটে পর্যন্ত ওয়েট করি আপনার ছুটি হলে তো লিফট দিবেন?”

পাতার মাথা ঘুরছে। এই ছেলে বলে কি! তবে মায়াও লাগছে!

-” আর তোমার আব্বু আমাকে বাইক সহ যমুনায় ভাসিয়ে দিক তাই না? যাও গাড়িতে যাও! অন্যসময় তোমাকে লং ড্রাইভে নিয়ে যাব!”

ভোর মুখ গোমড়া করে মাথা নাড়িয়ে বের হতে নেয়। পাতার মনটা খানিক নরম হয় ভোরের শুকনো মুখ দেখে।

-” ভোর?”

ভোর ঘুরে এগিয়ে এসে বলে,

-” জি মিস?”

-” সকালে কি খেয়েছো?”

ভোর খানিক ভেবে বলে,

-” নুডুলস আর দুধ খেয়েছিলাম!”

-” ক্ষিধে পেয়েছে?”

ভোর পেটে হাত দিয়ে বলে,

-” একটু একটু!”

পাতা হেসে চেয়ার থেকে উঠে ভোরকে তুলে টেবিলের উপরে বসিয়ে মাথার চুল এলোমেলো করে বলে,

-” আমার কাছে টিফিন আছে। খিচুড়ি আর ডিম খাবে?”

-” আপনি খাবেন না?”

-” খাবো । কিন্তু বেশি আছে ওতগুলো খেতে পারবো না! তুমি একটু কমিয়ে দেবে?”

-” তাহলে আপনি খাইয়ে দিবেন মিস?”

পাতা হেসে মাথা নেড়ে বোতল বের করে হাত ধুয়ে টিফিনের বক্স খুলে। একটু ইতস্ততও হয়! খাবার নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে ভোরকে তো বলল কিন্তু এই নবাবের ঘরের নবাব তাদের খিচুড়ি খেতে পারবে তো! সে বিসমিল্লাহ বলে অল্প খিচুড়ি আর ডিম ভোরের মুখে দেয়। ভোর চিবিয়ে খেতে থাকে আনন্দে।

-” মিস আপনিও খান?”

পাতা নিজের মুখে তোলে। খিচুড়ি খারাপ হয় নি ভালোই! তবে তার খেতে ইচ্ছে করছে না। তবুও গিলল। ভোর একটু খেয়ে বলে,

-” মিস আর খাব না! পেট ভরে গেছে!”

পাতা জোর করে না। পানি খাইয়ে মুখ মুছে কপালে চুমু দিল। ভোর ডান গাল এগিয়ে বোঝায় এখানেও পাতা সেখানেও চুমু দেয়। পর পর বাম গাল , থুতনি। পাতা তার আবদার পূরণ করে মাথায় হাত বুলিয়ে চুল ঠিক করে দিয়ে ভোরকে এগিয়ে দেয়। দরজার কাছে আভারির সাথে দেখা হলে আভারির কাছে ভোরকে দিয়ে রুমে ফিরে। ভোর আভারির দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে ক্লোজআপ হাসি দেয়। আভারি মুখ ফিরিয়ে বলে,

-” আমি স্যারকে সব বলে দেব!”

ভোর হেঁটে যেতে যেতে বলে,

-” তো! তোমার স্যারকে আমি ভয় পাই নাকি হুম?”

-” পাও না?”

-” না”

-” জানি তো!”

-” ভালো”

______

-” কি খাবি?”

-” মাটন বিরিয়ানি ,চিলি চিকেন, বিফ কাবাব,পাসতা,কোল্ড কফি..”

আর বলতে পারে না। অরুণ টেবিলে পড়ে থাকা ফাইল দিয়ে শুভকে ঢিল ছুঁড়ে মারে।

-” শালা বাপের হোটেল পেয়েছিস? কফি ছাড়া কিছুই পাবি না!”

শুভ হেসে বলে,

-” বাপের না তবে বন্ধুর। আর তুই ই তো বললি কি খাবি! তাই সরল মনে যা এলো বলে দিলাম!”

-” আব্বু?”

বলেই ভোর কেবিনের দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করে। অরুণ শুভ সেদিকে চায়।

শুভ হাত নেড়ে হাই দিলে ভোর তার কোলের কাছে এসে বলে,

-” আঙ্কেল তুমি? তুমি আর আমাকে ভালবাসো না। ভুলেই গেছ!”

শুভ তাকে কোলে তুলে আদর করে বলে,

-” এতো কিউট বাবাকে ভুলা যায়! আর কে বলেছে ভালোবাসি না। অনেকগুলো ভালোবাসি!”

-” তাহলে আর আসো না কেন আমাদের বাড়িতে?”

-” ব্যস্ত থাকি বাবা। তুমিও তো যেতে পারো বাবাকে নিয়ে আমাদের বাড়ি?”

ভোর বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,

-” বাবা ব্যস্ত থাকে তো!”

-” তুমি ফোন করলেই আমি তোমাকে নিয়ে যেতাম। এরপর থেকে আমার কথা মনে পড়লেই কল করবে আমি এসে বাবাটাকে নিয়ে যাবো ঠিকাছে?”

ভোর মাথা নাড়ায়। আভারি ততক্ষণে কেবিনে এসে দাঁড়িয়েছে। অরুণ আভারিকে বলে,

-” আভারি ভাই বসো?”

-” না স্যার বসবো না‌। ভোরকে কি আপনি নিয়ে যাইবেন? নাকি আমি অপেক্ষা করবো?”

-” আমিই নিয়ে যাবো! তোমার ওয়েট করতে হবে না।”

-” তাইলে আমি যাই‌?”

শুভ আভারিকে দেখে বলে,

-” ভারি ভাই ভালো আছো? আমাদের সুইট ভাবি কেমন আছে?”

আভারি বিড়বিড় করতে করতে চলে যায়। স্যার ভালো হলেও স্যারের সব কয়টা বন্ধু বদমাইশ। তার বউয়ের পিছনে পড়ে থাকে। সুইড সুইড বলে কানের পোকা বের করে ফেলে।
অরুণ আভারির প্রস্থান দেখে বলে,

-” তোরা ভালো হলি না! মিনু ভাবিকে এটা ওটা বলে ফ্লার্ট করে বেচারা আভারি ভাইকে পেরেশান করিস। সেই জন্য তোদের দেখতেও পারে না।”

শুভ হেসে বলে,

-” তাকে বিরক্ত করতে বেশ লাগে!”

ভোর হেসে উঠলো তার কথায়। অরুণ খানিক হেসে ম্যানেজারকে কল করে তিন প্লেট মাটন বিরিয়ানি, কোল্ড ড্রিঙ্কস ও আইসক্রিম আনতে বলে পাশের রেস্টুরেন্ট থেকে। শুভ চোখ ছোট ছোট করে বলে,

-” ছেলের জন্য বাপের হোটেল খুলে গেল বাহ!”

-” বাপের জন্য বাপের হোটেল খুলবে না?

অরুণ উঠে এসে ভোরকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করে নিজের চেয়ারে বসিয়ে পরনের টাই, সু , মুজো খুলে শার্ট টাও খুলে টেবিলে রেখে বলে,

-” আব্বু ওয়াশ রুমে চল ফ্রেশ করিয়ে দিই। আর স্কুল ড্রেসের শার্ট প্যান্টও পাল্টে দিব। রেস্ট রুমে তোমার সবকিছু আছে।”

স্কুলে ভর্তির আগে ভোরের সারাটা দিন বাবার সাথে অফিসেই কাটতো। অরুণ যেখানে যেতো তাকে বগলদাবা করে নিয়ে যেত। তাই অরুণ ও ভোরের সব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অরুণের কেবিনের সাথে লাগোয়া রুমে আছে।
অরুণ ভোরকে নিয়ে চলে গেল রুমে। আর শুভ প্রতিবারের মতো এক যত্নশীল বাবাকে দেখে। কি সুন্দর করে সব দিকে খেয়াল রাখে নিজের ছেলের! বাবা হিসেবে অরুণের কোনো তুলনা নেই হয়তোবা!
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে রুমে ছেলেকে চেঞ্জ করিয়ে কেবিনে আসে। ভোরকে পাশের সোফায় বসায়। শুভও সেখানে বসে।

-” ভোর বাবার অনেক ক্ষিধে পেয়েছে তাই না? আমারও মনে হচ্ছে পেটের ভিতরে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে বিরিয়ানর জন্য।”

ভোর হেসে বলে,

-” ইয়াক ইঁদুর! আর আঙ্কেল আমার ক্ষিধে পায় নি। আমি খেয়েছি!”

অরুণ ছেলেকে জিজ্ঞাসা করে,

-” কি খেয়েছো? নিশ্চয়ই ফাস্টফুড?”

ভোর না না করে বলে,

-” খিচুড়ি খেয়েছি। পাতা মিস টিফিনে এনেছিল! আমাকেও খেতে বলল তাই!”

অরুণের মুখশ্রী গম্ভীর হয়ে ওঠে।

-” তোমাকে না বলেছি অপরিচিত কেউ কিছু দিলে ভুলেও খাবে না!”

-” বাহ রে! মিস কি অপরিচিত নাকি!”

শুভ হেসে বলে,

-“একদম বাপের ছেলে! কথায় হারানো যাবে না!”

অরুণ চোখ রাঙায় দুজনকে। ভোরকে শাসনের সুরে বলে,

-” আর কখনো কারো হাতে কিছু খাবে না! খেলে আমি কিন্তু খুবই কষ্ট পাব আব্বু!”

ভোর মাথা নেড়ে বলে ,

-” কারো হাতে খাব না। তবে পাতা মিসের হাতে খাব‌ । উনি খুব ভালো। কত আদর করে! আব্বু জানো চাচিমনির মতো তার গা থেকেও আম্মু আম্মু গন্ধ আসে! আব্বু পাতা মিস আমার আম্মু হলে ভালো হতো না?”

চলবে……