#পাতা_বাহার
লেখনীতে: #বেলা_শেখ
#পর্ব- ১১ (প্রথম অংশ)
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
পাতা নিজেও হাত ধুয়ে ভাত মাখিয়ে ভোরের মুখে দেয়। ভোর হাসিখুশি মুখে পুরে খেতে থাকে। নাহ খাবারটা মজার! তখনই ফোনটা পুনরায় বেজে ওঠে পাতার! সবাই তার দিকে তাকিয়ে! পাতা বাম হাতে রিসিভ করে কানে ধরে। হ্যালো বলার সুযোগই পায় না!
-” মিস পাতাবাহার! আমি আপনাদের বাড়ির সামনে! দয়া করে ভোরকে নিয়ে আসুন! রাইট নাও!”
পাতার ভিতরটা কেঁপে ওঠে খানিক! কি ভয়ানক গম্ভীর আওয়াজ! ভোর সহ সবাই পাতার দিকে চেয়ে পাতা তাদের দিকে চেয়ে অরুণকে বলে,
-” নিয়ে আসছি এই দশ মিনিট!”
-” এক মিনিটও না! জলদি নিয়ে আসুন নইলে বাচ্চা কিডন্যাপের কেস ঠুকে দিব!”
পাতা দাঁত কিড়মিড় করে মনে মনে ভয়াবহ কয়েকটা গালি দেয়। যেগুলো অরুণ সরকার শুনলে তাকে হয়তোবা রিমান্ডে পাঠাতো! পাতা কল কাট করে! এক মিনিট? দেখ অপেক্ষা কত প্রকার ও কি কি তোকে বুঝিয়ে দেবো! ভোরের মুখে লোকমা দিয়ে বলে,
-” ভোর ধীরে ধীরে খাও! কোনো তাড়াহুড়া নেই!”
ভোর মুখে ভাত নিয়েই চিবোতে চিবোতে বলে,
-” আব্বু ছিলো কলে?”
পাতা মাথা নাড়ে। লাবনী আক্তারের ভ্রুযুগল কুঁচকে যায়! সন্দিহান কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
-” তোকে কেন কল করেছিল? আর নাম্বারই বা পেলো কোথায়?”
পাতা অসহায় বোধ করে! মায়ের ভাবনা কি হতে পারে ভেবেই! লতা বুঝতে পেরে বলল,
-” আম্মু? পাতা ভোরের টিচার! তো ভোরের বাবার কাছে ছেলের টিচারের নাম্বার থাকবে এটা স্বাভাবিক! আর ভোর এখানে এসেছে তাই হয়তো কল করেছে!”
লাবনী আক্তার বিশ্বাস করে। তবুও কেমন যেন মন খচ খচ করে! হুট করে একটা বাচ্চা আনলো! এখন বাচ্চার বাপ ডিভোর্সি! তার সাথে পাতার কোনো কানেকশন নেই তো আবার! নাহ কি ভাবছে সে! পাতা ওমন মেয়ে মোটেই না! তিনি পাতাকে জিজ্ঞেস করলেন,
-” কি বললো ওর বাবা?”
পাতা দড়িমসি করে জবাব দিল,
-” ওর বাবা নিতে এসেছে ওকে! বাইরে দাঁড়িয়ে আছে বললো!”
ভোরের মুখ খানা চুপসে যায়। আজ তাকে বাবা সার্ফ এক্সেল দিয়ে ধুয়ে না দেয়!! লাবনী আক্তার পাতাকে ধমকের সহিত বললেন,
-” তো ভেতরে আসতে বলবি না? নূন্যতম সামাজিকতা নেই তোর মাঝে! লুবমান বাবা যা তো? ওনাকে ভিতরে নিয়ে আয়! বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে কেমন দেখায়! যাহ?”
পাতা ধমক খানা গিলে নেয়! ওই নাক উঁচু ম্যানারলেস লোকের সাথে আবার সামাজিকতা দেখাতে হবে!! পারলে দুই একটা গালি দিয়ে ঘার ধরে বের করে দিতো!না ঘার ধরতে তার মই চড়তে হবে ! জিরাফ কিনা!! তার নামে কিডন্যাপারের কেস ঠুকে দিতে চায়!! আর কতগুলো ধমক দিলো। নেহাৎ সে ভদ্র শান্তশিষ্ট মেয়ে নইলে দেখিয়ে দিতো পাতা কি জিনিস! লুবমান বেরিয়ে যায় রুম্পাকে কোলে নিয়ে।
রাস্তায় আসতেই দেখে বাড়ির পাশে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে! গাড়িতে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে এক ভদ্রলোক। লুবমান এগিয়ে যায় সেদিকে। লোকটির চোখে সানগ্লাস! কালো সুট বুট পড়ে এদিকেই তাকিয়ে! লোকে প্রথম দেখায় বলে দেবে সুদর্শন সুপুরুষ! লম্বা চওড়া মুখে গাম্ভীর্যভাব! সবমিলিয়ে ঝাক্কাস! লুবমান এগিয়ে অরুণের সামনে দাঁড়ায়! এক হাত বাড়িয়ে বলে,
-” আমি লুবমান ইসলাম! আপনি নিশ্চয়ই অরুণ সরকার? ভোরের বাবা?”
অরুণ হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করে! কে এই ছেলে?তাকে চিনে কিভাবে!তাকে জিজ্ঞেস করতে হয় না। লুবমান নিজেই উত্তর দেয়।
-” আমি ভোরের টিচার পাতার ভাই! ভোর আমাদের বাড়িতে! ভিতরে চলুন?”
অরুণ সানগ্লাস খুলে হাতে নেয়!
-” নট নেসেসারি! আপনি প্লিজ ভোরকে নিয়ে আসুন! আমাকে জলদি ফিরতে হবে!”
লুবমান হেসে রুম্পাকে অন্য কোলে নিয়ে বলল,
-” তা হবে না মশাই. ! আপনি ভিতরে চলুন তারপরেই ভোরকে পাবেন। নইলে এতো কিউট বাচ্চা যেতে দিচ্ছি না!”
অরুণ ঠোঁট চেপে রাখে। কিছু ভেবে বলে,
-” ঠিকাছে চলুন!”
লুবমান হেসে পথ ধরে। অরুণ তার পিছু পিছু। রুম্পা অরুণের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে পলকই যেন ফেলছে না। অরুণ হাত বাড়িয়ে তার মুখ বন্ধ করে আঙ্গুল তার ঠোঁটে ধরে চুমুর মতো নিজের গালে ছোঁয়ায়! যেন রুম্পা তার গালে চুমু দিলো! রুম্পা হেসে ওঠে। অরুণের অধরকোনেও হাসি ফুটে ওঠে। কি মিষ্টি বাচ্চা। তার একটা মেয়ের শখ ছিল। মায়ের মতো মেয়ে! শুনেছে মেয়েরা মায়ের মতো শাসন করে ,ভালোবাসে। তাই! ভোরের বেলায়ও মেয়ের আশায় ছিল! কিন্তু উপরওয়ালা আব্বু দিয়েছে!! এতেও সে খুশি!
অরুণ ভিতরে ঢুকে। একতলা আদর্শ মধ্যবিত্তের বাড়ি! ছোট ড্রয়িংরুমে দুইটা ডাবল সোফা একটি সিঙ্গল। সামনে ছোট এল ই ডি টিভি। সোফার পরে ডাইনিং টেবিল তার পর কিচেন! ডায়নিং টেবিলেই সবার আগে নজর যায়! তার কলিজাটা চেয়ারে বসে! মুখের একপাশ দেখা যাচ্ছে! মিস পাতাবাহার তার পাশে দাঁড়িয়ে খাইয়ে দিচ্ছে বোধহয়! ছেলেটাও না! আদর পেতে অস্তাদ! নিশ্চয়ই খাইয়ে দেওয়ার আবদার জুড়ে দিয়েছি! অরুণকে ভিতরে ঢুকতে দেখে লাবনী আক্তার এগিয়ে আসে! অরুণ তাকে সালাম দেয়! ব্যস লাবনী আক্তারের সন্দেহ দূর! এত বড় ঘরের ছেলে তাদের বাড়িতে! তার উপর সুন্দর করে সালামও দিলো! তিনি হেসে সালামের উত্তর নিয়ে বললেন,
-” আমি পাতার মা! কি মিষ্টি ছেলে তোমার! বসো বাবা?”
অরুণ সিঙেল সোফায় বসে! লুবমান অপর পাশে রুম্পাকে নিয়ে বসে। ছোট রুম্পা অরুনের দিকে হাত বাড়িয়ে বু বু করে! অরূণ তাকে কোলে নেয়। রুম্পা অরুণের গালের চাপ দাঁড়ি ধরে টান দিয়ে খিলখিলিয়ে হাসে। তার মিষ্টি হাসি অরুণের অধরকোনেও হাসি ফুটে তোলে। লতা ছেলের খাওয়া শেষ হওয়ায় হাত ধুয়ে অরুণের সামনে লুবমানের পাশে বসে অরুণকে বলে,
-” ভালো আছেন ভাইয়া?”
অরুণ লতার দিকে ছোট ছোট চোখে তাকায়। চেনা চেনা লাগছে কেমন যেন! কোথায় দেখেছে?
-” আই থিংক আই নো ইউ! ইউ?”
লতা মুচকি হেসে বলে,
-” আমি লতা! আমিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলাম! যদিও আপনার বেশ জুনিয়র! তবে আপনাকে চিনি! আমার স্বামীর নাম রাতুল ভুঁইয়া!”
অরুণ খানিকটা ভেবে বলে,
-” আপনাদের লাভ ম্যারেজ! রাতুল নামক ছেলেটা আপনাকে চিঠি দিতে গিয়ে ভুলে আমাদের ডিপার্টমেন্টের একটি মেয়েকে দেয়! এতে মেয়েটার বয়ফ্রেন্ডের সাথে অনেক ঝামেলা হয়েছিল! তখন আমরা মিলেই তো সলভ করলাম! এম আই রাইট?”
লতা জিভে কামড় দিয়ে হেসে মাথা নাড়িয়ে মায়ের দিকে চায়! লাভনী আক্তারের চোখ কপালে! তারা তো এসব বিষয়ে জানে না!তারা পারিবারিকভাবে বিয়ে পড়িয়েছে। রাতুলের পরিবার সম্মন্ধ আনে তারা যাচাই-বাছাই করে মেয়ে দেয়! কিন্তু এখন জানতে পারল এটা পারিবারিক ছিলো না! পুরাই লাভ ম্যারেজ! তিনি মেয়ের দিকে কটমট চোখে চায়! লতা হে হে করে হাসে। লুবমান জোরে হাসতে শুরু করে।
-” আপু দেখ সত্য কোনোদিন চাপা থাকে না!”
অরুণ বোঝে না কিছু! লুবমান তাকে সব খুলে বলে! অরুণ সরকার শুনে লতাকে বলে,
-” বাহ! অনেক দিনের লুকিয়ে থাকা রহস্যের খোলাসা হলো বলে!”
লাবনী আক্তার শুনে আর প্রতিক্রিয়া করলেন না! যেভাবেই হোক বিয়েটা! মেয়ে খুশি আছে এতেই শুকরিয়া! তিনি অরুণকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
-” বাবা হুট করে এসেছে বাচ্চা ছেলেটা! কিছুই রান্না করতে পারি নি! ঘরে যা আছে তাই খেতে দিয়েছি! তুমিও বস টেবিলে? এই মধ্যবিত্তের ঘরে আজ মেজবান হয়ে? আসো?”
অরুণ বিনয়ের সাথে বলেন,
-” না আন্টি! আজ না অন্যদিন! আমার জরুরি কাজ আছে! জলদি যেতে হবে! ভোর জলদি শেষ করো?”
ভোর বাবাকে দেখেছে আগেই! তবুও চুপটি করে বসে আছে! বাবা না আবার বকা দেয়!পাতা ভোরকে চোখে আশ্বাস দিয়ে খাইয়ে দিতে থাকে!
লাবনী আক্তার শুনলেন না অরুণের কথা।
-” খেতে আর কত দেড়ি হবে! আর না হয় একটু দেরি হলো! কিছু হবে না! তুমি বসো তো বাবা? নাকি মধ্যবিত্তের ঘরে খাবে না!”
অরুণ শান্ত দৃষ্টিতে তার দিকে চায়! লতা, লুবমানও অনুরোধ করে! পাতা দূর থেকেই সব দেখছে! এই নাক উঁচু লোক তাদের বাড়িতে খাবে? অসম্ভব! আম্মু আপুর সাথে কথা বললো এই অনেক!! নইলে অহংকারে তার পা মাটিতে পড়ে না! এই লোক যদি তাদের বাড়ি খায় সে তার নাম বদলে মর্জিনা রাখবে! হুহ!
অরুণ বিভ্রান্ত হয় ! কি করবে! সবাই এতো অনুরোধ করছে! আর তাছাড়া ক্ষিধে লেগেছে বেশ! সকাল থেকে পেটে কিছুই পড়েনি! কি মনে করে রাজি হয়!
-” আচ্ছা ঠিক আছে! তবে আমার তাড়া আছে!”
লাবনী আক্তার খুশি হয়ে ডায়নিং এ যায়। লতা অরুণের কোল থেকে মেয়েকে নেয়। অরুণ লুবমানকে উদ্দেশ্য করে বলে,
-” তুমিও আসো!”
লুবমান উঠে যায়! লাবিব সামনে দাঁড়িয়ে! অরুণকে দেখে ভোরের দিকে চায়! ভোর মিষ্টি হাসে!
-” আমার আব্বু!”
অরুণ ছেলের দিকে তাকাতেই ভোরের মুখের হাসি গায়েব । কাঁচুমাচু করে গালে ভাত চিবোতে থাকে! পাতার দিকে চায় অরুণ! পাতার অবস্থাও সেম! লুবমান লাবিবকে দেখিয়ে বলে,
-” আপুর ছেলে লাবিব!”
অরুণ তার মাথার চুল এলোমেলো করে দেয়। বেসিনে হাত মুখ ধুয়ে এসে ভোরের পাশে বসে! পাতা একটু সরে যায়। লাবনী আক্তার অরুনের সামনে প্লেট দিয়ে, ভাত দেয়। অরুণ অল্প খানিকটা ভাত দেয়ার পরেই থামিয়ে দেয়,
-” হয়েছে আর না! লাগলে চেয়ে নেব!”
লাবনী আক্তার খুশি হয়! দুটো চিংড়ি, ভাজি, ডিম , ও কাঁঠালের তরকারি দেয়! অরুণ স্বাভাবিকভাবেই সব শেষ করে! পাতা মনে মনে তাকে ধুয়ে দিচ্ছে! শালা তোর জন্য আজ নিজের নামটা মর্জিনা রাখতে হবে! নাহ! রাখবে না পাতা! এতে কার কি ? কেউ তো আর জানে না! সে তো মনে মনেই পণ করেছিল! কেউ শোনেনি! ভোরের খাওয়া শেষে পাতা তার মুখ মুছে দেয়! ভোর পাতার ওড়নার কোনা টেনে মুখ মুছে মিষ্টি হাসে! পাতা তার গাল টিপে দেয়! অরুণ আড়চোখে দেখে সব! কলিজাটা এই মেয়ের সাথে বেশ সহজেই মিশে গেছে! অবশ্য সবার সাথেই সহজেই মিশে! তবে মিস পাতাবাহারের ব্যাপারটা আলাদা! ভোর সবার মতো তার থেকেও মায়ের মতো ভালোবাসা, আদর পেতে চায়! সবাই না দিলেও মেয়েটা কিছুটা হলেও আদর করে! তার জন্যই তো তার আগেপিছে থাকতে পছন্দ করে! হঠাৎ করে শুভর কথা গুলো কানে বাজে!
খাওয়া দাওয়া শেষে অরুণ ,ভোর সবার থেকে বিদায় নেয় চলে যাওয়ার জন্য! লাবনী আক্তার ভোরের জন্য বৈয়াম ভর্তি মুড়ির মোয়া দিলেন।
-” আরেকটু থেকে যেতে পারতে? বাচ্চাটার সাথে সেভাবে কথাই হলো না!”
ভোর বাবার কোলে আছে। তার কানে কানে ফিসফিস করে বলে,
-” আব্বু আরেকটু থাকি?”
অরুণ শান্ত চোখে চায়! ছেলেটা এতো ছোঁচো স্বভাবের কিভাবে হলো! তাদের পরিবারে আর কেউ তো এমন না! ভোর বাবার চাহনি দেখে চুপ করে যায়! পাতা খেয়াল করে সবটা! অরুণের দিকে তাকিয়ে ভেংচি দিয়ে বিড়বিড় করে বলে ‘শালা’। অরুণে কানে পৌঁছায় না তবে পাতার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চায়! মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো অষ্টাদশী রমনী! গোল জামার সাথে গলায় ওড়না পেঁচানো! কাঁধ থেকে সামান্য নিচে গড়িয়ে পড়া চুল ঝুটি করে রেখেছে! ছোট বাচ্চাদের মতো সামনের চুল গুলো ছোট ছোট করে কাটা সেগুলো কপালে পড়ে আছে। এই হিট এলার্টের তাপমাত্রায়ও গরম লাগে না, নাকি!! গরম লাগলে কি? মেয়েদের আগে ফ্যাশন!তারপর বাদবাকি! অরুণ ছেলেকে কোলে নিয়ে মেইন দরজার পাশে শু জোড়া এক হাতে তুলে নেয়! তারপর বেরিয়ে আসে ঘর থেকে! বেরোতেই সামনে পাতার বাবা আতিকুর ইসলাম সামনে পড়ে! তিনি অরুণ ও ভোরের দিকে একপল চেয়ে পিছনে থাকা সকলের দিকে প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে চায়! অরুণ তার চাহনির মানে বুঝতে পেরে ভোরের শু জোরা বাম হাতে নিয়ে হাত বাড়িয়ে বলে,
-” আমি অরুণ সরকার! এটা আমার ছেলে ভোর সরকার! মিস পাতার স্টুডেন্ট! বায়না ধরে এসেছিল। আমি নিতে এসেছিলাম!”
আতিকুর ইসলাম হাত মেলালেন। হালকা হেসে বললেন,
-” অরুণ সরকার মানে..!”
-” সরকার জুয়েলারি ফ্যাশন হাউসের ওনার!”
আতিকুর ইসলামের হাসি চওড়া হয়!
-” গরীবের বাড়িতে হাতির পারা! অবাক হলাম!!”
অরুণ হাসলো!
-” আসতে পারি না?”
পাতা অবাক গাম্ভীর্যে ঠাসা অরুণ সরকার হাসছে! এই প্রথম হাসতে দেখলো! নাহ লোকটাকে হাসলে বেশ লাগে! একদম ক্রাশ খাওয়ার মতো! মর্জিনা থুক্কু পাতা এসব কি ভাবিস! অরুণ সরকার শুনলে তোকে আস্ত রাখবে না!
আতিকুর ইসলাম হেসে বললো,
-” অবশ্যই আসতে পারেন! তা এখনি কোথায় যাচ্ছেন? বসুন?”
-” নাহ আর্জেন্ট কাজ পড়েছে! অন্যদিন! আসি!”
বলেই পা বাড়ায়! ভোর সবাইকে টাটা দেয় এক হাত নাড়িয়ে অন্য হাতে বৈয়াম! লতার কিছু মনে পড়ায় পাতাকে বলে,
-” ওর শার্ট?”
পাতা জিভে কামড় দিয়ে, রুমে গিয়ে শার্ট নিয়ে আসে। আতিকুর ইসলাম সহ সবাই ড্রয়িং রুমে। পাতা শার্ট টা নিয়ে বেরিয়ে আসে। অরুণ ভোরকে কোলে নিয়ে গাড়ির কাছে চলে গেছে। পাতা দৌড়ে সেখানে যায়। অরুণ ভোর ঘুরে তার দিকে চায়! পাতা হেসে বলে,
-” ভোরের শার্ট! খুলে দিয়েছিলাম! এই নিন!”
অরুণ পাতার হাত থেকে শার্ট নিয়ে ভোরের দিকে চায়! গায়ে একটা টি শার্ট! সাইজে ভোরের থেকে বড়! এটা কার? ভোর ইশারায় পাতাকে কাছে ডাকে! পাতা খানিকটা এগিয়ে যায়। ভোর আরো কাছে আসতে বলে! পাতা ইতস্তত বোধ করে। আরো এগিয়ে গেলে তো ওই নাক উঁচু লোকের অনেকটা কাছে চলে যাবে। ভোর যে তারই কোলে! অরুণ ছেলের গতিবিধি আগেই ধরতে পারে! পাতার কাঁচুমাচু চেহারা দেখে বেশ লাগে! ভোর বিরক্ত হয়ে বলে,
-” মিস আসুন না!”
অগত্যা পাতা এগিয়ে যায়! ভোর ঝুঁকে পাতার গালে চুমু দিল! পাতা মুচকি হাসে! বাচ্চাটা এতো আদুরে! তবে সে খানিকটা লজ্জা পায়!অরুণের দৃষ্টি পাতাতেই নিবদ্ধ! মেয়েটা লজ্জা পাচ্ছে! সিরিয়াসলি! এই ছোট বাচ্চার চুমুতেই!! বিয়ের পর এই মেয়ের কি হবে উপর ওয়ালাই জানে!ভোর পাতাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
-” মিস আমারটা?”
পাতার চোখ ছোট ছোট হয়ে যায়! বাহ এই ছেলে দেখি সুবিধাবাদী! আদর দিয়ে আবার আদর আদায়ও করে নিবে। পাতা ভোরের গালে চুমু দেওয়ার জন্য হালকা উঁচু হয় নাগাল পায় না! এই মেহগনি গাছের কোলে কি না! ভোর খানিকটা ঝুকে। অরুণ তাকে সোজা করিয়ে দেয়! পাতা ভোরের কোমর জড়িয়ে রাখা অরুণের হাতের উপর ভর দিয়ে উঁচু হয়। টুপ করে ভোরের গালে চুমু দিয়ে বিজয়ী হাসে! অরুণ ঝট করে পাতার হাত সরিয়ে দেয়! পাতা চোয়াল ঝুলে যায়! সে কি কারেন্ট নাকি! এভাবে সরিয়ে দিল! নাকি তার গলায় ঝুলে পড়েছিল! আশ্চর্য! এটিটিউড দেখ মনে হয় মেয়েদের কাছেই ঘেঁষে না!
পাতা জোর করে মুখে হাসি ঝুলিয়ে বলে,
-” আবার এসো ভোর?”
ভোর মাথা নাড়ে।
-” ওকে মিস! আপনাকেও আমাদের বাড়ি নিয়ে যাবো! কেমন?”
পাতা হাসে।
-” ঠিকাছে! আর তুমিও এসো! তবে তোমার এই নাক উঁচু বাপকে আনবে না!”
অরুণ শান্ত দৃষ্টিতে পাতার দিকে তাকিয়ে। পাতার কথা শুনে হালকা হাসে! পাতা সেদিকে চোখ ছোট ছোট করে চায়! সে তো ঝগড়াঝাঁটির প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে । কতবড় সাহস তাকে কিডন্যাপার বানিয়ে কেস ঠুকতে চায়! কতগুলো ধমক দিল! আর এখন হাসছে!
অরুণ ঠোঁটে হাসি বজায় রেখে বলে,
-” মিস পাতাবাহার আই এম স্যরি! আসলে তখন মেজাজ ঠিক ছিল না! আভারি ভাই ফোন করে বলে ভোরকে পাওয়া যাচ্ছিল না! শুনেই মাথা কাজ করা বন্ধ করে দেয়! ছেলেটা আমার প্রাণ!”
পাতা অবাক হয় বেশ! নাক উঁচু অহংকারী ম্যানারলেস লোকটা তাকে স্যরি বলছে? আবার এক্সকিউজেসও দিলো! নাহ লোকটা অতটাও নাক উঁচু না!
-” স্যরি বলতে হবে না! আমি বুঝতে পেরেছি!”
-“আসছি!”
বলে গাড়ির জরজা খুলে ভোরকে বসায়! পাতা সেখানেই দাঁড়িয়ে।
-” শুনুন?”
অরুণ থমকে যায়! ঘার ফিরিয়ে বলে,
-” জি?”
-” আমি পাতা নট পাতাবাহার!”
-” একি হলো!”
-” এক হলো না! পাতা! বাহার কোত্থেকে এলো শুনি?”
অরুণ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বুকে হাত গুজে গম্ভীর গলায় বলে,
-” আপনি ঝগড়া করতে এসেছেন?”
পাতা ঘাবড়ে মাথা এদিক ওদিক নাড়িয়ে না বোঝায়! এই তো ঠিক ছিল হঠাৎ এভাবে দৈত্যের মতো করে বলছে কেন?
অরুণ গাড়িতে বসে। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেয়। অরুণ দরজা লাগিয়ে জানালার কাচ নামিয়ে বলে,
-” ওই মিস পাতাবাহার আপনাকে ঘাবড়ে গেলে ব্যাঙের বাচ্চার মতো লাগে!”
পাতার চোখ বড় বড় হয়ে যায়! ব্যাঙের বাচ্চা বললো তাকে!
-” আর আপনাকে ক্ষ্যাপা ষাঁড় লাগে! সব সময় ফোঁস ফোঁস করে যে সেরকম! ”
কিছুক্ষণ থেমে আবার বলে,
-” আমি দ্বিধায় আছি! ভোরের মতো মিষ্টি কিউট ছেলে আপনার মতো ষাঁড়ের কি করে হতে পারে! নিশ্চয়ই চুরি করে এনেছেন তাই না?”
অরুণ গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বের করে পাতার দিকে চায়!পাতা রেগে আছে বোঝাই যাচ্ছে। রাগে আরেকটু ঘি ঢালতে বলল,
-” মিস পাতাবাহার রাগলে আপনাকে বিড়ালের বাচ্চার মতো লাগে!”
গাড়ি শা শা করে চলে যায়! পাতা সেদিকে তাকিয়ে থাকে অপলক।
অরুণ জানালা লাগিয়ে ভোরের দিকে চায়! ভোর মিটি মিটি হাসছে! তার তাকানো দেখেই হাসি গায়েব! মুখ কাচুমাচু করে কিউট করে বিড়াল ছানার মতো চেয়ে আছে! অরুণ ভেবেছিল বেশ বড়সড় ধমক দিবে। এভাবে চাইলে ধমক দেয়া যায়!! তবুও অল্প স্বল্প দেবেই। চোয়াল শক্ত করে ধমক দিবে তখনই ভোর ঝড়ের গতিতে জড়িয়ে ধরে গালে টপাটপ চুমু খেয়ে বলে,
-” আব্বু! আমার কলিজা!”
অরুণ বকবে কিভাবে একে! এভাবে বললে বকা যায়? নাহ যায় না! সে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
-” আব্বুকে বশ করার ভালো পন্থা! হুম?”
ভোর হাসে। মিসের ট্রিক কাজে দিয়েছে তবে।
-” মিস বলেছিল এভাবে আদর করলে তুমি বকবে না! দেখো তুমি বকলে না। আই লাভ ইউ আব্বু।”
-” ওহ্ মিস পাতাবাহারের বুদ্ধি!! শিখিয়ে দিয়েছে তোমাকে? আচ্ছা বকবো না! তবে নেক্সট এমন কিছু করলে আমি অনেক রেগে যাবো বলে দিলাম!”
ভোর মাথা নাড়লো। অরুণ ছেলের মাথা তুলে গালে মুখে আদর দিয়ে পরনের টি শার্ট খুলে ফেলে।
-” আব্বু নতুন টি শার্ট ছিল! ওই ছেলেটার!”
-” ওহ!
বলেই গায়ের দাগ দেখে। নেই এলার্জির কোনো চিহ্ন! অরুণ ছেলেকে বলে,
-” আর চুলকিয়েছে?”
-” নাহ! তুমি আমায় সকালে না বলে চলে গেলে কেন? আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি!”
অরুণ ছেলের কথায় হেসে বলে,
-” স্যরি আব্বু! জরুরি কাজ ছিল।নয় তো যেতাম না! শার্টের নিচে গেঞ্জি পড় নি? মুজোও পড়ো নি দেখছি!”
-” গেঞ্জি পাইনি! আর মুজো আমি পড়তে পারি না! তাই শুধু শু পড়েছি!”
অরুণ হেসে ছেলেকে আদর করে বলে,
-” শু না পড়ে অন্য জুতো পড়তে পারতে!”
ভোর ইনোসেন্ট ভঙ্গিতে চায়।
-” ওটা মাথাতেই আসে নি!”
অরুন হেসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে।
-” তাই! আমার ছেলেটার বুদ্ধি কবে হবে! কবে বড় হবে!”
ভোর কিছু বলে না। বাবার বুকে মাথা রেখে চুপটি করে রয়! অরুণ বুঝতে পারে ছেলের ঘুম ধরেছে।
-” আব্বু ঘুমিয়ো না এখন। মিস পাতাবাহারের বাড়ি কেমন লাগলো?”
ভোরের ঘুম উড়ে গেল। বাবাকে ওবাড়ির সবার কথাই বলল। মিসের ঘরে কি কি আছে সেটাও! এমনকি ওয়াশ রুমের বর্ণনাও দিল। অরুণ ছেলের দিকে তাকিয়ে অপলক। ঠোঁটে মুচকি হাসি।
চলবে….
#পাতা_বাহার
লেখনীতে: #বেলা_শেখ
#পর্ব- ১১ (শেষ অংশ)
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
মেঘাচ্ছন্ন বিকেল। আকাশে মেঘমল্লার ঘুরে বেড়াচ্ছে সকাল থেকেই! হালকা বেগে বাতাস বইছে ধরনীর বুকে। সারি সারি ধান ক্ষেত যেন দলীয় নৃত্য পরিবেশন করছে! দলে দলে পাখির ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে! ছোট বড় অনেকেই ঘুড়ি, গুড্ডি , কয়ড়া উড়াচ্ছে লাটাই হাতে। মেঘাচ্ছন্ন দিগন্তের বুকে রঙ বেরঙের ঘুড়ি দেখতে বেশ লাগছে! বড় কয়ড়া দিগন্তে জুড়ে ভো ভো শব্দের সমাহার সৃষ্টি করছে। পাখির দল ভয়ে হয়তো সেদিকে যাচ্ছেই না! সাদা বকের এসবে ভয় নেই বোধহয়। বক উড়ে কয়ড়াতে বসছে তো গুড্ডিতে ঠোকড় দিচ্ছে। আবার নিচে নেমে ধানক্ষেতে সার, বিষ ইত্যাদি সাইনবোর্ডের উপর চুপটি করে বসে আছে মাছের খোঁজে। দেখতে পেলেই খপ করে মুখে পুরে নিতে দেড়ি নেই!
শুকলা মন্ডল সহ এলাকার কিছু লোক পাতাদের বাড়ির একটু দূরে মাচায় বসে সিগারেট ফুঁকছে! একটু আগে শুকলা সহ সকলের তীক্ষ্ণ নজর পাতা আর অচেনা লোকের দিকেই নিবদ্ধ ছিল। দূর থেকে সব পর্যবেক্ষণ করেছে । তাদের আলাপ আলোচনা কানে না আসলেও সন্দিহান হয়ে চেয়েছিল সকলে। শুকলা শয়তানি হেসে সিগারেটের ধোঁয়া নাক মুখ দিয়ে বের করে শূন্যে ছুড়ে বলে,
-” ওই সাহেব গোছের লোকটা কেডা? বড় গাড়িও আছে। দেখে ভালো বংশের লাগছে। আমার জানামতে আতিকের এমন উচ্চবিত্ত কোনো আত্মীয় নাই ! তাইলে কেডা?”
আরেকটা লোক বলে,
-” হবে হয়তোবা দুঃসম্পর্কের! তয় ওই মাইয়া পাতার সাথে এমন রঙ তামাশা করছিল কেন? এটা শহর না! যে যা মনে চায় তাই করবো! চক্ষু লজ্জার একটা ব্যাপার আছে না?”
সবাই সায় জানালো। পাতা তখন লোকটার অনেকটা কাছে গিয়েছিল। হাতও ধরেছিল যেটা তাদের দৃষ্টিতে কটু লেগেছে।
আরেকটা লোক বলল,
-” মেয়েটাকে নম্র ভদ্রই মনে হয়! আমরা দূর থেকে দেখেছি তাই হয়তো অমন লেগেছে! আর লোকটা তাদের আত্মীয় হওয়ার চান্স বেশি ওদের বাড়ি থেকেই বের হলো তো!”
শুকলা মন্ডল সিগারেটের শলাকা ফেলে পায়ে পিসলেন। শালি তাকে সবার সামনে মেরে অনেক বড় বিপদ ডেকে এনেছে! তুই বুঝতেই পারবি না শুকলা তোর জীবনে কি ঝড় বইয়ে আনে!
-” শোন শামছুল যে বেশি ভদ্রতা দেখায় তার মধ্যেই ঘাপলা আছে! ম্যানা রাই ত্যানা ছেড়ে যানো না? ওই মাইয়ার জন্মেরই তো ঠিক নাই বোধকরি! দেখো না, আতিকের ভায়রা ভাইয়ের ঘরেই বড় হইছে! মেয়ে বানাইয়া নিয়া গেছিলো না? ফিরাইয়া দিল ক্যা? নিশ্চয়ই কোনো অকাম কুকাম করছিল! মাইয়াডার বয়সও তো ম্যালা! পঁচিশ ছাব্বিশ! অথচ বিয়া হওয়ার নাম নাই! দেখতে সুন্দর হলে কি হইবো চরিত্রের ঠিক নাই! শহরে যায়, না জানি কি কাম কাজ করে! সত্যিই মাস্টারি করে নাকি কারো বিছানা.. থাক সেসব না বলি!”
সবাই শুকলার দিকে চায়। একজন চরিত্রহীন লোক অন্যের চরিত্র নিয়ে কথা বলছে! উপস্থিত সকলেরই শুকলার চরিত্র সম্পর্কে অবহিত! তবে কিছু বলল না। পাতা মেয়েটার দিকেও একটু নজর দিতে হবে! যদি খারাপ কিছু পায় তো শালিশ বসাতে সময় নেবে না। দরকার হলে এক ঘরে করে দেবে আতিক দের। তাদের গ্রামে এসব নোংরামি চলবে না।
অথচ তারা গ্রামবাসি এটা ভাবেই না শুকলা চরিত্রের ঠিকানা নেই। সে অন্যের চরিত্রের ইজহার করে! আর মেয়ের চরিত্রে সমস্যা হলে তার নামে শালিশ বসাতে হবে ,এক ঘর করে দিবে। সেখানে শুকলার মতো কত শত ছেলের চরিত্রের গুনাগুণ জেনেও চুপ রয়!
________
ঠান্ডা বাতাস পাতার শরীরে বাড়ি খাচ্ছে। সে এখনো দাঁড়িয়ে সে জায়গায়। লোকটা তার সামনে তাকে ব্যাঙের বাচ্চা আবার বিড়ালের বাচ্চাও বলে দিলো! না সে ব্যাঙের মতো লাফায় না বিড়ালের মতো মিও মিও করে খামচি দেয়! তবে? কোন লজিকে বলে দিলো! শালা তুই বিড়ালের বাচ্চা! না বিড়াল কিউট হয়! তুই একটা ক্ষ্যাপা ষাঁড়! সাথে মহিষও! মনে মনে বিড়বিড় করতে করতে পাতা বাড়ির ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। ড্রয়িং রুমে সবাই আলোচনা করছে কিছু বিষয়ে পাতা কিছু বুঝতে পারলো না। লাবিবের কাছে গিয়ে তাকে ধীরে বলে,
-” কি নিয়ে আলাপ চলছে বোনের ছেলে?”
লাবিব মিটমিট করে হেসে বলে,
-” তোমার বিয়ের আলাপ চলছে মায়ের বোন!”
পাতার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। সে কথাগুলোতে মনোযোগী হয়। পাতার বিয়ের কথা শুনলে লজ্জা লাগলেও লজ্জার থেকে বেশি ভালোলাগে! ইশ কবে তার বিয়েটা হবে! একটা জামাই হবে! সে কাপল পিক তুলে ফোনের ওয়াল পেপারে দিবে! ফেসবুকে মেরিটাল স্টেটাস দেবে! #পাতার_জামাই ! জামাইকে ভালোবেসে বুকে না, মাথায় তুলে রাখবে সে!বিয়ে ও বিয়ের পর তার সব প্ল্যান তৈরি আছে। শুধু জামাই ও কাজির অপেক্ষায়! পাতা মনে মনে আল্লাহকে স্বরণ করে, “হে উপর ওয়ালা ! আমার জামাইটাকে জলদি আমার বাড়ির আঙিনায় পাঠিয়ে দিও! জামাই ছাড়া আর কতকাল থাকবো! জামাই হীনা দিন দিন খিটখিটে হয়ে যাচ্ছি যে! জলদি পাঠিয়ে দাও। তবে সাবধানে হ্যা জামাই না আবার ভুলে অন্যের বাড়ির আঙিনায় চলে যায়!”
পাতা সবার সামনে স্বাভাবিক মুখে থাকলেও ভিতরে লুঙ্গি ডান্স দিচ্ছে। মেয়েদের ব্যাপারে একটা সত্যি কথা হলো এরা বাইরে যতোই না না করুক বিয়ে করবো না হ্যান ত্যান অথচ এরাই মনে মনে জামাইয়ের জন্য বিরহে কাতর হয়ে থাকে!!
লাবনী আক্তার রুম্পাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লতা লুবমান ডাবল সোফায় বসে।আতিকুর ইসলাম পাতার দিকে তাকিয়ে বলে,
-” একটা প্রস্তাব এসেছে তোমার জন্য! ছেলেও তোমার মতো টিচার নাম আব্দুল করিম! হাই স্কুল লেভেলের! বেসরকারি স্কুল কিন্তু পারমানেন্ট চাকরি! খন্ডকালীন নয়! ছেলে তোমাকে দেখেছে কোথাও। ওর পরিবার খোঁজ খবরও নিয়েছে টুকটাক। ওদের থেকে হ্যা বলাই চলে। ওরা আসবে হয়তোবা! তবে এখন না কিছু দিন পরের কথা বললো। ছেলের বোন জামাই আসলে! দেখো তুমি আমার দায়িত্ব! আমি যথাযথ ভাবেই পালন করতে চাই! ছেলেটা ডিভোর্সি নয়! আর যৌতুকের কথা এখনো বলে নি। আমি আর এই প্রস্তাব হাতছাড়া করতে চাইছি না! তুমি কি বলো?”
পাতার হাসিখুশি মনটা নিমিষেই বিষিয়ে যায়। সে শুধু দায়িত্ব? তাদের মেয়ে না? তাদের উপর বোঝাসরূপ যাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিদায় করতে চায়! পাতার আঁখি ভরে ওঠে নোনাজলে। সে মুচকি হেসে আতিকুর ইসলামকে বলে,
-” আব্বু তোমরা যা ভালো মনে হয় করো! তবে সবটা তাড়াতাড়ি করো কেমন? অন্যের দায়িত্ব হয়ে আর থাকতে মন চায় না!”
বলে হন হন করে নিজের রুমে যায়। সে শুধু সকলের দায়িত্ব! তবে সে মনে মনে চায় যে তার জীবনে যে আসবে সে তার যেন শুধু দায়িত্ব না হয়!
_______
সরকার বাড়ির আঙিনায় দুই তিনটা কোকিল ডাকছে অবিরত। কু কু ধ্বনিতে ভরে গেছে আছে আশ পাশ! একটা কোকিল গলা ছেড়ে কুহ বলছে তো আরেকটা তার চেয়েও উঁচু গলায় কুহ বলছে। এভাবে অনবরত হাঁক ছেঁড়ে ডেকে যাচ্ছে। যেন কোমড় বেঁধে ঝগড়া করছে একে অন্যের সাথে। মাঝে মাঝে অন্যান্য পাখির গলাও ভেসে আসছে। ভোর গাড়ি থেকে নেমে গলা চড়িয়ে ‘ কুহ কুহ’ ডাকে। কোকিলের দল খানিক চুপ থেকে একসাথে বলে কুহ। ভোর হেসে উঠে আবার কুহ বললেও পাখিও বলে। ভোর অরুণের হাত ধরে বলে,
-” আব্বু দেখো আমি পাখির সাথে কথা বলতে পারি! আই হ্যাভ সুপার পাওয়ার!”
অরুণ ছেলের হাত ধরে ভিতরে নিয়ে যেতে যেতে বলে,
-” ইয়েস ইউ হ্যাভ!”
ভোর খুশি হয়ে বাবার সাথে পা মেলালো। অরুণ ,ভোর মেইন ডোর পেরিয়ে একটু দুরত্বে ড্রয়িং রুমের দিকে যায়। সেখানে আসমা, রুবি, আরিয়ান,আনিকা,আদুরি বাদেও দুটো পরিচিত মুখ দেখতে পায় ভোর বাবার হাত ছেড়ে দৌড়ে তাদের কাছে যায়। অরুণ গম্ভীর মুখে তাদের সামনে বসে বলে,
-” মামা ভাগ্নি একসাথে? আমি বিনা দাওয়াতে মেহমান খাওয়াতে পছন্দ করি না। যা ফুট?”
শুভ হেসে ভোরকে কোলে বসিয়ে আদর করে বলে,
-” বন্ধুর বাড়ি আমার বাড়ি! মেহমান কে এখানে? আমি তো দেখতে পাচ্ছি না! ভোর বাবা তুমি দেখতে পাচ্ছো?
ভোর হেসে মাথা নাড়ায় সে দেখতে পাচ্ছে না! আসমা বেগম হেসে বলে,
-” হ্যা নিজের বাড়ি বলেই তো মাসের পর মাস পেরোয় অথচ দেখা পাওয়া যায় না!”
শুভ হেসে বলে,
-” আন্টি বউ বাচ্চা কাজ নিয়েই পড়ে থাকতে হয়! নিজের জন্যই সময় নেই! তবে সময় পেলেই আমিই আসি কিন্তু! আপনারা তো ভুলেও যাবেননা! গরিবের বাড়ি কিনা!”
আরিয়ান সোফায় গা এলিয়ে বলে,
-” হ্যা শুভ ভাই উত্তরায় পাঁচ তলা বাড়ির মালিক দুটো লাক্সারি কার! ভার্সিটির প্রফেসর যে প্রায় লাখ টাকা বেতন পান! সেরকম গরীব!”
আদুরি ভাইয়ের কথায় তাল মেলায়।
-” ছোট ভাইয়া তুমি ভাবীর কথা ভুলে যাচ্ছো! তিনি তো একজন স্বনামধন্য রেস্টুরেন্টের মালিক! ওদের গরীব বলা যায় না! তার থেকেও খারাপ অবস্থা!”
রুবি হেসে উঠলো।
-” ভাইয়া এমন গরীব বাংলার ঘরে ঘরে হোক!”
শুভ ঠোঁট কামড়ে ধরে দাঁত দ্বারা। কেন বলতে গেলো! এরা সবাই এখন তার খিল্লি উড়াবে! অরুণ মিনুকে ডেকে বলে,
-” মিনু আপা গরীবদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা করো! আর এই গরীবের ঘরে গরীব রুমে চল? আর ভোর? টুম্পা আপুকে নিয়ে স্টাডি রুমে যাও! শনিবার থেকে এক্সাম তোমার!”
ভোর টুম্পার হাত ধরে নিয়ে যায়। টুম্পা মুখ গোমড়া করে পা চালায়! ভোরের মা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে অথচ আপু বনে গেলো! এই মি. অরুণ সরকারকে মামার বন্ধুই হতে হলো! অবশ্য মামার বন্ধু না হলে পরিচয়ও হতো না হয়তো!
অরুণ উঠে অনিকার গালে চুমু দিয়ে নিজের রুমে যায়। শুভ সকলের সাথে আরো কিছু সময় কথা বলে সিঁড়ি বেয়ে অরুণের রুমে আসে। নক না করেই ধরাম করে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে দেখল অরুণ তোয়ালে পড়ে প্যান্ট পড়ছে! শুভ দুষ্টু হেসে এক হাত চোখের উপর রেখে বলে,
-” দেখে ফেলেছি!!”
অরুণের ভাবান্তর হয় না। প্যান্ট উপরে তুলে তোয়ালে খুলে শুভর দিকে ছুঁড়ে মারে। চেন লাগিয়ে বলে,
-” দেখবি আর জ্বলবি লুচির মতো ফুলবি!”
শুভ বুঝলো না। সে কেন জ্বলবে!
-” কেন? বুঝলাম না!”
অরুণ কিছু বলে না ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে অল্প। আলমারি খুলে টি শার্ট বের করে পড়ে নেয়।
শুভ কোমড়ে হাত দিয়ে ছোট ছোট করে চায়!
অরুণ শুভর ঘাড়ে থেকে তোয়ালে নিয়ে বলে,
-” কি দেখছিস? আই হ্যাভ নো ইন্টারেস্ট ওন ম্যান! মেয়ে হলে ভেবে দেখতাম! ”
শুভ অরুণের পিঠে একটা লাগায়।
-” শালা! তোর হাবভাব ভালো না। ভালো একটা পাতা দেখে বিয়ে কেন করছিস না?”
অরুণ তোয়ালে বেলকনির চেয়ারে রেখে এসে বলে,
-” তুই জানিস কি না ! বাট তোর ভাগ্নি টুম্পা ক্রাশড ওন মি! এন্ড ওলসো লাভ মায় চাইল্ড! তার সাথে হলে কেমন হয়?”
শুভর চোখ রসগোল্লার ন্যায় হয়ে যায়! অরুণ সিরিয়াস হয়ে বলে,
-” দিবি না? কেন? দেখ শুভ! তুই যেমন তোর অবিবাহিত ভাগ্নিকে এক বাচ্চার বাপের সাথে বিয়ে দিতে রাজি হবি না! তেমনি মিস পাতা বাহারের পরিবারও নিশ্চয়ই সেটা চাইবে না! তাই বাজে কথা বলে মাথা গরম করাবি না!
শুভ খানিকক্ষণ চুপ থেকে অরুণের সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
-” দিবো! যদি টুম্পা ও তুই দুজনেই চাস! আই হ্যাভ নো প্রবলেম! তুই কি চাস?”
অরুণ গম্ভীর মুখে বলে,
-” আর ইউ ম্যাড! তোর ভাগ্নি আমারও ভাগ্নি!আর তুই দিবি বললেই তো হবে না! তোর বোন ,বোন জামাই?”
শুভর মুখ চুপসে যায়। অরুণ হেসে বলে,
-” হয়েছে থাম ভাই! মুখ গোমড়া করিস না! কথায় আছে না? যদি থাকে নসিবে হেঁটে হেঁটে আসিবে! আই মাস্ট প্রেয়ার ভাগ্য যদি আবারো কারো সাথে জুড়ে দেয় সে যেনো আমার কলিজাটাকে একটু ভালোবাসে!”
শুভ মাথা নাড়িয়ে বলে,
-” হুম বুঝলাম! আন্টিরা একটা মেয়ে দেখেছে! শ্রাবনী আহসান নাম! ডিভোর্সি! তোর সাথে কথা বলবে এ ব্যাপারে! আমি ছবি দেখলাম বেশ ভালোই দেখতে!”
অরুণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
-” মেয়ে পছন্দও করে ফেলেছে! নট ব্যাড! বাট আগে আমি তার সাথে দেখা করতে চাই। কথা বলে নিতে চাই।”
-” ওনারাও এমনটাই ভেবেছে। আগে তোরা দেখা করবি একে অপরকে জানবি দেন এগোবি!”
অরুণ মাথা নাড়ে। তার বুকটা কেমন ভার ভার লাগছে। যেন কিছু বোঝা বেঁধে রাখা হয়েছে! কি হতে চলেছে ভবিষ্যতে?
________
পাতা নিজের রুমে বসে আছে। এমনি বসে আছে শূন্যে তাকিয়ে। তার মনটা ভিষণ খারাপ! কান্না পাচ্ছে কেমন যেন! কিন্তু কাঁদতে পারছে না। চোখ দিয়ে অমূল্য সম্পদটা বেরোচ্ছে না। পাতা হাত বাড়িয়ে জানালাটা খুলে দেয়। সাথে সাথে শীতল বাতাস বেয়ে আসে। ঘুটঘুটে অন্ধকার বাইরে। কেমন ভুতুড়ে পরিবেশ। ঝিঁঝিঁ ডাকে অবিরত। সাথে ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ডাক। ব্যাঙ থেকে মনে আসে ভোরের আব্বুর কথা! তাকে ব্যাঙের বাচ্চা বলেছিল! ভাবতেই হাসি পেলো! অন্ধকারে তাকাতেই গা ঝেড়ে ওঠে। ঝটপট হাত বাড়িয়ে জানালা লাগিয়ে বুকে থুতু দেয়। সাথে সাথেই দরজা ধাক্কানোর আওয়াজ আসে। পাতা ভয়ে ‘ও মা গো’ বলে লাফিয়ে ওঠে। ভুত বলতে কিছু হয় না এটা সে দিনের বেলায় ষোলো আনা বিশ্বাস করলেও রাতে এক আনাও করে না। তার চিল্লানো শুনে লতা দরজা আরো জোরে ধাক্কা মেরে বলে,
-” ভুত নই আমি! তোর জামাইয়ের শালী হই।দরজা খোল পাতু!”
পাতা খানিকটা দাঁড়িয়ে থাকে। সে শুনেছে ভুত চেনা মানুষের রূপেও আসতে পারে! তাই দরজায় কান লাগিয়ে অনুভব করে সত্যিই ভূত কি না! পরে ভাবে ভুত হলে তো দরজা ধাক্কানোর প্রয়োজন ছিল না। হাওয়া হয়েই ভিতরে আসতে পারতো। আপুই হবে! তাই দরজা খুলে দিল। লতা কটমট করে চেয়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে ভিতরে ঢোকে।
-” এত বড় ধামড়ি মেয়ে কি না ভুতে ভয় পায়! লোকে শুনলে হাসবে!”
পাতা দরজা বন্ধ করে লতার দিকে চায়। বালিশ নিয়ে এসেছে। তার সাথে ঘুমাবে কি?
-” হ্যা তোর সাথেই ঘুমাবো!”
পাতা খুশি হয়।
-” সত্যিই?”
-” না মিথ্যে। বিছানা ঠিক কর জলদি?”
পাতা বিছানা ঠিক করে। লতা মেয়েকে একপাশে শুয়ে দিয়ে মাঝখানে শোয়। পাতার ঘুম খুবই জঘন্য! পাতা এসে বোনের ওপাশে শুয়ে জড়িয়ে ধরে পা তুলে দেয়! লতা ছ্যাত করে ওঠে।
-” এই ছাড় ছাড়! গরমের ভিতর গা ঘেসছিস কেন? আর পা নামা?”
পাতা সরে না। না পা নামায়।
-” ওমন করছো কেন? হুম! দুলাভাই ধরলে নিশ্চই এমন করো না!”
-” সে ধরলে ভালো লাগে। কুলম্বের সূত্রে বিপরীত আধান আকর্ষণ করে পড়িস নি! আর সম আধান বিকর্ষণ!”
পাতা তবুও ছাড়ল না। লতা হেসে বোনকে জড়িয়ে নেয়। ছোট থেকেই পাতাকে সে অনেক স্নেহ করে। পাতাকে মা বাবা খালাকে দিলে সে অনেক কেঁদেছিলো। তার বোনকে কেন ওরা নিয়ে গেলো!
-” পাতা বিয়ের কথা শুনে মনে মনে লাড্ডু ফুটছে তাই না? আমি জানি তুই খুব বিয়ে পাগলা!”
পাতা মলিন হাসে।
-” হুম আপা। আমি নিজের একটা ব্যাক্তিগত মানুষ চাই। যার সবটা জুড়ে আমি থাকবো। আমাকে দায়িত্ব না ভালোবাসার চাদরে মুড়ে নিবে! একটু স্বস্তির জীবন দিবে।শত ব্যস্ততার ভিড়েও একটু কেয়ার করবে। যেখানে সেখানে আগাছার মতো যেন থাকতে না হয়! কিছু দিন এ বাড়ি তো কিছু দিন ও বাড়ি । আমি আর কারো বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। না তোমার আব্বুর না প্রিয়োর আব্বুর!”
_________
-” আব্বু?”
-” ঘুমোওনি?”
ভোর বিড়াল ছানার মতো অরুণের বুকে আরেকটু সেটে যায়। অরুণে কম্ফোর্ট দিয়ে ছেলেকে ভালোমতো জড়িয়ে নেয়। পাতাবাহার নামক বিড়ালটি কম্ফোর্টের ভিতরে অরুণের পায়ের কাছে ঘেঁষে শুয়ে আছে। মাঝে মাঝে মিও মিও করছে।
ভোর জোরে জোরে কয়েকটা নিঃশ্বাস টানলো।
-” ঘুম ধরছে না!”
অরুণ ছেলের চাঁদ মুখখানি আঁজলা ভরে বুক থেকে সরিয়ে কপালে চুমু দিয়ে বলে,
-” কি হয়েছে কলিজাটার? ঘুম আসছে না কেন আজ? দিনেও তো ঘুমাও নি? ক্ষিধে পেয়েছে? কিছু খাবে? আমি বানিয়ে আনি?”
ভোর কেঁপে ওঠে।
-” নাহ। ভালো লাগছে না আব্বু!”
অরুণ হাত বাড়িয়ে রিমোট খুঁজে লাইট জ্বালায়। লাইটের আলোয় ভোরের চোখ ছোট ছোট হয়ে যায়। বিড়াল শাবকটি কম্ফোর্টের ভিতর থেকে বেরিয়ে ভোরের কাছে গিয়ে মিও মিও করে। অরুণ তাকে সরিয়ে বলে,
-” এই পাতাবাহার! সরো? যাও শুয়ে পড়ো?”
বিড়ালটা একটু সরে বসে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। অরুণ ছেলেকে বলে,
-” আব্বু? কি হয়েছে তোমার?”
-” ভালো লাগছে না!”
অরুণ যেন অস্থির হয়ে পড়ে। কি হলো ছেলেটার! ভালো লাগছে না কেন? ঠিকই তো ছিল বিকেলৈ শুভ টুম্পার সাথে অনেক মজা করেছে। আনিকার সাথে পুতুলও খেলেছে। রুপকে কোলে নিয়ে আদর করেছে। সবার সাথে হাসিখুশিই ছিলো! হঠাৎ? ভোরের গালে মুখে অসংখ্য চুমু দিতে দিতে বলল,
-” আব্বু? কলিজা? আমার সোনা বাবা! কি হয়েছে? মন খারাপ কেন? খারাপ লাগছে? আমরা কার্টুন দেখি চলো?”
ভোর মাথা নাড়ে। দেখবে না। অরুণ নিজেকে শান্ত করে ভোরের দিকে চায় ভোর চুপটি করে তার দিকেই চেয়ে।
-” আব্বু সবার মা কত ভালো! রোহানের আম্মু রোহানকে ভালোবাসে। চাচিমনিও আনি , রূপকে কত ভালোবাসে! পাতা মিসের বোন তার ছেলেকে কত ভালোবাসে! আব্বু তাহলে আমার মা কেন আমাকে ভালোবাসে না?আমার না মার কথা খুব মনে পড়ছে আব্বু?
বলেই ভোর কেঁদে দেয়। অরুণ অসহায় হয়ে পড়ে। চোখের জল মুছে দিয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে চুমুতে ভরিয়ে দেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। তার নিজের চোখও ভরে উঠেছে। ছেলেকে কি জবাব দেবে সে! অনেক কষ্টে ঢোক গিলে বলে,
-” কলিজা বলেছি না আমিই তোমার আব্বু আমিই আম্মু!”
ভোর কান্না থামিয়ে দেয়,
-” আব্বু কাঁদছো তুমি?”
অরুণ নাক টেনে বলে,
-” না তো!”
ভোর বাবার বুক থেকে মাথা তুলে অরুণের দিকে চায়। কপোলের অশ্রু মুছে দিয়ে বাবার গালে বেশ কয়েকটি চুমু দিয়ে বলে,
-” ভোর লাভস ইউ সো মাচ আব্বু কলিজা!”
চলবে…..
#পাতা_বাহার
লেখনীতে: #বেলা_শেখ
#পর্ব- ১২
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
দূর হতে কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাক ভেসে আসছে। বাদুড়ের দল আম গাছের মগডালে ঝুলছে। উড়ে এ গাছ হতে ও গাছের বসে আম খাচ্ছে। কিছু পাখির বাচ্চার চেও চেও শব্দ ধ্বনিত হচ্ছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ঝিঁঝিঁ শব্দে মাথা ভোঁ ভোঁ করার উপক্রম।ঘনঘটা তিমির রাত। জোৎস্নার ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ গম্ভীর উদাসীন হয়ে আছে। অরুণ সরকার এমন সময় কিচেনে দাঁড়িয়ে রান্না করছে। নুডুলস কলিজাটা বেশ পছন্দ করে।তাই সেটাই বানাচ্ছে। ভোর বাবার কোলে উঠে গলা জড়িয়ে চুপটি করে আছে। কিছু বলছে না। অরুণ এটা ওটা বলছে তাতেও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে না। হ্যা না হু কিছুই না। অরুণ হাল ছাড়ে না। বলতেই থাকে। এক হাতে কড়াইয়ে পেঁয়াজ মরিচ কুচি দিয়ে তেল ঢেলে খুন্তি দিয়ে নাড়তে থাকে। অপর হাতে ছেলেকে জড়িয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে ব্যস্ত। পাতা বাহার কিচেনের কেবিনেটে অরুনের ফোনের উপর উঠে মিও মিও করছে। কখনো পেঁয়াজ নিয়ে খেলছে তো আলু নিয়ে ফেলে দিচ্ছে। অরুণ তার দিকে তাকালে পিট পিট করে চেয়ে মিও মিও করে।
-” ওই পাতাবাহার ওগুলো ফেলছো কেনো? কে তুলবে ওসব হুম? তোমাকেই তুলতে হবে! আব্বু দেখ তোমার পাতাবাহার আলু ফেলছে ওকে বকে দাও তো!”
ভোর তাকায় বিড়াল শাবকটির দিকে। সেটি নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ করার প্রেক্ষিতে কিউট করে চেয়ে সুর তুলে মিয়াও ডাকে। অরুণ চোখ বড় বড় করে বলে,
-” দেখেছো আব্বু তোমার সামনে ইনোসেন্ট সাজছে। যেন কিছুই করে নি। তুমি ওর কথা বিশ্বাস করবে না ঠিকাছে? এই পাতাবাহার ও মিস পাতাবাহারের মতো! দুজনেই দুষ্টু! তবে তোমার সামনে ভোলাভালা সেজে থাকে!”
ভোর তবুও কিছু বলে না। অরুণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে কড়াইয়ে সবজি ঢেলে দিলো। ভোরের গালে চুমু দিয়ে বলে,
-” তোমার মা’র সাথে কথা বলবে? ফোন করবো? ভিডিও কল দিই?”
ভোর মাথা তুলে চায় পিট পিট করে।
-” মা কথা বলবে আমার সাথে? ”
অরুণ ভোরের দিকে চায় না। সবজি নেড়েচেড়ে ওতে নুডুলস ঢেলে দিলো।
-” বলবে কি না সেটা বলো? আমি কল করছি দাঁড়াও!”
বলেই কেবিনেটের উপর থেকে বিড়ালটি সরিয়ে ফোন হাতে নেয়। ভোর বাবার দিকে আগ্রহ ভরা চোখে চেয়ে আছে। সত্যিই ফোন করবে বাবা? অরুণ সত্যিই কল করে। বর্ষার নাম্বার আছে এখনো। ব্ল্যাকলিস্টে নয়। সেভ কন্টাক্টেই আছে। ডিভোর্সের পরেও বেশ কয়েকবার কথা হয়েছে।ভোর মা যাবে যাবে বলে জেদ করলে, কাঁদলে কল করতো আগে। সারে তিন বছরের পর আর মা মা করে নি তেমন। তাই কল করাও হয়নি! হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়লো কেন? অরুণ কল করে। প্রথমবার কল করলে রিসিভ হয় না। দ্বিতীয়বারের বেলায় সাথে সাথেই রিসিভ হয়। অরুণ লাউড স্পিকারে দিয়ে ভোরের হাতে দেয়। অপাশ থেকে ভেসে আসে,
-” আই এম সারপ্রাইজড। অরুণ সরকার আমাকে কল করেছে! তাও প্রায় বছর দুই পর। প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। দ্বিতীয় বার এলে বিশ্বাস হলো! তা কেমন আছো? হঠাৎ মনে পড়লো?”
অরুণের হাত থেমে যায়। বুকটা জ্বলে ওঠে। হাহাকার ধেয়ে আসছে যেন! স্নিগ্ধ শোভন ভালোবাসার নারী! যাকে মনে প্রাণে ঊজাড় করে ভালোবেসেছিলো!
ভোর খুশি হয় মা’র কণ্ঠস্বর শুনে। সে অনুভব করে মায়ের আওয়াজ ভোলেনি এখনো।আগের মতোই আছে বোধহয়!
-” মা?”
বর্ষার ঠোঁটের হাসি গায়েব হয়ে যায় মা ডাকটা শুনে। বিছানায় শোয়া সাত মাসের ছেলে ও স্বামীর দিকে চায়। ঘুমিয়ে আছে তারা। সেও ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। তখনই অরুনের কল আসে । তাদের ডিভোর্স হওয়ার পর অরুণ হাতে গোনা কয়েকবার কল করেছিল। সেটাও ভোরের জন্য। অনেক সময় পর আজ দিল। বর্ষা ফোন নিয়ে বেলকনিতে চলে যায়।
-” বরুণ? কেমন আছো সোনা?”
ভোর মাথা উঁচিয়ে বাবার দিকে চায়। অরুণ রান্নায় ব্যস্ত! ছেলেকে নামিয়ে দিলো। একটু স্পেসে কথা বলুক দু’জন। তার সামনে জড়তা না করে। ভোর একটু দূরে যায়। হাসিমুখে বলে,
-” আমি ভালো আছি মা! তুমি কেমন আছো?”
বর্ষা মুচকি হেসে বলে,
-” ভালো আছি সোনা! তোমার আব্বুর ফোন থেকে লুকিয়ে কল করছো কি? আব্বু বকবে না?”
-” না না। আব্বুই কল দিলো। আমি বলেছিলাম! তুমি কি করছো?”
-” এই তো ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম!এখন তো অনেক রাত! তুমি ঘুমাও নি?”
ভোরের মুখ মলিন হয়ে যায়।
-” ঘুম আসছিল না। তোমার কথা মনে পড়ছিলো!”
বর্ষার বুকটা ধ্বক করে ওঠে। তাকে প্রথম মাতৃত্বের স্বাদ যে দিয়েছে এই ছোট বাচ্চাটিই। তবে বরুণের তাকে মনে পড়ছিলো শুনে খানিকটা ভালো লাগে।
-” বরুণ তোমার যখনি মনে পড়বে কল দিও কেমন? আমার ভালো লাগে তোমার সাথে কথা বলতে! আগে কল দিতে মাঝে মাঝেই এখন দাও ই না”
-” মা তুমিও তো দাও না। তোমার আমাকে মনে পড়ে না? আমাকে আর ভালোবাসো না তাই না?”
বর্ষার ভিতরটা কেঁপে ওঠে। এ কেমন অনুনয়ের কণ্ঠস্বর। কতটা মায়াময় শোনা যায়! বর্ষা খানিকটা আমতা আমতা করে বলল,
-” পড়ে তো! আমি কল করলে তোমার আব্বু যদি বিরক্ত হয় তাই করি না! বরুণ সোনা ভিডিও কল দেই? একটু দেখি তোমায়?”
ভোর খুশি হয়। মা’ কে দেখা যাবে ভিডিও কলে ।সে আচ্ছা বলে অরুণের কাছে যায়। অরুণ পাতাবাহারকে কোলে নিয়ে আদর করছে। নুডুলস রান্না শেষ, সে ডিম সিদ্ধ দিয়েছে। সাথে দুধ চড়িয়েছে। গরম এক গ্লাস দুধ খেলে যদি ছেলেটার ঘুম হয়!! ভোর বাবার কাছে এসে হাসিমুখে বলে,
-” মা ভিডিও কল দিবে বললো। আমাকে দেখবে!”
অরুণ শান্ত চোখে ছেলের হাসিমাখা মুখ খানি দেখে। তার ভিতরটা এতো জ্বলছে কেন? ফোনটা হাতে নিয়ে ওয়াই ফাই কানেক্ট করে হোয়াটসঅ্যাপে যায়। সাথে সাথেই কল আসে বর্ষার নাম্বার থেকে। অরুণ রিসিভ করে ছেলের হাতে দিয়ে ফ্রিজ থেকে আইসক্রিমের বক্স বের করে রাখে। ঠান্ডা কমুক, একটু মেল্ট হোক!
ভোর ফোন মুখের সামনে ধরে একটু দূরে দাঁড়ায়! ফোনের স্কিনে মায়ের হাস্যোজ্জ্বল মুখ দেখে তার মুখশ্রীতেও হাসি ফুটে ওঠে। ছোট ভোর ভুলে যায় মা তাদের ছেড়ে চলে গেছে। বর্ষা ভোরকে দেখে নিয়ে ভোরের পিছনে কিচেনে অবস্থানরত তার প্রাক্তন স্বামীকে দেখে আড়চোখে। এত রাতে কিচেনে? নিশ্চয়ই ভোরের জন্য রান্না করছে! অরুণের হাতের রান্না অসাধারণ। তার জন্য কত রেঁধেছে! অরুণ ঘার ফিরিয়ে ফোনের দিকে চায়। বেশি দূরে নয়। স্পষ্টতই দেখতে পায় প্রাক্তন স্ত্রীকে। দুজনের চোখাচোখি হয়। বর্ষা চোখ ফিরিয়ে নিলেও অরুণ নেয় না। কিছু পল সেদিকে তাকিয়ে থাকে ভ্রু কুঁচকে।
ভোর মা কে দেখে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলে,
-” মা তুমি দেখতে খুব সুন্দর!”
বর্ষা অরুণের দিকে আড়চোখে আরেকবার চায়। এখনো চেয়ে আছে। সে খানিকটা অস্বস্তি বোধ করে। তারপর ভোরের দিকে তাকিয়ে বলে,
-” তাই? থ্যাংক ইয়ু! তুমিও অনেক বড় হয়ে গেছো। এত কিউট দেখতে! তুমি কোথায়?
-” কিচেনে! আব্বু নুডুলস রান্না করছে আমার জন্য! ”
বর্ষা অরুনের দিকে চায় আবার।নাহ আর তাকিয়ে নেই।
-” তাই? ইশ তোমার আব্বুর হাতের রান্না কিন্তু সেইরকম! আমার তো এখন লোভ হচ্ছে!”
-” তাই? তাহলে চলে আসো না আমাদের কাছে! আব্বু আমি তুমি একসাথে থাকবো!আসবে?”
বর্ষার মুখশ্রীতে অন্ধকার হানে।সে প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,
-” বরুণ তুমি স্কুলে যাও?”
ভোর উৎসাহের সাথে জবাব দেয়,
-” যাই তো! আমি নার্সারিতে পড়ি মা! রোজ স্কুলে যাই!”
-” ভেরি গুড! মন দিয়ে পড়াশোনা করবে কেমন?”
ভোর মাথা নাড়ে। টুকটাক ভালোই কথা বলে ভোর ও বর্ষা। অরুণ কেবিনেটের উপর বসে আইসক্রিম খাচ্ছে পা দুলিয়ে। পাশে পাতাবাহার মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। অরুণ তার গালে টোকা দিয়ে এক চামচ আইসক্রিম তার সামনে কেবিনেটের উপর রাখে। বিড়াল শাবকটি মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখে। অরুণ চোখ ছোট ছোট করে চায়।
-” ভাব দেখ! খেলে খাও! আমি সাধতে পারবো না! না আদর করে বলবো, মিস পাতাবাহার খেয়ে নাও সোনা! তাই ভং বাদ দাও, ওকে?”
বিড়াল শাবকটি অরুণের দিকে আড় চোখে চেয়ে আইসক্রিম শুকে খাওয়া শুরু করে। অরুণ বেশি করে মুখে আইসক্রিম পুরে ছেলের দিকে চায়। হাসতে হাসতে কথা বলছে মায়ের সাথে! এখনো এতো ভালোবাসা! একটু বুঝতে শুরু করলেও থাকবে তো!
তার ভাবনার মাঝেই ভোর আসে। তার দিকে ফোন বাড়িয়ে দেয় গোমড়া মুখে। অরুণ ভ্রু কুঁচকে ফোন হাতে নেয়। কল এখনও কাট হয় নি। কানে ধরতেই ওপাশ থেকে বর্ষার আওয়াজ আসে।
-” হ্যালো! অরুণ? কেমন আছো?”
অরুণ ছেলের দিকে চায়। ভোর আগ্রহ ভরা চোখে চেয়ে আছে। সে কথা বলতো না এই নারীর সাথে যদিনা সামনে ভোর থাকতো!
-” আলহামদুলিল্লাহ! তুমি?”
বর্ষা খানিকটা হেসে বলে,
-” ভালো! রান্না করছো? ছেলের জন্য! কি রেঁধেছো?”
অরুণের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। এত কিছুর পরেও হাসিমুখে নরমালি কথা কি করে বলতে পারে মানুষ ! তার তো ইচ্ছে করছে ফোনের ওপাশ গিয়ে চুলের মুঠি ধরে ঠাস ঠাস কয়েকটা থাপ্পড় লাগিয়ে দেয়ালে ঠুকে দিতে। স্বার্থপর নারী! তার হাতের মুঠো শক্ত করে আইসক্রিমের বাটি ধরে রাখে। হাতের কপালের শিরা উপশিরা সহ দৃশ্যমান। রাগে নাকের পাটা ফুলে ফুলে উঠছে বারংবার। দাঁতে দাঁত লাগিয়ে বলে,
-” রেঁধেছি কিছু! তুমি বাংলাদেশেই?”
-” হুম! অরুণ? শুনলাম তুমি বিয়ে করনি? করবে না? জানি অরুণ বলাটা অনঅধিকার চর্চা হবে তবুও বলছি, ইউ সুড মুভ অন! বরুণের জন্যে হলেও! নাকি আমাকে এখনো মনে রেখেছো?”
অরুণ ছেলের দিকে চায়।
-” লিসেন! বারো কি তেরো বছর বয়সে আমাকে একটা কুকুর কামড়িয়ে ছিল! একেবারে হাতের মাংসও তুলে নিয়েছিলো! সেই কুকুরটিকেও এখনো মনে রেখেছি আমি। সাথে ব্যথা সহ সাতটা ইনজেকশন। দেখলেও চিনতে ভুল হবে না কুকুরটিকে। যদিও বেঁচে নেই।”
বর্ষার বুঝতে একটুও অসুবিধে হয় না যে কতটা জঘন্য ভাষায় তাকে অপমান করেছে অরুণ সরকার।
-” ইউ ইনসাল্ট মি!”
অরুণ ছেলের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,
-” যাক ঘটে বুদ্ধি আছে তাহলে!”
বলেই খট করে কল কেটে দেয়। অরুণ আইসক্রিমেরবাটি পাশে রেখে কেবিনেট থেকে নেমে ফোন ট্রাউজারের পকেটে পুরে।
-” বলিয়ে দিলাম তো মায়ের সাথে কথা! এখনো গাল ফুলে আছে কেন? হুম?”
ভোর আইসক্রিমের বাটি থেকে আইসক্রিম মুখে পুরে বলে,
-” আরো কথা বলতে ইচ্ছে করছিলো তো!”
-” বলতে! আমি তো মানা করি নি! তোমার মা! তাকে ভালোও বাসো! কথাও বলবে! আমি মানা করার কে?”
ছোট্ট ভোর বাবার অভিযোগ বুঝতে পারে না।
-” মা বললো রাত অনেক হয়েছে। ঘুমিয়ে পড়তে! আবার পরে কথা বলবে!”
অরুণ কিছু বলে না। ডিম সিদ্ধ ছিলে নুডুলসে রাখে। গরম দুধ গ্লাসে ঢেলে সব ট্রেতে নিয়ে রুমের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। ভোর আইসক্রিমের বাটি হাতে নিয়ে মুখে পুরতে পুরতে বাবার পিছু পিছু হাঁটে। বিড়াল শাবকটি দৌড়ে একবার অরুনের পায়ের কাছে যায় তো ভোরের কাছে। রুমে সব রেখে অরুণ জগ হাতে নিয়ে বলে,
-” পানি আনছি! চুপচাপ যেন বসে থাকা হয়!”
ভোর ফ্লোরে রাখা বিড়ালের বাটিতে কিছু আইসক্রিম ঢেলে দিয়ে বিছানায় বসে নুডুলস ফু ফু দিয়ে খাওয়া শুরু করে। অরুণ নিচে যায়। জগে পানি ভরে পকেট থেকে ফোন বের করে কল লাগায়। বেশ সময় নিয়ে রিসিভ হয়। অরুণ কানে ফোন ধরে বলে,
-” হ্যালো! মিস পাতাবাহার?”
-” এই পাতাবাহার টা কে?”
অরুণ ফোন চেক করে! নাম্বার তো ঠিকই আছে! তাহলে কল কে ধরেছে?
-” মিস পাতা কে কল করেছি! হু আর ইউ?”
-” আমি পাতার বোন লতা! আর আপনি কে? এত রাতে পাতার কাছে কল করেছেন? এই আপনি ওর বয়ফ্রেন্ড টয়ফ্রেন্ড নন তো?”
আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করে লতা! মেয়ে রুম্পা ঘুমুচ্ছে না। টেও টেও করছে। তাই লতা জেগে আর এদিকে পাতা হা করে মরার মতো ঘুমিয়ে আছে।
অরুণ বিরক্তিকর শ্বাস ছেড়ে বলে,
-” আমি অরুণ সরকার! ভোরের বাবা! ভোর একটু তার সাথে কথা বলবে! ছেলেটা কাঁদছে ঘুম আসছে না তার!”
লতার চিনতে একটুও দেরি হয় না।সে হেসে বলে,
-” ওই ভাইয়া আপনি! আপনি হোল্ড করুন আমি ওকে ডেকে দিচ্ছি! কুম্ভকর্ণের মতন ঘুম তার ঢাক ঢোল পিটিয়ে ডাকতে হয়!”
-” ওকে”
অরুণ ফোন হোল্ড করে না। বরং স্পিকারে দেয়।
লতা ফোন পাশে রেখে পাতাকে ঠেলে ডাক দেয় বেশ কয়েকবার।পাতা হু হা করে শুধু, ওঠে না। লতা বিরক্ত হয়ে চিমটি কাটে গালে। পাতা ঢুলু ঢুলু চোখে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বলে,
-” আশ্চর্য! ডাকছো কেন? ঘুমুচ্ছি না! ভালো লাগে না বা*ল!”
বলেই বালিশে মুখ গুঁজে দিল। অরুণের পদচারণা থেমে যায়। কি বলল?
লতা পাতার চুল ধরে টানে।
-” কল করেছে! ধর কথা বল?”
পাতা বিরক্ত হয়ে উঠে বসে।
-” জামাই মরছে আমার? যে এভাবে ডাকো? আরে শালার জামাই ই নাই মরবে কেমনে!”
লতা চোখ রাঙিয়ে ধমকে বলে,
-” এক থাপ্পড় দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিবো আজীবনের জন্য! জামাই পাগল কোথাকার! নে ধর কথা বল?”
পাতা ফোন কানে ধরে বলে,
-” আমার আদরের জামাই! বা*ল কল করার আর সময় পাস না?”
অরুণ গলা খাঁকারি দেয়। এই মেয়ে পাবনা ফেরত পাগল!
লতা পাতার গালে আস্তে এক থাপ্পড় মেরে বলে,
-” ঘুমের ঘোরে কি আবোল তাবোল বলছিস! তোর জামাই না! ভোরের বাবা অরুণ সরকার কল দিয়েছে! কথা বল? ”
পাতা ড্যাব ড্যাব করে লতার দিকে চায়। গালে হাত দিয়ে চোখ বড়বড় করে বলে,
-” আমায় মারলে আপু?”
লতার চোখ রাঙানিতে পাতা গাল থেকে হাত সরিয়ে ফোনের দিকে চায়। ঘুমের ঘোর কেটে গেছে।
-” হ্যালো?”
অরুণ এক হাতে জগ ও অপর হাতে ফোন কানে ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলে,
-” ঘোর কেটে গেছে?”
পাতা বোনের দিকে তাকিয়ে বলে,
-” তা আর বলতে! তবে আমি আশ্চর্য হয়ে গেছি!”
অরুণের কপাল কুঁচকে যায়। পাতা বত্রিশ পাটি বের করে বলে,
-” আসলে আপনি মানুষের বাচ্চা হয়ে ব্যাঙের থুরি বিড়ালের বাচ্চাকে কিভাবে কল করলেন?এই এই আপনিও ব্যাঙের থুরি বিড়ালের বাচ্চা নন তো?নাকি চলতি ফিরতি ষাঁড়?”
অরুণ বিরক্ত হয়ে যায়।এখন মজা করার সময়!
-” মিস পাতাবাহার! ফালতু কথা বলার সময় বা মুড একটাও নেই আমার। আমার একটা ফেবার চাই?”
পাতা বোনের দিকে চায়। কান খাঁড়া করে এদিকেই চেয়ে পারলে ফোনের ভিতরে ঢুকে যায়।
-” দেখুন মি. ভোরের আব্বু!”
-” দেখার কোনো ইচ্ছে নেই আমার। আপনার আদরের জামাইকে দেখাবেন!”
পাতার চোখ কপালে! এই ম্যানারলেস লোকটা তো ভারি বজ্জাত! শালা বখাটে কোথাকার।
-” আপনার ফেবারের গুষ্টি কিলাই! ফোন রাখুন!”
বলেই কল কাটতে নিলে অরুণের গাম্ভীর্যে ভরাট কণ্ঠস্বর ভেসে আসে,
-” ভোরের মন খারাপ! ঘুমুচ্ছে না ,বলছে ভালো লাগছে না। মায়ের কথা মনে পড়ছে। তার সাথেও কথা বলিয়েছি! তবুও মুখ গোমড়া করে বসে আছে! ওর সাথে একটু কথা বলবেন ব্যস।”
পাতার নরম মনটা আরো নরম হয়ে আসে। ইশ ছোট ছেলেটা মায়ের জন্য কাঁদছে! লতারও মায়া হয় বেশ! মা থাকতেও মায়ের আদর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত ছেলেটা! সে পাতার দিকে চায়। সে জানে পাতা ছেলেটার মন ভালো করেই ক্ষ্যান্ত হবে। ভালোবাসার কাঙালিনী অপর কাঙালকে সাহারা দিতে অস্তাদ। পাতা হাত বাড়িয়ে জানালাটা খুলে দেয়,
-” দিন ওকে আমি কথা বলছি। ”
-“হুম! ওয়েট আ মিনিট!”
অরুণের গাম্ভীর্যে ঘেরা ভরাট কণ্ঠস্বরে পাতা ভেংচি কেটে বলে,
-” শুনুন ফ্রিতে একটা এডভাইজ দিই! কারো কাছে ফেবার চাইলে একটু নরম হয়ে বলতে হয়। অনুনয় বিনয় করে! সিধে ভাষায় পাম মেরে! রাজা মহারাজার মতো গম্ভীর মুখে হুকুম দিলে ফেবারের ফ-ও মিলবে না! নেহাতই আমি দয়ালু তাই!”
অরুণের অধরকোনে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। মেয়েটাকে দেখলে শান্ত শিষ্ঠ মনে হলে কি হবে, বেশ ছটফটে চঞ্চলতায় ঘেরা! তবে নরম মনের!
-” আমি এভাবেই বলব! আগে আপনার মর্জি!”
-” ওত ভাব ভালো না! হুহ!”
লতা পাতার কান টেনে ধরে চোখ রাঙায়। পাতা ছাড়িয়ে বোনের দিকে কটমট করে চায়। লতা ফোন নিয়ে লাউডে দেয়।
অরুণ রুমে এসে দেখে ভোর গালে হাত দিয়ে বসে আছে। সামনে নুডুলসের বাটি। পাতা বাহার খেয়েদেয়ে চিৎপটাং! অরুণ জগ রেখে বিছানায় বসে ছেলের দিকে ফোন বাড়িয়ে বলে,
-” তোমার মিস পাতাবাহার! কথা বলো?”
ভোর বিশ্বাস করে না।
-“মিস ? উনি তো এখন ঘুমিয়ে হয়তো! আমার সাথে কথা বলবেন কিভাবে?”
অরুণ ফোন বিছানায় রাখে। লাউডে থাকায় ভোর শুনতে পায় তার কথা!
-” ভোর সরকার? তোমার নাকি মন খারাপ? ঘুম আসছে না? ”
ভোর বাবার দিকে চায়! অরুণ নুডুলসের বাটি কোলে নিয়ে কাটা চামচ দিয়ে মুখে তুলতে ব্যস্ত! ভোর মিসকে সালাম দেয়,
-” আসসালামুয়ালাইকুম মিস! কেমন আছেন মিস?”
লতা পাতা দুজনে হেসে দেয়। অরুণও হালকা হেসে ছেলের মুখে নুডুলস দেয়। লতা হাসি থামিয়ে বলে,
-” তোমার মিস ভালো আছেন! এই তুমি নাকি কাঁদছো?”
ভোর বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
-” ইনি কে?”
-‘ এতো জলদি ভুলে গেলে? আমি তোমার মিসের বোন লতা! ইউ ক্যান কল মি আন্টি! ”
-” স্যরি!”
পাতা বিছানায় শুয়ে বলে,
-” ভোর তোমার মায়ের কথা মনে পড়ছে?”
ভোরের মুখটি মলিন হয়ে যায় পুনরায়। ছোট্ট করে জবাব দেয়,
-” হুম!”
লতা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বলে,
-” ভোর তোমাকে কে খাইয়ে দেয়? গোসল করিয়ে দেয়?”
-” আব্বু।”
-” আর স্কুল ড্রেস পড়িয়ে দেয় কে? তোমার সব আবদার পূরণ করে কে?”
-” আব্বু!”
-” তোমাকে বেশি ভালোবাসে কে? বেশি বেশি আদর করে কে? বকাই বা কে দেয়?”
অরুণ ছেলের দিকে তাকিয়ে।ভোর ভেবে বলে,
-” আব্বুইতো!”
লতা হেসে বলে,
-” তো তোমার আব্বু তোমাকে খাইয়ে দেয়,গোসল করায়, স্কুল ড্রেস পড়িয়ে দেয়, হোমওয়ার্ক করিয়ে দেয়, তোমার সব আবদার পূরণ করে, বকে আবার সবচেয়ে বেশি আদর করে,ভালোও বাসে! তাহলে আব্বুকে বেশি মনে পড়ার কথা! মা কে কেন মনে পড়বে হুম? এতে তোমার আব্বুর তো মন খারাপ হবে তাই না? যে ছেলের সব খেয়াল আমি রাখি অথচ মা কে মনে পড়ে তার!”
ভোর বাবার দিকে চায়। অরুণ তার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। সহজ ভাষায় বাচ্চাদের বোঝাতে অস্তাদ লতা! হবে না ওস্তাদ দুই বাচ্চার মা আবার টিচারও।
পাতা বোনকে খোঁচা দিয়ে ধীরে ফিসফিসিয়ে বলে,
-” এই আপু কি বলিস? মায়ের ভালোবাসা আর বাবার ভালোবাসা এক নাকি! আর ওর বাবা ওর সাথেই থাকে সবসময় তাহলে মনে পড়বে কিভাবে?”
লতা বিরক্ত হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলে,
-” জানি সেটা! ওর বাবার ভালোবাসাও তো কম না! জান হারায় হয়তো ছেলের উপর! ওর মায়ের সব দায়িত্ব নিজেই পালন করে! তোকে কেন বলছি! চুপ থাক মায়ের বাচ্চা!”
পাতা বালিশে মাথা দিলো।
ভোর বাবার গলা জড়িয়ে ধরে চুমু দিয়ে বলে,
-” আব্বু তুমি রাগ করেছো?”
অরুণ নুডুলস সরিয়ে রেখে ভোরকে জড়িয়ে বলে,
-” নাহ আব্বু! আব্বুদের রাগ করতে নেই!”
লতা ফোনের ওপাশ থেকে হেসে বলে,
-” ভোর মিথ্যে কথা! তোমার আব্বু অভিমান করেছে তবে স্বীকার করতে নারাজ! তাকে ফটাফট আদর করো দেখো হাসবে!”
ভোর বাবার গালে মুখে নাকে ঠোঁটে চুমু খায়।
-” থ্যাংকস আন্টি! কিন্তু আব্বু তো হাসছে না! তাহলে কি এখনো রেগে?
পাতা ভেংচি কেটে বলে,
-” ভোর তোমার নাক উঁচু আব্বু ওইটুকুতে হাসবে না! কাতুকুতু দাও হাসলেও হাসতে পারে! গ্যারান্টি নেই! ”
ভোর ছোট ছোট আঙ্গুল নাড়িয়ে বাবার পেটে কাতুকুতু দিতে দিতে বলে,
-” মিস কতবার বলবো আব্বুর নাক উঁচু না! ওটা বললে আমার কষ্ট হয়!”
অরুণের কাতুকুতুতে হাসি না এলেও ভোরের এই কথাতে হাসি আসে। ছেলের হাত জোরা সামনে ধরে অধর ছোঁয়ায় বেশ কয়েকবার।
-” আব্বু রেগে নেই কলিজাটা! না অভিমান করছে!”
ভোর খুশি হয়।
-” লাভ ইউ ইনফিনিটি আব্বু কলিজা।
-” এত লাভ কোথায় রাখবো ইয়া আল্লাহ!”
লতা মুচকি হাসে। বাবা ছেলের কথোপকথন শুনে। কি মিষ্টি বন্ধন! তার মনটাই ভরে গেলো! মেয়ের দিকে চাইতেই দেখে তার বুকে ঘুমিয়ে পড়েছে। পাশ ফিরিয়ে পাতার দিকে তাকিয়ে বিরক্তিকর শ্বাস ছাড়ে। ঘুমিয়ে পড়েছেন তিনি। এই মেয়েটা এত জলদি ঘুমোয় কিভাবে?
_________
জুমার দিন। মুসল্লিদের সাপ্তাহিক ঈদের দিন। প্রতি সাপ্তাহের এই দিনে জোহরের নামাজে যে সব ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা একত্রিত হয়ে জামায়াতের সঙ্গে নামাজ পড়ে। নামাজের আগে ইমাম সাহেব খুতবা পাঠ করেন। দিনের পথে চলার আহ্বান জানান। নামাজ শেষে কোলাকুলি করে তবারক ,জিলেপি , মিষ্টি ইত্যাদি বিতরণ করে অনেক ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। লাবিব ,লুবমান ও আতিকুর ইসলাম মসজিদ থেকে ফিরেন। হাতে তবারকের প্যাকেট। তবারক বলতে মাংসের খিচুড়ি। আবার আতপ চাউলের নাস্তাও দেয় সাথে। লাবিব প্যাকেট উঁচিয়ে বলে,
-” মামু? নানু? তোমাদের এখানে নামাজ পড়লে তো অনেক লাভ হবে! ইশ আমাদের ওখানে তো কিছুই দেয় না। মাঝে মাঝে জিলেপি দেয় একটা দুটা! এখন থেকে প্রতি শুক্রবারে এখানে এসে নামাজ পড়বো!”
লুবমান হেসে ভাগ্নের পিঠ চাপড়ায়। আতিকুর ইসলাম বলে,
-“তুমি এসবের আশায় নামাজ পড়বে? লাভের জন্য? শোন লাবিব! তুমি যদি মন থেকে নামাজ পড় পাঁচ ওয়াক্ত বেঁধেই তাহলে আল্লাহ খুশি হবে! ”
লাবিব হেসে বলে,
-” আল্লাহ খুশি হয়ে তখন বিরিয়ানীর প্যাকেট দিবে?”
আতিকুর ইসলাম মুচকি হেসে মাথা নাড়ে। লুবমান তার মাথায় চাটি মেরে বলে,
-” লোভী কোথাকার! এই তোর বাপ খাওয়ায় না তোকে বিরিয়ানি? এতো টাকা কামিয়ে কি করে শুনি?”
লাবিব মুখ ফুলিয়ে বলে,
-” সব তোমার বড় বোনের কাছে দেয়!সে ব্যাংকে জমা করে!”
লুবমানের ফেস চুপসে যায়। বিয়ে করলে এই এক জ্বালা সব কিছুর কৈফিয়ত হোম মিনিস্টারকে দিতে হয়! তার একটা আছে আলালের ঘরে দুলালি। কথা বার্তা চলতেই থাকে। মামা ভাগ্নে একটা মধুর সম্পর্ক। চাচা ভাতিজার সম্পর্ক আজকাল ফর্মালিটিজ হলেও মামা ভাগ্নে সম্পর্ক এখনো দেখা যায়। মামা ভাগ্নের খুনশুটির মাঝে তারা বাড়িতে ফেরে। লতা ও লাবনী আক্তার রান্না করছে। পাতা ড্রয়িং রুমে বসে টিভি দেখছে। বাড়িতে বড় বোন থাকলে ছোট বোন যে অকর্মার ঢেকি হয় তার জলজ্যান্ত প্রমাণ পাতা। মা বাবার দায়িত্ব হলেও বড় বোন ভাইয়ের ভালোবাসা ষোলো আনাই পেয়েছে সে। লতা ঘরের সব কাজেই হাত বাটাতো। পাতাকে ধারের কাছেও আসতে দিতো না। বলতো ‘ আগে আমি বিদায় নি তারপর তুই করবি! তার আগে না!’ পাতা খুশি মনে মাথা দোলাতো। আহা বাড়ির কাজ করতে কোন মেয়ের ভালো লাগে? পাতা টিভির দিকে হা করে চেয়ে আছে। লুবমান এসে তার মুখের ভিতর রিমোট দিতে নিলে পাতা সরে যায়। ভাইকে চোখ দিয়েই শাষায়। লাবিব হাসতে হাসতে বলে,
-” মায়ের বোন মুখে মাছি ঢুকবে তো! এই দেখো এটা কি? আমাকে দিয়েছে। তুমি গেলে তোমাকেও দিতো! হুম!”
বলেই প্যাকেট ছিড়ে মুখে পুরে। পাতা হাসে। লুবমান তার হাতের প্যাকেট পাতার দিকে বাড়িয়ে দিবে তার আগেই আতিকুর ইসলাম নিজের টা পাতার হাতে দিয়ে বলে,
-” নামাজ পড়ে নাও! আর এটা দুই বোন মিলে খেও!”
পাতা খিচুড়ি হাতে নিয়ে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কিছুদিন হলো বাবার বিহেভিয়ার পরিবর্তন হয়েছে। আগের মতো না দেখা করে চলে যায়না। কিছুটা হলেও কেয়ার করে। কথা বলে! হঠাৎ এমন পরিবর্তন? সেদিনের কথার জন্য? নাকি বিয়ে দিয়ে বিদায় করবে! সেজন্যই একটু ভালোবাসা! যেটাই হোক পাতা এটাকেই অনেক মনে করে। যেটাই মনে করে কেয়ার করুক পাতার জন্য কেয়ার করাটাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
পাতা প্যাকেটটা হাতে নিয়ে কিচেনে যায়। প্যাকেট ছিরে ছোট বাটিতে নিয়ে লতার সামনে রেখে বলে,
-” আব্বু এনেছে আমার জন্য। আমি একটু উদার তো তাই তোমাকেও দিচ্ছি! ধরো? বেশি নেবে না কিন্তু?”
লতা হেসে অল্প তুলে মুখে দেয়। পাতা মাকেও নিতে বলে। লাবনী আক্তার অল্প নিয়ে রুমের দিকে চলে গেল। লতা পাতার দিকে তাকিয়ে বলে,
-” নামাজ পড়বি না শয়তান? যা নামাজ পড়!”
পাতা খিচুড়ি মুখে দিয়ে বলে,
-” পড়ছিতো!”
-” পড়ছিতো পড়ছিতো বলে পড়ে পড়িস? শয়তান মেয়ে! নামাজের সময় শত বাহানা তাই না? এক ওয়াক্ত পড়িস তো বাকি ওয়াক্ত না!”
পাতা মুখ ছোট বানিয়ে বলে,
-” আলসি লাগে! আর শয়তান ঘারে চেপে বসে। ফজরের সময় এমন ঘুম ধরে! উঠতেই পারি না। ফজরের নামাজ না পড়লে বাকি গুলোতেও আলসেমি আসে!”
লতা শক্ত করে বলে,
-” ঝাটার পিটুনি দিলে ঠিকই হবে। দুনিয়ার জীবন ক্ষনিকালয়! আখিরাত অনন্তকাল। হাসরের ময়দানে কি জবাব দিবি? হুম? নামাজ নিয়ে কোনো অজুহাত চলবে না। যাহ?”
পাতা নিজের রুমে যায়। আপু ঠিকই বলেছে তো! দুনিয়া একটি পরিক্ষা ক্ষেত্র মাত্র! যার ফলাফল হাশরে দেয়া হবে। আর ফলাফল প্রকাশের পর পুরষ্কার নাকি তিরষ্কার সেটা আমলনামার উপর নির্ভরশীল! আর নামাজ বেহেশতের চাবিকাঠি স্বরূপ!
অপরাহ্নের খাওয়া দাওয়া শেষ করে লতা পাতা লুবমান বসে আলাপ আলোচনা করছে শপিং করতে যাবে। লাবিব রুম্পা ভাত ঘুম দিয়েছে। সেই সুযোগে তিন ভাইবোন শপিং করবে ও ঘুরবে। বাচ্চাদের নিয়ে কোথাও যাওয়ার মানে আস্ত প্যারা কাঁধে ডিঙিয়ে বেড়ানো! লুবমান হাই তুলে বোনকে বলে,
-” লতাপু শপিং করবি তুই আমরা গিয়ে কি করবো? তোর শপিং ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ঘুরবো? যাইতাম না বইন! তবে শর্ত মানলে যেতেও পারি!”
লতা চোখ ছোট ছোট করে বলে,
-” আচ্ছা যা তোদেরকে একটা টিশার্ট আর ফ্রক কিনে দেবনি!”
পাতা উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
-” আপু তুমি কত কিপটে? সব দুলাভাইয়ের সঙ্গদোষে। শুধু এইটুকুতে আমরা মানছি না! আমাদের আরো দাবি আছে!”
লতা সন্দেহ নজরে ভাই বোনের দিকে চায়। লাবিব বত্রিশ পাটি দেখিয়ে বলে,
-” বেশি কিছু না। শপিং শেষে খাওয়া-দাওয়া করাতে হব..”
-” সেটা তোরা না বললেও হবে! চল রেডি হয়ে নি!”
লাবিব লতার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,
-” পুরোটা তো শোন? খাওয়া দাওয়া আনলিমিটেড চলবে। মানে আমরা যা খুশি অর্ডার করতে পারি এবং যত খুশি! ডিল ফাইনাল!”
চলবে……