#পাতা_বাহার
লেখনীতে: #বেলা_শেখ
#পর্ব- ৫৬
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
সূর্য মহাশয় পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ঘড়িতে বেলা তিনটা। অরুণ ছেলেকে নিয়ে বাড়ির পথে। বাড়িতে অতিথি আসছে তাই টুকটাক দই মিষ্টি কিনতে একটু দেড়িই হলো! ভোর প্রশ্ন করে করে অরুণের কানের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে। তাঁরা কি নানুর বাড়িতে যাবে? নাকি না? অরুণ জবাবে না বলেছে। ভোর বিশ্বাস করে না। আম্মু তো বলেছে যাবে! তাহলে কারটা বিশ্বাস করবে?
বাবা ছেলে লিফট করে তাদের ফ্লোরে নেমে ডান দিকে অগ্রসর হয়। পেছনে রঞ্জু যার হাতে দই মিষ্টি সাথে টুকটাক আরো কিছু সরঞ্জাম। অরুণ কলিং বেল বাজিয়ে অপেক্ষা করে কেউ খোলে না। অরুণের কপালে ভাঁজ পড়ে। সে তো এক্সট্রা চাবিও রাখে নি আজ। আর বাড়ি ভর্তি মানুষ অথচ কেউ শুনছে না? অরুণ একনাগাড়ে বাজাতে থাকে কলিং বেল। তবুও রেসপন্স না পেলে অরুণ ফোন বের করে কল করার জন্য। পাতার নম্বর বন্ধ বলে। অরুণের কপাল বেয়ে শ্বেদজল গড়িয়ে পড়ে। কোনো বিপদ হয় নি তো? তাঁর বাহুজোড়ায় ব্যাথা হয় ক্ষীণ। অরুণ লম্বা শ্বাস টানে। হঠাৎ নব ঘুরিয়ে কেউ দরজা খুলে দিলো। অরুণ স্বস্তির শ্বাস ছাড়লো। আরেকটু হলেই বোধহয় তাঁর শ্বাস আটকে যেতো!
লতা দরজা খুলে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
-” সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি! কখন আপনারা আসবেন আর আমরা চলে যাবো! পাতা তো রেডি; অধৈর্য হয়ে বসে আছে!”
-” সত্যিই? তার মানে আমরা যাবো! ইয়ে ইয়ে!”
ভোর আনন্দের সাথে দৌড়ে ভেতরে চলে যায়। লতা অরুণের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে ভেতরে চলে গেল! অরুণ বিরক্ত হয়। রঞ্জুকে সব কিচেনে রাখতে বলে সে হনহনিয়ে গিয়ে ড্রয়িংরুমে বসা পাতাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
-” এই পাতাবাহার? ফোন বন্ধ কেন তোমার?”
পাতা চোখ রাঙিয়ে চায়। এই লোক কখনো সুধরানোর নয়। পাতা এখানে একা নয়! আতিকুর ইসলাম, লুবমান, রাতুল ভুঁইয়া সহ বাকিরাও আছে। তাদের উদ্দেশ্যে সালাম কালাম নেই এসে তাঁর উপর গলা ফাড়ছে? অরুণ বুঝতে পারলো বোধহয়। সকলের উদ্দেশ্যে সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করে। টুকটাক কথা বলে পাতাকে আবার একই প্রশ্ন করে। পাতা স্বাভাবিকভাবেই বলল,
-” নষ্ট হয়ে গেছে!”
অরুণ কিছু বলে না আর! রাতুলের সাথে কথা বলতে থাকে। ভোর লাবিবকে তাদের নতুন ছোট বাড়ি ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে। তাঁর ক্রিকেট সরঞ্জাম, খেলনা গাড়ি, ভিডিও গেম ইত্যাদি।
সকলের খাওয়া দাওয়া শেষে ড্রয়িংরুমে বৈঠক বসে। রাতুল পাতাকে নিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ উঠলে অরুণ সাফ সাফ মানা করে দেয়। লতা নাক মুখ কুঁচকে নেয় এরকম ঘারত্যাড়া লোকও হয়! শুধু নিজেরটাই বোঝে! আতিকুর ইসলাম শান্ত ভাবে বলে,
-” দেখো অরুণ তুমি এখন আলাদা থাকো। বাড়িতে তোমরা তিনজন! তুমি তো অফিসেই থাকো। ভোর ছোট ! এই অবস্থায় পাতার একা বাড়িতে থাকা ঠিক হবে?”
-” আমি অফিস থেকে লিভ নিবো কিছু দিন। টুকটাক বাড়িতে বসেই কাজ করবো!”
-” তবুও আলাদা একটা সাপোর্টের প্রয়োজন! এই সময় মায়ের সঙ্গটা গুরুত্বপূর্ণ!”
-” তাহলে আম্মাকে রেখে যান!”
স্পষ্ট উত্তর অরুণের। লতাও কম না। সেও সাথে সাথে জবাব দেয়,
-” আম্মু নিজের সংসার লাটে উঠিয়ে আপনার সংসার সামলাবে নাকি! আশ্চর্য!”
পাতা বোনকে থামিয়ে দেয়। অরুণের কাছে এগিয়ে যায়। লোকটা আসলেই ম্যানারলেস। যেতে দিবি না ঠিকাছে তাই বলে এভাবে মুখের উপর মানা করে দিবি? ভদ্রভাবে বলা যায় না?ম্যানারলেস অভদ্র লোক! পাতা অরুণকে উদ্দেশ্য করে বলে,
-” আমরা আলাদা কথা বলি?”
অরুণ ছোট ছোট করে চায় তার দিকে। এই মেয়েটা তাঁর থেকে দূরে যাওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে! সে উঠে পাতাকে নিয়ে রুমে চলে যায়।
______
-” আমি চিরদিনের জন্য যাচ্ছি না সেখানে! বাচ্চামো কেন করছেন? আমার মনটা ভালো নেই। একটু স্পেস দরকার আমার!”
অরুণের শান্ত নজর পাতাতে নিবদ্ধ! মেয়েটার চোখ মুখ মলিন। অরুণের ভালো লাগে না এই মলিনতা। তাঁর পাতাবাহার হাসবে, কিশোরীদের মতো চঞ্চল হরিনীর রূপ ঘুরেফিরে বেড়াবে। অরুণ হার মানে। পাতার বাড়ন্ত পেটে হাত বুলিয়ে কপালে চুমু দিয়ে বলল,
-” আচ্ছা তুমি যেমনটা চাইবে। তবে সাবধানে থাকবে পাতাবাহার! নিজের আর আমার বাচ্চা দুটোর খেয়াল রাখবে।”
পাতা খানিক হাসার চেষ্টা করে বেরিয়ে যায়। অরুণ বিষন্ন চোখে চেয়ে থাকে! একটু পরেই বেরিয়ে যায় সবাই। ভোর তো সবার আগে আগে লাবিবের সাথে গাড়িতে উঠে বসে আছে। অরুণ পাতার কাঁধ জড়িয়ে গাড়িতে উঠিয়ে দেয়। পরপর সবাই গাড়িতে উঠলে অরুণ রঞ্জুকে সাবধান বানী শুনিয়ে গাড়ি ছাড়তে বলে। গাড়িটি শা শা করে চলে যায়। পাতা গ্লাস নামিয়ে লনে দাঁড়িয়ে থাকা অরুণের দিকে তাকায়। অরুণের মলিন মুখটা দেখে পাতার হৃদয় কোনে জ্বলুনি অনুভূত হয়। আচ্ছা নাক উঁচু ম্যানারলেস লোকটা কি তাকে মনে করবে প্রতিক্ষণ? তার বিরহে হৃদয় ব্যাকুল হবে? প্রতিবার ‘পাতাবাহার’ ডাকার পর কি মনে হবে পাতা নেই তাঁর কাছে!! তাঁর কি মনটা আনচান করবে পাতাবাহারের জন্য? পাতাবাহার ডাকার পর শুধু ওই ছা’পোষার আগমনে লোকটার বুকটা কি খাঁ খাঁ করবে না? তাঁর জন্য চোখের কার্নিশে নোনাজল জমবে না?
গাড়িটা যতক্ষণ দেখা যায় অরুণ দাঁড়িয়ে থাকে। তাঁরপর উদ্দেশ্য হীন হাঁটা দেয়। বাড়ি যায় না। ঘরের রাণী ঘরে নেই ঘরে গিয়ে কি করবে? ও ঘরে কেবলমাত্র শুন্যতা ও একাকিত্ব। একাকিত্ব বড্ড অপছন্দ অরুণের। একা ঘুরে ফিরে অরুণ বাড়ি ফেরে রাত দশটায়! দরজা খুলতে এক অবুঝ প্রাণী দৌড়ে এসে মিও মিও করে ডাকে। অরুণের মন খারাপির মাঝেও একটু হাসি পায়। একা তো নয় সে! আছে তো আরেক পাতাবাহার। সে বিড়ালটিকে তুলে নিয়ে রুমে চলে যায়!
-” পাতাবাহার সখি বিনা কেমন কাটছে প্রহর?”
______
নিজ ঘরে বসে আছে পাতা। শুধু বসে নেই নিজ পুরনো কিছু স্মৃতি হাতরিয়ে দেখছে। তাঁর ড্রয়িং খাতায় আঁকানো বিভিন্ন ড্রয়িং! পাতা সব উল্টে পাল্টে দেখে। হঠাৎ একটা স্কেটচ সামনে আসে। পাতা জিভ কামড়ে তড়িঘড়ি পাতা উল্টিয়ে নেয়। স্কেটচ টা শুভ স্যারের। অনেক আগে আঁকিয়ে ছিলো। খুব ভালো না হলেও খারাপও হয় নি। এটা অরুণ সরকার দেখলে পাতাকে কাঁচা চিবিয়ে খেতো ঢেঁকুর অবধি তুলতো না। লোকটা ভোরের চেয়েও কয়েকগুণ হিংসুটে। তবে খুব একটা প্রকাশ করে না। পাতা স্মৃতির পাতা উল্টে পাল্টে দেখতে দেখতে আরো দুটো ছবি বের করে। বাবা ছেলের ছবি! ফরমাল ড্রেস আপে বাবার হাত ধরে একটা স্কুল ড্রেস পরিহিত মিষ্টি ছেলে। পাশে পাতা আরেকটা অবয়ব আকাতে চেয়েছিলো। কিন্তু নিজ অবয়ব আকাতে তাঁর বেশ লজ্জা লাগায় আঁকায় নি। পাতা মুচকি হেসে পাতা উল্টাতে নিবে কিন্তু ঘরে আরো দুটো মানবের আগমন ঘটে। ভোর ও লাবিব! লাবিবের হাতে ফোন। সে পাতার বিছানায় বসে ফানি রিলস দেখা শুরু করে। ভোরও আলগোছে উঠে তাঁর পাশে বসে উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখতে থাকে। একটু পরে আরেকজনের আগমন ঘটে। লতা মেয়েকে কোলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বলে,
-” আমি ,আমার মেয়ে আর তাঁর খালামুনি থাকবো এখানে। ভোর, লাবিব যাও মামুর ঘরে। ঘুমিয়ে পড়ো জলদি। আর ফোন দাও আমার কাছে?”
লাবিব তাঁর মা’কে ভয় পায়। মা’র মেজাজের ঠিক ঠিকানা নেই। বোঝে কম চিল্লায় বেশি। তাই সে কথা না বাড়িয়ে ফোন দিয়ে চলে যায়। ভোরকেও আসতে বলে। ভোর যায় না। পাতার দিকে তাকায় অসহায় চোখে। সে অন্য ঘরে থাকবে? তাঁর করুণ চোখের ভাষা পাতার বুঝতে বেগ পোহাতে হয় না। সে কিছু বলবে তাঁর আগে লতা বলে,
-” কি হলো ভোর? যাও?”
ভোরের মুখখানি ছোট হয়ে যায়। সে বিছানা থেকে নেমে মাথা নিচু করে চলে যেতে নেয়, পাতা পিছু ডাকে। ভোর উজ্জ্বল মুখে পাতার কাছে এগিয়ে আসে। আম্মু নিশ্চয়ই তাকে যেতে দিবে না! পাতা লতাকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বলে,
-” ও আমার কাছেই থাকবে!”
-” এতো ছোট বেডে জায়গা হবে?”
-” না হলে মেয়েকে নিয়ে চলে যাও আপু। এটা আমার রুম!”
লতা বিস্ময় নিয়ে চায় পাতার দিকে। মানছে তাঁর উপর রেগে আছে পাতা তাই বলে এভাবে বলবে? সে হম্বিতম্বি করে রুম্পাকে তুলে নিয়ে চলে যাবে তখনই ভোর তাঁর ওড়নার একাংশ টেনে বলল,
-” আন্টি তুমিই থাকো আমি লাব্বু ভাইয়ের কাছে যাচ্ছি।”
লতা থেমে যায়। ভোর পাতার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে চলে যায়। রুম থেকে বেরোতেই তাঁর হাসি ফুরিয়ে যায়!
লতা পুনরায় মেয়েকে শুইয়ে দিয়ে দরজা লাগাতে যাবে পাতা দরজা বন্ধ করতে বারণ করে। লতা গিয়ে মেয়ের একপাশে শুয়ে পড়ল। পাতা শোয় না। লতা বোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-” এই পাতা এখনো রেগে আছিস আমার উপর? আমি কি তোর খারাপ চাই বল? তখন রাগের মাথায় বলেছিলাম আর পাঠাবো না। তুই সত্যি ভেবে বসে আছিস! আমার ঘারে কটা মাথা জামাই পাগল তোকে জামাইয়ের থেকে আলাদা করবো! আর এমনিতেও অরুণ সরকারের তোপের মুখেও পড়ার শখ নেই। কিছুটা হলেও চিনি তাকে। তবে হ্যাঁ অহংকারী লোকটাকে একটু নাকানিচোবানি খাওয়াবো!”
পাতা বোনের দিকে চায়! শান্ত সুরে বলে,
-” আপু তোমাকে বলেছি না আমাদের ব্যাপারে নাক না গলাতে? আমাদের টা আমরা বুঝে নেবো! তোমাকে কিছু করতে হবেনা। আসলে তোমাকে বলাটা সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছে আমার। সে যেমনি হোক আমার তো। আমি আমার মতো গুছিয়ে নিবো।”
পাতা মুখ মুচরে ব্যাঙ্গ স্বরে বলে,
-” আসছে মিসেস অরুণ সরকার। তুই পারিস না ব্যাটার কোলে উঠে বসে থাকতে! আচ্ছা গলাবো না নাক। তবে হ্যাঁ তোর ওই ইগোয়েস্টিক লোক আমার সাথে লাগতে এলে দেখিস তাঁর ইগোর রফাদফা না করলে আমি লতা নাম পাল্টে কচুর লতি রাখবো! আর গুছিয়ে নিবি লোকটাকে? আগে নিজেকে তো গুছিয়ে নে!”
পাতা ভ্রু কুঁচকে চায়। লতা রাগে গজগজ করতে করতে চোখ বুজে নেয়। পাতা মুচকি হেসে বলল,
-” আপু রেগে যেও না। তবে দুলাভাই সত্যি বলে তুমি বুঝো কম চিল্লাও বেশি।”
লতা বড় বড় করে চায়। গলা উঁচিয়ে বলে,
-” কি বললি তুই? এই সাহস থাকলে আবার বল!”
-” আমি বলি নি দুলাভাই বলেছে!”
পাতা ঠোঁট চেপে হেসে বলে। লতা রাতুলের গুষ্টির তুষ্টি করে। পাতার বেচারা দুলাভাইয়ের জন্য দুঃখ অনুভব হয়। কাল সকালে তাঁর খবর আছে। তন্মধ্যে দরজা খোলর শব্দ হয়। লতা পাতা দু’জনেই তাকায়। ভোর লতার দিকে আড়চোখে চেয়ে বলে,
-” ও ঘরে একটাই বেড। চারজন মানুষ! বালিশ তিনটে আছে। আমাকে বলল বালিশ নিয়ে যেতে!”
পাতা মুচকি হেসে বলল,
-” বালিশ দেবো না। তুমি দরজা বন্ধ করে আমার কাছে এসো!”
-” না না বালিশ দাও আম্মু!”
-” ওই অরুণ সরকারের মিনি ভার্সন? নাটক কম করো! এসে শুয়ে পড়ো জলদি করে!”
লতা বলে ভোরের উদ্দেশ্যে। পাতা নিশ্চয়ই জানতো ভোর আসবে তাই তো দরজা বন্ধ করে নি। লতা ভাবে তাঁর বোনটা খুবই সহজ সরল। এতো ভালো হতে হবে কেন? ভোর পাতার দিকে তাকালো। পাতা কাছে ডাকে ভোরকে।লতার উদ্দেশ্যে বলে,
-” আমার ছেলেকে নিয়ে কোনো মজা না আপু! নইলে তোমার মেয়েকে বউমা বানিয়ে প্রতিশোধ নিবো ভবিষ্যতে।”
ভোর লজ্জা পেয়ে দরজা বন্ধ করে বিছানায় ওঠে। লতা হামি তুলে বলে,
-” মেয়েকে ঘরে খুঁটি বানিয়ে রাখবো তবুও তোর এই অতি ভদ্র ছেলের সাথে বিয়ে দেবো না। যে মেয়ের কপালে আছে তাঁর রফদফা করে ছাড়বে।”
পাতা ভোরকে মাঝে রেখে কিনারে শুতে বললে ভোর নাকচ করে বলে,
-” তুমি মাঝখানে শোবে আম্মু। রাতে ঘুমের মধ্যে পড়ে গেলে অনেক ব্যাথা পাবে!”
লতা খানিকটা অবাক হয়। এ নাকি ছোট বাচ্চা!! এতো পাতারও বাপ! পাতা মানা করলেও জেদি ভোর শোনে না। সে কিনারায় শুয়ে পড়ল। অগত্যা পাতা মাঝখানে শুয়ে ভোরকে নিজের দিকে টেনে নেয়। আদর করে বলে,
-” বাবার কথা মনে পড়ছে না ভোরের?”
লতা মনে মনে ভেংচি কাটলো। বাচ্চার মনে পড়ছে নাকি বাচ্চার মায়ের সে ঢের বুঝতে পারে। ভোর গোমড়া মুখে বলে,
-” ভোর মিস করছে তাঁর বাবাকে। অনেকটা!”
-” কথা বলবে? ফোন দিবো?”
ভোর জবাব না দিয়ে মিষ্টি হাসি উপহার দেয়। পাতা লতার থেকে ফোনটা নিয়ে কল লাগায় অরুণ সরকারকে।
______
স্নিগ্ধ কুয়াশায় ঢাকা ভোর বেলা। ঝোপ ঝাড়ে পাখির কিচিরমিচির শব্দে কানে বাজছে বেশ। বিহঙ্গের দল ডাকছে নাকি ঝগড়া করছে ঠাহর করা মুশকিল। কুয়াশার চাদরে মোড়ানো আশপাশের পরিবেশ দেখা গেলেও দূরের পরিবেশ ঠাহর করা যাচ্ছে না। এই কুয়াশায় ঢাকা ঠান্ডা পরিবেশে দুটো বাচ্চা পুরো প্যাকেট হয়ে ফুটবল খেলছে। একটার বছর দুয়েক হবে অপরটা সদ্য হাঁটা শিখেছে। আনাড়ি পায়ে কয়েকদম গিয়ে বসে পড়ে। তবুও ফুটবল দেখে তাঁর অদম্য কৌতূহল! এই বাচ্চা দুটোর বডিগার্ড আরেক পাঁচ বছরের বাচ্চা। সেও শীতের পোশাকে নিজেকে মুড়িয়ে বাগান থেকে ফুল তুলছে আর কানে গুজছে। ছোট বিচ্ছু দুটোর কানেও লাগিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ বাড়ির ভেতর থেকে আওয়াজ আসে,
-” আনি? এই কুয়াশায় বাইরে কেন বের হয়েছো ওদের নিয়ে? এখনি ভেতরে আসো?”
‘আচ্ছা দাদি!’ বলে আনিকা রুপ ও নয়নকে ডাকে। রূপ তাঁর ছোট ছোট ধারালো দাঁত দেখিয়ে হেসে বলে ‘যাবু না’ বলেই দৌড় লাগালো। নয়ন হেসে তার পিছু পিছু। আনিকা ‘বাঁদরের দল’ বলে তাদের পিছু নেয়। আনিকা নয়নকে ধরে ফেলে কিন্তু রূপকে ধরতে পারে না। গেইটের দিকে সে দৌড়ে যায়। আনিকা ফোঁস ফোঁস করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ তার রাগি মুখ কনভার্ট হয়ে বিস্ময়ে হা হয়ে যায়! সে নয়নকে ফেলে দৌড়ে যায় ‘বড় চাচ্চু’ বলে। রূপক সরকারও চিনতে পারে তাঁর চাচ্চুকে। সে আগে ‘চাচু’ বলে অরুণের পা জাপ্টে ধরে। অরুণ কোলে তুলে নিয়ে আদর করে। আনিকা এলে তাঁকেও টেনে তোলে । আনিকা অরুণের গালে টপাটপ কয়েকদফা আদরের কার্যক্রম করে উচ্ছসিত গলায় বলে,
-” চাচ্চু তুমি আনি’কে ভুলে গেছো! আই মিসড ইয়ু!”
রূপও আনিকাকে অনুকরণ করে অরুণের গালে চুমু দিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে বলে ‘আই মিচ উ চাচু’! অরুণ মুচকি হেসে দুটোকে নিয়ে পা বাড়ায়।
-” আই অলসো মিসড আনিবুড়ি, রূপ সোনা! কেমন আছো তোমরা?
-” ভালো আছি। চাচিমনির বাবু এসেছে?”
-” আসলে তো জানাতাম আনিবুড়ি! বাবুর আসতে আরেকটু সময় লাগবে।”
অরুণ দু’জন কে নিয়ে নয়নের সামনে দাঁড়ায়। নয়ন অরুণকে চেনে না। সে হাঁ করে চেয়ে আছে। মুখ দিয়ে লালা পড়ছে। অরুণ আনিকে পিঠে চড়তে বলে নয়নকে কোলে তুলে নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে যায়।
আরিয়ান ড্রয়িং রুমে বসে চা খাচ্ছিলো আর পেপার পড়ছিলো। হঠাৎ ভাইকে দেখে বেশ অবাক হয়। তবে প্রকাশ না করে স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
-” সকাল সকাল সরকার বাড়ি এসে বাঁদর গলায় ঝুলিয়ে ঘুরছিস ভাই?”
অরুণ মুচকি হেসে সবকটাকে নামিয়ে দেয়। নয়ন ছাড়া পাওয়ার সাথে সাথেই আনাড়ি পায়ে কিচেনের দিকে ছোটে। রূপ আনি যায় না। তাঁরা চাচ্চুর হাত ধরে টানাটানি করে। অরুণ দুটোকে সোফায় বসিয়ে নিজেও বসে। আরিয়ানকে বলে,
-” কেমন আছিস? ছোটমা কোথায়? রুবি অফিসের জন্য বেরিয়েছে?”
-” ভালোই আছি। মা কিচেনে চা আনতে গেলো। রুবি একটু আগেই বেরিয়েছে!”
আরিয়ানের কথার মাঝেই আসমা বেগম চা নিয়ে আসলো। অরুণ মুচকি হেসে বলল,
-” কেমন আছো ছোট মা?”
-” ভালো থাকার জন্যই তো চলে গেলে ভালো না থেকে উপায়? চা নাও! নাকি কফি আনবো?”
অরুণ চা’য়ের কাপ হাতে নেয়।আসমা বেগমের খোঁচা দিয়ে কথা বলাও গায়ে লাগায় না সে। আসমা বেগম অরুণের সম্মুখে সোফায় বসে বলে,
-” ভোরকে সাথে আনতে পারতে! কেমন আছে ওরা? পাতার কি অবস্থা?”
-” ভালো ছোট মা! প্রেসার টা আপ ডাউন করে! আর মেয়েটা ভয় পায় অনেক। তাছাড়া সব ঠিকঠাক!”
-” প্রথম তো তাই ভয় পাবে, স্বাভাবিক!”
চা’য়ে চুমুক দিয়ে বলে আসমা বেগম। অরুণ আরো টুকটাক কথাবার্তা বলে তাদের সাথে। একা একা ফ্ল্যাটে ভালো লাগছিলো না তাঁর।তাই এখানে ছুটে আশা। বুকে অসহনীয় যন্ত্রণা হচ্ছিল! গত রাত থেকেই তাঁর হাঁসফাঁস লাগছিলো। রাত যেন কাটছিলোই না। মনে হয়েছে সময় থমকে গেছে। রাতে ভোরের সাথে কথা হয়েছিলো মিনিট দশেক! ভোরকে পাতার কাছে দিতে বলেছিলো। পাতা কথা বলে নি। ভোরকে ফিসফিসিয়ে বলেছিলো বলো আম্মু ঘুমিয়ে পড়েছে! তাঁর ফিসফিসিয়ে বলা কথা শুনেছিলো সে। একবার মেয়েটাকে হাতের কাছে পাক চড়িয়ে গাল লাল করে দিবে। বেয়াদব! তার সাথে ছলচাতুরি।আজ বিকেলেই যাবে সে! দেখে নেবে!
অরুণ আনিকাকে কোলে বসিয়ে দেয়। মেয়েটা পাগল করে রেখেছে। ভোর কি করছে? কেন আনো নি তাকে? ভোরের কি আনি’র কথা মনে পড়ে না? তুমি কি সত্যিই ভোরের জন্য লাল টুকটুকে বউ এনেছো? তাই ভোর আনি’কে ভুলে গেছে? আরো অনেক প্রশ্ন শুধু ভোরকে ঘিরে। অরুণ তাকে আশ্বস্ত করে বলে,
-” ভোরও তোমার কথা বলে সবসময়! বিয়ে করাই নি এখনো। ওরকম দুষ্টু ছেলেকে কে বিয়ে করবে শুনি?”
আনি অরুণের কানে মুখ নিয়ে ধীমান সুরে বলে,
-” বড় চাচ্চু? আমি করবো! আনি হবে ভোরের লাল টুকটুকে বউ!”
অরুণ গোল গোল করে তাকালো আনিকা’র দিকে। আনিকা চাচ্চুর গাল জোড়া টেনে দেয়। অরুণ হেসে বলে,
-” আনিবুড়ি তো ভোরের বোন হয়!”
আনিকা ভেংচি কেটে বলে,
-” তো? লাল টুকটুকে বউ ও হবে!”
_____
সারাদিন ব্যস্ততায় কাটে অরুণের! ব্যস্ততার ভিড়েও বুকটা শূন্য শূন্য লাগে। আগে তো নীড়ে ফিরে চঞ্চল চড়ুই জোড়ার কিচিরমিচির শব্দে তাঁর হৃদয়খানি শীতল পবনে জুড়িয়ে যেতো। এখন তো তাঁর নীড় ফাঁকা! বাড়ি ফিরলে তো ছেলে কোলে চড়ে চুমু দিয়ে মিষ্টি হেসে শ’ খানেক আবদার করবে না! গাল ফুলিয়ে এক অভিমানীনি বলবে না দেড়ি করে কেন ফিরলো! তাঁর ত্যাড়া উত্তরে অভিমানীনির অভিমান তো আর বেড়ে যাবে না। সেই অভিমান ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিতেও তাকে নিয়ে সুখানুভূতির রাজ্যে ঘুরে বেড়ানো হবে না। অরুণ দেড়ি করেই বাড়ি ফিরে। ভেবেছিল চলে যাবে শ্বশুড় বাড়ি। কিন্তু যেতে পারে নি। সে পারবে না বিনা দাওয়াতে সেখানে যেতে। তাঁর সাথে যায় না ব্যাপারটা!
পূর্ববর্তী রাতের ন্যায় আজকের রাতটাও কেটে যায় হাঁসফাঁস করতে করতে। পরদিন অরুণ সিদ্ধান্ত নেয় যাবে শ্বশুড় বাড়ি সঙ্গে তিন নম্বর হাত; অর্থাৎ অজুহাত হিসেবে পাতার নতুন ফোন আর কিছু ওষুধ পত্র নিয়ে যাবে। সেই হিসেবে সারাদিন ব্যস্ত রেখে বিকেলে বাড়ি ফেরে। স্কাই ব্লু শার্ট ও জিন্সে নিজেকে রেডি করে। শার্টের উপর ধূসর রঙের হুডি পড়ে নেয়। শীতটা জেঁকে বসেছে। চুল সেট করার সময় ও মন মানসিকতা নেই শুধু চিরুনি চালায় কোনরকম। কালো ফ্রেমের চশমা চোখে পড়ে। আয়নায় নিজেকে দেখে! চেহারায় একটু বুড়ো বুড়ো ভাব দেখা যাচ্ছে তবে অরুণ জানে ওবাড়ি গিয়ে ইমার্জেন্সি ওষুধ নিলে ঠিক হয়ে যাবে! অরুণ ড্রেসিন টেবিলের উপর রাখা থেকে ঘড়ি পড়ে নেয়। ওয়ালেট নিতে পারে না। সেটা তো আরেকজনের দখলে! অরুণ চুলের ভাঁজে হাত চালিয়ে বলে,
-” দেখ পাতাবাহার ডোন্ট ডিস্টার্ব মি! তোমার সখি জানলে গর্দান নিবে তোমার। তাই ওয়ালেট দিয়ে দাও”
পাতাবাহার ছাড়ে না। ড্রসিন টেবিলে গা এলিয়ে চার পায়ে লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। ভাব এমন যেতে দেবে না অরুণ কে অথবা তাকেও সঙ্গে নিতে হবে। অরুণ তার গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করে। বাটিতে ক্যাট ফুড দিলে বিড়ালটি খেতে যায়। অরুণ ওয়ালেট পকেটে পুরে হাত ধুয়ে আসে।
-” শোন পাতাবাহার? খেয়াল রেখো ফ্ল্যাটের আসছি আমি।”
বলে দরজা লক করে বেরিয়ে যায়। পাতাবাহার খাওয়া বাদ দিয়ে দরজার কাছে গিয়ে মিও মিও ডাকে অনবরত! তাকে এভাবে ধোঁকা দিতে পারলো?
__
অরুণ মাগরিবের নামাজ আদায় করে শশুর বাড়ি ঢোকে। হাতে মিষ্টি সহ বাচ্চাদের জন্য ফাস্টফুড ও হাওয়াই মিঠাই। কলিং বেল বাজালে দরজা খুলে যায় অতিদ্রুত। লতাকে দেখে অরুণ ভদ্রসুলভ জিজ্ঞেস করে,
-” কেমন আছো লতা?”
বলেই অরুণ ইতস্তত করে খানিকটা। সেদিন তাদের বাড়িতে ভালোমন্দ কিছুই বলে নি আজ বললো, মেয়েটা না পিঞ্চ মেরে কথা বলে! অরুণের ধারনা শতভাগ সত্য। লতা খোঁচা দেয়। অরুণ হজম করে নেয়; দোষটা তাঁর! লতা ওখানেই থেমে থাকে নি। সে আরো বলে,
-” ভাইয়া আমি পাতার সাত আট বছরের বড়! আপনি আমার ছোট বোনের জামাই। বয়সে ঢের ছোট হলেও সম্পর্কে বড় আমি। ননশ্বাস না কি বলে যেন সে যাই হোক আপু ডাকবেন। সম্মান দিলে সম্মান পাবেন। বুঝলেন?”
অরুণ থমথমে মুখে লতাকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়! জবাব দেয় না। পাতাবাহারের রাগ অভিমান কমুক একটু। তাকে নিয়ে নিজ নীড়ে ফিরুক। পাতার কাছেও ঘেঁষতে দেবে না এই মেয়েকে। অরুণকে দেখেই রুম্পা ‘আনকেল আনকেল’ বলে দৌড়ে আসে। অরুণ কোলে তুলে নিয়ে তার হাতে একটা হাওয়াই মিঠাই দেয়। রুম্পার খুশি দেখে কে! অরুণ এদিকে ওদিকে তাকিয়ে পাতাকে খোঁজে। লাবনী আক্তার এগিয়ে এসে ব্যস্ত হয়ে পড়ে মেয়ে জামাইয়ের হালচাল জিজ্ঞেস করতে। বিয়ের পর দ্বিতীয়বার পা রাখলো তাদের বাড়িতে। অরুণ পাতার কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান লুবের সাথে ছাদে গিয়েছে চাঁদ দেখতে। অরুণের ভ্রু কুঁচকে যায়।এই ভর সন্ধ্যায় ছাদে? তাও এই পৌষের শীতে? অরুণ শাশুড়িকে বলে ছাদে চলে যায়। লতা ড্রয়িং রুমে বসে তাঁর কান্ড দেখে। পাতার খেয়াল রাখে লোকটা।
অরুণ একতলা বাড়ির ছাদে চলে যায়। অন্ধকার ছাদে শুধু রাস্তার ধারের ল্যাম্পপোস্টের সাদা নিয়ন বাতির আলো! আর উপরের এক ফালি চাঁদের জোৎস্না ঢালা। অরুণ গলা খাঁকারি দিলে সবাই এদিকে ফেরে। ভোর খুশিতে লাফিয়ে ওঠে। অরুণের পা জড়িয়ে বলে,
-” আই মিসড ইয়ু সো মাচ আব্বু কলিজা!”
-” আ’ম অলসো কলিজা!”
ভোর মাথা উঁচু করে মুচকি হাসলো। নিয়ন বাতি ও জোৎস্নার ম্লান আলোয় মিষ্টি হাসিটা যেন নিজস্ব দ্যুতি ছড়িয়ে দিলো! অরুণ ছেলের টুপিটা দিয়ে মাথা ভালো করে ঢেকে দেয়।
-” দুলাভাই কখন এলেন?”
লাবিবের কথায় অরুণ তার দিকে তাকিয়ে ভোরের হাত ধরে বলল,
-” মাত্রই এলাম! এই ভর সন্ধ্যায় ছাঁদে কি? ওই এক ফালি মলিন চাঁদে প্রেমিকার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাও নাকি?”
লাবিব লজ্জায় মাথা চুলকিয়ে বলে,
-” আপনার চাঁদ তো আপনার নামে লিখিত দলিল যখন খুশি দেখতে পারবেন। আমরা তো পারি না ,তাই! বুঝতেই পারছেন?”
-” তাঁর মানে স্বীকার করছো কেউ আছে! শালামশাই ভালো ভেবেছিলাম তোমাকে! পরিচয় দাও? তোমারও ব্যবস্থা করে দিই!”
লুবমান যেন নিজের কথাই ফেঁসে গেলো! পরিচয় জানালে ব্যবস্থা করা দূর, দা বটি নিয়ে ধাওয়া করবে! লাবিব বলে,
-” কি যে বলেন না দুলাভাই! এই লাবিব ভোর? চলো আমরা নিচে যাই!”
বলেই তাদের নিয়ে নিচে যায়। অরুণ সাবধানে নামতে বলে তাদের। তাঁরা চলে যেতেই অরুণ ছাদের কিনারে দাঁড়ানো তাঁর রমনীর পানে চায়। পাতা সাথে সাথে অন্যদিকে ফেরে। লোকটা আজ আসবে পাতার ভাবনার বাহিরে ছিলো! হয়তো ভোরকে ছাড়া থাকতে পারছে না তাই চলে এসেছে। তাঁর জন্য তো আর আসে নি। অরুণ বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে আসে পাতার নিকট। পাতার গায়ের শালটা তুলে মাথায় ঘোমটার ন্যায় পড়িয়ে কপালে অধর ছুঁয়ে রাখে। ঘনঘন শ্বাস টানে। যেন বুঝিয়ে দিতে চায় অল্প ক্ষণের বিরহে অরুণ সরকারের নাজেহাল অবস্থা! পাতার ইচ্ছে করে উষ্ণ ওই বুকটায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে কিন্তু পাতা নিজেকে ধাতস্থ করে। অরুণের উষ্ণ বুকে হাত রেখে ঠেলে সরিয়ে দিতে চায়। অরুণ হাত জোড় বুকে চেপে রেখে করুণ গলায় বলে,
-” অনেক হয়েছে স্পেস! পাতাবাহার বাড়ি চলো? রাগ অভিমান যা দেখাবে আপন নীড়ে দেখিও! আমি সব অভিমান অভিযোগ মাথা পেতে নেবো! প্লিজ পাতাবাহার?”
অরুণ মনে মনে ভাবে বাড়ি ফিরে চলো পাতাবাহার! নইলে তাঁরও এখানে থাকার বন্দোবস্ত করো। সে বিনা দাওয়াতে এসেছে এতেই কেমন অপ্রস্তুত সে! এখন ছোচামো করে শশুর বাড়ি দিনের পর দিন থাকতে পারবে না সে। আবার এরকম বিরহে থাকতেও পারবে না।
পাতা থমকায়! লোকটা এতো গভীর গলায় ভোর ব্যতিত কাউকে অনুনয় করেছে কি না সন্দেহ! পাতা কিছু সময় চুপ থেকে বলে,
-” নিচে চলুন!”
অরুণ হতাশ হয়! হতাশ মিশ্রিত গলায় বলে,
-” যাবে না বাড়ি?”
-” আশ্চর্য! আমি বলেছি তো কিছু দিন থাকবো। বিয়ের পর মেয়েরা বাপের বাড়ি থাকে না? নিচে চলুন!”
পাতার কাঠকাঠ গলার স্বরে অরুণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কিছু সময় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে পাতাকে পাঁজাকোলে নিয়ে সিঁড়ির পথ ধরে।
-” ইয়া আল্লাহ আমার জামাই পাগলি বউটাকে ফিরিয়ে দাও! তাঁর কানে কানে মন্ত্র পড়া কুচুটে শয়তানীদের মুখে ঝামা ঘষিয়ে দাও! আমিন! আমিন বলো পাতাবাহার?”
পাতা গরম চাহনি নিক্ষেপ করে। বর্বর লোক! অরুণ মুচকি হেসে পাতার ফুলো অষ্ঠাধরে সশব্দে চুম্বন করে সামনে তাকাতেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে!
রাতুল ভুঁইয়া গলা খাঁকারি দিয়ে আশেপাশে তাকালো। কাউকেই খুঁজে না পেয়ে বত্রিশ পাটি বের করে হেসে বলে,
-” মুরুব্বি উঁহু উঁহু! আমি কিছু দেখি নি কিন্তু! দেখলেও তোমাদের জানিয়ে লজ্জাও দিবো না। তবে হ্যাঁ পেছনে শশুর মশাই আসছে! তাই বাকি কাজ পোস্ট পন্ড করে দাও!”
লজ্জায় পাতার বাচ্চাদের ন্যায় দৌড়ে পালাতে ইচ্ছে করছে! দুলাভাইয়ের জায়গায় আব্বু হলে লজ্জায় সে বাড়ি ছাড়তো! অরুণ অবশ্য স্বাভাবিক আছে এখন। সে পাতাকে নামিয়ে ভেতরে নিয়ে যায়। রাতুল তাদের পিছনে। চোখে মুখে চাপা হাসি!
_____
পাতা রুমের ভেতর পায়চারি করছে গুটি গুটি পায়ে। একটা হাত বাড়ন্ত পেটে। ভোর ও লাবিব বিছানায় শুয়ে মোবাইলে গেম খেলছে।অরুণ বিছানায় বসে আছে বাবু হয়ে। তাকে দেখেই পাতার রাগ হচ্ছে অসম্ভব! অসভ্য বেহায়া বেলাজ লোক কোথাকার! রাতুল ভাইয়া পাতাকে দেখলেই পিঞ্চ মেরে কথা বলছে! ‘পাতার গোমড়া মুখো জামাই দেখি বেশ রোমান্টিক! তাই তো আমাদের পাতা জামাই বলতে অজ্ঞান!’ আর চোখাচোখি হতেই এমন করে হাসে পাতার লজ্জা বেড়ে যায়। সব দোষ এই বেলাজ ম্যানারলেস লোকটার! কথা হলো পাতা তাকে ঝাড়তে পারছে না তাই রাগ লাগছে! অরুণ পলকহীন তাকিয়ে থাকে পাতার দিকে। ঢিলেঢালা গোল ফ্রক ও টাওজার। ফ্রকের উপর একটা পাতলা সোয়েটার! শালে নিজেকে মুড়িয়ে ছোট ছোট পা ফেলে হাঁটছে যেন কোনো পুতুল! রাগে ফোঁস ফোঁস করছে! অরুণ হামি তুলে বলে,
-” সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করছো কেনো? হয়েছে টা কি? বলবে?”
পাতা কিচ্ছু বলে না। চুপচাপ হাঁটতে থাকে। অরুণ আবার বলে,
-” একটু স্থির হয়ে বসো না। নয়ন জুড়ে দেখি একটু! ঊনপঞ্চাশ ঘন্টা চোখের আড়ালে ছিলে!”
পাতা কেমন করে যেন চায়! লোকটা বলেছে এই কথা? নাকি সে ভুল শুনলো!অরুণও বলেই কেমন অস্বস্তিতে পড়ে। এসব ঢঙ্গী কথা সে কিভাবে বললো? কেমন নিব্বা টাইপ!
-” বাব্বাহ অরুণ সরকার এসব প্রেম বাক্য বলতে জানে?
পাতার কথায় অরুণ খানিকটা আমতা আমতা গলায় বলে,
-” না জানার কি আছে আশ্চর্য! তোমার কি কোনো প্রবলেম হচ্ছে? কেমন চিংড়ি মাছের মতো তিড়িং বিড়িং করছো! শান্ত হয়ে বসো না!”
প্রসঙ্গ পাল্টে নেয়। পাতা আড়চোখে অরুণকে দেখে। অরুণের ঘুম পাচ্ছে। কাল রাতে ঘুম হয় নি। আজকে হবে! তবে ঘুমোবে না সে। অভিমানীনির অভিমান ভেঙ্গে গুড়িয়ে সকাল সকাল নিজ নীড়ে ফিরবে তাকে সঙ্গে নিয়ে! সে ঘুম জড়ানো গলায় বলে,
-” এই পাতাবাহার ঘুম পাচ্ছে! রাত দশটা বাজতে চললো। ঘুমোবে না?”
-” হ্যাঁ ঘুমোবে তো! এখনি ঘুমোবে!”
তৃতীয় কোনো ব্যক্তির গলা শুনে অরুণ দরজার পানে তাকায়। রাতুল হাসিমুখে ভেতরে ঢুকে অরুণকে উদ্দেশ্য করে ফিসফিসিয়ে বলে যেন বাচ্চাদের কানে না যায়,
-” ভাই শীতের রাত এমনিতেই দীর্ঘ তাঁর উপর উষ্ণতা দেয়া বউ কাছে না থাকলে সেই রাত কাটতেই চায় না। আপনাকে গত দু রাতের মতো আজকের রাতেও স্বাগতম! চলুন দুই সম্বন্ধী ভাই মিলে দুঃখ বিলাস করি!”
পাতা অবুঝ চোখে দু’জনকে পর্যবেক্ষণ করে। সে পুরো কথার মানে বুঝতে পারে নি। তবে অরুণের বুঝতে এক সেকেন্ডও লাগে নি। সে পাতার দিকে তাকালো! তাঁর সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। সে রাতুলকে প্রশ্ন করে,
-” সমস্যা কোথায? তোমরা ফ্যামিলি নিয়ে লুবের ঘরে আমরা এ ঘরে! লুব আজ রাত ম্যানেজ করবে!”
রাতুল অরুণ পাশে বসে দুঃখি দুঃখি গলায় গুনগুন করে বলে,
-” কারে বোঝাবো মনের দুঃখ রে! আমি বুক চিড়িয়া!! ভাই আছে না আমার একমাত্র বউ? আর কিছু বলতে হবে?”
-” না! খুবই ভালো করে বুঝতে পেরেছি! বউকে একটু হাতের মুঠোয় রাখতে পারো না রাতুল? তাঁর নাক টা একটু বেশিই বড়!”
ত্যাক্ত গলায় বলে অরুণ। এই লতা মেয়েটা বেশি বাড়াবাড়ি করছে। পাতা বুঝতে পারে সম্পূর্ণটা। তাঁর হাঁসি পায়। ঠোঁট চেপে হেসে বলল,
-” দুলাভাই ও ঘরে মনে হয় তিনটে বালিশ আছে। আরেকটা নিয়ে যাবেন! লেপও একটা এক্সট্রা আছে! শীত পড়েছে বেশ এটাও নিয়ে যান !”
বলেই লেপ বের করে ওয়েড্রপ থেকে। অরুণ চোখ পাকায় পাতাকে। দাঁত দেখাচ্ছে মেয়েটা!এই সুন্দর দাঁত গুলো সে ভেঙ্গে দিবে। পাতা তাঁর কোলে সাদা ধবধবে নতুন লেপ রেখে বলে,
-” দুজনকেই শুভ রাত্রি!”
-” পাতাবাহার? হেসে নাও! এক পৌষে শীত যায় না। মাঘ মাসও আসবে অতি শীঘ্রই!”
বলেই অরুণ লেপ নিয়ে গটগট করে চলে যায়! পাতা হেসে ওঠে শব্দ করে।
চলবে…..
#পাতা_বাহার
লেখনীতে: #বেলা_শেখ
#পর্ব- ৫৭
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
শীতের স্নিগ্ধতায় ঘেরা বিকেল বেলা! নীল দিগন্তের পশ্চিম কোণে কমলা রূপ অরুণ মিষ্টি হেসে চেয়ে আছে। তাঁর মিষ্টি হাসির উষ্ণতা ধরনী ছেয়ে আছে। নীল দিগন্তের বুকে শত বিহঙ্গের দল ডানা মেলে উড়ে বেড়ায় এলোমেলো। দেশি পাখির ভিড়ে অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত নিলাম্বর। সরকার বাড়ির আঙিনায় দেশি বিদেশি পাখির মেলা বসেছে যেন। রঙ বেরঙের বিভিন্ন প্রজাতির পাখির বসবাস এই আঙিনায়। সারাটা বেলায় তাদের খুনসুটি দেখা যায় তবে বিকেলে তাদের মেলনায়তন চক্ষু শীতল আবেশে ভরিয়ে দিতে সক্ষম। অরুণ সরকারের আগমন ঘটেছে সরকার বাড়িতে। একাই এসেছে। শুক্রবার অফিস বন্ধ কাজের চাঁপাকল থেকে মুক্ত। একা তাঁর ছোট্ট কুটিরে ভালো লাগছিলো না। শ্বশুড় বাড়িও যেতে ইচ্ছে করছিলো না। দু’ এক দিন পর পরই যাওয়াটা কেমন দেখায় না? তাঁর উপর ও বাড়িতে পাতাবাহার যেন তাকে চোখেই দেখে না, কথা বলা দূরের কথা। লতা মেয়েটিও বাপের বাড়ি পড়ে আছে। অরুণ গেলেই খোঁচা মেরে কথা বলবে। অরুণ অপমান বোধ করে। তাই ভেবেছে যাবে না।পাতা কল করলে তবেই যাবে। অরুণ বর্তমানে সরকার বাড়ির আঙিনায় পাতা বেতের চেয়ারে বসে গরম ধোঁয়া ওড়ানো চায়ের স্বাদ নিতে ব্যস্ত। সে একা নয় এখানে। আরিয়ান, রুবি, আদুরি, আসমা বেগম, আভারি, মিনু, সুফিয়া সবাই উপস্থিত। আনিকা,রূপ, নয়ন খেলছে। সুফিয়া তাদের দেখাশোনা করছে। মিনুও তাঁর সঙ্গে। আভারি অরুণের পেছনে দাঁড়িয়ে। অরুণ বসতে বললেও বসে নি। আদুরি অরুণ পাশে বসে একটার পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। আরিয়ান তাকে এটা ওটা বলে লেগপুল করছে আদুরি কাঁদো কাঁদো হয়ে তাঁর কাছে নালিশ জানায়। অরুণ আরিয়ানকে মিছে মিছে শাসায়। দুষ্টু মিষ্টি খুনসুটির মাঝে হঠাৎ আদুরি অরুণকে উদ্দেশ্য করে বললো,
-” বড় ভাইয়া? শুনলাম ভাবী নাকি রাগ করে বাপের বাড়ি পারি জমিয়েছে! সত্যিই?”
আরিয়ান সন্দেহ চোখে চায়! আম পাতা জোড়া জোড়া ভাইয়ের উপর রাগ করে বাপের বাড়ি চলে গেছে? সত্যিই? এ যে অতি আশ্চর্যের বিষয়! অরুণ ভ্রু কুটিতে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করে,
-” কার থেকে শুনলি?”
আদুরি পড়ে এবার বিপাকে। কি জবাব দেবে? তবে আরিয়ানের প্রশ্নে আদুরি আটকে রাখা শ্বাস ছাড়লো।
-” ভাই ? সত্যিই আম পাতা জোড়া জোড়া রেগে বাপের বাড়ি গেলো? আমার তো বিশ্বাস হচ্ছে না!”
অরুণ স্বাভাবিক মুখের আদল গম্ভীর হয়। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে,
-” রেগে না। নাইওর গেছে। ডেলিভারীর সময় সব মেয়েই তো যায়!”
-” তাই তো বলি! তেজপাতার আবার রাগ তাও ভাইয়ের উপর! চোখে হারায় তোকে ভাই! তুই বললে ঠান্ডা চা গরম মনে করে খেয়ে নেবে!”
আরিয়ান হেসে বলে। আদুরিও হেসে ওঠে তাঁর কথায়। অরুণের কাঁধে মাথা রেখে বলে,
-” বড় ভাবী ভাইকে অনেক ভালোবাসে বুঝলে ভাইয়া! তাই ভাইয়ের কথা মেনে চলে।”
আরিয়ান হেসে মাথা নেড়ে সায় জানালো আদুরির কথায়। রুবির দিকে আড়চোখে চেয়ে বলে,
-” আম পাতার মতো জামাই পাগল মেয়েই তো সব ছেলেরা বউ হিসেবে চেয়ে থাকে। কিন্তু কপালে তো তাঁদের রিনা খান নাচে!”
রুবি কটমট করে চায় আরিয়ানের দিকে। আরিয়ান ভুলেও তাকায় না তাঁর দিকে। অরুণ চা শেষ করে কাপ সামনের টেবিলে রেখে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে খানিকটা কড়া সুরে বলে,
-” ভাবী হয় তোর! ভাবী সম্মোধন করবি নইলে দরকার নেই ডাকার। আম পাতা, তেজপাতা কেমন সম্মোধন?”
অরুণের কড়া সুরে বলা বাক্য আরিয়ান সিরিয়াস নেয় না। হেসে বলে,
-” রেগে যাচ্ছো কেন ভাই? আসলে এইটুকুন ই তো আমাদের ভাআবী। দেখতে পিচ্চি লাগে মনে হয় আদুরির চেয়েও ছোট! কলেজ পড়ুয়া মেয়ে!”
অরুণ কিছু বলে না। তবে তার মুখাবয়ব সিরিয়াস! রুবিরআরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো,
-” তুমি মজা করে বলো কিন্তু তোমার ভাইয়ের ভালো লাগে না হয়তো। কানে ঢোকে নি কথা? ভাবী ডাকলে ডেকো নইলে ডেকো না।”
-” সেটা আমি আর আমার ভাই বুঝে নিবো তোমাকে ভাবতে হবে না।”
ত্যাড়া গলায় বলে আরিয়ান । রুবি’র মুখটা থমথমে। আসমা বেগম আরিয়ানকে চোখে শাসায়। অরুণ চেয়ার ছেড়ে উঠে বলে,
-” আমি আসি তাহলে!”
আসমা বেগম কপালে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করে,
-” আসছো মানে? ফ্ল্যাটে তো কেউ নেই। এখানেই থাকো ক’টা দিন!”
-” না ছোট মা! অন্যদিন আজ সম্ভব নয়!”
আসমা বেগম আর জোর করেন না। তবে অরুণকে বসতে বলেন কিছু জরুরী কথা বলবে বলে।অরুণ আবার বসে পড়লো। আদুরি ভাইকে ফিসফিস করে বলে,
-” ভাবীর কাছে যাবে? তাহলে আমাকে সঙ্গে নিবে। ভাবীকে দেখি না কতদিন হলো”
-” না!”
অরুণের স্পষ্ট জবাব। আদুরি চুপসানো বেলুনের মতো মুখ বানিয়ে নেয়। ভাইটা তার একেবারে রসকষহীন! আসমা বেগম চা শেষ করে বলে,
-” আরিয়ানের সাথে কথা বলেছি আমি। তোমাকে ফোন করে আসতে বলতাম। তুমিই এলে ভালোই হয়েছে। আসল কথায় আসি। তোমাদের বোন বড় হচ্ছে। তাকে পাত্রস্থ করতে হবে। ছোট নেই এখন সে। রিসেন্ট একটা প্রস্তাব এসেছে। আসমানী আপার ভাসুরের ছেলে নাম কারিম মুয়ীদ! তোমরা দেখেছো। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। দেখতে শুনতে ভালো, ফ্যামিলি স্টেটাসও মেলে। তাঁরা আদুরিকে তো দেখেছেই। তাদের পছন্দ বেশ! আমি টুকটাক খোঁজ খবর নিয়েছি। আমারো পছন্দ হয়েছে। আরিয়ানের সাথে কথা বলেছি। এখন তোমাকে বলছি দেখো চলে কি না। চললে কথা আগাবো!”
অরুণ মনোযোগ দিয়ে শোনে সবটা! কারিম মুয়ীদ! দেখেছে সে দুই এক বার। লাজুক ভদ্র ছেলেই মনে হয়েছে! দেখতেও সুদর্শন। খোঁজ খবর নেয়া কোন ব্যাপারই না। এখনি একটা ফোন লাগালে আধা ঘন্টার মাঝেই ওদের পুরো চৌদ্দ গুষ্টির রিপোর্ট হাতে চলে আসবে। সে পাশে বসা বোনের দিকে চায়। আদুরীর আদুরে বদন খানি বিষাদের চাদরে মুড়ে আছে। অরুণ আসমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললো,
-” খোঁজ নেয়া যাবে! আসল বিষয় হলো আদুরির মতামত! সে কি চায়! তাঁর কোনো পছন্দ আছে কি না!আফটার ওল লাইফটা ওর! সারা জীবন ও পার করবে। এই প্রস্তাব আগাবে নাকি মানা করে দিবে সবটা তাঁর উপর ডিপেন্ড করে ছোটমা! ছোট ভুল সিদ্ধান্ত যেন গলার কাঁটা না হয়ে যায়।”
আসমা বেগম মেয়ের দিকে চায়! আদুরি মাথা নিচু করে নিয়েছে। আসমা বেগম অরুণকে বলে,
-” তুমিই জিজ্ঞেস করো? আমি করেছি বেশ কয়েকবার! মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকে!”
অরুণ জিজ্ঞেস করে আদুরিকে। আদুরি ভাইয়ের দিকে চায়। বিষাদের ছায়া দেখা যায় তাঁর ছোট কাজল কালো নয়ন জুড়ে। সে ভাইয়ের হাত ধরে বলে,
-” ভাই আমি এখনো প্রস্তুত নই। তাদের মানা করে দাও! আমাকে এই সেমিস্টার অবধি সময় দাও!”
অভিজ্ঞ অরুণ বোনের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করে। বুঝতে পারলো কি না কে জানে তবে বোনকে আশ্বস্ত করে বলে,
-” টেক ইয়োর টাইম আদু! তুই যখন প্রস্তুত হবি তখন আমরা ভেবে দেখবো। ভয়ের কিছু নেই। আর পছন্দ বা জানা শোনা থাকলে আমার সাথে কথা বলবি! বুঝাতে পেরেছি?
আদুরির আতঙ্কে আচ্ছাদিত মুখশ্রীতে মিষ্টি রৌদ্রের আনাগোনা শুরু হয়। মুচকি হেসে ভাইয়ের বাহু শক্ত করে চেপে ধরে ধন্যবাদ জানায়। অরুণ মুচকি হেসে তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে উঠতে নিবে আসমা বেগম আবার থামিয়ে দিলো! অরুণ প্রশ্নাত্মক চোখে চাইলে তিনি জানান গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবেন। অরুণ শান্ত হয়ে বসে। কি বলবে ছোট মা?
আসমা বেগম অতিশয় সিরিয়াস গলায় বললো,
-” অরুণ তুমি আমার কথায় কিছু মনে কোরো না। বাট আমার মনে হচ্ছে এখনি সময় বলার।হায়াত মউতের গ্যারান্টি নেই। তাই আগেই সব ঠিকঠাক করে নেওয়া ভালো!”
অরুণ আগামাথা কিছুই বুঝতে পারে না। কিসের কথা বলছে? আসমা বেগম সময় নিয়ে ব্যাপারটা ক্লিয়ার করে।
-” তোমার বাবা যখন সম্পদের উইল করেন তখন তুমি প্রাপ্ত বয়স্ক হলেও আরিয়ান আদু নাবালেক নাবালিকা ছিলো! তাই ওদের নামে করলেও সব তোমার আওতাধীন আছে। এখন আদু আরিয়ান দু’জনই যথেষ্ট প্রাপ্ত বয়স্ক তাই সব কিছু বুঝিয়ে নিলে ভালো হয়। তুমি প্লিজ ব্যাপারটা পজেটিভলি নিবে।আদু বড় হয়েছে ওর বিয়ে দিতে হবে। আমি চাই ওর প্রাপ্য অংশ ওকে বুঝিয়ে তবেই বিদায় করতে। আর উইল মোতাবেক তোমার, আরিয়ানের থার্টি থার্টি। আদু’র টুয়েন্টি আর আমার টুয়েন্টি! আমি আজ আছি কাল নেই। আমার টুয়েন্টি পার্সেন্ট আমি ভাগ করে দিতে চাই। টেন তোমার আর টেন পার্সেন্ট আদু ও আরিয়ানের! তুমি কি বলো?”
অরুণ মনোযোগ দিয়ে শোনে সম্পূর্ণটা। সে পজিটিভলি নেয়। সেও কথাটা পারতে চেয়েছিলো কিন্তু ওনারা কিভাবে নেবে তাই বলা হয় নি। অরুণ স্বাভাবিক ভাবেই বলে,
-” ছোট মা আমি সবসময় রেডি। তুমি দিন তারিখ ঠিক করো। আরিয়ান তুই উকিলের সাথে কথা বলে নিস! আর তুমি তোমার অংশ বন্টন করে দিতে চাও ভালো। তোমার ইচ্ছে! আরিয়ান আদু’কে দাও টেন টেন! আমার যতটুকু আছে যথেষ্ট ছোট মা। আমি নিতে পারবো না।”
আসমা বেগম অরুণের চোখে চোখ রেখে বলে,
-“কেন নিবে না? আমি সৎ মা বলে?”
অরুণ মুখটা কেমন তেতো হয়ে যায় নিমিত্তে। ক্ষীণ তিক্ততা ছেয়ে যায় হৃদয় কোণে। সৎ শব্দটা অরুণের বড্ড অপছন্দ। শুনতে খুবই বিশ্রী লাগে। মনে হয় কেউ চোখে চোখ রেখে তাকে ভর্ৎসনা করছে। কিছু হলেই সৎ আপনের প্রশ্ন। যেন আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয় অরুণ সরকার সৎ। অরুণ মন ভেঙ্গে যায় এই ছোট্ট শব্দে! তার কিছুই বলতে ইচ্ছে করে না। তাই সে চুপ থাকে। আরিয়ান মুচকি হেসে বলে,
-” আমি জানতাম তুমি নেবে না! বলেছিলাম না মা? তুমি স্নেহ করলেও সে তোমার স্নেহতলে থাকতে চায় না কেন জোর করো তবে?”
অরুণ আরিয়ানের দিকে একবার তাকিয়ে অল্প হাসে। সে হাসি খুবই নিষ্প্রাণ! আসমা বেগম আরিয়ানের কথায় জবাব না দিয়ে অরুণকে বলে,
-” তুমি পুরনো ব্যাপারটা নিয়ে পড়ে আছো? আমি জানি না তোমার কান কতটুকু ভারী করা হয়েছে…!”
-” আমি কিছু মনে রাখি নি। আর তাছাড়াও আমি সহমত ব্যাপারটা নিয়ে। আব্বু সহানুভূতি দেখিয়ে আমাকে বেশি অংশ দিবে এটা অনুচিত। আমরা সবাই সমান অংশীদার! এখন এই কথা তুলবেন না প্লিজ। আর আমি কচি খোকা নই বা ছিলাম যে আমার কান ভারী করবে!”
তাঁর গাম্ভীর্যে ভরপুর কাটকাট কথায় কারো মুখে রা নেই। আরিয়ানও চুপ করে যায়। তবে সবার নিরাবতার মাঝে রুবি বলে ওঠে,
-” আচ্ছা এই টপিক বাদ রাখি আমরা সবাই! আব্বু সব মিমাংসা করে দিয়েই গেছে আমরা আর কথা না বাড়াই! আচ্ছা অফিসের ভাগ বন্টন কিভাবে কি করা হবে?”
অরুণ রুবির দিকে মাথা তুলে চায়। আরিয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে সে। অরুণের অধর কোণে হাসি দেখা যায়। মানুষ কত দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যায়। মানব মনে যদি হিংসার এক ছোট্ট ঝলক উদয় হয় সেটা লাভায় পরিণত হতেও সময় নেয় না। এতে সাহায্য করে কতিপয় মানুষ রুপি শয়তানের নাতিপুতি! তবে সে খুশি হয়। অবশেষে তাঁর সামনে একথা উঠলো। সব মিমাংসা করে নেওয়া যাক। সে কিছু বলার উদ্দ্যোগ নেয় এর আগে আরিয়ান খেকিয়ে ওঠে রুবির উপর! দাঁড়িয়ে চড়া গলায় বলে,
-” তোমাকে এর আগেও বলেছি আবার বলছি! অফিস সম্পূর্ণটা ভাইয়ের! আব্বু তাঁর নামে লিখে দিয়েছে। আর অফিসের ভরাডুবির সময়ও ভাই নিজ পুঁজি ও পরিশ্রমে ব্যবসা দাঁড় করিয়েছে। আর তোমাকে আমাদের পারিবারিক বিষয়ে নাক গলানোর কোনো দরকার নেই!”
অপমানে রুবির মুখ থমথমে। সে কিছু না বলে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়! অরুণ উঠে রুবিকে আটকায়। আরিয়ানকে ধমক দিতে ভুলে না। বাচ্চারা খেলা বন্ধ রেখে এগিয়ে আসে। অরুণ তাদের খেলতে যেতে বলে ইশারায় মিনুকে বলে সরিয়ে নিয়ে যেতে! বাচ্চারা চলে গেলে অরুণ রুবিকে বসতে বলে।
-” রুবি তুমি বসো। আর আরিয়ান রুবি আমাদের পরিবারের একজন ! তাই কথা বার্তা সাবধানে বলবি।”
আরিয়ান মাথা নিচু করে বসে থাকে। এই রুবি’টা তো আগে এমন ছিলো না। এতোটা লোভী মনোভাব যে রুবি’র মা’য়ের কু মন্ত্রনার প্রভাব বুঝতে বাকি থাকেনা। সে যাই হোক রুবিও সমান দোষী। লজ্জায় তাঁর মাথা কাটা যায়! আসমা বেগম চুপচাপ। তিনি শান্ত চোখে সবটা পর্যবেক্ষণ করে। রুবি’কে সেই বলেছিলো অফিসে ব্যাপারটা তুলতে। সে রুবি’র দিকে আড়চোখে চায়। রুবিও তাঁর দিকে চেয়ে। ওনার জন্যই তো এভাবে সবার সামনে তাকে অপদস্থ হতে হলো! ওনার জন্যই তাঁর অফিসে পদার্পণ! রুবি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করে রাখা আরিয়ানের দিকে চায়! আসমা বেগম নিজেকে ধাতস্থ করে অরুণকে বলে,
-” অরুণ? কথা যেহেতু উঠেছে ক্লিয়ার করে নেওয়াটা যুক্তিসঙ্গত নয় কি?”
অরুণ হাসে। দু হাতের তালু ঘষতে ঘষতে এগিয়ে যায় আসমা বেগমের দিকে। তাঁর পাশের চেয়ারে বসে শান্ত গলায় বলে,
-” অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত! আমিও ক্লিয়ার করতে চাই! আমি অরুণ কারো এক আনা হকও মেরে খাবো না ছোট মা। আবার নিজের এক আনা ছেড়েও দেবো না।”
আসমা বেগম অরুণের চোখে চোখ রাখে। অরুণও চোখ সরায় না। চোখে চোখ রেখে বলে,
-” আব্বু সম্পূর্ণ অফিসটা আমার নামে দেয় নি। তিনি উইলে লিখেছেন যে তাঁদের ব্যবসা এগিয়ে নিয়ে যাবে সেই অফিসের মালিকানা পাবে। আমি আরিয়ানের সাথে এ বিষয়ে কথা বলেছি বলি নি আরিয়ান?”
আরিয়ান সম্মতি জানালো। আসমা বেগম ভ্রু কুঁচকে চায় আরিয়ানের দিকে। কই তার সাথে তো কোনো কথা হয় নি এ বিষয়ে? অরুণ রুবির দিকে তাকিয়ে আবার বলে,
-” আমি ছোটমা’কে ,আরিয়ানকে সম্পূর্ণটা অবগত করেই অফিসে পা রাখি। অফিস ভরাডুবি, ঋণে লালবাতি জ্বলে ছিলো। আমি সাহায্য চেয়েছিলাম ছোট মা’র কাছে! সে ভরসা করে নি। এমনকি ধার হিসেবেও চেয়েছিলাম। তবুও ভরসা পাই নি। ইগো ভুলে মামা’র কাছে হাত বাড়িয়ে ছিলাম। মামা রাজি হলেও মামী মুখের উপর মানা করে। সাথে সাথে ফিরে এসেছিলাম। সব আশার আলো নিভে যায়। আমি অফিস নিলামে তোলার জন্য সায় জানাবো তখনই রাসেল ফোন করে জানায় তাঁর কাছে কিছু আছে আরও বন্ধুরা মিলে ম্যানেজ করতে পারবে আমি যেন নিলামের জন্য সম্মতি না দেই। তাঁর পর কি! ওরাই সব ব্যবস্থা করলো। আমি পরিশ্রম করলাম। সফলও হলাম। দু এক বার পা পিছলে পড়লেও সামলে নিয়েছি! স্বস্তি ফিরলে আমি আরিয়ানকে বলেছিলাম অফিস জয়েন হতে। ও মানা করে। আমি এখনো বলি ওকে বিশ্বাস না হলে জিজ্ঞেস করতে পারো রুবি?”
রুবি মাথা নিচু করে নিয়েছে আগেই। আসমা বেগম মুখখানাও মলিন! আরিয়ান ভাইয়ের কথায় মাথা নেড়ে সায় জানালো। অরুণ মুচকি হেসে বলল,
-” আদু’র টেন, আরিয়ানের থার্টি পার্সেন্ট শেয়ার আছে! বাকি সিক্সটি ভোরের নামে! কারো কোনো অভিযোগ? থাকলে নির্দ্বিধায় বলতে পারো!”
পিন পিন নিরবতা। পাখির কল কাকলি ব্যাতিত আর কোনো শব্দ শোনা যায় না।
আরিয়ান নিরবতা ভেঙ্গে বলে,
-” ভাই আমি কোনো শেয়ার নেবো না…!”
অরুণ জানে আরিয়ান কি বলবে! তাঁর আপাদমস্তক চেনা অরুণের। সে তাকে থামিয়ে ধমক দিয়ে বলে,
-” এক থাপ্পড় দিবো! তুই চুপ থাক। তোকে বলি নি। ছোটমা তুমি বলো?”
আসমা বেগম স্বাভাবিক ভাবেই বলে,
-” আমার কি বলার আছে অরুণ? তোমার ভাই বোন! তুমি যা ভালো বোঝো। আমি এসবে নেই!”
বলেই তিনি উঠে চলে যায় বাড়ির ভেতরে। অরুণ তাঁর প্রস্থাণ দেখে। উনি কি নারাজ? থাকলেও তাঁর করার কিছুই নেই। তাঁরও ছেলে মেয়ের ভবিষ্যৎ আছে। স্বার্থপর দুনিয়ায় নিজের কথা না ভাবলেই নয়! আদুরি এতক্ষণ চুপ থাকলেও এবার উঠে অরুণের সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
-” ভাই? আমি এসব ভাগ বন্টন বুঝি না। আমার কিছুই চাই না। আব্বু তো নেই তবে তার ছায়া রূপ আমার শুধু দুটো ভাই, ভাবী, আমার ভাতিজা ভাতিজি, মা চাই। তাদের সাথে মিলেমিশে থাকতে চাই। তাদের ভালোবাসা চাই। পাবো না?”
অরুণ মুচকি হাসলো। উঠে বোনকে বাহু বন্ধনে আবদ্ধ করে। আরিয়ানও বসে থাকে না। এসে যোগ দেয়। রুবি চেয়ে দেখে তাদের ভাই বোনের এই মেলাবন্ধন।
-” সন্ধ্যা হয়ে এলো। আমায় ফিরতে হবে আদু!”
-” থেকো যা না ভাই!”
আরিয়ান ভাইকে ছেঁড়ে বলে। আদুরিও সরে দাঁড়ালো। অরুণ মুচকি হাসে। যার অর্থ থাকবে না। আরিয়ান আর জোর করে না। ভাইয়ের না কে হ্যাঁ বানানো তাঁর সাধ্যের বাইরে। আদুরি দুয়েক বার অনুরোধ করেও কাজ হয় না। অরুণ বাচ্চাদের আদর করে বের হয়ে যায়।
______
মধ্যাহ্ন পেরিয়েছে সবে। পাতা লুবমানের সাথে মাতৃসদনে গিয়েছে চেকাপের জন্য। দুই তিন দিন হলো পাতা কেমন নরম হয়ে গেছে। তাঁর গুলুমুলু চেহারার একাংশও নেই। কেমন হাড্ডিসার হয়ে গেছে শুধু ফুলো পেটটা দেখা যায়। চোখের নিচে কালি জমে গেছে। চোয়াল যেন ঝুলে পড়েছে। চোখ দুটো কোটর থেকে মনে হয় বেরিয়ে আসবে। পিঠ ও কোমড় ব্যাথায় কাঁদে। মাঝে মাঝে সেই ব্যাথা পায়েও ছড়িয়ে পড়ে। অরুণ সরকারও সাত দিন হলো আসে না। ফোন করে অবশ্য লুব ও ভোরের থেকে খোঁজখবর নেয় প্রতিদিন। পাতাকে ফোন করে পাওয়া যায় তবে কথা বলে না পাতা। শুধু কানে ধরে রাখে। পাতার কথা বলতে ইচ্ছে করে না। লুবমান ও লাবনী আক্তার নিয়ে গেছে পাতাকে। ভোর যাওয়ার জন্য বায়না করেছিলো তাকে বুঝিয়ে রেখে যাওয়া হয়েছে। বাড়িতে শুধু লতা, লাবিব ,রুম্পা ও ভোর। লতা ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখছে। ভোর ও লাবিব চোর পুলিশ খেলছে। ভোর পুলিশ লাবিব চোর। পুলিশ বন্দুক হাতে চোরকে ধরার প্রচেষ্টায়! কিন্তু ধরতে পারে না। লাবিব হাসতে হাসতে ঘরের এ কোণা ও কোণা ঘুরছে ভোর তাঁর পিছু পিছু। ছুটতে ছুটতে তার ফর্সা গোল গাল মুখ লাল হয়ে গেছে। ছোট রুম্পা হাসতে হাসতে তাদের পিছু পিছু ঘুরছে আর ‘চুল ধলো, চুল ধলো’ বলে লাঠি নিয়ে দৌড়াচ্ছে ভোরের পিছু পিছু। ছুটতে ছুটতে তাঁরা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসে। গোটা কয়েক ফুলগাছ লাগানো বাগানের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে লাবিব। ভোর তাকে খুঁজে এদিকে ওদিকে। রুম্পা তাঁর পিছনে ভোর খেয়াল করে নি। বন্দুক তাক করে পিছনে ঘুরতেই কাঁদায় পড়ে যায় ঠাস করে। সাথে সাথে কেঁদে ওঠে গলা ফাটিয়ে। ভোর চোখ বড় বড় করে চায়। হাত ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করে। রুম্পা ওঠে না শরীর ছেড়ে কাঁদতে থাকে! লাবিব বেরিয়ে আসে আড়াল থেকে। ততক্ষণে লতাও ছুটে আসে। মেয়েকে টেনে তুলে বলে,
-” কি হয়েছে? এ অবস্থা কেন ওর?”
লাবিব কাঁধ উঁচিয়ে বলে কি জানি! লতা ভোরের দিকে চায় তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে। ভোর কাঁচুমাচু করে চায়। এভাবে তাকিয়ে আছে কেন আন্টি? লতা মেয়েকে সান্ত্বনা দিয়ে জিজ্ঞাসা করে। ছোট রুম্পা কাঁদতে কাঁদতে ভোরের দিকে আঙুল তুলে বলে ‘ফেলি দিছে’! লতা ভোরের দিকে চায়। ভোর মাথা নিচু করে বলে,
-” আন্টি আমি ইচ্ছে করে করি নি। ও পিছনে ছিলো। আমি ঘুরে দাঁড়াতেই ও পড়ে যায়। ব্যাথাও পায় নি। শুধু কাঁদা লেগেছে!”
লতা ছোট ছোট করে চায়।
-” ব্যাথা পায় নি? তাহলে এমনি এমনি কাঁদছে? আর তোমাকে চিনি আমি সেদিন পাতার কোলে ছিলো বলে কিভাবে লুকিয়ে চিমটি কেটে কাঁদালে মেয়েটাকে! সত্যিই করে বলো তো ভোর! ওকে ইচ্ছে করে ফেলো নি?”
ভোর মাথা তুলে চায়। সেদিন চিমটি দিলেও আজ সত্যিই সে ফেলে দেয় নি। সে মুখটা গম্ভীর বানিয়ে বলে,
-” স্যরি আন্টি। তবে আমি ইচ্ছে করে ফেলি নি!”
এমন ভাবে বলল যেন কোন বড় মানুষ বললো। লতার কপালে ভাঁজ ফেলে খানিক শক্ত গলায় বলে,
-” ভোর! লাবিব যাও বাড়ির ভেতরে যাও। কোনো খেলা না। ভদ্র ছেলের মতো বসে থাকবে। যাও?”
লাবিব মুখ কালো বানিয়ে দৌড়ে চলে যায়। ভোর বন্দুক ওখানেই রেখে হনহন করে চলে যায়। লতা নাক মুখ কুঁচকে নেয়। এটুকু ছেলের আবার ভাব! ওর থেকে লাবিব তিন চার বছরের বড়ই হবে এখনো বাচ্চামো স্বভাব যায় নি আর এ এখনি মুরুব্বিদের মতো আচরণ করে।
ভোর চুপচাপ পাতার রুমে যায়। বিছানা চুপটি করে বসে থাকে। লাল মুখটা হাসি বিহীন। লতা আন্টি আগে মিষ্টি ছিলো এখন কেমন যেন! সে কি ইচ্ছে করে ফেলে দিয়েছে ওই রুম্পাকে? ভোর জানালার ধারে বসে থাকে। তাঁর বাবার কথা মনে পড়ছে। আম্মু এলেই বলবে বাবাকে ফোন করতে। তাকে যেন নিয়ে যায়! সে বাবার কাছে থাকবে! ভোর মিসড আব্বু।
বেশ সময় পরে পাতা, লুবমান ও লাবনী আক্তার বাড়ি ফিরে। লতা কন্ডিশন জিজ্ঞেস করে লুবমান বলে সব ঠিকঠাকই আছে। আর ডেলিভারী মনে হয় এ সপ্তাহের মধ্যেই হয়ে যাবে। সাবধানে থাকতে বলেছে। হাঁটাচলা খাওয়া দাওয়া, ঘুমানো সবটা অতি সাবধানতার সাথে করতে হবে। পাতা আস্তে ধীরে হেঁটে ড্রয়িংরুমে বসে। লতা পানি এনে দেয়। পাতা একটু খেয়ে বলে,
-” ভোর কোথায়? ঘুমিয়েছে? দুপুরে খেয়েছে কিছু? নাকি গাল ফুলিয়ে বসে আছে?”
বলেই হাঁপাতে থাকে। আজকাল অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠে। দমবন্ধ হয়ে যায়। লতা ত্যাড়া গলায় বলে,
-” নবাব ঘরে আছেন। ঘুমিয়ে আছে কি না বলতে পারবো না। আর খায় নি। ডাকলাম এতো করে এলোই না। বলে পড়ে খাবে!”
পাতা চিন্তিত বদনে উঠে দাঁড়ালো। বাচ্চাটা নিশ্চয়ই মন খারাপ করে আছে সাথে না নেওয়ার জন্য। পাতা সাবধানে হেঁটে নিজের ঘরে যায়। লতা বোনের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।
পাতা ঘরে গিয়ে দেখে ভোর জানালার দিকে উদাসীন হয়ে তাকিয়ে আছে। সে যে ভেতরে এসেছে খেয়ালই নেই। পাতা শাল খুলে রাখে। বড় হিজাব খুলে ভোরকে ডেকে বলে,
-” আব্বাজানের মন খারাপ কেন? রেগে আছো আম্মুর উপর?”
ভোরের উদাস মুখে চঞ্চলতা ফিরে আসে পাতাকে দেখে। সে একপ্রকার লাফিয়ে এসে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলে,
-” আম্মু? ডাক্তার কি বললো? বাবু কবে আসবে?”
পাতাও উচ্ছ্বসিত হয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,
-” খুব শিঘ্রই আসছে! এক্সাইটেড হুম?”
ভোর মিষ্টি হেসে উপর নিচ মাথা নাড়লো। পাতা তার গাল টেনে কপালে চুমু দিয়ে আদুরে গলায় সুধায়,
-” খাওনি কেন সোনা? কত বেলা হয়েছে! আরেকটু পরে তো রাত হবে।”
-” তোমার হাতে খাবো তাই খাই নি!”
কিউট ভঙ্গিতে বলে ভোর। পাতা ছোট ছোট চোখে চায়। ভোর হেসে তার কপালে চুমু দিয়ে খিলখিল করে হেসে ওঠে। পাতাও হেসে দেয়।ফ্রেশ হয়ে খাবার নিয়ে আসে বড় প্লেটে। ভোর ভদ্র বাচ্চার ন্যায় বাবু হয়ে বিছানায় বসে। পাতাও উঠে বসে। গরম ভাতের সাথে ডাল, আলু ভাজি , ভর্তা, ছোট মাছের চচ্চরি, আর ডিম পোস! পাতা ভাত মেখে বড় করে লোকমা বানিয়ে ভোরের মুখে দিতে থাকে। ভোর গপাগপ মুখে পুরে। পেটের খিদে যে আকাশ চুম্বি পাতার বুঝতে অসুবিধে হয় না। লতা এসে পানি দিয়ে যায়। পাতা ভোরকে পানি খাওয়ায়। ভোর বলে,
-” ও আম্মু তুমিও খাও না? অনেক ইয়াম্মি হয়েছে!”
-” তাই? আচ্ছা খাচ্ছি তুমিও খাও!”
পাতা বলে নিজেও ভোরের সাথে দুই তিন লোকমা খায়। হঠাৎ পাতার স্বাভাবিক মুখটা রক্তশূন্য হয়ে যায়। ব্যথায় মুখটা নীল হয়ে গেলো যেনো! প্লেট বিছানায় রেখে পাতা পেট চেপে ধরে। ভোর ভয় পায়! পাতার বাড়ন্ত পেটে হাত বুলিয়ে ভগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
-” আম্মু ব্যাথা করছে? পঁচা বোন আবার কিক করছে, তাই না?”
পাতা চোখ মুখ খিঁচে মাথা নাড়ে। ভোরের হাতটা পেটের এক সাইডে রেখে বলে,
-” দেখো তোমার বোন নড়ছে! এতো দুষ্টু সে! আম্মুর যে কষ্ট হয় সে বুঝতেই পারে না।”
ভোর দুঃখি চোখে চায়। আম্মুর কষ্ট হচ্ছে অনেক? হচ্ছেই তো! ওই যে কাঁদছে! ভোর বিছানা থেকে নেমে টেবিলের উপর থেকে পাতা’র নতুন ফোনটা নিয়ে বাবার নম্বরে কল করে। রিসিভ হওয়ার সাথে সাথেই ভোর নাক টেনে বলে,
-” আব্বু তোমার বাবু খুব দুষ্টু! আম্মুকে কষ্ট দেয়! ভোর কিন্তু দুষ্টু বোনকে ভালোবাসবে না। কোলেও নেবে না!”
ঠেকে ঠেকে কাঁপা গলায় বলে ভোর! পাতার ব্যাথার মাঝেও হাসে। বোনের নামে অভিযোগ দেওয়া দেওয়া হচ্ছে! পাতা ভোরকে ইশারায় ডাকে। ভোর এগিয়ে আসে ফোন কানে রেখেই। ওপাশ থেকে অরুণ অল্প হেঁসে বললো,
-” কি দুষ্টুমি করলো আমার বাবু?”
-” আম্মু টাম্মিতে কিক করে! আম্মুর ব্যাথা লাগে না বুঝি? কাঁদছে তো!”
পাতা ভোরকে পানি খাইয়ে ওড়নায় মুখ মুছে দেয়। ফোন লাউডে থাকায় অরুণের গমগমে আওয়াজ ভেসে আসে,
-” তোমার আম্মু দুষ্টুমি করে তাই বাবু তাকে পানিশড করে!”
ভোর তীব্র বিরোধিতা করে বলে,
-” আম্মু একটুও দুষ্টুমি করে না। সে গুড গার্ল!”
-” তোমার আম্মু আমার একটা কথাও শোনে না!”
পাতার ব্যাথা ধীরে ধীরে কমে গেছে। এমনিই হয়। হুট করে ব্যাথা শুরু হবে মিনিট দশেক থেকে ব্যাথা আপনে আপ চলে যাবে। অরুণের কথা শুনে পাতার ইচ্ছে করে ফোনের ভেতর দিয়ে হাত ঢুকিয়ে লোকটার গলা টিপে দিতে! নাক উঁচু ম্যানারলেস লোক!
-” ও আব্বু তুমি আসো না? তুমি এসে তোমার বাবুকে বকে দাও”
-” আমি গিয়ে কি করবো? তোমার আম্মু তো চেনেই না আমাকে! কথা বলা তো দূর ফিরেই তাকায় না!”
ভোর আড়চোখে আম্মুর দিকে চায়। ছোট ভোরও খেয়াল করেছে আম্মু আব্বুর সাথে কথা বলে না। আব্বু এলে দূরে থাকে। আম্মু কি আব্বুর উপর রেগে আছে? সে পাতার দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে বলে,
-” তুমি আসো আব্বু! তুমি এলে আম্মু’র কষ্ট হবেনা! আম্মু কাঁদবে না। কাল অনেক কেঁদেছিলো। আজ লুব মামা, নানু হাসপাতালেও নিয়ে গিয়েছিলো!”
পাতা চোখ বড় বড় করে ঘনঘন না বোধক মাথা নেড়ে মানা করে বাবাকে না বলতে ! ভোর তবুও গড়গড় করে বলে দেয় সব! ওপাশে পিনপতন নিরবতা বিরাজ করে। কিছু সময় পর টুট টুট করে ফোনের সংযোগ লাইন কেটে যায়। পাতা ছোট ছোট চোখে ভোরের দিকে চায়! ভোর ফোন রেখে দৌড়ে চলে যায়! যাওয়ার সময় চিল্লিয়ে ‘স্যরি আম্মু’ বলতে ভুলে না।
ভোর ঘর থেকে বেরিয়ে ড্রয়িং রুমে সোফায় বসলো। রিমোট খুঁজে টিভি অন করে কার্টুন দেখে। একটু পর গুটি গুটি পায়ে একটি মেয়ে দু হাতের আড়ালে মুখ লুকিয়ে এগিয়ে আসে। পিচ্চি হাতের আঙ্গুলের আড়ালে মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে ‘তুকি তুকি’ বলে ভোরের সামনে ঘুরঘুর করে। ভোর সেদিকে ভুলেও ফিরে তাকায় না। রুম্পা অনেকসময় ধরে তু’কি তুকি’ বলে, ভোর শোনে না বিধায় চলে যায়। মেইন দরজার একপাশে রাখা জুতোর র্যাক থেকে একটা স্যান্ডেল এনে ভোরকে মারতে থাকে! ভোর রেগে চায়। জুতোটা রুম্পার হাত থেকে ছিনিয়ে তাঁর দিকে তাক করে চোখ রাঙিয়ে বলে,
-” দুষ্টু মেয়ে! একটা মারবো!”
রুম্পা ঠোঁট উল্টিয়ে কেঁদে দেয়। যেন সত্যিই ভোর মেরেছে! ভোর খানিক ঘাবড়ে আশেপাশে চায়! কেউ নেই তবে সামনে চাইতেই লতাকে দেখে ভোর উঠে দাঁড়ালো! রুম্পাও পেছনে চায়। মা’কে দেখে দৌড়ে গিয়ে নালিশ জানায় ‘ভোল মাববো’! ভোর চোখ বড় করে রুম্পার দিকে চায়। কি বিচ্ছু! তাকেই মারলো আবার নালিশ করে যে, ভোল মাববো! পঁচা মেয়ে! লতা মেয়েকে কোলে নিয়ে ভোরের দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
-” মারছো কেন ওকে?”
ভোর ভ্রু কুঁচকে বলে,
-” আমি মারি নি ওকে। ওই মারছিলো আমাকে এই জুতা দিয়ে!”
-” কিন্তু জুতো তো তোমার হাতে?”
ভোর বা হাতে থাকা জুতোর দিকে চায়! সাথে সাথেই ফেলে দেয়। ইয়ু! কি নোংরা! সে নাক মুখ কুঁচকে বলে,
-” আমি ওর থেকে কেড়ে নিয়েছি!”
লতা ভোরের আপাদমস্তক দেখে নিয়ে আঙুল উঁচিয়ে বলে,
-“তোমার হাবভাব ভালো না! সেদিনের পাতার কথা মাথায় গেঁথে নিয়েছো নাকি? আমি কিন্তু তোমার মতো বিচ্ছু ছেলেকে মেয়ের জামাই কক্ষনো বানাবো না। এই তুমি আমার মেয়ের থেকে দূরে থাকবে বলে দিলাম!”
শেষের কথাটা একটু জোড়েই বলে। ভোর লজ্জা পায় সাথে রাগও হয়! ওই পঁচা দুষ্টু মেয়েকে বিয়ে করতে ভোরের বয়েই গেছে। ভোর রুম্পার দিকে চায়। নাক দিয়ে সর্দি পড়ছে সেই সর্দি মুখে যাচ্ছে! ইয়ু! নোংরা মেয়ে। সে মুখ ফিরিয়ে দরজার দিকেই চাইতেই চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়! আব্বু? এতো জলদি? ভোর বিস্ময়ে দৌড়ে যেতেও ভূলে যায়! অরুণ থমথমে মুখে ভেতরে প্রবেশ করে। লতা ও ভোরের কিছু কিছু কথা কানে এসেছে তাঁর! কি করেছে ভোর? এভাবে বকছে কেন? তাঁর ছেলেকে কেউ বকুক তাঁর পছন্দ নয়। সেটা যেই হোক! সে এগিয়ে এসে ভোরকে কোলে তুলে নিয়ে চুমু দেয় কপালে। ভোর হেসে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে। রুম্পা লতার কোল থেকে হাত বাড়িয়ে ‘আনকেল আনকেল’ ডাকে। লতা মেয়ের নাক মুখ মুছে নামিয়ে দেয়।
-” আসসালামুয়ালাইকুম! কেমন আছেন আপু?”
লতা ড্যাবড্যাব করে চায় অরুণের দিকে। সে কি ঠিক শুনলো? অরুণ ভোরকে নিয়ে চলে যেতে যেতে বলে,
-” সালাম দিলে, ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করলে তাঁর উত্তর দিতে হয়। এটুকু ম্যানার্স শেখায় নি আপনার ছোট বোন পাতা?”
ছোট রুম্পা দৌড়ে অরুণের হাত ধরে হাসতে হাসতে চলে যায়। লতা আহাম্মকের ন্যায় দাঁড়িয়ে! ভূতের মুখে রাম নাম?
_______
অরুণ রুম্পাকে সহ পাতার রুমে প্রবেশ করে। সে পথেই ছিলো। সরকার বাড়ি থেকে সরাসরি এই বাড়ির উদ্দেশ্যেই রওনা দেয়। তাঁর মনটা বিক্ষিপ্ত ছিলো। প্রশান্তির হাওয়া দরকার! আর তাছাড়াও প্রাণভোমরা গুলো থেকে দূরে থাকতে তাঁরও ভালো লাগে না। এই সবটার জন্য পাতাবাহার দায়ী। মেয়েটা তাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাচ্ছে! ভাবা যায় অরুণ সরকারকে নাকানিচুবানি খাইয়ে আধমরা বানিয়েছে! অরুণ সরকার প্রতিটা মুহুর্ত তরপায় যেমনটা কাঁচা ঘায়ে লঙ্কা গুঁড়ো ছিটালে মানুষ তরপায়! তফাৎটা এই, তাঁরা গলা ফাটিয়ে কাঁদতে পারে আর অরুণ সরকার পারে না। তবে সেও ছটফট করে। শীতকালীন এই দীর্ঘ রজনী একা একা কাটাতে হয়। কখনো ঘুমে তো কখনো নির্ঘুমে! স্বপ্ন রাজ্যে চড়ুইয়ের খুনসুটিতে মেতে থেকে সুবাহে সাদিকে পুরো বাড়ি খুঁজেও পাওয়া যায় না চড়ুই; তখন অরুণ সরকার ভেতর থেকে মূর্ছা যায়। রাতের অন্ধকারে যখন একাকিত্ব কুড়ে কুড়ে খায় তখন ভাবে হোক সকাল! চক্ষু লজ্জা গুল্লি মেরে শশুর বাড়ি চলে যাবে। কিন্তু দিনের আলোয় পারে না অরুণ সরকার। কবে যে সব স্বাভাবিক হবে। তাঁর মেয়েটা আসুক! মেয়েই সব ঠিক করে দেবে। তাতেও ঠিক না হলে! কষিয়ে এক থাপ্পড় দিয়ে কাঁধে তুলে নিয়ে যাবে। অরুণ রুমে প্রবেশ করে একটু অবাক হয়। গোধূলি লগ্ন, দূর হতে মাগরিবের আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। আর এই অবেলায় মেয়েটা কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে! শরীর ঠিক আছে তো? কাঁদছে কি? অরুণ রুম্পার হাত ছেড়ে ভোরকে নামিয়ে দিলো! বিছানায় বসে পাতার গা থেকে কম্বল সরিয়ে ডাকে,
-” এই পাতাবাহার? কি হয়েছে? অবেলায় শুয়ে আছো কেন? শরীর খারাপ লাগছে? দেখি এদিকে ফেরো?”
অরুণের উদ্বেগতা ভরাট কন্ঠস্বর কর্নগোচর হতেই পাতা চমকপ্রদ হয়ে এদিকে ফেরে। ক্লান্ত লাগছিলো কেমন যেন। চোখে ঘুম ঠেলে দিচ্ছিলো যেন। তাই গা এলিয়ে দিয়েছিলো! আচ্ছা সে কতক্ষন ঘুমিয়ে ছিলো? লোকটা এসেও গেলো! পাতা হা করে চেয়ে থাকে! অরুণ পাতাকে তুলে বসিয়ে দিলো। পাতার আপাদমস্তক দেখতে হয় না। শুকনো ফ্যাকাশে মুখটা দেখে অরুণ শান্ত হয়ে যায়! কি হাল করেছে নিজের! উসকোখুসকো চুল। চকচক করা চোখ জোড়ায় মলিনতা! ত্বকটা কেমন খসখসে!গলার নিচের ক্ল্যাভিকল দেখা যায়! অরুণ তাঁর থুতনি ধরে বলে,
-” মহারানীর সারা অঙ্গে এতো অযত্নের ছাপ! এতো মানুষের ভিড়ে? আয়নায় দেখেছো নিজেকে? এতো আমার পাতাবাহার নয়!”
পাতা মুখে বিরক্তের রেশ ফুটে তোলে। থুতনিতে রাখা অরুণের হাতটা ঝটকায় সরিয়ে দেয়। সাত দিন হয়ে গেলো নাক উঁচু লোকের খবর নেই এখন এসেছে সারা অঙ্গে অযত্নের ছাপ খুঁজতে! অরুণের রাগ হয়। সে বিছানা থেকে উঠে গমগমে গলায় আদেশ বানি শোনায়,
-” উই আর রিটার্নিং হোম আর্লি টুমোরো মর্নিং। আই উইল নট লিসেন টু অ্যানিওন । ইফ নেসেসারি আই উইল ইউস ফোর্স!”
পাতা ঠোঁট উল্টিয়ে ভেংগে বলে,
-‘ আই উইল ইউস ফোলস! ভোর তাকে বলে দাও কোথাও যাচ্ছি না! আমাকে জোর করলে আমি আমি… কি করবো নিজেও জানি না!”
-” সে দেখা যাবে। গুলুমুলু বউ যত্নের অভাবে হাড্ডিসার হয়ে গেছে! হাসপাতালের চক্কর পর্যন্ত লাগিয়েছে আমাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করে নি! আর আমি অরুণ সরকার চুপ করে বসে থাকবো?”
ভোরকে সুধায় অরুণ! ভোর পিটপিট করে চায়। আব্বু আম্মু তাকে জিজ্ঞেস করছে কেন? সে কার পক্ষে কথা বলবে এবার? রুম্পা আগেই কেটে পড়েছে অরুণের গম্ভীর গলার আওয়াজ শুনে! তাদের কথোপকথনের মাঝেই লতা আসে ধুপধাপ পা ফেলে। পাতার সব রিপোর্ট বিছানায় রেখে বলে,
-” আপনার অতি আদরের গুলুমুলু বউটা যত্নের অভাবে হাড্ডিসার হয়ে যায় নি। তাঁর ডেলিভারীর সময় ঘনিয়ে এসেছে। যেকোনো সময় তার আগমন হতে পারে। তাই উইক হয়ে পড়ছে; ইটস্ নরমাল। বাচ্চা, বাচ্চার মা দুজনেই সুস্থ আছে আল্লাহর রহমতে। তবে সাবধানে থাকতে হবে।”
অরুণ বিশ্বাস করে না তাঁর কথা। সে রিপোর্ট হাতে নিয়ে বোঝার চেষ্টা করে। পুরোটা না বুঝলেও টুকটাক পড়ে কিছুটা শান্ত হয়। তবে সে আর রাখবে না। যতই পাতা জেদ করুক। কালকেই চলে যাবে। লতা পাতাকে উঠতে বলে নামাজের জন্য। অরুণ তাকে ধরে নিয়ে ওয়াশ রুমে যায়। পাতাকে অযু করিয়ে দিয়ে নিজেও অযু করে নেয়।
চলবে….