পাতা বাহার পর্ব-৬১ এবং শেষ পর্ব

0
741

#পাতা_বাহার
লেখনীতে: #বেলা_শেখ
#পর্ব- ৬১ ( শেষ পর্ব)

(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)

নতুন ভোরের সূচনা। পুব দিগন্তে লালিমা ছড়িয়ে ঝলমলিয়ে উঁকি দিয়েছে অরুণ! তাঁর তেজে ধরনী যেন নতুন রঙে সেজেছে। সকাল সকাল পাতা ব্যস্ত সময় পার করছে। শুধু সে নয় সকলেই। মিনু রুটি বেলছে তো সুফিয়া পরোটা! রুবি ভাজি ও ডাল রান্না চড়িয়েছে। পাতা অমলেট বানিয়ে ব্রেড ভেজে নিচ্ছে। একেক জনের একেক আবদার। বড়দের বোঝানো গেলেও বাচ্চাদের বোঝানো মুশকিল। একজন অমলেট খাবে তো আরেকজন সুজির হালুয়া তো একজন স্যান্ডউইচ! নবাবের বংশধররা যা বলবে তাই! একটু এদিক সেদিক হলে মনে করো সাইক্লোন বয়ে যাবে। এরই মাঝে আরেক নবাব দূর হতে উঁচু গলায় আবদার করে চায়ের জন্য। পাতা যেন কুলকিনারা পায় না। রুবি তার কান্ডে হেসে বলে,

-” আরে বড় ভাবী রিল্যাক্স! হাইপার হচ্ছো কেন? আমি চা বসাচ্ছি!”

বলে রুবি ভাজির কড়াই নামিয়ে চা বসিয়ে দিল। পাতা অমলেট উল্টে দিয়ে বলে,

-” হাইপার হবো না আপু? এতো রান্না আমি তো চোখে সর্ষে ফুল দেখছি! এসবই হলো না আবার বাচ্চাদের টিফিন রেডি করো!”

সুফিয়া তার ব্যস্ততা দেখে মুখ মুচড়িয়ে বলে,

-” এমন ভাবে কইতাছেন মনে হয় আপনেই সব কাম কইরা উইল্টা ফালাই দিবেন।আর আমরা সবাই ঠ্যাং তুইল্যা বউসা থাহুম! অথচ সিন উল্টা আপনি পারেন খালি হম্বিতম্বি করবার। কাজের কাজ কিছুই পারেন না!”

পাতা শাণিত নজরে চায়। সুফিয়ার দিকে খুন্তি তাক করে রাগে গজ গজ করতে করতে বলে,

-” আমাতে তোমার সমস্যাটা কোথায়? সবসময় আমার পিছনে পড়ে থাকো! আমি তো কিছুই পারি না। তুমি কি করো? মিনু আপার উপর সব চাপিয়ে দিয়ে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াও না?”

সুফিয়া রুটি বেলতে বেলতে হাসিমুখে বলে,

-” সেটা মিনু আপাই ভালো জানেন! আর আপনেতে আমার অনেক সমস্যা বুঝলেন আপা! আপনের পারসোনাল বেডায় কথায় কথায় ধমকায় মোরে!”

পাতা এবার হেসে দিলো। খুন্তি তুলে নিয়ে বলে,

-” তুমি উল্টো পাল্টা কাজ করো কেন‌ তার সামনে?”

সুফিয়া এবার তেজি গলায় বলে,

-” আমি উল্টা পাল্টা কাজ করি? ওই বদমেজাজি লোকের সবেতে সমস্যা। কাল রাতে চা দিলাম সবেরে।‌ সবাই গিললো। হেই লোকে চা নিল না। নতুন করে হাত মুখ ধুইয়া চা বানাইয়া আনতে কয়! কেন? জিজ্ঞেস করলে ধমকায় কয় মুখে আটা লাইগা আছে। আরে বেডা আমি কি মুখ দিইয়া চা বানাইছি? রুটি বানাইতে ছিলাম তয় আটা ভরছিলো আমি কি হাত ধুই নাই?”

পাতা রুবি মিনু ঠোঁট চেপে হাসে। এসব আর নতুন কি!! সুফিয়া চুপ নেই শুরু হয়ে গেছে তাঁর ভাঙা রেডিও। অরুণ, আরিয়ানের ও ভোর সরকারের খুঁতখুঁতে স্বভাবে তার ঢের সমস্যা! সেটা নিয়েই প্রতিবেদন শুরু। রুবি চায়ের কেতলি কাপ চিনির বৈয়াম ট্রেতে ভরে পাতাকে বলে নিয়ে যেতে। পাতা তরিঘরি পা বাড়ায়। কিচেন থেকে বেরোতেই ছোট্ট ভাবনা কোথা থেকে ছুটে এসে মায়ের আঁচল টেনে বলে,

-” কিদে পেয়িচে! কেতে দাও?”

পাতা হাঁটতে হাঁটতে জবাব দেয়,

-” একটু সবুর করো মা আমার। দিবো তো! তোমার বাবা এসেছে?”

-” ভোলেল বাবা আসি নি। একুনি কিতে দাও?’

পাতার আঁচল টানতে টানতে বলে ভাবনা। পাতা ট্রে নিয়ে ড্রয়িং রুমের টেবিলের রাখে। আরিয়ান মুচকি হেসে নিজেই কেতলি হতে কাপে চা ঢেলে চিনি নিয়ে বলে,

-” অরুণিতা চা খাবে চাচ্চুর সাথে?”

ভাবনা মাথা নাড়লো।

-” চা কেলি কালু হয়ি যাবু!”

আরিয়ান হেসে তাঁর গাল‌ টিপে যেতে যেতে বলে,

-” চা খেলে কালো হয় কে বললো? চা মন ভালো করার ওষুধ! আমি যাই বাঁদর ছানা তুলতে! এখনো পড়ে পড়ে ঘুমুচ্ছেন!”

ভাবনা হা করে চাচ্চুর প্রস্থান দেখে। বাঁদর ছানা দেখার ইচ্ছে হয় তবে পেটে গুরগুর করে খিদেয়। সে কাঁদো কাঁদো গলায় মায়ের আগে পিছে ঘুর ঘুর করে আর ‘কেতি দাও’ জপতে শুরু করে। পাতা বিরক্ত হয়ে বলে,

-” দিচ্ছি রে বাবা!”

বলে কিচেনে চলে যায়। ভাবনা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে উঁকি দেয়। পাতা ব্যস্ত হয়ে পড়ে কিচেনে। ছোট ভাবনা গাল ফুলিয়ে ধপ ধপ পা ফেলে চলে যায়। পাতা ডাকে শোনে না। পাতা চোখ উল্টিয়ে বলে,

-” সব নবাবের ঘরের নবাব!”

রুবি হেসে ওঠে তাঁর কথায়। চুলায় তাআ বসিয়ে রুটি দেয়।পাতাও হাতে হাতে কাজ করে।

ছোট ভাবনা গাল ফুলিয়ে সোফায় থাকা তাঁর টেডি নেয়। হামাগুড়ি দিয়ে ডাইনিং টেবিলের নিচে শুয়ে থাকে। ভোর সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছিলো সবটা। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে চা নেয় কাপে। কিচেন থেকে বিস্কুটের বৈয়াম এনে ডাইনিং-এ বসে। চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে মুখে পুরে। ভাবনা শোয়া থাকুন উঠে বসে ভাইকে দেখে। ভাই তাকে দেখে নি? সে হেসে কুটিকুটি হয়ে ভোরের পায়ে চিমটি কেটে বলে,

-“আমি ভুত! পা খেয়ি ফিলবু!”

বলেই পায়ে টেনে ধরে হেসে উঠলো খিলখিলিয়ে। ভোর হাসে না। না নিচে উঁকি দেয়। সেভাবে বসেই পাটা আলগোছে টেনে নিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে স্বাভাবিক সুরে বলে,

-” আমি জানি তুমি ভাবনা! লুকিয়ে আছো কেন?”

ভাবনার হাস্যোজ্জ্বল মুখখানিতে অন্ধকার নামে। সে পুনরায় গাল ফুলিয়ে ভাইকে নালিশের সুরে বলে,

-” আমাল কিদে পেয়িচে! মা কিতে দিবু না। মা বুকে দিবা?”

ভোর এবার হাসে। একটা বিস্কুট ডাইনিং টেবিলের নিচে ভাবনার দিকে বাড়িয়ে বলে,

-” এটা খাও! পেট ভরে যাবে।”

ভাবনা হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখে। তাঁর মুখে রুচে না। অন্যকেউ হলে ছুঁড়ে ফেলে দিতো। তবে ভাই দিয়েছে তাই কামড় বসায় এক কোনায়; নইলে ভাই রেগে যাবে। ভোর সময় নিয়ে চা বিস্কুট শেষ করে কিচেনে যায়।

– ”আম্মু খিদে লেগেছে খেতে দাও জলদি”

পাতা ভোরের কথা শুনে দরজায় চায়। ভোর উঁকি দিয়ে মিষ্টি করে হেসে আবারো ডাকে,

-“ও আম্মু জলদি দাও!”

পাতা সময় নেয় না এবার‌। একটা প্লেটে দুটো পরোটা ও দুটো অমলেট দিলো। ভোর কিচেনে গিয়ে পাতার গালে টুপ করে চুমু দিয়ে ঝটপট প্লেট সমেত বেরিয়ে আসে। ভাবনা খুশি হয় ভাইকে খাবার আনতে দেখে। তবে আবার গাল ফুলিয়ে নেয়। সে চাইলো মা দিলো না! ভাইকে দিলো! ভোর প্লেট টেবিলে রেখে চেয়ারে বসে। টমেটো সস ঢেলে নেয় প্লেটে। গপাগপ মুখে পুরে খেতে থাকে। ভাবনা আশায় থাকে ভাই ডাকবে।সময় গড়ালেও ভোর ডাকে না বিধায় সে টেবিলের তল থেকে বেরিয়ে অনেক কষ্টে চেয়ারে উঠে বসে। মিষ্টি হেসে ডাকে,

-” ভাই দাও?”

ভোর বোনের দিকে চায় শান্ত ভাবে। পরে একটু অমলেট ছিঁড়ে তাঁর মুখে দেয়। ভাবনা হেসে গালে পুরে চিবোতে থাকে। ভোর মিষ্টি হেসে বলে,

-” দেখেছো আমি চাইলাম আম্মু খেতে দিলো তোমাকে দেয় নি কেন বলোতো?”

ভাবনা টেবিলের উপর উঠে বসে নিজেই পরোটা ছিঁড়ে গপাগপ গালে পুরে সুধায়,

-” কেনু? আম্মু পুঁচা! বাবা বলি দিবু!”

ভোর প্লেট সরিয়ে নেয় সাথে সাথেই। ভাবনা গাল ভর্তি খাবার নিয়ে কুটুর মুটুর চায়। গালটা ফুলে গেছে। ভোর আঙুলের ডগায় সস তুলে ভাবনার গালে মুখে মাখিয়ে দিয়ে বলে,

-” বাবা কে? হুম? আবার বলো? কে তোমার বাবা?”

ভাবনা গালের খাবার গিলে জিভ বের করে লেগে থাকা সস চেটে নিয়ে গোমড়া মুখে বলে,

-” আমাল না তুমাল বাবা। ভোলেল বাবা!”

ভোরের হাসি বিস্তার লাভ করে। প্লেট সামনে এনে নিজেই পরোটা ছিঁড়ে সসে মেখে বোনের মুখে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,

-” এই তো গুড গার্ল! আম্মুও তো ডাকে ভোরের বাবা তাই না? তাহলে তো সে ভোরের বাবা তোমার না! বাবা ডাকলে কিন্তু ভাই একটুও আদর করবে না।”

ভাবনা হেসে উপর নিচ মাথা নেড়ে খাবার খায়। ভোর হেসে তাঁর গালে চুমু দিয়ে বলল,

-” আম্মু আব্বু আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।”

ভাবনা মুখের আদল পরিবর্তন হয় নিমিষেই।

-” আমাল ভালুবাসে না?”

ভোর হেসে উঠলো শব্দ করে। বোনের গাল টেনে মিষ্টি উচ্ছ্বাসের সাথে বলে,

-” বাসে তো। তোমাকেও ভালোবাসে তবে ভোরের থেকে একটু কম কম।”

-” কম কম কেনু?”

ভোর তার মুখে অমলেট পুরে দিয়ে হাসতে হাসতে বলল,

-” কারণ ভাই তোমাকে বেশি বেশি ভালোবাসে!”

ভাবনাও ভাইয়ের সাথে হেসে ওঠে খিলখিলিয়ে। ভোর টেবিলে কনুই ঠেকিয়ে বোনের হাসি চেয়ে চেয়ে দেখে। ভাবনা এগিয়ে এসে ভাইয়ের গালে চুমু দেয়। ভোরের গালে সস লেগে গেলেও ভোর কিছু বলে না। হেসে বোনকে অল্প অল্প পরোটা ছিঁড়ে খাইয়ে দেয়। পাতা কিচেন থেকে উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখে একটু পর পর। মুখে তার ভুবন ভোলানো হাসির ছবি। এরই মাঝে অরুণ সরকারের আগমন ঘটে। ভোর তাকে আসতে দেখে মুখ ফিরিয়ে নিলো। অমলেটে সস বেশি করে ঢেলে সবটুকুই মুখে পুরে নিয়ে চিবোতে থাকে। ভাবনা পিটপিট করে চায়! তার জন্য রাখলো না? সে অবশিষ্ট পরোটা হাতে নিয়ে খেতে থাকে কুট কুট করে। ভাইকে দিবে না। অরুণ ড্রয়িংরুম পেরিয়ে ডাইনিং টেবিলে এগিয়ে আসে। ভোরের ফুলো গালে সশব্দে চুমু দিয়ে মেয়ের দিকে চেয়ে মুচকি হাসলো। ভোর হাত দিয়ে গাল মুছে। বিরক্ত মুখে খাবার চিবোতে থাকে। অরুণ ছেলের বিরক্তিকর মুখখানি দেখে হেসে চুলগুলো এলোমেলো করে দেয়।

-” আরে চুল গুলো ভালো ভাবে মুছো নি! এখনো পানি আছে! ঠান্ডা লেগে যাবে কলিজা!”

বাবার কথায় ভোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনা। কাল মারলো এখন এসেছে মিষ্টি কথা বলে গলাতে! সে মাথা থেকে বাবার হাত সরিয়ে দিয়ে আলগোছে উঠে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। পা বাড়িয়েই ভাবে ভুল করেছে। সে পিছু ফিরে এসে জগে পানি ঢেলে খেতে থাকে অল্প অল্প করে। অরুণ গ্লাসটা টেনে নেয়। ভোর ছোট ছোট করে চায়। অরুণ হেসে ভোরকে বসিয়ে দিয়ে ঠোঁটের কোনায় গ্লাস ধরে বলে,

-” বসে পানি খেতে হয় জানো না?”

ভোর গ্লাসে চুমুক দেয়। ছোট ভাবনা গাল ভর্তি পরোটা নিয়ে চেয়ে চেয়ে দেখে সব। ভাইকে পানি খেতে দেখে সেও পানি খাবে। অরুণ ভোরকে খাইয়ে তাঁর মুখে ধরলে চুক চুক করে পানি খায়। অরুণ খাওয়া শেষে তাঁর গাল টিপে দিয়ে বলে,

-” পরোটা খাচ্ছে চড়ুই? বাবাকে দাও একটু?”

বলেই হাত পাতে অরুণ। ভাবনা ঘার উঁচিয়ে চায় বাবার দিকে। হাতে থাকা অবশিষ্ট পরোটা সবটুকু মুখে ঠুসে নিয়ে হাত নাড়িয়ে বলে,

-” নাই নাই!”

অরুণ ভোঁতা মুখে চায়। ভোর হেসে ওঠে খিলখিলিয়ে। অরুণ তাঁর দিকে তাকালে ভোর হাসি থামিয়ে গটগট করে চলে যায়। অরুণ চেয়ারে বসে মেয়েকে কোলে বসিয়ে বলে,

-” আমার মা এতো কিপ্টুস কেন?”

ভাবনা মুখ এগিয়ে বাবার গালে মুখ লাগিয়ে চুমু দেয় গোটা কয়েক। মিষ্টি করে হেসে বলে,

-” ভোলেল বাবা আদুল খাও!”

অরুণ মেয়ের নাকে নাক ঘষে পেটে কাতুকুতু দেয়। ভাবনা তিড়িং বিড়িং করে হেসে দেয় হি হি করে।অরুণও হাসে শব্দহীন। বাবা মেয়ের খুনসুটিতে ডাইনিং প্লেস যেন জ্বল জ্বল করে। ক্ষণে ক্ষণে হাসির দ্যুতি ছড়ায়। তাদের সেই দ্যুতি নিভিয়ে দিতে ভোর শব্দ করে প্লেট রাখে টেবিলের ওপর। অরুণ ও ভাবনা ঘার ঘুরিয়ে পাশে তাকায়। ভোর ভাবনাকে টেনে নিজ কোলে নিয়ে চলে যায় হনহনিয়ে। অরুণ আড়চোখে ছেলের প্রস্থান দেখে। হিংসুটে ছেলে তাঁর!! প্লেটের দিকে চাইতেই দেখে তিনটে পরোটা অমলেট! অরুণ মুচকি হাসলো।
_____

ঘড়িতে সকাল সাড়ে দশটা! ঝলমলে রোদের তেজে আশেপাশ ঝলমল করছে। বসন্তের আগমনে কোকিল কুহু কুহু ডেকে চলেছে অনবরত। বসন্তের পবনের দোলায় দুলছে গাছ এলোমেলো।নতুন পল্লবে ছেয়ে আছে সারি বেঁধে লাগানো গাছ। কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে নৃত্য পরিবেশন করছে ফুলের দল! ভোর প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভাবলেশহীন। তাঁর বাজপাখির ন্যায় নজর ভাবনাতে নিবদ্ধ। তাদের অবস্থান ভোরের স্কুলের প্রিন্সিপাল রুমে। তাঁরা একা নয়। পাতাও এসেছে। সাথে ভোরকে ডিস্টার্ব করে সেই ছেলে তিনটা! তাদের মধ্যে একজন যাকে ভোর মেরেছিলো তাঁর বাবা মা উপস্থিত। ছেলের মা ক্রন্দনরত অথচ তেজী গলায় অনেক কথাই বলছে ছেলের নাকে সাদা ব্যান্ডেজ দেখিয়ে। পাতা থমথমে মুখে বসে আড়চোখে ভোরের দিকে তাকাতে ভুলছে না। ভোরের তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই। সে বোনকে চোখে চোখে রাখছে। ছোট ভাবনা চুপ করে নেই। বুকশেলফ থেকে বই টেনে বের করে তো ফ্লাওয়ার ভেসে রাখা কৃত্রিম ফুল টেনে বের করে। বাজে ছেলে তিনটা মিটমিট করে হাসে তাঁর দিকে তাকিয়ে সেদিকে খেয়ালই নেই। একবার তো ঝুঁটি টেনেছে। ভোরের হাত নিশপিশ করে। আরেকবার তাঁর বোনকে ধরার চেষ্টা করুক হাত ভেঙে দেবে সে। ভাবনা একটা লাল ফুল এনে ভাইকে দিয়ে মিষ্টি করে হাসলো। ভোর সুযোগ বুঝে কোলে তুলে নেয়। আর নামাবে না। সে এবার আম্মুর দিকে তাকিয়ে মনোযোগী হয় বিচার সভায়। শুনতে পায় মহিলাটি বলছে,

-” মেরে হাসপাতালে পাঠিয়েছে।‌ বাচ্চাটা আমার সারারাত ভর ছটফট করেছে যন্ত্রণায়। এখন আপনিই বিচার করুণ ম্যাম! আশাকরি পক্ষ টেনে কথা বলবেন না। আপনাকে সৎ ন্যায়নিষ্ঠ বান হিসেবেই জানি!”

পাতা মাথা নাড়লো। ভোরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধ জড়িয়ে বলে,

-” আমার ছেলে ক্লাস ফোরে পড়ে। আর আপনার ছেলে সিক্সে। তো ক্লাস ফোরের বাচ্চা সিক্সে পড়ুয়া তিনটে ছেলেকে বেধড়ক মারধর করেছে আর ওরা চুপ করে হজম করেছে? আমার ছেলের পুরো গা জুড়ে কালচে নীল জখম! আর আপনি বলছেন আপনার ছেলেরা দুধে ধোয়া তুলসী পাতা?”

মহিলাটা কিছু বলতে নিবে পাতা তাকে বলার সুযোগ দেয় না। প্রিন্সিপাল ম্যামের দিকে তাকিয়ে বলল,

-” ম্যাম আমি আপনাকে ও এই ছেলেগুলোর গার্ডিয়ানকে ইনফর্ম করেছিলাম এরা আমার ছেলেটাকে ডিস্টার্ব করে। বাজে নোংরা ভাষায় গালি দেয়। ওনারা যেন শাসন করে নিজ বাচ্চাদের। কিন্তু মনে হচ্ছে না ওনারা শাসন করেছেন! এতো শিক্ষা দিক্ষার কথা তুলছেন! দেখতেই পাচ্ছি কতটা শিক্ষা দিচ্ছেন বাচ্চাদের। এতোটা নোংরা তাদের ভাষা যা বলার মতো নয়। আপনি আবার বিচার চাইতে আসেন? বাচ্চারা ভুল করলে শাসন না করে ছেড়ে দিলে উচ্ছন্নে তো যাবেই! বিচার আমি চাইছি! ওইটুকু বাচ্চা বাবা মা তুলে গলি দিয়ে নোংরা কথা বলে এর কি জবাব দিহিতা দিবেন?”

শেষের কথাগুলো মহিলার দিকে তাকিয়ে খানিকটা চড়া গলায় বলে পাতা। ভোর গোল গোল করে চায় মায়ের দিকে! মাঝে মাঝে মমতাময়ী আম্মুর রৌদ্র রূপ দেখে ভোর অবাক হয়। ভোর ঠোঁট চেপে হাসে। সামনের ভদ্রমহিলা এবার আমতা আমতা করে। কথা বলার ভাষা খুঁজে পায় না। তবে ছেড়ে দেবার মানুষ নন বিধায় তিনি জোড় গলায় বলেন,

-” আপনি এমনি আজগুবি কথা বলবেন আর বিশ্বাস করবো? আমার ছেলেকে আমি চিনি না? তাঁর মতো শান্ত শিষ্টাচারে ভরপুর ছেলে দুটো খুঁজে পাবেন না আপনি!”

গর্বের সাথে বলেন তিনি। পাতা ভ্রু কুঁচকে চায়। ছেলের বাবা এ যাত্রায় গলা খাঁকারি দেয়। হয়তো এতোটা সত্য কথা হজম করতে কষ্ট হচ্ছে। প্রিন্সিপাল সাবিনা চৌধুরী চশমা খুলে মুচকি হেসে বলেন,

-” খুবই ভালো মিসেস রুকাইয়া! আপনার ছেলে খুব ভালো তবে বাড়িতে হয়তোবা! স্কুলে তাঁর রিপোর্ট সুবিধার না। এর আগেও রিপোর্ট এসেছে। এতটুকু ছেলেরা মেয়েদের টিজ করার চেষ্টা করে। স্কুলের বাইরে এক মোড়ে সিগারেট হাতেও দেখা গেছে একবার। আপনি জানেন না এসব? আমি কিন্তু অবগত করে ছিলাম!”

এবার ভদ্রমহিলার মুখ খানা ভোঁতা হয়ে যায়। সে মাথা নিচু করে নেয়। তাঁর স্বামী ছেলের গালে সপাটে চর বসায়। ভাবনা তা দেখে হাত তালি দিয়ে আরো মারতে বলে। ভোর গোল গোল করে চেয়ে বোনের মুখ চেপে ধরে। প্রিন্সিপাল ম্যাম বুঝিয়ে বলে তাঁর গার্ডিয়ানকে; সাথে ঠান্ডা গলায় হুমকি দেয় এরকম আর করলে স্কুল থেকে বরখাস্ত করে দেবেন। আর ভোরকেও শক্ত গলায় বকে মারামারি করার জন্য। বাজে কথা বলেছে টিচারের কাছে জানাতো মারামারি করে সেও অপরাধ করেছে।পাতা তাকে ইশারা করলে ভোর মাথা নিচু করে মিনমিনে গলায় ‘স্যরি’ বলে। প্রিন্সিপাল ম্যাম ভদ্র সুলভ হেসে সবার উদ্দেশ্যে উপদেশ বানী শুনিয়ে বিচার সভা সমাপ্ত করে। পাতা ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে শান্তগলায় বলে,

-” বাচ্চাকে শাসন করবেন। শাসন মানে এই না মেরে ধরে বুঝাবেন। মাথায় হাত দিয়ে ভালোভাবে বুঝিয়ে ভালোমন্দ ধরিয়ে দিন। এখনো সময় আছে লাগাম টানুন নইলে পস্তাবেন আপনারাই। বাচ্চাদের ভালোবাসবো মানে এই না তাঁদের অন্যায়কে অদেখা করবো। ভালো থাকবেন আমার ছেলেটার উপর রেগে থাকবেন না অনুরোধ!”

ভদ্রমহিলা মাথা নেড়ে মলিন মুখে চলে যায়। তাঁর পেছনে পেছনে বাকি সকলে চলে যায়। পাতাও ভোরকে নিয়ে বিদায় হবে সাবিনা চৌধুরী ভোরকে যেতে বলে পাতার সাথে কিছু কথা বলবেন তিনি। ভোর মাথা কাত করে সায় জানিয়ে বোনকে নিয়ে চলে যায়। সাবিনা পাতাকে বসতে বলে। পাতা ভদ্রসুলভ হেসে বসে বলে,

-” কিছু বলবেন খালা মুনি?”

সাবিনা চৌধুরী হাসেন। জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে ঢক ঢক করে পান করে বলতে শুরু করেন,

-” আমার কথায় কিছু মনে করো না পাতা। বাট আই থিংক তোমাদের ভোরের উপর একটু বেশি যত্নবান হওয়া দরকার। মেয়ে তোমার মাশাআল্লাহ বড়ই হয়েছে। কিছু মনে করবে না বলে দিলাম , তোমার মনে হয় না মেয়ে আসার পর ভোরের প্রতি মনোযোগ টা এদিক সেদিক হয়?”

পাতা শান্ত চোখে চেয়ে সাবিনা চৌধুরীর দিকে। প্রশ্নটা মনে হলো পাতার ভিতরটা নাড়িয়ে দিলো। পদার্থের ভিতরে কম্পমান কণার ন্যায় পাতার ভিতরেও কিছু কম্পিত হয়! ভোরের প্রতি কি সে কখনো উদাসীন হয়েছে? কই পাতা স্মৃতি বিজড়িত দিন গুলো খুঁজে খুঁজে দেখতে পারে না! সে কি বলবে ভেবে পায় না।অতিবাহিত দিন গুলো প্রতিটা ক্ষণে পাতা উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করে। এরই মাঝে সাবিনা চৌধুরী আবার বলে,

-” ভোর কিন্তু অনেকটাই ওয়েট হারিয়েছে! আগে স্বাস্থ্য মাশাআল্লাহ ভালো ছিলো এখন? পাঠকাঠি। পড়াশোনায়ও উন্নতির বদৌলতে অবনতি। আগের সেই হাসিখুশিটা চঞ্চল ভাবটাও নেই কিন্তু!”

আবেগী পাতার চোখজোড়া আবেগে টইটুম্বর হয়ে যায়। পাতা হেসে আঙুলের ডগায় মুছে নিয়ে বলে,

-” জবাবদিহি চাইছেন? আপনাকে কেন দেবো? ভোরের বাবা আঙ্গুল তুলুক ভেবে দেখবো। আসছি ভালো থাকবেন ম্যাম!”

বলেই পাতা হনহনিয়ে বের হয়ে যায়। সাবিনা চৌধুরী তাঁর প্রস্থান দেখে ভ্রু কুঁচকানো মুখে। পাতা রুম থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক তাকায় ছেলে মেয়ের খোঁজে। দেখতে পায় না। পিয়নকে জিজ্ঞেস করলে জানায় কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে আছে। পাতার এককালে শিক্ষিকা ছিলো স্কুলের; সেই হিসেবে স্কুলের আঙিনা চেনা যদিও কিছু কিছু পরিবর্তন এসেছে। পাতা সেদিকে অগ্রসর হবে সৈয়দ পিছু ডাকে। পাতা মুচকি হেসে তাঁর সাথে কুশলাদি জিজ্ঞেস করে টুকটাক কথা বলে বিদায় নিয়ে কৃষ্ণচূড়া গাছের কাছে যায়। সবুজে ঘেরা পাতার ডালে ডালে থোকা থোকা রক্তিম কৃষ্ণচূড়া যেন নিজ সৌন্দর্যের গড়িমায় মেতে। পাতার ইচ্ছে করে তাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে যে, ফুল তো তাঁর বাগিচায় ফুটেছে! কৃষ্ণচূড়ার নিচে বসা তাঁর ছেলে মেয়ের মিষ্টি মুখের মধুর হাসির কাছে ওই কৃষ্ণচূড়ার সব সৌন্দর্য ফিকে যেন! পাতা ‘মাশাআল্লাহ’ আওড়িয়ে এগিয়ে যায়।

ভোর ভাবনা কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়ার নিচে ঘাসের উপর বসে আছে। শুধু বসে নেই দুজনেই হাসছে প্রাণখোলা সেই হাসি। দু’জন ফিসফিসিয়ে কিছু বলেই হাসিতে ফেটে পড়ে। পাতাকে দেখে দু’জনে হাসি থামিয়ে দেয়। ভাবনা দাঁড়িয়ে ভাইয়ের কানে কানে ফিসফিস করে কিছু বলে। তাঁর অস্পষ্ট কথা না পাতা বুঝতে পারে না ভোর তবে দু’জনেই হেসে দিল। ভাবনা হিহি করে হাসতে হাসতে ঘাসের উপর গা ছেড়ে দেয়। ভোর আগলে নেয় বোনকে। পাতাও বসে পড়ে ভোরের পাশে। ভোর তাঁর বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে বলে,

-” ও আম্মু মন খারাপ তোমার? আমি আর মারামারি করবো না। তবে কেউ ভোরের সাথে লড়তে এলে ছাড়বো না।”

পাতা মলিন হাসে। ভোরের মাথায় হাত রেখে বলে,

-” চলবে তো নিজ মন মর্জি! আমার কথা এ কান দিয়ে শুনে ও কান দিয়ে বের করে দিবে । তাই কিছু বলবোও না। পরের বার পড়াশোনা, মারামারি, খেলাধুলা নিয়ে কোনো অভিযোগ এলে আমি যেদিকে চোখ যায় চলে যাবো বলে দিলাম!”

ভোর সোজা হয়। ভাবনাকে পাতার কোলে বসিয়ে দিয়ে তাঁর শাড়ির আঁচল নিজ হাতে বেঁধে নিয়ে গোমড়া মুখে বলে,

-” কোথাও যেতে দেবো না। বেঁধে রাখবো এভাবে! ভোরের আম্মু সবসময় তাঁর সাথে থাকবে একদম ছায়ার মতো!”

পাতার কাজলে আঁকানো চোখ পুনরায় ভরে ওঠে আবেগে। ভোর চেয়ে থাকে তাঁর দিকে পলকহীন! আম্মুর চোখে জল দেখে ভোরের আঁখি যুগলও ভরে ওঠে। সে নাক টেনে হাতে বাঁধা আঁচলে চোখ মুছে নিয়ে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলে,

-” আচ্ছা হয়েছে ভোর কখনোই দুষ্টুমি করবে না। গুড বয় হয়ে যাবে। তুমি কেঁদো না তো! ভাবনা কেঁদে দিবে কিন্তু। আম্মু!”

গলা তাঁর কম্পমান। হাত বাড়িয়ে আঁচল দিয়ে মায়ের গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অপছন্দের বস্তু মুছে দিলো। পাতা হাসে মন থেকে। হাত বাড়িয়ে ভোরের গাল চেপে ধরে আলতোভাবে। ভোর একগাল হেসেই ঝরঝরিয়ে কেঁদে দেয় শব্দ করে। পাতা তাঁর কান্নায় হেসে দিল। এই তো তাঁর ছোট্ট ভোর! সেই কিউট আদুরে রসগোল্লা! ভাবনা এতক্ষণ গোলগোল চোখে সব দেখছিলো।আম্মুর কান্নায় তার ঠোঁট ভেঙ্গে এলেও ভাইয়ের কান্নায় তা বাঁধ ভেঙে পড়ে। ভাইয়ের গাল থেকে মায়ের হাত সরিয়ে ভোরের গলা জড়িয়ে কাঁদতে থাকে। পাতা তড়িঘড়ি দু’জনকে বুকে টেনে নিয়ে বলে,

-” আরে বাবা কাঁদে না। হয়েছে থামো। সবাই দেখলে কি ভাববে? ইশ্ ভোর কাঁদে না। তোমাদের বাবা দেখলে বলবে ছিঁচকাদুনে একেকটা! দেখি দেখি চাঁদ মুখ দু’টো?”

ভোর হাত থেকে আঁচল খুলে উঠে দাঁড়ালো। স্বল্প দূরে থাকা টিউবওয়েল চেপে মুখ ধুয়ে নেয়। পাতাও মেয়েকে নিয়ে এগিয়ে আসে। ভাবনা মায়ের কোল ঘেঁষে নেমে পড়ে। ভোর মুখ ধুয়ে মায়ের আঁচলে মুখ মুছে বলে,

-” বাড়ি চলো! ড্রাইভার আঙ্কেল আছে?”

পাতা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,

-” বাড়ি চলো মানে? ক্লাস চলছে তোমার! ক্লাসে যাও?”

ভোর মাথা চুলকায়। আমতা আমতা করে বলে,

-”আজ তো আমি স্কুল ড্রেস পড়ে আসি নি। স্কুল ব্যাগও নেই ক্লাস কিভাবে করবো? আজ থাক না?”

পাতা তাঁর কান টেনে ধরে আলতো ভাবে। ভোর হেসে দেয় মিষ্টি করে। পাতা গলে না।

-” শুধু ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার বাহানা। ব্যাগ স্কুল ড্রেস ছাড়াও ক্লাস করা যায়। চুপচাপ ক্লাসে যাও ভোর?”

ভোর নিজ কান ছাড়িয়ে বলে,

-” আজ থাক না আম্মু? চলো আমরা ঘুরতে যাই? কোথায় যাওয়া যায় বলো তো?”

পাতা চোখ রাঙিয়ে চায়। ভোর দাঁত বের করে হেসে দেয়। পাতা কিছু বলবে ভোর থামিয়ে বলে,

-” আমি ক্লাস করবো না আজ। প্লিজ তুমি জোর করবে না আম্মু! ভাবনা কোথায় গেলো?”

বলেই ভাবনাকে ডাকে। পাতা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এ ছেলের পড়ার প্রতি এতো অনীহা কেন? এরই মাঝে ভাবনা ছুটে আসে।একা না, হাতে একটা বড় মাংসল ব্যাঙ। পরনের সাদা ফ্রক কাঁদায় মেখে আছে। ভাবনা হেসে ব্যাঙ দেখিয়ে বলে,

-” দেকু চুন্দল না?”

পাতা তাঁর হাত থেকে ব্যাঙ নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে। ব্যাঙটা লাফাতে লাফাতে চলে যায়। এই টুকুন মেয়ের কি সাহস ব্যাঙ ধরে এনেছে। ছোট ভাবনা ব্যাঙের যাওয়া দেখে রাগে হাত পা ছুঁড়তে থাকে। তার ওটা চাইই চাই। ভোর নিমিষেই তাঁর গালে চর বসিয়ে ধমকে বলে,

-” পঁচা মেয়ে! নোংরা ব্যাঙ ধরে এনেছে! ছিঃ কি অবস্থা করেছে নিজের! ফ্রকে নোংরা হাতে নোংরা তোমাকে কোলেই নেব না।”

ভাবনা গালে হাত দিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।গালেও ময়লা লেগে যায়। ঠোঁট ভেঙ্গে আসতে চায়। পাতা মেয়েকে টেনে টিওবয়েলের কাছে নিয়ে ফ্রকটা খুলে দেয়। দুই হাত ও মুখটা ধুয়ে দিলো। ভোরের নাকটা সিঁকায় এখনো তাই পাতা টিওবয়েলের পাশে ওয়াশ রুমে নিয়ে সাবান দিয়ে মুখ হাত ধুয়ে দিয়ে আঁচলে মুছে দিলো। ভাবনা ছলছল চোখে গাল ফুলিয়ে নিয়েছে। ভাই আবার মারলো তাকে? পাতা এগিয়ে আসতেই ভোর ভাবনাকে কোলে নিয়ে যে গালে মেরেছিলো সেখানে আদর করে।ভাবনা প্রতিক্রিয়া দেখায় না। এখনো সেভাবেই মায়ের দিকে চেয়ে আছে। ভোর আবার গালে চুমু দিয়ে বলে,

-” ভাবনা বুড়ি রেগে আছে? দুষ্টুমি করলে তো ভাই মারবেই তাই না!”

ভাবনা মায়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। ভাইয়ের কাছে থাকবে না সে। পাতা মেয়েকে কোলে নিয়ে ভোরের উদ্দেশ্যে বলে,

-” মারবে তারপর আদর?”

-” নোংরা মেখেছে কেন? দুষ্টুমি করলে মার খাবেই তো!”

-” আমিও একটা মারি তাহলে?”

আড়চোখে ভোরের দিকে তাকিয়ে বলে পাতা। ভাবনা এবার কেঁদেই দিবে এমন ভাব।ভোর মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নেয় বোনকে। তারপর সেই চিরচেনা গলায় হুমকি,

-” আমার বোনকে কেউ বকবে না। মারা তো দূরের কথা!”

পাতা ভোরের গাল টেনে দেয় শক্ত করে। নিজে মারবে সেটা কিছু না অন্য কেউ ছুঁতেও পারবে না! এ কেমন ভালোবাসা বোনের প্রতি? তাঁরা মাঠ পেরিয়ে স্কুল প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে আসে। ড্রাইভার রোডেই ছিলো তাঁরা গাড়িতে উঠলে চলতে থাকে গন্তব্য হীন গাড়ি! ছোট ভাবনার অভিমান গলতে সময় নেয় না। ভাইয়ের আদর ও দু’টো মিষ্টি মিষ্টি কথাই যথেষ্ট তাঁর অভিমানের পাহাড় ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে।কখনো কখনো থামে গন্তব্য হীন গাড়ি! ফুচকা স্টলে পাতার মুখ টক মিষ্টি ঝালে স্বাদবদল করে! কখনো আইসক্রিম স্টলে ভাবনা ভোরের আইসক্রিম খাওয়ার বায়না মেটানো। হাওয়াই মিঠাইয়ের জন্য ভাবনার বায়না। রেস্টুরেন্টে পেটপুরে মাটন বিরিয়ানি খেয়ে তাঁরা শপিং মলে যায়। পাতা নিজের ও বাচ্চাদের জন্য টুকটাক শপিং করে গাড়িতে বসলে ভোর ড্রাইভারকে বলে,

-” আঙ্কেল আব্বুর অফিসে নিয়ে যাবেন।”

পাতা ভোরের দিকে চায়। ভোর সাথে সাথে নজর ঘুরিয়ে বলে,

-” কি হয়েছে? ওভাবে তাকিয়ে আছো কেন?”

পাতা ঠোঁট চেপে হেঁসে বলে,

-” কে যেন তাঁর বাবার উপর অভিমান করে বসেছিলো! কথাই বলে নি। এখন নিশ্চয়ই তাঁর মনটা আনচান করছে বাবার সাথে কথা বলার জন্য!”

ভোর লজ্জায় জানালার বাইরের ব্যস্ততম শহরে নজর লুকায়। বাবা যে তাঁর রন্ধ্রে রন্ধ্রে বহমান। বাবা ছাড়া এক মুহুর্ত ভাবতে পারে না। আর সে জানে বাবার কলিজা সে। বাবার সাথে কথা বলে নি বাবা নিশ্চয়ই কষ্ট পেয়েছে! ভোরের বাবা কষ্ট পেলে ভোরের কষ্ট হবে না? পাতা আর লজ্জায় ফেলে না। সকালে অভিমানের ঠেলায় বাবাকে অবহেলা করলেও এখন হয়তো মন কাঁদছে ছেলের। বাবা পাগল কি না! ভাবনা হঠাৎ হাত তালি দিয়ে আনন্দের সাথে বলে,

-” ভোলেল বাবা যাবো! ইয়ে কি মুজা! ইয়ে!”
______

কেবিনে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে অরুণ সরকার। কাজে নয় বন্ধুর সাথে। এককালে একসাথে এতো এতো ঘন্টা অতিবাহিত করা বন্ধুদের সাথে এখন মাস অন্তরও দেখা হয় না। অনেক সময় তা বছরও গড়িয়ে যায়। দুরত্ব কমে গেলে বন্ধুত্ব ফিকে পড়লেও স্মৃতির পাতা গুলো ভোলা দায়। স্কুল জীবন মানুষের স্মৃতির সোনালী পাতায় খচিত হয়ে থাকে। আর স্কুল জীবনের বন্ধুত্বের কথা বলার ভাষা রাখে? অরুণ সরকারের জীবনে বন্ধু গুলো একেকটা খাঁটি সোনা! সবসময়ই তাঁর পাশে ছিলো! সুখে দুঃখে! শুভর সাথে চায়ের আড্ডায় মেতেছে অরুণ। হাবিজাবি কথায় অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁদের সময় জ্ঞান নেই। না তাড়াহুড়ো। আড্ডার ফাঁকে শুভ বন্ধুর কাঁধ মিলিয়ে সিরিয়াস গলায় জিজ্ঞেস করে,

-” কেমন চলছে জীবন? সব ঠিকঠাক?”

-” আলহামদুলিল্লাহ!”

মুচকি হেসে জবাব দেয় অরুণ সরকার। তাঁর মুখের হাসিই বোঝায় তাঁর সুখের পরিসীমা। শুভ বন্ধুর হাসিমুখ দেখে; এই হাসিতে নেই কোনো লুকনো সুর! এতো খোলা পাতা!

-” তোর কলিজার কি খবর? অরুণিতাকে নিয়ে জেলাসনেস?”

অরুণ সোফায় গা এলিয়ে টেবিলে পা তুলে দেয়। হামি তুলে বলে,

-” কোনটা রেখে কোনটা বলি বল? নবাব পুত্তুর কিছু হলেই বাপের মতো সাইলেন্ট মুডে যাবে। রাগ তাঁর রগে রগে!”

-” বাপের রক্ত বইছে বুঝতে হবে না!”

শুভর কথায় শব্দ করে হেসে দেয় অরুণ।

-” আমি খুব ভয়ে ছিলাম ভাই! বাচ্চা আসায় ছেলেটা কেমন রিয়েক্ট করবে? পাতাবাহার বদলাতে শুরু করবে না তো? আমার কলিজা আমার দূরে চলে যাবে না তো? সেই পুরনো কাহিনীর পুনরাবৃত্তি হবে না তো? কিন্তু আমার সব ভয় কে পাতাবাহার ভেঙে দিয়েছে! সবটা সামলিয়ে নিয়েছে। মেয়েটা খুবই ভালো জানিস! ভালোবাসতে জানে প্রাণ ভরে। আমাকে কখনো মনে করিয়ে দিতে হয় নি যে ভোর সেন্সসিটিভ; অরুণিতার পাশাপাশি ভোরের দিকেও সর্বোচ্চ ধ্যান দিবে। সে তোয়ালে মোড়ানো ছোট অরুণিতাকে যতটা স্নেহের আঁচলে রেখেছে ভোরকেও ততটাই স্নেহের সাথে আগলে রেখেছে; হোক আমি উপস্থিত অথবা অনুপস্থিত! মেয়েটা ভালোবাসা নামক মায়ায় বেঁধেছে ভোরকে! আর আমার জেদি কলিজার কথা! তাঁর প্রতিটা প্রশ্বাস আমার অতি পরিচিত। আমিও এককালে পরিস্থিতি পার করে এসেছি! ছেলেকে বুঝতে সময় নিই নি; না উল্টো পাল্টা ভাবার। তবুও কখনো কখনো গাল ফুলায়! মাঝে মাঝে হিংসুটে ভাবটা দেখা যায়। তবে সে অরুণিতাকে ভালোবাসে, আদর যত্ন করে! আর মেয়েটাও ভাই বলতে পাগল! এভাবেই চলছে পাতাবাহারের সংসার!”

শুভ অরুণের পিঠ চাপড়ে বলে,

-” ভাগ্য করে বউটা পেয়েছিস! যে ভোরের সাথে এই গোমড়া মুখো ষাঁড় টাকেও সামলেছে। তোর এই মুখাবয়ব বলে দেয় তোর ভেতরের খবর! অনেক আলাপ হলো এখন উঠি হ্যাঁ? মেয়েকে স্কুল থেকে পিক করতে হবে!”

বলে শুভ উঠে পড়লো। অরুণ তাকে আরেকটু থাকতে বলে। তাঁর মনটা একটু অশান্ত! ছেলে কাল বিকেল থেকেই কথা বলছে না তাঁর সাথে। তাঁর কি বুকটা আনচান করবে না? ইশ্ থাপ্পড় দেয়া একদম উচিত হয় নি। ছেলে বড় হচ্ছে বিরূপ প্রভাব পড়ে যদি? সব তাঁর দোষ! নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারে না কেন! অরুণ ভাবে শুভর সাথে সেও বেরিয়ে পড়বে। এভাবে থাকা দায়!ছেলেটা স্কুলে নিশ্চয়ই! স্কুলে গিয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিবে স্যরি বলবে। ব্যস ছেলের অভিমান কর্পূরের মতো উবে যাবে। অরুণের ভাবনার মাঝেই রিনিঝিনি কন্ঠস্বর কানে পৌঁছায়! অরুণের বুঝতে সেকেন্ড সময়ও লাগে না এটা তাঁর ছোট্ট চড়ুইয়ের কলতান। অরুণ উঠে আধখোলা দরজার কাছে দাঁড়ায়। শুভ ভ্রু কুঁচকে চায়। অরুণ ইশারায় সামনে তাকাতে বলে। শুভর নজরে আসে ধূসর রঙের টি শার্টে আবৃত ভোর! যার কোলে ছোট্ট অরুণিতা। তাদের পেছনে পাতা ওরফে অরুণের পাতাবাহার! ভোর কেবিনে প্রবেশ করে শুভকে দেখে হাসিমুখে সালাম দেয় অথচ তাঁর উৎকণ্ঠ নজর বাবাকে খোঁজে। বাবার উপস্থিতি বুঝতে পেরে ঘার ফেরায়। ছোট্ট ভাবনা বাবাকে দেখে হেসে বলে,

-” ভোলেল বাবা টুকি?”

অরুণ নাক মুখ কুঁচকে নেয়। শুধু বাবা ডাকতে পারতো! তাঁর তৃষ্ণার্ত হৃদয় খানি জুড়িয়ে যেতো! অরুণ মেয়ের নাক টেনে বলে,

-” পুচা মেয়ে! তোমার সাথে আড়ি।”

ভাবনা ছোট ছোট আঁখি যুগল বড় বানিয়ে বাবাকে চোখ রাঙিয়ে বলে,

-” তুমি পুচা চেলে। তোমাল পিততি দিবু!”

অরুণ হেসে গাল বাড়িয়ে দেয়।

-” দাও পিততি?”

ভাবনা হাত তোলে চর দিবে। ভোর বোনের দিকে চায়। ব্যস ভাবনা আর সাহস করে না ভোরের বাবাকে মারার। সে হাত গুটিয়ে গাল ফুলিয়ে নেয়। ভোর বাবার দিকে বাড়িয়ে দেয় বোনকে। অরুণ কোলে তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করে,

-” স্কুল ছুটি হয়েছে? এতো জলদি? নাকি মিস দিয়েছো?”

ভোর ঘার ঘুরিয়ে আম্মুর দিকে চায়। পাতা কেবিনের বাইরে দরজার দিকটায় দাঁড়িয়ে ছিলো। অরুণের প্রশ্নে ও ছেলের চাহনি দেখে মুচকি হেসে ভিতরে ঢুকে বলে,

-” আমিই সাথে এনেছি।একদিন ক্লাস মিস দিলে কিছু হবে না!”

অরুণের বুঝতে বাকি থাকেনা পড়াচোর ছেলের কান্ড! তবে সে কিছুই বলে না। এমনিতেই রেগে বোম হয়ে আছে আবার কিছু বললে ব্লাস্ট হতে সময় নেবে না। পাতা শুভর সাথে কুশল বিনিময় করে। ভোর চুপচাপ পাতার পাশে বসে থাকে; আড়চোখে অবশ্য বাবাকে দেখতে ভুলে না। ভাবনাকে আদর করছে আর সে যে রেগে আছে তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই। ভোর মনে মনে ভেঙায়! শুভ ভাবনাকে কোলে নিতে চায় ভাবনা বাবার কাঁধে মুখ লুকিয়ে নেয়। যাবে না সে! অরুণ বললেও যায় না। শুভ হাল ছেড়ে দেয়। ভোরকে উদ্দেশ্য করে বলে,

-” এই আমাদের সেই দুষ্টু মিষ্টি ভোর?এতটা চুপচাপ আর ভদ্র ছেলে? হজম হচ্ছে না কিন্তু!”

ভোর লাজুক হেসে বলে,

-” দুষ্টুমি করলেও দোষ ভদ্র থাকলেও দোষ! ভোর এখন কোথায় যাবে আঙ্কেল?”

-” ভদ্র বাচ্চার মতো দুষ্টুমি করবে বুঝলে? শুনলাম স্কুলে মারামারি করেছো? এটা কিন্তু ঠিক না? তোমার বাবা যতই রেগে থাকুক কখনোই স্কুলে মারামারি করতো না!তবে হ্যাঁ স্কুলের বাইরে ফায়ার!”

হেসে বলে শুভ। অরুণ বন্ধুকে চোখে শাসায়। ভোর বাবার দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটলো। নিজে মারামারি করবে সেটা ঠিক আছে ভোর করলেই দোষ। শুভ আর দেড়ি করে না বিদায় নিয়ে চলে যায়। সে চলে যেতেই অরুণ মেয়েকে পাতার কোলে দিয়ে ভোরের পাশে বসে কাঁধ জড়িয়ে ধরে। ভোর মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়। অরুণ ছেলের গালে হাত দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বলে,

-” আব্বু টা এখনো রেগে আছে? দেখি আমার কলিজাটাকে? এই মানিক? আমি কিন্তু আদর করেই জিজ্ঞেস করেছিলাম। তুমি চুপ ছিলে। কতবার জিজ্ঞেস করেছি টু শব্দ করোনি। তাই রেগে গিয়েছিলাম। আবার আনিবুড়িকে ধাক্কা দিয়ে চিল্লিয়ে উঠলে। ওর কি দোষ ছিলো?”

ভোর বাবার দিকে ফিরে তবে চোখে চোখ রাখে না।অরুণ আদুরে গলায় ডাকে,

-” কলিজা বাবার দিকে তাকাও? বাবা স্যরি বলছে তো!”

ভোর তাকায় না। পাতা ভাবনাকে সোফায় বসিয়ে উঠে দাঁড়ালো। মাথার হিজাবের পিন ছুটাতে ছুটাতে বলে,

-” স্যরি বললেন আর হয়ে গেলো তাই না? মারবেন তারপর স্যরি। আপনার স্যরি আপনিই ভেজে খেয়ে ফেলুন নাক উঁচু ম্যানারলেস লোক!”

ভাবনা হি হি করে হেসে সোফায় লাফাতে লাফাতে হাত তালি দেয়। অরুণ ছেলের গালে ঠোঁট চেপে চুমু দিয়ে বলে,

-” তাহলে কি করতে হবে? কান ধরে স্যরি বলবো? নাকি উঠবস করতে হবে?”

বলেই কান ধরে একহাতে। ভোর মুচকি হাসে। বাবার কান থেকে হাত সরিয়ে বুকে মুখ লুকিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে মিনমিনে গলায় বলে,

-” কিছুই করতে হবে না আব্বু! ভোর রেগে নেই!”

অরুণ ছেলেকে জড়িয়ে ধরে মাথায় ঠোঁট চেপে বলে,

-” আ’ম স্যরি কলিজা। আর হবেনা। প্রমিজ আর হবে না। বাবার উপর অভিমান করে থেকো না। বাবার সাথে কথা বলো!”

ভোর বাবার বুক থেকে মাথা তুলে মিষ্টি করে হেসে বলে,

-” আই লাভ ইয়ু আব্বু!”

অরুণ ছেলেকে টেনে নিজ কোলে বসিয়ে দেয়। দশ বছরের হ্যাংলা পাতলা ভোর খানিকটা লজ্জা পায়। তাঁর লজ্জাকে বাড়িয়ে দিতে ছোট ভাবনা হাত বাড়িয়ে বলে,

-” ভোলেল বাবা ভাই কুলে? আমিও কুলে!”

ভোর সাথে সাথে নেমে আসে। অরুণ হেসে বলে,

-” পাতাবাহার দেখছো? কলিজা লজ্জা পাচ্ছে বাবার কোলে বসতে। এইটুকুন ছেলে বাবার গলা জড়িয়ে থাকবে!”

-” আমি আর এইটুকুন নেই! উচ্চতায় আরেকটু বড় হলেই আম্মুর সমান সমান!”

পাতা পাশে দাঁড়িয়ে নিজেকে মেপে দেখে বলে ভোর। অরুণ গিয়ে ভোরের অপর পাশে দাঁড়ায়। তাঁর সেই ছোট্ট ভোর এখন তাঁর বুক ছুঁই ছুঁই। অরুণ ভোরকে পাঁজা কোলে নিয়ে বলে,

-” বড় হয়ে গেছে আমার কলিজা তাই না? বিয়ে করিয়ে দিই? একটা লাল টুকটুকে বউ আসবে! কি বলো পাতাবাহার?”

একে তো ছোট্ট বাবুদের ন্যায় কোলে নিয়েছে তাঁর উপর বিয়ের কথা। লজ্জায় ভোরের ফর্সা গাল লালিমায় ছেয়ে যায়। সে নাকের পাটা ফুলিয়ে বলে,

-” আমি বিয়ে করবো না। তুমি বরং বোনকে বিয়ে দিয়ে দাও! লাল টুকটুকে জামাই আসবে!”

অরুণ হেসে ওঠে শব্দ করে। ভোর নামতে চায় অরুণ নামায় না। কপালে সশব্দে চুমু দেয়। ছোট্ট ভাবনা কি বুঝলো কে জানে সে লাফ দিয়ে সোফা থেকে নেমে দুহাত তুলে নাচতে নাচতে বলে,

-” ইয়ে আমাল বিয়ে! লাল লাল জামা আচবে! ইয়ে!”

পাতা ও ভোর তাঁর নাচ দেখে হেসে দেয় খিলখিলিয়ে। পাতা ঝুটি টেনে কিছু বলবে ভাবনা নাচ থামিয়ে বলে,

-” মালচু কেনু? পুচ মা!”

বলেই ঠোঁট ভেঙ্গে কেঁদে দেয়। পাতা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রয় মেয়ের দিকে। তারপর ভোরের ন্যায় পাঁজা কোলে তুলে বলে,

-” ভোর তোমার এই ঢঙ্গি বোনকে কে বিয়ে করবে? ছোঁয়ার আগেই কেঁদে গঙ্গা যমুনা ভাসিয়ে দেয়!”

ভাবনা হাত পা ছুড়তে থাকে। পাতা শক্ত করে ধরে আগলে নেয়। ভোর নেমে বোনকে কোলে নেয়। ভাবনা তার ভাইয়ের গলা জড়িয়ে মায়ের নামে নালিশ করে। ভোর পাতাকে মিছে মিছে বকে। ভাবনা গাল ফুলিয়ে বলে,

-” কান সলি বুলো?”

পাতা গাল ফুলিয়ে কান ধরে বলে,

-” মাফ করেন আম্মাজান!আর হবে না।”

ভোর হেসে বোনকে আদর করে। ভাবনাও হেসে দেয়। পাতা সিনা টান টান করে দন্ডায়মান অরুণের বাহু আকরে ধীমান সুরে বলে,

-“ভোরের বাবা এই দুজন হুট করে বড় হয়ে যাবে। ওদের বিয়ে দিতে হবে। তারপর ঘরে ছেলের বউ আসবে; মেয়ের জামাই আসবে। আমাদের আব্বু আম্মু বলে ডাকবে। ওদের সংসার হবে। আবারও হুট করে এইটুকুন বাচ্চা কাচ্চা হবে! আমাদের দাদু নানু বলে ডাকবে! আমার না কেমন যেন লজ্জা লজ্জা লাগছে! লজ্জা লাগছে কেন?”

অরুণ ভ্রু কুঁচকে পাতার দিকে চায়। ভাবতে ভাবতে মেয়েটা কতদূর চলে গেছে! পাতা তাঁর দিকেই চেয়ে। নয়নে নয়ন মিলন হতেই পাতার লজ্জা বেড়ে যায়। তাঁর আদরের জামাইটাকে কেউ দাদু বলে ডাকবে?
______

সরকার বাড়ির আঙিনা উৎসবে সেজেছে যেন। বাচ্চাদের হৈ হুল্লোড়ে মেতে উঠেছে আঙিনা! ভোরের আবদারে সবাই মাঠে নেমেছে এই হব হব গোধূলি লগ্নে। ক্রিকেট ক্রিজকে ঘিরে রেখেছে সবাই। আজ বৃহস্পতিবার ভোরের প্র্যাকটিস ছিলো! মিস হয়ে যাওয়ায় সে বাড়িতেই প্র্যাকটিসে নেমেছে। চাচ্চু জলদি ফেরায় তাকেই সঙ্গী করেছিলো। চাচা ভাতিজা মিলে বেশ চলছিলো মাঝখানে অরুণ এসে ঘেটে দেয়। ফলাফল আজকের এই অপরাহ্নে আয়োজিত ক্রিকেট ম্যাচ। দুই দল। প্রথম দলে ভোর, আরিয়ান, আভারি ও রূপ! দ্বিতীয় দলে অরুণ, আনিকা, রুবি ও ছোট নয়ন! পাতা, ভাবনা, মিনু, সুফিয়া সম্মানীয় দর্শক! আরো দুটো দর্শক উপস্থিত তবে তাদের অবস্থান একটু দূরে। অরুণ সরকারের বেলকনির ঝুড়িতে বসে পাতাবাহার। তাঁর বুকের ওমে তার শাবক মিও মিও করে ডাকছে। পাতাবাহার তাঁর মুখটা চেটে দিলে বিড়াল শাবক লেজ নাড়িয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। পাতাবাহার আড়চোখে সেটা দেখে দূরে মালিকের খেলার দিকে চেয়ে রয়! চেয়ার পেতে বসেছে সবাই। ভাবনা ফুঁ দিয়ে ভেঁপু বাঁশি বাজিয়ে চলছে অনবরত! ভোরের দল ফিল্ডিং করছে। আনিকার দল একশত ছয়ের টার্গেট নিয়ে ব্যাট হাতে ক্রিজে দাঁড়িয়ে! আরিয়ানের হাতে বল! সে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সামনে ব্যাট হাতে দন্ডায়মান রুবিকে স্লেজিং করছে। রুবি বিরক্ত হয়ে বলে,

-” আরিয়ান হারতে বসেছো তাই অমনোযোগী করে আউট করার ফন্দি আটছো?”

-” ঝুলিতে সবে পঁচাশি! উনি জিতে বসে আছেন!! এমন বল করবো না, ড্যান্স করতে করতে স্ট্যাম্প উড়িয়ে দিবে। যাস্ট ওয়েট এন্ড সি ব্রাদার!”

বল ঘুরাতে ঘুরাতে জবাব দেয় আরিয়ান। স্ট্যাম্পের পেছনে উইকেট কিপিংএ দাঁড়িয়ে থাকা ভোর গলা উঁচিয়ে বলে,

-” চাচ্চু এবার চার হলে আর বল দিবো না। শুধু বড় বড় কথা! একটাও আউট করতে পারলে না খালি রান দিচ্ছো!”

রুবি হেসে দিল। আরিয়ানের মুখটা চুপসে যায়। সেও গলা চড়িয়ে বলে,

-” এইবার কনফার্ম আউট! রুবি তোমার খেল খতম! হু হা!”

অরুণ ব্যাট দিয়ে তাঁর পশ্চাতে আলতোভাবে বাড়ি মেরে বলে,

-” কথা কম কাজ বেশি! সন্ধ্যা হয়ে এলো। জলদি ব্যাট কর না!”

আরিয়ান দৌড়ে এসে বল করে। রুবি আবার আরেকটা চার মারে। রূপ দৌড়ে বল এনে বাবার দিকে ছুঁড়ে বলে,

-” আম্মুকেই আউট করতে পারছো না? জোড়ে ভোর ভাইয়ের মতো বল করবে! আর আম্মু তুমি না সোনা মা! আউট হলে আমি আর চকলেট খাবো না। বাবাকে ছুঁয়ে বলছি! সত্যিই!”

আরিয়ান তাঁর মাথায় চাটি মারে। ভোর ধমকে লেগ সাইটে যেতে বলে। সে মাথা ডলতে ডলতে চলে যায়। আরিয়ান দোয়া দরুদ পড়ে বলে ফু দিয়ে বলে ছুঁড়তে ছুঁড়তে বলে,

-” দোয়া পড়ে দিদাম রুবি তুমি আউট!”

সত্যিই সত্যিই রুবি আউট হয়। বল স্ট্যাম্প ছুঁয়েছে। রুবি মানতে নারাজ আরিয়ান তাকে দিকভ্রষ্ট করেছে। ওদিকে আরিয়ান কোমড়ে হাত রেখে তর্ক করে যায়। যুক্তি দেখিয়ে রুবিকে বিদায় করে বিজয়ী হাসে। আনিকা ব্যাট হাতে বাবার সম্মুখে দাঁড়ায়। বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলে,

-” বাবা আস্তে বল করবে কিন্তু?”

সাথে সাথেই ভোর খেকিয়ে ওঠে।

-” একদম না চাচ্চু। প্রতিপক্ষ যতোই কাছের হোক না কেন খেলার সময় সে প্রতিপক্ষ। মেয়ে বলে দরদ দেখিয়ে আস্তে বল করবে না বলেদিলাম! লাস্ট বল ভালোভাবে করো! আর আনি খেলতে পারিস না তো ব্যাট হাতে এসেছিস কেন? যা ফুট?”

আনিকা ফোঁস ফোঁস করে অরুণের দিকে চায়। যার অর্থ এই যে তোমার ছেলেকে সামলাও! অরুণ ভোরের দিকে তাকিয়ে বলে,

-” কলিজা গলা বেশি উঁচু হয়ে যাচ্ছে কিন্তু? আনিকা ছোট তাই বলের গতি কম হবে! ওর লেগে যাবে নইলে। আরিয়ান বল কর?”

আরিয়ান আস্তে বল করে। আনিকা বল শূন্যে মেরে ছক্কা হাঁকিয়ে উল্লাস করে।‌ ভোর চাচ্চুর দিকে চায়! আরিয়ান নজর লুকিয়ে মেয়েকে থাম্বস আপ দেখায়। ভোর হ্যান্ড গ্লাভস খুলে ফেলে চাচ্চুর হাত থেকে বল নেয়। আরিয়ান চলে গেলে অরুণ ব্যাট হাতে দাঁড়ায়। ভোর সরকার বল হাতে আর অরুণ সরকার ব্যাটিং করবে। উত্তেজনায় ঠাসা এক মুহুর্ত। পাতা মেয়েকে নিয়ে চেয়ার থেকে উঠে আসে। সাথে রুবিও! রুবি মুচকি হেসে বলে,

-” ভাইয়া তো খুশি খুশি আউট হয়ে যাবে বড় ভাবী! তাঁর কলিজা বল করছে বলে কথা!”

পাতা প্রতিত্তরে মুচকি হাসলো। মেয়েকে আঙ্গুল উঁচিয়ে দেখায়,

-” ওই দেখো তোমার বাবা ব্যাট করবে। আর বল করবে তোমার ভাই! বলো তো কি হবে?”

ভাবনা হা করে কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করে। তারপর চিল্লিয়ে বলে,

-” বাবা চককা! বাবা চককা মালু!”

অরুণ তাদের দিকে চায়। খানিকটা মনোযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে কি বলছে? মেয়ের বাবা ডাক কর্ন গহ্বরে বারি খেতেই অরুণ ভোরকে থামিয়ে দিয়ে ব্যাট সমেত এগিয়ে আসে। ভাবনা হাত বাড়িয়ে দিতেই কোলে তুলে অরুণ চুমুতে আদুরে মুখ খানা ভরিয়ে দিল।

-” আমার মা বাবা ডেকেছে আমাকে। আবার বলোতো? বাবা ডাকো?”

ভাবনা হিহি করে হেসে ডানে বামে মাথা নাড়লো বলবে না আর! অরুণ ভ্রু কুঁচকে বলে,

-” মাত্রই না ডাকলে? শুধু বাবা ডাকো? ছক্কা হাঁকাবো! আইসক্রিমও দিবো!”

-” শুদু বাবা!”

অরুণের মুখ খানি দেখার মতো হয়েছে! পাতা হেসে মেয়ের গাল টিপে বলে,

-” আব্বু ডাকো? ভাইও তো আব্বু ডাকে! আব্বু ডাকলে তোমার আব্বু খুশি হবে!”

-” তুমি চুপ থাকো বেয়াদব। তোমার থেকেই মেয়েটা ভোরের বাবা ডাকা শিখেছে! ছোটবেলায় বাবাই ডাকতো।

ধমকে পাতার মুখটা চুপসে যায়। আশ্চর্য সে বলেছে নাকি ‘ভোরের বাবা’ বলে ডাকতে! ইচরে পাকা মেয়ে ডাকে এতে তাঁর কি দোষ! সে আর ডাকবে না ‘ভোরের বাবা’ বলে! ‘অরুণ সরকার’ বলে গলা উঁচিয়ে ডাকবে নয়তো শালার জামাই বলে চিল্লাবে। নইলে নাক উঁচু ম্যানারলেস বলেই ডাকবে। পাতা গাল ফুলিয়ে একটু সরে দাঁড়ায়। অরুণও‌ তাঁর গাল ফুলানোকে তোয়াক্কা করে না। সবাই কে কি সুন্দর করে সম্মোধন করে অথচ তাঁর বেলায়? অরুণ খানিকটা মন খারাপের রেশ নিয়ে মেয়েকে রুবির কাছে দিয়ে চলে যায় ক্রিজে।রুবি ভাবনার গাল টিপে বলে,

-” বাবা ডাকতে কি‌ সমস্যা হুম? বাবা মন খারাপ করলো তো!”

-” আমি কি‌‌ কচচি?”

কাঁধ উঁচিয়ে বলে ভাবনা। রুবি কিছু বলবে পাতা মেয়ের পিঠে চড় মেরে খানিকটা কড়া গলায় বলে,

-” কতবার বলবো বাবা ডাকতে? বাবা বলতে মুখ ব্যাথা করে? আরেকবার ওভাবে ডাকলে মুখ ভেঙ্গে দিবো বেয়াদব।”

ভাবনা গলা ফাটিয়ে কাঁদে। রুবি তাকে শান্ত করাতে করাতে পাতাকে বলে,

-” ছোট বাচ্চা! বোঝে নাকি ওতসব! এভাবে কেউ মারে? ভাইয়া দেখলে খবর আছে! আর ভোরের তো কথাই নেই।”

-” এতো বোঝে আর বাবাকে বাবা বলতে পারে না?”

হাত পা ছুড়ে চিল্লাচিল্লি করতে থাকে ভাবনা; ভাইকে ডাকে। পাতা রুবির কোল থেকে ওকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে যায়। একটু কিছু হলেই সবাই তার দিকে কি সুন্দর করে আঙ্গুল তোলে!

ওদিকে অরুণ পরপর তিনটে ছক্কা মারে। ঝুলিতে রানের সংখ্যা একশত তিন। আর জেতার জন্য আর মাত্র তিন রান আবশ্যক। আনিকার চোখ মুখ উজ্জ্বল সে ভোরকে দেখিয়ে দেখিয়ে হাসে। ভোরের দলের সকলের মুখে আঁধার। আরিয়ান গলা উঁচিয়ে বলে,

-” ভোর? বাবাকে আউট করতে পারলে নেক্সট বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচের টিকিট কনফার্ম! চাচ্চু প্রমিজ!”

অরুণ ভাইয়ের দিকে চায় ঘার ঘুরিয়ে। আরিয়ান হেসে দেয়। ভোর আবার বল হাতে নেয়; দৃষ্টি তার স্ট্যাম্পে নিবদ্ধ। বল ঘুরিয়ে বল করে ক্রিজে বল বাউন্স করে স্ট্যাম্প উড়িয়ে নিয়ে যায়। ভোর ‘আউট’ বলে লাফিয়ে ওঠে। সকলে উল্লাসে ফেটে পড়ে। অরুণ ছেলের হাসিমুখ খানি দেখে ক্রিজ থেকে সরে আসবে আনিকা কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,

-” চাচ্চু তুমি ইচ্ছে করে আউট হয়েছো তাই না?”

অরুণ দুঃখি ফেস বানিয়ে দু দিকে মাথা নাড়লো।

-” একদম না আনি বুড়ি! কিভাবে যে আউট হলাম! এখনো বল আছে তো! নয়ন ব্যাঠ করবে। দৌড়ে আর তিনটে রান নিবে শুধু! ওল দা বেস্ট!”

আনিকা মুখ ফুলিয়ে সায় জানালো। নয়ন এসে ব্যাট করে। ভোর তাকেও আউট করলে আনিকা আসে। এক রান নিয়ে সেও আউট। একশ চার রান! ভোরের দল জিতে যায় ম্যাচ টা! ভোর, রূপের উল্লাস দেখে কে? অরুণ এগিয়ে এসে ছেলেকে কাঁধে চড়িয়ে বাহবা দেয়। আনিকা মুখ ভেঙ্গায় তা দেখে। মায়ের কাছে গিয়ে বলল,

-” চাচ্চু ভোরকে ইচ্ছে করে জিতিয়ে দিয়েছে। এটা তো চিটিং তাই না?”

রুবি হেসে মেয়ের দিকে পানির বোতল বাড়িয়ে বলে,

-” মোটেই না।এটা তো ভালোবাসা! তোমার চাচ্চু চায় না ভোর হারুক!”
_______

নিস্তব্ধ জোৎস্না ঢালা রজনী। তারকারাজি মিটমিটে হাসি দিয়ে চেয়ে আছে ধরনী পানে। চাঁদের এই পূর্ণ তিথিতে ধরনী ম্লান আলোয় আলোকিত। অরুণ সরকার ছেলের বিছানায় বসে আছে। খেলে ধুলে লাফিয়ে এখন বলছে পা ব্যাথা করছে। তাই ওষুধ খাইয়ে পা জোড়া নিজ কোলে নিয়ে আস্তে করে টিপে দিচ্ছে। ভোর যেন তাঁর পুরনো রূপে ফিরে এসেছে বাবার সম্মুখে। আজকের ম্যাচ জেতার আনন্দ তাঁর চোখে মুখে স্পষ্ট সাথে তাঁর চঞ্চলা রূপের ঝলক দেখা যাচ্ছে। বিছানায় হেলান দিয়ে বসে বাবার সাথে গল্পে মেতেছে। ভোর বলছে অরুণ শুনছে! গল্পের মাঝে ভোর হঠাৎ বলে,

-” আব্বু? একটা কথা বলি?”

-” বলো? শুনছি তো!”

ভোর বাবার কোল থেকে পা নামিয়ে বালিশ রেখে মাথা রাখলো কোলে। অরুণ ছেলের চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে দেয়।

-” আমি তো এখন বড় হচ্ছি তাই না? তাহলে স্কুলে সবার সামনে আমাকে ওভাবে কোলে নিয়ে আদর করবে না। ক্লাসের সবাই হাসে। বলে ভোর এখনো ছোট বেবি! তোর বাবা ফিটার দেয় নি? ফিটার গলায় ঝুলিয়ে নিতে! আরো অনেক কিছু বলে।”

অরুণের হাত থেমে যায়।‌ ভোর আবার বলতে শুরু করে,

-” একবার তো ফিটারও এনে দিয়েছিলো। আমি মানা করলেও শোনে না। তুমি ওদের সামনে আদর করবে না আমাকে।”

-” ওরা হিংসে করে বুঝলে! ওদের বাবা তো এতোটা ভালোবাসে না তাই। আমি গিয়ে বকে দিবো!”

অরুণ ছেলের কপালে চুমু দিয়ে বলল। ভোরের কপালে ভাঁজ পড়ে।

-” তুমি কিছুই বলবে না। এতে ওরা আরো হাসবে। বলবে ছোট বেবি ভয় পেয়ে বাবাকে ডেকে এনেছে। আমি যেটা বললাম সেটা মনে রেখো! সবার সামনে ওভাবে আদর করবে না ব্যস। আমি এখন ছোট নই!”

একটু রুক্ষতার সাথেই বলে ভোর! অরুণ ছোট্ট করে ‘হুম’ বলে সায় জানালো। আর কথাবার্তা হয় না বাবা ছেলের মাঝে। ভোরের চঞ্চল ভাব উড়ে যায়। নিরাবতার মাঝেই ভোর ঘুমের দেশে পারি জমায়। অরুণ ছেলেকে ভালোভাবে শুইয়ে কম্পোর্টে ঢেকে কপালে গালে চুমু দিতে নিয়েও দেয় না। ছেলে বড় হচ্ছে তো! ছোট্ট টি নেই। সে লাইট নিভিয়ে ফেইরি লাইটস জ্বালিয়ে বেরিয়ে যায়। আবছা অন্ধকারাচ্ছন্ন রুমে প্রবেশ করে অরুণ। দরজা বন্ধ করে টি শার্ট খুলে ছুঁড়ে ফেলে। বিছানায় কম্ফোর্টে ঢুকে কম্ফোর্টজোনে মাথা রেখে ডাকে,

-” এই পাতাবাহার? ঘুমিয়ে পড়েছো?”

পাতা নড়ে চড়ে ওঠে। ঘুমায় নি সে। চোখের পাতায় ঘুম ধরাই দিচ্ছে না। সে নিজের উপর থেকে অরুণকে সরিয়ে দিতে চায়। অরুণ সরে না ছোট্ট বুকটায় মুখ গুঁজে বলে,

-” তোমার আবার কি হলো?”

-” আম্মু লাগ কলিচে! আমিও লাগ কলিচি!”

অরুণ এতক্ষণ খেয়াল করে পাতার পাশে তাঁর চড়ুইছানাও শুয়ে আছে। ঘুমায়নি ফোন হাতে গ্যালারিতে ব্যাঙের ছবি দেখছে। সে ওঠে না। পাতার বুকে মাথা রেখেই মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে বলে,

-” তাই? তা আম্মুই রাগ করলো কেন? আম্মুর আম্মুই বা কেন রাগ করলো?”

ভাবনা কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,

-” আম্মু মালিচে! লাগ কলিচে। কুতা বুলে না।”

অরুণের কপালে ভাঁজ পড়ে। মাথা তুলে পাতার দিকে চায়। চোখ বুজে রেখেছে। অরুণ গালে হাত রেখে বলল,

-” এই পাতাবাহার? চড়ুইকে মেরেছো? মানা করেছি না? এই কথা বলছো না কেন? চোখ খুলো?”

পাতা চোখ খুলে। অরুণকে সরিয়ে দিয়ে বলে,

-” শান্তিতে ঘুমাতেও‌ পারবো না নাকি! ঘুম পাচ্ছে আমার ডিস্টার্ব করবেন না!”

বলে ওদিকে ঘুরে শুয়ে পড়ে। ভাবনা বাবাকে ডিঙিয়ে মায়ের কাছে যায়। মায়ের গালে চুমু দিয়ে বলল,

-” মা আদুল দিচি। লাগ কলে না। কুতা বুলো?”

পাতা চোখ খুলে। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলে,

-” রাগ করি নি। ঘুমাও তো!”

ভাবনা মায়ের বুকে চুপটি মেরে শুয়ে থাকে। অরুণ কপালে গাঢ় ভাঁজ পড়ে। এর আবার কি হলো? অরুণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মান অভিমান ভাঙানো এখন তাঁর কাছে দুধভাতের মতোন! এ বেলা ছেলের অভিমান ভাঙাও তো পরের বেলা ছেলের মায়ের! তাঁর পরের বেলা মেয়ের। সে হেসে পাতাকে পেছন থেকে জড়িয়ে বলে,

-” কি করেছি একটুও মনে পড়ছে না! তবুও স্যরি! রাগ অভিমানের দরজা আপাদত বন্ধ রাখো। ছোট বুকটায় মাথা রাখি? একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দাও! দিবে না?”

পাতা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে না। চুপচাপ চোখ বুজে রাখে। শ্বাস ক্রিয়া স্বাভাবিক! ভাবনা মায়ের বুকেই ঘুমিয়ে পরে। অরুণ এখনো আশায় প্রহর গুনছে। পাতার কানের নিচে মুখ ঘষে ঘনঘন শ্বাস টেনে নেয়। পাতা আর থাকতে পারে না। মেয়েকে বুকে নিয়েই কাত হয়। অরুণ বিজয়ী হেসে গলার ভাঁজে মুখ লুকিয়ে বলে,

-” আমার পাতাবাহার!”
________

সুবাহে সাদিকে মসজিদে মুয়াজ্জিন সুরেলা গলায় আজান দিচ্ছে ‘আল্লাহু আকবর আল্লাহু…..” ! সেই ক্ষীণ সুর মস্তিষ্কে পৌঁছতেই ভোর তড়িৎ বেগে চোখ খোলে। ঢোক গিলে জোরে জোরে শ্বাস টানে। পাশ হাতরে খোঁজে কাউকে। মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে ‘বাবা’ ধ্বনি নির্গত হয়। ভোর উঠে বসে। কম্ফোর্ট সরিয়ে ঘরে লাইট জ্বলায়। এরপর ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। বাবার ঘরের সামনে গিয়ে দরজা ধাক্কায় শব্দ করে। দরজা ধাক্কানোর শব্দে ভাবনা ঘুমের ঘোরেই চমকে ওঠে। চোখ খুলে কেঁদে ওঠে ‘মা মা’ বলে। অরুণের ঘুম ছুটে গেলো নিমিষেই। তাঁর বুকেই যে ছোট্ট চড়ুই ঘুমিয়ে। সে ভাঙা গলায় সুধায়,

-” মা কি হয়েছে? কাঁদছো কেন?”

দরজা ধাক্কানোর শব্দও কানে বাজে অরুণের। পাশে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমানো পাতাকে মৃদু স্বরে ধাক্কা দিয়ে ডেকে উঠে যায়। দরজা খুলে ভোরকে দেখে খানিক অবাক সুরে বলে,

-” কি হয়েছে কলিজা?”

ভোর বাবার দিকে চায় ফ্যাল ফ্যাল করে। তারপর ডানে বামে মাথা নেড়ে বলে,

-” কিছু না। ঘুম আসছিলো না। ও কাঁদছে কেন?”

ভাবনাকে দেখিয়ে বলে ভোর! অরুণ ছেলেকে ভেতরে নিয়ে দরজা চাপিয়ে বলে,

-” দরজা ধাক্কানোর শব্দে হঠাৎ জেগে কেঁদে দিলো! ভাবনা চড়ুই দেখো ভাই এসেছে?”

ভাবনা কান্না থামিয়ে দুহাতে চোখ ডলে দেখে সত্যিই ভাই এসেছে।‌সে হাত বাড়িয়ে দিলে ভোর কোলে নেয়। অরুণ ভোরের মাথায় হাত বুলিয়ে ‘আসছি’ বলে ওয়াশ রুমে যায়। ভোর বাবার প্রস্থান দেখে চেয়ে চেয়ে। কালকের কথায় বাবা কি কষ্ট পেয়েছে? সে কি স্যরি বলবে একবার? ভোরের মন কোণে কিছু উঁকি দেয়। সে বোনকে নিয়ে বিছানায় বসে।আম্মুকেও ডেকে তোলে। পাতা ঘুম ঘুম চোখে একবার চায়। ভোরকে দেখে হেসে আবার চোখ বুজে নেয়। ভাবনা মায়ের এলোমেলো চুল টেনে ধরে। ব্যস পাতা উঠে যায়। চোখ ডলে ভোরকে দেখে একগাল হেসে বলে,

-” সকাল হয়ে গেছে? এতো জলদি? রাত আরেকটু বড় হলে কি হয়?”

-” তোমাকে রাত দিন চব্বিশ ঘন্টা ঘুমোতে দিলেও ঘুম ফুরোবে না!”

অরুণের কন্ঠে পাতার ঘুম পুরোপুরি উড়ে যায়। হামি তুলে ভোরের গাল টিপে বালিশে মাথা এলিয়ে দেয়। মেয়েকে ভেংচি দিতে ভোলে না। অরুণ পাতার পা ধরে টেনে আনে। আদেশের সুরে বলে,

-” আজান হচ্ছে! জলদি ফ্রেশ হয়ে ওযু সেরে নামাজ পড়ে নাও? যাও? ভোর তুমিও যাও? আর চড়ুই তুমি বাবার কাছে এসো?”

ভোর বোনকে বাবার কাছে দিয়ে ওয়াশ রুমে যায়। পাতাও ফ্রেশ হয়ে ওযু করে বেরিয়ে আসে । চারটে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়ে নেয় তিনজন! ছোট ভাবনা মা বাবা ভাইকে দেখে নিজেও বিড়বিড় করে কখনো সিজদা দেয় তো কখনো মোনাজাত ধরে। কখনো মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে হা করে দেখে তো কখনো বাবা রুকুতে ঝুঁকে এলে গালে সশব্দে চুমু দিয়ে খিলখিলিয়ে হাসতে থাকে।মোনাজাত শেষে ভোর বোনকে কোলে বসিয়ে নেয়। আদর করে ফিসফিসিয়ে কানে কানে কিছু বলে। ভাবনার মুখে হাসি বিস্তারিত হয়। সে মাথা নাড়িয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,

-” আমল বাবা?”

ভোর মাথা নাড়ে। ভাবনা মিষ্টি করে আসে। ভাইয়ের গালে টুপ করে চুমু দিয়ে সে দৌড়ে পেছন থেকে বাবার গলা জড়িয়ে ডাকে,

-” বাবা বাবা আমাল বাবা!”

অরুণ দু হাত তুলে সৃষ্টি কর্তার কানে মোনাজাতে দোয়া প্রার্থনা করছিলো। মেয়ের ডাকে অবাক হয়। বাবা ডাকলো তাকে? অরুণ উপর ওয়ালার কাছে শুকরিয়া আদায় করে। ছেলে মেয়ে, পাতা ও পুরো পরিবারের জন্য দোয়া চেয়ে দোয়া পাঠ করে ‘আমিন’ বলে মোনাজাত শেষ করে। মুচকি হেসে পিঠে ঝুলে থাকা মেয়েকে কোলে নিয়ে বলে,

-“কি বললে আবার বলো?”

-” বাবা”

অরুণ আদুরে মুখ খানায় চুমুতে ভরিয়ে দিলো। তাঁর তৃষ্ণার্ত হৃদয় খানি জুড়ালো? সে চাইতো ছেলের মতো মেয়েটাও আব্বু, বাবা ডেকে তাঁর শূন্যতা ভরিয়ে দিক! অরুণ ভোরের দিকে তাকিয়ে পরপর পাতার দিকে চায়! ইশারায় কাছে ডাকলে তাঁরা আসতে সময় নেয় না। ভোর বাবার বাহু জড়িয়ে ধরে বলে,

-” ভোর লাভস ইয়ু সো মাচ আব্বু!”

অরুণ শুধু হাসে। এ যে প্রাপ্তির হাসি। উপর ওয়ালার কাছে পুনরায় শুকরিয়া জানিয়ে পাতার দিকে তাকিয়ে বলে,

-” ধন্যবাদ পাতা! পাতাবাহার হয়ে অরুণ সরকারের জীবনে পদার্পণের জন্য!”

পাতা বরাবরে মতোই মুচকি হাসলো। আবেগে আঁখি যুগল ভরে গেলো নোনা জলে। ভরবে না? সে যে অতিমাত্রায় আবেগী। ছোটবেলা থেকে সুখের খোঁজে সকলের দোড়প্রান্তে ঘুরলেও দায়িত্বের বেড়াজালেই আটকে রাখা হয়েছে তাকে। কারো বাড়ির আগাছা রূপে সে বড় হয়েছে। কটুক্তি শুনেছে। তুচ্ছতাচ্ছিল্য সহ্য করেছে! ক্ষুরধারালো বাক্য শুনে শুনে বড় হয়েছে। কিশোরী কালে সেই আগাছা কেটে তাকে ফেলে আসা হয়েছে তাঁর জায়গায়। নিজ জায়গায় দিন ভালো কাটলেও দায়িত্ব নামক বোঝা পিষ্ট করতো পাতাকে। হঠাৎ এক ঝড়ে পাতা ঝড়ে পরে অরুণ সরকারের আঙিনায়! সেই ঝড়ে পরা পাতাকে অরুণ সরকার যত্ন করে রেখে দিয়েছে। ভালোও বেসেছে। পাতা মানিয়ে নিতে জানে। ছোট জীবনের অপূর্ণ শখ আহ্লাদ নিয়ে আফসোস না করে সে যা পেয়েছে তা নিয়েই তুষ্ট থাকতে জানে। পাতাবাহার ভালোবাসতে জানে। পূর্ব দিগন্তে রাতের অন্ধকার বিলীন হয়ে নতুন ভোরের সূচনা হয়।আরো এক নতুন ভোর নতুন দিনের আরম্ভ হয় পাতাবাহারের দিনপঞ্জিতে।

সমাপ্ত