পাপমোচন পর্ব-১২ এবং শেষ পর্ব

0
242

#পাপমোচন (১২/অন্তিম পর্ব)

-মাথায় আঘাত খেয়ে অবচেতন হয়ে পড়া ফাইয়াজ হুসাইনকে তুলে নিয়ে একটা সরু টেবিলের উপর শুইয়ে দিয়ে হাত-পা গুলো শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধার সময় রেশমি বলে উঠলো,’ এই নরপশুটাকে আমি নিজের হাতে শাস্তি দিবো। ওর নারী শরীরের প্রতি এত তৃষ্ণা কোত্থেকে জন্মাতো তা দেখাবো আমি।’

কথাগুলো বলে আমাকে সরিয়ে দিলো রেশমা। তারপর আমাকে সরিয়ে দিয়ে অজ্ঞানরত ফাইয়াজের শরীরে আন্ডারওয়্যারটা ছেড়ে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে ফেললো নিজের হাতে।

চোখের সামনে একজন পুরুষকে বিবস্ত্র হতে দেখে খানিকটা ইতস্তত লাগলো নিজের কাছে। তবে রেশমার চোখমুখে যেন পাষবিক রুপ এসে ভর করেছে। আমাকে চেয়ারে বসতে বলে মেয়েটি এবার রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। আমি হতবাক হয়ে চুপচাপ চেয়ারে গিয়ে ধপ করে বসে পড়লাম।

কিছুক্ষণ পর ফাইয়াজ হুসাইনের জ্ঞান ফিরতেই সে ছটফট করে উঠলো নিজেকে বাঁধন মুক্ত করার জন্য।
ঘাড় ঘুরিয়ে একবার আমার দিকে তাকিয়ে ইংরেজিতে বিশ্রী একটা গালি দিয়ে বললো,’ এক বাপের ব্যাটা হলে সাহস থাকলে হাতের বাঁধন খুলে দে। তোকে আর ওই মা*গিকে আমি একাই দেখে নিবো। কি ভেবেছিস এভাবে উলঙ্গ করে আমার হাত-পা বেঁধে রেখে ভয় দেখালেই আমি ভয় পেয়ে যাব? আমি ফাইয়াজ হুসাইন। ‘

লোকটার বলা কথাগুলো আমার আঁতে লাগলো। চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে হাতের বাঁধন গুলো খুলে দিয়ে বললাম, ‘ ওঠ।’

বাঁধন খোলা পেয়ে ফাইয়াজ হুসাইন এবার সিংহ গর্জন দিয়ে নগ্ন অবস্থায় টেবিল থেকে নেমে দাঁড়ালো। তারপর আমার দিকে তেড়ে আসতেই হাতের মুঠোয় থাকা লাঠিটা দিয়ে সপাটে দু পায়ের হাঁটুতে কয়েকটা বাড়ি মেরে বসলাম। আঘাত খেয়ে ফাইয়াজ ব্যাথায় ককিয়ে উঠে হাঁটুতে হাত দিতেই ওর শিরদাঁড়া বরাবর আঘাত করলাম সজোরে। আঘাত খেয়ে ফাইয়াজ আবার মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো চাপা গোঙানি দিয়ে। হিতাহিত বোধবুদ্ধি লোপ পেয়ে এতদিনের জমানো ক্রোধ,ক্ষোভ, প্রতিহিংসা সবকিছু মিলেমিশে উম্মাদ করে তুললো আমাকে।

হাতের লাঠিটা দিয়ে একের পর এক আঘাত করে করে রক্তাক্ত করে ফেললাম ফাইয়াজের শরীরটাকে। ফাইয়াজ মুখের অভিব্যক্তিতে চরম যন্ত্রনা ফুটিয়ে বললো,’ আমাকে কেন মারছো? আমি তো কিছু করিনি। আমি পুরুষ মানুষ, যৌনাকাঙ্ক্ষা আমার থাকতেই পারে। আমি তো কাউকে জোর করে কিছু করিনি। সবাই তাদের নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্যই স্ব- ইচ্ছায় এসেছে আমার কাছে।’

রাগে গজগজ করতে করতে বললাম,’ আমার বোন তোর মত নরকের কিটের কাছে নিজেকে আত্মসমর্পণ করেছিলো?!’

কথাটা বলে লাঠির এক মাথা সোজা লোকটার মুখের ভিতরে ঢুকিয়ে জিহ্বা বরাবর ঠেস দিতেই ফাইয়াজ ছিটকে সরে গিয়ে দেওয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসলো। তারপর কাতর গলায় বললো,’সে আসেনি। তাকে পাঠানো হয়েছিলো আমার কাছে।’

‘কে পাঠিয়েছিলো?’

ফাইয়াজ ফ্যাচফ্যাচ করে হেসে উঠলো এবার। তারপর রক্ত মিশ্রিত কয়েক দলা থুথু ফেলে বলল, ‘ আমি ফাইয়াজ হুসাইনের নাড়ি নক্ষত্র সবটা জেনে নিতে পেরেছো অথচ এই কথাটা এখনো জানতে পারোনি? এই সামান্য বুদ্ধি নিয়ে বোনের প্রতিশোধ নিতে এসেছো তুমি! আসল কালপিট তো তোমার নিজেদের ভিতরেই আছে এতদিন ধরে।’

‘মানে?’

‘তোমার বোনের হাসব্যান্ড, সে বর্তমানে কার অফিসে চাকরি করে জানো?’

‘হ্যাঁ। মাজহারুল চৌধুরীর কোম্পানিতে।’

ফাইয়াজ আবার ফ্যাচফ্যাচ করে হেসে উঠলো।
তারপর বলল, ‘ একটু ভালো করে খোঁজ নিলেই জানতে পারতে মাজহারুল সাহেবের কোম্পানির ত্রিশ পারসেন্ট সেয়ারের মালিক ফাইয়াজ হুসাইন মানে আমি।’

‘তারমানে….’

‘হ্যাঁ। ওখানে তার চাকরিটা আমিই করিয়ে দিয়েছি। ওর উপর যাতে কারও সন্দেহ না হয় তাই বুদ্ধি করে আমার কোম্পানিতে চাকরি না নিয়ে অন্য আরেকটা কোম্পানিতে চাকরি নিয়েছিলো। নিজের বউকে দিয়ে খুব সযত্নে একটা গেম খেললো। অথচ তোমরা কেউ ধরতেও পারোনি।’

কথাগুলো বলে ফাইয়াজ হুসাইন তিক্ত হাসিতে গড়িয়ে পড়লো মেঝেতে।
তারপর ছোট্ট পুটুলির মত গোল হয়ে হো হো করে হাসতে লাগলো। ক্রোধে চোখ জোড়া আগুনের মত লাল হয়ে উঠলো আমার।
লাঠিটা নিয়ে এগিয়ে গিয়ে মারতে উদ্যত হওয়ার আগেই ফাইয়াজ হাত জোড় করে বললো,’ আর মেরো না আমায়। এইসব কিছুর পিছনে সে নিজেই জড়িত। সে-ই তোমার বোনকে আমার কাছে পাঠিয়ে ছিলো।’

বিস্ময়ে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো আমার। চোখমুখ শক্ত করে নিয়ে বললাম,’ রিয়াদ ভাইয়া!’

‘হ্যাঁ। এইসব কিছুর পিছনে রিয়াদ নিজেই জড়িত। সে তার স্বার্থ হাসিলের জন্যই তোমার বোনকে আমার ড্রাইভারের গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে অপহরণের নাটকটা সাজিয়েছিলো।
একবার একটা অফিস পার্টিতে প্রথমবার তোমার বোনকে দেখেছিলাম আমি। রিয়াদের সাথে এসেছিলো। প্রথম দেখাতেই তাকে দেখে মনের ভিতরে সুপ্ত কামনার স্বাদ জেগেছিলো। সেদিন থেকে নজর থেকে রেখেছিলাম তোমার বোন আর তার হাসব্যান্ডের উপর। রিয়াদ যেই অফিসে চাকরি করতো সেই অফিস থেকে খুব একটা সুযোগ সুবিধা দিতো না তাকে। একটা প্রমোশনের জন্য রাত-দিন গাধার মত খেটেখুটেও প্রমোশন করতে পারেনি। ঠিক করলাম এই প্রমোশনের লোভ দেখিয়েই তাকে ফাঁদে ফেলবো।
আর শেষমেশ আমি সফলও হয়েছিলাম। তারপর একদিন সবকিছু ঠিকঠাক করে আমাকে জানালো,সে বাড়ি থেকে কয়েকদিনের জন্য অফিসের মিটিংয়ের নামে বাইরে যাবে। আর তখন সাথে করে বউকেও নিয়ে বার হবে। তারপর মাঝরাস্তায় এসে অফিসের ফোন কলের একটা নাটক সাজিয়ে অন্য আরেকটা গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে সে চলে যাবে। আমিও তার কথামত নাটকের দৃশ্যপট সাজিয়ে নিয়েছিলাম।
এখানে দোষী হলে রিয়াদ দোষী। মানছি আমারও দোষ রয়েছে। তবে সে-ও তো নিজের স্বার্থের জন্য তার বউকে তুলে দিয়েছে। শাস্তি হলে তার হওয়া উচিৎ।’

কথাগুলো শুনে ভিতরের পিশাচ সত্তাটা এবার পুরোদমে জেগে উঠলো। ক্রোধ মেশানো গলায় বললাম,’ শাস্তি তো সে-ও পাবে। তবে আসল কাল পিট যেহেতু তুই নিজেই। তাই শাস্তিটা তোরও প্রাপ্য।’

তারপর হাতের লাঠিটা তুলে ফাইয়াজের মাথা বরাবর বসানোর উদ্যত হতেই রেশমি থামিয়ে দিয়ে বললো,’ শ্রাবণ তোমার যা জানার ছিলো জেনে নিয়েছো। এখন বাকিটা আমার কাজ। আমি তো বলেছিলাম, ওকে শাস্তি আমি আমার নিজের হাতে দিবো।’

পিছন ঘুরতেই দেখলাম, একটা চারকোনা ট্রে-তে ছোট সাইজের একটা গ্রাইন্ডার মেশিন,চাকু,মরিচের গুড়ো সহ আরও কয়েকরকমের ধারালো অস্ত্র নিয়ে দাড়িয়ে আছে রেশমি।

‘ওনার সাথে আমার বহুদিনের হিসাব বাকি আছে। তুমি তো যা মারার মেরেই নিয়েছো, যা জানার জেনেও ফেলেছো। এখনো তোমার অনেক কাজ বাকি। এইটাকে বরং আমার হাতে ছেড়ে দাও। কথা দিলাম, ওর শরীরের এমন হাল করবো, স্বয়ং যমরাজও দেখে ভয় পাবে সামনে দাঁড়াতে।
তুমি ততোক্ষণে তোমার হিসাবটা মিটিয়ে নাও।’

রেশমির কথাগুলো শুনে মারার জন্য উদ্যত হওয়া লাঠিটা মেঝের উপর ফেলে দিলাম। তারপর একবার ঘৃণাভরে দেওয়ালে কোণঠাসা হয়ে বসে থাকা ফাইয়াজের দিকে তাকিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলাম।

ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতেই গ্রাইন্ডার মেশিন চলার শব্দের সাথে ফাইয়াজের গগনবিদারী চাপা আর্তনাদ কানে ভেসে এলো আমার।

বাইরে বেরিয়ে আসতেই দেখলাম দিনের আলো ফুরিয়ে রাত নেমে চারপাশটা গাঢ় কালো অন্ধকারের চাদরে মুড়িয়ে নিয়েছে।

ফাইয়াজের কথাগুলো শোনার পর থেকে ভিতরটা আগ্নেয়গিরির দাবানলের মত দাউদাউ করে জ্বলছে। শেষমেশ কি-না রিয়াদ ভাইয়া! ছিঃ মানুষটাকে ভাই বলে ডাকতেও নিজের বিবেকে বাঁধছে এখন। তারমানে আপু সেদিন তার চিঠির শেষ কয়েকটা শব্দ রিয়াদকে উদ্দেশ্য করেই লিখে গিয়েছিলো। আপু তারমানে তার উপর হওয়া অত্যাচারের জন্য আত্মহত্যা করেনি,আত্মহত্যা করেছিলো তার ভালোবাসাটা এইভাবে স্বার্থের কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়ার কষ্টে!

রাতে বাসায় ফিরে দেখলাম রিয়াদ তখনো ফেরেনি। বাড়িটাতে ঢোকার পর থেকে কেমন দমবন্ধ লাগছে আমার। এই বাড়ির প্রতিটা ইটের খাঁজে খাঁজে আমার বোনের সাথে হওয়া অন্যায় , চার দেওয়ালে বন্দী হয়ে থাকা আর্তনাদ আর চোখের জল মিশে আছে।
রিয়াদের বাবা-মায়ের সাথে কথা বলে শূন্য হাতেই আবার বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসলাম বাড়ি থেকে। তারপর বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা রিয়াদের অফিসের সামনে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম।

রাত তখন প্রায় নয়টা, রিয়াদের দেখা মিললো এবার। একজন সুদর্শণা মেয়ের সাথে বেশ হাসি হাসি মুখে কথা বলাবলি করতে করতে বেরিয়ে আসছে অফিস থেকে। রিয়াদকে দেখে শ্বাপদের মত চোখজোড়া ক্রোধে জলজল করে উঠলো আমার। ইচ্ছা করছে এখনি ছুটে গিয়ে ওর হাসিটা মুখটার উপর অবিরত আঘাত করে করে বিকৃত করে ফেলি। কিন্তু চটজলদি এভাবে কোনকিছু করলে তীরে এসে তরি ডুববার মত অবস্থা হবে। তাই নিজেকে শান্ত রেখে শিকারের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বসে রইলাম চুপচাপ।

কিছুক্ষণ একে অপরের সাথে কথা বলাবলির পর একটা সময় মেয়েটিকে বিদায় দিয়ে রিয়াদ তার গাড়িতে উঠে বসলো। রিয়াদ গাড়িতে উঠতেই মুখের উপর মাস্ক টেনে নিয়ে এবার সন্তপর্ণে এগিয়ে গেলাম গাড়িটাকে উদ্দেশ্য করে। তারপর গাড়ির ভিতরে বসে থাকা রিয়াদকে ডাকার ভঙ্গিতে গ্লাসে কয়েকবার টোকা দিয়ে অজ্ঞাত ঠিকানা জানতে চেয়ে একটা কাগজ এগিয়ে ধরলাম রিয়াদের সামনে।
ব্যস। স্কোপোলামিনের নেশায় রিয়াদ বোধবুদ্ধি হারিয়ে ঘোর লাগা চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে।

রিয়াদের অবস্থা দেখে আর কালবিলম্ব না করে চটজলদি গাড়ির অপর পাশের দরজা খুলে সিট গিয়ে বসলাম। তারপর বললাম,’ চল এখন।’

রিয়াদ বাধ্য ছেলের মত গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে চলতে লাগলো এবার। প্রায় চল্লিশ মিনিট পর গাড়িটা সেদিনের সেই পরিত্যক্ত বাড়ির রাস্তার সামনে আসতেই রিয়াদকে গাড়ি থামাতে বলে গাড়ি থেকে নামতে বললাম।
রিয়াদ আমার কথামত গাড়ি থেকে নেমে দাড়ানোর পর নিজেও নামলাম। তারপর কাঁধে হাত দিয়ে বললাম,’ চল এখন।

তারপর শুকনো পাতার সরু রাস্তাটা ধরে এগিয়ে যেতে লাগলাম বাড়িটার দিকে।

বাড়িটার ভিতরে নিয়ে যাওয়ার পর রিয়াদের মুখটা ঠিকমত টেপ দিয়ে আটকে নিয়ে হাত দুটো পিছমোড়া করে বেঁধে নিলাম এবার। তারপর বোতলের মুখ খুলে রিয়াদের চোখে ঠান্ডা পানির ছাটা মারতেই স্কোপোলামিনের ঘোর কেটে যেতেই রিয়াদ হকচকিয়ে উঠলো। নিজেকে বন্দী অবস্থায় দেখে ছটফট করে গোঙানি দিয়ে কিছু একটা বলতে গেলে আমি মুখে আঙুল দিয়ে হুশশশ শব্দ করে চুপ থাকার নির্দেশ দিয়ে তারপর চাপা স্বরে বললাম,’ তোমার বলার দিন শেষ। এখন আমি বলবো তুমি মনোযোগ দিয়ে শুনবে শুধু।’

কথাগুলো বলার পর হাতে ধরা মোবাইল ফোনটাতে একটা ভিডিও চালু করে রিয়াদের সামনে ধরলাম।
প্রথমে জব্বারের স্বীকারোক্তি তারপর ফাইয়াজ হুসাইনের।

চোখের সামনে নিজের সব কুকর্মের বিবরণ শুনে রিয়াদ যেন বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য আরও মরিয়া হয়ে উঠলে বললাম, ‘তুমি ভাই একখান জিনিস। মানতেই হবে। নিজের হাতে পুরো গল্পটা লিখে আবার সেই গল্পেই দর্শক হয়ে পুরো সময়টা উপভোগ করে গিয়েছো। তোমার তো অস্কার পাওয়া উচিৎ। তবে তোমার গল্পটার যে শেষ পৃষ্টা এসে গিয়েছে। এখন আমি নতুন করে তারপর থেকে আবার শুরু করবো। কি বলো ভালো হবেনা?’

রিয়াদ গোঙানি দিয়ে নিজেকে বাঁধণ মুক্ত করার জন্য উতলা হয়ে উঠতেই মেঝেতে পড়ে থাকা শক্ত কাঠের একটা সুচালো লাঠি তুলে নিয়ে সোজা হাতের কব্জিতে বসিয়ে দিয়ে তারপর সসসসস করে চাপাস্বরে বললাম,’ একদম চুপ। বেশিরকম ছটফট করলে পরের বার জায়গা মত বসিয়ে দিবো।’

তারপর কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক করে বললাম,’ ছটফট করে কোনো লাভ নেই। এই গল্পে আমি যা বলবো শুধু সেটাই হবে। আচ্ছা আমার আপু তো তোমাকে নিজের চাইতেও বেশি ভালোবাসতো তাই না? তুমিও তো বাসতে। তাহলে যেই মানুষটাকে এতটা ভালোবাসতে সেই মানুষটাকে সামান্য একটা চাকরির জন্য অন্য আরেকজনার কাছে তুলে দিতে সেদিন তোমার অন্তরাত্মা সামান্যতম কাঁপলো না?
মানুষ নাকি ভালোবাসার জন্য জান পর্যন্ত দিয়ে দেয়,আর তুমি? তুমি তো ভালোবেসে একটা গোটা পরিবারকে শেষ করে দিলে। আচ্ছা মর্গে সেদিন আমার আপুর মৃত শরীরটাকে দেখার পর কি তোমার ভিতরে একটুকুও অনুশোচনা নাড়া দিয়ে ওঠেনি? অবশ্য না ওঠারই কথা। তুমি কি জানো পৃথিবীর বুকে তুমিই একমাত্র বিরল পুরুষ, যে নিজের স্বার্থের জন্য এমন একটা ঘৃণ্যতম নাটক সাজিয়েছে। এখন বলো তো এই নাটকের পুরস্কার হিসাবে তুমি কি ডিজার্ভ করো?
ওহ তুমি তো বলতে পারবা না,আমিই বলছি।
ওয়েট..

পাশের ঘর থেকে সেদিনের সেই টুল বক্সটা নিয়ে এলাম এবার। তারপর রিয়াদের সামনে তুলে ধরে বললাম,’ বলো কোনটা দিয়ে শুরু করবো?’

বক্সটার দিকে তাকিয়ে রিয়াদ আতঙ্কে কেঁপে উঠলো। চেয়ারে বসে থাকা অবস্থায় মরিয়া হয়ে ছটফট করতে লাগলো তারপর।

বক্সটা মেঝেতে রেখে এবার একটা ব্লেড তুলে নিলাম হাতে। তারপর রিয়াদের চোখের সামনে কয়েকমূহুর্ত ধরে রাখার পর হাতের তালু থেকে কুনুই পর্যন্ত আড়াআড়িভাবে একটা সুক্ষ্ম টান মারতেই রিয়াদ যন্ত্রনায় চাপা আর্তনাদ করে উঠলো।

মুখে পৈশাচিক হাসি ফুটিয়ে বললাম,’ সবে তো শুরু। এতটুকুতেই এত অধৈর্য হলে চলবে কীভাবে?’
ওয়েট তুমি কিছু বলতে চাইছো মনে হয়।’

রিয়াদের মুখ থেকে টেপ টা খুলে দিতেই রিয়াদ আতর্নাদ করে বলে উঠলো, ‘ আমাকে মারিস না ভাই। আমি অন্যায় করেছি, অনেক বড় পাপ করেছি। কিন্তু আমি সত্যিই সুমনাকে দিয়ে ওসব করাতে চাইনি। আসলে চারদিকে সবার এত এত জয় জয়কার এত উন্নতি দেখে আমার মনেও লোভ জন্মেছিলো। মানুষ হিসাবে একটু ভালোভাবে জীবনযাপন করার সখ কার ভিতরে না থাকে? আমারো তো ইচ্ছা করতো নিজের একটা বাড়ি হবে,গাড়ি হবে। কর্পোরেট এলাকায় একটু ঠাটবাট করে ঘুরবো। কিন্তু এমন একটা কোম্পানিতে চাকরি করতাম, গাধার মত খেটে বসের মন জয় করা তো দূরের কথা, ছোটখাটো একটু ভুল করলে ম্যানেজার যাচ্ছেতাই বলে দিতো। তখন নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হতো। মনের ভিতরে জমানো বহুদিনের সুপ্ত আকাঙ্খাগুলো ফাইয়াজ সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার পর আর চেপে রাখতে পারিনি। আমি লোভি হয়ে উঠেছিলাম, পাপ করেছি। আমাকে ক্ষমা করে দে ভাই।’

রিয়াদের কথাগুলো শুনে মৃদু হেসে উঠে বললাম,’ স্বার্থান্বেষী সমাজে যেখানে টাকা আর নিজ স্বার্থের কাছে কাঠের পুতুলও মুখ খুলে,সেখানে তোদের মত নরকের কিট তো পাপ করবেই। যেদেশে আইনের মাধ্যমে নিরপরাধীদের শাস্তি আর অপরাধীদের মুক্তি দেওয়া হয় সেদেশে যুগে যুগে আমার মত শ্রাবণদেরকেই শিকারি হয়ে উঠতে হয়।পাপের সাগরে ডুবে থাকতে থাকতে পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়েছে তোদের,এখন পাপমোচনের পালা।’

কথাগুলো বলার পর একের পর এক তীব্র যন্ত্রণা উপহার দিতে লাগলাম রিয়াদকে। যন্ত্রনায় রিয়াদের মুখ থেকে বের হওয়া আর্তনাদে কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো ঘরের চার দেওয়াল।
—-

সে রাতেই রিয়াদ আর ফাইয়াজ হুসাইনকে খুন করার পর আমি আর রেশমি দুজন মিলে স্থানীয় থানার ওসি সাহেবের বাড়িতে গিয়ে তাঁর কাছে সবিস্তারে নিজেদের সবকিছু অকপটে স্বীকার করার পর দুজনের স্বীকারোক্তি শুনে নিয়ে তিনি চেয়ারে নড়চড়ে নিয়ে তারপর গম্ভীরমুখে বললেন,’ অপরাধী যত বড় অপরাধ করুক না কেন,তাকে নিজের হাতে কেউ খুন করলে সে তার থেকেও বড় অপরাধি। তোমরা দুজনেও সেই অপরাধটায় করেছো।’

দুজনে নির্লিপ্ত মুখে জবাব দিলাম,’ হ্যাঁ স্যার। আর এখন সেই অপরাধের জন্য যদি আমাদের ফাঁসিও হয় তাতেও কোনো আপত্তি নেই। আপনি তো সবটা শুনলেন,এখন আপনার ইচ্ছামত শাস্তি দিতে পারেন।’

‘আইন অনুয়ায়ী তোমরা যেটা করেছো তার জন্য ফাঁসি না হলেও যাবজ্জীবন হাজতবাস হবে এটা সিউর। তবে আমি চাই না তোমাদের সাজা হোক। কারণ আমাদের সমাজে ফাইয়াজ সাহেবের মত এখনো বহু মানৃুষ আছেন যারা নিজেদের ক্ষমতা আর টাকা দিয়ে সবাইকে কাঠের পুতুলের মত আঙুলের ডগায় রেখে নাচাচ্ছে। এরা সমাজের জন্য অভিশপ্ত। আমরা চাইলেও মাঝেমধ্যে ওদের বিরুদ্ধে যেতে পারিনা। নিজেদের ইচ্ছামত কিছু করতে পারিনা। কারণ ওইযে আইনের শিকল দিয়ে হাত বাঁধা। তবে তোমরা যেহেতু গিয়েছো তাই তোমাদেরকে শাস্তি দিয়ে তার অবমাননা করতে চাই না। তবে একটা কথা, এভাবে নিজেদের হাতে সবসময় আইন তুলে না নিয়ে মাঝেমধ্যে একটু আমাদেরকেও ভরসা করতে শিখো। সরকারি পোষাকটাকে একটু তো কাজে লাগাতে দাও।’

‘কিন্তু স্যার…

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন ওসি সাহেব,’হাতের পাঁচ আঙুলের মত সব পুলিশরাও খারাপ হয় না। এটাও মাথায় রাখতে হবে। অবশ্য যে দেশে আইনের মাধ্যমে নিরপরাধীদের শাস্তি আর অপরাধীদের মুক্তি দেওয়া হয় সেদেশে মাঝেমধ্যে একটু আদটু আইনের বরখেলাপ হলে তেমন কিছু হবেনা। তোমরা বরং যাও। বাকিটা আমি দেখে নিবো। ওহ হ্যাঁ, মিসেস রেশমি আপনি বরং আজকের রাতটা ওই বাগান বাড়িতেই গিয়ে কোনরকম কাটিয়ে দিন। কি পারবেন না?’

‘কেন স্যার?’রেশমি প্রশ্ন করে।

‘রুহুলের লাশটা যেহেতু বাগান বাড়িতেই কবর দিয়ে ফেলেছেন,ও বেচারা বরং ওখানেই থাকুক। ওকে দিয়েই কেসটা নতুন ভাবে সাজাবো আমি।
তারপর আইনের চোখে কালো কাপড় বেঁধে মরা মানুষকে কয়দিন খুঁজে বেড়াবো ফাইয়াজ হুসাইনকে হত্যা করার অপরাধে।’

কথাগুলো বলে মৃদু হাসলেন ওসি সাহেব।
————-
পরদিন সকালে ফাইয়াজ হুসাইনের বাগান বাড়ি থেকে ফাইয়াজ হুসাইনের লাশ উদ্ধার করার সময় রেশমির বয়ানের উপর ভিত্তি করে ওসি সাহেব পলাতক রুহুল আর জব্বারের নামে মালিককে খুনের অপরাধে চার্জ ফাইল করলেন।

এক সাংবাদিক ওসি আমজাদ হুসাইনকে খুনের তদন্তের ব্যপারে জানতে চেয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বিরস মুখে জানালেন,’ মৃত ফাইয়াজ সাহেবের মৃত্যুর পর থেকে তার ড্রাইভার রুহুল এবং কেয়ারটেকার জব্বার দুজনেই গায়েব। তাই আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি এই খুনের পিছনে ওরা দুজনে কোনোভাবে জড়িত। হয়তো ফাইয়াজ হুসাইনের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ওদের দুজনকে টাকা খাইয়ে ঘটনাটা ঘটিয়েছে। এখন দেখা যাক কতদূর কি হয়।’

এ পর্যন্ত বলার পর ওসি সাহেব তার লোকজন নিয়ে ফাইয়াজ হুসাইনের লাশটা মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করে দ্বিতীয় লাশটার তদারকির জন্য ডেড স্পটে রওনা দিলেন।

-রিয়াদের লাশটা রাস্তা সংলগ্ন একটা বটগাছের ডালের সাথে ঝুলে আছে। বেশ কিছু মানুষ জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে আতংকিত নয়নে দেখছে ঝুলে থাকা লাশটাকে। রিয়াদের ঝুলে পড়া পা দুটোকে আঁকড়ে ধরে দুজন বয়স্ক মানুষ কান্না করছেন।
রক্তাক্ত শরীর,শরীরের জায়গায় জায়গায় আঘাতের চিহ্ন।

‘কি নারকীয় যন্ত্রনা দিয়েই না মারা হয়েছে মানুষটাকে! এভাবে কেউ কাউকে মারতে পারে!’
জটলার ভিতরে থাকা কয়েকজন কাপা কাপা গলায় বললো কথাগুলো।

ওসি সাহবে গাড়ি থেকে নেমে জটলা ছাড়িয়ে এগিয়ে যেতেই দেখলো,মৃত লাশের কোমরের সাথে ঝুলে থাকা একটা প্লেকার্ডের উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে,’ স্বার্থহাসিলের জন্য নিজের বউকে বিলিয়ে দিয়েছিলাম আমি। ভালোবাসার নামে বেইমানি করায় পাপের পাপমোচন করেছি তাই। আমার মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ী।’

ওসি আমজাদ হুসাইন লেখাটা পড়ে নিয়ে ঝুলন্ত লাশটার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে নিলেন একবার। তারপর মাথার টুপিটা হাতে নিয়ে একটা ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিয়ে পাশের একজন কনস্টেবলকে বলে উঠলেন, ‘ দুনিয়াটা দিনকে দিন পাপের রাজ্য হয়ে উঠছে। চারপাশে কত রকম পাপের মানুষ যে দেখবো কে জানে। যা-ই হোক লাশটাকে নামিয়ে পোস্টমর্টেমে পাঠানোর ব্যবস্থা করো।’
তারপর কাঁদতে থাকা দুজনকে জিজ্ঞাসা করলেন,’ মৃত ব্যক্তি কে হয় আপনাদের?’

পুরুষ কণ্ঠস্বরটা বলে উঠলো, ‘ স্যার আমার ছেলে। কয়েকমাস আগে আমার বউমাটাও ঠিক একইভাবে মারা গিয়েছিলো আজ ছেলেটাও চলে গেলো। এই শেষ বয়সে এসে না জানি কোন পাপের ফল ভোগ করতে হচ্ছে আমাদেরকে আল্লাহ ভালো জানেন। এখন কাকে নিয়ে বাঁচবো আমরা?’

ওসি সাহেব ভদ্রলোক কে সান্ত্বনা দিয়ে উপস্থিত জনতার মাঝে বেশ কয়েকজনকে কিছুক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করার পর রিয়াদের বাবাকে আশ্বস্ত করে তারপর গাড়িতে চেপে বসলেন।
তারপর পিছনে বসে থাকা একজনকে উদ্দেশ্য করে বললেন,’ কি বুঝলেন রহমান সাহেব?’

কনস্টেবল রহমান হায়দার বোকাসোকা চোখে তাকিয়ে থেকে পাল্টা প্রশ্ন করলো,’ কী স্যার?’

‘কিছু কিছু পাপের শাস্তি এজন্মেই পাপিকে ভোগ করতে হয়। চলুন যাওয়া যাক এখন।’

কি ভাবছেন গল্পের এখানেই শেষ? চলুন একটু রিয়াদের বাড়ি হয়ে আসা যাক।

— নিস্তব্ধ বাড়িটার অন্ধকার একটা রুমে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে একটা ছায়ামূর্তি। আবছা আলোয় আর মৃদু বাতাসে ছায়ামূর্তি টার খোলা চুলগুলো হাওয়ায় একটু পর পর দুলে উঠছে। ছায়ামূর্তিটা একদৃষ্টিতে মাথা নিচু করে তাকিয়ে আছে তার হাতে ধরে রাখা মোবাইল ফোনের স্ক্রীনের দিকে।
স্ক্রিনে ভেসে আছে রিয়াদের একটা হাস্যজ্বল মুখের ছবি।
স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে এবার সামনের দেয়ালের দিকে তাকালো সেই ছায়ামূর্তিটা। চোখজোড়া ভিষণ রকমের শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ ধূর্ততা খেলে বেড়াচ্ছে মুখ জুড়ে। সেই সাথে ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে রহস্যময় একটা হাসি।

ছায়ামূর্তিটা চাপা স্বরে বলে উঠলো,’ শ্রাবণ তোমার গল্পও শেষ। এখন তোমার গল্পের শেষ পৃষ্ঠা থেকে আমি আবার নতুন গল্পের সূচনা ঘটাবো। এটাই তো খেলার আসল মজা।’

তারপর কথাগুলো বলে অট্রহাসি হেসে উঠলো ছায়ামূর্তিটা।সেই হাসির শব্দে আলো আধারির ঘরটাও যেন মেতে উঠলো নতুন উদ্যমে।
সমাপ্ত…

#আশিক_মাহমুদ