পাষাণী তুই পর্ব-০১

0
1

#পাষাণী_তুই
#সূচনা_পর্ব
#লেখনিতে_ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি

চার বছর পর বিদেশ থেকে দেশে ফিরছে ইনায়া। শুধু ইনায়া না তার সাথে আছে তার তিন বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে। বিচ্ছেদের পর এই প্রথম সে বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখছে। ইনায়া আসতে চাইনি আসতে বাধ্য হয়েছে । তাকে বাধ্য করেছে তার পরিবার। একের পর এক ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করেছে। ইনায়া অতীতে যা ফেলে এসেছে সেগুলো আর মনে করতে চাই না। পিছু ফিরে দেখতে চাই না। কিন্তু নিয়তি যে ছাড় দেয় না। সেই ঘুরে ফিরে সেখানে এনেই দাড় করায় তাকে। কি দরকার? অতীতের কথা মনে করে নিজে কষ্ট পাওয়া। ইনায়া তার মেয়ের জীবনে তার অতীতের কালো ছায়া কিছুতেই পড়তে দেবে না। সেজন্য এই চারটা বছর সে দেশে আসেনি। আর না তেমন কারোর সাথে যোগাযোগ করেছে।

ইনায়া এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে আসে। এক হাতে ল্যাগেজ অন্য হাতে তার ছোট্ট মেয়ের হাত। ইনায়া শক্ত হাতে মেয়ে কে ধরে রেখেছে। এয়ারপোর্টে তাকে নিতে এসেছে তার বোন সানায়া। সানায়া ইনায়া কে দেখে দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে। কত গুলো দিন মাস বছর পর তার আপাই কে ছুতে পেরেছে। সানায়া খুশি তে কান্না করে দেয়। এয়ারপোর্টের অনেক মানুষ তাদের দিকে তাকাচ্ছে কিন্তু সে সবে তাদের কিচ্ছু যায় আসে না। দু’জন কে কাঁদতে দেখে ইনায়া’র মেয়ে ছোট্ট মর্ম আদোও আদোও কন্ঠে বলল,

“- মাম্মাম তোমরা কি বাবু? এভাবে কান্না করছো কেন? লোকে দেখলে তোমাদের পঁচা বলবে?

মর্ম’র কথা’য় ইনায়া কে ছেড়ে দেয় সানায়া। ছোটো ছোটো চোখে মর্ম’র দিকে তাকায়। সানায়া এতক্ষণ খেয়াল করেনি। এখানে যে তার ছোট্ট প্রিন্সেস আছে! সানায়া কোমড়ে দু’হাত দিয়ে বলল,

“- ওরে দুষ্টু মেয়ে! তুমি তো দেখি খুব পাকা৷ সানায়া হাঁটু গেড়ে বসে পরে। তারপর আবার বলল, দৌড়ে আমার কাছে আসো তো প্রিন্সেস!

মর্ম দৌড়ে সানায়া কে জড়িয়ে ধরে। সানায়া পরম যত্নে মর্ম কে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। তার বোনের মেয়ে মানে তার মেয়ে। মর্ম বলল,

“- মিমি তুমি খুচ পঁচা?

মর্ম’র কথা’য় সানায়া অবাক হয়ে বলল,

“- মিমি পঁচা হলো কেমনে শুনি?

মর্ম সানায়া’র থেকে দুরে সরে দাঁড়িয়ে বলল,

“- তুমি আমাকে জড়িয়ে না ধরে মাম্মাম কে জড়িয়ে ধরেছো কেন? তুমি খুব পঁচা! তোমার সাথে আমার আড়ি বলে অন্য দিকে মুখ করে ঘুরে দাঁড়ায় মর্ম। মর্ম’র কথা’য় হা হয়ে যায় সানায়া। অবাক হয়ে ইনায়ার দিকে তাকায়। ইনায়া হাসছে! ইনায়ার হাসি দেখে সানায়া মনে মনে বলল, কতগুলো দিন পর তোকে হাসতে দেখছি আপাই। আমি চাই তুই সবসময় হাসিখুশি থাক। সানায়া নিজের ভাবনা থেকে বেড়িয়ে বলল,

“- আপাই তোর মেয়ে তো খুব পাঁজি! শুধু পাকা পাঁকা কথা।

ইনায়া হেঁসে বলল,

“- কেবল তো শুরু। দেখ ওর জ্বালা সইতে পারিস কি না?

সানায়া ভাব নিয়ে বলল,

“- উহু! আমি পারব না এমন কোনো কাজ আছে এই পৃথিবীতে? আমি সানায়া সব পারি। তোর মেয়ে এখন আমার মেয়ে। দেখে নিস কিভাবে ওরে সামলায়। সানায়া মর্ম কে কোলে তুলে নেয়। ইনায়া কে বলল,

‘- আপাই পার্কিং লটে গাড়ি আছে। চল এবার সেখানে যাওয়া যাক। ইনায়া মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।

কিছুক্ষণ হেঁটে গাড়ির কাছে আসে তারা। মর্ম সানায়ার কোলে। সানায়া গাড়ির দরজা খুলে মর্ম কে সিটে বসায়। ইনায়ার হাত থেকে ল্যাগেজ নিয়ে গাড়ির পিছনে রেখে আসে। সানায়া কে ল্যাগেজ নিয়ে যেতে দেখে ইনায়া বলল,

“- সানু তুই ল্যাগেজ নিচ্ছিস কেন? ড্রাইভার কোথায়?

সানায়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“- আপাই উনি তো গাড়িতে।

“- তিনি না নিয়ে ওখানে বসে আছেন কেন?

“- উনি বসে আছেন বিধায় তাকে আর নামতে বলিনি। সামান্য কাজই তো তাই আমি করলাম।

ইনায়া উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করে ড্রাইভার কে। সানায়া ইনায়ার হাত ধরে বলল,

“- আপাই উঁকি ঝুঁকি মারছিস কেন? বাসায় যেতে হবে। সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে?

ইনায়া কিছু না বলে চুপচাপ গাড়িতে গিয়ে বসে পরে। সানায়াও নিজের সিটে বসে। ইনায়া রা গাড়িতে বসলে গাড়ি স্টার্ট দেয়। ইনায়া ড্রাইভারের পোশাক দেখে বলল,

“- সানু ড্রাইভারের এই পোশাক? আমাদের বাড়ির ড্রাইভার রা তো এমন পোশাক পড়ে না। হঠাৎ উনি এমন পোশাক পরছে কেন?

ইনায়ার এত প্রশ্ন করা দেখে সানায়া বলল,

“- উফসস আপাই! তুই এখনো উনাকে নিয়ে পরে আছিস? উনার যা ইচ্ছা হয় পরুক তাতে সমস্যা কোথায়? তুই এতদিন পর বাসায় যাচ্ছিস। নিজের পরিবারের কথা ভাব না? তারা তোকে দেখে কতটা খুশি হবে।

সানায়ার কথায় সুরু চোখে তাকায় ইনায়া। ইনায়া প্রথম থেকে লক্ষ্য করছে তার বোন ড্রাইভার কে সামনে আসতে দেয়নি। ড্রাইভারের কথা বললে বার বার এড়িয়ে যাচ্ছে। ইনায়া মনে মনে ভাবে সামনে যে গাড়ি ড্রাইভ করছে সে কি আদোও ড্রাইভার নাকি অন্য কেউ? ড্রাইভার হলে সামনে কেন আসবে না? সে যাই হোক না কেন? তাতে আমার কি?

সানায়া মনে মনে সামনে থাকা ড্রাইভার কে আচ্ছা করে বকছে। তার জন্য তাকে কথা ঘুরাতে হচ্ছে।

কিছুক্ষণের মধ্যে তারা চৌধুরী বাড়ির সামনে চলে আসে। ইনায়া গাড়ি থেকে নেমে পরে। সানায়া মর্ম কে নিয়ে নামে। ইনায়ার কাছে মর্ম কে দিয়ে ল্যাগেজ বের আনে। তারপর চৌধুরী বাড়ির মধ্যে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। একটু খানি পথ যেতেই থেমে যায় ইনায়া। পিছনে ফিরে তাকায়। তারা যে গাড়িতে এসেছে সেই গাড়ি টা শো শো করে চলে যায়। সানায়া খানিকটা পথ চলে গেছে। পিছনে পায়ের শব্দ না পেয়ে ঘুরে দাড়ায়। ইনায়া কে দুরে দাড়িয়ে থাকতে দেখে বলে,

“- আপাই দাড়িয়ে আছিস কেন? ভিতরে চল।

“- হ্যাঁ চল।

অতঃপর চৌধুরী বাড়ির সদর দরজায় এসে দাঁড়ায়। সানায়া মর্ম কে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইনায়া দরজার কাছে। কাঁপা কাঁপা হাতে দরজায় হাত দেয়। ইনায়ার চোখে পানি টলমল করছে। যেকোনো সময় তা নিচে গড়িয়ে পরবে।

ইনায়া হাত সরিয়ে নেয়। পিছনে সানায়ার দিকে তাকায়। সানায়া ইশারা কলিং বেল বাজাতে বলে। ইনায়া কাপা কাঁপা হাতে এবার কলিংবেল বাজায়। দুবার বাজাতেই কেউ দরজা খুলে দেয়। ইনায়া দুকদম পিছিয়ে যায়। দরজার সামনে দাড়িয়ে আছে তার মা। ইনায়া কে দেখে তিনি আবেগ উৎফুল্ল হয়ে যায়। ইনায়া কে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না করে দেন। ইনায়া মা কে পেয়ে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়। মা মেয়ের এমন দৃশ্য দেখে সবাই এগিয়ে আসে। ইনায়ার মা তাসলিমা চৌধুরী কান্না মাখা গলায় বললেন,

“- কেমন আছিস মা?

ইনায়া কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,

“- আমি ভালো আছি মা। তোমরা কেমন আছো ?

“- তোকে ছাড়া আমরা কি করে ভালো থাকি মা। তুই ছাড়া যে আমরা কেউ ভালো নেই।

“- এভাবে বলো না মা। আমার খুব কষ্ট হয়।

❝ সবাই দেখি মাম্মাম কে নিয়ে পরে আছে? এখানে যে আরো একজন আছে সেটা কি কেউ দেখছে না?

ছোট্ট মর্ম’র কথা’য় সবাই হেঁসে উঠল। তাসলিমা চৌধুরী ইনায়া কে ছেড়ে মর্ম কে কোলে নেয়। ছোট্ট মর্ম সবার সাথে খুব মিশে গেছে।

ড্রয়িংরুমে উপস্থিত আছে ইনায়ার বাবা রফিক চৌধুরী। বড় চাচা রাশেদ চৌধুরী, বড়ো চাচি রোমেনা চৌধুরী। ইনায়ার বড়ো চাচা’র একটা ছেলে। এখন সে এখানে নেই। এমনি দেশে আছে কি না ইনায়া জানে না । তাদের আর কোনো সন্তান নেই। আর ইনায়া রা দুই বোন। ইনায়া বাবা চাচা র সাথে কুশল বিনিময় করে।

ইনায়ার ছোট চাচ্চু বিদেশ থাকেন তার পুরো পরিবার নিয়ে। ইনায়া এই চারবছর তাদের বাসাতেই থেকেছে। সেখানে থেকে নিজেকে তৈরি করেছে। সাথে তার বাচ্চা মেয়ে কেউ।

★★★

চিরচেনা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে ইনায়া। মর্ম ঘুমিয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগে। একা একা দাঁড়িয়ে আছে। রাত অনেক হয়েছে। ইনায়ার চোখে ঘুম নেই। ইনায়া রুম থেকে বের হয়ে ছাদে আসে।

ছাদের কর্ণারে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক। ইনায়া দুর থেকে দেখতে পারছে যুবকে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। তবে এত রাতে তাদের বাসায় একটা ছেলে কোথা থেকে আসবে? আর ছাদেই বা আসল কিভাবে? ইনায়া র মনে প্রশ্ন জাগে। তারপর এক পা দু পা করে কর্ণারের দিকে এগিয়ে যায়। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

“- কে ওখানে?

চলবে?

[শব্দ সংখ্যা ১১০০+++]