#পাষাণী_তুই
#পর্ব_২
#লেখনিতে_ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি
ছাদের কর্ণারে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক। ইনায়া দুর থেকে দেখতে পাচ্ছে যুবকে দাঁড়িয়ে কারোর সাথে ফোনে কথা বলছে। তবে এত রাতে তাদের বাসায় একটা ছেলে কোথা থেকে আসবে? আর ছাদেই বা আসল কিভাবে? ইনায়া র মনে প্রশ্ন জাগে। ইনায়া এক পা দু পা করে কর্ণারের দিকে এগিয়ে যায়। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
“- কে ওখানে?
ছেলেটা নির্লিপ্ত! কোনো কথা বলছে না। ইনায়া সামনে আগাতে গিয়ে ভয়ে দু পা পিছিয়ে যায়। কেন না এত রাতে একা ছাদে এসেছে। আর ছেলেটার যদি খারাপ চিন্তা ভাবনা থাকে। তখন? তবুও ইনায়া সাহস করে সামনে এক পা আগায়। আবার বলল,
“- কে আপনি? ছাদে আসলেন কিভাবে?
সহসা ছেলেটা ঘুরে দাঁড়ায়। ইনায়া চমকে দুকদম পিছিয়ে যায়। ছেলে টা নির্লিপ্ত চাহুনি তে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। ইনায়া অবাক হয়ে বলল,
“- মেঘ ভাইয়া তুমি ।
রাজের পুরো নাম মেঘরাজ চৌধুরী। পেশায় ডক্টর। সবাই ডক্টর মেঘরাজ চৌধুরী নামেই চিনে। বাসার সবাই রাজ নামে ডাকলেও ইনায়া ছোটো বেলা থেকে মেঘ ভাইয়া বলে ডাকে। ইনায়া কে কেউ কখনো নিষেধ করেনি। মেঘের কাছে ইনায়ার দেওয়া নামটা খুব স্পেশাল। মেঘ নামে কাউকে কখনো ডাকতে দেয়নি।
মেঘ এগিয়ে আসল ইনায়ার কাছে। ইনায়া এখনো অবাক চোখে মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে। মেঘ ভাবেনি এত তাড়াতাড়ি তার ইনায়ার সাথে দেখা হয়ে যাবে। মেইন কথা মেঘ দেখা করতে চাইনি। কিন্তু এত দ্রুত সাক্ষাৎ হবে ভাবেনি। মেঘ এগিয়ে ঠিকই আসল কিন্তু কোনো কথা বলছে না। এক ধ্যানে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। ইনায়া আবার বলল,
“- মেঘ ভাইয়া।
‘- তবুও মেঘ নিশ্চুপ! ইনায়া এবার করুন কন্ঠে ডেকে উঠল ভাইয়াাাাাাা…….কথা বলবে না?
মেঘ গম্ভীর মুখে বলল,
“- অবশেষে আমাকে চিনতে পেরেছেন আপনি?
মেঘের কথা’য় চুপসে যায় ইনায়া। মেঘের বলার যথেষ্ট কারণ আছে। ইনায়া এই চার টা বছরে একটা বারের জন্য ও মেঘের সাথে যোগাযোগ করেনি। এমনকি চার বছর আগে মেঘ তখন বিদেশ ছিল। তখন ফোন দিয়ে বারবার ইনায়া কে বলেছিল তুই বিয়ে করিস না। হুট করে বিয়ের মতো এমন একটা সিদ্ধান্ত নিস না। কিন্তু ইনায়া মেঘের কথা’য় গুরুত্ব দেয়নি। মায়ের কথা মতো তার বোনের ছেলেকে বিয়ে করে নেয়।
রাজ হেঁসে উঠল। তারপর বলল,
“- চুপ করে আছিস যে। আমার কথার উত্তর দিবি না?
ইনায়া মেঘের দিকে তাকাল। মেঘ তার উত্তরের অপেক্ষায় ইনায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। ইনায়া মৃদু হেসে বলল,
“- তেমন কিছু না মেঘ ভাইয়া। তোমার কথা শুনছিলাম। তা বলো তুমি কেমন আছো?
মেঘ গম্ভীর কণ্ঠে সুধালো,
“- আমি বেশ আছি। বলতে পারেন বিন্দাজ লাইফ লিড করছি।
ইনায়া মেঘের দিকে কেমন করে তাকালো। তার মেঘ ভাইয়া তাকে আপনি করে বলছেন। ইনায়া তাচ্ছিল্যের হেঁসে বলল,
“- শুনে ভালো লাগল। তবে একটা কথা কি জানো মেঘ ভাইয়া?
“- কি!
“- মানুষ সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়ে যায়। এটা চিরন্তন সত্য কিন্তু এতটা পরিবর্তন হয় জানতাম না। কেমনে এত পরিবর্তন হয়ে গেলা বলবা?
“- কি বলতে চাইছেন আপনি?
“- সিম্পল! এই দেখো না তুমি আমাকে তুই করে বলতে এখন আপনি করে বলছো? তাহলে বলব না তুমি পুরা চেঞ্জ হয়ে গেছো?
মেঘ তাচ্ছিল্যের হেঁসে বলল,
“- আমাকে এ কথা জিজ্ঞেস না করে নিজেকে আগে প্রশ্ন কর? তুই এই চার টা বছরে একটা বার আমাকে কল দিছিস? কোনো দিন এক মিনিট ফোন দিয়ে বলছিস ভাইয়া কেমন আছো?
“- আমি না হয় দেইনি কিন্তু তুমি দিছো? তুমি তো ফোন দিয়ে শুনতে পারতে ইনায়া কেমন আছিস? কই তা তো করো নি। তখন আমার মেন্টালি অবস্থা ভালো ছিল না। সাপোর্ট দেওয়ার মতো কাউকে পাইনি। সে যাই হোক যা হয়েছে বাদ দাও। এ বিষয়ে আমি আর কথা বাড়াতে চাই না। ভালো লাগে না।
মেঘ ইনায়ার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। অনেক টা পাল্টে গেছে মেয়ে টা। সেই আগের মতো আর নেই। অনেক কিছু বুঝতে শিখেছে। এই স্বার্থপর সমাজে কিভাবে নিজেকে বাঁচাতে হয়। সেটা খুব ভালো মতো বুঝেছে। মেঘ আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ ছাদ থেকে নেমে যায়।
মেঘের যাওয়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইনায়া। কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে তার। কি এমন দোষ করেছে যার জন্য তাকে এত সাফার করতে হচ্ছে। সেই কবেই হয়তো আল্লাহর কাছে চলে যেত। শুধু তার নিষ্পাপ মাসুম বাচ্চা টার দিকে তাকিয়ে চুপচাপ নিজের ভাগ্য কে মেনে নিয়েছে।
ইনায়া খোলা আকাশের নিচে বসে পরে। আকাশের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে বলল,
“- সব তো মেনে নিয়েছি আল্লাহ! তাহলে কেন এত কষ্ট হয়! আপনজনের ব্যথা যে কুড়ে কুঁড়ে খায়। সবাই কেমন পাল্টে গেছে। কেউ আর আগের মতো ভালোবাসে না। এই স্বার্থপর পৃথিবীতে সবাই স্বার্থপর। সবাই নিজের জন্য বাঁচতে চাই! ইনায়া ডুকরে কেঁদে ওঠে।
চিলেকোঠার দরজায় দাঁড়িয়ে সবটা দেখছে মেঘরাজ। মেঘের দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে হাতে পরে। মেঘ নিরবে চোখের পানি মুছে ছাদ থেকে নেমে আসে।
ইনায়া নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ায়। তাকে ভেঙে পরলে চলবে না। তার মেয়ের জন্য লড়াই করতে হবে। বাঁচতে হবে! এই স্বার্থপর পৃথিবীতে তাকে টিকে থাকতে হবে। যতদূর সম্ভব এখানকার সব ঝামেলা শেষ করে চলে যেতে হবে। পিছু ফিরে তাকালে তার চলবে না।
★★★
নতুন একটা সকালের সূচনা হয়। বিছানায় মেয়ে কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে ইনায়া। ইনায়া অনেক্ক্ষণ হলো জেগে গেছে। মাম্মাম কে ঘুমাতে দেখে আর ডেকে তুলে না। মর্ম আস্তে আস্তে ইনায়ার হাত ছাড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে পরে। ইনায়া ঘুরে আবার ঘুমিয়ে পরে। মর্ম পা টিপেটিপে রুম থেকে বেড়িয়ে যায়।
ড্রয়িংরুমে বসে সবাই চা খাচ্ছেন। বাড়ির সকলে থাকলেও নেই শুধু ইনায়া। সানায়া ইনায়া ডাকতে যাচ্ছিল কিন্তু তাকে যেতে দেয়নি মেঘ। সানায়া মেঘের কথা শুনে আর যায়নি। মর্ম ছাদের সিড়ি বেয়ে নিচে নামে। ড্রয়িংরুমের সোফায় সবাই কে চিনলেও মেঘ কে চিনতে পারেনি। মেঘ ঠিকই মর্ম কে চিনছে। মর্ম কোমড়ে হাত দিয়ে মেঘের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“- এই যে হিরো! তুমি কে গো? তোমাকে তো চিনতে পারলাম না।
মর্ম’র কথা’য় হেঁসে উঠল সকলে। মেঘ মুচকি হেঁসে বলল,
“- আমার কাছে আসো তারপর বলছি।
মর্ম আঙুল কামড়িয়ে বলল,
“- আমি অপরিচিত কারোর কাছে যায় না৷ মাম্মাম বলেছে অপরিচিত কারোর কাছে যাবে না।
মেঘ মনে মনে হাসল। তারপর বলল,
“- আমি কি ছেলেধরা? যার জন্য তুমি আসবে না।
মর্ম ভাবুক হয়ে বলল,
“- ছেলে ধরা আবার কি?
“- কেন তুমি জানো না।
“- নাহহ তো!
সানায়া মর্ম কে বলে,
“- প্রিন্সেস উনি তোমার মামা হয়। মামার কাছে যাও।
মর্ম সবার দিকে তাকিয়ে মেঘের দিকে তাকায়। মেঘ ইশারায় কাছে আসতে বলছে। মর্ম গুটিগুটি পায়ে মেঘের কোলে বসে। মেঘ মর্ম কে চকলেট দেয়। মর্ম তো খুব খুশি। তার মাম্মাম তাকে চকলেট খেতে দেয় না। মর্ম খুশি হয়ে বলে,
“- তুমি খুব ভালো! আমাকে এভরি ডে তুমি চকলেট দেবে ওকে মামা! মেঘ মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।
ইনায়া ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিচে আসে। ড্রয়িংরুমে সবাইকে দেখে। ইনায়া চুপচাপ সোফায় গিয়ে বসে। মেঘ ইনায়ার দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ায়। মা কে ডেকে বলল,
“- মা আমি হসপিটালে যাচ্ছি। এখন খাওয়ার সময় নেই। হসপিটালের ক্যান্টিন থেকে কিছু খেয়ে নেব। মেঘ বাসা থেকে বের হয়ে যায়। মেঘের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে ইনায়া। ইনায়ার মনে অনেক গুলা প্রশ্ন আঁকিবুঁকি করছে! যে গুলো উত্তর তার অজানা!
চলবে~