পাষাণী তুই পর্ব-০৭

0
1

#পাষাণী_তুই
#পর্ব_৭
#লেখনিতে_ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি

মেঘ একটা পুরানো ডায়রি ডয়ার থেকে বের করে খাটের উপর বসে। খুব যত্নে সবার আড়ালে এতদিন লুকিয়ে রেখেছিল। মেঘের হাতে কতগুলো কাচের চুড়ি। যে গুলো ডায়রির সাথে ডয়ারে রেখেছিল। মেঘ ডায়রির ভাজ খোলে। ডায়রির ভিতরে একটা লাল গোলাপ। মেঘ প্রতি মাসে একটা করে লাল টকটকে গোলাপ ডায়রির ভাজে লুকিয়ে রাখে। যখনই সে টা শুকিয়ে যায় তখনই সেটা পাল্টে আরেকটা রাখে। এভাবে অনেক গুলো শুকনো গোলাপ ডয়ারে পরে আছে।

মেঘ ডায়রির ভাজ থেকে গোলাপ টা হাতে নিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। যেন ডায়রি আর গোলাপের মধ্যে তার প্রিয় মানুষ কে দেখতে পায়। প্রিয় মানুষের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। মেঘ গোলাপ টা হাত থেকে বিছানায় রাখে। একটা কলম নিয়ে ডায়রি টা হাতে নেয়। প্রিয় মানুষের জন্য কিছু লিখবে। মেঘ লিখতে শুরু করে,

“- আমার শূন্যতার খাতায় কখনো কি তুই পূর্ণতা হয়ে আসবি না! কখনো কি আমার ভালোবাসা বুঝবি না! এত

দিন তো অনেক অপেক্ষা করালি এবার না হয় আমার ভালোবাসা টা বোঝ! তোকে আপন করে নিতে দে। আমার ভালোবাসায় তোর সব অতীত ভুলিয়ে দেবো। এতটা দিন আমার থেকে দুরে থেকেছিস। কিছু বলিনি। এবার না হয় নিজে থেকে আমার কাছে ধরা দে। তুই খুব পাষাণী! পাষাণী তুই শুধু আমার হবি!

লেখা শেষ করে মেঘ ডায়রি টা বন্ধ করে দেয়। তারপর রুম থেকে বের হয়। ড্রয়িংরুমে এসে দেখে সবাই খাবার টেবিলে খাওয়া প্রস্তুতি নিচ্ছে।৷ মেঘ চুপচাপ তার চেয়ারে গিয়ে বসে পরে। মেঘের আম্মু ফিরোজা চৌধুরী আর তাসলিমা চৌধুরী সবাই কে খাবার সার্ভ করেন। খাওয়া শেষ হলে যে যার মতো টেবিল থেকে উঠে যায়।

****
আজ শুক্রবার। বন্ধের দিন। সবার বন্ধ থাকলেও মেঘের বন্ধ নেয়। মেঘ ভেবেছিল আজ ছুটি নিবে। শুক্রবার হসপিটালের চাপ কম হবে কিন্তু না। তা আর হলো না। তাকে এখনই হসপিটালে যেতে হবে। মেঘ দ্রুত রেডি হয়ে বাসা থেকে বের হয়।

ইনায়া বাসায় একা একা বোরিং ফিল করছে। সানায়া ওর কোন ফ্রেন্ডের বাসায় গেছে নোটস নাকি কি আনতে। ইনায়া বের হওয়ার কথা ভাবছে। রুমে এসে মর্ম কে জিজ্ঞেস করে,

“- মামণি তুমি কি তোমার মাম্মা মের সাথে বের হবে নাকি নানুদের কাছে থাকবে?

মর্ম হাসি দিয়ে বলে,

“- তোমার সাথে যাবো মাম্মাম!

ইনায়া হেঁসে মেয়ে কে জড়িয়ে ধরে বলল, আচ্ছা মা। তুমি আমার সাথে ই যেও। তাহলে এখন ঝটপট তৈরি হয়ে নাও। বের হতে হবে তো। মর্ম হেসে ল্যাগেজ থেকে ড্রেস এনে ইনায়ার হাতে দিয়ে দেয়। ইনায়া মর্ম কে ড্রেস পড়িয়ে সুন্দর করে চুল বেঁধে সাজিয়ে দেয়। তারপর নিজেও একটা শাড়ি নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়।

সাধারণত ইনায়া শাড়ি খুব কম পরে। শাড়ি পড়েই না বলতে গেলে। বাসায় থাকলে সবসময় সুতি কাপড় পড়ে। বিদেশ থাকার সময় জিন্স প্যান্ট আর লং জামা পড়তো। কখনো থ্রি পিস। সবসময় শালীন ভাবে চলাফেরা করেছে।

আজ অনেক দিন পর শাড়ি পরছে। ইনায়া রেডি হয়ে বাইরে আসে। মর্ম গুড গার্ল মেয়ে। চুপচাপ মা’য়ের জন্য অপেক্ষা করছে।।

ইনায়া মেয়ে কে নিয়ে ড্রয়িংরুমে আসে। দুজন কে পরিপার্টি হয়ে আসতে দেখে এগিয়ে আসেন তাসলিমা চৌধুরী। তিনি জিজ্ঞেস করেন,

“- ইনায়া মা, কোথাও বের হচ্ছিস নাকি।

ইনায়া মৃদু স্বরে বলল,

“- হ্যাঁ মা। একটু বের হচ্ছি।

“- একা যাচ্ছিস।

“- হ্যাঁ মা।

“- রাজ কে ফোন দিয়ে বলি তোকে নিয়ে যাবে। এগিয়ে আসতে আসতে কথাটা বলেন মেঘের আম্মু।

ইনায়া উত্তর দেয়,

“- না না তার দরকার নেই বড়ো আম্মু। আমি একাই পারব। এতদিন না হয় দেশে ছিলাম না। তাই বলে কি সব ভুলে গেছি নাকি। আমার সব মনে আছে বড়ো আম্মু। আমি একাই পারব।

“- আচ্ছা বেশ। তবে সাবধানে যাস। আর সাবধানে ফিরে আসিস। বেলা বাড়ছে।

“- জ্বি। দ্রুত ফেরার চেষ্টা করব।

তাসলিমা চৌধুরী ইনায়া র মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,

“- সাবধানে যাবি মা। বাড়ির গাড়ি নিয়ে যাবি।

“- না মা। আজ গাড়ি নিবো না। আজ এই শহর টা আমরা মা মেয়ে নিজেদের মতো ঘুরবো। আমাদের মধ্যে কেউ আসবে না।

তাসলিমা চৌধুরী মুচকি হাসেন। তবে তার ভিতর টা শেষ হয়ে যাচ্ছে। আজ তার জন্য তার আদরের মেয়ে টার এই অবস্থা। তখন যদি আরেকটু ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতো তাহলে হয়তো আজ তার মেয়ে টা র জীবন অন্য রকম হতো। সুখের সংসার হতো। ইনায়ার ভাগ্যের জন্য নিজেকে দায়ি করেন। চোখে পানি জমে। ইনায়া দেখার আগে মুছে নেন। তারপর বললেন,

“- আচ্ছা সাবধানে। আমার নানু কে দেখে নিয়ে যাস।

“- আচ্ছা মা আসি।

তাসলিমা চৌধুরী মাথা নেড়ে যেতে বলেন। ইনায়া চৌধুরী বাড়ি থেকে বের হয়। ইনায়ার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে কেঁদে দেন তিনি। ফিরোজা চৌধুরী এগিয়ে এসে বলেন,

“- কাঁদিস না মেজো। সব ঠিক হয়ে যাবে। দেখিস একদিন আমাদের ইনায়া খুব সুখী হবে।

তাসলিমা চৌধুরী কাঁদতে কাঁদতে বলেন,

“- কিভাবে আপা। কিভাবে আমার মেয়ে টা আগের মতো হাসি খুশি থাকবে? কিভাবে সবার সাথে মন খুলে কথা বলবে? ও তো এখন আর আগের মতো কারোর সাথে কথা বলে না। মেয়ে কে নিয়েই সবসময় থাকে। মর্মের জন্য ই আমার মেয়ে টা এখনো বেঁচে আছে।

ফিরোজা চৌধুরী কাঁধে হাত রেখে বলেন,

“- ইন শা আল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে। আল্লাহর উপর ভরসা রাখ। সব হবে। আমাদের ইনায়া হাসবে। মন খুলে হাসবে। সবার সাথে মন খুলে কথা বলবে।

“- আল্লাহর উপর ভরসা করি আপা। কিন্তু আমি তো কোনো আশার আলো দেখতে পারছি না। এমন কেউ কি আছে। যে আসবে আমার ইনায়ার জীবনে। এসে ওর জীবনটা রঙিন করে দেবে। হাসি খুশিতে ওর জীবন হয়ে উঠবে রঙিন।

“- অবশ্যই আসবে। আমাদের ইনায়া এমনটা ডিজার্ভ করে। আমি তোকে বলছি ওর জীবন রঙিন করার জন্য একজন আসবে। যে ওর জীবনের কালো অতীত অন্ধকার দুর করবে। আগের মতো রঙিন হয়ে উঠবে। স্বপ্ন দেখবে। সবটা হবে। মিলিয়ে নিস।

“- তাই যেন হয় আপা। আমিও চাই আমার মেয়েটার জীবনে কেউ আসুক। কিন্তু ও তো বিয়ে নামক শব্দ টা শুনতে পারে না। ও আর চাই না ওর জীবনে কেউ আসুক। বাকিটা জীবন মেয়ে কে নিয়ে একা কাটাতে চাই।

“- একদিন আসবে যেদিন ও রাজি হবে। এখন আর না কেঁদে চল দু’জনে কাজ গুলো সেরে ফেলি।

তাসলিমা চৌধুরী চোখের পানি মুছে। একবুক আশা নিয়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে। সব যেন ভালো হয়। সব অন্ধকার দুর হয়ে আলোর দেখা পাক তার মেয়েটা।

★★★

মেয়ের হাত ধরে হাঁটছে ইনায়া। অনেক দিন পর মন খুলে হাসছে। ছোট্ট মর্ম তা মাম্মাম কে হাসানের জন্য বিভিন্ন কথা বলছে, বায়না ধরছে। ইনায়া হাসি মুখে সবটা মেনে নিচ্ছে। তার এই ছোট্ট জীবনে তার মেয়ে টাই সব। মেয়ের জন্য সে সব করতে পারে।

দুর থেকে একজোড়া চোখ ইনায়া কে দেখছে কিন্তু ইনায়া কিছু টের পাচ্ছে না। মেয়ে কে নিয়ে একটা হাওয়াইমিঠায় ওয়ালা মামার কাছে যায়। আর তখনই……….

চলবে~