#পাষাণী_তুই
#পর্ব_৯
#লেখনিতে_ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি
মর্ম মেঘ কে দেখে দৌড়ে চলে আসে। মেঘ মর্ম কে খেয়াল করেনি। হঠাৎ পায়ে কারোর স্পর্শ পেয়ে নিচে তাকিয়ে দেখে মর্ম। মর্ম কে দেখে হাসি ফুটে ওঠে মেঘের ঠোঁটে। তারপর ঝুঁকে বসে নিচে। মেঘ মর্মের গাল আলতো করে ছুয়ে বলল,
“- আম্মাজান!
মর্ম খিলখিল করে হেঁসে দেয়। মর্ম’র হাসি দেখে মেঘ ও হেসে দেয়। মেঘ মর্ম কে কোলে তুলে নেয়। মর্ম দু’হাতে জড়িয়ে ধরে মেঘের গলা।
“- আম্মাজান! তুমি আজ ঘুরবে?
সহসা ইনায়া বলল,
“-আমরা বাসায় যাবো মেঘ ভাইয়া।
“- কেন?
“- এমনি। ভাল্লাগছে না। মর্ম মামণি চলো বাসায় যাবো।
মর্ম ঠোঁট উল্টে বলল,
“- মাম্মাম আমরা তো মাত্র এলাম। এখনই বাসায় চলে যাবা। চলো না আজ আমরা তিনজনে ঘুরি।
ইনায়া চোখ রাঙিয়ে তাকায় মর্মর দিকে। মর্ম ভয়ে মাথা নিচু করে নেয়৷ ইনায়া কঠোর গলায় বলল,
“- কোনো কথা না। আমরা আরেকদিন আসব। সেদিন অনেক ঘুরবো মা। আজ বাসায় চলে যায়। মাম্মামের ভালো লাগছে না।
মর্ম মাথা নেড়ে আচ্ছা বলে। মেঘ অবাক হয়ে বলল,
“- ইনায়া এটা তুই কি করছিস। ওকে চোখ রাঙাচ্ছিস কেন? বাচ্চা মেয়ে টা কত ইচ্ছে নিয়ে তোর সাথে ঘুরতে বের হয়েছে। আর তুই সামান্য একটা বিষয় নিয়ে না ঘুরেই বাসায় চলে যাবি।
“- হ্যাঁ ভাইয়া। অন্য এক দিন ঘুরবো।
“- এটা হবে না। আমি আছি এই জন্য তুই ঘুরতে চাইছিস না নাকি ওর জন্য? কোনটা?
ইনায়া চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলল,
“- এমনিতেই হঠাৎ করে ভালো লাগছে না।
“- শোন, মর্ম ছোট্ট। বাংলাদেশে এসে আজ প্রথম তোর সাথে ঘুরতে বের হয়েছে আর তুই ওকে না ঘুরিয়ে বাসায় নিয়ে গেলে ওর মন খারাপ হয়ে যাবে। আমি এটাও বুঝতে পারছি তুই কেন ঘুরতে যেতে চাইছিস না। ইমরানের জন্য তাই তো? শোন, ও তোর অতীত, অতীত নিয়ে না ভাবা টায় তোর জন্য বেটার। তুই ওকে দেখিয়ে দে তুই ও ভালো থাকতে পারিস।
“- কিন্তু কিভাবে মেঘ ভাইয়া?
মেঘ বিড়বিড় করে বলে
“- আমাকে বিয়ে করে।
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
“- কিছু বললে।
মেঘ বোকা হেঁসে বলল,
“- কই না তো।
“- মনে হলো তুমি কিছু বললে?
“- হ্যাঁ বললাম তো,।
“- কি?
“- বলছি তুই নিজের জীবন টা সুন্দর করে গুছিয়ে দেখিয়ে দে। তুই ও ভালো আছিস। ভালো থাকতে পারিস।
ইনায়া হাসল। তবে সেটা তাচ্ছিল্যের হাসি। মর্ম থাকায় তেমন কিছু বলল না। বলল,
“- চলো যাওয়া যাক।
“- কোথায়? অবাক হয়ে বলল মেঘ।
“- এখনই ভুলে গেলে। তুমি ই তো বললে ঘুরতে নিয়ে যাবা।
ইনায়ার কথা’য় ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে মেঘের। মেঘ হেসে বলে,
“- ও তাই তো। চল।
ইমরান দুর থেকে তিনজন কে দেখে নিজের চোখের পানি মুছে নেয়। নিজের ভুলের জন্য আজ সে ইনায়া কে হারিয়েছে। আসলেই মানুষ যখন ভুল করে তখন বুঝতে পারে না। আর যখন বোঝে তখন চাইলেও আর কিছু করতে পারে না। তবে মেঘ যে ইনায়া কে বিয়ে করবে সেটা সে কস্মিনকালেও ভাবেনি। মেঘের মতো একজন ছেলে কি না ডিভোর্সি মেয়ে কে বিয়ে করল। ভাবতেই অবাক লাগছে তার। কিন্তু এটা ভেবে ভালো লাগছে যে ইনায়া একজন যোগ্য স্বামী পেয়েছে। সে তো আর যোগ্য স্বামী হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু একজন তো পেরেছে।
রুপের মোহে সে অন্ধ হয়ে জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল করেছে। আসলে রুপ থাকলেই সব হয় না। মানুষের মন টাই মেইন। ভালোবাসা টায় আসল। আপনাকে যে মন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসবে আপনি তার ভালোবাসা টা দেখেও বুঝবেন না। অথচ যে আপনাকে ভালোবাসে না। রুপের মোহে আকর্ষণ করবে। আপনি তার দিকেই ঝুঁকে পড়বেন। কিন্তু ভুলেও এই কাজটা করবেন না। আপনার জীবন সঙ্গী যদি আপনাকে জান দিয়ে ভালোবাসে। তাহলে সেটা আগলে রাখার চেষ্টা করবেন। তাকে নিজের ভালোবাসার বাহুডোরে আগলে রাখবেন। কখনো কাউকে ছুতে দেবেন না।
ইমরান জীবনে যে ভুল করেছে তার কোনো মাশুল হয় না। সারাটা জীবন তাকে শুধু পস্তাতেই হবে। প্রতিটা ক্ষেত্রে তাকে মনে করিয়ে দেবে তুই ভুল করেছিস ইমরান। যে ভুলের কোনো ক্ষমা হয় না। ইমরান চোখের পানি মুছে হাসি মুখে নিজের গন্তব্যে হাটা ধরে।
★★★
তিনজনে একটা রিক্সায় উঠে বসে। মেঘ রিকশা ওয়ালা মামা কে বলল,
“- মামা আমাদের কে ওখানে নিয়ে চলুন। মেঘ একটা জায়গার নাম বলে। রিকশা ওয়ালা মামা তাদের কে সেখানে নিয়ে যায়।
মিনিট বিশেক পর সেখানে পৌঁছায়। মেঘ ভাড়া মিটিয়ে মর্ম কে কোলে নিয়ে হাটতে শুরু করে। মেঘের পিছনে পিছনে ইনায়া নিরিবিলি হাঁটছে। ইনায়া আশেপাশে তাকিয়ে দেখে আগে এই জায়গা টায় কখনো আসা হয়নি। চেনে না সে। এখন বেলা বারোটা বাজতে চলল। এই সময় মানুষ জনের ভিড় কম। তবুও অনেক মানুষ আছে। যেহেতু আজ বন্ধের দিন। এই একটা দিনেই তো সবাই তার প্রিয় মানুষের সাথে একান্ত কিছু সময় কাটাতে চাই। মেঘ কে অনুসরণ করে সামনে আগাচ্ছে ইনায়া। তারা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে। ইনায়া সবচেয়ে বেশি অবাক হয় এটা দেখে যে সিড়ির পর তারা যেখানে হাঁটছে সেটা বাঁশের তৈরি। খুবই সুন্দর! নদীর পাড়ে টিন দিয়ে তৈরি ছোটো ছোটো ঘরের মতো। একেক টা ঘরে পাঁচ ছটা চেয়ার তার সাথে টেবিল। মেঘ গিয়ে সেখানে বসে। মেঘ মর্ম কে চেয়ারে বসিয়ে দেয়। ইনায়া দাঁড়িয়ে আছে দেখে মেঘ বলল,
“- বোস।
ইনায়া বসল। বৃষ্টি হওয়ায় নদীতে পানি টুইটুম্বর করছে। ইনায়া হাত বাড়িয়ে পানি ছুয়ে দেয়। ঠান্ডা পানি আকাশে তেমন রোদ নেই। এই বৃষ্টি তো এই রোদ। পরিবেশ টা খুবই সুন্দর। ইনায়ার ঠোঁটের কোণে হাসি। যা দেখে মনে মনে হাসে মেঘ। এই হাসির জন্য সে সব করতে পারবে। অথচ কিছু করার সুযোগ নেই তার।
একটু পর ওয়েটার আসে। মেঘ ইনায়া কে কি খাবে অর্ডার করতে বলে। ইনায়া বলল,
“- তুমি যা করবে করো৷ তবে ভাড়ি খাবার যেন করবে না।
মেঘ আচ্ছা বলে মেনু দেখছে। ইনায়ার সবচেয়ে পছন্দের পিজ্জা অর্ডার দেয়। মর্মের জন্য আইসক্রিম চকলেট এগুলো দেয়। আরো দিতে চেয়েছিল কিন্তু ইনায়া দিতে দেয় নি।
ওয়েটার অর্ডার নিয়ে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর খাবার নিয়ে ফিরে আসে।
মর্মের খুব পছন্দের খাবার আইসক্রিম চকলেট। তবে সে গুলো খেতে দেয় না ইনায়া। সবসময় খুব কম খেতে দেয়। এগুলো খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না। মেঘ ডক্টর হয়েও কেন যে এগুলো অর্ডার দিল। বুঝল না সে। কিন্তু প্রথম দিচ্ছে বলে কিছু বলেনি। মর্ম আইসক্রিম চকলেট পেয়ে খুবই খুশি। খুশি মনে সেগুলো খাওয়া শুরু করে। ইনায়া একটু একটু করে খাচ্ছে। মেঘ নিজের জন্য কফি অর্ডার দিছে তাই খাচ্ছে।
অনেক্ক্ষণ সময় কাটায় তিনজনে। ইনায়া র খাওয়া শেষ হয়েছে অনেক আগে। ইনায়া নদীর দিকে তাকিয়ে থেকে মেঘ কে বলল,
“- তুমি না বললে তোমার হসপিটালে জুরুরি কাজ আছে। তাহলে এখানে আসলে কিভাবে?
ইনায়ার কথায় চোখ তুলে তাকায়। ইনায়া নদীর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মেঘ বলল,
“- হসপিটালের কাজ শেষ করে বের হয়েছিলাম। মাঝ রাস্তায় এসে দেখি তোরা। তাই তো এগিয়ে আসলাম।
“- ওহ। তুমি তো গাড়ি নিয়ে আসছিলে। তাহলে গাড়ি কোথায়?
মেঘ মনে মনে হাসে। তারপর বলল,
“- গাড়ি হসপিটালের পার্কিং এ আছে।
“- গাড়ি আনোনি কেন?
“- এমনি। ইচ্ছে করে রেখে আসছি।
ওহ। ইনায়ার ছোট্ট জবাব।
ইনায়া নদীর মাঝে চলা নৌকার দিকে তাকিয়ে আছে। মাঝি নৌকা বয়ছে। মেঘ লক্ষ্য করে বলল,
“- নৌকায় উঠবি।
ইনায়া চুপ রইল। মেঘ বুঝল ইনায়ার সম্মতি আছে। ইনায়ার কোলে মর্ম কে দিয়ে বলল,
“- চল। অতঃপর তিনজন নৌকায় চড়ে। ইনায়ার খুব ভালো লাগছে। এভাবে কখনো নৌকায় ঘুরা হয়নি।
অতঃপর সেখান থেকে বের হয়। উদ্দেশ্য তাদের চৌধুরী বাড়ি।
চলবে~