পাষাণী তুই পর্ব-১২

0
1

#পাষাণী_তুই
#পর্ব_১২( বোনাস পর্ব)
#লেখনিতে_ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি

“- আমাকে মর্ম’র পাপা হওয়ার সুযোগ দিবি ইনায়া?

আকস্মিক মেঘের কথা’য় চমকে তাকায় ইনায়া। মেঘের দিকে অবাক চোখে তাকায়। মেঘ তার দিকে করুন চোখে তাকিয়ে আছে। ইনায়ার চোখে মুখে ফুটে ওঠে অজানা ভয়ের ছাপ। যা ভেবে কেঁপে ওঠে৷ সে। ইনায়া র চমকিত মুখ দেখে মেঘ আবার বলল,

“- দিবি একটা সুযোগ?

ইনায়া কথা বলতে ভুলে গেছে। একের পর এক শক সে নিতে পারছে না। নেওয়ার মতো অবস্থায় সে নেই।
ইনায়া কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

“- তুমি মজা করছো? মজা করে আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য বলছো তাই না?

মেঘ সিরিয়াস হয়ে বসল। ইনায়ার হাত ধরে বলল,

“- আমি মজা করে বলছি না ইনায়া। আমি সত্যি বলছি। দিবি একটা সুযোগ? কখনো বাবার অভাব বুঝতে দেবো না ওকে। সব সময় বট গাছের মতো ছায়া দিয়ে আগলে রাখবো।

ইনায়া এতক্ষণ শান্ত থাকলেও এবার চিৎকার করে ওঠে। চেচিয়ে বলে,

“- আমাকে তোমরা কি মনে করেছো হ্যাঁ? আমি ফ্যাল না। আমাকে যে দিকে নিবা আমি সে দিকেই যাবো। আমার কোনো গুরুত্ব নেই। সব সময় তোমরা যা সিদ্ধান্ত নিবা তাই মেনে নিতে হবে। এমন টা কেন করো তোমরা? আমাকে কি শান্তি মতো বাঁচতে দিবে না। এখন তো মনে হচ্ছে এখানে আসা টায় সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছে। ওই ভিনদেশেই আমি ভালো ছিলাম।

ইনায়ার চেচামেচি শুনে সবাই দৌড়ে আসে কিন্তু ভিতরে যায় না। বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে সবটা শোনে।

মেঘ নিজেকে ঠিক রেখে বলে,

“- তুই নিজেকে কেন একা ভাবিস? আমরা সবাই তোর পাশে আছি থাকবো। তুই একা নস।

“- আমি বাচ্চা নই। আমাকে এসব বলে সান্ত্বনা দিও না প্লিজ।

“- আমাকে বিয়ে করবি?

ইনায়া যেন আবারও ঝটকা খায়। অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায় মেঘের দিকে। মেঘ আবার বলে,

“- বিয়ে করবি আমায়? খুব সুখে রাখবো? আমার ভালোবাসা দিয়ে তোর অতীত ভুলিয়ে দেবো প্রমিজ?

ইনায়া উঠে দাড়িয়ে বলল,

“- আর ইউ ক্রেজি? তুমি পাগল হয়ে গেছো মেঘ ভাইয়া? নিশ্চয়ই বাইরে থেকে কিছু খেয়ে এসেছো তাই না। এসব ফালতু কথা বলার জন্য সবাইকে বের করে দিয়েছো তাই না। একদম আজেবাজে কথা না। আমার ভাল্লাগছে না।

“- তুই কেন বুঝিস না ইনায়া আমি তোকে ভালোবাসি! একটুখানি না এতটা ভালোবাসি। দু’হাত প্রসারিত করে দিয়ে বলে। মেঘের মুখে ভালোবাসি শব্দ টা শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় ইনায়া। নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারছে না।

ইনায়া কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

“- দেখো মেঘ ভাইয়া৷ এসব কথা বলো না। তোমার মাথা ঠিক নেই। তুমি নিজের হুশে নেই। আর বাসার সবাই শুনতে পেলে কি হবে ভাবতে পারছো?

মেঘ হাসছে। তবে আস্তে নয় খুব জোরে জোরেই হাসছে। মেঘের হাসির শব্দ ছাদের রুমে খুব শব্দ করে বাজছে। মেঘের হাসি দেখে ইনায়া কিছু না বলে রুম থেকে বের হয়ে যেতে নেয়। কিন্তু পারে না। মেঘ উঠে দাড়িয়ে ইনায়া কে থামিয়ে দেয়। মেঘ বলল,

“- কোথায় যাচ্ছিস? যাওয়ার আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যা।

ইনায়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“- তুমি কি ভেবেছো আমি তোমাকে বিয়ে করব? কখনো না ডক্টর মেঘরাজ চৌধুরী! আপনি যা চাইছেন তা কখনোই সম্ভব নয়। আমি কোথায় আর তুমি কোথায়?

“- তুই একবার রাজি হুম আমি বাসার সবাই কে মেনেজ করে নেবো।

“- তুমি একজন বুঝদার ছেলে হয়ে এসব বলছো? তোমার বিবেকে বাঁধে না। সম্পর্কে আমি তোমার বোন হই বোন! বোন কে বিয়ের প্রস্তাব দিতে লজ্জা করে না তোমার?

মেঘ হেঁসে বলল,

“- শোন ইনায়া, তুই আমার মায়ের পেটের বোন লাগিস না। তাই বোন বলে অজুহাত দেওয়া বাদ দে।

“- বাহ্! খুব ভালো। আজকে তোমার আসল রুপ টা দেখিয়েই দিলে ভালো। মনে রাখব। শুধু একদিন না সারাজীবন মনে রাখবো।

ইনায়া ঘনঘন নিশ্বাস নেয়। নিশ্বাস নিতেও যেন তার কষ্ট হচ্ছে।

মেঘ ইনায়ার হাত ধরে। ইনায়া ঝাড়া মেরে সরিয়ে দেয়।
মেঘ হাসলো। যে হাসিতে স্পষ্ট কষ্টের ছাপ। মেঘ হাসি মুখে বলল,

“- আমাকে বিয়ে করতে তোর সমস্যা কোথায় সেটা তো বল?

“- তুমি বোঝো না?

“- নাহ। তুই বল।

“- আমি এক বাচ্চার মা মেঘ ভাইয়া। তুমি কেন বুঝতে চাইছো না আমি একজন ডিভোর্সি।

“- তাতে প্রবলেম টা কোথায়?

“- অবুঝের মতো কথা বলছো কেন?

“- আমাকে বিয়ে করলে তুমি সোসাইটি তে মুখ দেখাবে কিভাবে? তোমাকে সবাই কটু কথা বলবে?

“- এটাই তোর মেইন সমস্যা?

“- নাহ। মেইন সমস্যা আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই না।

“- কিন্তু কেন?

“- কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি না!

“- তাতে কি?

“- মানে আমি তোমাকে ভালো না বাসলেও তুমি আমাকে ভালোবাসবে। আমাকে বিয়ে করবে? আজব তো?

“- আমি তোকে ভালোবাসি এটাই অনেক। তোকে বাসতে হবে না। আমি বাসলেই হবে।

ইনায়া অবাক না হয়ে পারে না। মেঘ কে কিছু না বলে চুপচাপ রুম থেকে বের হয়। দরজা খুলে সামনে বাবা মা চাচা চাচি কে দেখে চমকে ওঠে। সবাই তাদের কথা শুনে ফেললো না তো। ইনায়া তাদের কে পাশ কাটিয়ে নিজের রুমের দিকে হাটা ধরে।

মেঘ নিজের চুল খামচে ধরে। রাগে কষ্টে সবকিছু শেষ করে ফেলতে মন চাইছে।

দরজার বাইরে থাকা চারজন পুরো স্তব্ধ হয়ে গেছে। একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা কখনো কল্পনাও করেন নি মেঘ ইনায়া কে এতটা ভালোবাসে।

তাসলিমা চৌধুরী কাঁদতে কাঁদতে রুমের দিকে চলে যান। স্ত্রী র পিছন পিছন রফিক চৌধুরী ও যান।

রাশেদ চৌধুরী স্তব্ধ হতবাক। ফিরোজা চৌধুরীর মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। একে একে সকলে যে যার মতো চলে যায়।

★★★

নিস্তব্ধ পরিবেশ। চৌধুরী বাড়ি তে যেন নিরবতা চলছে। কেউ কারোর সাথে কথা বলছে না। মর্ম সানায়া’র কাছে আছে। মেঘ মেঘের মতো ইনায়া ইনায়ার মতো। দুজনের মনের মধ্যে চলছে ঝড়। মেঘ ফ্লোরে বসে আছে। দুচোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পরছে। মেঘের কাছে আজ মনে হচ্ছে একতরফা ভালোবেসে সে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছে। একতরফা ভালোবাসা যে শুধু কাঁদায়।

মেঘ আনমনে বলে,

তোমাকে কতটা ভালবাসি সেটা হয়তো তুমি কখনো পুরোপুরি বুঝতে পারবে না! হয়তো আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে তোমার নাম লেখা, কিন্তু তুমি সেটা শুনতে পাও না!আমি শুধু এটুকু বলতে পারি তুমি আমার সুখের কারণ, তুমি আমার হাসির পেছনের মানুষ। তুমি না থাকলে আমার দিনগুলো ফাকা মনে হয়, মনে হয় কিছু একটা অপর্ণ থেকে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তোমার কথা মনে পড়লে মনটা কেমন যেন হালকা হয়ে যায়, আবার সেই না পাওয়ার ব্যথায় বাড়িও হয়ে ওঠে। তুই আমার স্বপ্ন, তুই আমার অনুভব আর সব থেকে বড় কথা তুই আমার শান্তি। তুই পাশে না থাকলেও আমি প্রতি মুহূর্তে তোকে অনুভব করি,, I miss you all time, without any reason without any condition. তুই হয়তো আবার দূরে চলে যাবি কিন্তু আমার ভালবাসা সব সময় তোর চারপাশে ছায়ার মত ঘুরে বেড়াবে। যতদিন বেঁচে আছি ততদিন তোরই “হ্যাপিনেস “হয়ে থাকতে চাই… চুপচাপ,, নিঃশব্দে…. শুধু তোর জন্য ইনায়া। এতটা পাষাণী হোস না রে। খুব কষ্ট হয় আমার। খুব!

চলবে~