পাষাণী তুই পর্ব-১৩

0
1

#পাষাণী_তুই
#পর্ব_১৩
#লেখনিতে_ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি

নতুন ভোর। সবকিছু যেন অন্য রকম। চৌধুরী বাড়ির প্রতিটি কণা নিস্তব্ধ। মেঘ ফ্লোরে ঘুমাচ্ছে আর ইনায়া বিছানায়। সারারাত ঘুম না হওয়ায় ফজরের সময় ঘুমিয়েছে ইনায়া। সারা রাত দুচোখের পাতা এক করতে পারি নি। চোখের পাতা বন্ধ করলেই বারবার মেঘের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠছে। মেঘের বলা কথা গুলো কানে বাজছে। ইনায়া সহ্য করতে পারছে না। হাউমাউ করে কান্না করছে। কেন তার সাথে এমন হয়। মেঘ যখন বিদেশ ছিল ইনায়া তখন ইন্টার পড়তো। মেঘের করা কেয়ার, শাসন করা সব বোন হিসেবে ভেবেছে। কোনো দিন ভাবেনি মেঘ তাকে ভালোবাসে। যদি তখন বলতো তাহলে হয়তো তার জীবন টা অন্য রকম হতো। কিন্তু এখন কিভাবে সম্ভব! তার মতো একটা মেয়ে কিভাবে মেঘের মতো ছেলে কে বিয়ে করে তার জীবনটা এলোমেলো করে দেবে। বর সে যাই মেঘ কে মেনে নেয় তাহলে বাড়ির সবার মধ্যে যে সম্পর্ক টা আছে সেটা নিমিষেই শেষ হয়ে যাবে। তার বড়ো চাচি কখনোই চাইবে না তার ডক্টর ছেলের সাথে একটা বাচ্চা থাকা মেয়ের বিয়ে দিতে। বাবা মা চাচা চাচি সবার মধ্য কার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে। যা ইনায়া কখনোই চাই না।

পূব দিগন্তে সূর্য মামা উঁকি দিচ্ছে। দেখতে দেখতে চারপাশ সূর্যের আলোয় ঝলমল করে ওঠে।

ফিরোজা চৌধুরী কিচেনে দাঁড়িয়ে চুপচাপ রান্না করছেন। তার পাশে তাসলিমা চৌধুরী টুকিটাকি সব কাজ করছেন। তাসলিমা চৌধুরীর বড়ো জা’য়ের সাথে কথা বলতে পারছেন না। কাল রাতে যা হলো তাতে মুখ দিয়ে কথা বলা টাই দুষ্কর হয়ে পরে।

ফিরোজা চৌধুরী গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

“- তরকারি টা একটু দেখ আমি মেঘ কে ডেকে আসি।

তাসলিমা চৌধুরী মাথা নেড়ে আচ্ছা বলেন। ফিরোজা চৌধুরী মেঘ কে ডাকতে দোতলায় যান। মেঘের রুমের দরজা ভিড়ানো। ফিরোজা চৌধুরী মেঘের রুমে ঢুকে ছেলে কে ফ্লোরে পড়ে থাকতে দেখে চমকে যান। ছেলের অসহায় মুখ দেখে মায়া লাগে। তার একটা মাত্র ছেলে। আর সেই ছেলে কি না ইনায়া কে ভালোবেসে এতগুলো বছর কষ্ট পাচ্ছে। কখনো কাউ কে একটা বারও বলেনি। বুকের মধ্যে কষ্ট গুলো চেপে রেখেছে। তবুও কাউকে বুঝতে দেয়নি। বিয়ের কথা বললে নানান বাহানা দিয়েছে। সবসময় এড়িয়ে গেছে। তবুও মুখ ফুটে বলেনি মা আমি ইনায়া কে ভালোবাসি! ইনায়ার বিয়ের আগে যদি বলতো মেঘ ইনায়া কে ভালোবাসে তাহলে তিনি নিজে ইমরানের সাথে ইনায়ার বিয়ে বন্ধ করে দিতেন। কিন্তু এখন যে কিছু করার নেই। তিনি মন থেকে চান ইনায়া ভালো থাকুক। কিন্তু সেটা তার ছেলের সাথে না। তিনি মেনে নিতে পারবেন না ইনায়া তার ছেলের বউ হোক। এই চৌধুরী বাড়ির একমাত্র পুত্রবধু। তার একটাই কারণ ইনায়া ডিভোর্সি। ইনায়ার একটা বাচ্চা আছে।

ফিরোজা চৌধুরী ধীর পায়ে ছেলের কাছে এগিয়ে আসেন। ফ্লোরে বসে ছেলের মাথায় হাত রাখেন। মেঘের ফোলা চোখ দেখে তিনি কেদে ওঠেন। কারুর কাঁদার শব্দ পেয়ে মেঘ জেগে যায়। আস্তে আস্তে চোখ খুলে সামনে মা কে দেখে। মেঘ গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে তার মা’য়ের চোখে পানি। আচমকা মেঘ ফিরোজা চৌধুরীর দু-হাত আকড়ে ধরে বলে,

“- ও মা! মা গো! তুমি কাঁদছো কেন? নিশ্চয় ইনায়া রাজি হয়নি বলে কাঁদছো তাই না? মা গো তুমি একটু ওকে বোঝাও না। আমি ওকে খুব ভালোবাসি মা। নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি। আমি ওকে পাগলের মতো ভালোবাসি মা। ও মা তোমরা সবাই ওকে বোঝাও না। তোমরা বললে ও ঠিক রাজি হয়ে যাবে। আমি জানি ও তোমাদের কথা ভেবে রাজি হচ্ছে না। তোমরা কষ্ট পাবে বলে চুপচাপ নিজের ভাগ্য কে মেনে নিয়েছে।

ফিরোজা চৌধুরী ছেলের আচরণে হতবাক। তার ছেলে যে ইনায়া কে পাওয়ার জন্য উম্মাদ হয়ে গেছে। তিনি কি বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। মেঘ আবার ও বলল,

“- ও মা তুমি কিছু বলছো না কেন?

ফিরোজা চৌধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

“- দ্যাখ রাজ, ইনায়া হয়তো তোর ভাগ্যে নেই।। সবটা মেনে নে বাপ। খামাকা তুই নিজে কষ্ট পাচ্ছিস! নিজের ভালো টা বোঝ এবার?

মায়ের কথা য় মেঘ তার হাত ছেড়ে দেয়। তারপর বলল,

“- মা তুমি এসব কি বলছো? তোমরাই তো এতদিন চাইতে আমি বিয়ে করি। আমি রাজি আছি মা তোমরা ইনায়া কে রাজি করাও। আমি বিয়ে করব।

মেঘের কথা’য় আশ্চর্য হয়ে যায় ফিরোজা চৌধুরী। তার ছেলেটা পুরো পাগল হয়ে গেছে। তিনি কিছুটা রাগ দেখিয়ে বলেন,

“- ইনায়া কে বিয়ে করলে সোসাইটি তে মুখ দেখাবো কি করে? বাইরে বের হলে লোকে কি বলবে? ডিভোর্সি চাচাতো বোন তার আবার একটা বাচ্চা আছে। তাকে নাকি বিয়ে করেছে রাজ। তুই বল তখন আমাদের মুখ কোথায় গিয়ে দাড়াবে?

মায়ের কথা শুনে তাচ্ছিল্যের হেঁসে বলল,

“- মা। এখন এই জেনারেশনের ছেলে হয়ে আমি ওইসবের ধাড় ধাড়ি না। আমরা ২৫ জেনারেশনের ছেলেমেয়ে। এসব আমাদের গায়ে মাখে না। আর তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে আমরা গ্রামে বাস করি। মা ভালো করে শুনে নাও আমরা শহরে থাকি। শহরে এসব কমন ব্যাপার।

ফিরোজা চৌধুরী আশ্চর্য না হয়ে পারেন না। তিনি কিছু না বলে চুপচাপ উঠে দাঁড়ান। মেঘ ও উঠে দাঁড়ায়। ফিরোজা চৌধুরী চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। মেঘ মায়ের হাত ধরে বলল,

“- মা তুমি তো ইনায়া কে মেয়ের মতো ভালোবাসো স্নেহ করো। তাহলে আজ এমন করছো কেন?

“- তুই আমাকে আগে বলিস নি কেন? তুই ইনায়া কে ভালোবাসিস?

সহসা মায়ের প্রশ্নে চুপসে যায়। মেঘ কে চুপ থাকতে দেখে তিনি বললেন,

“- কি হলো চুপ করে গেলি কেন? আমার প্রশ্নের উত্তর দে। তুই কেন আমাকে বলিস নি। ইনায়ার যখন বিয়ে ঠিক হয় তখন তো তুই জানতি তাহলে আমাকে ফোন দিয়ে কেন বলিস নি। মা আমি ইনায়া কে ভালোবাসি। ওর বিয়ে টা আটকাও।।তাহলেই তো সমস্যার সমাধান হয়ে যেতো। ইনায়া তোর হতো।

“- আমি ওকে বিয়ে টা করতে নিষেধ করেছিলাম মা। কিন্তু ও শোনেনি।

“- কেন শোনেনি? তুই ওকে বলেছিলি। তুই ওকে ভালোবাসিস।

“- ভালোবাসার কথা বলেনি। ভেবেছিলাম দেশে এসে ওকে সারপ্রাইজ দেবো। কিন্তু কি থেকে কি হয়ে গেলো। সব এলোমেলো হয়ে গেলো। কিন্তু এখন তো সব ঠিক আছে মা।

“- কিচ্ছু ঠিক নেই রাজ। তুই যেমন ভাবছিস তেমন কিছু হবে না। আমাদের সবার কথা বাদ দিলাম। ইনায়া নিজেই তো তোকে বিয়ে করতে চাই না। তাহলে তুই কিভাবে ওকে বিয়ে করবি বল?

“- ও যদি রাজি হয় তাহলে তুমি রাজি হবে তো মা।

ফিরোজা চৌধুরী ভাবেন। তারপর বলেন,

“- আমার দৃঢ় বিশ্বাস ইনায়া তোকে কোনো দিন ও বিয়ে করতে রাজি হবে না। আর ও যদি রাজি হয় তাহলে আমি মেনে নিবোো।

“- ঠিক আছে। তোমরা প্রিপারেশন নাও।

“- কিসের? অবাক হয়ে বললেন ফিরোজা চৌধুরী।

মেঘ মুচকি হেঁসে বলল,

“- আমাদের বিয়ের।

“- তুই শুধু শুধু স্বপ্ন দেখছিস বাপ। ইনায়া কখনো রাজি হবে না। ও বুঝদার মেয়ে। জীবনের সাথে চারটা বছর একা লড়াই করছে। ইনায়া ওর জীবনে কোনো পুরুষ কে আর চাই না। মর্ম কে নিয়ে বাকি জীবন একা পার করতে চাই।

“- ও নিয়ে তুমি ভেবো না। মাত্র পাঁচ দিন। পাঁচ দিনে ওকে আমি রাজি করাবো। এটা আমার প্রমিজ।

“- দ্যাখ পারিস কি না। এখন চুপচাপ উঠে ফ্রেশ হয়ে খেতে আই। অনেক বেলা হয়ে গেছে।

অতঃপর মেঘ ফ্রেশ হতে চলে যায়। আর ফিরোজা চৌধুরী নিচে যান।

চলবে ~