পাষাণী তুই পর্ব-১৪

0
1

#পাষাণী_তুই
#পর্ব_১৪
#লেখনিতে_ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি

ইনায়ার ঘুম ভাঙে সাড়ে আটটায়। বিছানা থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে মেয়ের খোঁজ করে।। মর্ম সানায়া’র কাছে আছে। ইনায়া রুম থেকে বের হয়ে সানায়া’র রুমের উদ্দেশ্য বের হয়। সানায়া’র রুম টা একটু দুরে। একদম কর্ণারে। সানায়া নিজেই রুম টা বেছে নিছে। যাওয়ার পথে মেঘের সাথে মুখোমুখি দেখা হয়ে যায় ইনায়ার। ইনায়া মেঘ কে ইগনোর করে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। ইনায়ার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকে হাসে। কারণ আর মাত্র কয়েকদিন পর ইনায়া শুধু তার হবে। তার পাষাণী শুধু তার হবে। ভাবতেই খুশিতে চোখ ঝলমল করে ওঠে। কিন্তু তার স্বপ্ন কি পূরণ হবে? ইনায়া কে কি সে রাজি করাতে পারবে?

মেঘ লক্ষ্য করছে ইনায়া র চোখ মুখ ফোলা। চোখ দুটি লাল টকটকে হয়ে আছে। নিশ্চয় তার মতো নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে। মেঘ দাঁড়িয়ে আছে। নড়ছে না।

সানায়া’র রুমে সানায়া’র সাথে খেলছে মর্ম। ইনায়া দরজায় দাঁড়িয়ে দু’জনের খেলা দেখে। তারপর চুপচাপ রুমে ঢুকে বলে,

“- মর্ম এদিকে আসো?

ইনায়া র কন্ঠ স্বর পেয়ে মর্ম ছুটে আসে মায়ের কাছে। ঝাপিয়ে কোলে উঠে পরে। মর্ম কে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে আসে। আবারও সামনে মেঘ কে দেখতে পাই ইনায়া। মর্ম চেচিয়ে বলে ওঠে,

“- পাপাাা……!

হঠাৎ মর্মের ডাক শুনে পিছনে ঘুরে তাকায় মেঘ। মেঘের ঠোঁটের কোণে চওড়া হাসি। ইনায়া অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকায়। মর্ম আবার ডেকে ওঠে,

“- পাপা!

মেঘ এগিয়ে আসছে। ইনায়া চোখ রাঙিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

“- উনি তোমার পাপা নয় মর্ম! উনি তোমার মামা হয়!

ইনায়ার কথার পরিপ্রেক্ষিতে মেঘ বলল,

“- মাম্মাম মিথ্যা কথা বলছে মা! আমি তোমার পাপা!

মেঘের কথা’য় হেঁসে দেয় মর্ম। হাত বাড়িয়ে দেয় যাওয়ার জন্য। মেঘ নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালেই সরে দাঁড়ায় ইনায়া। সরে গিয়ে বলল,

“- খবর দার মেঘ ভাইয়া, বাজে কথা বলবে না? আমার মেয়ে কে তুমি নিবে না। ও তোমার কেউ হয় না। ওর মা আমি ওর পাপাও আমি। আমার মেয়ে কে আমার মতো মানুষ করতে দাও! আমাদের কে একটু শান্তি তে থাকতে দাও! তুমি অন্তত আমার সামনে এসো না। তোমাকে দেখলে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়৷

ইনায়ার লাস্টের কথা শুনে মেঘের মুখ কালো হয়ে যায়। ইনায়া তাকে এতটা অপছন্দ করে। তবে ব্যাপার না। সে ঠিকই মেনেজ করে নিবে। মেঘ কষ্ট লুকিয়ে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলল,

“- তুই যাই বলিস না ক্যান? আমি কিছু মনে করব না! সব কিছু সহে নেব। যদি তুই আমার হোস।

ইনায়া তাচ্ছিল্যের হেঁসে বলল,

“- তোমার ওই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে ডক্টর মেঘরাজ চৌধুরী। আমি কখনো তোমার হবো না।

“- ওকে। দেখা যাক এই যুদ্ধে কে জয়ী হয়।।

“- মিলিয়ে নিও!

“- অবশ্যই। মিলিয়ে নিস তুমি আমার হবি।

“- সেগুড়ে বালি! বলে চলে যায় ইনায়া। মর্ম পিছনে ফিরে মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে। মেঘ মর্ম কে ইশারায় কিছু বলছে। যা না বুঝেই হাসছে মর্ম।

ইনায়া মর্ম কে রুমে এনে বিছানায় বসিয়ে বলল,

“- মাম্মাম তোমাকে কিছু কথা বলব? তুমি মন দিয়ে শুনবে। আমি জানি না তুমি কতটুকু বুঝবে তবুও বলছি। এই পৃথিবীতে তোমার মাম্মাম ছাড়া তোমার আপন বলতে কেউ নেই।। আমিই তোমার মা আমিই তোমার বাবা। তোমার যত আবদার আছে তুমি আমাকে বলবে? আমি তোমার সব আবদার হাসি মুখে মেনে নেবো। তবুও তুমি পাপা’র কাছে যাবা বলবে না। তোমার পাপা নেই মা! সে অনেক দিন আগেই আমাদের ছেড়ে চলে গেছে! তাই কখনো পাপা’র কথা বলবে না। আমরা দুজন দু’জনার সুখ দুঃখের সখী। এই পৃথিবীতে আমাদের কেউ নেই মা। আমরা একা! খুব একা! আমাদের ভালো মন্দ নিজেদের ভাবতে হয়। আমাদের কে মুখ বুজে সব মেনে নিতে হয় মা। নিজের কষ্ট নিজে বুকে চেপে ধরে রাখতে হয় মা। কথা গুলো বলতে বলতে কেঁদে দেয় ইনায়া।
মর্ম বুঝলো কি না জানে না ইনায়া। কিন্তু নিজের মনের মধ্যে থাকা কথা গুলো বলতে পেরে ভালো লাগছে তার। মর্ম তার ছোট্ট হাত দিয়ে ইনায়ার চোখের পানি মুছে নেয়। এতেই যেন ইনায়ার প্রাপ্তি! এইটুকুই তার চাওয়া পাওয়া। কেউ না বুজুক অন্তত তার মেয়ে টা তার কষ্ট বুঝুক! ইনায়া কান্নার মধ্যেও হেসে ওঠে। মেয়ে কে বুকের সাথে চেপে ধরে দুচোখের পানি ফেলে।

ফিরোজা চৌধুরী ইনায়ার কাছে এসেছিল ইনায়া কে কিছু বলার জন্য কিন্তু দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে মর্ম কে বলা কথা গুলো শুনে পা দুটো থমকে যায় তার। নিজের অজান্তেই তার চোখে পানি চলে আসে। ফিরে যায় নিজের রুমে।

★★★

লজ্জায় ঘৃণায় মেয়ের সামনে যেতে পারছে না তাসলিমা চৌধুরী। কাল রাত থেকে এখন পর্যন্ত কিচ্ছু খাইনি ইনায়া সহ মেঘ। মেঘ কে খেতে বললেও খাই নি সে। প্রেয়সী না খেলে সে কিভাবে খাবে। তাসলিমা চৌধুরী বারবার দরজার কাছে এসে ফিরে গেছেন। ইনায়ার ঘুম ভাঙার পর সানায়া আসেনি। ইনায়াই মর্ম কে আনতে গিছিল।

ফিরোজা চৌধুরী রুমে মাথা নিচু করে বসে আছেন। মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে নানান কথা। মেঘের জেদ রাগ সম্পর্কে তিনি খুব ভালো করেই জানেন। মেঘ যা বলে তাই করে। পাঁচ দিন সময় নিয়েছে। মানে পাঁচ দিনই। এর কোনো নড়চড় হবে না। ইনায়া কে যে ভাবেই হোক মেঘ রাজি করাবেই। তাই তো তিনি চান ইনায়া এখানে না থাকুক। তার অনেক ইচ্ছে তার একমাত্র ছেলে কে খুব ধুমধাম করে বিয়ে দেবেন। পুরো শহরের মানুষ জানবে। কিন্তু তার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। তার ছেলে টা ভালোবাসল এমন একজন কে। যাকে কি না পাওয়া অসম্ভব! যখন সম্ভব ছিল তখন বলেনি! কখনো রাজের আচরণ দেখে মনে হয়নি রাজ ইনায়া কে ভালোবাসে! অথচ এতদিন পর এমন একটা কথা শুনাইলো। যা কি না অসম্ভব! আচ্ছা এই অসম্ভব কে কি আদোও সম্ভব করা যায়। তিনি ইনায়া কে ছোটো বেলা থেকে নিজের মেয়ের মতো আদর স্নেহ ভালোবাসা দিয়েছেন। তাহলে আজ কেন তাকে ছেলের বউ হিসেবে মেনে নিতে সমস্যা হচ্ছে।

ভাবতে ভাবতে মাথাটা ভাড়ি হয়ে যাচ্ছে। এত বছর সংসার করেছে অথচ এমন প্রবলেমে তিনি কোনো দিন ও পড়েন নি। সিদ্ধান্ত নিতে বারংবার দ্বিধায় পড়ে যাচ্ছেন।

ইনায়া র বলা কথা গুলো কানে বাজছে। এই পৃথিবীতে আমাদের কেউ নেই মা! আমরা একা! খুব একা! আমাদের ভালো মন্দ নিজেদের ভাবতে হয়। এই কথা কেন গুলো কেন যেন তার কাছে খুব ভাড়ি মনে হচ্ছে। বুকের ভিতর বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছে! এমন কেন হচ্ছে তার? না চাইতেও চোখে পানি চলে আসছে। আচ্ছা তারা কি ইনায়ার জীবনে এক টুকরো সুখ এনে দিতে পারেন না? তারা কি ইনায়ার অন্ধকার জীবন দুর করে আলোর দিশা দিতে পারে না? এটা কি এতটাই অসম্ভব!

চলবে ~