পাষাণী তুই পর্ব-১৫

0
1

#পাষাণী_তুই
#পর্ব_১৫
#লেখনিতে_ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি

ফিরোজা চৌধুরী খাবার নিয়ে ইনায়ার রুমে আসে। ইনায়া তখন মেয়ে কে খাওয়াতে ব্যস্ত। ফিরোজা চৌধুরী খাবারের প্লেট নিয়ে ইনায়ার কাছে এসে বলে,

“- এবার নিজে কিছু খেয়ে নে?

কারোর কন্ঠ স্বর পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ইনায়া। চাচি কে দেখে মুখ টা চুপসে যায়। চোখ মুখ কালো হয়ে যায়। ইনায়া চাচির দিকে তাকিয়ে ফের মর্ম’র দিকে তাকিয়ে মর্মের মুখে খাবার তুলে দিয়ে বলে,

“- পরে খাবো বড়ো আম্মু!

“- না। তুই এখনই খাবি। বেলা কিন্তু কম হয়নি। কাল রাত থেকে এখনো পর্যন্ত তোর পেটে একটা কিছু পরেনি।

ইনায়া মৃদুস্বরে বলল,

“- তুমি আমার জন্য এতটুকু ভেবেছো এটাই অনেক বড়ো আম্মু। তুমি টেবিলের উপর রেখে যাও। আমি সময় করে খেয়ে নেবো। এখন আমি মর্ম কে খাওয়াচ্ছি৷।

ফিরোজা চৌধুরী ইনায়ার হাত থেকে খাবারের প্লেট নিয়ে বলল,

“- বাকিটুকু আমি খাইয়ে দিচ্ছি। তুই আমার সামনে ই খাবার খেয়ে শেষ করবি।

ইনায়া কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। চুপচাপ খাবারের প্লেট নিয়ে চেয়ার টেনে বসে। ফিরোজা চৌধুরী মর্ম কে নিয়ে খাওয়াচ্ছে। ইনায়া অল্প কিছু খাবার মুখে নিয়ে ফিরোজা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে একটু একটু করে চিবোচ্ছে। ফিরোজা চৌধুরী আড়চোখে ইনায়া কে দেখে। ইনায়ার খুব খিদে পাওয়ায় চুপচাপ সবটুকু খাবার খেয়ে নেয়।

ইনায়া সবচেয়ে বেশি অবাক হয় তার আচরণ দেখে। এভাবে স্বাভাবিক আচরণ কিভাবে করছে? ফিরোজা চৌধুরী খাবারের প্লেট নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যান।

ফিরোজা চৌধুরী রুম থেকে বের হয়ে মেঘ কে কল করে। মেঘ ফোন রিসিভ করে বলে,

“- হ্যাঁ, মা বলো?

“- ইনায়া খেয়েছে এবার তুই কিছু খা বাবা। না হলে যে তোর শরীর খারাপ করবে।

মেঘ মুচকি হেঁসে বলল,

“- আচ্ছা মা।

“- রাখলাম?

“- শোনো মা..?

“- হ্যাঁ বল।

“- আই লাভ ইউ মা। বলে কল কেটে দেয়। ফিরোজা চৌধুরী হাসেন। চোখের কার্নিশ থেকে পানি মুছে নেন। তারপর হেঁসে বললেন,

“- এটাই হয়তো আমার ভাগ্যে ছিল!

★★★

বেলা এখন এগারোটা বাজতে চলল। সূর্য মামা তার কিরণ দিয়ে রেখেছে। ভ্যাপসা গরম পরছে। তবুও ইনায়া ছাদে এসেছে। মর্ম কে নিয়ে সানায়া বের হয়েছে। ইনায়া বাধা দেয় নি।
খোলা আকাশ। আকাশ কেমন মেঘলা হয়েছে। যেকোনো সময় হয়তো বৃষ্টি হতে পারে।। ইনায়া ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়ায়। জীবনের হিসাব মেলায়। কেমন জীবন ছিল আর কেমন হয়ে গেছে। সবকিছু তার ভাগ্যে ছিল। ইনায়ার তখন বিয়ের ছ’মাস। এই ছ’মাসে ইমরানের সাথে তার মোটামুটি ভালো সম্পর্কই তৈরি হয়েছে। ইমরান ইনায়ার খালাতো ভাই হলেও কখনো সেভাবে তাদের সম্পর্ক তৈরি হয়নি। ইনায়া জানে ইমরান ভালো ছেলে। যেখানে তার নিজের খালার ছেলে সেখানে আর কিছু বলা যায় না। ইনায়ার মন কখনো সায় দেয় নি। তবুও মায়ের হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে ইমরান কে বিয়ে করে নেয়। তার খালা ছিল খুব ভালো মনের মানুষ। ইনায়া কে নিজের মেয়ের মতো করে দেখেছে। কিন্তু হঠাৎ করে একদিন ইমরান একটা মেয়ে কে বাসায় নিয়ে আসে। ইনায়া প্রথমে ভাবে ইমরানের কোনো ফ্রেন্ড হবে। কিন্তু না। ইমরান যখন বলল, ইনায়া আমরা দু’জন আজ বিয়ে করব? ইনায়া তখন অবাক হয়ে যায়। তবুও হেসে বলে,

“- তুমি মজা করছো তাই না।

ইমরান তখন উচ্চ স্বরে হেসে বলল,

“- তোমার কি মনে হচ্ছে? আমি তোমার সাথে মজা করছি? মোটেও না ইনায়া। আমি সিরিয়াসলি বলছি। আমরা আজ সন্ধ্যায় বিয়ে করব বলে মেয়ে টা কে হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে নেয়। মেয়ে টাও বেহায়ার মতো জড়িয়ে নেয়। ইমরানের কথা শুনে ইনায়ার পায়ের তোলের মাটি সরে যায়৷ ইনায়ার খালা অবাক হয়ে ইমরানের দিকে তাকিয়ে আছেন। নিজের ছেলেকে আজ চিনতে পারছেন না তিনি। তার ছেলে এতটা পাল্টে গেলো কিভাবে? তিনি অস্বাভাবিক ভাবে জিজ্ঞেস করেন,

“- এসব তুই কি বলছিস ইমরান। তোর বিয়ে হয়ে গেছে? এখন আবার কিসের বিয়ে?

“- মা রিল্যাক্স! এত উত্তেজিত হয়ো না। এতে তোমার শরীর খারাপ করবে। পরে কিন্তু আবার বিয়ে টাই দেখতে পারবে না। ইমরানের কথায় দুকদম পিছিয়ে যান তিনি।

ইনায়া অস্ফুট স্বরে বলল,

“- না না এটা হতে পারে না। ইমরান তুমি এমন টা করো না পিলিজ। আমাদের সব সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে।

ইমরান ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল,

“- তাতে আমার কি? শোন, ইনায়া তোকে আমার ভালো লাগে না। আগে যেমন ছিলি তার থেকে বেশি খারাপ হয়ে গেছে তোর চেহারা। আমার সাথে তোর যায় না। ওকে দ্যাখ, তোর থেকে বেশি সুন্দরী স্মার্ট! শিক্ষিত মেয়ে! তোর থেকে সব দিক দিয়ে এগিয়ে সে। তাহলে তোকে কেন আমার লাইফে রাখবো বল। আমরা দু’জন দু’জন কে খুব বেশি ভালোবাসি।

ইনায়া কাঁপা গলায় বলল,

“- তোমার কাছে রুপটাই সব ইমরান! ভালোবাসা টা কিছু না। তুমি আমার রুপটাই দেখলে।

“- এই তো গুড গার্ল! বুঝে ফেলেছো!

“- একটা কথা মনে রাখবে ইমরান। রুপ ক্ষণস্থায়ী। রুপ আজ আছে কাল নাও থাকতে পারে।

“- এই এত ফটরফটর করতে কে বলেছে তোকে? তুই যদি চাস তাহলে সতিনের ঘর করতে পারিস।

ইমরানের কাছে দাঁড়ানো মেয়ে টা বলল,

“- বেবি আমি কোনো সতিনের ঘর করতে পারব না। তুমি বরং ওকে বাসা থেকে বের করে দাও। মেয়ে টার কথায় ইমরান হেঁসে বলল,

“- ওকেহ বেবি, তুমি যা বলবে তাই হবে।

ইনায়া তুই তোর ব্যাগপত্র গুছিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যা। সময় মতো আমি তোর কাছে ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দেবো। ইনায়া রুক্ষ কন্ঠে বলল,

“- শোন ইমরান, আমার কোনো ইচ্ছে নেই তোর মতো অমানুষের সাথে থাকার। আর রইল সতিনের ঘর করার। আমি চলে যাচ্ছি। যাওয়ার আগে একটা কথা বলে যাচ্ছি মনে রাখিস। তোকে পস্তাতে হবে। তুই যে রুপের মোহে পড়ে আমার সাথে বেইমানি করলি না। এই মেয়েটায় তোর সাথে সেম ভাবে চিট করবে। সেদিন তুই খুব মনে করবি আমায়। আমাকে চাইবি কিন্তু পাবি না। পুড়বি খুব করে? তোর ভিতর জ্বলে পুড়ে ছাড়খাড় হয়ে যাবে তবুও তুই কাউকে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারবি না। কেন জানিস? লজ্জায়! তোর এই গার্লফ্রেন্ড নিয়ে সুখে সংসার কর দ্যাখ ক’দিন করতে পারিস? বলা তো যায় না পাখি আবার কার হাত ধরে উড়াল দেয়।

ইনায়া র কথা শুনে মেয়ে টা রেগে যায়। রেগে কিছু বলতে গেলে ইমরান থামিয়ে দেয়। ইনায়ার খালা কাঁদতে কাঁদতে রুমে চলে যান। আর ইনায়া রুমে এসে ব্যাগপত্র গুছিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়৷

রাস্তায় এসে খুব কাঁদতে ইচ্ছে করে কিন্তু কাঁদে না। নিজেকে শক্ত করে চৌধুরী বাড়ির উদ্দেশ্য চলে আসে।

তারপর! তারপর ইনায়া র জীবন অন্য রকম হয়ে ওঠে। ইনায়া যখন বাসায় ফিরে সবাইকে সবটা বলে দেয়। তখন ইনায়ার বাবা ইনায়ার মায়ের উপর খুব রেগে যান। তার জন্য আজ তার মেয়ের এই অবস্থা। তাসলিমা চৌধুরী শুধু হতবাক হয়ে চেয়ে ছিলেন। তারপর সেখান থেকে তাদের বোনের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। ইনায়ার বাবা মামলা করে।

ইনায়া ধীরে ধীরে গুমরে গুমরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। রুম থেকে বের হতো না। সারাদিন রুমের মধ্যে বন্দী থাকতো। তারপর কয়েক দিন পর জানতে পারে ইনায়া অন্তঃসত্ত্বা। বাসার সবাই ইনায়া কে দুরে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মেঘ তখনও বিদেশ ছিল। তাকে কেউ জানায়নি। ইনায়া বিদেশ যেতে চাই না। বাসার সবাই জোর করে পাঠায়। একমাত্র তার,অনাগত সন্তানের কথা ভেবে ইনায়া রাজি হয়।

পিছন থেকে ইনায়ার কাঁধে হাত পড়তে চমকে ওঠে। ভয়ার্ত চেহারায় পিছনে ফিরে তাকায়।

চলবে ~