পাষাণী তুই পর্ব-২১

0
1

#পাষাণী_তুই
#পর্ব_২১
#লেখনিতে_ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি

ভার্সিটির ক্যাম্পাসে বসে আছে সানায়া আর তার বান্ধবী সাথী। সানায়া’র মুখে রয়েছে বিস্ময়ের ছাপ। অদ্ভুত চিন্তা ভাবনা! আর আছে অদ্ভুত ফিলিংস! সানায়া কে এত ভাবতে দেখে সাথী বিরক্ত হয়ে বলল,

“- তুই যদি এবার চিরকুট টা না খুলিস সত্যি বলছি আমি এখান থেকে চলে যাবো। আমার আর ওয়েট করতে ভালো লাগছে না। সব অসহ্য লাগতেছে বইন।

সানায়া কোণা চোখে তাকালো সাথীর দিকে। সানায়া’র তাকানো দেখে সাথী বলল,

“- এমনে করে তাকাস ক্যান ভাই? আমি তো ভুল কিছু বলি নাই। ক্লাসের সময় হয়ে যাচ্ছে। এবার ক্লাসে যেতে হবে। তোর যদি চিরকুট টা খুলতে ইচ্ছে না করে তাহলে দে আমি চিরকুট টা নিয়ে ছিড়ে ফেলি বলে নিতে গেলে সানায়া নাাা বলে চেচিয়ে ওঠে!

সাথী বাঁকা হেসে বলল,

“- বাহ্! ডাল মে কুচ কালা হে বান্ধপী! ছেড়ার কথা বললাম আর তুই চেচিয়ে উঠলি। কাহিনি কি মনু?

সানায়া গম্ভীর কণ্ঠে বললো,

“- তেমন কিছু না। কে না কে দিছে সেজন্য আরকি খুলতে কেমন একটা লাগছে। যদি খারাপ কিছু লেখা থাকে।

“- আরেহ না! আমার মনে হয় এখানে লাভ লেটার আছে। তোকে কোনো ছেলে ভালোবাসে। সেজন্যই তো তোকে এই লাভ চিরকুট দিলো।

“- জানি না বইন।

“- এবার খোল নইলে আমি সত্যি সত্যি হাঁটা ধরুম কইয়া দিলাম।

সানায়া ভয়ে ভয়ে চিরকুট টা খুললো। সাথী অধীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে সানায়া’র দিকে। সানায়া একবার সাথীর দিকে তো একবার চিরকুটের দিকে তাকাচ্ছে। সাথী জোরে পড়তে বলল সানায়া কে।

সানায়া চিরকুট টা চোখের সামনে ধরল। তারপর পড়তে শুরু করল।

‘ প্রিয় রূপবতী ‘

কেমন আছো? নিশ্চয়ই ভালো আছো? শুরুতেই রুপবতী বলাতে খুব অবাক হচ্ছো তাই না? অবাক হওয়ার কিছু নেই। তুমি আমার চোখে সেরা রুপবতী। আমার দেখা দ্বিতীয় নারী। যাকে দেখে আমার পুরো দুনিয়া থমকে গেছে। দ্বিতীয় নারী বলাতে আরো বেশি অবাক হয়েছো নিশ্চয়ই? তাহলে শোনো,আমার জীবনে প্রথম নারী হচ্ছে আমার মা। আর দ্বিতীয় নারী তুমি! যেদিন থেকে তোমাকে দেখেছি সেদিন থেকে আমার সবটা জুড়ে তোমার আনাগোনা। এখন তোমার মনে একটা প্রশ্ন জেগেছে তাই না? সেটা হলো আমি কে? এই প্রশ্নের উত্তর আমি তোমাকে দেবো না। তুমি খুঁজে বের করো। আমি কে? আর হ্যাঁ আরেকটা কথা। তোমাকে দেওয়া আমার প্রথম গোলাপ টা গুছিয়ে রেখো। ওটা দিয়ে বাসর রাতে তুমি আমাকে প্রপোজ করবে। এবার নিশ্চয় ভাবছো গোলাপ টা কি তাজা থাকবে? তুমি শুকনো গোলাপ দিয়েই আমাকে প্রপোজ কইরো। এটা আমাদের জীবনে স্মৃতি হয়ে থাকবে। ভালো থেকো, সুস্থ থেকো। খুব শীঘ্রই আমাদের দেখা হবে।

ইতি
তোমার অচেনা পাগল প্রেমিক

চিঠি টা পড়ে থমকে গেছে সানায়া। চোখে মুখে হাজারো প্রশ্ন। বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে সাথী’র দিকে। সাথীর ও সেম অবস্থা। দুজনের মুখ বিস্ময়ে হা হয়ে গেছে। সাথী বিস্ময়ের রেশ কাটিয়ে সানায়া কে বলল,

“- ভাই ছেলে টা একটা চিস! প্রথম চিঠিতে ই বাসর পর্যন্ত চলে গেছে। ভাবতে পারছিস ছেলে টা কত রোমান্টিক! কত সুন্দর করে করে চিঠি টা লিখে তোকে দিলো। হাউ রুমান্টিকককক বলে হেসে দেয় সাথী।

সানায়া চোখ গরম করে তাকায়। কোনো কথা না বাড়িয়ে ক্লাসের উদ্দেশ্য যায়। পুরো ক্লাস টাইম সানায়া’র মন চিরকুটের মালিকের উপর পরে আছে। ক্লাসে একদমই মনোযোগ নেই। এর জন্য বার কয়েক বকাও খেয়েছে সানায়া।

ভার্সিটি ছুটি হওয়ার পর বাসার উদ্দেশ্য রওনা হয় সানায়া। সাথী বাসা অন্য রোডে হওয়ায় সে চলে গেছে। সানায়া রিকশার জন্য অপেক্ষা করে কয়েক মিনিট। তারপর রিকশা পেয়ে উঠে বসে। রওনা হয় চৌধুরী বাড়ির উদ্দেশ্য।

__________________

সন্ধ্যার পরপরই মেঘ হসপিটাল থেকে বাসায় চলে আসে। বিয়ের জন্য দুদিন ছুটি নিয়ে ছিল।আজকে হাসপাতালে গিছিল। সব কাজ কম্পিলিট করে বাসায় চলে আসছে। এই দুদিন কোনো রোগী দেখেনি। কালকে থেকে আবার আগের মতো ব্যস্ত হয়ে পড়বে।

রুমে মর্ম র সাথে দুষ্টুমি করছে মেঘ। ইনায়া ড্রয়িং রুমে ছিল মাত্র রুমে আসলো। এসেই বাপ মেয়ের সুন্দর মুহূর্ত দেখে মনটা ভরে যায়। মেঘ মর্মের সাথে খেলতে খেলতে ইনায়া র দিকে চোখ পরে। ইনায়া কে দেখে ছোট্ট একটা হাসি উপহার দেয়। তার বিনিময়ে ইনায়া’য় ও মুচকি হাসে। ইনায়া এগিয়ে আসলো। মর্ম ঝাপিয়ে ইনায়া র কোলে উঠে পড়ে। ইনায়া মেয়ে কে বুকে আগলে নেয়। ইনায়া মেঘ কে বলল,

“- খেতে আসো আমি মর্ম কে নিয়ে নিচে যাচ্ছি। ওকে খাইয়ে ঘুম পাড়াতে হবে।

মেঘ মাথা ঝাকিয়ে হ্যাঁ বলল।

চৌধুরীর পরিবারের সবাই রাতের ডিনার শেষ করে। সানায়া কোনো রকম খেয়ে টেবিল ছেড়ে উঠে যায়। কেউ লক্ষ্য না করলেও ইনায়া ঠিকই করে। সবার সামনে কিছু না বলে নিজের খাবার শেষ করে সানায়া’র রুমে যায়। মর্ম ঘুমিয়ে গেছে।

সানায়া বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। ঠান্ডা বাতাসে শীত শীত অনুভব হচ্ছে তার। গায়ের ওড়না টা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নেয়। ইনায়া সানায়া কে খুজতে বেলকনিতে আসে। বোন কে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কাঁধে হাত রাখে। সানায়া ভয়ে চমকে ওঠে বলে,

“- কে…..

ইনায়া বলল,

“- আমি। তুই ভয় পেয়েছিস সানু।

বড়ো বোন কে দেখে সানায়া মৃদু হেসে বলল,

“- না না আপাই। তবে হুট করে স্পর্শ করায় একটু চমকে উঠেছি।

“- ওহ।

ইনায়া নিরব থেকে সানায়া কে দেখল। তারপর হালকা গলা কেশে বলল,

“- কি হয়েছে সানা? তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন? কোনো কিছু নিয়ে মনে হচ্ছে টেনশনে আছিস?

সানায়া বড়ো বোনের থেকে কিচ্ছু লুকায় না। তেমনি আজও লুকাবে না। তাই বলল,

“- আপাই আজকে একটা ঘটনা ঘটেছে।

“- কি..? অবাক হয়ে বলল।

“- একটা ছেলে বলে থেমে গেলো সানায়া।

“- কি রে থেমে গেলি কেন? বল আমাকে।

“- আসলে আপু….। সানায়া সকালের সব ঘটনা বলল ইনায়া কে। চিঠি টা রুম থেকে এনে ইনায়ার হাতে দিল। ইনায়া চিঠি হাতে নিয়ে ভ্রু নাচিয়ে সানায়া কে বলল,

“- কি লেখা আছে সানা।

“- তুমি পড়েই দেখো না।

ইনায়া পুরো চিঠি টা পড়ল। পড়ে উচ্চ স্বরে হেসে উঠল। ইনায়ার হাসি দেখে সানায়া ঠোঁট উল্টে বলল,

“- আপাই হাসছো কেন?

ইনায়া হাসতে হাসতে বলল,

“- বনু ছেলে টা কিন্তু খুব ইন্টারেস্টিং! তা না হলে এমন চিঠি কেউ দেয়। তাও আবার প্রথম চিঠি। তাতেই কি-না একেবারে বাসর রাতের প্রপোজ। বলে আবারও হেঁসে উঠল।

ইনায়ার উপর রাগ হচ্ছে তার। কিন্তু কিছু বলছে না। কোমড়ে হাত দিয়ে রাগে ফুলছে।

ইনায়া কে খুজতে খুজতে সানায়া’র রুমে আসে মেঘ। ইনায়া কে হাসতে দেখে মুগ্ধ নয়নে পলকহীন চেয়ে আছে মেঘ। এই হাসি টায় তো দেখতে চাই মেঘ। প্রেয়সীর মুখের হাসি যে তার কাছে সবচেয়ে বেশি ইম্পরট্যান্ট। ইনায়া মুখ চেপে ধরে ঘুরতেই মেঘ কে দেখতে পেলো। ইনায়া হাসি থামিয়ে বলল,

“- মেঘ ভাইয়া তুমি এখানে?

সানায়া হুট করে হেঁসে ফেলে। সানায়া’র হাসি দেখে ইনায়া ভ্রু কুঁচকে তাকায়। মেঘ রেগে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। ইনায়া অবাক হয়ে বলল,

“- তুই হাসছিস কেন সানা? নিশ্চয়ই ছেলেটা র প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিস তাই না।

সানায়া হাসতে হাসতে বলল,

“- আপাই বর কে কেউ ভাইয়া বলে ডাকে। মেঘ ভাইয়া কে তুমি ও তো স্বামী তুমি এখানে কি করছো এভাবে বলবে তা না। ভাইয়া তুমি এখানে কেন? সিরিয়াসলি!

ইনায়া রেগে তাকালো সানায়া’র দিকে। তারপর মেঘের দিকে তাকাতেই চমকে গেলো। মেঘ রেগে মেগে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

ভাব খারাপ দেখে ইনায়া ইনোসেন্ট ফেস করে বলল,

“- স্যরি স্যরি আর হবে না। আসলে এতদিনের অভ্যাস তো তাই আরকি…

মেঘ কিছু বলল না। তারপর বলল,

“- রুমে আয় তারপর তোকে দেখছি তার আগে এটা বল দুবোন মিলে হাসছিলি কেন?

সানায়া দৌড়ে এসে চিঠি টা নিতে গেলে ইনায়া সরিয়ে নিয়ে বলল,

“- খবরদার। দুরে গিয়ে দাঁড়া।

সানায়া বলল,

“- প্লিজ আপাই ভাইয়া দেখিও না।

ইনায়া শুনলো না। মেঘ ইনায়ার হাত থেকে চিরকুট টা নিয়ে পড়ল। পড়ে নিজেও হেঁসে ফেলে। সানায়া’র দিকে তাকিয়ে হাসি বন্ধ করে দেয়। তারপর ইনায়া কে বলল,

“- রুমে চল।

সানায়া লজ্জায় অন্য দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। বড়ো ভাইয়ের সামনে এমন একটা চিঠি। দুর ভাল্লাগে না। মেঘ ইনায়া রুম থেকে বেড়িয়ে যায়।

চলবে~