পাষাণী তুই পর্ব-২৫ এবং শেষ পর্ব

0
2

#পাষাণী_তুই
#পর্ব_২৫( সমাপ্তি পর্ব )
#লেখনিতে_ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি

দেখতে দেখতে পাঁচ দিন চলে যায়। চৌধুরী বাড়ি মেতে উঠেছে বিয়ের আনন্দে। বিশাল বড়ো বাড়ি টা লাল নীল সবুজ রঙের আলোয় ঝলমল করছে। পুরো বাড়ি হৈ-হুল্লোড়,চেচামেচি তে ভরপুর। আজ সন্ধ্যায় সানায়া’র গায়ে হলুদ। ইনায়া সেই কখন থেকে মর্ম’র পিছনে দৌড়াচ্ছে। মর্ম ড্রয়িংরুমে ছোটাছুটি করছে। ইনায়া এমনিতেই ক্লান্ত তার উপর আবার মর্ম’র দৌড়ানি। সব মিলিয়ে ইনায়ার অবস্থা খারাপ। ইনায়া সোফায় ধপাস করে বসে পরে। আর পারছে না। মেঘ মাত্র ড্রয়িংরুমে পা রাখল। ইদানিং সে খুবই ব্যস্ত। সানায়া’র বিয়ে প্লাস হসপিটাল। সব মিলিয়ে মেঘ সব কিছু সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে। তবুও হাসি মুখে সবটা করছে। ইনায়া কে সোফায় ক্লান্ত হয়ে বসতে দেখে জিজ্ঞেস করে,

“- কি হয়েছে? তোমাকে এমন ক্লান্ত দেখাচ্ছে কেন?

মেঘের কথা’য় চোখ মেলে তাকাল ইনায়া। ইনায়া সোজা হয়ে বসল। মেঘ এখন ইনায়া কে তুমি সম্বোধন করে বলে। ইনায়া বলল,

“- মর্ম কে রেডি করানোর জন্য এসেছিলাম কিন্তু তাকে ধরতে পারি নি।সেই কখন থেকে ওর পিছনে দৌড়াচ্ছি অথচ মেয়ে টা আমার কাছে ধরা দিচ্ছে না।

“- আচ্ছা আমি দেখছি। মর্ম এখন কোথায়?

“- দেখো কোন কোণায় গিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে। ইদানিং তোমার আশকারায় ও এমন বিচ্ছু হয়ে উঠেছে৷

মেঘ হালকা হেঁসে বলল,

“- দেখতে হবে না মেয়ে টা কার। মর্ম হচ্ছে মেঘরাজ চৌধুরীর মেয়ে! এতটুকু বিচ্ছু তো হবেই। কি বলো?

ইনায়া কিছু না বলে সানায়া’র কাছে যাওয়ার জন্য হাটা ধরে। মেঘ মেয়ে কে খুজতে দোতালায় যায়।

★★★

সানায়া’র রুমে শোরগোল হচ্ছে। সানায়া কে পার্লারের মেয়ে রা সাজাচ্ছে। সানায়া’র সাথে আরো সাজছে সাথী রিসা সহ আরো কয়েকজন মেয়ে। যারা সানায়া ও মেঘদের আত্মীয় হয়। বিয়ে বাড়িতে সবসময় একটু বেশি মানুষ হয়।

চৌধুরী বাড়ির ছাদে গায়ে হলুদের জন্য সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। সানায়া কে নিয়ে সেখানে বসানো হয়। সানায়া কে পুরো হলুদ পরী লাগছে। আজ সব মেয়ে রা হলুদ শাড়ি আর ছেলে রা হলুদ পাঞ্জাবি পরেছে। মর্ম বাবা মা য়ের সাথে ম্যাচিং করে হলুদ শাড়ি পরেছে। মেঘের কোলে উঠে বসে আছে মর্ম। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে একটু আগে। একে একে সবাই সানায়া কে হলুদ ছোঁয়ায়। অনেক ফটোশুট ও হয়। মর্ম গুটিগুটি পায়ে মেঘ আর ইনায়ার কাছে আসে। দু’জন কে নিজের দুপাশে বসতে বলে। মেয়ের কথা মতো দু’জনই নিচে বসল। মর্ম হাসি দিয়ে বলল,

“- পাপা মাম্মাম তোমরা একসাথে আমাকে হলুদ লাগিয়ে দাও।

মর্মের কথা শুনে দু’জনেই অবাক চোখে তাকাল। ইনায়া বলল,

“- মা একসাথে হলুদ লাগাবো কেন?

মর্ম মুখে হাত দিয়ে বলল,

“- উফসস মাম্মাম! এত প্রশ্ন করো কেন? লাগাতে বলছি লাগাও।

কি আর করার। মেয়ের কথা মতো হলুদ লাগালো দুজন। মর্ম তো মহাখুশি। দুজনের গালে দুটো চুমু দিয়ে দৌড়ে চলে গেল। মেঘ ইনায়া হেসে উঠল।













:

চৌধুরী বাড়িতে নতুন মেহমান আসতে শুরু করেছে। সোসাইটি কলিগ যত আত্মীয় স্বজন আছে সবাই আজ আসবে সানায়া’র বিয়ে তে। খুব বড়ো আয়োজন করা হয়েছে। চৌধুরী বাড়ির বাগানে স্টেজ করা হয়েছে।

দেখতে দেখতে সময় চলে যাচ্ছে। সকাল গড়িয়ে বিকাল, বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা। সানায়া কে বউ বেশে সাজানো হয়েছে। লাল শাড়ি তে মাশাল্লাহ খুব সুন্দর লাগছে সানায়া কে।

বাইরে থেকে আওয়াজ শোনা গেল। বর এসেছে বর এসেছে! সবাই হুরহুর করে রুম থেকে দৌড়ে গেল বরের গাড়ির কাছে। ইফাদ বর বেশে চৌধুরী বাড়িতে পা রাখল। ইফাদ কে নিয়ে স্টেজে বসানো হলো। একটুপর সানায়া কে নিয়ে ইফাদের পাশে বসানো হয়। সানায়া মাথা নিচু করে স্টেজে বসে আছে। লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে আশেপাশে তাকাতে পারছে না সানায়া।

অতঃপর ইফাদ সানায়া’র বিয়ে সম্পূর্ণ হয়। দুজনের চারহাত এক করে দেওয়া হয়।

__________________________

দেখতে দেখতে রাত দশটা বেজে গেল। একটু আগেই সানায়া তার নতুন জীবনের জন্য নতুন জায়গায় রওনা হয়েছে। হাসিখুশি চৌধুরী বাড়ি টা এখন নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেছে। তাসলিমা চৌধুরী ছোটো মেয়ে কে বিদায় জানি কান্নায় ভেঙে পরেছেন। ইনায়া মা কে সামলাচ্ছে।

****

বাসর ঘরে ঘোমটা দিয়ে বসে আছে সানায়া। ইফাদ দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করল। দরজার ছিটকানি দিয়ে এগিয়ে আসল সে। সানায়া বিছানা থেকে নেমে ইফাদ কে সালাম করল। ইফাদ মুচকি হেঁসে তার রুপবতী কে বুকে জড়িয়ে নেয়। সানায়া’র কিছু একটা মনে পড়তে ইফাদ কে ছেড়ে দাড়াল।

ইফাদ অবাক হয়ে তাকাল। চুপ করে সানায়া’ কে পর্যবেক্ষণ করছে। সানায়া ফোনের ক্যামেরা অন করে টেবিলের উপর রেখে ব্যাগ খুলে সেখান থেকে একটা গোলাপ ফুল বের করে। গোলাপ টা অনেক শুকিয়ে গেছে তাতে কি? এতেই চলবে। ইফাদ শুধু অবাক হয়ে সব দেখছে। সে বুঝতে পারছে না সানায়া ঠিক কি করতে চাইছে। সানায়া যখন তার সামনে হাঁটু গেড়ে ফুল হাতে বসল। তখন ইফাদের মাথায় টনক নড়ে। তার মনে পরে যায় সানায়া কে দেওয়া প্রথম চিঠির কথা।। বাসর রাতে শুকনো গোলাপ দিয়ে প্রপোজের কথা৷ মুহুর্তে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে।

সানায়া হাটু গেড়ে বসে বলল,

“- আই লাভ ইউ ইফাদ!

ইফাদের খুশিতে বুকে হাত চলে যায়। সানায়া কে আর অপেক্ষা না করিয়ে বলে দেয়।

“- আই লাভ ইউ টু রুপবতী! সানায়া’র হাত ধরে দাঁড় করিয়ে বলল,

“- আমি ভাবতে পারিনি তুমি যে আমার বলা কথা মনে রাখবে। বাসর রাতে আমার দেওয়া প্রথম ফুল দিয়ে আমাকে প্রপোজ করবে। আমি সত্যি খুব খুশি হয়েছি সানায়া। আই এম সো হ্যাপি। আজকে নিজেকে সব থেকে হ্যাপি মানুষ মনে হচ্ছে বলে সানায়ার দু’হাত ধরে ঘুরতে থাকে। দু’জনেই ঘুরছে, দুজনের ঠোঁটের কোণে হাসি। একসময় ঘুরতে ঘুরতে দু’জনে বিছানায় একে অপরের উপর ঠাস করে পড়ে যায়। দুজন দু’জনার দিকে অপলক দৃষ্টি তে তাকিয়ে থাকে। কতক্ষণ থাকে জানে না। বেশ অনেক টা সময় কেটে যায় সানায়া’র যখন হুঁশ আসে তখন ধড়ফড় করে ইফাদের উপর থেকে উঠে যায়। লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়ায়। ইফাদ দুষ্টু হেসে বলল,

“- বউ!

সানায়ার ভিতরে কম্পন সৃষ্টি হয়। ইফাদ আবার বলল,

“- রুপবতী বউ আমার! ফ্রেশ হয়ে আসো। তারপর আমরা বাসর করব।

সানায়া লজ্জা পেয়ে দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা আটকিয়ে দেয়। সানায়া ফ্রেশ হয়ে একটু পর বাইরে বের হয়। ইফাদ রুমেই ফ্রেশ হয়ে নিয়েছে। সানায়া আসলে দুষ্টুমি করে বলে,

“- চলো শুরু করা যাক।

সানায়া অবাক হয়ে বলল,

“- কি……?

“- বাসর! এতটুকু সময়ের মধ্যে ভুলো গেলে রুপবতী।

সানায়া এবার দ্বিগুণ লজ্জা পেল। লজ্জায় মাটির ভিতরে লুকাতে মন চাইছে। ইফাদ এগিয়ে আসল। সানায়া কে কাছে টেনে নেয়। কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলল,

“- মজা করছিলাম। প্যানিক হওয়ার দরকার নেই। চলো দুজন আজ গল্প করি। তারপর না হয়য়য়…..
সানায়া লজ্জা পেয়ে বলল,

“- আপনি এমন বেশরম কেন? মুখে কি কিছু আটকায় না!

“- এতদিন আটকায় ছিল কিন্তু এখন আর আটকায় না। কারণ এতদিন আমার বউ ছিল না এখন তো আমার বউ আছেে…….!

“- ধুরর আপনি খুব বজ্জাত!

“- সত্যি বলছো!

“- ধুর বাল…

“- ছিহ বর কে কেউ গালি দেয়?

সানায়া ইফাদের দিকে তাকাল। ইফাদ চুপ থেকে হুট করে হেসে ফেলে। সানায়া নিজেও হেসে ফেলে।

[ কেউ উঁকিঝুঁকি না দিয়ে মানে মানে কেটে পড়ুন ]

★★

মেঘের বুকে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে ইনায়া। মেঘ ইনায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ইনায়া হুট করে বলল,

“- শুনো…..

“- বলো।

“- তুমি আগে কেন এলে না আমার জীবনে? আগে যদি আসতে তাহলে আমার জীবন টা এভাবে এলোমেলো হয়ে যেতো না। হাসিখুশি ভাবে বাঁচতে পারতাম। আমার জীবনে কোনো কষ্ট থাকতো না।

“- উহু.. আগে যা হয়েছে সব ভুলে যাও পাষাণী! অতীত কে কখনো মনে রাখতে নেই। সবসময় বর্তমান কে নিয়ে বাঁচতে হয়।

“- আমি যে অতীত ভুলতে পারি নি।

“- আমাকে ভালোবাসিস?

ইনায়া মেঘের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“- জানি না!

“- সাধে কি আর তোরে পাষাণী বলি আমি! এখনো তুই আমারে বুঝলি না। ভালোবাসলি না! মন খারাপ করে বলে মেঘ। মুখ গোমড়া করে অন্য দিকে তাকালো মেঘ।

ইনায়া তা দেখে হেসে উঠল। মেঘ আড়চোখে সেই হাসি দেখল। ইনায়া বলল,

“- এখনো পাষাণী বলে ডাকো কেন আমায়?

মেঘ ইনায়ার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“- বই ভালোবাসা বুঝে না তাই তাকে পাষাণী বলি।

“- বউ তো তার বর কে একটু একটু করে ভালোবাসতে শুরু করেছে। বর কি তা বোঝে না।

মেঘ চমকে তাকাল ইনায়ার দিকে। ইনায়া হাসি মুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মেঘ ইনায়ার হাত দু’টো ধরে বলল,

“- সত্যি বলছিস ভালোবাসিস আমাকে?

“- হ্যাঁ তো….

মেঘ ইনায়া কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মেঘের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরে। যা গিয়ে ইনায়ার হাতে পরে। ইনায়া মেঘ কে নিজের থেকে সরিয়ে বলল,

“- কাঁদছো কেন? আমি তো বললাম তোমাকে ভালোবাসি!

“- খুশি হয়ে কাঁদছি পাষাণী।

“- উফ আবার পাষাণী। চলে যাব কিন্তু?

“- এই না না আর বলব না। আমার পাষাণী তুই! তুই যে আমাকে ভালোবাসিস এটাই আমার কাছে অনেক।

“- তাই।

“- হ্যাঁ.. তাহলে চল আজ দু’জন দু’জন কে ভালোবাসায় ভড়িয়ে দেব। আজকের পর তোর জীবনে শুধু মেঘরাজ চৌধুরীর অস্তিত্ব থাকবে। আর কারোর না।

ইনায়া লজ্জা পেল। লজ্জায় মেঘের বুকে মুখ লুকায়। অতঃপর দু’জন হারিয়ে যায় ভালোবাসার রাজ্যে! এভাবেই তারা দু’জন দু’জন কে সব বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করুক। তাদের ভালোবাসায় সব কিছু হয়ে উঠুক রঙিন। ভালোবাসা রা ভালো থাকুক।

[ সমাপ্তি ]