#পিঞ্জিরা
#সূচনা_পর্ব
#জান্নাত_সুলতানা
-“আম্মা আমার বিয়ে ঠিক করেছে রিহান ভাই।”
সামনে শেওলা রঙের জিপগাড়ি টার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো সুদর্শন পুরুষ টা নিজের হাতে থাকা আধখাওয়া সিগারেট টা নিচে ফেলে পা দিয়ে পিষে নিয়ে চোখ তুলে সামনে সাদা কলেজ ড্রেস গায়ে সুন্দরী রমণী মিরার দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো।মিরা’র বুকের ভেতর তৎক্ষনাৎ ঝড় উঠলো।সাথে সাথে মাথা নিচু করে নিলো।অনেক সাহস সঞ্চয় করে কথাখানা বলে তো দিলো।কিন্তু এখন কি হবে? কি বলবে রিহান ভাই? থাপ্পড় লাগাবে? মিনিট খানেক সময় পেরুনোর পরেও যখন কোনো রকম কথা সামনে দাঁড়ানো পুরুষ টা বললো না। মিরা তখন ভয়ে ভয়ে আবার মাথা উঁচু করলো।মাথা সামন্য উঁচু করে পুরুষ টার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলো রিহান ওর দিকে তাকিয়ে আছে। দৃষ্টি তার একদম শান্ত। গম্ভীর মানুষ টার শান্ত দৃষ্টি মিরার মস্তিষ্কে ভারী চিন্তার প্রভাব ফেললো।মিরা কে তাকাতে দেখে রিহান শান্ত কণ্ঠে জিগ্যেস করলো,
-“বয়স কত তোর?”
অতি নরম।কোমল স্বর।অথচ মিরা’র মনে হলো কত গম্ভীর।ভয় বুক ধুকপুক করলো মেয়ে টার।কেনো জানি শুধু এই মানুষ টার সামনে এলে কথা বলতে পারে না। ভয়ে গলা বারবার শুঁকিয়ে আসে।সারাদিন তো মুখে খই ফুটে।শুধু এই গম্ভীর পুরুষ টার সামনে এলেই সব কথা হারিয়ে যায়।
মিরা’র ভাবনার মাঝেই রিহান আবার জিগ্যেস করলো,
-“বলছিস না কেনো?
কথা বল।”
চাপা ধমক। মিরার রুহু কেঁপে উঠে। চোখ বন্ধ করে এক নিঃশ্বাসে বলে দিলো,
-“আঠারো বছর হতে তিন মাস তিন দিন বাকি।”
রিহান এর গম্ভীর মুখের আদল পরিবর্তন হলো মূহুর্তে। গম্ভীর মুখখানায় চমৎকার হাসি ফুটে।মিরা’র মূহুর্তে স্থান কাল সব ভুলে গেলো। মুগ্ধ হয়ে পুরুষ টার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।বহুদিন পর মানুষ টা গ্রামে এসেছে।অনেক দিন পর এমন সামনা-সামনি দাঁড়িয়ে পুরুষ টা কে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে মিরা’র।
গ্রামের সবচেয়ে সুনামধন্য পরিবার হচ্ছে শেখ পরিবার। যেমন তাদের ক্ষমতা তেমন তাদের নামডাক। এককালে রিহান এর দাদা রমজান শেখ গ্রামের চেয়ারম্যান ছিলো।যদিও এখন তাদের পরিবার এর কোনো সদস্য রাজনীতিতে যুক্ত নয়।তাদের নিজস্ব ফ্যাক্টরি রয়েছে।সেটায় এখন তার বাবা চাচা চালাচ্ছে। গ্রামে তাদের তারপরও আলাদা একটা দাপট রয়েছে। তার কারণ ও অবশ্য রয়েছে। গ্রামে কেউ তাদের পরিবার এর রাজনীতি না করলেও রিহান এর মামা আতিক চৌধুরী ঢাকার স্থানীয়।সেখানের কোনো এক এলাকার মেয়র তিনি। রিহান ভাই সেখানে থাকে।মামার সব কিছু ওনি দেখে।আতিক চৌধুরীর ডান হাত বলা চলে।প্রায়শই রিহান ভাই ঢাকা থাকে।গ্রামে খুব কম আসে।আবার কখনো কখনো হুটহাট চলে আসে। এই তো আজ তিন মাস পর এসছে। মিরার ভালো লাগে পুরুষ টাকে।একপলক দেখার জন্য চাতক পাখির ন্যায় অপেক্ষা করে থাকে।কিন্তু মানুষ টার সামনে দাঁড়িয়ে কখনো কিছু বলার সাহস পায় না।তার অবশ্য যথেষ্ট কারণ রয়েছে। মিরা রিহান এর ফুপিমণির মেয়ে।রিহান আর মিরাদের বাড়ি খুব বেশি দূরে নয়।সম্পর্ক থাকলেও মানুষ গুলো তাদের মধ্যে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে চলে।এর কারণ মিরা’র বাবা।মিরা’র মা কে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো।
মিরা বিশেষ কিছু জানে না।তবে দাদি মাঝেমধ্যে একটুআধটু বলে।কিন্তু পুরো টা কখনো বলে না।মিরা’র মা সেই সুযোগ মিরা’র দাদি কে দেয় না।
মিরা’র মন খারাপ হয় দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে।মিরা মাথা নিচু করে কথা গুলো ভাবছিলো।রিহান হঠাৎ বলে উঠলো,
-“আজ বাড়ি গিয়ে তোর মাকে বলবি। রিহান ভাই বলেছে আমার বিয়ের বয়স হয় নি এখনো।”
রিহান এর কথায় প্রথমে হকচকালেও পর মূহুর্তে ভাবুক হয় মিরা।চিন্তার ভাজ পড়ে কপালে মেয়ে টার। অকপট বললো,
-“কিন্তু রিহান ভাই আমাদের পাশের বাড়ির চম্পা তো আমার সমান।ওর তো বিয়ে হয়েছে। একটা বাচ্চাও আছে।”
মিরা’র বোকা-সোকা কথা শুনে রিহান দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
-“তোর বিয়ে করার শখ প্রচুর।
একটা দেব না কানের গোড়ায়।”
মিরা পুরো কথা না শুনে এক দৌড়ে চলে গেলো সেখান থেকে। রিহান ভাই নিশ্চিত বুঝে গিয়েছে বিয়ের কথা টা মিরা মিথ্যা বলেছে।
মিরা কে দৌড়ে চলে যেতে দেখে রিহান ভ্যাবাচ্যাকা খেলো।তবে কি ভেবে ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ে।মাথার পেছনে এক হাত রেখে আরেক হাত কোমড়ে রাখে।কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে জিপগাড়ি টায় বসলো। সিটে মাথা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে বসতেই পেছনের সিট থেকে খোঁচা মারলো কাজল।ওর সাথে সাথে ইফাদও খোঁচা মেরে দু’জনে এক সাথে উঠলো,
-“কি মাম্মা বুকে জ্বলে?”
রিহান চোখ বন্ধ করে রেখেই দাঁত কটমট করলো।গম্ভীর স্বরে চাপা ধমক দিয়ে বললো,
-“আর একটা কথা বললে দু’টো কে লাত্থি মেরে জিপ থেকে ফেলে দেব।”
কাজল ইফাদ দু’জনে মুখে আঙ্গুল দিয়ে বসলো।রিহান চোখ বন্ধ করে বসে রইলো। কত সময় কাটলো জানা নেই। কাজল ফিসফিস করে ইফাদ কে কিছু বলতে যাচ্ছিল।এরমধ্যে হঠাৎ গম্ভীর কণ্ঠে রিহান বললো,
-“সিগারেট দে।”
কাজল দ্রুত পেছনের সিট থেকে রিহানের ঠোঁটে সিগারেট রাখলো।ইফাদ অন্য পাশ থেকে লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিলো সিগারেট এর মাথায়।ঘটনা এতো দ্রুত ঘটল রিহান কিছু বুঝে উঠতে পারে না। বিষয় টা মস্তিষ্কের কাছে সচল হতেই রিহান ক্ষেপে উঠলো।দাঁত কটমট করে বললো,
-“আমার হাত আছে।”
-“সররি,সরি ভাই।
তুই রেগে আছিস।তাই ভাবলা,,,
কাজল তড়িঘড়ি করে বলতে লাগলো।রিহান পুরো কথা না শুনেই সিগারেট ফেলে দিলো দূরে। জিপগাড়ি স্টার্ট করতে করতে বলে উঠলো,
-“আমি তোদের বলেছি আমি রেগে আছি?”
কাজল আর কিছু বলার সাহস পায় না।ইফাদ চুপ করে বসে আছে। দু’জনে জানে এখন কিছু বলা মানে নিজেদের বিপদ নিজেরা হাতে পায়ে ধরে টেনে আনা।
——
মিরা’র বাবা মুনতাসীর ছিলো মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র সন্তান।সে-তুলনায় মিরা’র মা রোকেয়া ছিলো জমিদারের মেয়ে। দু’জনের ভালবাসা মেনে নেয় নি কেউ।সম্পর্কের কথা জানাজানি হওয়ার পর দু’জন কে শাসানো হয়। একটা সময় মিরা’র মাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য পাত্র দেখা হয়।বিয়ের সব আয়োজন শেষ বিয়ের দিন রোকেয়া বেগম পালিয়ে আসে।অতঃপর বিয়ে করে দু’জন। এরপর বছর দুই বছর দু’জন এর কোনো খোঁজ ছিলো না।কিন্তু হঠাৎ একদিন তারা ফিরে আসে। তখন আর রমজান শেখ এর কিছু করার সুযোগ ছিলো না।তখন তাদের কোল জুড়ে চলে এসেছিলো মিরা।তারপরও কোনো যোগাযোগ ছিলো না দুই পরিবারের মাঝে।রমজান শেখ কষ্ট পেয়েছিল অনেক। দুই ছেলে আর এই একমাত্র মেয়ে। মেয়ে কে তিনি অনেক ভালোবাসতো।মেয়ের দেওয়া আঘাত তিনি মেনে নিতে পারে নি। মেয়ে কে মৃত বলে ঘোষণা করেছিলো।সেদিনের পর থেকে। সময় চলতে থাকে এভাবে। কিন্তু মিরা যখন ছয় বছর বয়স মিরার বাবা তখন মা-রা যায়।মিরা’র বাবা একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে।রোজ গ্রাম থেকে তিনি যাতায়াত করতেন। একদিন সন্ধ্যা বেলা বাড়ি ফিরে বুকের ব্যাথা জানালো।তারপর রাত গভীর হওয়ার আগে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।ঘরে তখন মিরা’র দাদা-দাদি আর মিরা’র মা।খবর টা খুব দ্রুত গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে।শেখ বাড়িতে থেকে সেদিন সব রাগ অভিমান সরিয়ে রমজান শেখ আসে।এতে কোনো লাভ হয় নি।রোকেয়া বেগম বাবা-র সাথে কথা বললেও কখনো শেখ বাড়িতে যান নি।যত বড় অনুষ্ঠান উৎসবই হোক না কেনো।স্বামী বেঁচে থাকতে যেখানে ওনার স্বামী নিয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য হয় নি।সেখানে তিনি স্বামীর অনুপস্থিতিতে যেতে চান না।রমজান শেখ মেয়ের অভিমান বুঝতে পারে। কিন্তু এখন আফসোস আর দীর্ঘ শ্বাস ছাড়া কোনো কিছু করার নেই।
—–
মিরা লম্বা চুলের বিনুনি দোলাতে দোলাতে বাড়িতে প্রবেশ করলো। এক তলা এই বাড়ি টা মিরা’র বাবা তৈরী করেছে।বিশাল বড়ো নয়।তবে শান্তি পাওয়া যায় এখানে। উঠোনের এক সাইডে গোসলখানা।যদিও বাড়ির ভেতরে সুন্দর একটা বাথরুম রয়েছে। কিন্তু গ্রামের যেন এটা একটা রীতি বলা চলে।বাড়ির ভেতরে সব থাকার পরেও বাহিরে একটা গোসলখানা আর রান্না ঘর থাকবেই।গোসলখানার সাথে একটা রান্না ঘর।তার সামনে মিরা’র দাদি মাটির চুলা বানিয়ে দিয়েছে। মিরা’র মা বৃষ্টি না থাকলে বেশিরভাগ সময় এখানে রান্না করে।
এই যে আজও রান্না করছে। মিরা লাফিয়ে লাফিয়ে মায়ের কাছে চলে গেলো। পেছন থেকে গলা জড়িয়ে ধরে। রোকেয়া মেয়ের ছোঁয়া পেয়ে মুচকি হাসলো। মিরা আহ্লাদী স্বরে ডাকলো,
-“আম্মা!”
রোকেয়া উত্তর দেয় না।মেয়ের মুখে এই এক টা ডাক ওনার বুকের ভেতর সব আগুন নিভিয়ে দেয়।সব কষ্ট মেয়ের মুখের দিকে তাকালে ভুলে যায়।মিরা মায়ের থেকে জবাব না পেয়ে নিজ থেকে বলতে লাগলো,
-“আম্মা জানো রিহান ভাই গ্রামে এসেছে।আজ আমার সাথে দেখা হয়েছে।”
রোকেয়া মেয়ের হাত গলা থেকে ছাড়িয়ে নিলো।নিজে মেয়ের দিকে ফিরে বসে। মুখ টা মূহুর্তে মাঝে আঁধার হয়ে গেলো।গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো, ,
-“কত বার বলেছি ওই বাড়ির কারোর সাথে কথা বলবে না?”
মিরা’র হঠাৎ মনে হলো খুশির ঠেলায় মাকে সত্যি কথা বলে দেওয়া ঠিক হয় নি।শেখ বাড়ি নিয়ে তো কিছু বললেই মা রাগ করে।মিরা মিথ্যা খুব একটা বলতে পারে না। কিন্তু আজ যেন মিথ্যা বলতে হচ্ছে সবখানে বেশি। বলে না “তুমি একটা মিথ্যা বললে সেই মিথ্যা ঢাকতে আরো হাজার টা মিথ্যা তোমার মুখ দিয়ে আপনা-আপনি চলে আসবে”।
মিরা আমতা আমতা করে বলে,
-“কথা বলি নি।একটু,,,,
মিরা’র পুরো কথা শুনলো না রোকেয়া বেগম। রান্নার জন্য চিকন চিকন লাকড়ি এনে রেখে ছিলো চুলার কাছে। সেখান থেকে একটা চিকন ডাল নিয়ে মিরা’র গায়ে এলোপাথাড়ি কয়েকটা লাগিয়ে দিলো।মিরা আকস্মিক আক্রমণে কিছু বুঝে উঠতে পারে না। শরীরে চিনচিন ব্যাথায় দিকবিদিক ভুলে নিচে বসে পড়ে কান্না করতে করতে। বাহিরে হৈচৈ শব্দ মিরা’র দাদি কমলা বেগম ছুটে আসে। ছেলে বউয়ের কান্ড দেখে হতবাক তিনি। দৌড়ে এসে নাতনিকে জড়িয়ে ধরে।ঘেমে ন্যায় একাকার অবস্থা মেয়ে টার।শরীরে বিভিন্ন অংশ লাল হয়ে ফুলে গিয়েছে। সুন্দর শরীরে যা খুব ভয়ংকর ভাবে ফুটে উঠছে।শাশুড়ী কে দেখে রোকেয়া হাত থেকে লাকড়ি ফেলে দিলো। কমলা বেগম রাগী চোখে তাকিয়ে ছেলে বউয়ের দিকে।তেজী কণ্ঠে বলে উঠলো,
-“কি কারণে তুমি মাইয়াডারে মারছো আমি জানবার চাই না।শুধু কইয়া দিলাম কামডা তুমি ভালা করো নাই বউ।”
কমলা বেগম কথা গুলো বলতে বলতে মিরার মুখে হাত বুলায়। একমাত্র ছেলের শেষ চিহ্ন এটা।খুব আদরের শখের নাতনি। তিনি নিজেও কাঁদতে লাগলো।মিরা হেঁচকি তুলে কাঁদছে। রোকেয়া বেগম কঠিন স্বরে বললো,
-“বেশ করেছি মেরেছি।ওকে বলে দিন আম্মা। শেখ বাড়ির আর কারোর সাথে কথা বললে এরচেয়েও খারাপ হবে ওর সাথে।”
#চলবে…..
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন প্লিজ।]