#প্রণয়ের_জলসাঘরে
#পর্বঃ২ #রেহানা_পুতুল
পিয়াসা ঝুঁকে গোলাপটি কুড়িয়ে নিতে যাবে, অমনি কারো বলিষ্ঠ পায়ের স্যান্ডেলের নিচে চাপা পড়ে যায় ফুলটি। পিয়াসা মাথা তুলে চেয়ে দেখে আয়মান স্যার।
সে ভূত দেখার মত ঘাবড়ে গেল। আড়ভাঙা স্বরে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,
স্যার কে মেরেছে ফুল আমি জানিনা।
কলেজে কি সুন্দর মেয়ে তুমি একা? আর দ্বিতীয়টি নেই? আর যদি নাইবা জানো তাহলে ফুলটা তুলতে যাচ্ছিলে কেন? রুক্ষ স্বরে বলল আয়মান ।
স্যার ফুল আমার খুউব ভালোলাগে। তাই ফুলটা নিতে যাচ্ছিলাম। এর বেশি কিছু পিয়াসা বলতে গিয়েও পারলনা।
এখন বড় হচ্ছো তুমি। প্রেম করো আর যাই করো সেটা তোমার ফ্রিডম। তবে অন্তত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চত্বরের বাইরে গিয়ে করবে। এসব থার্ডক্লাশ কর্মযজ্ঞ যেন এখানে আর না দেখি।
লুকানো ক্ষোভ আর দুঃখ নিয়ে পিয়াসা লম্বা লম্বা পা ফেলে আয়মানের সামনে থেকে চলে গেল। হেয়ালী করে ভাবল পূর্বের জনমে মনে হয় আমার কপালে এটাই লিখা ছিলো,
হে বালিকা একদা তুমি ধরনীতে পদার্পণ করিবে। কারণে অকারণে এক যুবক শিক্ষক দ্বারা অপমানিত হইবে। যে তোমাকে দেখলেই যুবক রূপধারীতে বয়স্কার বেশ ধরিবে। দূর কি ছাইঁপাশ চিন্তা করছি বলে পিয়াসা নিজের মাথায় নিজেই মৃদু ধাক্কা দিল।
আয়মান কলেজের বারান্দা ধরে এগিয়ে গেল। খুঁজে দেখল কেউ নেউ। তাহলে ফুল ছোঁড়া ছেলেটি কই। মনে হয় আমাকে দেখেই পালিয়েছে। পুনরায় গিয়ে দলিত মথিত হওয়া ফুলটার দিকে চাইল।
‘ আমি ফুল খুব ভালোবাসি স্যার। ‘ পিয়াসার নরম হয়ে বলা বাক্যটি নিজের অজান্তেই মনে হলো আবার।
সেকেন্ড ইয়ারে উঠে গেল পিয়াসা।ক্লাসের অন্য বন্ধুরা আয়মান স্যারের কাছে কোচিং করছে। পিয়াসাও অন্যদের সাথে কোচিং করছে। কারণ ইংরেজির জন্য আয়মান স্যার ভালো। কোচিং ক্লাস হয় কলেজের কমনরুমে।
আজ স্যার এখনো আসেনি কোচিং ক্লাসে। সব বন্ধুরা নানান খুনসুটিতে মেতে উঠেছে। পিয়াসাদের এই বন্ধুগ্রুপের নাম হলো গ্লুবাহিনী। সুপার গ্লু’ র আঠার মতো তারা একে অপরের সাথে আষ্ঠেপৃষ্ঠে লেগে থাকে।
এই তোরা একটা কৌতুক শুনবি? বলল হিরন।
পিয়াসা দাঁত কেলিয়ে বলল,
বলতো শুনি। তোর আবার কৌতুক। ঘুরে ফিরে যেই লাউ সেই কদু।
এই পেশা চুপ কর।
হিরু শুন, আজ থেকে, এই মুহুর্ত থেকে তোর সাথে আমার আড়ি। যেদিন তুই পিয়াসা বলে ডাকবি। ঠিক সেদিন তোর সাথে কথা হবে।
জেবা গুনগুনিয়ে বলল পেশা+ব ইকুয়াল হয়, বলে মুখ চেপে মিটমিট করে হাসল।
তুই এত বেশরম মাইয়া ক্যান? পাশ থেকে জুলি বলল।
এই ব্যাপ্যার না। জুলি বাদ দে। জেবার মত এমন একটা খাটাইশ দোস্ত থাকার দরকার আছে। সময় অসময়ে কাজে লাগানো যাবে। এক দমে বলল পিয়াসা।
এই পেশাবু কৌতুকটা শুনে যা আড়ি নেওয়ার আগে।
” স্ত্রী তার স্বামীকে জিজ্ঞেস করছে শিশুসুলভ কন্ঠে,
ওগো আমি মরে গেলে তুমি কি করবে ?
স্বামী ঃ পাগল হয়ে যাব জান।
স্ত্রী ঃ আচ্ছা তুমি কি আবার বিয়ে করবে?
স্বামী ঃ অবশ্যই বিয়ে করব জান।
স্ত্রীঃ কিইই? তুমি এত বড় বেঈমান?
স্বামী ঃ পাগলে কখন কি করে ঠিকাছে জান ? ”
শান্ত স্বভাবের পিয়াসাও অন্য বন্ধুদের সাথে হেসে কুটিকুটি হলো।
আরেকটা কৌতুক শুন বলে হিরন আবার বলল,
” পার্কের একটি বেঞ্চেতে বসে আছে প্রেমিক প্রেমিকা। তারা একে অন্যের প্রতি প্রেমের পরিমাপ বোঝাচ্ছে। এক পর্যায়ে প্রেমিকটি উঠে দাঁড়িয়ে গেল। চোখে মুখে রাজ্যের অস্থিরতা। একটু খোলা জায়গায় গিয়ে বুক টানটান করে দাঁড়ালো। দুহাত মেলে ধরে আকাশের দিকে মুখ তুলে বলল,
প্রিয়া আমরা স্বাধীনভাবে প্রেম করব। কেউ কোন বাধা হয়ে আসতে পারবেনা। কারণ এই পৃথিবী শুধু তোমার আমার। আমাদের দুজনার।
পার্কের মাঝ বরাবর মেঠো পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে এক প্রবীণ লোক। তিনি শুনতে পেয়ে এগিয়ে এলেন প্রেমিক ছেলেটির সামনে।
বললেন, তাহলে কি তোমরা দুজন ছাড়া এ পৃথিবীতে বাস করা আমরা সবাই ভাড়াটিয়া? ”
হোঃ হোঃ হোঃ করে সববন্ধুরা উচ্চস্বরে হাসতে লাগল। জেবা বলল,চরম হইছে এটা।
বিনা টিকেটে পিউর বিনোদন দিলাম তোদের । আমার দিকে একটু নজর রাখিস তোরা।
হ রাখিস ফেল্টু বয় হিরোর দিকে। চোখের পাতা টেনে বলল জুলি।
স্মার্ট ছেলেমেয়েরা কি আড্ডাবাজি চলছে? বলেই আয়মান স্যার চলে এলো। সবগুলো বোবা হয়ে গেল পলকেই। কোচিং চলাকালীন রায়হান স্যার ও ক্লাসে ঢুকলো।
আয়মানের সাথে তার কথা বলার ধরন দেখে ছাত্র হিরন জিজ্ঞেস করল,
স্যার আপনারা দুজন মনে হয় ফ্রেন্ড?
আয়মান সহাস্যে হেসে বলল,
ওহ হো! তোমরা জাননা? রায়হান ও আমি বহুদিনের পুরোনো বন্ধু। আমরা দূরের এলাকার হলেও স্কুল, কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়ে একসাথেই শেষ করেছি। বাট আমার লাইফে ওর অবদান বেশী।
রায়হান বন্ধু আয়মানের পিঠ চাপড়ে, ও ভালো ছেলেতো তাই সামান্য কিছুকেই অসামান্য করে বলতে পারে।
মাশাল্লাহ স্যার। আপনাদের বন্ধুত্বের বন্ধন যেন চির অম্লান, চির অক্ষয় থাকে। আশীর্বাদ ঢংয়ে বলল নাহিদ।
তোমার কথার ফুল চন্দন ফুটুক। হেসে বলল রায়হান।
জেবা ও তুলি কানে কানে ফিসফিসিয়ে কি যেন বলছে।
আয়মান বলল,কি বলছ তোমরা?
সাহসী মেয়ে তুলি বলেই ফেলল,
স্যার বলছি যেকোন মানুষের বন্ধুত্ব যতই মধুর হোক আর গভীর হোক, কিন্তু নিজের বউ বা বরের ভাগ কেউই দিবেনা।
রায়হান বলল,খুব দামী কথা বললে তুলি। এটা অসম্ভব।
হয়েছে টপিক চেঞ্জ করো এবার তোমরা। নির্দেশ দিল আয়মান।
সবগুলো নোট খাতায় মনোনিবেশ করলো। রায়হান পিয়াসার দিকে চেয়ে আছে সকরুণ চোখে। সেদিনের পর হতেই পিয়াসার জন্য তার হৃদয়ে একটা সফট কর্ণার কাজ করছে। পিয়াসাকে নিয়ে তার মনে শত প্রশ্ন, শত জিজ্ঞাসা। এ যেন এক দুর্নিবার কৌতুহল। কিন্তু কিভাবে জিজ্ঞেস করবে, কি ধরে প্রসঙ্গ তুলবে তার কোন অবলম্বন খুঁজে পাচ্ছেনা।
পিয়াসা মনে হয় পড়াশোনায় আগের চেয়ে বেশি মনোযোগী হয়ে উঠেছ? চুপচাপ দেখা যাচ্ছে যে? জিজ্ঞেস করলো রায়হান।
পিয়াসা এক পলক চোখ তুলে চাইলো রায়হানের দিকে। কিন্তু মুখে কিছুই বললনা। রায়হান ও আর কিছুই জিজ্ঞেস করলনা। সবার উদ্দেশ্যে বলল, পরিক্ষার সময় দেখতে দেখতেই ঘনিয়ে আসবে। তোমরা কারো কোন সমস্যা হলে আয়মান স্যারকে ফোন দিবে।
আয়মান হিরনের খাতায় তার পাবলিক নাম্বার লিখে দিয়ে, সবাই নাম্বার নিয়ে রাখ। এনিটাইম ফোন দিতে পারবে।
পিয়াসা ছাড়া সবাই নাম্বার লিখে নিল।
পিয়াসা নাম্বার নিলেনা যে? জিজ্ঞেস করলো রায়হান।
স্বল্পভাষী আয়মান দেখেও চুপ রইলো। কারণ সে জানে তার মতো করে এই মেয়েটাও তাকে পছন্দ করেনা। আর না করাটাই স্বাভাবিক। তাই হয়তো নাম্বার নেয়নি।
পিয়াসা চুপ হয়ে আছে। রায়হান যা বোঝার বুঝে নিল। তাই দ্বিতীয় কোন প্রশ্ন করলনা আর। কোচিং শেষ হয়ে গেলে সবাই একসাথে বের হয়ে গেল। পিয়াসা রায়হানের পিছন পিছন গিয়ে স্যার বলে ডাক দিল।
রায়হান পুলকিত হল মনে মনে। দাঁড়িয়ে গেল।
স্যার আপনার রুমালটা সেদিন যে দিয়েছিলেন। এই নেন।
ওহ। আমি ভুলেও গিয়েছি। এই সামান্য কিছু ফেরত দিতে হয়? রেখে দাও তুমি।
নাহ স্যার। সামান্য হোক কি হয়েছে। জিনিসতো। আমি ভালো করে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে দিয়েছি।
আচ্ছা দাও। রুমাল দিলে নাকি ঝগড়া হয় আমার দাদীর মুখে শুনেছি। তবে না ধুইলেই বেশী ভালো হতো।
বুঝলাম না স্যার। না ধুইলে বেশি ভালো হতো কেন?
রায়হান ছল করার আশ্রয় নিলো। তুমি কষ্ট করে না ধুইলেও হতো। এটা মিন করেছি।
তাই বলেন বলে পিয়াসা মিষ্টি হেসে দিল। রায়হান কৌশলে তার মোবাইল নাম্বার লিখে দিল পিয়াসাকে। বলল, যেকোন প্রয়োজনে ফোন নয় শুধু মিসকলড দিলেই হবে।
চকিতে বিষম খেল পিয়াসা। বুকের ভিতর খচখচানি শুরু হলো। একজন শিক্ষক এত উপচানো আন্তরিকতা কেন আমার মতো একজন নিরীহ ছাত্রীকে দেখাচ্ছে। কারণ কি?
কোন সমস্যা পিয়াসা?
কাঁচুমাচু করতে করতে জানাল,স্যার আমার মোবাইল নেই। এজন্যই আয়মান স্যারের ও নাম্বার নেইনি।
রায়হান আফসোস করে বলল, ওহ আচ্ছা। আচ্ছা পিয়াসা তোমার এইম ইন লাইফ কি বা ক্যারিয়ার নিয়ে কোন স্বপ্ন আছে কি?
পিয়াসা মাথা নিচু করে ধীর গলায় জানালো,
স্যার এসব বলতে গেলে লম্বা সময় লাগবে। আমি আজ যাই। বাসায় তাড়া আছে। অন্য একদিন আপনাকে বলল।
রায়হান দেখল সেদিন দেরী হতেই বেদম মার খেলো সৎ মায়ের হাতে।
চট করে নিজের পকেট থেকে একটা মোবাইল বের করে নিল। সিম সহ পিয়াসার দিকে এগিয়ে ধরলো। বলল,আমার দুটো মোবাইল। এটা তুমি রাখ।
মুহুর্তেই মুখ মলিন করে ফেলল পিয়াসা। তার আত্মসম্মানে বাঁধলো খুব
। এটাকে রায়হান স্যারের দয়া মনে হলো তার কাছে। বলল, না স্যার প্লিজ। আপনি কেন আমাকে ফোন দিবেন?
আরেহ মেয়ে। দিচ্ছি কই। তুমি ফ্রি টাইমে ঠিক সেই কথাগুলো আমার সাথে শেয়ার করবে। যা এখন বলতে তুমি। এরপর আমাকে সেট দিয়ে দিবে। কারণ কলেজে আসলে অতিরিক্ত সময় তোমার বা আমার কারোই হচ্ছেনা।
এবার পিয়াসা অনিচ্ছাসত্ত্বেও মোবাইলটা নিল। রায়হান চলে গেল। পিয়াসা ভাবনার একূল ওকূল করেও কোন সদুত্তর পেলনা। রায়হান স্যার এতটা ভালো। এতটা আন্তরিক। নাকি সেদিন আমার দূর্দশাগ্রস্ত জীবন সম্পর্কে স্যার কিছুটা আঁচ করতে পেরেছে? করতে পারাটাই যুক্তিযুক্ত। আর তারজন্যই কি এই অসীম সহানুভূতি?
এদিকে কলেজের বারান্দার একপাশে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনা দেখে গেল আয়মান। আজ কিছু না বললেও কাল ঠিকই পিয়াসাকে নাজেহাল করতে ভুল করবেনা সে। বন্ধু রায়হানকে কিছুই বলবেনা সে। কারণ সে জানে পিয়াসাই আস্ত একটা খারাপ মেয়ে।
পিয়াসা মোবাইলের সুইচড অফ করে ব্যাগের ভিতরে রাখল। চলে গেল বাসায় । তাদের বাসায় গেট দিয়ে ঢুকতেই সে যা দেখল,তাতে আৎকে গিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো।
চলবে…২
#প্রণয়ের_জলসাঘরে
#পর্বঃ৩ #লেখনীতে_রেহানা_পুতুল
পিয়াসা থমকে দাঁড়িয়ে যায় বাসার সামনের খালি স্থানেই। পুলিশ কেন তাদের বাসার সামনে? ছোটবেলায় চোখের সামনে দেখা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার পর হতেই পুলিশ দেখলেই পিয়াসা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে যায়। তার আত্মারাম খাঁচা ছেড়ে পালায়।
এত মানুষের জটলা কেন তাদের বাসার সামনে? সব বাসার মানুষ তাদের বাসার ভিতরে কেন? পাশের বাসার মিনা আন্টি এসে পিয়াসাকে বুকে চেপে ধরে। টেনে নিয়ে যায় বাসার ভিতরে।
তার বাবার নিথর দেহটা মাটিতে পড়ে আছে। পিয়াসা বাবার বুকের উপর আছড়ে পড়ে। আকাশ মাটি এক করে গলা ফাটিয়ে বিলাপ করে। নানান প্রশ্নবাণে পরিচিতজনদের জর্জরিত করে ফেলে। সবাই চুপ হয়ে নিরবে অশ্রু ফেলছে।
পুলিশ তাকে জানায় আপনার বাবাকে আপনার সৎ মা বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছে। আমরা ফোন পেয়ে এসেছি। যদিও তিনি পুরোদমে অস্বীকার করছে। আমরা উনাকে থানায় নিয়ে যাচ্ছি। লাশ ও নিয়ে যাচ্ছি। পোস্ট মটের্ম হবে।
পুলিশ চলে গেলে আশেপাশের মানুষ ও চলে যায়। সৎ মায়ের বোন এসেছে সৎ বোন দুটোকে নিয়ে যেতে। পিয়াসা যেখানে নিজেই এতিম অসহায় হয়ে গেল। সেখানে বোনদের কিভাবে নিজের করে রাখবে। সবাই বলাবলি করছে এই মেয়েটার কি হবে এখন। কোথায় যাবে। কে আশ্রয় দিবে এই উঠতি বয়সের মেয়েটাকে।
পিয়াসা নয় বছরের সৎ বোন রিয়াকে জিজ্ঞেস করে বাবার মৃত্যুর কারণ। সিমা রিয়ার চেয়ে তিন বছরের বড়। সে সত্যিটা বলবেনা। কিন্তু সে জানে রিয়া হুড়হুড় করে যা জানে বলে দিবে।
ম্যাড়ম্যাড়ে স্বরে জানতে চায়,
রিয়া পুলিশ যে বলল আব্বুকে তোর আম্মু বিষ খাইয়েছে।
এটা সত্যিই বোন?
রিয়া কাঁপতে কাঁপতে বোন পিয়াসার হাত ধরে বলল,
আপু তুমি সকালে স্কুলে যাওয়ার পর আম্মু আর আব্বু তোমাকে নিয়ে ঝগড়া লাগছে। আব্বু বলে পিয়াসাকে অনেক পড়াশোনা করামু।
আম্মু বলে নাহ। কলেজ পাসের পর বিয়া দিয়া দিমু তারে। ওর পিছনে টাকা খরচ করলে আমার দুইটারে কিভাবে পড়ালেখা শিখামু?
এভাবে অনেক কথা কাটাকাটির পর আব্বু বলে,
আমার শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকতে আমার মেয়েকে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিমুনা।
আম্মু তখন নিজে নিজে অনেক বকল তোমাকে। এরপর আব্বু বাইরে চলে যায় নামাজ পড়তে। আসার পর আম্মু ভাত দেয়। ডাল দেয়। আব্বু খেয়ে শুয়ে থাকে। তারপর বলে পেটব্যথা, বমি ও করে দিছিলো। মিনা আন্টির জামাই ডাক্তার আনছে। বলে আব্বু নাই।
পিয়াসা বেদনার্ত মুখে বলে, আব্বু ওই কথাটা না বললেই বেঁচে যেতরে রিয়া।
রিয়া পিয়াসার গলা পেঁচিয়ে ধরে, ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে বলে, আপু আম্মু কবে ছাড়া পাবে? আমাদেরকে ছোট খালা নিয়ে যাবে। তুমি কার কাছে থাকবা?
পিয়াসা হুহু করে অশ্রুপাত করতে লাগলো। বলল, তা আমি কি করে জানব রে। আর আব্বুর লাশ দাফন হোক আগে। তারপর গ্রামে চলে যাব কোন আত্মীয়ের বাড়িতে।
এদিকে প্রত্যাশিত সময় অতিবাহিত হয়ে গেল। পিয়াসার কোন খবর নেই। রায়হান বিচলিত হয়ে পড়ল। ভয়ে ফোন ও দিতে পারছেনা। সাইলেন্ট না থাকলে ফোন বেজে উঠবে। পরে সৎ মায়ের হাতে মেয়েটা মার খাবে। এই ভেবে
দুই শব্দের ছোট্ট একটা মেসেজ দিল।
“কেমন আছ পিয়াসা? এনি প্রবলেম?”
প্রতিক্ষার প্রহর কেটে গেল। তবুও কোন রিপ্লাই এলনা। রায়হানের মাঝে অস্থিরতা বেড়ে দিগুণ হয়ে গেল।
পরপর টানা দুইদিন পিয়াসা কলেজে আসছেনা। কোচিং ও করছেনা। সে যে পিয়াসাকে খুঁজছে এটা দ্বিতীয় কাউকে বুঝতে দিলনা খুব সচেতনভাবেই।
এদিকে আয়মান ও কোচিং ক্লাসে অন্যদেরকে জিজ্ঞেস করল,
তোমাদের সাথের আরেক বন্ধু আসেনা কেন? কিছু জান তোমরা?
জেবা, জুলি,নাহিদ উৎকন্ঠা নিয়ে জানাল,
স্যার জানিনা। পিয়াসাতো ক্লাস মিস করেনা ভুলেও। বরং ও বাসা থেকে বাইরে থাকতে পারলেই বাঁচে। আমরা কোনভাবেই খোঁজ নিতে পারছিনা। ওর তো মোবাইল ও নেই।
বাইরে থাকলে বাঁচে মানে? ও অসুস্থওতো হতে পারে।
তা হতে পারে। কিন্তু তেমন অসুখ বিসুখ তো দেখিনা তার। স্যার পিয়াসার সৎ মা ঘরে। আমরা এর বেশী কিছু জানিনা। স্যার কোনভাবে কি ওর খোঁজ নেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়না?
ওদেরকে চিন্তাগ্রস্ত মুখে দেখে আয়মানের ও চোখের কোণে চিন্তার রেখা পরিষ্ফুটিত হলো । বলল,অফিস থেকে ওর বাসার এড্রেস বের করা যায় কিনা দেখি।
তাই করেন স্যার প্লিজ। আজই। পারলে এক্ষুনি।
দেখছি বলে আয়মান উঠে গেল অফিসে। একটু পর পিয়াসার এড্রেস বের করে আনল। তোমরা কেউ গিয়ে খবর নিতে পারো। যে মোবাইল নাম্বার দেয়া আছে অভিভাবকের। সেটা অফ পাচ্ছি।
নাহিদ বলল স্যার আমি আর হিরন কাল যাব। আজতো সময় নেই।
আচ্ছা যেও তোমাদের সুবিধামতে।
রায়হান আর থাকতে পারছেনা। বিকেলেই পিয়াসাদের বাসায় চলে গেল। মনে মনে স্রস্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করল সেদিন ধরনীর বুকে বৃষ্টি দিল বলে। নয়তো আজ কিভাবে তাদের বাসা চিনতো।
পিয়াসাদের গেটে ঢুকে ছোট একটি ছেলের সাহায্য নিয়ে বাসার ভিতরে গেল রায়হান। তাকে দেখেই বাসার ভিতরের লোকজন সরে গেল।
পিয়াসা রায়হানকে দেখেই বিস্মিত হলো। চোখ কপালে তুলে ক্ষীণ স্বরে,
স্যার আপনি?
রায়হান থম মেরে গেল পিয়াসাকে দেখেই। অনিমেষ চেয়ে রইলো পিয়াসার দিকে। তিনদিন আগেও যে মেয়েটা ছিল প্রাণোচ্ছল, সজীব। আজ সেই মেয়েটাকে দেখতে কতটা নিষ্প্রাণ, নির্জীব লাগছে। পিয়াসা যেন পুইঁয়ের কচি ডগার ন্যায় তরতর করে বেড়ে উঠছে,আচমকা ঝড়ে ঝাপটাতে মরমর করে ভেঙ্গে পড়েছে। তার কল্পনার ঘোর কাটে কানে কুকুরের বিদঘুটে ডাক কানে আসতেই ।
তোমার ফোন বন্ধ। কলেজেও যাচ্ছনা। তাই খবর নিতে এলাম। এসেতো কারণ শুনলাম ওই ছেলেটার কাছে।
পিয়াসা ঢুকরে কেঁদে উঠলো বাবাকে স্মরণ করে। রায়হান তার সামর্থ্যনুযায়ী পিয়াসাকে শান্তনা দিল। তার খুব ইচ্ছে করছে পিয়াসার মাথায় নির্ভরতার হাতটুকু রাখতে। কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি অনুকূলে নেই।
পিয়াসা রায়হানকে নাস্তা দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তা বুঝতে পেরে রায়হান বলল,
পিয়াসা ফরমালিটির কোন প্রয়োজন নেই। আমি এখন উঠি। তোমার এত বড় দুঃসময়ে আমি কিভাবে কি করতে পারি তাই ভাবছি। কাল কলেজে অবশ্যই আসবে। তুমি মাইন্ড করবে নয়তো তোমার হাত খরচের জন্য কিছু দিতাম।
রায়হান চলে যাওয়ার সময় অনুরোধের ভঙ্গিতে বলল,
পারলে ফোন অন করে একটু যোগাযোগ করো আমার সাথে। কথা আছে জরুরী।
পিয়াসা ক্লান্ত অবসাদগ্রস্ত মুখে মাথা হেলিয়ে মৌনতা প্রকাশ করল।
রায়হান এতসময় কি বলল না বলল তা পিয়াসার তেমন হৃদয়ঙ্গম হলনা। কিভাবেই বা হবে। যে বাবা বুকে পিঠে করে বড় করেছে তাকে,যে বাবা তার জন্য প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেই বলি হয়ে গেল কারো রোষানলের। সে বাবা তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে মিশে আছে। তার পুরো হৃদয়টা জুড়ে তার বাবা।
থেমে থেমেই পিয়াসা বাবার জন্য কান্না জুড়ে দিচ্ছে। নিজের নিস্তেজ শরীরটাকে আশি বছরের বৃদ্ধার মতো টেনে টেনে নিয়ে গেল বিছানার উপরে। গা এলিয়ে কাত হয়ে পড়ে রইলো।
মোবাইলটা হাতে নিয়ে নেড়েছেড়ে আবার বালিশের নিচে রেখে দিল। মিনা আন্টি এসে জোর করে দু’লোকমা ভাত মুখে তুলে দিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে অভুক্ত ছিল পিয়াসা। তাই সামান্য ভাত খাওয়াতেই শরীর ছেড়ে দিল। দুচোখে নেমে এলো এক পাহাড় ঘুম। তার সাথে রাতে মিনা আন্টি নিজেই ঘুমিয়েছে।
পরের দিন সকালেই হিরন, নাহিদ,তুলি এলো পিয়াসাদের বাসায়। ঘটনার আকস্মিকতা শুনে তারা ভীষণ মর্মাহত হলো। পিয়াসা তুলিকে জাপটে ধরে কান্না করতে লাগল। তারা কি বলে শান্তনা দিবে সে ভাষাটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। কিছুসময় অতিবাহিত হলে, তাদের সাথে কলেজে যেতে অনুরোধ করল পিয়াসাকে।
পিয়াসা মিনমিন ভেজা কণ্ঠে জানাল,
নারে আমার পড়াশুনা করার টাকা নাই। আব্বুর এ ঘরের যে ছোট দুটো বোন ছিল আমার। তাদেরকে নিয়ে গিয়েছে তাদের খালা। আমি এ শহরে একা কোথায় থাকব। তোরাই বল। গ্রামে ফুফু আছে। দূর সম্পর্কের এক খালা আছে। তাদের কাছে গিয়ে উঠবো।
হিরন বলল,কেন তোদের এই বাসায় থাকবি। যে মিনা আন্টির কথা বললি উনি তোর খেয়াল রাখবে।
এ বাসার দুই মাসের ভাড়া বাকি। সকালে বাড়িওয়ালা এসেছে। উনি বলছে উনার ভাড়া দিতে হবেনা। আমি যেন বাসা ছেড়ে দিই। বাসার সব জিনিসপত্র বেচে উনি টাকা নিয়ে নিবে। তাতেই উনার পাওনা টাকা শোধ হয়ে যাবে।
শুনে ওরা হতাশ হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। পরে বলল, অন্তত বের হয়ে আয় আমাদের সাথে। বাইরের আলো বাতাস একটু গায়ে লাগুক তোর।
নারেহ। তোরা চলে যা । আমার কিছুই ভালোলাগছেনা। পুরো দুনিয়াকে বিভীষিকাময় লাগছে। কোথাও যেন কোন আলো নেই। পিতামাতাহীন একটা এতিম মেয়ের জীবন কতটা নির্মম আর দুর্বিষহ হতে পারে, তা এই কয়দিনে মর্মে
মর্মে উপলব্ধি করতে পেরেছি।
বন্ধুরা কলেজে চলে গেল ব্যর্থ হয়ে। গিয়ে ক্লাসের সবাইকে পিয়াসার বিষয়ে জানালো। আয়মান স্যারকে জানালো।
আয়মান শুনে চমকে উঠলো। ওদেরকে বলল, এটা কোন কথা হলো। ও পড়াশোনায় মোটামুটি ভালো। অন্তত ফাইনাল পরিক্ষাটা শেষ করুক। আমার কোচিং-এর বেতন আর দিতে হবেনা। আর অফিসে বললে অধ্যক্ষ তার বেতন ও মওকুফ করে দিবে নিশ্চিত।
ওরা জানাল, স্যার ও থাকবে কোথায়?
একটু থেমে আয়মান বলল, এটাও প্রশ্ন। ঢাকা শহরে কে কাকে কয়দিন রাখে। দেখি রায়হানের সাথে আলাপ করে থাকার কোন বন্দোবস্ত করা যায় কিনা।
আর তোমরা বিকেলে একটু কষ্ট করে আবার যেও পিয়াসার কাছে। আমাকে ফোনে ধরিয়ে দিও। ওকে বুঝিয়ে বললে আশাকরি শুনবে। যার বিপদ তার মাথা কাজ করেনা। এ সময় অন্যদের এগিয়ে আসতে হয়।
বন্ধুরা বেশ সন্তুষ্ট হলো আয়মান স্যারের উপর।
কিয়ৎক্ষন ভেবে পূনরায় বলল আয়মান, আচ্ছা থাক আমিই নিজেই যাব। ফোনে কাজ নাও হতে পারে।
তাহলেতো বেশ ভালো হয় স্যার। যেভাবেই হোক ওর গ্রামে যাওয়া বন্ধ করতেই হবে। আমরা এমন ভালো,মিষ্টিভাষী বন্ধুকে ছাড়া নিরানন্দ জীবন চাইনা। আয়মানকে তারা বাসার ঠিকানা ভালো করে বুঝিয়ে দিল।
বিকেলে ক্লাস শেষে আয়মান একটি রিকশা নিয়ে পিয়াসার বাসার দিকে রওনা দিল। বাসার কাছাকাছি যেতেই আয়মানের দৃষ্টি আটকে গেল সামনের একটি স্থানে।
দেখতে পেলো রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে বন্ধু রায়হান রিকসা ডাকছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে পিয়াসা।
আয়মান এক আকাশ অবাক বিস্ময় নিয়ে নির্বাক চোখে চেয়ে রইলো। যেন পৃথিবীতে এইমাত্র ঘটে যাওয়া কোন অত্যাশ্চর্য জিনিস তার দৃষ্টিগোচর হলো। সে যেন নিজের চোখ দুটোকেই বিশ্বাস করতে পারছেনা।
চলবে…৩