#প্রণয়ের_সুর২
#পর্ব৫
#মহুয়া_আমরিন_বিন্দু
নিখিলের সাথে নেহার বেশ কিছুক্ষণ ধস্তা”ধস্তি চললো।নিখিল নেহার হাত ধরে টানছে তার সাথে যাওয়ার জন্য, নেহাও নাছোড়বান্দা সে কিছুতেই যাবে না।রাস্তার মানুষজন কিছুক্ষণ পর পর তাদের কান্ড দেখে যাচ্ছে।কিছু কিছু মানুষ তো নিখিল কে চিনতে পেরে কানাঘুঁষা করে করে বিদায় নিচ্ছে।
নেহার চিন্তা ও হচ্ছে নিখিল যদি এখন এখান থেকে না যায় তাহলে কিভাবে কি সামলাবে নেহা।না জানি কখন তাহমিদা বেগম চলে আসে,নেহাও যেতে পারবে না তার সাথে দেখা না করে।
নিখিল আশেপাশে তাকিয়ে রাগী গলায় বললো–,,দেখ নেহা মেজা’জ যদি একবার বিগ”ড়ে যায় আমার এতোদিন পর পেয়েছি, পুরোটাই শোধ তুলবো আমি, এক চুল ও ছাড় দিবো না।তখন আমাকে পারলে আটকে দেখাস তুই,তুই নিজেও জানিস আটকাতে পারবি না আমাকে।তাই ভালোয় ভালোয় আমার সাথে চল।
নেহা তাকিয়ে দেখলো রাস্তা পাড় হয়ে তাহমিদা বেগম আসছে।নেহা বিরবির করে বললো–,,এবার কি হবে?তার থেকে ভালো নিখিলের সাথে যাওয়া।
নেহা নিখিলের দিক না তাকিয়েই বললো–,,চলুন।
নিখিল বলে উঠলো–,,কোথায়?
নেহা বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে বললো–,,আরে ভাই আপনি তো বললেন আপনার সাথে যেতে তাই যেতে চাচ্ছি!
নিখিল গম্ভীর ভাবে একবার তাকালো পরক্ষণেই নেহার হাত টেনে গাড়ির দিক গেলো,নেহা ভার্সিটির গেইটের দিক তাকিয়ে দেখলো রাহা বেরিয়েছে।নেহা রাহার চোখাচোখি হলো এক পলকেই যেনো তাদের কথা বিনিময় হয়ে গেলো।
নিখিল সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো–,,আমার থেকে কি লুকাচ্ছো নীহারিকা!
নেহা চমকে উঠে,সেই পুরনো সম্মোহনী ডাকে যেনো আজও বিমোহিত হতে চাইলো তার মন।তবুও নিজেকে কঠোর করে বলে উঠলো–,,আমার বয়ফ্রেন্ডের নাম!
নিখিল কে রাগাতে যেনো এই একটা শব্দই যথেষ্ট ছিলো
নেহাকে জোড়ে ধাক্কা মে’রে ফেললো গাড়ির ভিতরে।নিজেও উঠে গাড়ি চালিয়ে দিলো।
——-
তাহমিদা বেগম রাহা কে দেখে জিজ্ঞেস করলো–,,কিরে তুই এখানে?নেহা কোথায়?
রাহা চারদিকে একবার দেখে বললো–,,নিখিল ভাইয়ার সাথে গেছে।
তাহমিদা বেগম কিছুটা গম্ভীর কন্ঠে বললো–,,তুই ক্লাস না করে চলে আসলি কেনো?
রাহা চুপ রইলো কিছুক্ষণ পরেই বললো–,,মা এই ভার্সিটিতে আর না পড়লে হয় না!
তাহমিদা বেগম হতচকিত হলো তার সাথে আরো একজন ব্যক্তি, রৌফ এখনই বের হয়েছিলো গেইট থেকে।রাহার দিক তাকিয়ে থেকেই ভাবলো–,,মেয়েটা একটু বেশিই অদ্ভুত!নিজেকে কেনো এমন করে রেখেছে মেয়েটা?কিসের এতো দূরত্ব তার শহিদুল চৌধুরীর সাথে,কখনো কি রৌফ জানতে পারবে মেয়েটার সম্পর্কে? নাকি থেকে যাবে এই মেয়েটা চির অধরা!
তাহমিদা বেগমের পেছন থেকে একটা ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে বেরিয়ে আসলো দু হাত কোমরে রেখে বলে উঠলো–,,তুমি ভী’তন প’তা মিম্মি!
রাহা উল্টো ভাব নিয়ে বললো–,,তুমি কে গো? কোন দেশের মহারানী শুনি?
বাচ্চাটা খিলখিলিয়ে হেসে বলে উঠলো–,,পাপার রাজ্যের রাত’কুমারী। মতা’রানী না!
কথা টা শোনা মাত্ররোই রাহার মুখটা কুঁচকে গেলো।যেনো সে বেশ বিরক্ত হয়েছে কথাটা শুনে।
রাহা কিছুটা ধ’মকের সুরে বললো–,,কি এতো সারাদিন পাপা পাপা করিস?তোর পাপা কি একবার ও এসেছে তোর খবর নিতে?আর যদি কোনো দিন আমার সামনে পাপা বলিস তো মা’ইর লাগাবো নামিরা!
নামিরা ঠোঁট উল্টে কেঁদে ফেললো দৌড়ে তাহমিদা বেগমের কাছে গিয়ে বললো–,,মা..ম্মা মাম্মার কা’তে যাবো,মিম্মি প’তা।নানু ভাই প’তা প’তা মেয়েকে পি”ট্টি দিয়ে দাও!
তাহমিদা বেগম রাহা কে চোখ রাঙিয়ে বললো–,,কি হচ্ছে কি রাহা।
এর মধ্যেই পুরো ঘটনা দেখলো রৌফ,সে এসে বললো–,,এই মেয়ে তুমি তো দেখছি সত্যি ভীষণ রকম বেয়া’দব একটা বাচ্চা কেও ব’কা দিয়ে কাঁদিয়ে দিয়েছো তুমি!
এসো তো মামনি চাচ্চুর কাছে আসো!
নামিরা হেসে কু’টি কু’টি হলো।এক লাফে রৌফের কোলে চড়ে বসলো গলা জড়িয়ে ধরে বললো–,, তুমি আমা’ল চাচ্চু?জানো তো আ’মাল এক’তাও চাচ্চু নেই!
রাহা বিরক্তি নিয়ে বললো–,,তোর ডজন খানেক চাচ্চু আছে চল আমার সাথে নিয়ে যাবো।তোর পাপার কাছেও!
নামিরা ঠোঁট উল্টে বললো–,,পাপা আ’তে না তো,মাম্মা বলেছে পাপা নামিরা কে ভালোবাতে না!
রৌফ বেশ চমকালো,বাচ্চাটার মুখের দিক তাকিয়ে মুগ্ধ হলো সৃষ্টিকর্তার কি অপরুপ সৃষ্টি!এই হাসিখুশি বাচ্চাটার মুখ দেখতে কোন বাবা না করতে পারে?রৌফের মনে প্রশ্ন জাগলো,কৌতুহলে মনটা খচখচ করে উঠলো।
সে আর না পেরে বলেই বসলো–,,নূর তোমার স্বামী কোথায়!
রাহা রেগে বললো–,,ওই নামে ডাকবেন না আমায়।আর কিসের স্বামী কার স্বামী?মা এই লোকটা কে যেতে বলো এখান থেকে না হয় আমিই চলে যাচ্ছি!
রাহা হন হন করে চলে গেলো।তাহমিদা বেগম তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বললো–,,তা বাবা তোমাকে বেশ চেনা চেনা লাগছে, কে তুমি?
রৌফ সৌজন্যে মূলক হেসে বললো–,,আন্টি আমি রৌফ সাহিলের ভাইয়ার ছোট ভাই!আর রাহার শিক্ষক।
তাহমিদা বেশ কিছুক্ষণ ভেবে বললো–,,ওহ!মনে পড়েছে বাবা,অনেক দিন আগে দেখেছি তো তোমায় তাই চিনতে পারিনি,আমার মেয়ের কথায় কিছু মনে করো না, দিন দিন রাগী হচ্ছে শুধু!
রৌফ হেসে বললো–,,তা ঠিক আছে,কিন্তু নামিরা কে?
তাহমিদা বেগম চুপসে গেলেন,সাহিল নিখিলের বন্ধু যদি এ কথা রৌফ তাকে বলে দেয় তখন!তিনি মেকি হেসে বললো–,,আমাদের প্রতিবেশি একটা মেয়ে আছে ওর মেয়ে নাওশিন নামিরা!
তাহমিদা বেগম হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো–,,বনু চলো বাড়ি যেতে হবে তো!
নামিরা আদো আদো কন্ঠে বললো–,,মাম্মা কো’তায়?
–,,বাড়ি চলে গেছে তো মিম্মির সাথে, চলো আজ অনেক গল্প করবো দুজনে।
তাহমিদা রৌফ কে বিদায় দিয়ে নামিরা কে নিয়ে চলে গেলো!
————-
এই মেয়ে তুমি ঠিক আছো তো?
আরুশি উপর নিচ মাথা নাড়লো।
ইরফান বললো–,,কিসের কথা বলছিলে তুমি তখন?
আরুশি জোড়ে শ্বাস নিলো,কোর্টের ভেতর থেকে একটা কাগজ বের করে ইরফানের দিকে এগিয়ে দিলো।
ইরফান কাগজ টা নেড়ে চেড়ে দেখলো কৌতূহল নিয়ে বললো–,,কিসের কাগজ এটা, আর একটা সামান্য কাগজের জন্য ওই ডক্টর তোমার পেছনে পড়ে আছেই বা কেনো?
আরুশি বলতে শুরু করলো–,,আজ থেকে প্রায় ছয় মাস আগে আমি আর ছোট্টু মিয়া মানে রনি এই ডক্টরের কথা জানতে পারি,কিন্তু কোনো প্রমান ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে আমরা কোনো কেই’স ফাইল করতে পারতাম না, তাই অনেক চেষ্টা করি, কোন কোন রোগী এখানে যায় কতো দিন ধরে ট্রি’টমেন্ট করাচ্ছে এসবই জানতে থাকি।একদিন হঠাৎ করে নজরে আসে ড্রা’গ ডিলা’রস দের সাথে ডাক্তারের যোগ সূত্র আছে,ঔষধ কোম্পানির নাম ভাঙ্গিয়ে এখানে আসতো তারা।বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বা গরিব রোগীদের তারা টা’র্গেট করে।সেরকমই একটা রোগীর ফাইল নিতে সক্ষম হই আমরা,মেয়েটার নাম সোহানা। তার সাথে ওই দিন ভাগ্যক্রমে ড্রা”গ ডি”লিং এর ও একটা কাগজ পেয়ে যাই,আর দুর্ভাগ্য বসত ওদের চোখেও পড়ে যাই।তার পর আপনার সাথে দেখা!
–,,তুমি কেনো এসব কিছু করছো?পুলিশ কে জানাও নি কেনো?
আরুশি বিরক্তি নিয়ে বললো–,,ছা’তার পুলিশ গুলা আগে প্রমান চায়,সাধারণ মানুষের কথা কোনো দিন বিশ্বাস করে নাকি এরা!
ইরফান আরুশির দিক তাকিয়ে মেয়েটার বয়স আর কতো হবে?এর কথা কি বিশ্বাস করা উচিত হবে?কোনো প্রতা”রক চক্র নয়তো আবার!
–,,এই মেয়ে আমিও তো পুলিশ আমি তোমার কথা বিশ্বাস করবো বলে মনে হয় নাকি তোমার?
–,,বিশ্বাস করা না করা আপনার ব্যাপার।আর আমি আপনার নিকট কোনো আশা করি ও না,আমি নিজের কাজ নিজে একাই করতে পারি!
–,,পুঁচকে একটা বড় বড় কথা বলতে শিখলে কার থেকে?
–,,নিজে নিজেই,আপনাদের মতো শিখানোর জন্য আগে পিছনে কেউ ছিলো না।সরুন আপনি আপনার মতো থাকুন আমাকে যেতে দিন।
আরুশি কিছু দূর গিয়ে আবার ফিরে এলো ইরফানের হাত থেকে কাগজ গুলো টেনে নিয়ে চলে গেলো।
ইরফান দাড়িয়ে রইলো কয়েক পল,মেয়েটার আত্নসম্মান বেশি,কিন্তু এমন কাজ করছে কেনো এই বয়সে?কার কথায় ওসব প্রমান জোগার করছে?
ইরফান পিছু ডাকে–,,আরু শুনো,আমি তোমাকে হেল্প করতে চাই!
মেয়েটা শুনলো না,দৌড়ে চলে গেলো অপর পাশে,ইরফান ওর পিছু নিলো,মোবাইলে সোহানা নামক মেয়েটার ডিটেইলস বের করতে বললো।
★
সোহানা কাজ করছে,আজ রোগী যেনো একটু বেশি শরীরটা বেশ দুর্বল মনে হচ্ছে আজ টানা ভার্সিটির ক্লাস তার উপর কাজ,মায়ের ফোন এসেছিলো কয়েকবার রিসিভ করার সময় হয়নি মেয়েটার।
বার বার ঘেমে উঠছে শরীর।ভিতর থেকে ডাক পড়লো –,,মিস সোহানা?শুনছেন?ভেতরে আসুন!
সোহানা শুনলো সময় লাগলো আজ উঠতে,দ্রুত উঠতে চেয়েও পারলো না।কোনো রকম ঢুকলো কেবিনে।সাহিলের মনোযোগ এখনো ফাইলের দিকে।পেসেন্টের প্রেসক্রি”পসন দেখতে দেখতে সেও ক্লান্ত।
সাহিল নিচে তাকিয়ে থেকেই বললো–,, আজ আর রোগী ভিতরে দিবেন না প্লিজ, আজ আর দেখা সম্ভব হবে না!
সোহানা শুনতে পেলো না। মাথা ঘুরে উঠলো মেয়েটার।কিছু বুঝে উঠার আগেই মাথা ঘুরে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো।ধপ করে শব্দ হওয়ায় চোখ তুলে তাকালো সাহিল, সে আত”ঙ্কিত কন্ঠে ডেকে উঠলো –,,সোহা!
সাহিল উঠে এসে সোহানার মাথাটা নিজের হাঁটুর উপর নিলো।হাত চেক করলো মেয়েটার,নার্স কে ডেকে এনে বেডে শুইয়ে দিলো।চেক আপ করলো কিছুক্ষণ ধরে,মেয়েটার প্রতি কেনো যেনো মায়া কাজ করতে থাকলো সাহিলের,কি হলো কেনো হলো জানা না পর্যন্ত যেনো শান্তি পাচ্ছে না সে।
সময় পার হলো তবুও জ্ঞান ফিরছে না,রাতের ডিউটি নেই সাহিলের যেতে হবে তাকে,কিন্তু মেয়েটা!তার হয়ে কাজ করে সামান্য দায়িত্ব বোধ থেকেও তো তার সাহায্য করা উচিত সাহিলের!আর ভাবতে পারলো না যেনো নিজের কেবিনে বসে রইলো মাথায় হাত দিয়ে।
——–
ভার্সিটিতে বসে ছিলো জেরিন বিকেল হয়ে এলো বলে,সে বাড়ি ফিরবে।কোথা থেকে সাব্বির হাজির হলো রেগে মেগে এসেই জেরিন কে মার’লো একটা।
জেরিন মুখ আগের মতো করেই বসে আছে।সাব্বির বলে উঠলো–,,তুই নাকি ওই ছাগ’লটার সাথে রিকসায় করে ঘুরছিস?ছেলের অভাব পড়েছে নাকি বইন?
জেরিন এখন ও চুপ তা দেখে সাব্বির তার পাশে গিয়ে বসে পড়লো।
সাব্বির জিজ্ঞেস করলো–,,বলতো কি হয়েছে,জানি সিরিয়াস বিষয়, তার পরও হালকা ভেবে বলে ফেল!
জেরিন বলে উঠলো–,,নেহা আর নিখিল ভাইয়ার একটা মেয়ে আছে সাব্বির!
সাব্বির ভুত দেখার মতো চমকে উঠলো যেনো জোরর চেঁচিয়ে বলে উঠলো–,,কিহ্!
চলবে?