প্রণয়ের সুর ২ পর্ব-০৮

0
1031

#প্রণয়ের_সুর২
#পর্ব৮
#মহুয়া_আমরিন_বিন্দু
ওই একটা পুঁচকে মেয়ের কাছে এভাবে হেরে যাচ্ছো তোমরা?যদি কোনো ভাবে এসব ইনফরমেশন পুলিশের কাছে যায় তো সবাই ফেঁ’সে যাবে। কোনো ভাবেই এসআরের নাম সামনে আসা যাবে না, ভাই সবাই কে শেষ করে দিবে!
–,,তুমি তো বেঁচে যাবে ডক্টর শেলি!ডক্টর রা যে ভাবে মানুষ কে বোকা বানাতে পারে ওরকম ভাবে অন্য কেউ পারবে না!

—,,তোমাকে এসব বলার জন্য এখানে ডাকি নি রাহুল।ওই মেয়েকে খুঁজে বের করো সাথের ছেলেটা কেও, কার কথায় কিসের জন্য এসব করছে ওরা?কিভাবেই বা জানলো আমাদের বিষয়ে।খোঁজ নাও সময় খুবই কম,তার উপর পুলিশ জেনে গেলে আর বাঁচার কোনো উপায় থাকবে না।
রাতের আঁধারে মিলিয়ে গেলো এক মাক্স পরিহীত নারী অবয়ব।
—————-
নিখিল দাড়িয়ে আছে হসপিটালের কেবিনের বাহিরে সে এসেছে তার প্রিয়তমা কে দেখতে,মেয়েটা কি সুন্দর ঘুমিয়ে আছে!কতোটা শান্ত শীতল,তার নেহা তো মোটেও এমন ছিলো না,সে তো নিখিল কে প্রচুর প্রচুর পরিমাণে বিরক্ত করতো ভালোবাসা আদায় করে নিতে ব্যস্ত থাকতো!কিন্তু আজ মেয়েটা তার মুখ দেখতেও চায় না।

পৃথিবীর সবচেয়ে তিক্ত অনুভূতি হয়তো
প্রিয়মানুষের চোখে অপ্রিয় হওয়া!

নিখিল দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কেবিনের পাশ থেকে সরে বেরিয়ে যেতে নিলো তখনই ধাক্কা লাগলো কারো সাথে।
সে মানুষটির দিক তাকানোর আগে তাকালো ফ্লোরে পড়ে থাকা আইসক্রিমটার দিকে যেটা এখন ফ্লোরে পড়ে লেপ্টে গেছে চারপাশে!

নিখিল স্যরি বলতে যাবে ঠিক তখনই সামনে থাকা ব্যক্তি বলে উঠলো–,,তোখে দেখো না তুমি?দিলে তো আইত’ক্রিম টা ফেলে,এমনিতেই মিম্মি কিনে দিতে চায় না!

নিখিল এক পলকে তাকিয়ে রইলো বাচ্চাটার দিক পর মুহূর্তেই হেসে উঠলো খিল খিল করে।হামিদা বেগম সে দৃশ্য স্পষ্ট দেখলো দূর থেকে, ভাবলো ছুটে এসে এখনই বলে দিবে দেখ না বাবা আমার দাদু ভাই তোর সন্তান!
কিন্তু তিনি তা করলেন না,মুহুর্ত টা নষ্ট করতে চাইলেন না যেনো।

নিখিল বাচ্চাটার গাল আলতো টি’পে দিয়ে বললো–,,চলো আমি কিনে দিচ্ছি!

নামিরা একবার আশেপাশে তাকালো পরে গালে এক আঙুল রেখে কিছু একটা ভাবলো তার পর বলে উঠলো–,,মাম্মা কারো থেকে কিছু নিতে মানা করেছে।

নিখিল কিছুটা ঝুঁকে বললো–,,তাই?আংকেলের থেকে নিলে কিছু হবে না মামনি,আংকেল তো পঁ’চা নয়!

–,,যদি পঁ’তা হও পরে?

–,,সত্যি বলছি আংকেল একটুও পঁচা না।

নামিরা খপ করে নিখিলের হাত ধরে বললো–,,তাহলে তালা’তালি চলো মিম্মি দেখে ফেললে অনেক ব’কা দিবে!

–,,কে তোমার মিম্মি?

–,,আমার খা’মনি আমি মিম্মি ডাকি।আমরা ফ্রেন্ড’স তো!

নিখিল মুগ্ধ হয়ে তাকালো এতোটুকু মেয়ে তে কতো মায়া!ঠিক যেনো তার নেহা! সে তাল মিলিয়ে বলে উঠলো–,,তাই, আমার ফ্রেন্ড’স হবে?

নামিরা দু দিক মাথা নাড়িয়ে না জানালো সাথেই বললো–,,না না মিম্মি হেইট’স বয়।সে জানলে খুব করে ব’কবে নামিরা কে!

–,,কে নামিরা?

নামিরা ফিক করে হেসে নিজের দিক আঙুল দিয়ে বললো–,,এইতো আমি আমি!

দুজন কথা বলতে বলতে আইসক্রিমের দোকানের কাছে চলে আসলো।নিখিল জিজ্ঞেস করলো–,,কোনটা নিবে মা?

নামিরা চোখ পিট পিট করে তাকিয়ে বললো–,,মা?মাম্মাও মা বলে ডাকে!আমি ভ্যা’নিলা নিবো।জানো আংকেল

–,,কি?

–,,মাম্মার ও ভ্যানিলা পছন্দ!

নিখিল হেসে বললো–,,মায়ের জন্য ও একটা নিবে?

নামিরা ঠোঁট উল্টে বললো–,, মাম্মা সি’ক তো খেতে পারবে না।মাম্মা ভালো হলে মাম্মাকেও একতা কিনে দিও!

নিখিল নামিরার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো–,,দিবো সোনা,চলো ভিতরে দিয়ে আসি।

নামিরা দৌড়ে যেতে যেতে বললো–,,দিদি ভাই।দিদি ভাইয়ের সাথে যাবো তুমি চলে যাও আংকেল!

নিখিল আসতে চেয়েও আসলো না,দলের একটা ছেলের সাথে দেখা হয়ে গেলো তার।কথা বলতে ব্যস্ত হলো।
_______________

রোহান হাই হাই তুলতে তুলতে বললো–,,জেরিন আপু শুরু করো তো, তখন ছোটো ছিলাম তো তেমন কিছু দেখতে পাইনি তুমি বরং বলো এখন একটু প্রেম পিরিতি বুঝার বয়স হয়েছে!

মিহির রোহানের কান টেনে ধরে বললো–,,বলবো নাকি আন্টি কে?

রোহান কান ঢলতে ঢলতে বললো–,,মিহির ভাই সব জায়গায় মাকে কেনো আনো বলোতো।যাও আর কিছু বলবোই না আমি!

বৃষ্টি বিরক্তি নিয়ে বললো–,,ওফ!শুরু করো তো,ওদের যে কাহিনি রাত তো এখানেই শেষ হয়ে যাবে।

মিলি বেগম বললো–,,হ্যাঁ হ্যাঁ কথা বাড়াস না আর শুরু কর রে জেরিন।

জেরিন বলা শুরু করলো বাকিরা গালে হাত দিয়ে মনোযোগী হলো।

____________________অতীত___________________
“ছয় বছর পূর্বে”______

—,, সেজো মা সেজো মা শুনছো?কেউ কি আছো
বাড়িতে!

ভার্সিটি থেকে ফিরেছে নিখিল অনার্স চতুর্থ বর্ষে পড়ছে সে।বাড়িতে এসেই বাড়ি মাথায় তোলার পেছনে হয়তো বড় সড় কোনো কারন আছে।

হামিদা বেগম,তাহমিদা বেগম ছুটে আসলেন।হামিদা বেগম বললো–,, ঈদে এবার ষাঁড় আর কিনতে হবে না, যা গলা বানিয়েছিস ওটার থেকে কম না তুই।

তাহমিদা বেগম বললো–,,কি হয়েছে বাবা এতো রেগে আছিস কেনো?

নিখিল ফোঁস ফোঁস করে বললো–,, তোমার মেয়ে সেজো মা।এতো বজ্জা’ত কি করেনি তাই বলো!

তাহমিদা বেগম রেগে বললো–,,আজ আসুক শয়’তান টা কি করেছে বল।

–,,আমার ভার্সিটিতে ঢুকে মেয়েদের সাথে মারা’মারি লেগে এসেছে আর বলেছে তার বড় মা নাকি বলেছে তার বড় মায়ের ছেলেকে দেখে রাখতে কোনো মেয়ে যাতে আশেপাশে না ঘেঁষতে পারে।

হামিদা বেগম হু হা করে হেসে উঠলো। নিখিল বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে বললো–,,মা ভালো হবে না বলছি,তোমার জন্য বেয়া’দব টা আরো বেয়া’দব হচ্ছে।বাড়িতে মাথা খারা’প করে হয় না ওর বাড়ির বাহিরেও পিছু ছাড়ছে না।

সাহারা বেগম এসে বললো–,,পিছু ছাড়তে দিবোও না।আমার এই বি”চ্ছু মেয়েকেই তোর গলায় ঝুলাবো রে তুই হবি আমার মাইয়ার জামাই!

–,,মজা নিবা না মেজো মা,এরকম মেয়েকে সারাজীবন? না না কিছুতেই সম্ভব না।এর নামে আজই আমি সেজো চাচ্চুর কাছে বিচার দিবো!

নেহা দরজার পেছন থেকে ছুটে এসে নিখিলের হাত চেপে ধরে বললো–,, ভুল হইয়া গেছে বড় ভাই।জীবনেও করমু না এই দেখো কান ধরে ফেলছি, এই শেষ আব্বুকে কিছু বলো না প্লিজ!

নিখিল হাতটা ঝাপটা মে’রে ছাড়িয়ে বললো–,,এইরকম কথা তুই প্রতিদিনই বলোছ।আজকে কোনো মাফ নাই।

নেহা ডেকে বললো–,,ভাইয়া,,,,,,!প্লিজ। বড় মা তোমার ছেলেকে বুঝাও না আমি কি এমন নাকি? তুমি তো জানো আমি কতো ভদ্র!

তাহমিদা বেগম নেহার কান টেনে ধরে বললো–,,তুই কতো ভালো সবার জানা আছে।ছেলেটার পেছনে লাগবি না আর।কলেজে গিয়ে কি মাঠে গড়াগড়ি খাছ?ড্রেসের কি অবস্থা করেছিস!

বৃষ্টি ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বললো–,,আর বলো না সেজো মা।তোমার মেয়ে বাচ্চাদের স্কুলে গিয়ে বাচ্চাদের খেলার জিনিস দিয়ে খেলে এসেছে!

তাহমিদা বেগম কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে রান্না ঘরে ঢুকলো।

নেহা হামিদা বেগম কে জড়িয়ে ধরে বললো–,,বড় মা তুমি একটু ধুয়ে দিবে বলো?মা তো ধুয়ে দিবে না!

নিখিল সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে বললো–,, আমার মা কেনো ধুয়ে দিবে রে? তোরে কি আল্লাহ হাত দেয় নাই?নোং”রা, আব’র্জনা,অপরিষ্কার মেয়ে কোথাকার।বাড়ির মানুষ গুলোর দয়ার শরীর না হয় তোকে কে রাখতো বাসায়!

নিখিল নেহার চুল গুলোতে একটু হাত দিয়ে টেনে বলে উঠলো–,,ছি! ছি! এর থেকে ভালো তো কাকের বাসা।চুল গুলো তো এমনিতেই ছেলেদের মতো তার উপর কি বালি চুলে, ওয়াক ওয়াক যা গিয়ে ওয়াশ কর পে’ত্নী!

নেহা নাক ফুলিয়ে দৌড়ে উপরে চলে গেলো।হামিদা বেগম বললো–,, তুই মেয়েটার পেছনে লাগিস কেনো?

নিখিল চুল গুলো আরো একটু পরিপাটি করতে করতে বললো–,,ওর সাথে লাগতে ভাল লাগে তাই লাগি।তুমি আমার পেছনে লেগো না তো মা।বাহিরে যাচ্ছি।

সাহারা বেগম ডেকে উঠলো–,,ও মেয়ের জামাই না খেয়ে কোথায় যাস?

–,,আংকেলের সাথে একটু পার্টি অফিসে যাবো।

সেতারা বেগম এসে বললো–,,রাজনীতির ভুত চাপছে দাদাটার মতো।

নিখিল দৌড়ে বেরিয়ে গেলো।বাহির থেকে সাব্বির ঢুকলো খাবার টেবিল থেকে ছো মে’রে এক মোঠ শশা নিয়ে আবার বাহিরে যেতে যেতে বললো–,,নিখিল ভাই দাড়াও বাবা আমাকে ও যেতে বলেছে।

হামিদা বেগম তপ্ত শ্বাস ছাড়লো।জেরিন ব্যাগ রেখে বসে পড়লো সেতারা বেগম বললো–,,কি রে বইন পিরিত করতে গেছিলি নি? অনে তো স্কুল কলেজ কোনো টাই নাই।

জেরিন বিরক্তি নিয়ে বললো–,,বুড়ি আর কোনো কাজ পাও না তুমি।কোচিং করতে গেছিলাম যাও তো খাইতে দাও ক্ষুধা লাগছে!

সেতারা বেগম না ছিটকে বললো–,, দু দিন পর পরের বাড়ি যাইবো মাইয়া এখনো ভাতটুকু নিয়ে খেতে পারে না।
জেরিন মুখ ভেংচি কাটলো।

———–
নেহা চিপসের প্যাকেট গুলো ছড়িয়ে বসলো নিখিলের সুন্দর পরিপাটি করে রাখা বিছানার উপর।
শুয়ে বসে যেভাবে পাড়ছে বিছানায় ফেলছে আর খাচ্ছে পুরো ঘরটা মুহুর্তেই এলোমেলো ময়লার স্তুপে পরিনত হলো।

তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললো নেহা,পেটে হাত বুলিয়ে বললো–,,নিখিল্লা তুই আর তোর পরিষ্কার থাকা সব কিছুতে আমার এক বালতি বিরক্তি তে ভরা ময়লা।এবার বুঝবে কেমন লাগে।

নেহা সুন্দর করে ঘরটা আটকে বেরিয়ে পড়লো আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো কেউ আছে কিনা। দু হাত দিয়ে চুল গুলো ঠিক করে নিলো।পড়নের স্কার্ট টা দু হাতে উঁচু করে সিঁড়ি বেয়ে নামলো আরাম করে বসলো সোফার উপরে।
অর্ডার করার ভঙ্গিতে বললো–,,আমার খাবার টা দিয়ে যাও প্লিজ!

তাহমিদা বেগম বললো–,, এসেছেন প্রেসিডেন্ট,খাবার দিতে হবে।কেনো রে সবাই টেবিলে বসেছে তোকে আবার আলাদা করে দিতে হবে কেনো?

শাহআলম চৌধুরী সদর দরজায় দাড়িয়ে বললো–,, আমার মা তো স্প্যা’শাল তাকে আলাদা করে একটু দিলে কি এমন হবে শুনি?

সাহারা প্লেট দিয়ে বললো–,,তা যা বলেছেন ভাইজান।আমার ছোট্ট মেয়ে তো একটু বেশি আদর পেতেই পারে।

তাহমিদা বেগম বললো–,,লা’য় দিয়ো না তো আপা।হাড়ে হাড়ে শয়’তানি এটার।ওর থেকে ছোট বাড়িতে আরো দুজন আছে, ওরা তো ওর মতো এমন করে না।

মফিজুর চৌধুরী এসে বললো–,,নেহা ঘুরতে যাবি? চল চাচ্চু আর তুই আজ অনেক ঘুরবো!

শাহআলম চৌধুরী বলে উঠলো –,,মানুষ যায় প্রেমিকা নিয়ে তুই যাচ্ছিস ভাইয়ের মেয়ে নিয়ে।বলি বিয়ে সাদি কি করবি না নাকি?

মফিজুর চৌধুরী তওবা কে’টে বললো–,, কি যে বলো না ভাইজান এসব বিয়ে সাদির চক্করে আমি নাই।নেহা চল তো।

নেহা ভাতের প্লেট রেখে বললো–,, চলো চাচ্চু দ্রুত আজ আমি এক বস্তা খুশি!

নিঝুম,জেরিন,বৃষ্টি একত্রে বলে উঠলো–,,আবার কি আকা’ম করছিস বইন!

নেহা ভুত দেখার মতো চমকে উঠলো তার পরও ভাব নিয়ে বললো–,,নেহা কখনো অকা”জ করতে পারেই না যা করে শুধুই গুড কাজ!চাচ্চু গো গো।

নিশাত বলে উঠলো–,,ইংরেজিতে এতো ভুল আপু!

নেহা একটা কুশন ছুঁড়ে মে’রে বললো–,, ওরে আমার মাস্টারনি যা ভাগ।গেলাম ঘুরতে সবাই আর বিদা!

সাহারা তাড়া দিয়ে বললো–,,ভাত টুকু খেয়ে যা মা!

নেহা বেরিয়ে যেতে যেতে বললো–,, পরে খাবো সেজো মা!

চলবে?