প্রণয় সমাচার পর্ব-০১

0
29

#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ১

“উসামা ভাইয়ার মতো হাসবেন্ড না পেলে জীবনটাই বৃথা! হাসবেন্ড হতে হবে উসামা ভাইয়ার মতো। যেমন তাঁর রূপ তেমন তাঁর গুন!”

মমোর এত আক্ষেপ অহমিকাপূর্ন কথা শুনে অপলা তাঁর দিকে তাকিয়ে একরাশ বিরক্তিমাখা কন্ঠে বললো,

“সারাদিন এসব উল্টাপাল্টা চিন্তা বাদ দিয়ে পড়াশোনাটা ঠিকঠাক ভাবে কর। সামনে এসএসসি পরীক্ষা ফেল করলে ফুপি সোজা বিয়ে দেবে তোকে।”

মমো আঁচলের ওরনা আঙুলে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বললো,

” এসব পড়াশোনার টপিক আমার সামনে এনো না আপু। আই হেট পড়াশোনা! এসব আমার দ্বারা হবে না। এরচেয়ে ভালো বিয়ে করে স্বামী সন্তান নিয়ে সুখী থাকবো। কী হবে এত পড়ে? একদিন তো ম’রেই যাবো। এরচেয়ে উসামা ভাইয়ার মতো এমন সুদর্শন যুবককে বিয়ে করে তাঁর ঘরের ঘরনী হবো।”

অপলা বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে ফেললো। এসব অদ্ভুত আলাপ তাঁর ভালো লাগে না। মমোকে সে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বললো,

“এসব আলাপ বাদ দে। গিয়ে বই খাতা নিয়ে বসে পড়। আর এই উসামা-টাই বা কে? কোচিং ক্লাসে গিয়ে বুঝি এসবই করিস?”

মমো নিজের উত্তেজনা দমাতে না পেরে এক বাক্যে বললো,

” আপু তুমি তো কিছুই জানো না। ওহ! জানবেই বা কী করে? তুমি তো আমাদের বাসায় এসেছো-ই কয়েকদিন আগে। ক্লাস এইটের জিএসসির সময়ে উসামা ভাইয়া আমাকে পড়িয়েছেন। রেজাল্ট ও সেইবার কী ভালো হয়েছিল! উনি আমাদের নিচের তলার ফ্ল্যাটেই থাকেন। ভেবেছি ওনার মতো সুন্দর একটা মানুষকেই বিয়ে করবো। এক পাল ছানাপোনা নিয়ে সংসার করবো। ”

মমো আর কিছু বলার পূর্বেই অপলা তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললো,

” এসব আজগুবি কথা বাদ দে। চিনি না জানি না কোথাকার কে না কে! চুপ করে পড়তে বস!”

মমো ভ্রু কুঁচকে বই খুলে বসলো। বই খুললেই চোখে ঘুম এসে বাসা বাঁধে। এই ঘুম রাতে কোথায় থাকে? রাতে তো ওভার থিংকিং এর কারণে চোখে ঘুমের ‘ঘ’ ও আসে না।

সকাল সকাল এলার্মের বিকট শব্দে অপলার ঘুম ভাঙলো। ঘড়ির দিকে তাকাতেই সে বিষম খেলো! এত দেরি হয়ে গেছে? তড়িঘড়ি করে মুখ ধুয়ে নাস্তা করে নিচে নামলো। অতিশয় ব্যস্ততার কারণে তাড়াহুড়ো করে বাড়ির নিচের কেঁচি গেট খুলতে গিয়ে এক ভয়ংকর বিপত্তি ঘটলো। হাতে এক বিভৎস আঘাতের কারণে অপলা চেঁচিয়ে উঠলো। কিছু বুঝে উঠার আগেই সবকিছু এত দ্রুত ঘটলো যে অপলা নিজেও চমকিত হলো। হাত লাল হয়ে র’ক্ত জমাট বেঁধে গেল। অনামিকা আঙুলের নখের কিছুটা অংশ ভেঙে গেল। হাতের নরম কিছুটা অংশ ছিঁলেও গেল। অকস্মাৎ এক আগন্তুকের আগমন। অপলাকে এই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে দেখেও সেই যুবকের ভেতর সেভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। ঘটনাস্থলে থেকেও তিনি সাহায্য করলেন না। বরং কটুক্তি কেটে বললেন,

“ফুলের ঘায়ে মূর্ছা যায়”

কঠিন পরিস্থিতিতে এহেন কটুক্তিমূলক বাক্য শুনে অপলা প্রচন্ড ক্ষুদ্ধ হলো। সাহায্য হয়তোবা তিনি নাই-বা করতেন। কিন্তু এরূপ কটুক্তি কাটার মানে কী? মুখে কিছু না বললেও অপলার চেহারায় রাগের ছাপ স্পষ্ট হয়ে গেল।রাগে তাঁর শরীর রি রি করে উঠলো। সর্বাঙ্গে ক্রোধ বিষের মতো ছড়িয়ে গেল। চোখে টলমলে অশ্রু নিয়ে অপলা যুবকটির প্রস্থান দেখলো। সেদিন আর তাঁর ক্লাস করা হলো না। অপলা বাড়ি ফিরে গেল।

” টেইলার্সের কাছে আমার কয়েকটা জামা বানাতে দিয়েছি। অপলা তুই মমোকে গিয়ে নিয়ে আয়।আমি এখন যেতে পারবো না। তোর ফুপাজির জন্য আবার মুরগির ঝোল রান্না করতে হবে। ”

অপলা তাঁর ফুপি শায়েলা বেগমের কথা শুনে ব্যান্ডেজ হাতে সোফা থেকে উঠে বসলো। মমোকে ডেকে বাইরে বের হওয়ার কথা বললো। যদিও বা অপলার হাত ব্যাথায় টনটন করছে। বাইরে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তাঁর নেই। কিন্তু, ফুপি তাঁর গুরুজন তাঁর আদেশ অপলা ফেলতে পারবে না। যত যাইহোক না কেন ফুপিই তো অপলাকে তাঁদের এখানকার ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। ফুপি না থাকলে, অপলাকে তাঁর বাবা ভাই কখনোই বাড়ি থেকে এতদূরে পড়তে পাঠাতো না।

অপলা আর মমো দোকানের স্লিপ নিয়ে সিঁড়ি থেকে নামতে লাগলো। অতঃপর এক যুবককে দেখে মমো থেমে গেল। চুপিসারে বললো,

” ওই যে ছেলেটাকে দেখতে পাচ্ছো। ওটাই উসামা ভাইয়া। গত বছর বুটেক্স থেকে টেক্সটাইল ইন্জিনিয়ারিং পাশ করেছে।”

মমোর কথা শুনে অপলা একবার চোখ মেলে চাইলো যুবকটির দিকে। পরক্ষনেই সে চমকে উঠলো। এই ছেলেটাই তো সকালে তাঁকে কটুক্তি কেটেছিল। এটাই তাহলে উসামা? পরোক্ষনেই সকালের ঘটনা মনে পরতেই অপলা অস্বস্তিকর দৃষ্টিতে উসামার দিকে তাকালো। এ যেন এক তালপাতার সেপাই। বিলাতি ইদুঁরের মতো গায়ের রং, কোঁকড়া চুল, লম্বাটে মুখের গড়ন, গালে হালকা চাপ দাঁড়ি। মমোর মুখে এত প্রশংসা শুনে সে ভেবেছিল সাক্ষাৎ কোনো ভদ্র সভ্য, শান্ত প্রকৃতির ছেলে হবে হয়তো। কিন্তু, এ-তো ইব’লিশের আপন খালাতো ভাই।

টেইলার্স থেকে ফেরার সময়ও অপলা ও মমোর সঙ্গে আবারও উসামার দেখা। অপলা তাঁর তীক্ষ্ম দৃষ্টি দ্বারা লক্ষ্য করলো উসামা নতুন জুতার বক্স হতে জুতা সু র‍্যাকে তুলে রাখছে। জুতোটাতে নাইকির লোগো চকচক করছে। এই দৃশ্য দেখামাত্রই অপলাকে আর সেভাবে কিছু ভাবতে হলো না। মনে মনে সে নিখুঁত এক ছক কষে ফেললো। প্রতিশোধ পরায়নতার ঝোঁকে পরদিন খুব ভোরে কেউ কিছু দেখার আগেই উসামার সদ্য কেনা নতুন জুতোজোড়া সে লাপাত্তা করে ফেললো। ওসামার সু র‍্যাক হতে সেই জুতোর স্থান সর্বশেষে ঘটলো অপলার বিছানার তলায়। একদিনও ব্যবহার করা হয়নি। একেবারে নতুন জুতোজোড়া। এহেন প্রতিশোধ পরায়নতা ঘটিয়ে অপলা খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল। অপলা একান্তে নিজের মনে মনে বলতে লাগলো,

“এবার দেখো কেমন লাগে বাছাধন। এই জনমে আর এই জুতার সন্ধান পাবে না।”

কিন্তু আসল বিপত্তিটা ঘটলো সন্ধ্যাবেলা। অপলা তখন ঘুমে ঢুলুঢুলু। ক্লাস করে এসে সে প্রচন্ড ক্লান্ত; মমো কোচিংয়ে গেছে। অপলার ফুপি তখন কী যেন খুঁজতে এসে বিছানার তলায় ঝুঁকতেই। সেই গোপনীয় জুতার বক্স দেখতে পেলেন। হাত দিয়ে বক্সটা খুলে জুতোজোড়া বের করে অপলাকে দেখিয়ে বললেন,

“কীরে অপলা, নতুন জুতা কিনে আনলি। একবার আমাকে দেখালিও না?”

অপলা নিদ্ নিদ গলায় জবাব দিলো,

” কই আমি আবার কী কিনলাম?”

শায়েলা বেগম জুতো জোড়া অপলার সামনে তুলে ধরে বললেন,

“তাহলে এই জুতো কার?”

জুতোর কথা শুনে অপলা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে উঠলো। তাঁর ঘুমের ঘোর এক নিমিষেই কেটে গেল। আমতা আমতা করে বললো,

“ওহ হ্যা আমিই তো কিনেছিলাম। কী যে ভুলো মন আমার! তোমাকে বলতেই ভুলে গেছি। ”

অপলার ফুপি জুতো জোড়া আবার পরখ করে দেখলেন। তারপর বললেন,

“” ও তাই বল, যাইহোক জুতোটা সুন্দর হয়েছে খুব। তোকে মানাবে ভালো; তা কত নিলো?”

অপলা যেন এবার আকাশ থেকে পড়লো। জুতো জোড়া তো উসামার। তবে সে কী করে জানবে এর দাম কত? তবুও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সে বললো,

” গুলিস্তান থেকে নিয়েছি ফুপি। একদাম পাঁচশো! ”

অপলার ফুপি চোখ কপালে তুলে বললেন,

” তুই তো পুরো জিতে গিয়েছিস রে অপলা। কিন্তু, জুতাগুলো তোর পায়ের চেয়ে অনেক বড় হবে মনে হচ্ছে। ”

অপলা জুতাটা নিজের হাতে নিয়ে গর্বের সহিত বললো,

” আরে ফুপি সস্তায় পেয়ে গিয়েছি তাই নিয়েছি। আর জুতা একটু বড় কেনাই ভালো। তাহলে সামনের আরো কয়েক বছর পরতে পারবো।”

অপলার ফুপি হেসে বললেন,

” এতদিনে তোর একটু জ্ঞান বুদ্ধি হয়েছে। এভাবে সবসময় সতর্ক থাকবি। তাহলে আর কারো কাছে ঠকতে হবে না।”

ফুপি একথা বলে ঘর থেকে চলে যেতেই অপলা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। নাইকির জুতোকে শেষ অবধি সে গুলিস্তানের জুতা বলে চালিয়ে দিলো?এইদিন ও তাঁকে দেখতে হলো? এই জীবনে কোনোদিনই অপলার পাঁচশো টাকার জুতা পায়ে দেওয়ার কপাল হয়নি। তাঁর বাবা বরাবরই একটু সৌখিন মানুষ কিনা। তাঁকে কিংবা তাঁর বড় ভাইকে কখনোই কোনো কিছুতে কমতি অনুভব করার সুযোগটুকু দেননি। কিন্তু, আজ উসামা তাঁকে জুতো চুরি করাও শিখিয়ে দিলো। অতি লজ্জাজনক বিষয়! ছিহ! অপলা ছিহ!

চলবে….