প্রণয় সমাচার পর্ব-০২

0
27

#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ২

পরদিন ভার্সিটিতে থেকে এসেই অপলা দেখলো একজন মধ্য বয়স্কা নারী তাঁর ফুপির সঙ্গে হেসে হেসে গল্প করছে। অপলা কৌতুহল না পেরে মমোকে জিজ্ঞেস করে বসলো,

” এটা কে মমো?”

মমো তখন চা বানানোর মধ্যে ডুবে ছিল। সে তড়িৎ উত্তর দিলো,

” এটা উসামা ভাইয়ার আম্মু জেসমিন আন্টি।”

অপলা চোখ ফিরিয়ে আবার ভদ্রমহিলাটির দিকে তাকালো। এটাই সেই অস’ভ্য উসামার আম্মু? দেখতে শুনতে তো ভদ্র মহিলা যথেষ্ট ভালো। তবে, তাঁর ছেলে এমন কেন? অপলা সাত পাঁচ ভেবে টেবিলে বসে পরলো। তাঁর আজ খুব খুদা লেগেছে। ক্লাসের চাপে সেভাবে কিছু খাওয়া হয়নি আজ। ওইদিকে মমো গিয়ে ওসামার আম্মুকে চা দিয়েছে। প্রথমে স্বাভাবিক কথাবার্তা বললেও; চা খেতে খেতে জেসমিন হঠাৎ অপলার ফুপিকে বলে উঠলেন,

“” ভাবী, আপনাদের জিনিসপত্র একটু সাবধানে রাখবেন। দুঃখের কথা কী আর বলবো ভাবী। ওরহান আর ওর বউ আমেরিকা থেকে কিছুদিন আগে এসেছে। আসার সময় উসামার জন্য একটা নাইকির নতুন জুতা এনেছিল। ছেলেটা আমার একটা দিনও পরতে পারেনি। বের করে সু র‍্যাকে সাজিয়ে রেখেছে। পরদিনই চোর ব্যাটা নিয়ে চম্পট! এত তন্নতন্ন করে খুঁজলাম কোথাও পেলাম না জুতাটা। ওরহান খুব শখ করে এনেছিল। কে যে এই চোর! একে হাতেনাতে ধরা দরকার। ”

ড্রয়িংরুম থেকে খাওয়ার ঘর খুব একটা দূরে নয়। তাই সবকিছু খুব কাছে থেকে স্পষ্ট শুনে, অপলা পিলে চমকে উঠে বিষম খেলো। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করা হলে তাঁর মান সম্মান যে কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না। আসামীর খাতায় স্বর্নাক্ষরে অপলা কবিরের নাম লিখা হবে। চুরি বিদ্যা মহা বিদ্যা যদি না পড়ো ধরা। আচ্ছা! জুতা চুরির দায়ে তাঁর ফা’সিঁ হবে নাকি শুধু জেল হবে? অবশ্য সে নিজের ব্যাক্তিগত ব্যবহারের জন্য জুতাটা আনেনি। শুধুমাত্র ওই ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় এই কাজটা করেছে।

তবে, কিছুদিন যেতেই এই অদ্ভুত জুতা চুরির গল্পটা চাপা পরে গেল। কারো খেয়ালেই রইলো না এই ব্যাপারটা। অপলা ঠিক যতটা ভয় পেয়েছিল সেরকম বড় কিছু ঘটলো না। এতে অবশ্য সে হাফ ছেড়ে বেঁচেছিল। এবারের মতো রক্ষা তো হলো!

” অপলা আজ কিন্তু বুয়া আসবে না। কাপড় যেটুকু হয় ধুয়ে ছাঁদে শুকাতে দিয়ে দিস। সবারটা দিতে দিবে না যাঁর যাঁরটা সেই ধুয়ে নিবে। তোর যেটুকু হয় সেটুকুই ধুয়ে শুকাতে দিয়ে দিস।

ফুপির কথা শুনে অপলা চট জলদি কাপড় ধুয়ে ছাঁদে শুকাতে দিলো। রোদ আজ বেশ ভালোই পরেছে। বেশি সময় লাগবে না শুকাতে দিতে। তবে, ছাঁদ থেকে নামার সময়েই উসামা নামক এক ব্যাক্তির আগমনে অপলার কপাল কুঁচকে গেল। এই গু’ন্ডা আবার এখানে কেন? এর কী কোনো কাজকর্ম নেই? পরোক্ষনেই তাঁর মনে পরলো ওহ! আজ তো ফ্রাইডে; এইদিনে সচারাচর কারো সেভাবে অফিস থাকে না। অপলা আবার উসামাকে একটু পরখ করে দেখলো। তাল পাতার সেপাইয়ের মতো দেহ নিয়ে আবার এত ভাব? আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে অপলা আবার বাড়ি ফিরে যায়।

বিকেলে ছাঁদে মেলে দেওয়া কাপড় আনতে গিয়ে অপলার চোখ চড়কগাছ! একি অবস্থা কাপড়ের? সব কাপড়ে গাঢ় নীল রঙের কালির দাগ! ছাঁদে কলমের কালি আসবে কোথা থেকে? আবার শুধু শুধু কাপড়ে কেউ কলমের কালি ফেলবেই বা কেন? অপলা ক্ষনিকের জন্য মমোকে সন্দেহ করলো। তারপর তাঁর মনে হলো মমো এমন করবেই বা কেন? আর আজ তো মমো ছাঁদেও ওঠেনি একবার জন্যেও। তাহলে কে করলো এই ভয়ানক অপকর্ম! অপলা পাশ ফিরে ছাঁদে কোনে অবিরাম ছোটাছুটি করে খেলতে থাকা বাচ্চা দুটোর দিকে তাকালো। সম্ভবত এরা চার তলায় থাকে। মমোর কাছে শুনেছিল বাচ্চাগুলো খুব দুষ্ট! তবে কী ওরাই? অপলা আর কিছু ভাবলো কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

” এই বাবু, তুমি কী আমার জামায় কালি ফেলেছো?”

বাচ্চাটা অদ্ভুত ভাবে চোখ কুঁচকে উত্তর দিলো,

” উহু! আমি বাবু না। আমার বয়স পাঁচ বছর।”

অপলা বাচ্চাটার কথা শুনে চমকে গেল। এ তো আরেক ধানি মরিচ! অপলা আবার প্রশ্ন করলো,

” আচ্ছা মানলাম তুমি বাবু না। আমাকে বলতে পারবে এখানে কালি কে ফেলেছে? ”

বাচ্চা দুটো প্রথমে একটু সময় নিলো। এরপর ভেবেচিন্তে উত্তর দিলো,

” বলতে পারি কিন্তু তুমি কাউকে বলবে না তো? যদি বলে দাও তাহলে উসামা ভাইয়া বলেছে সব ক্যান্ডি নিয়ে যাবে।”

ব্যস! অপলার আর কিছু বুঝতে বাকি রইলো না।এইসব ওই ব’জ্জাত উসামার কাজ। আজকে এর একটা হেস্তনেস্ত সে করবেই! পেয়েছেটা কী এই ছেলেটা?

অপলা পরদিন ওঁত পেতে বসে রইলো। বারবার দরজার আই হোলে দেখছিল কখন তাঁর সেই মহান মানবটি সিঁড়ি বেয়ে ছাঁদে উঠবে। আনুমানিক বিকালের দিকে অপলা দেখলো তড়িঘড়ি করে উসামাকে ছাঁদের দিকে যেতে। ছাঁদ থেকে কাপড় তোলার বাহানায় অপলা ছাঁদে গিয়ে উপস্থিত হলো। গিয়ে দেখলো উসামা ছাঁদের কিনারা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কী যেন দেখছে। অপলার মাথা তখন রাগে টগবগিয়ে উঠলো। হড়বড়িয়ে গিয়ে বললো,

” আপনি আমার জামায় কালি ফেলেছেন কেন?”

উসামা প্রচন্ড চমকে গিয়ে অপলার দিকে তাকালো। সে যে এভাবে হুট করে এসে উসামার সঙ্গে কথা শুরু করবে; তা উসামা মোটেও ভাবতে পারেনি। উসামা কেমন একটা অপ্রস্তুত হয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,

” কীসের কালি কীসের জামা?”

অপলার মাথা তখন গরম উনুনেের মতো জ্বলে উঠলো। কড়কড়ে গলায় বললো,

” আমি ছাঁদে জামা শুকাতে দিয়েছিলাম। আপনি তাতে ইচ্ছে করে কালি ফেলেছেন। এমন কেন করেছেন?”

উসামার হঠাৎ করে অপলা আরো সামনে এগিয়ে এসে বললো,

” এই মেয়ে মুখ খোলো তো দেখি তোমার আক্কেল দাঁত উঠেছে কিনা।”

উসামাকে এভাবে সামনে এগুতে দেখে অপলা দু কদম পিছিয়ে গেল। কেমন একটাঝাঁঝমাখা গলায় বললো,

” মানে! এখানে আক্কেল দাঁতের প্রসঙ্গ আসলো কোথা থেকে?”

উসামা আরো কাছে এগিয়ে এসে হাত ভাঁজ করে বললো,

” আমি শিওর তোমার আক্কেল দাঁত ওঠেনি। উঠলে এসব বেআক্কলের মতো কথা বলে বেড়াতে না। আমি কারো সাদা জামায় কোনো কালি ফেলিনি।”

অপলা প্রথমে কিছু বললো না। কিছুটা সময় ভাবলো। তারপর হুট করে তাঁর মাথায় এলো। একি! সে তো কাউকে এখনও অবধি কোনো সাদা রঙের জামার কথা বলেনি। তাহলে উসামা কী করে জানলো? এটা নির্ঘাত উসামাই করেছে। অপলা চটচটে গলায় উসামাকে ব্যঙ্গ করে বললো,

” আমি আপনাকে একবারও কোনো সাদা রঙের জামার কথা বলিনি। তাঁর মানে এটা আপনিই করেছেন। সত্যি করে বলুন এটা আপনিই করেছেন।”

উসামা বড় নিঃশ্বাস ফেলে ঝাঁঝালো ভঙ্গিতে বললো,

” এসব উল্টাপাল্টা কথা কে বলেছে? আমি এসব কিছুই করিনি। নিচের বাচ্চাদের মুখে শুনে ছিলাম কার যেন জামা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তাই কথাটা বলেছি।”

অপলা হাসতে হাসতে বললো,

” এই তো ধরা পরে গেছেন। নিচের বাচ্চারাই বলেছে কাজটা আপনি করেছেন।”

উসামা আমতা আমতা করে বললো,

” মানে! কী বলেছে বাচ্চারা?”

অপলা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বললো,

” ওরা বলেছে নিচের তলার ম্যাগি নুডলসের মতো কোঁকড়া চুল ওয়ালা একটা ভাইয়া এই কাজ করেছে।ম্যাগি নুডলসের মতো চুল আর গুবলেটের মতো চেহারা আপনার ছাড়া আর এই বাড়িতে কার’ই বা রয়েছে বলুন?

উসামা এবার ক্ষীপ্ত গলায় বললো,

” একদম বডি শেমিং করবে না।”

অপলা অতি তিক্ত গলায় বললো,

” শুকনা পটলের আবার বডি শেমিং!”

উসামা প্রচন্ড বিক্ষিপ্ত বানের মতো তেড়ে এসে বললো,

” ওয়াট ডিড ইউ জাস্ট স্যা?”

অপলা সোজাসাপটা বললো,

” শুকনা পটল বলেছি। সঙ্গে তাল পাতার সেপাইও বলেছি। জানেন, আমি একবার কক্সবাজার গিয়েছিলাম। তখন ওখানে গিয়ে আপনার মতো সেম আরো কয়েক পিস দেখেছি। যদিও আমাদের ভাষায় আমরা সেটাকে শুটকি বলি।”

এরপর হাত ভর্তি কাপড় নিয়ে অপলা নিচে নেমে আসলো। বেশি সময় ছাঁদে থাকলে ফুপি আবার তাঁকে না পেয়ে ঝামেলা করতে পারে। যদিও সময় পেলে উসামাকে আরো দুয়েক কথা শুনিয়ে আসতো সে। এই ছেলে অত্যন্ত নচ্ছার!

চলবে…