#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ৩
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ক্লাসে যাওয়াটা অপলার বড়ই অপছন্দ। যদি জীবন থেকে এই অংশটুকুকে বাদ দেওয়া যেতো! পুরো রোবটের মতো লাইফ। কেমন একটা যন্ত্র যন্ত্র মনে হয় নিজেকে। এই মাসের শেষের দিকে সে সব ছেড়ে ছুড়ে বাড়ি থেকে ঘুরে আসবে কয়েকদিনের জন্য। হঠাৎ কেউ পথ আঁটকে দাঁড়ালে ঘোর কাটলো অপলার। অপলা কেমন উন্মাদ চাহনিতে সামনে থাকা ব্যাক্তিটির দিকে তাকালো। পরমুহূর্তেই তাঁর কপাল কুঁচকে গেল। এই ছেলেটা এভাবে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে কেন? অপলাকে একরাশ অবাক করে দিয়ে আগুন্তক বললো,
” আমার জুতো কোথায়?”
অপলা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমতা আমতা করে বললো,
” কীসের জুতো?”
উসামা বাঁকা হেসে বললো,
” এত ঘটনার পরে তুমি এই কথা বলছো? এতটা ইনোসেন্ট, এতটা নাদান তুমি? ওয়াও! এই যুগে এখনও এত ভোলাভালা মানুষ আছে? কিন্তু, তোমার কীর্তিকলাপ এখন যদি আন্টিকে গিয়ে বলি? আমি শিওর বাসায় ঢুকতেই দেবে না তোমাকে।”
অপলা ঢোক গিলে বললো,
” কেন? আর কী এমন করেছি আমি? যে আপনি ফুপিকে গিয়ে বলবেন। আমি যথেষ্ট ভালো, ভদ্র, সভ্য একটা মেয়ে। ”
উসামা তাঁর নিজের ফোন বের করে নির্দিষ্ট একটা ভিডিও ক্লিপ বের করে বললো,
” তাহলে এটা কী? এটা যদি কোনো ভাবে লিক হয় তাহলে তোমার কী হবে একবার ভেবেছো?”
অপলা লক্ষ্য করলো তাঁর সেদিনকার জুতো চুরি করার সেই বিখ্যাত সময়টুকু সিসিটিভিতে ফুটে উঠেছে। অপলা পিলে চমকে উঠলো। এই ভিডিও উসামার হাতেই কেন পরলো? পরিস্থিতি সামাল দিতে অপলা বললো,
” দেখুন এটা আসলে আমি না। আমার মতো দেখতেই আমার একটা বোন আছে। আমার জমজ বোন ;আমরা এতটাই সেম যে আমাদের বাবা মাও আমাদের আলাদা করতে পারে না। ওই হয়তোবা এই কাজ করেছে। আমাদের নামেও অনেক মিল জানেন। আমার নাম অপলা আর ওর নাম কপলা। ”
উসামা ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে উত্তর দিলো,
“ওহ রিয়েলি। আমি তাহলে আন্টির সঙ্গে কপলার ব্যাপারে কথা বলতে যাচ্ছি।”
অপলা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো,
” এই না না! এটা কেন করবেন। ওর বড় বোন হিসেবে আমি সবটা বুঝিয়ে বলবো। আমি বলে দেবো আপনার জুতো ফেরত দিয়ে দিতে।”
উসামা ঘাড় নাড়িয়ে উত্তর দিলো,
” সেটা হবে না। আমার কথা হবে সরাসরি আন্টি আর কপলার সঙ্গে। আর এত কথা তোমাকে বলে লাভই বা কী? আন্টিকে বললেই তো আন্টি একটা ব্যবস্থা করবেন।”
অপলা চোখ রাঙিয়ে উত্তর দিলো,
” আজব তো! আপনি বারবার ফুপিকে টানছেন কেন? আমি সোজাসাপ্টা আপনার সঙ্গে সমঝোতায় আসতে চাচ্ছি।”
উসামা জবাব দিলো,
” নিজের অপরাধ ঢাকতে ফেইক আইডেন্টিটি ক্রিয়েট করে লাভ হলো না। এবার সোজা কথায় আসো। এমন করলে কেন? দেখে তো মনে হয় খুব লক্ষী একটা মেয়ে। কিন্তু আসল সত্যি ঘেটে দেখলে তো তুমি জুতো চোর।।”
অপলা কর্কশ গলায় বললো,
” অপবাদ দেবেন না। আমি এসব কিছুই করিনি। আপনার জিনিস আপনাকে ফেরত দিয়ে দেবো। আগে বলুন ভিডিওটা ডিলিট করে দেবেন।”
“যদি আমার জিনিস আমি ফেরত পেয়ে যাই তাহলে আর ভিডিও দিয়ে আমি কী করবো। যেখান থেকে নিয়েছো ঠিক সেখানে রেখে আসবে।”
উসামা জামার হাতা গুটাতে গুটাতে নিচে নেমে গেল। অপলা অপরাধীর ন্যায় সেখান দাড়িয়ে রইলো। এই জীবনে এমন কী পাপ করেছিল যে আজ তাঁকে এমন দিন দেখতো হলো? কেন সে এত কিছু থাকতে ওই জুতো জোড়ার পেছনে ছুটলো? নাহলে ওই বেয়াড়া ছেলে আজ এত ভাব দেখানোর সুযোগ পেতো? নিজেকে গালমন্দ করতে করতে উপরে উঠলো অপলা। ফুপি ঘুমোচ্ছে এটাই চূড়ান্ত সুযোগ। অপলা সাবধানে জুতো জোড়া বের করে আলতো হাতে গেট খুলে নিচে গেল। জুতো জোড়া পূর্ব নির্ধারিত জায়গায় রেখে দ্রুত চলে এলো। ভাগ্যিশ কেউ দেখে ফেলেনি। দেখে ফেললে তাঁর জাত যেতো।
এরপর আবার দরজার ম্যাজিক আইয়ের দিকে নজর রাখতে শুরু করলো। উসামাকে ওপরের দিকে উঠতে দেখে নিজেও হড়বড়িয়ে ওপরে উঠে গেল। মুখে একটা সিরিয়াস ভাব এনে বললো,
” আপনি আপনার জুতো ফিরিয়ে দিয়ে এসেছি। এখন আমার ওই সিসিটিভি ফুটেজের ভিডিও ডিলিট করুন। আপনি যা বলেছেন আমি তসই করেছি। এখন নিজের দেওয়া কথা রাখুন।”
উসামা অবাক হওয়ার ভান করে বললো,
” আমি কাউকে কখনো কথা দিয়েছি বলে তো আমার মনে পরছে না।”
” আপনি বলেছিলেন জুতো জোড়া ফেরত পেলে ভিডিওটা ডিলিট করে দেবেন। ”
” কখন বললাম?”
অপলা ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতো ছুটে গিয়ে বললো,
” আপনি নিজে আমাকে বলেছিলেন এখন অস্বীকার করছেন? আমিও আপনার আম্মুকে বলে দেবো আমার জামায় কালি কে ফেলেছে। ”
উসামা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলো,
” কোনো প্রমান আছে? যেকোনো কথা বলতে হয় প্রমানের ভিত্তিতে। আমার কাছে তো প্রমান আছে। তোমার ব্যাপারটা নেহাতই বানানো একটা মিথ্যা কথা। একজন সরল সোজা মানুষকে একা পেয়ে দোষ চাপিয়ে দিচ্ছো। “শেমলেস নারী”
উসামা আবার বললো,
” আমিও কয়েক বছর আগে কক্সবাজার গিয়েছিলাম জানো। ওখানে গিয়ে সমুদ্র পাড়ে একটা ধবধবে সাদা ঘোড়া দেখেছিলাম। এত সুন্দর একটা ঘোড়া। তোমার চুলগুলো দেখে আমার সেই সাদা ঘোড়ার লেজের কথা মনে পরছে। একেবারে সেম টু সেম! কে কাকে কপি করেছে বলো তো?
অপলা এতক্ষন সবটা হজম করতে পারলেও এবার সে আরো ক্ষেপে গেল। উসামার সামনে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বললো,
” চুপচাপ ভিডিওটা ডিলিট করুন। নাহলে কিন্তু আরো খারাপ হবে। আর ঘোড়ার লেজ মানে কী? সৌন্দর্য, ফ্যাশনের কী বোঝেন আপনি? নিজেকে দেখুন! কয়দিন পর ম্যাগি নুডলসের ব্র্যান্ড এম্বাসেডর হিসেবে আপনাকে ডাক দেবে। আমরা নুডলস প্লেটে নিয়ে ঘুরি। আর আপনি মাথায়! ওয়াট এ নাইস কম্বিনেশন! ”
” একদম বডি শেমিং করবে না। ”
” বডি? আপনার বডি আছে? কোথায় আমি তো দেখতে পাচ্ছি না। গোটা খানেক হাড্ডি ব্যাতিত আর তো কিছু চোখে পরছে না।”
উসামা নির্বিকার ভাবে বললো,
” দেখো এবার কিন্তু মোটেও ভালো হচ্ছে না। আমি এক্ষুনি গিয়ে আন্টিকে সবটা বলবো।”
অপলা উসামার দিকে তাকিয়ে আঙুল তুলে বললো,
” আমি কখনোই আপনার সঙ্গে আগ বাড়িয়ে লাগতে আসিনি। আপনি-ই জেঁচে বারবার আমার পিছু লেগেছেন? আপনার কোন বাড়া ভাতে ছাঁই ফেলেছি? চুপচাপ ভিডিওটা ডিলিট করুন।”
“নো মিনস নো!”
উসামা এটুকু বলেই এক দৌড়ে ছাঁদ থেকে নেমে গেল। অপলা কিংকর্তব্যবিমূঢ় বেশে দাঁড়িয়ে রইলো। তাঁর জীবনে কী এক নতুন মুসিবতের আগমন।
সন্ধ্যাবেলা অপরিচিত গলার আওয়াজ বেয়ে অপলা উঁকি দিয়ে তাকালো। আজকেও উসামার আম্মু এসেছে ফুপির সঙ্গে গল্প করতে। অপলা চা নিয়ে তাঁদের সামনে গেল। জেসমিন হঠাৎ চা খাওয়ার ফাঁকে বললেন,
” ভাবী এটা আপনার ভাইয়ের মেয়ে না?”
শাহেলা বেগম উত্তর দিলেন,
” হ্যাঁ, আমার কাছেই রেখেছি ওকে। আমার ভাইয়ের আমানত হিসেবে। যদি আমার একটা ছেলে থাকতো তাহলে ভাইজি হিসেবে না বউ হিসেবে ঘরে তুলতাম। তবে, দুঃখের বিষয় আল্লাহ আমাকে সেই ভাগ্য দেননি।”
জেসমিন হেসে বললেন,
” তা বলেছেন বেশ। আপনাকে একটা কথা বলতেই ভুলে গেছি। কিছুদিন আগে উসামার একটা জুতোর সেট হারিয়ে গিয়েছিল না? বলেছিলাম যে চোরে নিয়ে গেছে। ওটা আজকে চোর আবার আগের জায়গায় রেখে গিয়েছে। আল্লাহ চোরের মধ্যে হেদায়েত দিয়েছে। আমি তো এই কান্ড দেখে এত অবাক হয়েছি কী আর বলবো। ওরহান এত শখ করে পাঠিয়ে ছিল। চুরি হয়ে যাওয়ায় এতটা কষ্ট পেয়েছিলাম।
শায়েলা বিস্মিত হয়ে বললেন,
” বাবাহ! চোর চুরি করা জিনিস আবার ফেরতও দিয়ে যাচ্ছে? এ তো অবাক কান্ড। সেদিন আমার আলমারি থেকে এক হাজার টাকার একটা নোট গায়েব। এত অবাক হয়েছি ;আপনার ভাইয়ের বাজার করার টাকা থেকে সরিয়ে রেখেছিলাম। কোথায় যে গেল টাকাটা! এত খুঁজলাম কোথাও পেলাম না।”
অপলা অবাক হয়ে মমোর দিকে তাকালো।অদ্ভুত ব্যাপার স্যাপার! বাসায় কী সব গায়েবি কর্মকান্ড ঘটে যাচ্ছে। কিন্তু, মমোর কোনো হেলদোল নেই। সে দিব্যি আরামসে চা দিয়ে বিস্কুট ডুবিয়ে খাচ্ছে।অপলা কিছুক্ষন মমোর দিকে তাকিয়ে থাকলো। এরপর আবার নিজের কাজে মনোনিবেশ করলো।
চলবে…..