প্রণয় সমাচার পর্ব-০৫

0
29

#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ৫

চায়ের কাপ পিরিচের টুং টাং আওয়াজে অপলার মাথা ধরে এলো। এই উসামার মায়ের সঙ্গে ফুপির এত কীসের খাতির? দু’জন একত্রে বসলে দিন দুনিয়ার কোনো খোঁজই তাঁদের থাকে না। অপলা এসে দেখলো মমো টেবিলে মাথা দিয়ে চেয়ারে বসে বেহুঁশের মতো ঘুম দিয়েছে। একেবারে ছোট্ট খরগোশ ছানার মতো। অপলা আর কোনো আওয়াজ করলো না। টেবিল জুড়ে বই খাতার ছড়াছড়ি। অপলা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তাঁর বিদ্যান বোন পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেছে। অপলা আলতো হাতে বই খাতা গুছিয়ে রাখতে গেলে কলমের বক্সের সামনে একটা ছোট্ট ঘড়ির বাক্স খুঁজে পেলো। কৌতুহলের বশে সেটা খুলতেই ভেতরে একটা ঘড়ি দেখতে পেল। কিন্তু এটা তো ছেলেদের ঘড়ি। অপলার উপস্থিতি টের পেয়ে মমো তড়িৎ ঘুম থেকে উঠে বসলো।অপলার হাতে ঘড়ির বাক্সটা দেখতে পেয়ে মমো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসলো। অপলা ঘড়ি বাক্সটা হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

” এটা কার? দেখে তো মনে হচ্ছে ছেলেদের ঘড়ি”

মমো তড়িঘড়ি করে অপলার হাত থেকে ঘড়ির বাক্সটা নিয়ে আলমারিতে তুলে রাখতে রাখতে বললো,

” উফ! এত কিছু তোমার বুঝতে হবে না।”

অপলা আর কিছু বলতে চাওয়ার আগেই শায়েলা অপলাকে ডেকে পাঠালেন। অপলা দৌড়ে সেদিকে চলে গেল। শায়েলা আয়েশ করে চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন,

” ফ্রিজে চিকেন পাকোড়া মেরিনেট করে রেখেছি। একটু ভেজে নিয়ে আয় তো অপলা।”

অপলা চিকেন পাকোড়া ভাজার মধ্যেই খেয়াল করলো জেসমিন হাসতে হাসতে শায়েলাকে বলছেন,

” জানেন ভাবী, কাল উসামা অফিস থেকে ফিরেই আমার হাতে একটা লিফলেট ধরিয়ে দিয়ে বললো, ও নাকি আমাদের এলাকার র’ক্ত দান কমিটির স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দিয়েছে। আমি আর ওর বাবা শুনেতো পুরো অবাক। আমার ছেলেটা ছোট বেলায় সূঁচ দেখলেই ভয়ে কেঁদে ফেলতো। সে আজ কত বড় ভালো কাজে যোগ দিয়েছে। এই বাচ্চাগুলো এত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায় কেন?”

জেসমিনের কথা শুনে অপলা চমকিত হলো। এই বাঁদরের মধ্যে এত মানবতার উদয় হলো কীভাবে?

আকাশে বড্ড মেঘ করেছে। মমো কোচিংয়ে গেছে শায়েলা তাওয়ায় রুটি সেঁকতে সেঁকতে বললেন,

” অপলারে, আকাশের যা অবস্থা মা রে ছাঁদ থেকে কাপড়গুলো তুলে নিয়ে আয় তো। মমোকে বলেছিলাম ওর কোনোকিছুতেই মনোযোগ নেই। আজ আসুক বাসায়!”

অপলা আনমনে ছাঁদে গিয়ে কাপড় তুলতে শুরু করলো।

” আজকাল সব জায়গায় আপেল, কমলা, বেদানার ছড়াছড়ি। ”

পুরুষালি গলার আওয়াজ পেয়ে অপলা পেছন ফিরে তাকালো। তবে, তাকাতেই তাঁর মুখ অসন্তুষ্ট হয়ে গেল। যখনই তাঁর জীবনে একটু শান্তির অবপ্রকাশ ঘটে তখনই এই ভিলেন রূপী উসামার আগমন ঘটে! ছাঁদে উঠলেই উসামার সঙ্গে দেখা হবেই! এই মানুষটার কী কোনো কাজকর্ম নেই? ছাঁদটা কী তাঁর পৈতৃক সম্পত্তি?

উসামা অপলার কিছুটা সামনে এসে বললো,

” এ ফর এ্যাপেল!”

অপলা অনুরাগশুন্য দৃষ্টিতে উসামার দিকে তাকালো। আপেক্ষিক অর্থে আপেল বলতে সে যে অপলাকেই বুঝিয়েছে তা আর বলতে কিংবা বুঝতে বাকি নেই। অপলা কাপড়ের ক্লিপ গুলো খুলতে খুলতে উত্তর দিলো,

” আন্টির কাছে শুনলাম আপনি নাকি র’ক্তদান কমিটিতে নাম দিয়েছেন। শুনে খুবই ভালো লাগলো। তবে, আমি একটা বিষয় নিয়ে ভাবছি জানেন।”

অপলা একটু থেমে আবার বললো,

” আপনার যা শরীরের অবস্থা! কাউকে র’ক্ত দিতে গেলে দেখবেন ডক্টর আপনাকে উল্টো আরো এক ব্যাগ র’ক্ত হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে। অবশ্য আপনার শরীরে এক দেড় লিটারের বেশি হয়তো র’ক্ত হবে না।”

উসামার মুখখানা নিমিষেই শুকিয়ে গেল। অপলা উসামার করুন দশা দেখে প্রচন্ড উচ্ছাসিত হলো।

উসামা গলা খেঁকিয়ে অপলাকে উদ্দেশ্য করে বললো,

” তোমার র’ক্তের গ্রুপ কী?”

অপলা সরলতার সহিত উত্তর দিলো,

” বি পজেটিভ ”

উসামা অকস্মাৎ হাসতে হাসতে লাগলো। হাসতে হাসতে বললো,

” আরে এটা তো গরুর র’ক্ত।”

অপলা ভ্রু সংকুচিত করে উসামার দিকে তাকালো। উসামা হাসি থামিয়ে উত্তর দিলো,

” আমার বন্ধুর গরুর ফার্ম আছে জানো। তোমার যদি কখনো মনে হয় তোমার অ্যানিমিয়া হয়েছে অথবা তোমার ব্লা’ডের প্রয়োজন। তাহলে জরুরি ভিত্তিতে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। আমি আমার বন্ধুকে বলে তোমার জন্য গরুর ফার্ম থেকে তাজা ব্লা’ড এনে দেবো। বেশি না মাত্র এক গ্লাস খেলেই চলবে।”

অপলার গা কেমন গুলিয়ে উঠলো। ছিহ! কীসের সঙ্গে কীসের তুলনা! এই ছেলের কী আদৌও কোনো বুদ্ধিসুদ্ধি আছে নাকি? অপলা তিক্ত গলায় বললো,

” আমি যখন আপনাকে প্রথম দেখেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম আপনি খুব ভালো এবং সভ্য ও সুশীল প্রকৃতির মানুষ। কিন্তু, আমি পুরোপুরি ভুল। আপনি নিতান্তই অস’ভ্য ও ব’দ প্রকৃতির মানুষ। ”

অপলার কথা শুনে উসামা বাঁকা হাসলো। তারপর জিহ্বা দিয়ে নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে উত্তর দিলো,

” ইউ নো ওয়াট অপলা? তুমি আমাকে যতটা অস’ভ্য ভাবো আমি তাঁর চেয়েও দশগুন বেশি অস’ভ্য।”

নিজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অবপ্রকাশ সত্যিই কেউ এভাবে ঘটায় তা উসামাকে না দেখলে অপলার সত্যিই জানা হতো না। শেইমলেস!

অপলা শান্ত গলায় উত্তর দিলো,

” এক গ্লাস ইঁদুরের বি’ষ এনে দেবো। খাবেন?”

উসামা হাই তুলতে তুলতে উত্তর দিলো,

” ওসব তোমার খাবার আমি ওসব খাই না।”

চলবে…