প্রণয় সমাচার পর্ব-০৬

0
23

#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ৬

অপলা দীর্ঘসময় ধরে তাঁর লাগেজে জামাকাপড় বোঝাই করছে। কতদিন যাবত বাড়ির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নেই। আজ সকালেই বাবাকে ফোন করে সে জানিয়েছে সে বাড়িতে আসবে। এই অদ্ভুত যান্ত্রিক জীবন তাঁর আর ভালো লাগছে না।

” অপলা তাড়াতাড়ি কর।”

বড় ভাই আজলানের ডাকে অপলার ঘোর কাটলো। অপলা ভেতর থেকে উত্তর দিলো,

” এই তো হয়ে গেছে ভাইয়া; একটু দাঁড়াও। অপলা বাড়িতে আসবে শুনে আজলান তাঁকে নিতে এসেছে। অপলা তৈরি হতেই শায়লা এসে অপলার হাত দুটো ধরে বললো,

” অপলা যাই করিস তাড়াতাড়ি ফেরত আসবি। তোকে ছাড়া আমার বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তোর ফুপা সারাদিন বাড়ি থাকে না। মমোর বাড়ি থাকা যা না থাকাও তা। একমাত্র তুই-ই আছিস যাঁর কাছে দুটো সুখ দুঃখের কথা বলতে পারি।”

অপলা ঘাড় কাঁত করে সম্মতি জানালো। শায়েলাকে সে জড়িয়ে ধরলো। অতঃপর আজলানের সঙ্গে সে বেরিয়ে গেল। দীর্ঘ দুই ঘন্টা জার্নি শেষে বাড়ি পৌঁছেই অপলা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। বাবার সঙ্গে দেখা করেই সে বিছানায় লুটিয়ে পরলো। দুই ঘন্টার জার্নিতেই তাঁর শরীর কাহিল হয়ে পরেছে। ভাবী মিলা সরবত নিয়ে অপলার ঘরে প্রবেশ করে বললো,

” অপলা তুমি আজ বিকালে একটু তৈরি হয়ে থেকো। তোমার ভাইকে দিয়ে একটা শাড়ি আনিয়ে রেখেছি। গোসল করে ওটা পড়ে নিও।”

অপলা ক্লান্ত গলায় উত্তর দিলো,

” ভাবী, এখন আবার শাড়ি পড়তে হবে কেন? আমরা কী কোথাও যাবো?”

মিলা একটু থেমে তারপর বললো,

” আসলে বাবা আর তোমার ভাই মিলে তোমার জন্য একটা বিয়ের সম্বন্ধ দেখেছিল। তাঁরা আজকে তোমাকে দেখতে আসবে। ছেলে বেশ সুন্দর তোমার খুব ভালো লাগবে। ছেলে আর ছেলের পরিবারের তোমাকে খুব ভালো লেগেছে। আজ তোমাকে সরাসরি দেখতে আসবে। ”

অপলার ক্লান্তি যেন নিমিষেই দূর হয়ে গেল। সে উত্তেজিত কন্ঠে বললো,

” আমাকে আগে কেন বললে না তোমরা? আমি আগে জানলে এখানে আসতামই না। আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।”

মিলা সরবতের গ্লাস অপলার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,

” যাও, তাহলে সেটা তোমার বাবাকে গিয়ে বলো।”

অপলা চুপ হয়ে গেল। এই কথা বাবার সামনে গিয়ে বলার মতো সৎ সাহস তাঁর সত্যিই নেই।

বিকালে সত্যিই এক দল মানুষ তাঁকে দেখতে এলো। অপলা মুখ গোমড়া করে একটা টুকটুকে নীল শাড়ি পড়ে পাত্রপক্ষের সামনে গিয়ে বসলো। নার্ভাসনেসের দাপটে তাঁর হাত পা কাঁপছে। একবার মাথাটা একটু উঁচু করে সে সবার দিকে আড়চোখে তাকালো। সবাই কেমন গান্ডে পিন্ডে গিলছে। যেন জীবনে কখনো খাদ্য নামক বস্তুর দেখা পায়নি। পুরো লঙ্গরখানার মতো পরিস্থিতি। তবে, পাত্রের দিকে তাকাতেই অপলা চমকে গেল। ভাবী আদতেই সত্য বলেছে। ছেলে আসলেই অত্যন্ত রূপবান। পাত্রের মা ব্যাগ হতে একটা আংটি বের করে অপলাকে পড়াতে যেতেই অপলার বাবা আতিউর কবির বলে উঠলেন,

” আসলে আংটি বদলটা ঠিক আজ করতে চাচ্ছি না। এটা বরং তোলা রইলো। আমার ছোট বোন শায়েলাকে এখনও কিছু বলা হয়ে ওঠেনি। আমরাও ভাবিনি বিষয়টা হুট করে এতদূর গড়াবে। শায়েলা আসুক তারপর আপনাদের খবর দেবো। আপনারা এসে আংটি পড়িয়ে যাবেন।”

সেদিন পাত্রপক্ষের প্রস্থান ঘটলো। অপলা চমকিত ও বিস্মিত! এটা কী হলো তাঁর সঙ্গে?৷ বাড়ি এসে তো সে সকলের ফাঁদে পা দিয়ে ফেললো। এই বিষয়ে তাঁকে অবহিত করা হলে সে কখনোই বাড়ি-ই আসতো না। ফুপির বাসাই ঢের ভালো ছিল। অসহ্য লাগছে তাঁর! চেনা নেই জানা নেই। যাঁর তাঁর হাতে আংটি ঠুসে দিতে হবে! ছ্যাহ!

সকালে নিজের প্যাটরা পোটলা পাকিয়ে শায়েলা তাঁর কন্যাসহ এসে হাজির হলো। এসেই অপলাকে দেখেই হবু বউ বলে ডাকতেই অপলা রাগে দুঃখে আরেক ঘরে গিয়ে বালিশের মাঝে মুখ গুঁজলো। এই বাড়িতে তাঁর কেউ নেই! কেউ তাঁকে বোঝে না। মা যদি থাকতো তবুও তাঁকে একটাবার বুঝিয়ে বললে সে শুনতো। সেও তো দুই বছর আগে অপলাকে ছেড়ে চলে গেল। চোখ ভর্তি জল নিয়ে অপলা শুয়ে পরলো। হঠাৎ শায়েলা এসে অপলার পিঠে চিমটি কেটে বললেন,

” কীরে বউ, তোর বরের নাম নাকি রোদ্দুর? তা এখন থেকে কী বৃষ্টিতে না ভিজে। রোদে গিয়ে বসে থাকবি?”

অপলা পাশ ফিরে উত্তর দিলো,

” আমার বরের নাম রোদ্দুর হোক আর টিনের চালা হোক তাতে তোমার কী?”

শায়েলা হেসে বললো,

” এখনই বরের নাম নিয়ে কেউ মজা করলে এত রাগ? বাবাহ! ”

অপলা কাঁদো গলায় বললো,

” তোমরা সবাই ষড়যন্ত্র করে এসব করেছো জানি আমি। আমার কিছু ভালো লাগছে না যাও তো তুমি।”

শায়েলা নিরবে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

পরদিন যথারীতি অপলার আংটি বদল হলো। এক রাশ অস্বস্তি নিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে অপলা তাঁর হবু বর রোদ্দুরের হাতে আংটি পরিয়ে দিলো। এর দুইদিন পরেই ক্লাসের বাহানায় অপলা শায়েলার সঙ্গে বাড়ি ফিরে এলো। তবে, আসার সময় হাতের আংটিটা খুলে নিজ হস্তে বাড়ির আলমারিতে তুলে রেখে এলো। আনুমানিক সন্ধ্যার দিকে কলিংবেলের টুংটাং শব্দে অপলা দৌড়ে গিয়ে গেট খুললো। একজন৷ ভদ্রবেশী তাল পাতার সেপাইকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিছুটা অবাকও হলো। উসামা তাঁকে উদ্দেশ্য করে বললো,

” এভাবে দরজা ধরে জলহস্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকলে আমি কীভাবে ঢুকবো? সাইড দাও আপেল।”

অপলা বিনা বাক্যে সরে দাঁড়ালো। এই লোকটার সমস্যা কী? যখনই আসে তখনই কেমন অদ্ভুত আচরণ করে। শায়েলা এসে উসামাকে দেখে বললো,

” আরে বাবা তুমি এসেছো।”

” আন্টি মমোকে পড়ানোর জন্য স্যার খুঁজে দিতে বলেছিলেন। আমি সব ঠিক করে ফেলেছি। কাল সন্ধ্যার পর পড়াতে আসবে। আশাকরি খুব ভালো পড়াবে।”

অপলা দরজা লাগিয়ে দিয়ে ভেতরে চলে গেল। এই ভেজা বিড়ালটা মানুষের সামনে কত ভদ্র! আদতে একটা মাথামোটা পাগল। শায়েলা এক প্লেট মিষ্টির উসামার সামনে দিয়ে বললো,

” বাবা খাও, সারাদিন কতটা পরিশ্রম হয় তোমার। ”

উসামা কাঁটাচামচ দিয়ে মিষ্টি মুখে তুলে বললো,

” এটা কীসের মিষ্টি আন্টি? উপলক্ষ্যটা আসলে ঠিক কী?”

শায়েলা পানির গ্লাসটা উসামার সামনে তুলে দিতে দিতে বললেন,

” আরে অপলার এনগেজমেন্টের মিষ্টি। যে-ই মেয়েটা গেটটা খুলে দিলো। ওটাই অপলা আমার ভাইয়ের মেয়ে।”

উসামা ফ্যাল ফ্যাল করে শায়েলার দিকে তাকিয়ে রইলো। মাথা ঘুরিয়ে কয়েকবার কাকে যেন এদিক ওদিক খুঁজলো। কিন্তু কাঙ্খিত মানুষটিকে দেখতে না পেয়ে ব্যর্থ হলো।

সকাল বেলা কড়া রোদে অপলা নিচের মেইন কেঁচি গেটের মূল হাতল চেপে সাবধানে গেট খুললো। আগে একবার এভাবেই তাঁর হাত কেটেছে। বের হয়ে উসামাকে দেখেই বিষ্ময়কর এক চাহনি দিলো। মনে হচ্ছে অফিসে যাচ্ছে। তবে, তাঁকে দেখেও না দেখার ভান করে বেড়িয়ে যেতে চাইলেও তা আর হলো না। উসামা বাইক স্টার্ট দিতে দিতে অপলাকে উদ্দেশ্য করে বললো,

” আন্টির কাছে শুনলাম তোমার নাকি সাঙ্গা?”

অপলা বুঝতে না পেরে বললো,

” মানে?”

উসামা জবাব দিলো,

“সাঙ্গা মিনস বিয়ে।”

অপলা মাথা নেড়ে উত্তর দিলো,

” হ্যাঁ। তাতে আপনার কী? আমার বিয়ে হোক সাঙ্গা হোক আর চল্লিশা হোক। তা জেনে আপনার কী লাভ? আপনাকে তো ঘুনাক্ষরেও দাওয়াত দেবো না।”

উসামা বাঁকা হেসে বললো,

” তোমার বিয়ে খেতে আমার বয়ে গেছে। তা তোমার হাসবেন্ড নাকি চৌরাস্তার মোড়ে ভিক্ষা করে। ঘটনা কী সত্যি? ”

অপলা কোনো জবাব দিলো না। এই লোকটার সঙ্গে তর্কে জড়ানো মানেই সময় নষ্ট। অভ’দ্র!

চলবে….