#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ৭
“অপলা!”
নিজের নাম কোনো পুরুষালী কন্ঠে শুনতে পেয়ে অপলা চমকে পিছু ফিরলো।ফুলের তোড়া হাতে রোদ্দুরকে দেখতে পেয়ে অপলা বিষ্ময়কর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। রোদ্দুর এখন এখানে কী করছে?
” চলে এলাম তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে। দুই ঘন্টা জার্নি করেছি। আজকের অফিসও কামাই করেছি। শুধু মাত্র তোমাকে চমকে দিতে।”
অপলা একটু ইতস্তত বোধ করলো। এই বিকালবেলা রোদ্দুরকে এভাবে দেখবে তা সে কখনোই ভাবেনি। তবুও মুখে সৌজন্যতা বজায় রাখলো। রোদ্দুরের দিকে তাকিয়ে খুব মিষ্টি হাসি দিলো। রোদ্দুর তৎক্ষনাৎ তাঁর হাতে থাকা গোলাপের তোড়াটা অপলার দিকে এগিয়ে দিলো। অপলা কাঁপা হাতে ফুলের তোড়াটা তুলে নিলো। লাল টকটকে গোলাপ তাঁর খুবই প্রিয় তবে এই মুহূর্তে গোলাপের প্রতি কোনো আগ্রহ আসছে না।
“কীরে অপলা তুই তো পুরো চমকে গেলি!”
শায়েলার কথায় অপলা একবার রোদ্দুরের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে ফেললো। শায়েলা হাসতে হাসতে বললেন,
” আজকে সকালেই রোদ্দুর আমাকে ফোন করে বাড়ির ঠিকানা চাইলো। আমিও দিয়ে দিয়েছিলাম। বললো তোকে নাকি সারপ্রাইজ দেবে। তাই আমিও আর বলিনি।”
অপলা কেমন নিরশ দৃষ্টিতে রোদ্দুরের দিকে তাকিয়ে রইলো। সেই দৃষ্টিতে কোনো প্রেম ও প্রীতি নেই। নেই কোনো উদ্দীপনা! কলেজে থাকতে এমনকি এখন ভার্সিটিতে উঠেও অপলা দেখেছে; তাঁর বান্ধবীদের যখন নতুন নতুন বিয়ে ঠিক হয়েছে। তখনই কেউ তাদের হবু স্বামীর নাম দিলে তাদের গাল এমনকি পুরো মুখ লজ্জায় লাল হয়ে যেতো। শায়লা রোদ্দুরকে লেবুর সরবত দিতে ব্যস্ত থাকলে অপলা আয়নায় নিজেকে একবার পরখ করে দেখলো। কই তাঁর তো গাল লাল তো দূরে থাক গোলাপি অবধি হচ্ছে না। অপলা তাঁর গাল জোড়ায় জোরে চিমটি কাটলো। এখনও তাতে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না! উফ গাল লাল হচ্ছে না কেন তাঁর!
” অপলা বিয়ের পর আমরা কোথায় হানিমুনে যাবো?”
অপলা রোদ্দুরের দিকে ফ্যাকাশে চোখে তাকালো। বিয়ে হওয়ার খবর নেই এখনই হানিমুনের টেনশন! ছ্যাহ!
অপলা গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিলো,
” আপনার যেখানে ইচ্ছে। ”
রোদ্দুর হেসে অপলার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো। অপলা লক্ষ্য করলো রোদ্দুরের চোখে মুখে কেমন একটা উচ্ছাস ফুটে উঠেছে। বিয়ের উচ্ছাস! বিয়ের ঠিক আগে আগে ছেলেরা মেয়েরা যেমন অহেতুক উৎফুল্লে থাকে ঠিক সেরকম। অপলা একবার মায়ের মুখে শুনেছিল বিয়ের ঠিক আগে আগে পাত্র পাত্রীর মনে নাকি লাল নীল বাতি জ্বলে। এদিকে অপলার মনে বাতি তো দূর টিউব লাইট অবধি জলছে না।
আনুমানিক সন্ধ্যার দিকে রোদ্দুর আর অপলা ছাঁদে গেল। মেঘলা আকাশ বারবার অপলাকে কেমন বিষন্ন করে তুলছে। বাতাসে অপলার চুলগুলো যখন এদিক ওদিক উড়ছিল। রোদ্দুর কেমন ঘোরলাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। অপলা সেই দৃষ্টির মানে বোঝেনি। উল্টো অস্বস্তিতে বারবার তাঁর কপাল ঘেমে যাচ্ছিলো।
সেদিন রাতে খেয়ে দেয়ে রাত আটটার দিকে রোদ্দুর বেড়িয়ে গেল। কালকে আবার তাঁকে অফিস জয়েন করতে হবে। তাই শায়েলা তাঁকে ঠেলেঠুলে পাঠিয়ে দিয়েছে বাড়িতে। রোদ্দুর চলে যেতেই অপলা হাফ ছেড়ে বাঁচলো। এই লোকটা যতক্ষন বাড়িতে ছিল প্যা প্যা করে তাঁর মাথা খেয়েছে। ভাগ্যিস ফুপি তাঁকে তাড়াতাড়ি বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। নাহলে অপলার খবর ছিল আজকে। আরেকটু হলে সে পা’গলই হয়ে যেতো।
” আজ নাকি রোদ্দুর এসেছিল বাড়িতে?”
খাওয়ার টেবিলে ফুপা আব্দুল হকের কথায় অপলা মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো। খেতে বসেও একটু শান্তি নেই তাঁর এখানেও একই প্রসঙ্গ! শায়েলা তাঁর স্বামীর প্লেটে মুরগির রান তুলে দিতে দিতে বললো,
” সারাদিন এত পরিশ্রম করেছো। এখন শরীরটাকে একটু বিশ্রাম দাও। তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো সকাল সকাল আবার উঠতে হবে তোমার। ”
আব্দুল হক মুরগির রান চিবুতে চিবুতে রোদ্দুরের প্রসঙ্গ ভুলে গেলেন। খাওয়া দাওয়া শেষে শায়লা অপলার ঘরে এলেন। একটা শপিং ব্যাগ থেকে একটা হালকা আকাশি রঙের ফুল হাতা শার্টের প্যাকেট বের করে বললেন,
” দেখতো কেমন হয়েছে শার্টটা।”
অপলা শার্টের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে বললো,
” সুন্দর কিন্তু কার জন্য কিনেছো ফুপি? ফুপা তো এমন শার্ট পড়ে না। আর ফুপার শার্টের সাইজও তো এটা নয়।”
শায়েলা হেসে বললেন,
” আর বলিস না। তুই তো ছিলি না সেদিন। তুই তোদের বাড়িতে ছিলি। সন্ধ্যাবেলা জেসমিন ভাবী হঠাৎ কেক নিয়ে আসলেন। আমি আর মমো তো অবাক। হলোটা কী? পরে ভাবী বললো সেদিন ছিল উসামার জন্মদিন। উসামার বন্ধুরা ওকে সারপ্রাইজ দিতে কেক-টেক আরো কী কী যেন নিয়ে এসেছে। ভাবলাম ছেলেটাকে জন্মদিন উপলক্ষে কিছু দেবো। তাই তোর ফুপাকে দিয়ে এটা আনিয়েছি। আশাকরি ওর পছন্দ হবে। কাল সময় করে ওকে দিয়ে দেবো।”
উসামার জন্মদিনের কথা শুনেই শায়েলার অগোচরে অপলা মুখ কুঁচকে ফেললো। মনে মনে নিজেই বললো,
” বুড়া দামড়া ব্যাটার আবার জন্মদিন! যতসব আদিক্ষেতা!
সকাল বেলা ভার্সিটি যাওয়ার সময় অপলা উসামাদের গেটের সামনে একটা ছোট্ট গিফটের বক্স রেখে গেল।এমন ভাবে রাখলো যাতে গেট খুললেই জিনিসটা সামনে পড়ে। গিফটটা রেখে অপলা তড়িঘড়ি করে চলে গেল।
সকাল বেলা ঘুমু ঘুমু চোখে উসামা অফিস যাওয়ার জন্য; রেডি হয়ে বের হতে নিলে পায়ের সামনে গিফটের বক্স দেখে চমকিত হলো। এটা আবার কে রেখে গেল? নিজের অভ্যন্তরীন কৌতুহল দমাতে না পেরে বক্সটা খুলতেই সে আরো বেশি আশ্চর্যান্বিত হলো। বক্সের ভেতরে একটা ছোট মিনারেল ওয়াটার আর একটা ইঁদুরের বি’ষের শিশি রাখা। এবং উপরে একটা ছোট্ট চিরকুটে লিখা শুভ জন্মদিন। এই সাত সকালে এই কাজ করলো? তিন তলার ওই বজ্জা’ত মেয়ে অপলা নয়তো? উসামা হতবিহ্বল ভঙ্গিতে গিফটের বক্স হাতে দাঁড়িয়ে রইলো।
চলবে…..