#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ৮
ক্লাসে লেকচারের ফাঁকে অপলা বারবার আজ অন্যমনস্ক হয়ে ছিল। সকালের কথা মনে পরতেই বারবার শুধু হাসি পাচ্ছ তাঁর। উসামা যখন বক্স খুলে দেখবে বি’ষের বোতল তখন তাঁর প্রতিক্রিয়া ঠিক কেমন হবে? অপলা নিজেই ব্যাপারটা মনে করে আবার একটু হেসে নিলো। ফুপা এনেছিল বি’ষের বোতলটা ইঁদুর মা’রার জন্য। তবে, অপলা সেটা অন্য কাজে লাগিয়েছে। উসামাকে জব্দ করতে পেরে আজ তাঁর বড্ড আনন্দ লাগছে। উসামা হচ্ছে একটা পাজি নেংটি ইঁদুর! সরি বিলাতী ইঁদুর ; যে-ই ধবধবে গায়ের রং তাঁর!
অপলা ক্লাস শেষ করে বাড়ি ফিরতেই দেখলো শায়লা তাঁর প্রিয় ভাবী জেসমিনের সঙ্গে গল্প করছে। অপলা জেসমিনকে দেখে সালাম দিলো। মমো ঘরে বেহুঁশের মতো বেঘোরে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে। অপলা অবশ্য বেশ কিছুদিন মমোর সঙ্গে রাতে ঘুমিয়েছিল। তবে, মমোর একটা বিচ্ছিরি অভ্যাস আছে। রাতে যে ওর সঙ্গে ঘুমোবে তাঁর ঘুম পুরোপুরি হারাম! বারবার গায়ের ওপরে হাত পা তুলে দেয় মেয়েটা। আবার ঘুমায়ও হা করে। মুখের লালা দিয়ে পুরো বিছানা ভিজে যায়। তাই দুদিনের মাথায়ই ফুপি মমো আর তাঁর ঘর আলাদা করে দিয়েছে।
অপলা আয়েশ করে থালাভর্তি ভাত নিয়ে বসলো। টিভি ছেড়ে গোপাল ভাড় দেখতে দেখে ভাত খাওয়া তাঁর খুবই পছন্দের। খাওয়ার মধ্যেই সে শুনতে পেল শায়েলা জেসমিনকে উদ্দেশ্য করে বলছেন,
” ভাবী, উসামার জন্য মেয়ে দেখবেন না। ছেলেটার তো এবার বিয়ের বয়স হয়ে যাচ্ছে। ”
জেসমিন জবাব দিলেন,
” মেয়ে আসলে দেখতে হবে না। মেয়ে ঠিক করাই আছে।”
শায়েলা উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে বললেন,
” কে ভাবি?”
জেসমিন বললেন,
” আর বলবেন না ভাবী সে অনেক কথা। আমার মামাতো বোনের মেয়ে কমলা। এখন কম্পিউটার ইন্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ছে। ওরা যখন খুব ছোট ছিল। তখনই আমার আর আমার মামাতো জুইঁ আমাদের দুজনের ইচ্ছে ছিল ওরহান আর কমলার একসঙ্গে জুড়ি করার। কিন্তু, ওরহান তো ওর বউ নিজে পছন্দ করেছে। বিয়েটাও তো প্রেমেরই। তাই, আমি আর জুইঁ ঠিক করেছি উসামা আর কমলার বিয়ে দেবো। ভাবী আপনি বিশ্বাস করবেন না কমলা এত সুন্দর! আর তেমনই ওর চালচলন। এত শান্তশিষ্ট মেয়ে আমি এর আগে দেখিনি। আমার তো মনে হয়, উসামাও কমলাকে মনে মনে পছন্দ করে। লজ্জায় হয়তো বলতে পারে না।”
অপলার গলায় খাবার আঁটকে গেল। এই নেংটি ইঁদুরের ও পছন্দের মানুষ আছে? বাবাহ! সবাই তলে তলে টেম্পু চালায়।
শায়েলা উসামার প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে এবার জেসমিনকে বললো,
” ভাবী, আপনাকে তো একটা কথা বলতে মনেই নেই। আমার ভাইজি অপলার কিছুদিন আগে বাগদান হয়ে গেছে। ছেলে ব্যাংকে সরকারি চাকরি করে। ছেলে খুবই ভালো; পরিবারের সদস্যরা ও খুবই ভালো মনের। ছেলেটাকে অপলার সঙ্গে যা মানিয়েছে না!”
জেসমিন অবাক হয়ে শায়লার সব কথা শুনতে লাগলো। অপলার এবার প্রচন্ড বিরক্ত লাগলো। ফুপির কাছে সারাদিন শুধু রোদ্দুর আর রোদ্দুর! এ যেন এক অসহনীয় যন্ত্রণার নাম!
সন্ধ্যাবেলা মিলার কল পেয়ে অপলা ফোন তুলতেই শুনতে পেল,
” অপলা তোমাকে কথা বলার ছিল। জানি তুমি কষ্ট পাবে কিন্তু সত্য তো সত্যই। আজ বিকালে রোদ্দুরের বাবা মা ফোন করেছিল। আমার জিনিসটা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু অতি দুঃখের সাথে তোমাকে বলতে হচ্ছে যে, রোদ্দুরের বাবা মা তোমার সঙ্গে রোদ্দুরের বিয়েটা ভেঙে দিয়েছেন। তোমার আলমারিতে তুলে রাখা আংটিটা আমি ঘটকের মাধ্যমে ওদের ফেরত দিয়ে দিয়েছি। যখন ওদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তাই, ওদের দেওয়া কোনো জিনিস রেখে লাভও নেই।”
অপলা হতবাক হয়ে গেল। রোদ্দুর কেন এটা করলো তাঁর সঙ্গে? এতদূর এগিয়ে এসেছিল বিষয়টা। বিয়েটা এভাবে আচমকা ভেঙে দেওয়ার মানে কী? শায়েলা হুট করে অপলার ঘরে এসে অপলার সামনে বসলো। শায়েলার চোখ ছলছল। অপলার বিয়ে ভাঙা নিয়ে সবচেয়ে কষ্ট হয়তো শায়লাই পেয়েছে। শায়লা কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,
” দুঃখ করিস না অপলা। এমন ছেলে তো তোর জীবনে আসবে যাবে। তুই কী ফেলনা নাকি? তুই হলি আমার সাত রাজার ধন। ওই হারা’মজাদার জীবনে কিছু ভালো হবে না দেখিস। আমার বাড়িতে এসে কত মিষ্টি মিষ্টি কত বলে গেল। অস’ভ্য কোথাকার! আসলে ওর মনে তো ছিল বি’ষ। ওর কপালে ডা’ইনি জুটবে দেখিস। আমার এই নিষ্পাপ মেয়েটাকে কত কষ্ট দিলো। ”
ফুপির কাঁদো কাঁদো অবস্থা দেখে অপলারও কান্না পেয়ে গেল। ফুপির মতো কেউ তাঁকে এত ভালোবাসে না। অপলা বারবার শুধু রোদ্দুরের বলা কথাগুলো মনে পরতে লাগলো। এমন না যে রোদ্দুরকে সে পছন্দ করতো কিন্তু তবুও তাঁদের দুজনের তো নতুন ভাবে নিজেদের সঙ্গে একটা নতুন জীবন শুরু করার কথা ছিল। আর রোদ্দুরের বাবা মাও তো অপলাকে অনেক পছন্দ করেছিলেন। প্রথম দিনই অপলার সঙ্গে বাগদান করে ফেলতে চেয়েছিলেন। তাহলে এখন এহেন আচরণের হেতু কী?
অপলা ধীর পায়ে সকাল বেলা ক্লাসের জন্য বের হলো। আজকে তাঁর শরীর চলছে না। ঘুমে বারবার চোখ বুজে আসছে। কালকে রাতের ওই জঘন্য বিষয়টা নিয়ে ভাবতে ভাবতে অনেক দেরি করে ঘুমিয়ে ছিল। ফলাফল আজ ঘুমে তাকানোই যাচ্ছে না। নিচের মেইন ডোরের সামনে আসতেই উসামা বিন লাদেনের সঙ্গে দেখা। বাইক নিয়ে বের হওয়ার সময়ই অপলাকে দেখে সেও থেমে যায়। অপলার আলুথালু অবস্থা দেখে কৌতুকের স্বরে বললো,
” আহারে তোমার জন্য খুবই খারাপ লাগছে। কেঁদে কেটে দেখছি চোখ ফুলিয়ে ফেলেছো। সো স্যাড! ”
অপলা না জানার ভান করে বললো,
” কীসের স্যাড? আর আমি কাঁদবো-ই বা কেন?”
উসামা নিজের পকেটে হাত গুঁজে বললো,
” তোমার তো বিয়ে ভেঙে গেছে শুনলাম। ”
অপলা জবাব দিলো,
” এসব আজগুবি কথা কে বলেছে আপনাকে?”
উসামা বাঁকা হেসে বললো,
” আন্টি-ই তো কাল রাতে আমার মাকে ফোন করে বললেন। আমি তো সামনেই ছিলাম তখন।”
অপলার ইচ্ছে হলো মাটির নিচে গর্ত করে তাঁর মধ্যে ঢুকে যেতে। এসব বিষয় এত ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বলার কী আছে? উসামা একটু থেমে আবার বললো,
” তোমার বিষয়টা শুনে খুবই দুঃখ পেয়েছি অপলা। কিন্তু, আমার ওই ছেলেটার জন্য খুবই আনন্দ লাগছে। তুমি যে-ই ধানী লংকা! বেচারা জিন্দেগী জ্বালি’য়ে পু’ড়িয়ে পুরো তামা তামা বানিয়ে দিতে।”
অপলা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো,
” এসব কথা আপনি-ই বলছেন? আপনি? নিজেকে কখনো একবার আয়নায় দেখেছেন? নিজেকে কী ভাবেন? বুটেক্সের টেইলর! আর কথাবার্তার ছিঁড়ি তো বাদ-ই দিলাম। মেয়েদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয় তাও তো জানেন না।”
উসামা ডোন্ট কেয়ার ভাব দেখিয়ে বললো,
” আমার কথা বাদ দাও। আমি যে ভালো মানুষ না সেটা আমিও জানি। কিন্তু, তুমি নিজেকে আবার ধোয়া তুলসীপাতা ভেবো না। আর আরেকটা কথা। তুমি কিন্তু ভেবো না তোমার কপালে আমার মতো কোনো হ্যান্ডসাম ছেলে জুটবে। যদি ওই আশা করে থাকো তাহলে তোমার আশায় গুড়ে বালি! তোমার কপালে ওই আলু পটল ছাড়া কিছু জুটবে না।”
অপলা ক্ষীপ্ত গলায় বললো,
” নিজেকে হ্যান্ডসাম ভাবেন আপনি? আয়নায় একবার ভালো করে নিজেকে দেখে নেবেন। গায়ের রং নিয়ে বুঝি এত দেমাক? ফর্সা রং তো মূলারও হয়! আর আপনাকেও আরেকটা কথা বলে রাখছি। যদি আপনি দুনিয়ার শেষ পুরুষও হন। তবুও আমি আপনাকে বিয়ে করবো না।”
চলবে…