প্রণয় সমাচার পর্ব-০৯

0
23

#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ৯

” তোমার মতো এমন ঢংগী মেয়ে বিয়ে করতে আমারও বয়ে গেছে। কথায় যেন আগুন ঝড়ে!”

অপলা আর কথা না বাড়িয়ে বের হয়ে গেল৷ এই মানুষটাকে সে এড়িয়ে চলতে চায়। কিন্তু, সৃষ্টিকর্তার অদ্ভুত লীলাখেলায় বারবার দেখা হয়েই যায়। তবে, বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উসামার মতো কেউ পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে অপলা একবার পিছু ফিরে পরখ করে দেখলো। উসামাকে সে অনেকটা পিছু ফেলে রেখে এসেছে। এত তাড়াতাড়ি উসামা কীভাবে এখানে চলে আসবে? অপলা কী তবে ভুল দেখলো?

বাড়ি ফিরে অপলা দেখলো, শায়েলা আলমারি থেকে এক গাদা শাড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে মেঝেতে বসে আছে। অপলা কৌতুহলী ভঙ্গিতে শায়েলার দিকে তাকাতেই শায়েলা বললেন,

” ওরহানের মেয়ের আজকে জন্মদিন। জেসমিন ভাবীর নাতনি। আমাদের সবাইকে আজকে দাওয়াত দিয়েছে রাতে। তোর ফুপা আজ একটু গ্রামে যাবে। জায়গা জমিন নিয়ে কী সব ঝামেলা চলছে গ্রামের বাড়িতে। তাঁর হিসাব বাদ, তুই মমো রেডি হয়ে থাকিস। তোদের দুজনকে নিয়ে যাবো।”

অপলা প্রথমে একবার না করে দিতে চাইলো। উসামাদের বাসায় যাওয়ার ইচ্ছে তাঁর মোটেও নেই। কিন্তু শায়েলার কথার ওপর কথা বলার মতো ইচ্ছে অপলার নেই। তাই অপলা চুপ করে থাকলো। কিছুদিন আগেই তো উসামার জন্মদিন গেল। এখন আবার উসামার ভাইয়ের মেয়ের জন্মদিন। চাচা ভাস্তী কী আগ পিছু জন্মেছে নাকি?”

সন্ধ্যার পরই শায়েলা সেজেগুজে অপলার কাছে এলো। গায়ে টকটকে সবুজ রঙের শাড়ি। অপলার কাছে এসে সে বললো,

” অপলা, আমাকে একটু সুন্দর করে সাজিয়ে দে তো। মমোকে কত করে বললাম আমাকে একটএ সাজিয়ে দিতে। মেয়েটা আমার কথা শুনছেই না। বলে আমি নাকি বুড়ি হয়ে গিয়েছি। আমি তো এখনও সুইট সিক্সটিন। আমার এখন সেজেগুজে লাভ রোডে ঘোরার বয়স।”

অপলা শায়েলার কথা শুনে হেসে কুল পায় না। হাসতে হাসতেই সে শায়েলাকে সাজিয়ে দিলো। শায়েলা সাজুগুজু শেষে অপলাকে বললো,

” কীরে অপলা, তুই এমন চুলে তেল লাগিয়ে চুম্পু হয়ে ঘুরছিস কেন? তুই একটা সুন্দর জামা পড়ে নে। একটু হালকা সেজে নে। ইয়াং মানুষ কই সেজেগুজে সুন্দর হয়ে থাকবি। সকিনা বিবির মতো চুলে এক গাদা তেল লাগিয়ে বসে আছিস। আমার আম্মা ছোট বেলায় ইচ্ছেমতো তেল দিয়ে আমের আচার বানাতো। তোর মাথাটাকে আমার এখন আমের আচারের কৌটা মনে হচ্ছে।”

অপলা মুখ গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে রইলো। দূর! কীসের সঙ্গে কীসের তুলনা! কোথায় তাঁর চুল আর কোথায় আমের আচারের কৌটা! এরপর আরো এক গাদা গাল খাওয়ার পর অপলা আলমারি থেকে একটা নীল রঙের জামা বের করলো। গোমড়ামুখে সেটাই পরলো। ফুপির কথা শুনে সাজলো। কিন্তু, সাজটায় তাঁকে মানাচ্ছে না। আসলেই ফুপি ঠিক বলেছে। মাথাটাকে আস্ত আচারের কৌটাই মনে হচ্ছে। শায়েলা অপলা আর মমোকে নিয়ে নিচের তলায় গেলেন। কলিংবেল দিতেই জেসমিন এসে দরজা খুলে শায়েলাকে জড়িয়ে ধরলেন। ভেতরে এসে বসতে দিলেন সকলকে। অপলা ভেতরে ঢুকে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো। উসামার মতো কেউ এসে শায়েলাকে সালাম দিলো। অপলা পাশ ফিরে তাঁকে বেশ ভালো করে দেখলো। দেখতে উসামার মতোই কিন্তু উসামার চেয়ে ঢেরবেশি সুন্দর! চুলগুলো উসামার মতো কোঁকড়া নয়। তবে, গায়ের রংটা উসামার মতোই। চকচকে ধবধবে গায়ের রং। এটাই হয়তো উসামার বড় ভাই ওরহান। যতদুর মনে পড়ে একেই তো অপলা সকালে দেখেছিল। জেসমিন একটা ছোট্ট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে সামনে এলো। শায়েলা বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে বললো,

” এটাই ওরহানের মেয়ে। দেখ কত সুন্দর! টুকটুকি বুড়ি একটা। ও যখন প্রথম হলো আমি আর জেসমিন ভাবী একসঙ্গে গিয়ে ওকে হসপিটালে দেখতে গিয়েছিলাম। পুরো কাগজের টুকরো!”

অপলা একবার বাচ্চাটার দিকে তাকালো। ড্যাব ড্যাব চোখে সে অপলাকে দেখছে। অপলা হাত বাড়াতেই সে অপলার কোলে চলে এলো। মায়াবী চোখে অপলার দিকে তাকিয়ে রইলো। অপলা জেসমিনকে বললো,

” বাবুর নামটা কী আন্টি?”

জেসমিন এক বাক্যে বললো,

” মেহউইশ বিনতে ওরহান”

অপলা তাঁর কোলে থাকা বাচ্চাটার দিকে আবার একবার তাকালো। পুতুলের মতো দেখতে; গালগুলো গোলাপি। চুলগুলো তাঁর চাচ্চুর মতো কোঁকড়া। চেহারার গঠনও চাচার মতোন। একেবারে চাচার আদর্শ ভাতিজী।

জেসমিন এসে শায়েলাকে অন্য ঘরে টেনে নিয়ে গেল। মমো পাশের ফ্ল্যাটের কার সঙ্গে যেন গল্প করছে বসে বসে। অপলা এখানকার কাউকে তেমন চেনে না। সে চুপচাপ নিজের জায়গায় বসে রইলো। মেহউইশ তাঁর বাবার কোলে ঘুরছে। সঙ্গে ওটা মনে হয় মেহউইশের আম্মু। অকস্মাৎ কলিংবেল বেজে উঠতেই জেসমিন এসে দরজাটা খুললো। একটা খুব সুন্দর মেয়েকে জেসমিন জড়িয়ে ধরলো। শায়েলার সামনে মেয়েটাকে হাজির করে বললো,

” ভাবী এটা আমার বোনের মেয়ে কমলা। ওর কথাই বলেছিলাম সেদিন।”

শায়েলা হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে কমলার সঙ্গে কথা বললো। কমলার মা বেশ মিশুক। তিনিও খুব সহজেই শায়েলার মিশে গেলেন। এরূপ পরিস্থিতিতেই উসামা বার্থডে কেক হাতে বাসার ভেতরে এলো।উসামাকে দেখা মাত্রই অপলার মেজাজটা বিগড়ে গেল। এতক্ষন সবকিছু ভালোই লাগছিল। কিন্তু, এই উসামাকে দেখলেই অপলার মন মেজাজে খরা ধরে। উসামাকে দেখে কমলা দৌড়ে গেল তাঁর নিকটে। উসামা বার্থডে কেকটা টেবিলের ওপর রেখে কমলার সঙ্গে কথার তালে মিলিয়ে গেল। দুজনের কথার ভঙ্গিতেই অপলা বুঝে গেল, ওরা দুজনেই একে অপরের সঙ্গে ঠিক কতটা ঘনিষ্ঠ। আজ অবধি উসামাকে সে এতটা প্রান খুলে হাসতে দেখেনি। হাসির ছলে উসামার গালে যে টোল পড়ে সেটাও সে দেখেনি। উসামা আড়চোখে অপলার দিকে তাকাতেই সুযোগ বুঝে অপলা চোখ ফিরিয়ে নিলো। এই অভ’দ্রটার দিকে সে তাকাতেও চায় না।
উসামাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই মেহউইশ তাঁর কোলে হামলা চালালো। দুজন দুজনের কার্বন কপি। অপলার হাতে থাকা শায়েলার ফোনটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনে অপলার ফুপার নাম ভেসে উঠেছে। অপলা শায়েলাকে খুঁজতে পাশের রুমে ঢুকলো। সেখানে শায়েলাকে না পেয়ে আরেকটা ঘরে ঢুকতেই দেয়ালে বড় করে উসামা ওরহানের ছবি দেখতে পেল। অপলা ফোন হাতে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলো। এই দুই ভাইয়ের চেহারায় এত মিল। কিন্তু, ব্যবহারে আকাশ পাতাল তফাত। একজন যতটা মিষ্টভাষী আরেকজনের কথাবার্তা, ভঙ্গি ঠিক ততটাই কর্কশ! ঘর ভর্তি মেডেল আর প্রাইজ দেখে অপলা বেশ অবাক হলো। সাদা ইদুঁরটা তো বেশ মেধাবী! ফোনটা আবার বেজে উঠতেই অপলার ঘোর কাটলো। দৌড়ে সে আবারও শায়েলাকে খুঁজতে গেল। খুঁজতে খুঁজতে অবশ্য পেয়েও গেল। এই ফ্ল্যাটের সকল ভাবীদের সমাবেশে বসে সে আড্ডা দিচ্ছিলো। শায়েলার হাতে ফোন দিয়ে অপলা ড্রয়িংরুমে মমোর কাছে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তেই; মেহউইশকে কোলে নিয়ে উসামা অপলার সামনে এসে দাঁড়ালো। অপলাকে শান্ত গলায় বললো,

” বি’ষের বোতলটা তাহলে তুমি রেখেছিলে তাই না?”

অপলা অবাক হওয়ার ভান করে বললো,

” আমি আর বি’ষের বোতল? আমার যদি সাধ্য থাকতো তাহলে আপনাকে সেই বি’ষ পানিতে মিশিয়ে খাইয়ে দিতাম। কিন্তু এই সৌভাগ্য আল্লাহ আমাকে দেননি।”

উসামা জবাব দিলো,

” আমাকে মে’রে তোমার লাভ কী?”

অপলা ঠান্ডা গলায় বললো,

” কী আর হতো? আপনি ম’রলে আমার ভাগের একটা শত্রু কমতো। আপনার চল্লিশার এক প্লেট বিরিয়ানি খেতে পারতাম। তবে, আপনি যেই মর্কট প্রকৃতির মানুষ। মনে হয় না এই সামান্য ইঁদুরের বি’ষে আপনার ওপর কোনো প্রভাব পরবে। সবচেয়ে ভালো হতো আপনাকে একটা হারপিক গিফট করলে। পেট সাফ হতো সঙ্গে আমার জীবনের অশান্তি গুলোও সাফ হতো।”

উসামা নির্বাক ভঙ্গিতে অপলার দিকে তাকিয়ে রইলো। এই ছিল তবে তাঁর মনে? শেষে কিনা হারপিক! ছিহ!

চলবে….