#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ১০
বাড়িতে প্রচন্ড চিৎকার চেচাঁমেচির আওয়াজ পেয়ে অপলা ছুটে এলো। হঠাৎ হলো কী? বাড়িতে এতো হট্টগোল কেন? অপলা টেবিলের বই খাতা ফেলে দৌড়ে এলো। এসে দেখলো শায়েলা বিছানার ঝাড়ু হাতে দাঁড়িয়ে আছে। মমো মেঝেতে আলুথালু ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে বসে আছে। অপলা বিষ্ময়কর দৃষ্টিতে শায়েলার দিকে তাকিয়ে বললো,
” কী হয়েছে ফুপি? খারাপ কিছু কী হয়েছে? ”
শায়েলা উত্তেজিত গলায় উত্তর দিলো,
” খারাপ কোনো কিছু হতে বাকি আছে কিনা তাই বল! অস’ভ্য একটাকে পয়দা করে আমার জিন্দেগী তামা হয়ে যাচ্ছে! এত কষ্ট করে পড়াশোনা করাচ্ছি মহারানী বাড়ির বাইরে লীলা করে বেড়াচ্ছেন। এটাকে আমার সামনে থেকে সরা তো অপলা!”
অপলা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তাঁর মাথায় কিছু ঢুকছে না। শায়েলা হাঁপাতে হাঁপাতে মমোকে ইঙ্গিত করে অপলাকে বললো,
” আমাদের একটাই মেয়ে অপলা। তোর ফুপার আর আমার ওকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন। আজকে মমো কোচিং থেকে আসার পরে দেখি গনিত বইটা ছিঁড়ে গেছে। আমি বই সেলাই করার সুতা সুঁচ নিয়ে বসেছি। ভেবেছিলাম ভালো করে মলাট বেঁধে বইটা সেলাই করে দেবো। দেখ বইয়ের ভেতরে এটা কী পেয়েছি।”
শায়েলা এটুকু বলেই অপলার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিলো। অপলা কৌতুহলী ভঙ্গিতে চিরকুট হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলো। ভেতরে লেখা,
” এই জীবনে আমার ফাস্ট ক্রাশ তুমি। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। তোমাকে ছাড়া প্রতিটা মুহুর্ত আমার খালি খালি মনে হয়। যদি আমার সাড়া না দাও তাহলে আমি ফিনাইল খাবো।”
অপলা তড়িৎ মমোর দিকে তাকালো। মমো কেমন কাচুমাচু দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। শায়েলা একটা ঘড়ির বক্স বের করে অপলার কাছে তুলে ধরলো। অপলা ঘড়ির বক্সটা দেখেই চিনতে পারলো। এটা তো সে সেদিন মমোর পড়ার টেবিলে দেখেছিল। অপলা কিছু বলার পূর্বেই শায়েলা বললো,
” এটাকে দেখে হয়তো আমার মতো কোনো সাধারণ ঘড়ি ভাবছিস! আমিও সেটাই ভেবেছিলাম। কিন্তু ঘড়ির দামটা দেখে আমি নিশ্চিত হয়েছি। আমার আলমারি থেকে এক হাজার টাকা চুরি হয়েছিল। আমি তোকে বলেছিলাম একটু খুঁজে দেখতে। আসল চোর তো আমার নিজের পেটেরটা! আমার আলমারি থেকে টাকা নিয়ে সে তাঁর নাগ’রকে ঘড়ি গিফট করতে চেয়েছিল। জিজ্ঞেস কর তোর বোনকে! এত টাকা নাহলে কোথায় পেয়েছে ও?”
অপলা হতভম্বের ন্যায় মমোর দিকে তাকিয়ে রইলো। মমো অপলার চোখে চোখ মেলাতেও সাহস পাচ্ছে না। শায়েলা মমোকে আরো দু’ঘা দেওয়ার জন্য অগ্রসর হলে অপলা অনেক কষ্টে শায়েলাকে শান্ত করলো। পরিস্থিতিটা একটু স্বাভাবিক করলো।
সন্ধ্যার পর পাশের বেলকনি ওয়ালা ঘরটাতে মমোর আনাগোনা একটু বেশিই বেড়ে যায়। এতদিন শায়েলা সেটাকে তেমন একটা পাত্তা দেয়নি। তবে, আজও সন্ধ্যার পর মমোকে ওই ঘরের দিকে ছুটে যেতে দেখে শায়েলাও পা টিপে টিপে মমোর পেছনে ছুটলেন। গিয়ে যা দেখলেন তা দেখে তাঁর চক্ষু চড়কগাছ! মমো তাঁর প্রেমিকের সঙ্গে ইশারায় আলাপে মেতে রয়েছে। বেলকনির নিচে দিয়ে একটা রাস্তা গিয়েছে। সেখানেই মমোর কাঙ্ক্ষিত প্রেমিক এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মমো ইশারায় তাঁর সঙ্গে কথা বলছে। শায়েলা ছুটে গিয়ে মমোর গালে চ’ড় মেরে বসলেন। মমোকে ঘরে টেনে নিয়ে এসে বেলকনির দরজা বন্ধ করে দিলেন। চুলের মুঠি ধরে একের পর এক ঘা দিতে লাগলেন। বিপদের আশংকা টের পেয়ে অপলা ছুটে এলো। শায়েলার বেগতিক অবস্থা দেখে অপলা প্রথমে শায়েলাকে মমোর থেকে দূরে সরালো। মমো চুল ধরে ভ্যা ভ্যা করে কাঁদছে। শায়েলা উত্তেজিত গলায় বললেন,
” এত এত টাকা ওর পেছনে ওর পড়াশোনার পেছনে উড়াই। আর ও এসব ধিঙ্গিপনা করে বেড়াচ্ছে। আজ ওর একদিন তো আমার একদিন। ওর কপাল ভালো রে অপলা যে তোর ফুপা আজ বাড়ি নেই। নাহলে ওর আজকে কী অবস্থা হতো ও নিজেও টের পেতো না। এই ছেলেটা মোটেও ভালো নয়। এলাকার এক প্রকার বড়লোক বাপের বখাটে ছেলে। ওই ছেলের সঙ্গে ওর এত খাতির! ছিহ!”
শায়েলা এসব বলে মমোর দিকে আবারও ধেয়ে গেলেন। মমো ভয়ে চুপসে নিজেকে অপলার আড়াল করে ফেললো। শায়েলা আবার বললো,
” ওই ছেলে কয়েক বার জে’লে গিয়েছে জানিস! ইভটিজিং এর জন্যও এলাকায় কয়েকবার ওর জন্য সালিস বসেছে। বাপের টাকায় নে’শা করে সারাদিন পড়ে থাকে। ভালো ঘরের সভ্য সন্তান হলে আমি বিষয়টা বিবেচনা করতাম। কিন্তু, ও যে-ই ছেলেকে পছন্দ করেছে এটা কী মোটেও মেনে নেওয়ার যোগ্য রে অপলা? আমার জায়গায় থাকলে তুই কী করতি?”
রাতে পরিবেশ কিছুটা স্বাভাবিক হলো। অপলা মমোকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। হঠাৎ কলিংবেলের আওয়াজ পেয়ে পড়ার টেবিল হতে উঠলো সে। তবে, গিয়ে দেখলো তাঁর আগে শায়েলা-ই গিয়ে গেট খুলে দিয়েছে। অপলা আড়চোখে দেখলো ড্রয়িংরুমে উসামা প্রবেশ করছে। উসামাকে দেখে অপলা কিছুটা আড়াল হয়ে দূরে সরে দাঁড়ালো। আড়ি পেতে শুনতে পেল। শায়েলা উসামাকে আজকের সব ঘটনা একের পর এক খুলে বলছে। অকস্মাৎ শায়েলা অপলাকে ডাক দিয়ে; উসামার জন্য নাস্তা আনতে পাঠালে অপলা রান্নাঘরের দিকে অগ্রসর হলো। নাস্তা ভর্তি ট্রে নিয়ে অপলা উসামার সামনের টেবিলটায় রেখে এলো।শুনতে পেলো শায়েলা উসামাকে উদ্দেশ্য করে বলছে,
” তুমি আমার ছেলের মতো বাবা। তোমাকে ওরহানকে আমি আমার ছেলের মতোই ভাবি। আমাকে আল্লাহ কোনো ছেলে সন্তান দেননি তো কী হয়েছে? তোমরা তো আছো; আমার মেয়ের বয়সটা খুব কম। এই বয়সে আবেগের বশে ওরা এমন অনেক ভুল করে ফেলে। আমি মমোর ভুলটাকে আর বেশি গভীরে যেতে দিতে চাচ্ছি না। ছেলেটা যে মমোর পিছু এত সহজে ছাড়বে না তা আমি বেশ ভালো করেই জানি। তুমি এই বিষয়ে কিছু করো বাবা।”
উসামা গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিলো,
” আন্টি আপনি আজ শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ুন। সকালেই আপনার প্রবলেম সলভ হয়ে যাবে। আমি কালকেই সান্টিং দিয়ে দেবো ওকে। ও আর মমোর ধারেকাছেও ঘেঁষতে ভয় পাবে।”
এরপর কিছুক্ষন টুকটাক কথা বলে উসামা চলে গেল। শায়েলা সবকিছু গুছিয়ে নিজেও শুয়ে পড়লো।শোয়ার আগে একবার মমোর ঘরে গিয়ে আলতোভাবে মমোকে দেখে এলো। এই মেয়েটা এত বোকা কেন?
সকাল বেলা ক্লাসের জন্য বের হতে নেওয়ার আগ মুহূর্তেই উসামার আগমন। অফিসের ফরমাল গেটআপে সে ধীরে ধীরে অপলার দিকে এগিয়ে এসে বললো,
” মমোর বিষয়টা নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমি সবকিছু সলভ করে দিয়েছি।”
অপলা নিচু স্বরে উসামাকে ধন্যবাদ জানালো। তবে, উসামা অপলার দেওয়া ধন্যবাদ তো গ্রহন করলোই না; উল্টো অপলাকে রাগানোর জন্য বললো,
” দুই বোন একেবারে একে অপরের কার্বন কপি। কেউ জুতো চুরি করে কেউ আবার টাকা চুরি করে। এজন্যই আল্লাহ তোমাদের বোন হিসেবে দুনিয়াতে পাঠিয়ে। সেম পিস দুজন!”
অপলার রাগে কান গরম হয়ে গেল। সবকিছুতে বাম হাত ঢোকাতেই হবে উসামার? অপলাও আগুনে ঘি ঢালতে বললো,
” আমাদের কথা ছাড়ুন! ফুপির কাছে আপনার সুনাম শুনে ভেবেছিলাম আপনি আসলেই বড্ড ভালো ও ভদ্র সভ্য মানুষ। কিন্তু আক্ষরিক অর্থে আপনি ভদ্রের মাতাকে পিতা ও পিতাকে মাতা করে দিয়েছেন। কী লজ্জা কী লজ্জা! ছ্যাহ!
চলবে….