প্রণয় সমাচার পর্ব-১১

0
27

#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ১১

ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরার পথে আনমনে হাঁটা শুরু করলো অপলা। পেছনে অপরিচিত কোনো পুরুষের আগমন টের পেল অপলা। সাধারন পথচারী ভেবে নিজের মতো হাঁটতে লাগলো। তবে, অপলাকে অবাক করে দিয়ে পেছন প্রশ্ন এলো,

” এই যে মিস, আপনার নাম্বারটা দেওয়া যাবে। না মানে রাতে কথা বলতাম।”

অপলা পেছন ফিরে চমকিত হলো। লম্বা মতো, একটা কালো টিশার্ট পড়া ছেলে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে। অপলাকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে যুবকটি দাঁত বের করে একটা হাসি দিলো। অপলা বিব্রত বোধ করলো। পেছনে না তাকিয়ে সোজা বাড়ি ফিরে এলো। ভয়ে বুকের ভেতরটা কেমন যেন করছে? কে ছিল ছেলেটা? অচেনা অজানা মানুষ হুট করে অপলার নাম্বারের দিকেই বা কেন হাত বাড়ালো? নাকি আবার কোন নতুন আপদ এর আগমন? এরূপ সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই অপলা বাড়ি এসে রুমে ঢুকলো। কলিংবেল দিতেই মমো এসে দরজা খুলে দিলো। খেয়ে দেয়ে লম্বা একটা ঘুম দিলো।

” উসামার সঙ্গে খুব শীঘ্রই কমলার এনগেজমেন্টটা সেরে ফেলবো। ইচ্ছে আছে সেদিনই একেবারে আকদ করে ফেলার।”

অপলা উসামার প্রসঙ্গ শুনেই একবার ওপাশের ঘরের দিকে উঁকি দিলো। জেসমিন আন্টি ফুপির সঙ্গে একমনে গল্প করছেন। উসামারও খুব জলদি তাহলে বিয়ে হয়ে যাবে। উসামার কপালে এমন বউ জুটুক ; যে কিনা দিনরাত উসামাকে জ্বালিয়ে মা’রবে। বজ্জা’তটার জন্য ওটাই ঠিক আছে।

অপলা বই খাতা নিয়ে পড়ার টেবিলে বসলো। ঘুম থেকে উঠে মাথাটা বেশ হালকা লাগছে। সামনে সেমিস্টার এক্সাম অনেক পড়াশোনা বাকি। মমো তৎক্ষনাৎ অপলার কাছে এসে বললো,

“আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে!”

অপলা কৌতুহলী ভঙ্গিতে মমোর দিকে তাকালো। মমো মুখটা নিরাশ করে বললো,

” উসামা ভাইয়ার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। কয়েকদিন পর এনগেজমেন্ট! আমার ক্রাশের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে আপু!”

অপলা মমোর দিকে তাকিয়ে হতাশ হলো। কয়েকদিন আগেই প্রেমিক ঘটিত বিষয়ে ফুপির হাতে উদ্যম কেলা’নি খেয়েও মমোর সাধ মেটেনি। এখন সে সবকিছু ফেলে রেখে উসামার পিছু নিয়েছে। অপলা শান্ত গলায় বললো,

” কয়েকদিন আগেই বাসায় বিরাট ধরনের ঝামেলা গেল। ভাগ্যিস ফুপার কানে যায়নি। মনের মধ্যে কয়জনকে জায়গা দিবি রে মমো? একজনের পিছু না ছুটতেই আরেকজনকে নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিস।”

মমো একটুও সময় ব্যয় না করেই বললো,

” আমার মনটা আসলে অনেক বড়। এক মনে অনেক জনকেই জায়গা দিতে পারি। আর এমনিতেও উসামা ভাইয়াকে আমি ক্রাশের চোখে দেখি। ওয়ান এন্ড অনলি ক্রাশ”

অপলা অবাক হওয়ার ভান করে বললো,

” ওমা তাই? এই মনে কয়েকদিন আগেও অন্যকেউ ছিল। এখন আবার আরেকজন?”

মমো নির্বিগ্নে জবাব দিলো,

” পাস্ট ইজ পাস্ট! নাও অনলি উসামা ভাইয়া ইজ রিয়েল। এখন বলো ক্রাশের বিয়ে কীভাবে ভাঙবো?”

অপলা তড়িৎ জবাব দিলো,

” মমো এসবে ভুলেও জড়াস না। এসবে জড়ানোর আগে ফুপির মা’রের কথা একবার মাথায় রাখিস। আমি থাকায় তাও কিছুটা ছাড় পেয়েছিস। আবার এরকম কিছু হলে আমিও কিন্তু কিছু করতে পারবো না। যা করবি ভেবে করবি।”

মমো অপলার কথা ঠিকমতো কানেও তুললো। চুল ঝাপ্টা দিয়ে সে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। অপলা বেশ কিছুক্ষন মমোর দিকে তাকিয়ে রইলো। কিন্তু, মমোর খাপছাড়া ভাব দেখে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। এই মেয়ের মাথায় কখন কী ঢোকে কেউ জানে না!

অপলা কল্পনায় একবার কমলাকে নিয়ে ভাবলো। মেয়েটা কত সুন্দর! আসলেই চোখ ফিরিয়ে দেখার মতো। কিন্তু, এত সুন্দর মেয়েটার কপালে উসামার মতো বাঁদর জুটলো? একারণেই বলে সুন্দর মেয়েদের কপালে সুন্দর বর জোটে না। বাঁদরের গলায় জুটেছে মুক্তোর মালা!

ফোনে নোটিফিকেশনের আওয়াজ পেয়ে অপলা ফোনটা হাতে নিয়েই দেখলো ;ফেসবুকে কে যেন ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট দিয়েছে। অপলা ভালো করে চেক করে দেখলো ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরার পথে যে অপলার পিছু নিয়েছিল সেই ছেলেটা। অপলা ভালো করে আইডিটা দেখে রাখলো। আইডির নাম শান্ত হাসান। অপলা ব্লক লিস্টে ফেলে রাখলো। নিজেই ফের মনে মনে বললো,

” নাম শান্ত তুই থাকবিও শান্ত। তুই কেন শান্তি ফেলে মেয়েদের পেছনে ঘুরবি?”

সকালে ভার্সিটি যাওয়ার সময়ও অদ্ভুত এক বিড়ম্বনার শিকার হলো অপলা। বাড়ির থেকে একটু দূরেই অশান্ত নামের ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে। অপলা পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলে বারবার অপলাকে পিছু ডাকলো। অপলার নাম নিলো বারংবার।ভদ্রতার খাতিরে লোকলজ্জার ভয়ে অপলা প্রতিবাদ করার সাহস পেলো না। লোকে তাঁকেই মন্দ বলবে ভেবে সে কিছুই বললো না। কিন্তু, মানসিক ভাবে চাপ অনুভব করলো। ক্লাসে সেদিন মোটেও মন বসলো না। বাড়ি ফেরার জন্য মন আকুলিবিকুলি করতে লাগলো। অপলা প্রচন্ড ভয়ে ভয়ে বাড়ি ফিরলো। পাছে না ওই ছেলেটার সঙ্গে আবার দেখা হয়ে যায়। বাড়ি ফিরে দীর্ঘসময় বিষয়টা নিয়ে ভাবলো। আচ্ছা, বিষয়টা উসামাকে বলে দেখবে কী একবার? মমোর বিষয়টা খুব সহজেই উসামা সলভ করে ফেলেছিল। উসামা কী তাঁকে এই বিষয়ে সাহায্য করবে? করুক আর না করুক একবার বলে দেখতে ক্ষতি কী?

দীর্ঘ অনেকদিন পর ছাঁদে উঠলো অপলা। কাপড় তোলাটা আসলে একটা বাহানা। আসল উদ্দেশ্য উসামার সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে আলাপ করা। অপলা অনেকটা সময় অপেক্ষা করলো। সন্ধ্যা হয়ে এলো এখনও উসামার কোনো খবর নেই। আজকাল ছাঁদে আসে না নাকি বাঁদরটা?

দীর্ঘসময় পরে অকস্মাৎ উসামার আগমন। হাতে একটা সিগারেট; যে-ই না সিগারেটটা ধরাতে যাবে অমনি অপলা তাঁর নিকট এগিয়ে এলো। উসামার হাতে সিগারেট দেখেই অপলা ভ্রু কুঁচকে ফেললো। ওহ! তাহলে অফিস থেকে এসে সিগারেট খাওয়ার জন্যই উসামার ছাঁদে আসার এত তাড়া? ওপরে ওপরে কত ভালো মানুষী! যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে পারেন না। মনের আক্রোশ গোপন করে অপলা বললো,

” উসামা আমার আসলে আপনার একটা হেল্প লাগতো। অনেকটা ভয়ে লজ্জায় কাউকে বিষয়টা খুলে বলতে পারছি না। আমার মনে হয় আপনি আমার প্রবলেমটা সলভ করতে পারবেন। ”

উসামা হাতের সিগারেটটা তাৎক্ষনিক ভাবে পকেটে রেখে দিলো। শক্ত গলায় জবাব দিলো,

” কীসের হেল্প? আমি কী কোনো সাহায্য সংস্থা খুলে রেখেছি নাকি? যদি এমন কিছু মনে হয় তাহলে তুমি ভুল। আমি এত মানবিক না।”

অপলা নিরাশ ভঙ্গিতে উসামার দিকে তাকালো। নরম গলায় বললো,

” উসামা ভাই, আপনার যদি আমার বয়সী নিজের একটা বোন থাকতো। আপনি তাঁর বিপদে এগিয়ে যেতেন না? নিজের বোন ভেবে বিবেচনা করুন।”

উসামা নির্বিগ্নে উত্তর দিলো,

” কীসের বোন? আমার কোন মেলায় হারিয়ে যাওয়া বোন তুমি? আমার কোনো বোন-টোন নেই।”

অপলা আর এক মিনিটও ছাঁদে দাঁড়ালো না। তাঁর ঘাট হয়েছে জেচে গিয়ে উসামার সঙ্গে কথা বলা! আস্তা বে”য়াদবের বংশধর এই ছেলে!

চলবে….