#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ১৪
অপলা নিচু স্বরে বললো,
” ওটা তো একটা মর্কট রা’স্কেল।”
তবে শায়েলার কান অবধি তা পৌঁছালো না। শায়েলা অপলাকে পুনরায় বললো,
” যা জিজ্ঞেস করলাম তা বল। কী পুনপুন করছিস কানের সামনে!”
অপলা বিরক্তিমাখা গলায় বললো,
” মানুষকে যেমন লাগে তেমনই লাগে। তুমিও না আজকাল কী সব প্রশ্ন করো ফুপি! মমোর পেছনে ছুটতে ছুটতে তোমার মাথাটা মনে হয় গেছে!”
শায়েলা হতাশ দৃষ্টিতে অপলার দিকে তাকিয়ে রইলো। অপলা চোখ বুজে একটা গভীর ঘুম দিলো। এই মুহূর্তে তাঁর প্রচন্ড ঘুমের প্রয়োজন।
শায়েলা ভাতের লোকমা তুলে অপলার গালে দিতেই অপলা ঘুমু ঘুমু চোখে চিবুতে লাগলো। ভেবেছিল আধা ঘন্টার জন্য একটু ঘুমিয়ে নেবে। কিন্তু, ঘুমোতে গেলে সময় যে কোন ফাঁকে কেটে যায়! শায়েলা অপলার মুখে ভাতের লোকমা মাখিয়ে তুলে দিতে দিতে বললো,
” তোর বাবাকে ফোন করেছিলাম।”
অপলা মুখে ভাত নিয়ে বিকৃত স্বরে বললো,
” কী বললো বাবা? বাবা খেয়েছে রাতে?”
শায়েলা ভাত মাখাতে মাখাতে বললো,
” তোর বাবা কিছু বলার সুযোগ পায়নি। সব আমি বলেছি।”
অপলা পানির গ্লাস থেকে এক চুমুক পানি খেয়ে বললো,
” তা কী বললে?”
শায়েলা নির্দ্বিধায় বললো,
” তোর বিয়ের কথা।”
“কীহ!”
অপলা প্রচন্ড জোরে বিষম খেলো। অপলার এরূপ অবস্থা দেখে শায়েলা বললো,
” এমন ভান করছিস যেন জীবনে বিয়ে করবি না। সারাজীবন আইবুড়ো হয়ে বসে থাকবি। তোর বান্ধবীরা কয়েক বছর পর বাচ্চা নিয়ে ঘুরবে। তুই বসে বসে সন্ন্যাস জীবন পালন করিস!”
অপলা মুখ ভোঁতা করে বসে থাকলো। খানিক বাদেই শায়েলাকে বললো,
” তা পাত্রটা কে শুনি? তুমি আজকাল ঘটকালি শুরু করেছো ফুপি?”
শায়েলা শান্ত গলায় উত্তর দিলো,
” উসামা আফতাব চৌধুরী। ব্রাদার অফ ওরহান আশফাক চৌধুরী।
অপলা যেন টাশকির ওপরে টাশকি খেল। সে প্রচন্ড উত্তেজিত গলায় বললো,
” কীহ! ফুপি তুমি কী পাগল হয়েছো? তুমি বাবার সামনে ওই ছাগলের কথা কেন বলতে গেলে? আমি তোমাকে বলে রাখলাম জীবনে দরকার হলে বিয়ে করবো না। মাজারের সামনে স্টিলের থালা নিয়ে বসবো। ভিক্ষা করবো তাও ওই ছেলেকে আমি বিয়ে করবো না।”
শায়েলা মোটেও অবাক হলেন না। খুব বেশি উত্তেজিত হলে মেয়েটার মাথা চড়ে যায়। তখন অনেক আজগুবি কথাবার্তা বলে ফেলে। শায়েলা ভাতের খালি প্লেট নিয়ে অপলার ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। যেন অপলা কী বলেছে তিনি শুনতেই পাননি। অপলা সারারাত ভাবলো এই অবস্থা থেকে বাঁচার উপায়। সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে এই মুহূর্তে হলে গিয়ে ওঠা। নাহলে ফুপির সামনে থাকলে সারাদিন বিয়ে নিয়ে উসামাকে নিয়ে জ্বালিয়ে মা’রবে। কালকেই গিয়ে ভার্সিটিতে গিয়ে এটা নিয়ে কথা বলতে হবে।
সকালে ক্লাসে যাওয়ার সময় অপলা মেইন ডোরের কাছে যেতেই কে যেন তাঁকে পুরুষালি গলায় পিছু ডাকলো। অপলার সেই গলা চিনতে সময় লাগলো না। অপলা পিছু ফিরে তাকাতেই উসামা এসে বললো,
” আমার অনেক কথা আছে তোমার সঙ্গে; আমার সঙ্গে এসো।”
অপলা ভীষণ হতবাক হলো। উসামা কী বলতে চায় তাঁকে? অপলা ফের জিজ্ঞেস ও করলো। উসামা জবাব দিলো,
” অনেক বড় কাহিনি। এখানে বলা যাবে না।”
অপলা আর কথা বাড়ালো না। দুজনেই একসঙ্গে বাইরে বেড়িয়ে গেল। উসামা আজকে তাঁর বাইক নিয়ে বের হয়নি। বাড়ি থেকে বাইরে বের হতেই উসামা বললো,
” দেখো, আমি তোমার একটা প্রবলেম সলভ করেছি। তুমি এবার আমার একটা প্রবলেম সলভ করো।”
অপলা শান্ত গলায় বললো,
” আপনি যে-ই বিষয়টার কথা বলছেন ওটা শুধু আপনার একার প্রবলেম নয়। আমিও এর ভুক্তভোগী। ”
উসামা জোরে জোরে শ্বাস ফেলে বললো,
” তোমার আমাকে সহ্য হয় না। আমারও তোমাকে সহ্য হয় না। বাসায় আমাদের নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। আশাকরি ইতিমধ্যে সবই জেনে গেছো। এখন সব তোমার হাতে আপেল। তুমি জাস্ট কোনোভাবে ম্যানেজ করে বিয়েতে না বলে দাও। বিয়েটা ভেঙে দাও;আমি তোমার উপকার করেছি। তুমি এবার আমার উপকার করো। দ্যান আমি প্রমিজ করছি আমি আর তোমার পিছু লাগতে আসবো না।”
অপলা উসামার দিকে তাকিয়ে বললো,
” বিয়েটা ভাঙা এতো সহজ না। অলরেডি ফুপি আমার বাবার কাছে সবকিছু বলে দিয়েছে। আমি যদিও চেষ্টা করবো বিয়েতে রাজি না হতে। সবচেয়ে ভালো হয় আপনি না করে দিলে। আপনি ছেলে মানুষ ; আপনি না বলে দিলে খুব সহজেই বিয়ে ঠিক হওয়ার আগেই ভেঙে যাবে। শুরুর আগেই সবকিছু বালি চাপা দিয়ে দিন।”
উসামা উদভ্রান্তের ন্যায় বললো,
” কীভাবে করবো? বাসায় এই অবধি কয়েকশো বার না বলেছি। আমার কানের পোকা বের করে ফেলেছে সবাই।”
অপলা নির্বিগ্নে বললো,
” আগের ট্রিকটাই এপ্লাই করুন। কিছুদিন আগে যেভাবে বিয়ে ভেঙে ছিলেন। সেভাবেই আবারও এই বিয়েটা ভেঙে দিন। একবার যেহেতু আপনার বুদ্ধি কাজে লেগেছে তারঁ মানে আবারও এই বুদ্ধি কাজে আসবে। আপনার রাস্তা আলাদা আর আমার রাস্তাও আলাদা।”
উসামা কিছুক্ষন ভেবে বললো,
” গুড আইডিয়া। তুমিও তোমার মতো চেষ্টা চালাও। আমিও বাসা থেকে উধাও হয়ে যাবো কয়েকদিনের জন্য।”
অপলার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে বললো,
” এখানে আমার নাম্বার আছে। এটা নতুন সিম একেবারে পার্সোনাল নাম্বার। বাসার কেউ জানে না। ওই সিম বন্ধ করে রাখবো। বাসায় বিয়ে ভাঙা নিয়ে যেসব আপডেট শুনবে। সব আমাকে ফোন করে জানাবে। আর এই বিষয়গুলো আমাদের মধ্যে রেখো। এলাকায় মাইক ভাড়া করে বলে দিও না যেন।”
অপলা ঘাড় নাড়িয়ে সায় দিলো। অতঃপর উসামাকে ফের জিজ্ঞেস করলো,
” বিয়ে ভেঙে এতদিন কই ঘাপটি মেরে ছিলেন?”
উসামা হাই তুলতে তুলতে বললো,
” প্রথমে সিলেট এরপর সাজেক তারপর কক্সবাজার। ”
অপলা হা করে উসামার দিকে তাকিয়ে রইলো। বাড়ির সকল মানুষকে টেনশনে ফেলে হারা’মজাদাটা এত জায়গায় ঘুরেছে?
ক্লাসের শেষে অপলা হল নিয়ে স্যারের সঙ্গে কথা বলেছে। হলের একটা সিট খালি আছে কিন্তু একটু ম্যানেজ করে চলতে হবে। কয়েকদিন সময় দিতে হবে এজন্য। বাড়ি ফিরতেই শায়েলা অতি উৎফুল্ল গলায় অপলাকে বললো,
” তোর বাবার কাছে উসামার ছবি, বায়োডাটা সব পাঠিয়ে দিয়েছি। মনে হয় তোর বাবারও পছন্দ হবে ওকে। আমার সোনার টুকরো ছেলে। তোর বাবা অবশ্য ফোনে আমাকে আর তোর ফুপাকে বলেছে ছেলে যদি ভালো হয় তাহলে কথা আগাতে।”
শায়েলার কথা শুনেই অপলার মেজাজ বিগড়ে গেল। কেমন কড়কড়ে দৃষ্টিতে সে শায়েলার দিকে তাকালো। শায়েলার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। নিজের উসামার গুনগান করেই যাচ্ছে।
পরদিন সকালে প্রচন্ড চিৎকার চেচাঁমেচিঁর আওয়াজে অপলার ঘুম ভাঙলো। ঘুম থেকে উঠেই সে জেসমিনকে দেখতে পেল। জেসমিন কাঁদতে কাঁদতে মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। হেঁচকি তুলতে তুলতে সে শায়েলাকে বললো,
” ভাবী, আমার ছেলেটার কী হলো বলুন? হঠাৎ কী শুরু করলো ও?”
অপলা মমোকে ডেকে ইশারায় জিজ্ঞেস করতেই মমো তাঁকে জানালো উসামা কালকে রাত থেকে বাড়ি ফেরেনি। অপলা মনে মনে প্রচন্ড উৎফুল্ল অনুভব করলো। মনে মনে একগাল হেসে নিলো। উসামার আইডিয়া তাহলে সত্যি-ই কাজে লেগেছে। হি হি!
চলবে…
#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ১৫
বাড়ির আলুথালু অদ্ভুত অবস্থার মধ্যে দিয়েও অপলা সেদিন ক্লাসে গেল। জেসমিন আন্টির জন্য অপলার ভীষণ খারাপ লাগছিল। কিন্তু, কী আর করা! কয়েকদিন আগে ছেলে বিয়ে ভাঙলো। এরমধ্যেই তাঁকে ধরে বেঁধে বিয়ে দেওয়ার কী আছে? যে বিয়ে করতে চায় না তাঁকে বিয়ে দেওয়ার-ই বা এত তাড়া কীসের?
ক্লাস থেকে বাড়ি ফিরে অপলা দেখলো শায়েলা বাড়িতে নেই। মমো গম্ভীরমুখে ভাতের প্লেট নিয়ে বসে আছে। অপলা মমোকে বললো,
” কীরে মমো ফুপি কোথায়?”
মমো খেতে খেতে জবাব দিলো,
” হসপিটালে।”
অপলা বিস্মিত স্বরে বললো,
” কেন? কী হয়েছে ফুপির? ফুপি কী অসুস্থ? কীরে মমো কিছু বলছিস না কেন?”
মমো শান্ত গলায় বললো,
” জেসমিন আন্টি উসামা ভাইয়ার জন্য টেনশন করতে করতে প্রেসার খুব হাই করে ফেলেছিল। সুগার ফল করে হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। পরে আন্টিকে হসপিটালে নিয়ে গিয়েছে। আম্মু হসপিটালে জেসমিন আন্টিকে দেখতে গিয়েছে।”
অপলা এক পলকের জন্য থমকে গেল। বিষয়টা নিয়ে সে আর উসামা বেশিই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। অন্যভাবেও সামাল দেওয়া যেতো। অপলা আর কিছু ভাবলো না। দৌড়ে গিয়ে ব্যাগ হতে সেই চিরকুটটা বের করলো। উসামার নাম্বারটা নিয়ে মোবাইলে তাঁকে কল দিলো। প্রথম বারে উসামা কল রিসিভ করলো না। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করার পর সে উসামার সঙ্গে অপলা কথা বলতে সক্ষম হলো। উসামা ফোন ধরেই বললো,
” হ্যালো, কে?”
অপলা তৎক্ষনাৎ উত্তর দিলো,
” আমি অপলা, আপনার সঙ্গে প্রচন্ড গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা আছে।”
উসামা অতি উৎফুল্ল কন্ঠে বললো,
” হ্যা বলো। বিয়েটা ভেঙে গিয়েছে তাই না?”
অপলা উদাস কন্ঠে বললো,
” বিয়ে ভেঙেছে কিনা জানি না। তবে, খুবই জঘন্য একটা জিনিস ঘটেছে। আপনার মা এসব সহ্য করতে পারেননি। প্রেসার হাই করে সুগার ফল করে এখন হসপিটালে ভর্তি হয়েছেন। আমি বুঝতে পারছি না কী করবো। আপনি….
অপলা কিছু বলার আগেই টুট টুট শব্দ করে কলটা কেটে গেল। অপলা কলটা কাটেনি; তবে কী উসামা কেটে দিয়েছে? এটা কেমন ছেলে? এত গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা শুনেও কোনো রিয়েক্ট করলো না।
শায়েলা হসপিটাল থেকে আসতেই অপলা বিশেষ কৌতুহল নিয়ে তাঁর নিকটে আসলো। শায়েলা উদভ্রান্তের মতো বললো,
” আর বলিস না! জেসমিন ভাবীর যা অবস্থা! হাত পা কাঁপুনি দিয়ে কীভাবে যে মাটিতে পরলো! উসামা যে কী ছেলে মানুষী শুরু করেছে কে জানে!”
অপলা অনেকটা সময় চুপ থাকল। তাঁর মধ্যে অনুশোচনার রেশ দেখা যাচ্ছে। তবুও স্বাভাবিক গলায় বললো,
” এখন জেসমিন আন্টি কেমন আছে ফুপি?”
শায়েলা পানির গ্লাস হাতে নিয়ে অপলার দিকে তাকিয়ে বললেন,
” এখন আছে আগের চেয়ে ভালো। আমার সঙ্গেই একই গাড়িতে করে বাড়ি ফিরেছে। পরে ওরহান ধরে ধরে পরে বাসায় নিয়ে এসেছে।”
অপলা ছোট্ট করে শ্বাস ফেললো।
অপলা তারঁ মোবাইল থেকে আবার উসামাকে ফোন করলো। এবার তাঁর ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। উফ! কী যে হলো এই মানুষটার!
বিবিধ প্রকার মানসিক অশান্তি নিয়ে অপলা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরলো। ঘুমে তাঁর চোখ বুজে এলো। টেনশনে তাঁর ঘুম পাচ্ছে কেন?
” আপু!”
মমোর ডাক শুনে অপলা ঘুমু ঘুমু চোখে তাঁর দিকে ফিরে তাকালো। উঠে বসতেই মমো ফের বললো,
” ভাত খাবে না?”
অপলা ঘুমু ঘুমু গলায় বললো,
” আসছি, তুই গিয়ে বস খাবার টেবিলে।”
অপলা খাবার টেবিলে গিয়ে দেখলো মমো একা বসে আছে। অপলা খাবার বাড়তে বাড়তে মমোকে জিজ্ঞেস করলো,
” ফুপি কোথায়? ফুপি খাবে না?”
মমো জবাব দিলো,
” জেসমিন আন্টিদের বাসায় গিয়েছে। উসামা ভাইয়া ফিরে এসেছে।”
উসামার কথা শুনতেই অপলা সম্বিত ফিরে পেলো। উসানা এত জলদি ফিরে এলো? যাক ভালো হয়েছে। কিন্তু, এবার বেশ মুশকিল হয়ে গেল অপলার জন্য। বিয়েটা কীভাবে ভাঙবে সে?
আজ অপলার ক্লাস নেই। বেশ দেরি করেই ঘুম থেকে উঠলো সে। ঘুম থেকে উঠতেই শায়েলা বললো,
” অপলারে! তোর কী কোনো কান্ড জ্ঞান নেই? সামনে বিয়ে তুই এত দেরি করে উঠেছিস ঘুম থেকে? কই আমার সঙ্গে থেকে থেকে একটু বাড়ির কাজগুলো শিখে নিবি! তা না করে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিস?”
বিয়ের কথা শুনতেই অপলা এক লাফে উঠে বসলো? তাঁর মানে কী ওই নেংটি ইঁদুরটা বিয়েতে হ্যা বলে দিয়েছে? হায় আল্লাহ! একি সর্বনাশ হয়ে গেল তাঁর! অপলা মুহূর্তেই প্রতিবাদ করে উঠলো,
” আমি ম’রে গেলেও এই বিয়ে করবো না। আর আমি ভালো করেই জানি যে বাবা আর ভাইয়া বিয়েতে কেউ রাজি হবে না। সুতরাং বিয়ের চিন্তা বাদ দাও। আমার পক্ষে এই বিয়ে করা অসম্ভব! ”
শায়েলা জবাবে বললেন,
” তোর বাবা-ই আমাকে সকালে ফোন করে বলেছে ছেলে তাঁর পছন্দ হয়েছে। আজলানের কোনো সমস্যা নেই। ওরহান বাইরে চলে যাবে। তাই, জেসমিন ভাবী চাচ্ছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ের কাজটা সেরে নিতে। আর তুই দূরে তো কোথাও যাচ্ছিস না। আমাদের কাছেই তো থাকবি। আমরা থাকি তিনতলায় তুই থাকবি দো’তলায়। এতটুকুই শুধু পার্থক্য।”
অপলা এক লাফে বিছানা থেকে নেমে বললো,
” থাকবোই না আমি এই বাড়িতে। হলে গিয়ে উঠবো; সেখানে থেকেই পড়াশোনা করবো। বাড়ি থেকে টাকা না দিলে টিউশনি করবো।”
শায়েলা ভেংচি কেটে বললেন,
” আহারে! মহারানী হলে গিয়ে উঠবেন! একা বিছানা ছাড়া ঘুম হয় না। মাছ, মাংস মুরগি ছাড়া খাওয়া হয় না। হলের হাত ধোয়া পানির মতো দেখতে ডাল খাবি কী করে?”
অপলা চুপ করে রইলো। তাঁর হাত পা বাঁধা। না সে হলে গিয়ে থাকতে পারবে আবার নাহলে তাঁকে উসামাকে বিয়ে করতে হবে। কোথায় যাবে?
অপলা গম্ভীর মুখ করে নাস্তা খেয়ে উঠলো। খেয়ে উঠতেই বাবার কল পেয়ে সে ফোন রিসিভ করলো। আতিউর কবির অপলাকে বললেন,
” অপলা মা কেমন আছো?”
অপলা কৃত্রিম হেসে বললো,
” ভালো আছি বাবা। তোমার শরীরটা কেমন আছো বাবা? ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করছো তো?”
আতিউর কবির জবাবে বললেন,
” আমি আছি ভালোই। এখন কাজের কথায় আসি। শায়েলা আমাকে একটা ছেলের কথা বেশ কিছুদিন যাবতই বলছে। আমি ছেলের ছবি দেখেছি। দেখতে শুনতেও ভালো আবার ছেলে শিক্ষিত। ছেলের পরিবারের সঙ্গেও কথা বলেছি। ছেলের পরিবারের মানুষজন প্রচন্ড আন্তরিক। সবদিক বিবেচনায় আমার প্রস্তাবটা বেশ ভালো লেগেছে। পাত্রের বড়ভাই দেশের বাইরে থাকে। তাঁর ফ্লাইট কিছুদিনের মধ্যেই। তাই, পাত্রের মা চাচ্ছিলেন বিয়েটা এরমধ্যেই করে ফেলতে। আমি জানি তুমি আমার কথা কখনোই ফেলতে পারবে না। আমি শায়েলাকে এবং পাত্রের মাকে কথা দিয়ে ফেলেছি। তুমি মানসিক ভাবে বিয়ের প্রস্তুতি নাও। আর আরেকটা কথা পাত্রপক্ষ পরশু আকদ করে ফেলতে চাচ্ছে। সন্ধ্যার পর আজলান গিয়ে তোমাকে নিয়ে আসবে বাড়িতে। তাহলে আমাদের বাড়িতেই পরশু তোমার আকদ হবে। আশাকরি এই বিষয়ে তোমার কোনো আপত্তি নেই।”
অপলা আর কোনো কথা বলতে পারলো না। বাবা এক কথার মানুষ। বাবা যেহেতু কথা দিয়ে ফেলেছেন তা কোনো মূল্যেই তিনি ভঙ্গ করবেন না। অপলার চোখ বেয়ে পানির ধারা বয়ে গেল। বাবা একটা বার সরাসরি জিজ্ঞেস তো করতেই পারতেন অপলার এই বিয়েতে মতামত আছে কিনা! আর এমনিতেও বাবার কথার ওপর কথা বলার সাহস অপলার নেই।
অপলা বিকাল অবধি উসামার জন্য অপেক্ষা করলো। বারবার দরজার ম্যাজিক আই দিয়ে দেখছিল উসামা ছাঁদে ওঠে কিনা। অপলা ভেবেছিল বিয়ে নিয়ে সরাসরি উসামার সঙ্গে কথা বলবে। অপলাকে অবাক করে দিয়ে সেদিন ছাঁদে এলোই না উসামা। অপলা বারবার উসামার ফোনে কল দিলো। ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে ; উসামা হয়তো সিমটা অফ করে রেখেছে। সব অঘটন কী আজকেই ঘটছে নাকি? অসহ্যকর পরিস্থিতি! উসামা তাঁকে পছন্দ করে না। অপলার নিজেরও উসামাকে দেখলে মেজাজ বিগড়ে যায়। এই ম্যানারলেস ছেলের সঙ্গে সে কী করে জীবন কাটাবে? দুঃখে অপলার মাটিতে শুয়ে কাঁদতে ইচ্ছে হলো। এই ছেলে তাঁর জীবন তেজ পাতা নয় বরং কচুপাতা করে ছাড়বে!
চলবে…