#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ১৬
” জিনিসগুলো এখানে রাখলাম ভালো করে দেখে নিও। পরে আবার আমায় দোষ দিতে এসো না। যেমন ছিল আমি তেমনই রাখলাম।”
মিলার কথা শুনে অপলা ঘরের মেঝের দিকে একবার চোখ মেলে তাকালো। ওরহান ভাইয়া এসে একটু আগে বিয়ের এক গাদা জিনিসপত্র দিয়ে গেছে। সঙ্গে ছিল ওরহানের বউ প্রিমা। এত অমায়িক তিনি! অপলার সঙ্গে অনেকক্ষন আলাপ আলোচনা করে গেছেন। অপলা ভেতরে ভেতরে অসুখ থাকলেও সে সেই ভাবটুকু প্রকাশ করেনি। বাড়িতে কেমন উৎসব উৎসব ভাব। এক গাদা আত্নীয় স্বজন অপলাদের বাড়িতে ভীর করেছে। এরমধ্যে অনেককে অপলা ঠিকঠাক চেনেও না। অপলার চাচী রূনা আর শায়েলার বুদ্ধিতে অপলাকে রাতে হলুদ লাগানো হবে। এই ছোটখাটো করে বাড়ির লোকজনদের নিয়েই গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান হবে। এই অনুষ্ঠানটা হয়তো বড় করেই করা হতো। কিন্তু, অপলার বাবা এসব পছন্দ করেন না বিধায় ছোট করেই আনন্দ ফূর্তির জন্য করা হবে। অপলা অবশ্য অনুভূতিহীন। তাঁর এসবের প্রতি বিন্দু পরিমাণ ইন্টারেস্ট নেই। এই বিয়েটা না হলেই সে হাফ ছেড়ে বাঁচতো। আবার গায়ে হলুদের বাসনা!
মমো যখন গভীর মনোযোগে অপলাকে গায়ে হলুদের জন্য সাজিয়ে দিচ্ছে; অপলা তখন মূর্তির ন্যায় বসে আছে। রজনী গন্ধা আর মাঝে গোলাপ দিয়ে টিকলি, কানের দুল, গলার হার বানানো হয়েছে। শায়েলা গিয়ে এসব কাঁচা ফুলের গয়না অপলার জন্য বানিয়ে এনেছে। মমো নিজের ধ্যান জ্ঞান সবকিছু দিয়ে অপলাকে তৈরি করছে। অপলা অবাক হয়ে মমোকে দেখছে। তাঁর বিয়েটা উসামার সঙ্গে হচ্ছে। কিন্তু, মমোর সেভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। অপলা এই বিষয়টতে বড্ড অবাক হয়েছে। অপলার ফোনে নোটিফিকেশনের টু টাং আওয়াজ হতেই সে ফোনটা হাতে নিয়ে যা দেখলো তাতে তাঁর চক্ষু চড়কগাছ! অপলার ফেসবুক আইডি থেকে মমো একটা ছেলেকে এক গাদা নিজের ছবি পাঠিয়ে রেখেছে। অপলা ফোনটা মমোর দিকে ঘোরাতেই মমো বললো,
” হেহে এটা আমার নতুন ক্রাশ। সুন্দর না আপু? বুয়েটের স্টুডেন্ট; আমার যে কী ভালো লাগে! এত সুন্দর যে আমি রাতে ঘুমালেও ওকে স্বপ্নে দেখি।”
অপলা বিষম খেয়ে বললো,
” উসামা না তোর ক্রাশ ছিল? তোর ক্রাশের তো বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। ”
মমো নির্দ্বিধায় জবাব দিলো,
” সো ওয়াট? আমার মনটা ভীষণ বড়। দিন রাত কয়েকশো পুরুষ আমার মনের মাঝে বাস্কেটবল খেলে। পুরনো গেলে নতুন আসবে। উসামার দিন শেষ! নতুন ক্রাশ আবিরের বাংলাদেশ! ”
অপলা নিরাশ ভঙ্গিতে মমোর দিকে তাকিয়ে রইলো। এই মেয়েটা মিনিটে মিনিটে ক্রাশ খায়!
শায়েলা হঠাৎ তাঁর ফোন নিয়ে এসে একটা ভিডিও অপলাকে দেখালো। এক রাশ অচেনা মানুষ উসামার গালে, হাতে হলুদ মাখাচ্ছে। তাদের সারা শরীরে রং। যেন এই মাত্র তাঁরা রং খেলে এসেছে। অপলা মনে মনে বিরবির করে বললো,
” ভন্ড একটা! বিয়ের প্রতি ইন্টারেস্ট নেই। আবার ঢং করে গায়ে হলুদ মাখানো হচ্ছে! শা’লা নেংটি ইঁদুর! ”
উসামার গায়ে পরনে সাদা কাবলি সেট হলুদের আভায় ছেয়ে গেছে। তাঁর মোহনীয় রূপের ঝলকে অপলা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। কোঁকড়ানো চুলগুলোকে আলুথালু মেঘের মতো লাগছে কেন?
অপলার চাচাতো বোন নাফিসা, ইলমা তাঁকে হলুদ লাগালো। হলুদের ছোঁয়াও অপলার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। নিজের দৃষ্টি দ্বারা সে চারিপাশের সকলের আনন্দ উদ্দীপনা দেখতে লাগলো। সকলের এই আনন্দমাখা হাসি-ই তো সে দেখতে চেয়েছিল। বিয়েটা ভেঙে গেলে কী সে এসব দেখতে পেতো? অপলা মনকে সান্ত্বনা দিলো। যা হচ্ছে হয়তো এতেই তাঁর কল্যান নিহিত। মিলা বারবার অপলাকে আড়চোখে দেখছিল। অপলা খেয়াল করেও বিষয়টাকে গুরুত্ব দিলো না। মিলা যে তাঁকে ভালো নজরে দেখছে না অপলা তা জানে।
সকালে অপলার শান্তির ঘুম নষ্ট করতে শায়েলার চিৎকারই যথেষ্ট ছিল। কাল সারারাত চাচাতো, মামাতো, ফুপাতো ভাইবোনদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে সকলেই বেশ দেরি করে ঘুমিয়েছে। অতঃপর ফলাফল হিসেবে দুপুরে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা! অপলা চোখ ডলা দিতে দিতে ঘুম থেকে উঠলো। চোখে মুখে বারবার পানির ঝাপ্টা দিলো। ঘুম যেন তাঁর কাটছেই না! ঘুমের কারণে সকালের নাস্তাও তাঁর মিস গেছে।শায়েলা ঠেলেঠুলে দুপুরে খাবার খাইয়ে অপলাকে মমো আর নাফিসার সঙ্গে বিউটি সালোনে পাঠিয়ে দিলো। অপলা মুখ ভার করে গাড়িতে উঠলো। খাঁড়ার ওপরে ম’রার ঘা! একে তো বিয়েতে তাঁর মর্জি সামিল নেই। তাঁর ওপর আবার এত আদিক্ষেতা!
” আপু লিপস্টিক কী লাল দেবো নাকি নুড কালার?”
সালোনের মেকআপ আর্টিস্টের কথায় অপলার সম্বিত ফিরলো। মমো নিজেই মেকআপ আর্টিস্টকে বললো নুড লিপস্টিক দিয়ে দিতে।অপলা আয়নায় একবার নিজেকে দেখলো। যে-ই মানুষটাকে সে তাঁর চোখের বালি বলে গন্য করতো। আজ তাঁরই বউ হয়ে তাঁর কাছে যেতে হচ্ছে! হায় কপাল! একেই হয়তো বলে বিধাতার লিখন। সবশেষে মাথায় গোলাপ গোঁজার মাধ্যমে সাজসজ্জার ইতি ঘটলো। অপলার পুরো সময় বড্ড বোরিং কেটেছে। কী হবে এত সেজে? শেষমেশ পড়তে তো হবেই ওই জংলা মুখো ইঁদুরের খপ্পরে!
সবকিছু শেষ করে বাড়িতে ফিরতে সন্ধ্যা হলো। অপলা এসে বসতে না বসতেই শায়েলা এসে অপলাকে খাইয়ে দিলেন। বাড়ির ছাঁদে বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে। আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীদের নাচের তালে ছাঁদ ভেঙে পড়ার উপক্রম। অপলাকে সকলে মিলে স্টেজে তুলে দিলো। ফটোগ্রাফার বারবার করে অপলাকে ফোকাস করে ছবি তুলতে লাগলো। অপলার শুরুতে অস্বস্তি লাগলেও পরে আর বিষয়টাতে তেমন সমস্যা হলো। ঘন্টা দুয়েক পর সকলের হইহট্টগোলের আওয়াজে অপলা একটা কথাই শুনলো। ” জামাই এসেছে! ” ” এই জামাই এসেছে।” অপলার মুখভঙ্গি নিমিষেই পরিবর্তিত হলো। মুখখানা সে বড্ড গম্ভীর করে ফেললো।
বরের বেশে উসামা দেখতে পেয়ে অপলা অবাক না হয়ে পারলো না। উসামার কোলে মেহউইশ ; সাইডে ওর আর প্রিমা দাঁড়িয়ে। উসামা এসে অপলার সাইডে বসতেই অপলা আরো কিছুটা পিছিয়ে গেল। উসামা আড়চোখে অপলার দিকে তাকালো। অপলা ফিসফিস করে বললো,
” ড্যাং ড্যাং করে বিয়ে করতে চলে এসেছেন। আমি আপনাকে কতবার করে ফোন দিয়েছি! আপনি চাইলেই সবকিছু সুন্দর ভাবে সলভ করতে পারতেন। এভাবে অন্তত সঙ সেজে তো বসে থাকতে হতো না।”
উসামা অপলার দিকে বেশ খানিকটা সময় তাকিয়ে রইলো। এরপর বললো,
” বলা যতটা সহজ করা ততটাই কঠিন। আমি তো চেষ্টা করেছি তুমি তাও করোনি। আমি বাসা থেকে ভয়াবহ ব্ল্যাক মেইলিং এর শিকার হয়েছি। নাহলে, তোমার মতো ঢংগী, রঙচটা মেয়েকে বিয়ে করতে আমার বয়ে গেছে!”
অপলা কটমট করতে করতে উসামার দিকে তাকালো। চোখে যেন তাঁর জলন্ত আগুনের কুন্ডলী! উসামা খানিকবাদেই কেমন মিইয়ে গেল। কাজী আসতেই সকলে কাজীসহ উসামা অপলাকে ঘিরে ধরলো। কাজী প্রথমে অপলাকে কবুল বলতে বললে অপলা বেশ কিছুটা সময় চুপ করে থাকলো। অপলার মৌনতা টের পেয়ে শায়েলা সকলের অগোচরে অপলাকে চিমটি কাটলো। চিমটি খেয়ে অপলার সম্বিত ফিরতেই সে কবুল বললে। সকলে আলহামদুলিল্লাহ বললো। উসামার ক্ষেত্রে উল্টো ব্যাপার ঘটলো। সে দেদারসে কবুল বলে দিলো। উসামার কবুল বলা শুনে জেসমিন শায়েলার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসলেন। বাসা থেকে যে-ই পরিমাণ শান্টিং উসামাকে দেওয়া হয়েছে। তাতে উসামা কবুল বলতে বাধ্য! উসামা কেন তাঁর ঘাড়ও কবুল বলতে বাধ্য।
কাজি স্টেজ থেকে নামতেই অপলা উসামাকে উদ্দেশ্য করে ফিসফিস করে বললো,
” চেয়েছিলাম স্বামী আল্লাহ দিলেন এক স্বামীবেশী নেংটি ইঁদুর। খোমা ভর্তি যাঁর ছলচাতুরী! ”
উসামা নিজের ঘোর অপমান সইতে না পেরে বললো,
” সেম পিঞ্চ! আমিও আল্লাহর কাছে চেয়েছিলাম বউ। আল্লাহ দিয়েছেন এক নাগীন বেশী অসভ্যীনি নারী। যাঁর মনে শুধু বিষ আর বিষ! আমাকে ধ্বংস করে দেবে ফর শিওর!
চলবে….
#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ১৭
” এভাবে কাঁদলে অতি শীঘ্রই বাংলাদেশ বন্যায় ডুবে যাবে। নিজের কান্না থামাও; জনগণের প্রাণ বাঁচাও। ”
অপলা চোখের পানি আলতোভাবে মুছে ঝাপসা চোখে উসামার দিকে তাকালো। উসামার সেদিকে কোনো হেলদোল নেই। অপলার বড্ড দুঃখ হলো। বিয়ের দিন বিদায় বেলায় অন্য মহিলাদের স্বামীরা তাঁদের কত সান্ত্বনা দেয়। আদর করে বুঝিয়ে সুঝিয়ে কান্না থামায়। এদিকে তাঁর কপালে জুটেছেও এক পিস! বিদায় বেলায় বউকে সান্ত্বনা দেওয়া তো দূর সে জনগনের নিরাপত্তা নিয়ে হেদিয়ে মর’ছে!
অপলার বারবার বাবার কথা মনে পরছে। আসার সময় বাবার করুন চাহনি অপলাকে ছিন্ন বিছিন্ন করে দিয়েছে। মেয়েদের জীবন এত অদ্ভুত কেন? যেখানে জন্ম সেই জায়গাটাও ছেড়ে যেতে হয়। অপলা আবার হাত দিয়ে চোখ মুছলো। অপলা গাড়ির জানালার সিটটায় বসেছে। মাঝে উসামা আর ওইপাশের সিটে প্রিমা। প্রিমার কোলে ঘুমন্ত মেহউইশ। ড্রাইভারের সঙ্গে সামনের সিটে ওরহান। পেছনের গাড়িতে মমো, শায়েলা ও তাঁর স্বামী এবং জেসমিন আরো বরযাত্রীর অনেকেই আছে।
অপলার মন বেজায় খারাপ। ভেতরে ভেতরে কেমন ভয়ও লাগছে।
বাড়ির সামনে গাড়ি এসে থামতেই সবাই গাড়ি থেকে নামার তোড়জোড় করতে লাগলো। রাত তিনটা বেজে গেছে ইতিমধ্যেই। অপলার চোখ ভর্তি ঘুম। নতুন বউ বিধায় কাউকে সে কিছু বলতোও পারছে না। সকলে দোতলায় ওঠা মাত্রই জেসমিন; উসামার ঘরের গেট খুলে অপলাকে সেখানে বসিয়ে রেখে এলো। অপলা ভেতরে ঢুকে চমকে গেল। পুরো বিছানা ফুল দিয়ে সাজানো। ফুল পাপড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিছানা ও মেঝে উভয় জায়গাতেই। অপলার ইচ্ছে হলো শরীর এলিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়তে। তবে লোকলজ্জার ভয়ে সে তা পারলো না। জেসমিন বড় দুটো লাগেজ নিয়ে এসে আলমারির সামনে রাখলো। অপলাকে বললো,
” অপলা তোমার ব্যাগগুলো এখানে রেখে গেলাম। আপাতত এখান থেকে কিছু বের করে পড়ে নাও। তারপর কাল সময় হলে লাগেজ খুলে সবকিছু বের করে আলমারিতে বের করে তুলে রেখো।”
অপলা তাঁর পরিহিত বিয়ের ভারী জামাকাপড়, গহনা ছেড়ে কামিজ পরে নিলো। বড্ড ঝাড়া হাত পা লাগছে এখন। এতক্ষন মনে হচ্ছিলো যেন শরীরে বস্তা জড়িয়ে রেখেছিল সে। একটু হেলান দিয়ে বসতেই চোখ ঘুমে জুড়িয়ে এলো। কখন যে ঘুমিয়ে পরলো সে টেরও পেল না।
জোরে দরজা লাগানোর শব্দে অপলার নিদ্রাভঙ্গ হলো। ঘুমু ঘুমু চোখে সে দরজার দিকে তাকালো। ত্বরিত তাঁর ঘুমের রেশ কেটে গেল। শেরওয়ানি পড়া উসামা কেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। অপলা উঠে বসলো এই ভন্ডটা তাঁর দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে কেন? অপলা অপ্রস্তুত ভাবে এদিক ওদিক তাকালো। উসামা বিনা বাক্যে ঘরে ঢুকে ওয়াশরুমে গিয়ে শেরওয়ানি ছেড়ে এলো। একটা কালো রঙের কাবলি পড়ে বাইরে বের হলো। অপলার সামনে এসে বিছানায় বসতে না বসতেই অপলা বললো,
” আরে বিছানায় কেন উঠছেন?”
উসামা বিস্মিত ভঙ্গিতে অপলার দিকে তাকিয়ে বললো,
” আমার বিছানায় আমি উঠবো না?”
অপলা ফের প্রশ্ন করলো,
” না মানে আপনার বিছানায় ঘুম হবে?”
উসামা কিছু বুঝতে না পেরে বললো,
” মানে? ঘুম হবে না কেন? আমি অনেক টায়ার্ড।”
অপলা কিঞ্চিত হেসে বললো,
” আসলে আপনার তো আবার ধুলো বালিমাখা রাস্তায় শুয়ে অভ্যাস। চালের পুরনো চটের বস্তা গায়ে দেওয়া ছাড়া নাকি আবার আপনার ঘুমই হয় না। এই নরম বিছানায় কী আপনার ঘুম হবে? এরচেয়ে ভালো হয় আপনার জায়গা যেখানে আপনি সেখানে চলে যান।”
উসামা বিছানায় হাত পা বিছিয়ে বললো,
” ওমা তাই? তুমি কীভাবে জানলে? তুমিও বুঝি ওই রাস্তায় বসে ভিক্ষা করতে?”
অপলা গাল লজ্জায় অপমানে লাল হয়ে গেল।এভাবে মুখের ওপরে উসামা তাঁকে কীভাবে বললো? অপলা বিছানার মাঝে কোলবালিশ রেখে বললো,
“এটাকে ইন্ডিয়া পাকিস্তানের বর্ডার ভেবে ঘুমিয়ে পড়ুন। আর খবরদার যদি ঘুমের মধ্যে কোলবালিশ সরিয়ে নিয়েছেন তবে আপনার খবর আছে। নিজের বর্ডারের মধ্যে থাকবেন। ঘুমের তালে নাচতে নাচতে আবার আমার বর্ডারের মধ্যে চলে আসবেন না যেন!”
উসামা নিজের জায়গায় শুয়ে পরলো। পাশ ফিরে অপলাকে বললো,
” আমি কোলবালিশ সরাতে যাবো কেন? আমার এত পরনারীর সান্নিধ্যে আসার ইচ্ছে নেই। তবে হ্যাঁ, একটা ব্যাপারে আমি কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছি না। আমি ঘুমিয়ে পড়লে আমার হাত, আমার পা এবং আমি নিজে কোথায় থাকি তা জানি না। হাত, পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে না ঘুমালে আমার ঘুমই হয় না।”
অপলা বাঁকা দৃষ্টিতে উসামার দিকে তাকালো। তাঁকে নিজেকেই সতর্ক থাকতে হবে। ওই ব’দলোকের কোনো ভরসা নেই।
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে অপলা যা সন্দেহ করেছিল তাই হলো। উসামা ঘুমের তালে বর্ডার ভেঙে বর্ডারই গায়েব করে ফেলেছে। অপলা আড়চোখে তাকিয়ে নিচে দেখলো। কোলবালিশ বেচারা অবহেলিত প্রানীর মতো নিচে পড়ে আছে। অপলা নিরাশ ভঙ্গিতে কোলবালিশের দিকে তাকিয়ে রইলো। দ্রুততার সঙ্গে উসামাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে বললো,
” বর্ডার ভেঙেছেন কেন? কালকে আমাকে এত বড় বড় ভাষন শুনিয়ে এখন নিজে কীভাবে বিছানার মাঝেখানে এলেন? আপনি তো বাম পাশে শুয়ে ছিলেন বিছানার। ”
উসামা ঘুমু ঘুমু গলায় বললো,
” আমি কিছুই করিনি। তুমিই বিয়ের খুশিতে কালকে ব্যাঙের মতো লাফাতে লাফাতে বর্ডার ভেঙে মাঝে এসেছিলে। তোমাকে সাইড করতে করতে কখন মাঝে এসে পড়েছি মনে নেই।”
অপলা নিজের প্রতিবাদী স্বরে বললো,
” আমি মোটেই ব্যাঙের মতো লাফাইনি। আমি যেখানে রাত সেখানেই কাঁত। ঘুমের মধ্যে নড়াচড়ার অভ্যাস নেই আমার। অপকর্ম নিজে ঘটিয়ে আমার দোষ দিচ্ছেন?”
উসামা সূঁচালো ভঙ্গিতে বললো,
” ওহ রিয়েলি? আমি মোটেও একা একা বিছানার মাঝে যাইনি। তুমি-ই ধরে বেঁধে ঘুমের ঘোরে আমার ইজ্জত হরনের উদ্দেশ্যে আমাকে বিছানার মাঝে নিয়ে গিয়েছিলে। অনেক কষ্টে আমি নিজের সম্রম রক্ষা করেছি। এই অপলা তোমার লজ্জা করলো না পর পুরুষের মান সম্মান নিয়ে এভাবে টানাটানি করতে? তোমাদের মতো মেয়েদের জন্যই ছেলেরা আজ কোথাও নিরাপদ না। ছিহ!”
অপলা উসামার কথা শুনে দ্রুত উঠে বসে তাঁর দিকে এগিয়ে এসে বললো,
” কী বললেন হ্যাঁ! আমি আপনার ইজ্জত লুট করতে গিয়েছিলাম? আমার মোটেও ইচ্ছে নেই সেকেন্ড হ্যান্ড প্রডাক্ট টাচ করার। আমার রুচি এত জঘন্য নয়।”
উসামা ভ্রু কুঁচকে বললো,
” ওয়াট? আমি সেকেন্ড হ্যান্ড প্রডাক্ট? সবাইকে নিজের মতো ভাবো নাকি? আমি একদম ইনটেক, র্যাপিং করা প্রিমিয়াম কোয়ালিটির প্রডাক্ট। যাঁর তাঁর গায়ে গিয়ে ঢলে পড়া আমার স্বভাব নয়।”
অপলা আর কথা বাড়ালো না। বিনাবাক্যে বিছানা ছেড়ে ফ্রেশ হতে চলে গেল। বিয়ের পরেরদিনই বউ এত দেরি করে উঠলে বিষয়টা মোটেও ভালো দেখাবে না। অপলা রেডি হয়ে বের হতেই প্রিমা তাঁকে ডাক দিয়ে নাশতার টেবিলে নিয়ে গেল। সকলের সঙ্গে একসাথে নাশতা সেড়ে নিয়ে বসতেই জেসমিন বললো,
” অপলা তুমি কিন্তু এই বাড়ির নতুন বউ। আজকে তুমি তোমার মনমতো কিছু একটা আমাদের জন্য রান্না করবে। ভয় নেই আমি আছি প্রিমা আছে। আমরা তোমাকে সাহায্য করবো।”
অপলা নির্ভয়ে মাথা নাড়লো।রান্নাটা সে বেশ ভালোই করতে পারে।
দীর্ঘসময় ব্যায়ের পর অপলা ভাত, মাংস ভুনা, মাছের চচ্চড়ি এবং শেষ পাতে খাওয়ার জন্য ডাল রাঁধল। দুপুরের খাবার হিসেবে সকলের পাতে তুলে দিতেই সকলে বেশ আয়েশ করে খেলো। প্রশংসাও করলো; ওরহান তো অপলাকে বকশিসও দিলো। একমাত্র উসামার মধ্যেই কোনো ভাবপ্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেল না। প্রিমা তাঁকে শেষ অবধি জিজ্ঞেস করেই বসলো যে,
” কেমন লাগলো তোমার নতুন বউয়ের হাতের রান্না?”
উসামা মুখ বাঁকা জবাব দিলো,
” এরচেয়ে লঙ্গরখানার পাতলা খিচুড়ি আরো বেশি মজা।”
সঙ্গেই সঙ্গে জেসমিন নিজের ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
” মাছ মাংস ছাড়া তো তোর খাওয়াই হয় না। তুই আবার লঙ্গরখানার পাতলা খিচুড়ি কবে খেলি?”
ওরহান একগাল হেসে মিছিমিছি বললো,
” তোমার যে আজকাল কী হয়েছে মা! তোমার মনে নেই? আমরা যে এমনি একদিন লঙ্গরখানার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় এক ভিক্ষুক মহিলা চার বছর বয়সী উসামাকে আমাদের কাছে মাত্র পঞ্চাশ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছিল। ওর মা তো লঙ্গরখানায়ই থাকতো। অভাবের তাড়নায় পড়ে উসামাকে বিক্রি করে দিয়েছিল। ছোটবেলায় ওখানে বড় হয়েছে তাই এখনও ওখানকার খাবারের স্বাদ ভুলতে পারেনি। তাই এখনও যত ভালো খাবার-দাবারই উসামা খা-ক না কেন লঙ্গরখানার ওই পাতলা খিচুড়ির কথা এখনও ও ভুলতে পারেনি। মায়ের স্মৃতি বলে কথা!
ওরহানের মিছে বানানো গল্প শুনে সকলে হা হা করে হেসে উঠলো। উসামা রাগে গটমট দৃষ্টিতে বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। এভাবে সকলের সামনে ইজ্জতের ফালুদা করার কী প্রয়োজন ছিল? উসামার বেগতিক দশা দেখে অপলা মিটিমিটি হাসলো। বেশ আচ্ছা ভাবেই শায়েস্তা হয়েছে ব’দটা! আরো লাগতে এসো পেছনে!
চলবে….