প্রণয় সমাচার পর্ব-১৮+১৯

0
31

#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ১৮

” বানাতে চেয়েছিলাম সোয়ামি। হয়ে গেল দুলাভাই একেই বলে কপাল!”

মমো দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে অপলার দিকে তাকালো। অপলা মমোর কথার তেমন গুরুত্ব দিলো না। মমো নিজেই অপলাকে ফের বললো,

” যাইহোক বলো আমার ক্রাশ কেমন আছে? যত্নআত্তি করো তো ঠিকমতো তুমি তাঁর? ”

অপলা মমোকে শাসনের স্বরে বললো,

” এখন আর এসব উল্টাপাল্টা নামে ডাকবি না”

মমো এক নিঃশ্বাসে উত্তর দিলো,

” তবে কী ডাকবো শুনি? বিয়ে হতে না হতেই এত মোহাব্বত! বাপরে! সোয়ামিকে পেয়ে বোনকে ভুলে গেলে?”

অপলা গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিলো,

” যা সম্পর্ক তাই ডাকবি। তবে, দুলাভাই বলতে পারিস। অথবা মার্জিত ভাবে যেকোনো নামে ডাকতে পারিস। কিন্তু, ওসব অদ্ভুত নামে ডাকাডাকি করা যাবে না। আর আমি কাউকেই ভুলিনি। তুই তোর জায়গায় উনি ওনার জায়গায়।”

অপলার কথাকে সামান্যতম গুরুত্ব না দিয়েই মমো তাঁকে বললো,

” যাকে আমার ভেবেছিলাম সেও আমার রইলো না। ড্যাং ড্যাং করে আমার বোনকে বিয়ে করে ফেললো।”

এরপর প্রচন্ড সিনেমাটিক ভাবে কপালে এক হাত দিয়ে গান গাওয়ার স্বরে বললো,

” হৃদয়ের বন্ধন, হৃদয়ের বন্ধন! সম্পর্ক বদলে গেল একটি পলকে!”

অপলা হতাশ হওয়ার ভঙ্গিতে মমোর দিকে তাকিয়ে রইলো। এই মেয়ের মাথায় কখন কী ভূত ঢোকে কে জানে!

” কীরে অপলা, কেমন আছিস মা? শশুর বাড়িতে এসে ফুপিকে ভুলে গেলি?”

অপলা ছুটে গিয়ে শায়েলাকে জড়িয়ে ধরলো। অভিমানী গলায় বললো,

” সকাল থেকে অপেক্ষা করে বসে ছিলাম। এখন তোমার আসার সময় হলো?”

শায়েলা অপলার কপালে গভীরভাবে চুমু খেলেন। বুকে বেশ খানিকটা সময় ধরে জড়িয়ে ধরে বসে রইলেন। অপলাও বিড়ালের ছানার মতো চুপটি করে বসে রইলো। শায়েলা বেশখানিকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর অপলাকে মমোর আড়ালে ফিসফিস করে বললেন,

” শোন একটা কথা বলে রাখি। নতুন নতুন বিয়ে হয়েছে এগুলো জানা দরকার তোর। উসামা অফিস থেকে ফেরার আগে একটু সেজেগুঁজে থাকবি। একটু আতর মাখবি; চুলগুলো ছেড়ে রাখবি। আর এসব কী বুড়ি মানুষের মতো ফুল হাতার ব্লাউজ পড়েছিস? হাফ হাতার ব্লাউজ পড়বি। আজকাল কী যেন বলে না? ওই যে ব্যাকলেস। আমার সঙ্গে দর্জির কাছে গিয়ে মাপ দিয়ে ওরকম ব্যাকলেস ব্লাউজ বানাতে দিবি। এমন মরা মানুষের মতো ফ্যাকাসে হয়ে মোটেও পড়ে থাকবি না। পুরুষ মানুষকে কাছে টানতে হলে রূপ যৌবনের যথাযথ ব্যবহার করবি।”

অপলা লজ্জায় তাঁর হাত দুটো দ্বারা মুখ আবৃত করে বললো,

” ছিহ! এসব কী বলছো তুমি? আমি পারবো না এতকিছু করতে। বাড়িতে ওরহান ভাই আছে। আমি ওসব ব্যাকলেস ট্যাকলেস পড়তে পারবো না। আমার বড্ড লজ্জা করে ”

শায়েলা অপলার লজ্জা পাওয়া দেখে হেসে বললো,

” সবার সামনে পড়বি কেন? বিবাহিত মেয়েদের রূপ, যৌবন সব নিজের স্বামীর জন্যই বরাদ্দ। স্বামীর সামনে কীসের লাজলজ্জা? তাঁর কাছে তো তুই উন্মুক্ত বইয়ের মতো। আর,ওরহান পরশু ওর বউ বাচ্চা নিয়ে চলে যাচ্ছে। এরপর বাড়িতে বাইরের পুরুষ বলতে কেউ থাকবে না তখন পড়বি।”

অপলা শায়েলার কথার আর কোনো জবাব দিলো না। তবে, মনে মনে উসামাকে খুব করে ভেঙালো। তাঁর বয়েই গেছে উসামার জন্য এত পরিশ্রম করার। ব্যাটা একটা আস্ত বজ্জা’তের ঘাটি!

শায়েলা জেসমিনের সঙ্গে বসে দীর্ঘক্ষন আলাপ সারলেন। আগে থেকেই তো বান্ধবীর মতো সম্পর্ক তাঁদের। উসামা আর অপলার খাতিরে সম্পর্কের গভীরতা আরো বেশ কয়েক ধাপ বেড়ে গেছে।

” কী অবস্থা আপেল?”

অপলা রাগান্বিত দৃষ্টিতে উসামার দিকে তাকালো। নামের বিকৃতিকরন তাঁর মোটেও পছন্দ নয়। কড়া গলায় বললো,

” এসব অদ্ভুত নামে আমাকে একদম ডাকবেন না। আমার নাম অপলা।”

উসামা অপলার কথা গায়ে মাখলো না। না শোনার ভান করে বললো,

” কী বললে? আমি না ঠিক শুনতে পাইনি। আবার বলো তো আপেল।”

অপলার মেজাজ বিগড়ে গেল। উসামার সামনে গিয়ে সে বললো,

” নিজেকে ঠিক কী ভাবেন আপনি? যা খুশি তাই বলবেন? আমাকে যে এত অদ্ভুত আর উল্টাপাল্টা নামে ডাকছেন। আপনি নিজে তা জানেন? এই ফর্সা গায়ের রং নিয়ে বুঝি এত দেমাক? আরে ফর্সা তো মূলাও হয়।আপেলের কেজি চারশো টাকা। আর মূলার কেজি চল্লিশ টাকা। শুধু এটাই হলো তফাত। ”

উসামা আড়চোখে অপলা দেখলো। অপলার ঝাঁঝ দেখে আর কিছু বলার সাহস পেলো না সে। তবে, এর প্রতিশোধ সে অন্যভাবে নেবে।

মেহউইশের অপলাকে বড্ড পছন্দ হয়েছে। সে অপলার পিছু ছাড়ছেই না।অপলাও তাঁকে বেশ আহ্লাদ করে । প্রিমা আর ওরহান বাইরে গেছে। পরশু ভোর ছয়টায় তাদেঁর ফ্লাইট। কিছু কেনাকাটা বাকি আছে বিধায় মেহউইশকে তাঁর দাদীর কাছে রেখে তাঁরা বাইরে গেছে। মেহউইশ একটু পরপর অপলার কোলে উঠে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। অপলা বেশ কয়েকবার আদর করে চুমু খেলো মেহউইশের ছোট্ট গালে। পুরো পরীর মতো দেখতে বাচ্চাটা। বড্ড আদুরে!

কাল রাতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো। অপলা কোলবালিশটা মাঝে রেখে ইন্ডিয়া পাকিস্তানের বর্ডার বানালো। যদিও উসামাকে দিয়ে বিন্দু পরিমাণ ভরসা নেই। সে যখন তখন বর্ডার ভেঙে ফেলতে পারে। ঘুমের ঘোরে তাঁর অবস্থা অত্যন্ত বেগতিক থাকে। অপলার গায়ে কাল বেশ কয়েকবার সে হাত পা তুলে দিয়েছিল। অপলার তো দম যায় যায় অবস্থা। কতবার যে শোয়া থেকে উঠে উসামাকে ঠিক করে শুইয়ে দিয়ে বর্ডার ঠিক করলো! কিন্তু, কোনো লাভ হয়নি তাতে। উসামা গড়াতে গড়াতে সেই মাঝে এসে পরেছে! অপলা যখন শোয়ার প্রস্তুতি হিসেবে বিছানা গুছিয়ে নিচ্ছিলো। তখনই দেখলো উসামা অর্ধ উলঙ্গ বেশে খালি গায়ে ওয়াশরুম থেকে বের হচ্ছে। অপলা ভয়ে ঢোক গিলে চোখ ফিরিয়ে নিলো। ভান করলো যেন সে কিছুই দেখেনি। নিজের কাজের দিকে পরিপূর্ণ মনোযোগ দিলো।
তবে, উসামা তাঁর মনোযোগ বারবার ভেঙে দিচ্ছিলো। ইচ্ছে করে যেন খালি গায়ে অপলার পাশেই বেশি ঘুরোঘুরি করছিল। অপলা শোচনীয় অবস্থা সামাল দিতে উসামাকে উদ্দেশ্য করে বললো,

” এভাবে জন্মদিনের পোশাক পড়ে অর্ধ উলঙ্গ হয়ে ঘুরছেন কেন? লাজলজ্জার কী মাথা খেয়েছেন নাকি?”

উসামা টাওয়াল দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বললো,

” কেন? তোমার হিংসে হচ্ছে বুঝি? এত হ্যান্ডসাম সুপুরুষ আগে দেখোনি নাকি?”

অপলা তাঁকে ব্যঙ্গ করে বললো,

” হ্যান্ডসাম না কচুপোড়া! দেখে মনে হচ্ছে একটা বাঁশের কঞ্চি টাওয়াল নিয়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে।”

উসামা অপলার ব্যঙ্গ উক্তি গায়ে মাখলো না। উল্টো তাঁকে খেপানোর জন্য বললো,

” তুমি চাইলে চেক করে টাচ করে দেখতো পারো এই বাঁশের কঞ্চিকে। আমি কোনো মাইন্ড করবো না।

এরপর হাত থেকে ভেজা টাওয়ালটা বিছানায় ঝেড়ে ফেলে দিয়ে ফের বললো,

” যারা যারা টাচ মি; টাচ মি, টাচ মি। যারা যারা কিস মি ;কিস মি, কিস মি। যারা যারা হোল্ড মি; হোল্ড মি, হোল্ড মি।”

মোনালি ঠাকুরের এই অদ্ভুত গান গেয়েও সে তৃপ্ত হলো না। নিজের চোখ টিপে, চুমুর ভঙ্গিতে অপলার দিকে তাকিয়ে কেমন অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করতে লাগলো। অপলা উসামার কান্ডে বিব্রতবোধ করলো। মৃদু স্বরে চিৎকার করে বললো,

” আস্তাগফিরুল্লাহ! এমন অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির মানে কী? আপনার মাথাটা কী গেছে নাকি?”

উসামার অঙ্গভঙ্গির কোনো পরিবর্তন ঘটলো না। আজ সে শপথ করছে অপলাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার। অপলা আবার বললো,

” আপনার মাথাটা আসলেই গেছে। ভালো ডক্টর দেখান। অশ্লীল মানুষ! নষ্ট পুরুষ! ”

উসামা তবুও থামলো না। সে আরো এক ধাপ ওপরে উঠে গেল। অপলাকে ফের উত্ত্যক্ত করার জন্য বললো,

” যৌবন আমার লাল টমেটো! হায়রে যৌবন আমার লাল টমেটো! ”

চলবে….

#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ১৯

‎”সকালে উঠে হাসবেন্ডের জামাকাপড় একটু প্রেস করে রাখলেও তো পারো।”

‎অপলা পাশ ফিরে উসামাকে দেখলো। নিজের জামাকাপড় প্রেস করছে সে। চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ। অপলা চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললো,

‎” যাঁর অফিস আছে তাঁর কোনো আক্কেল জ্ঞান নেই? নিজের ড্রেস নিজে প্রেস করবেন। আপনি কোনো বাচ্চা না। যে সবকিছু হাতে ধরে ধরে করে দিতে হবে।”

‎উসামা কোনো জবাব দিলো না। শার্ট প্রেস করা শেষে চেঞ্জ করে নিলো। জেসমিন আর প্রিমা টেবিলে নাস্তা সাজাচ্ছে। অপলা নিজেই এসব করতে চেয়েছিল। প্রিমা-ই তো তাঁকে বাঁধা দিয়ে বললো,

‎” আজকে আমাদের সবার একসঙ্গে বসে শেষ নাস্তা করা। কালকে তো ভোরে চলে যাবো। আবার কবে না কবে দেশে আসি। মেহউইশটা খুব ছোট; ওকে নিয়ে এত জার্নি করতে পারি না। বাচ্চাটা অসুস্থ হয়ে যায়। তাই, আজ আমাকেই এসব করতে দাও। আমি চলে যাওয়ার পর তোমার সংসারের কাজ তুমি করো।”

‎অপলা জবাবে কিছু বলেনি। এত করে যখন বলছে তখন কী আর না করা যায়?

‎ জেসমিন আর ওরহান ব্যাংকের কাজে একটু বাইরে গেছে। মেহউইশ নিজের খেলনা নিয়ে খেলছে। প্রিমা রান্নাঘরে দুপুরের খাবার রান্না করছে। উসামা শার্টের হাতা গুটিয়ে বললো,

‎” আমি অফিসে যাচ্ছি ;গেটটা একটু লাগিয়ে দিয়ে যাও।”

‎অপলা কোনো জবাব দিলো। মেহউইশকে কোল থেকে নামিয়ে গেট লাগাতে যেতেই; উসামা হুট করে গেটটা ধাক্কা দিয়ে পুনরায় ভেতরে প্রবেশ করলো। অপলা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এতটাই চমকে গেল যে সে চিৎকার দিতে চাইলো। উসামা পরিস্থিতি সামাল দিতে অপলার মুখ এক হাত দিয়ে ধরলো। আরেক হাত দিয়ে অপলার দু’হাত ধরে রাখলো। অপলা চোখ বড় বড় করে উসামার দিকে তাকিয়ে রইলো। উসামা অপলার গালে এক গভীর চুম্বন করে বসলো। অপলা কিছু বলার আগেই অপলাকে বাঁধনছিন্ন করে দ্রুত গতিতে নিচে নেমে গেল। অপলা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কী হলো এটা তাঁর সঙ্গে?

‎শায়েলা মমোকে পাঠালেন অপলাকে ডাকতে। মমো এসে অপলাকে বললো,

‎” আপু, আম্মু তোমাকে একবার ওপরে যেতে বলেছে।”

‎অপলা মেহউইশ কোলে নিয়ে মমোর সঙ্গে ওপরে গেল। শায়েলা অপলাকে দেখে নিজের পার্সটা বের করে বললেন,

‎” আমার সঙ্গে একটু বাইরে চল তো অপলা। জরুরি দরকার আছে।”

‎অপলা মেহউইশকে কোলে নিয়ে সোফায় বসে বললো,

‎” কোথায় যাবে ফুপি?”

‎শায়েলা মেহউইশ অপলার কোল থেকে তুলে মমোর কোলে দিয়ে বললেন,

‎” ওই টেইলরের কাছে। তোর জন্য ব্লাউজ বানাতে দেবো বলেছিলাম না?”

‎টেইলরের কাছে যাওয়ার কথা শুনেই অপলা বেঁকে বসলো। সে মোটেও ওরকম ব্যাকলেস ব্লাউজ পড়তে পারবে না উসামার সামনে। ব্যাটা এমনিই ব’দের হাড্ডি! একটু আগেই যা বিভৎস কান্ড সে করে বসলো! অপলা উত্তেজিত গলায় বললো,

‎” আমার অনেক কাজ আছে ফুপি। আরেকদিন যাবো আজকে থাক।”

‎শায়েলা ত্বরিত অপলার হাত ধরে বললেন,

‎” তো? টেইলরের দোকান এই সামনেই। পাঁচ যোগ পাঁচ দশ মিনিট সময় লাগবে। দশ মিনিট সময় নষ্ট হলে তোর তেমন কোনো অসুবিধা হবে না।”

‎অপলা আরো নানারূপ বাহানা দিলো। তবে, এতে কোনো লাভ হলো না। শায়েলা ঠিকই ধরে বেঁধে ঠিকই অপলাকে নিয়ে গেল। অপলা ইনিয়ে বিনিয়ে বারবার বললো তাঁর ওসব ব্লাউজের দরকার নেই। শায়েলা অপলার মিনতিপূর্ণ বাক্যে কোনো কান দিলো না। সে নিজের সিদ্ধান্ততেই অটল রইলো।

‎হঠাৎ করে কলিংবেলের আওয়াজ পেয়ে অপলা ছুটে এলো। গেট খুলতেই এক অপরিচিত ব্যাক্তি তাঁর হাতে একটা কার্ড তুলে দিলো। প্রিমা লোকটার সঙ্গে কথা অনেকক্ষন কথা বললেও অপলা চিনতে না পায় তেমন কথা বললো না। অপলা কার্ডটা খুলে দেখলো এটা একটা বিয়ের কার্ড। প্রিমাকে শুধাতেই সে বললো,

‎” তুমি জানো কিনা জানি না। তবে, তোমার পূর্বে উসামার একটা মেয়ের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েছিল। মেয়েটার নাম অপলা; উসামারই কাজিন। এরমধ্যে কোনো ঘটনাই ঘটে গেছে। উসামার অনিচ্ছার কারণে সম্পর্কটাও আর বিয়ে অবধি এগোয়নি। কমলারই বিয়ের কার্ড এটা।”


‎অপলার আর কিছু বুঝতে বাকি রইলো না। পূর্ব হতেই সে সব জানে। তবুও কৌতুহল দমাতে না পেরে সে বিয়ের কার্ডটা খুলে ফেললো। কমলার বিয়ের কার্ড এটা। বরের নামের জায়গায় লিখা রোদ্দুর। অপলা বিস্মিত হলো। আজকাল রোদ্দুর নামটা বেশ কমন হয়ে গেছে।

উসামা বাইরে থেকে এসেই হাত পা এলিয়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পরলো। ভেজা তোয়ালে বিছানার ওপরে দেখে অপলার মেজাজ বিগড়ে গেল। কাঠখোট্টা গলায় সে বললো,

” ভেজা তোয়ালে আবার আপনি বিছানার ওপরে রেখেছেন কেন?”

উসামা কোনো জবাব দিলো না। অপলাকে হাত ধরে টেনে বিছানায় ফেলে দিয়ে বললো,

” কেমন মেয়ে তুমি? বর অফিস থেকে এসেছে। কোথায় একটু আদর সোহাগ করবে। তা না করে ঝগরুটে মেয়ের মতো পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করছো। কাছে এসে একটু আদর ভালোবাসাও তো দিতে পারো।”

অপলা তেতে উঠে বললো,

” আপনার মুখে লাগাম দিন। লাজলজ্জা তো আপনার কিছুই নেই। সকালে ওরকম অদ্ভুত আচরণ করলেন কেন? আপনি একটা চরিত্রহীন! ”

উসামা অপলার আরো কাছে এসে বললো,

” তুমি আমাকে যতটা চরিত্রহীন ভাবো। আমি এরচেয়েও এক ধাপ ওপরে আছি। আজকে হয়তো আমাকে চরিত্রহীন মনে হচ্ছে তোমার। একদিন তুমি-ই আমাকে কাছে টেনে নেবে। তবে, আমি কথা দিচ্ছি সেদিন আমি কোনো বাঁধা দেবো না।”

অপলা বিরক্তি নিয়ে উসামার দিকে তাকালো। তাঁর বয়েই গেছে এই বজ্জা’তটার কাছে যাওয়ার।
উসামা অকস্মাৎ এসির পাওয়ার আরো বাড়িয়ে দিলো তাঁর বড্ড গরম লাগছে৷ অপরদিকে অপলার শীত লাগছে। সে কাঁপতে কাঁপতে বললো,

” এসি এত বাড়িয়ে দিয়েছেন কেন? আপনার কীসের এত গরম?”

উসামা হেয়ালি করে জবাব দিলো,

” আমি এমনিতেই অনেক হট। তাই, আমার গরম একটু বেশিই লাগে। বেশি ঠান্ডা লাগলে কাছে এসো। ঠান্ডার রেশ কাটিয়ে দিচ্ছি। ”

অপলা উসামার কথার মানে বুঝতে পেরে বললো,

” ইয়া মাবুদ তুলে নাও আমাকে!”

উসামা জোরে শব্দ করে বললো,

” সুম্মা আমিন।”

অপলা রাগী দৃষ্টিতে উসামার দিকে তাকিয়ে রইলো।

খাওয়ার টেবিলে বসে জেসমিন কমলার বিয়ের প্রসঙ্গটা নিয়ে কথা তুলতেই অপলা চুপ হয়ে গেল। কমলার বিষয়টা নিয়ে অনেকটা সময় কথা বলার পর জেসমিন অপলাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

” তুমি এতে মন খারাপ করো না মা। কমলার সঙ্গে উসামা বিয়ে ভেঙে দেওয়ায় আমার প্রচন্ড আফসোস হয়েছিল। তবে, সেই দুঃখ আমার এখন আর নেই। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। উসামার ভাগ্যে তুমি ছিলে। আল্লাহ তোমার সঙ্গেই ওর জোড়া বানিয়েছেন।”

অপলা মৌন হয়ে বসে রইলো। খাওয়া দাওয়া শেষে উসামার রুমে আসতেই অপলা বলল,

” কী অবস্থা আপনার? আপনার না হওয়ায় বউয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। আপনার অনুভূতি কী?”

উসামা টিস্যু দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললো,

” ওকে আমি বোনের চোখে দেখি।”

অপলা ফের প্রশ্ন করলো,

” তাই নাকি? ছোটবেলা থেকে বিয়ে ঠিক হয়ে ছিল। তবুও বোনের চোখে দেখতেন? ব্যাপারটা কেমন হয়ে গেল না?”

উসামা অপলার সামনে এসে বললো,

” হ্যাঁ, যদিও বিয়ে ভাঙার সবচেয়ে বড় কারণ এটা ছিল না। কমলা একজনকে ভালোবাসে। পরিবারের প্রেসারে বলতে পারছিল না। আমি বিষয়টা জানতাম। তাই, আমি নিজেই বিয়েটা ভেঙে দিয়েছি। সবচেয়ে ভালো বিষয় ওর পছন্দের মানুষের সঙ্গেই এখন ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে। আমি যদিও এটা নিয়ে খুব হ্যাপি।”

অপলা সবটা শুনে বললো,

” যাই বলুন না কেন। আপনাদের কিন্তু মানাতো ভালো। আর নামেরও বলিহারি! আর ভালো নাম খুঁজে পাননি আপনারা? এত সুন্দর একটা মেয়ের কেমন একটা নাম। কমলা! মা যখন ফুপির কাছে গিয়ে গল্প করতেন। আমার এত হাসি পেতো! উসামার বউ কমলা! হাহা!”

উসামা উদাস হওয়ার ভান করে বললো,

” আমার কপাল যে এখনও খুলেছে তাও কিন্তু নয়। আগে সবাই বলতো উসামার বউ কমলা। এখন বলবে উসামার বউ আপেল। আমার মনে হয় আমাকে আল্লাহ ভুল করে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার বানিয়ে ফেলেছেন। আমার আসলে ফলওয়ালা হওয়ার কথা ছিল। আপেল, কমলা, বেদানা, পেয়ারা সব আমার কপালেই এসে জুটেছে! বাট, এনিওয়ে আই লাভ আপেল।”

চলবে…