#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ২০
সেদিন ভোরে সকলের মন প্রচন্ড খারাপ। ওরহান, প্রিমা আর মেহউইশ চলে যাচ্ছে। অপলারও বেশ খারাপ লাগলো। এই বাড়িতে তাঁর আসার পর ওদের সঙ্গে; অপলার বেশ ভালো একটা সময় কেটেছিল। জেসমিন অনেকক্ষন মেহউইশকে কোলে নিয়ে কাঁদলেন। অপলাও খানিকক্ষণ মেহউইশকে কোলে নিয়ে বসেছিল। উসামা ওরহান প্রিমাদেরকে পৌঁছে দিতে এয়ারপোর্টে গেল। জেসমিনেরও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, তাঁর শরীরটা বেশ খারাপ থাকায় ওরহান নিষেধ করলো। বললো ঘরে বসে ওদের জন্য দোয়া করতে। উসামা ওরহান বেড়িয়ে যেতেই অপলা দরজা লাগিয়ে; দিয়ে ঘরে ঢুকতেই তাঁর খুব খালি খালি মনে হলো সবকিছু। এই বাড়িতে আসার পর থেকে ওরহান প্রিমা এবং মেহউইশকে দেখে অভ্যস্থ সে। হঠাৎ তাঁদের প্রস্থান অপলার মনে দাগ কেটেছে।
জেসমিন সকাল থেকেই মুখ গোমড়া করে বসে আছেন। অপলা শায়েলা অনেককিছু বলে কয়েও তাঁর খারাপ লাগা দূর করতে পারেননি। উসামা এয়ারপোর্টের কাজ শেষ করে ওখান থেকেই অফিসে চলে গিয়েছে। তাই, বিকাল অবধি বাড়িতে কেমন একটা ছমছমে পরিবেশ। একেবারে নিরিবিলি সবকিছু। দুপুরে খাওয়ার পর অপলা কখন যে ঘুমিয়ে পরলো। তা সে টেরও পেল না।
শরীরে আঁটসাঁট অনুভব হতেই অপলা জেগে উঠলো। চোখ মেলতেই বিস্মিত হলো। উসামা তাঁকে পেছন থেকে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে; পা মেলে দিয়ে এলোমেলো ভাবে গভীর নিদ্রায় নিদ্রিত রয়েছে। অপলার ইচ্ছে হলো ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে। কিন্তু, এমন অমানবিক কাজ করতে সে পারলো না। নিরবে উসামার হাত দুটো ছাড়িয়ে দিয়ে সরে গেল শুধু।কখন যে চোখ লেগে এসেছিল অপলা টেরই পায়নি। ঘুমটাও বড্ড দেরিতে ভাঙলো; ইতিমধ্যে সন্ধ্যাও হয়ে গিয়েছে ঘর থেকে বের হতেই দেখলো জেসমিন বসে চা খাচ্ছে। অপলাকে দেখা মাত্রই সে বললো,
” অপলা তোমার জন্যও চা বানিয়ে রেখেছি। তুমি খেয়ো; উসামা উঠলে ওকে ও দিয়ো। আর শোনো আমার শরীরটা আজ ভালো লাগছে না। রাতের রান্নাটা আজ তুমি করো।”
অপলা সায় দিয়ে নিজেও চায়ের কাপ নিয়ে জেসমিনের সঙ্গে বসলো। চা খেতে খেতে জেসমিনের সঙ্গে অনেকক্ষন গল্পও করলো। অপলার নিজেকে ভাগ্যবতী বলে মনে হয়। ক্লাসে বান্ধবীদের কাছে সে অনেক শুনেছে বিয়ের পর শাশুড়ীরা শুধু যন্ত্রণা দেয়। কিন্তু, জেসমিন অপলার সঙ্গে এখনো অবধি সেরকম কিছু করেনি। অপলাকে বাড়ির বউ হিসেবে সম্মান দিয়ে এসেছে। যদিও এই বিয়েটাকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলেই মানে অপলা। তবুও জেসমিন সবকিছু খুব স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছে।
রাতে রান্নার সময় পিঠে সুরসুরি অনুভূত হলো অপলার। মনের ভুল ভেবে বিষয়টা এড়িয়ে যেতে চাইলেও তা হলো না। কানের সামনে গরম নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ পেতেই অপলা চমকে উঠলো। পিছু ফিরতেই উসামার সঙ্গে ধাক্কা খেলো। রান্নাঘরে কাজের সময়ে উসামার এরূপ আচরন অপলার কাছে অশোভনীয় মনে হলো। তবুও শান্ত গলায় বললো,
” আপনি এখানে কী করছেন?”
উসামা তৎক্ষনাৎ বললো,
” আমি তো একটা বাটি নিতে এসেছিলাম। ফ্রিজে পুডিং আছে ওটা খাওয়ার জন্য।”
অপলা রান্নার দিকে মনোযোগ দিয়ে খুন্তি নাড়াতে নাড়াতে বললো,
” আপনার কাজ শেষ হলে তাড়াতাড়ি কেটে পড়ুন। কাজের সময় ঘাড়ের সামনে কেউ এসে বসে থাকলে আমার অসহ্য লাগে।”
উসামা সহজ কথায় গলে যাওয়ার মতো মানুষ নয়। ত্বরিত অপলাকে কিচেন কেবিনেটের সঙ্গে চেপে ধরলো। অপলা কোনো কিছু বলার আগেই অতি চমকপ্রদ এক ঘটনা ঘটে গেল তাঁর সঙ্গে। উসামা অপলার অধর যুগলে মত্ত হলো। অপলা হাত দিয়ে উসামার বুকে বাড়ি; দিয়েও তাঁকে সরাতে পারলো না নিজের কাছ থেকে। বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর ;কাশির শব্দ পেয়ে উসামার ঘোর কাটলো। উসামা আড়চোখে জেসমিনকে দরজার সামনে দাঁড়াতে দেখেই তাড়াতাড়ি অপলার নিকট হতে সরে গেল। হাঁপাতে হাঁপাতে জেসমিনকে বললো,
” আসলে আমি একটা বাটি নিতে এসেছিলাম।”
বাটি নিয়ে উসামা দ্রুত সরে গেল। অপলা এই অবস্থায় তীব্রতর বিব্রতবোধ করলো। জেসমিনকে দেখামাত্র সেও রান্নার দিকে মনোযোগ দিলো। জেসমিন অবশ্য এমন ভান করলেন যেন সে কিছুই দেখেনি। কিন্তু, ভেতরে ভেতরে ঠিকই মুচকি হাসলেন।
রান্না শেষ হতেই অপলা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ঘরে গেল। উসামা কড়া গলায় কিছু বলার পূর্বেই উসামা নিজে অপলাকে বললো,
” তোমার যদি এতই রোমান্স করার ইচ্ছে হয় তাহলে রুমে আসলেই তো হয়। রান্নাঘরে এসব শুরু করার মানে কী অপলা? বেডরুম থাকতে কিচেনে? ছিহ! আমি তোমার হাসবেন্ড। ভালোবেসে দু’একটা চুমু খেতেই পারো। কিন্তু, সিচুয়েশনটা তো বুঝতে হবে নাকি? দেখলে আজ তোমার জন্য একটু হলেই মায়ের সামনে পড়ে যাচ্ছিলাম। ”
অপলা দ্বিগুণ পরিমানে ফায়ার হলো। তাঁর ইচ্ছে হলো আগুন দিয়ে উসামাকে ভস্ম করে দেওয়ার। একে তো দোষ নিজে করেছে। তারপর আবার অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছে! অপলা ক্রোধান্বিত গলায় বললো,
” আপনার মতো মানুষের কাছে যেতে আমার বয়েই গেছে। আর কী বললেন আপনি মাত্র? আমি আপনার কাছে আগ বাড়িয়ে গিয়ে ওসব করেছি? আপনি আমার কাছে এসেছিলেন। আমি তো রান্না করছিলাম। নিজে দোষ করে সেটার ভার আমার কাঁধে ঠেলে দিচ্ছেন। শেইমলেস! বিন্দুমাত্র লজ্জাশরম নেই আপনার মধ্যে? মা আরেকটু হলে কী ভাবতো আমাকে? আর এভাবে হুটহাট যদি আমার কাছে এসেছেন। গরম খুন্তি আপনার গালে লাগিয়ে দেবো। এরপর আপনার কমলার কাছে যাবেন। সুন্দর করে মলম লাগিয়ে দেবে।”
উসামা এক দৃষ্টিতে অপলার দিকে তাকিয়ে রইলো। অপলা সেই দৃষ্টির মানে বুঝলো না। অসন্তুষ্ট হয়ে রুমের বাইরে চলে গেল।
খাওয়ার টেবিলে অপলার দিকে তাকিয়ে জেসমিন মিটমিট করে হাসছিলেন। অপলা জেসমিনের হাসিটাকে লক্ষ্য করা মাত্রই মৃদু অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করলো। জেসমিন নিশ্চয়ই অপলাকে খারাপ কিছু ভেবেছে!
” আমার নীল শার্টটা কোথায়?”
উসামার প্রশ্নে অপলা তাঁর দিকে ফিরে তাকালো। রুদ্ধ গলায় বললো,
” আপনার শার্ট কোথায় আমি কীভাবে জানবো? আপনার নীল কালার কোনো শার্ট আছে কিনা সেটাই তো আমি জানি না।”
উসামা অপলার প্রশ্নে বিচলিত হলো। খুঁজতে খুঁজতে শেষ অবধি আলমারির এক অদ্ভুত জায়গায় পাওয়া গেল। উসামা শার্টটা অপলার সামনে মেলে ধরে বললো,
” এই শার্টটা আমি কোথায় পেলাম জানো? আলমারিতে তুমি যেখানে কাপড় রাখো সেখানে। বিয়ে করলে এই এক ঝামেলা। বউকে জীবনের ভাগ দেওয়ার পাশাপাশি আলমারির ভাগও দিতে হয়। অসহ্য ব্যাপার স্যাপার! আমার গুছিয়ে রাখা সুন্দর আলমারিটাতে এখন একটা মেয়ের জামাকাপড় উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। ভাবতেই আমার কান্না পায়!”
উসামা এরপর একটা ড্রামাটিক সিচুয়েশন তৈরি করলো। অপলার মেজাজ শুরু থেকেই তুঙ্গে। কাঠখোট্টা গলায় সে বললো,
” আলমারিতে এত শার্ট পড়ে থাকতে এখন এই শার্ট নিয়ে পরে আছেন কেন? জামাকাপড়ের খুব অভাব বুঝি? আমার আলমারির তাকে আপনার যা কাপড় আছে। সব আমি পরে ভাজঁ করে আপনাকে দিয়ে দেবো।”
উসামা জবাব দিলো,
” শার্ট আমার অনেক আছে; তবে এই শার্টটা আমার খুব পছন্দের। আসলে স্পেশাল মানুষের উপহার দেওয়া তো তাই, এটার প্রতি আলাদা একটা মায়া কাজ করে আমার।
অপলা শার্টটার দিকে তাকালো। এরপর প্রশ্ন করলো,
” স্পেশাল মানুষ? কে দিয়েছে এটা আপনাকে?”
উসামা হেঁয়ালি করে উত্তর দিলো,
” ওটা আমার একান্তই ব্যাক্তিগত মানুষ। তুমি তাঁকে চিনবে না।”
অপলা ফের বললো,
” আপনার ভনিতা রাখুন। কে দিয়েছে এটা আপনাকে?”
উসামা লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতে বললো,
” রূপা।”
অপলা সন্দেহের সৃষ্টিতে উসামার দিকে তাকিয়ে বললো,
” রূপা কে?”
উসামা অতি এক্সাইটেড হওয়ার ভান করে বললো,
” আমার কলিগ। যদিও সাধারণ কলিগদের মতো সম্পর্ক আমাদের একদমই নয়। ”
অপলা বললো,
” মানে?”
উসামা বিছানায় বসে বললো,
” দেখো মেইন কথায় আসতে চাই। তুমি তো আগেই জানতে তোমার সঙ্গে আমার বিয়েটা একেবারে অনাকাঙ্ক্ষিত। আমিও চাপে পড়ে বিয়ে করেছি আর তুমিও। আমাদের মধ্যে আর পাচঁটা সাধারণ স্বামী স্ত্রীর মতো সম্পর্ক নেই সেটা তুমিও বেশ ভালো করেই জানো। তোমাকে একটা মিথ্যা বলেছি। কমলার সঙ্গে বিয়ে ভাঙার মূল কারণ কমলার বয়ফ্রেন্ড নয়। আমি আমার কলিগ রূপার সঙ্গে একটা সম্পর্কে আছি। ভেবেছিলাম কমলার সঙ্গে বিয়ে ভাঙার পরপরই রূপাদের পরিবারে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাবো। কিন্তু, বলির পাঠা হয়েছি আমি। পারিবারিক চাপে তোমাকে বিয়ে করলেও আমি রূপাকে ভুলতে পারছি না। কোনোদিন সম্ভবও না রূপাকে ভোলা। তাই, তোমার সঙ্গে একটা সমঝোতায় আসতে চাই। এই বিয়ের বাঁধন থেকে তুমি পুরোপুরি মুক্ত। সবার সামনে আমরা প্রিটেন্ড করবো আমরা খুব সুখে আছি। কিন্তু, আমরা একে অপরের মতো থাকবো। তুমি যা ইচ্ছে করো না কেন আমি কোনো বাঁধা দেবো না। আর আমার ক্ষেত্রেও সেম। আমি রূপাকে নিয়ে সুখে থাকতে চাই। আমাদের সম্পর্কটা আমার কাছে বোঝা মনে হয়। জোর করে মেনে নিতে চেষ্টাও করেছি। কিন্তু, রূপাকে ভুলতেই পারছি না।”
অপলার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। গলাটা কেমন ধরে এলো। উসামার কথায় সে কোনো প্রতুত্তর করলো না। উসামাও অপলার জবাবের অপেক্ষায় না থেকে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পরলো। নীল শার্টটা প্রেস করে হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রেখে অপলাকে বললো,
” কালকে রূপার জন্মদিন। অফিসের সবাই মিলে রূপার জন্য সারপ্রাইজ প্ল্যান করেছি। ভেবেছি এই শার্টটাই পড়ে যাবো।রূপা খুব পছন্দ করে কিনেছে।”
অপলা আড়ালে গিয়ে চোখ মুছলো। এই বিয়ের প্রতি সেও উদাসীন। তবুও উসামার মুখে রূপার কথা শুনে এত কষ্ট কেন হচ্ছে তাঁর?
রাতে শোয়ার বন্দবস্ত হতেই উসামা নিজের নির্ধারিত স্থানে গিয়ে শুয়ে পরলো। অপলা ড্রয়িংরুম থেকে পাটি নিয়ে এসে মেঝেতে;বিছিয়ে বিছানা থেকে বালিশ নিয়ে নিচেই শুয়ে পরলো। উসামা হতবাক হলো অপলার কান্ডে। অপলাকে একবারও জিজ্ঞেসও করলো। অপলার সোজাসাপ্টা জবাব দিলো,
” আপনি ঘুমের ঘোরে বড্ড হাত, পা ছোঁড়েন। আমার কষ্ট হয় আপনার সঙ্গে শুঁতে।”
উসামা আর কথা বাড়ালো না। বিনাবাক্যে বিছানায় শুয়ে পরলো। অফিসের ক্লান্তি ও ধকলের কারণে নিমিষেই ঘুমের তলদেশে তলিয়ে গেল। অপলার দু’চোখে সারারাত নিদ্রা ধরা দিলো না। কেমন একটা হাঁসফাঁস করতে করতে সারারাত সে এপিঠ ওপিঠ করলো। তাঁর মন এত অস্থিরতায় ছেঁয়ে গেল কেন?
চলবে….