প্রণয় সমাচার পর্ব-২৩+২৪

0
25

#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ২৩

মাঝরাতে দমকা বাতাস বয়ে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। হালকা ঠান্ডাও পড়েছে। অপলা উসামার বিপরীত দিকে ঘুরে কাঁথার নিচে জুবুথুবু হয়ে ঘুমোচ্ছে। উসামা অকস্মাৎ অপলার ঘাড়ের নিচে পিঠ বরাবর প্রগাঢ় চুমু খেলো। উসামার চাপ দাঁড়িগুলোর খোঁচা খেয়ে অপলা নড়েচড়ে উঠলো। উসামা আলতোভাবে অপলাকে জড়িয়ে ধরলো। অপলার নিদ্রাভঙ্গ হলো। পাশ ফিরে অপলা অতি অপ্রসন্ন ভঙ্গিতে উসামার দিকে তাকালো। ঘুমু ঘুমু গলায় বললো,

” সারারাত আমাকে জ্বালিয়ে মে’রেছেন। এখন যদি একটুও বিরক্ত করেন তো ল্যাং মেরে বিছানা থেকে ফেলে দেবো।”

উসামা কোনো প্রতিত্তর না দিলেও সে বসে থাকার মতো লোক নয়। ফোনটা বের করে অপলা শুনিয়ে শুনিয়ে বললো,

” স্যার সরি আমি আজকে অফিসে আসতে পারবো না। সারারাত বউয়ের সঙ্গে রোমান্স করে আমি অনেক ক্লান্ত। আই নিড টু রেস্ট”

অপলা শোয়া থেকে উঠে বসে দ্রুত উসামার মুখ চেপে ধরলো। উসামা ফোনটা হাত থেকে ফেলে দিতেই অপলা বললো,

” আপনার মধ্যে কী নিম্নতম লজ্জাবোধ টুকু নেই? লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে বসে আছেন? এসব প্রাইভেট বিষয় বসকে কেউ বলে? ছি ছি ছি! ”

উসামা কপটগলায় মৃদু কপটতা রেখে বললো,

” এত লাজলজ্জা মেনে চললে আমার আর আব্বা ডাক শোনা হবে না। আর নিজেকে খুব সুশীলা নারী মনে হয় নাকি তোমার? কালকে রাতে ওভাবে আমার মতো অবলা পুরুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে তোমার বিবেকে বাঁধলো না? এভাবে একজন পুরুষের সুযোগ নিতে তুমি কীভাবে পারলে অপলা? আমি এখন সমাজের কাছে কীভাবে নিজের মুখ দেখাবো? আমাদের ছেলেদের-কে কিছু হলেই তোমরা মেয়েরা বলো কাপুরষ। তুমি নিজে কা-মহিলার মতো একটা কাজ কীভাবে করতে পারলে? এভাবে আমার বস্ত্রহরণ করলে? তোমার ঘরে বাপ ভাই নেই অপলা? তোমার ওপরে আমি শ্লীলতাহানির কেস করবো।”

অপলা বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। বিছানার সাইডের ছোট্ট টেবিলে রাখা কাঁচের ফুলের টবটা নিয়ে; উসামার গলার দিকে ইশারা করে বললো,

” একদম ভন্ডামি করবি না। ভন্ড এর ঘরের ভন্ড! কালকে রাতের শোধ তোর ওপরে আমি পাই টু পাই নেবো।”

উসামা অপলার এরূপ আচরন সহ্য করতে পারলো না। খালি গায়ে নিজের অর্ধনগ্ন দেহটাকে অপলার সামনে তুলে ধরে বললো,

” আমি ভন্ড হলে তুমি কী? নিজে যেন কত ভদ্র। তোমায় দেখলে মনে হয় ভাজা মাছখানি উল্টে খেতে জানো না। ভেতরে ভেতরে যে কাটা শুদ্ধ মাছ; পেটের ভেতরে চালান করে বসে আছো! এই দেখো কাল রাতে জংলি বিড়ালের মতো আমাকে খামচে কামড়ে আমার কী হাল করেছো। আবার আমাকে বলে ভন্ড!”

অপলা ফের তেড়ে গিয়ে বললো,

” সকাল সকাল হাঁসের বাচ্চার মতো প্যা প্যা প্যা করবেন না। বেশি কথা বললে চ্যালাকাঠ দিয়ে মে’রে অজ্ঞান করে ফেলে রাখবো।”

উসামা চুপ করে গেল। তাঁর বউ রেগে গেলে বাঘিনী হয়ে যায়। তাই চুপ করে বসে রইলো। মহারানীর কাল রাতের ক্ষোভ এখনো কাটেনি।

নাশতার টেবিলে বসে জেসমিন আড়চোখে কয়েকবার উসামাকে দেখলেন। শেষমেশ বলেই ফেললেন,

” উসামা বাবা তোর গলায় ঘাড়ে এত দাগ কীসের? পুরো লাল হয়ে ছড়িয়ে আছে।”

অপলা বিষম খেলো। উসামা আমতা আমতা করে বললো,

” ওই যে মশা কামড় দিয়েছে। রাতে বৃষ্টি হয়েছিল না? জানালা দরজা খুলে রেখেছিলাম ঠান্ডা হাওয়ার জন্য। বজ্জা’ত মশা এসে কামড়ে লাল করে ফেলেছে।”

জেসমিনের মন মানলো না। উসামার কথায় সে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারলো না। কেমন খুঁটিয়ে নাটিয়ে উসামাকে দেখলো। তবে, পরোক্ষনেই উসামা অপলার ইশারা ইঙ্গিত ভাব ভঙ্গি; প্রকাশের ধরন দেখেই সবটা বুঝে গেলেন। মনে মনে খানিকটা সময় হেসে নিলেন।

অপলা শাড়ির আঁচল কোমড়ে গুঁজে উসামার নিকট এসে বিদ্বিষ্ট কন্ঠে বললো,

” অফিসে যাচ্ছেন না কেন? ”

উসামা প্রতিবাক্যে বললো,

” তুমি আমার পুরো শরীরে দাঁত দিয়ে ঠোঁট দিয়ে যে নকশা এঁকেছো! সেটা নিয়ে বাইরে গেলে আমাকে বুলিং এর শিকার হতে হবে। সো আজ নো অফিস! ”

অপলা উসামার দিকে আঙুল তাক করে বললো,

” একদম উল্টাপাল্টা কথা বলবেন না। যা জিজ্ঞেস করেছি তাই বলুন।”

উসামা ভনিতা ছেড়ে বললো,

” প্রজেক্টের কাজে কাল অনেক খাটুনি গেছে। বস আজ আমাদের ছুটি দিয়েছে।”

অপলা চোখ পিটপিট করে উসামাকে দেখলো। ফের রান্নাঘরে চলে গেল। উসামা বাড়িতে আছে শুনে জেসমিন; উসামার পছন্দের খাবার বিরিয়ানি রাঁধতে বললেন। অপলা রান্নার কাজে মনোযোগ দিলো। জেসমিন সব কেটে বেছে দিয়ে অপলাকে বাকি কাজ সারতে বললেন। অপলা চুলায় হাঁড়ি বসাতেই উসামা এসে তাঁর ঘাড়ে মুখ ডোবালো। অপলা কেঁপে উঠলো। এই ছেলেটা আবারও বেহা’য়াপনা শুরু করেছে! অপলা উসামা হাত দিয়ে সরিয়ে দিলো। উসামার বিষয়টা বড্ড গায়ে লাগলো। উসামা আরো শক্ত করে জাপ্টে ধরলো অপলাকে। কাল রাতের ঘটনা অপলার মাথায় চাড়া দিয়ে; উঠতেই অপলা উসামার দিকে গরম খুন্তি তাক করে বললো,

” একদম গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দিয়ে দিবো। আপনার বদমাইশি হাড়ে হাড়ে ছুটিয়ে দেবো।”

উসামা দু’হাত উঁচু করে স্যারেন্ডার করে বললো,

” হাসবেন্ডকে কেউ ছ্যাঁকা দেয় বলো? আদর ভালোবাসা দিলেও তো পারো। কাছে এসো বউ। এমন ঠান্ডা আবহাওয়ায় আমার আবার একটু বেশিই প্রেম প্রেম পায়।”

অপলা এবার খুন্তি হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে; ডয়ার থেকে সবজি কা’টার বঁটি বের করলো। সহস্তে তা উসামার দিকে তুলে ধরে বললো,

” আপনি যাবেন নাকি বঁটি দিয়ে কু’পিয়ে দেবো? ”

উসামা অপলার এই রাগী রাগী চেহারা দেখে দূরে সরে গেল। রান্নাঘরের দরজার সামনে গিয়ে বললো,

” একখান চুম্মা দে পরান লাগাইলি
দুইখান চুম্মা দে ভোল্টেজ বাড়াইলি
তিনখান চুম্মা দে আমায়
হাই হলো টেম্পারেচার
চড় গেয়া পেয়ার কা বুখার
চড় গেয়া পেয়ার কা বুখার”

অপলা ত্বরিত কানে আঙুল দিলো। একে তো বেসুরো গলা! অপর দিকে অতি বিতিকিচ্ছিরি গান! তবুও উসামা থামলো না; গান গেয়েই গেল। অপলা শেষ অবধি টিকতে না পেরে বঁটি তুলে উসামাকে ধাওয়া দিলো। বাড়িতে একজন মুরব্বি মানুষ আছেন। তবুও কীসব অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে গান গাওয়া! অপলা এদিক ওদিক ভালো করে তাকিয়ে দেখলো। ভাগ্যিস জেসমিন এদিকে নেই। নাহলে ছেলের এসব কান্ড দেখে ভিরমি খেতো। একবার সে উসামা বাটে পাক! তারপর তাঁর পেয়ার কা বুখার একেবারে ছুটিয়ে দেবে!

রান্না শেষ হতেই অপলা টেবিলে তা পরিবেশন করলো। উসামা গাল মুখ ভর্তি করে গোগ্রাসে গিলতে লাগলো। তবে, ভাবখানা এমন যেন খাবার এতই জঘন্য যে মুখে নেওয়া যাচ্ছে না! জেসমিন অবশ্য বেশ তারিফ করলেন। খেতে খেতে অপলাকে বললেন,

” উসামা হয়েছে তোমার শশুড়ের মতো। উনি বিরিয়ানি খেতে খুব ভালো বাসতেন। আজ বেঁচে থাকলে হয়তো আমাদের সঙ্গে উনিও একই টেবিলে বসে খেতেন। ”

অপলার বড্ড মন খারাপ হলো। জেসমিনের চোখ কেমন ছলছল করে উঠলো। অপলা বুঝলো উসামার বাবা আর মার ভেতরে ভালোবাসার কত তীব্রতা ছিল।

খাবার শেষ করে ওঠার পর অপলার ইচ্ছে হলো শরীরটা এলিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে। আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা আজ। একটু ঘুমিয়ে নিলে খারাপ হবে না। এমনিতেও কাল রাতে উসামার যন্ত্রনায় এক ফোঁটাও ঘুমোতে পারেনি সে। অপলার ও কথা ভাবতে গেলেও লজ্জা পায়। কেমন কেমন যেন একটা অনুভূতি। কাল রাতের কথা ভাবতে গেলেই পেটের ভেতর কেমন একটা সুরসুরি হয়। উসামাকে আঁচলে বেঁধে রাখতে হবে। একবার সে রূপা নামের চরিত্র তুলে ধরেছে৷ এরপর যদি আসলেও ওই রূপার মতো কাউকে জুটিয়ে নেয় তবে সর্বনাশ!

ঘরে গিয়ে বসতেই উসামা অপলার কোমড়ে হাত গুঁজে দিলো। আরেক হাত দিয়ে টান দিয়ে অপলাকে নিজের বুকের ওপরে এনে ফেললো। অপলা কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলো না। উসামার দৃষ্টি তাঁকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিলো। অপলা যেন ঘোরে চলে গেল। কিন্তু, পরমুহূর্তেই রূপার প্রসঙ্গ মনে হতেই এক ধাক্কা দিয়ে উসামাকে সরিয়ে দিলো। উসামা জোর করে অপলার হাত দুটো বিছানার ওপর চেপে ধরলো। তাঁর নাকের সঙ্গে নাক মিশিয়ে দিয়ে বললো,

” এখনো এত রাগ?”

অপলা কোনো জবাব দিলো না। উসামার বাঁধন থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগলো। উসামা অপলার কানে কানে ফিসফিস করে বললো,

” অনেক রাগ হয়েছে বুঝি?”

অপলা নির্দ্বিধায় উত্তর দিলো,

” না, আপনার জন্য রূপা-ই যথেষ্ট। আমি কী করলাম না করলাম তা আপনার না ভাবলেও চলবে। আপনি খুবই খারাপ একটা লোক। সংসার করা যায় না আপনার সঙ্গে। আমার পোড়া কপাল যে ঘাটের ম’রা আপনি আমার জিন্দেগীতে এসে জুটেছেন। জীবনে আর কোনোদিন এসব নিয়ে মজা করার চিন্তা করেছেন তো ওয়াশরুমের স্যান্ডেল খুলে আপনাকে পে’টাবো।”

উসামা হাই তুলতে তুলতে বললো,

” একদিকে ভালোই হয়েছে জানো। আমার অবশ্য লাভই হয়েছে। মিথ্যা গল্প ফেঁদে একটু আদর আহ্লাদ তো পেলাম। তাতে চ্যালা কাঠের বাড়ি খাই বা ওয়াশরুমের স্যান্ডেলের বাড়ি খাই কিংবা বঁটির কোঁ’প খাই। এই নিয়ে আমার কোনো আফসোস শেষ।”

উসামা কথা শেষ করেই অপলার ঘাড়ে আলতো করে কামড় দিলো। অপলা ঘাড়ে হাত দিয়ে উঠে বসে বললো,

” উফ! কী করলেন এটা? এখন আবার আমাকে চৌদ্দটা ইনজেকশন লাগাতে হবে। ধুর!”

উসামা অবাক হয়ে বললো,

” মানে?”

অপলা নির্বিগ্নে বললো,

” কুকুরে কামড়ালে চৌদ্দটা ইনজেকশন লাগাতে হয় সেটা কী জানেন না?”

উসামা অপলার কথার মানে ধরতে পেরে কটমট করতে করতে তাঁর দিকে তাকালো। অপলা সেদিকে কোনো পাত্তাই দিলো না।

চলবে…

#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ২৪

মৃদু রোদের আলো অপলার মুখে এসে পড়তেই অপলা ঘুম থেকে উঠে বসলো। তাঁর পাশে উসামা কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমোচ্ছে। অপলা ফ্রেশ হয়ে নাস্তা বানাতে চলে গেল। জেসমিন এসে নাস্তার টেবিলে বসলেন। খুব ধীর স্বরে বললেন,

” উসামা ওঠেনি? ওকে ডাক দাও ওর আবার অফিস আছে তো। আর তোমরা নাস্তা করে নিও। আমি দুধ রুটি খেয়েছি। আমি আর কিছু খাবো না। ”

অপলা টেবিলে খাবার রেখে উসামাকে ডাকতে ঘরের ভেতরে গেল। বেশ কয়েকবার উসামার নাম ধরে ডাকলো। উসামার কোনো সাড়া নেই। অপলা বিছানার পাশের টেবিলটা থেকে; পানির গ্লাসটা নিয়ে উসামার মুখে পানি ছিটিয়ে দিলো। উসামা প্রচন্ড চমকে ঘুম থেকে উঠে বসলো। অপলার দিকে তাকিয়ে তাঁকে বললো,

” সকাল সকাল এসব কী শুরু করলে আপেল? কই একটু আদর সোহাগ দিয়ে বরকে ঘুম থেকে ডেকে তুলবে। অত্যাচারী নারী!”

অপলা জানালার পর্দা সরিয়ে দিতে দিতে বললো,

” আহা রে! মানুষের শখের ও বলিহারি! পানি ছিটিয়েছি সেটা আপনার কপাল। মুখে বালিশ চাপা দিয়ে ঘুম থেকে তোলা উচিত ছিল।”

উসামা ওয়াশরুমে যেতেই অপলা বিছানা গুছিয়ে নিলো। এই ছেলে সারারাত বিছানায় গড়াগড়ি খায়। বিছানার এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত কোনো ব্যাপারই নয় তাঁর কাছে। কোনো হাত উঠিয়ে দেয় শরীরে ;কখনো আবার পা। মাঝেমধ্যে তো ইচ্ছে অপলার ইচ্ছে হয় ঠেলে উসামাকে বিছানা থেকে ফেলে দিতে। উসামা এর মাঝেই হঠাৎ অপলার নাম ধরে ডেকে উঠলো। অপলা তাঁর ডাকে সাড়া দিতেই উসামা ওয়াশরুমের ভেতর থেকে বললো,

” আপেল ও আপেল!”

অপলা ওয়াশরুমের সামনে এসে বললো,

” কী হয়েছে? এত রাজহাঁসের মতো প্যাঁক প্যাঁক করছেন কেন?”

উসামা ওয়াশরুমের দরজা খুলে মুখটা বের করে বললো,

” একটা টাওয়াল দিয়ে যাও। আমি ভুলে গিয়েছি টাওয়ালের কথা।”

অপলা কোমরে হাত দিয়ে বললো,

” আগে বলুন এসব অদ্ভুত নামে আমাকে ডাকবেন না। তারপর টাওয়াল পাবেন; এর আগে নয়।”

উসামা মুখটা অসহায়ের মতো করে বললো,

” আচ্ছা যাও তুমি যা বলবে তাই হবে। এখন আমার টাওয়াল দাও।”

অপলা দ্রুত আলমারি থেকে একটা টাওয়াল; বের করে উসামা দিতে ওয়াশরুমের সামনে গেল। ওয়াশরুমের সামনে গিয়ে উসামার হাতে টাওয়াল; তুলে দিতেই উসামা শক্ত করে অপলার হাত ধরে ফেললো। অপলা উসামার মতলব বুঝতে পেরে হাত ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করলো। তবে সফল হলো না। উসামা তাঁকে টেনে ওয়াশরুমের ভেতরে নিয়ে দরজা আঁটকে দিলো। ভেতরে ঝর্না অন থাকায় অপলা পুরোপুরি ভিজে গেল। উসামা দরজার হাতল আঁটকে দাঁড়িয়ে রইলো। অপলা রুষ্ট স্বরে বললো,

” এটা কী করলেন আপনি?”

উসামা নিজের মুখে পানির ঝাপ্টা দিয়ে বললো,

” কী করলাম? ”

অপলা উসামার দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো,

” ওয়াশরুমে টেনে আনলেন কেন? দেখুন পুরো ভিজে গিয়েছি। ইচ্ছে করছে আপনার গলাটা টি’পে দিতে। নির্ল’জ্জ, হায়া বলতে কিছু আছে আপনার? ”

উসামা কোনো জবাব দিলো না। হাত বাড়িয়ে অপলার কোমর পেঁচিয়ে ধরে কাছে টেনে নিলো তাঁকে। অপলা বেশ মোচড়ামুচড়ি করলো। কিন্তু, বাঁধন থেকে বের হতে পারলো না। উসামা তাঁকে আরো কাছে টেনে বললো,

” ম’রা ভাল্লুকের মতো এত মোচড়াচ্ছো কেন?”

অপলা রাগান্বিত গলায় বললো,

” ছাড়ুন বলছি! হাতে কাম’ড় দিয়ে জখম করে দেবো একদম। হাত সরান বলছি!”

উসামা অপলার কথা কানেই তুললো না। অপলার গলায় ঘাড়ে চুমু খেয়ে বললো,

” ওরকম জখম এখন আমি প্রতিদিনই হই। ও আমার সয়ে গেছে। কুকুড়ের মতো এত কাম’ড়াকা’মড়ি কোথায় শিখেছো অপলা? কখনো তো বলতে শুনলাম না উসামা কাছে এসো চুমু খাবো। ম্যানারলেস লেডি! ”

অপলার মাথা ভোঁ ভোঁ করে উঠলো। চিৎকার করে বললো,

” মুখে লাগাম নেই আপনার? বাড়িতে মা আছেন! আর সামনে থেকে সরুন। আমাকে বের হতে দিন। ”

অপলা উসামাকে সরিয়ে বের হতে নিতেই উসামা পেছন থেকে অপলার শাড়ির আঁচল টেনে ধরলো। আঁচল টেনে অপলাকে নিজের কাছে টেনে আনলো। অপলার নাক, ঠোঁট, গাল গলা বেয়ে পানি পরছে। উসামা অকস্মাৎ অপলার গালে চুমু খেলো। উসামার চাপ দাঁড়ি দ্বারা অপলার গালে খোঁচা লাগলো। অপলা গাল সরিয়ে নিতেই উসামা তাঁর গলার মাঝে মুখ গুঁজলো। অপলা হাত দিয়ে উসামার বুকে ধাক্কা দিতেই উসামা সরে গেল। অপলা সুযোগের সৎ ব্যবহার করে দরজা খুলে বের হয়ে গেল। ভেজা শাড়িটা বদলে নেওয়ার জন্য আলমারি থেকে একটা শাড়ি বের করলো। শরীর থেকে শাড়ির আঁচলটা খসাতেই উসামা ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে অপলার দিকে তাকিয়ে বললো,

” ওয়াও! কী চমৎকার দৃশ্য! ”

অপলা চমকে পেছন ফিরে তাকাতেই দেখলো উসামা তাঁর দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। অপলা মেঝে থেকে শাড়ির আঁচলটা তুলে জলদি নিজের শরীরে জড়িয়ে নিলো। এরপর দ্রুত গতিতে নিজের অপর শাড়িটা হাতে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে ছুটলো। পেছন থেকে শুধু উসামার হাসির শব্দই শুনতে পেল। বেয়াড়া ছেলেটা নিশ্চয়ই দাঁত কেলিয়ে কেলিয়ে হাসছে! অ-ভ-দ্র!

” আজকে উসামা অফিস থেকে ফিরলেই তৈরি হয়ে থেকো। কমলার বিয়ের অনুষ্ঠান আজ রাতে।”

জেসমিনের কথা শুনে অপলা কেমন অস্বস্তি বোধ করলো। জেসমিন সেদিকে তেমন নজর দিলেন না।অপলাও জেসমিনের কথা ফেলতে পারলো না। উসামা অফিস থেকে ফিরতেই অপলা আলমারি থেকে নতুন একটা হালকা গোলাপী রঙের শাড়ি বের করলো। এই শাড়িটা সে বিয়ে উপহার পেয়েছে। সুন্দর করে শাড়িটা পড়ে তৈরি হয়ে নিলো। ড্রেসিং টেবিলে রাখা একটা হালকা গোলাপী কালার লিপস্টিক খুঁজতে লাগলো। অনেকক্ষন খুঁজেও সেটা অপলা পেল না। উসামা কৌতুহলের বশে বলেই ফেললো,

” কী খুঁজছো সুন্দরী টসটসে আপেল?”

অপলা মাথায় চিরুনী করতে করতে বললো,

” একটা নতুন হালকা গোলাপী রঙের লিপস্টিক রেখেছিলাম ড্রেসিং টেবিলের ওপরে। কোথাও পাচ্ছি না ওটা। আমি তো ঠিক জায়গায়ই রেখেছিলাম। কোথায় যে গেল!”

উসামা বিছানা থেকে নেমে আলমারি খুললো। নিজের তাকের একটা শার্টের পকেট থেকে অপলার কাঙ্ক্ষিত; লিপস্টিকটা বের করে তাঁর দিকে এগিয়ে দিলো। অপলা বিষ্মিত হলো। লিপস্টিকটা হাতে নিয়ে বললো,

” আমার জিনিস আপনার কাছে কী করছে? আমি কিন্তু মোটেও এটা আপনার আলমারির তাকে রাখিনি। আমার দোষ একদম দেবেন না।”

উসামা হাই তুলতে তুলতে বললো,

” সপ্তাহ কয়েক আগে আমার গলার তুমি কোনো দাগ দেখোনি? হালকা লাল লাল দাগ?”

অপলা উসামার কথার মানে বুঝতে পেরে তাঁর দিকে চোখ বড় বড় করে তাকালো। আড়ষ্ট কন্ঠে বললো,

” আপনি আমার লিপস্টিক দিয়ে এসব অপকর্মে চালিয়েছেন? ছি ছি ছি! পুরুষ মানুষ হয়ে বউয়ের লিপস্টিক মাখতে বিন্দু মাত্র আত্মসম্মানে বাঁধলো না?”

উসামা অপলার দিকে এগিয়ে এসে বললো,

” সেসব বাদ দাও। লিপস্টিক মেখে অন্তত আমার লাভ তো হয়েছে। তোমার মতো আনরোমান্টিক, ত্যাঁড়া, রসকষহীন কাঠখোট্টা মেয়েকে তো সোজা করতে পেরেছি। এটাই আমার জন্য অনেক। যাইহোক তোমার লিপস্টিক একদমই কাজের না। অনেকটুকু মেখেছিলাম গলায়; কেমন একটা ম্যারম্যারে গোলাপি রঙ! লাভ বাইট হবে লাল রঙের। গোলাপি হলে কী সেটা আর লাভ বাইট হয় বলো? পরে গলায় চিমটি কেটে কেটে লাল রঙ এনেছি। যা ব্যাথা হয়েছিল পরে!’

অপলা নির্দ্বিধায় বললো,

” বেশ হয়েছে। এত কষ্ট করার কী দরকার ছিল? আমাকে বলতেন আমি কার্লার মেশিন দিয়ে একটু ডলা দিয়ে দিতাম। লাল না খয়েরি কালারের কার্লার বাইট হতো তখন।”

উসামা খানিক বাদে রেডি হতে হতে অপলাকে বললো,

” আমার না হওয়া বউয়ের বিয়ে আজ। অপলা তুমি সতীনের ঘর করতে পারবে? তোমার তো নাকি বড্ড একা একা লাগে। তোমার জন্য কমলাকে নিয়ে আসি? দুই সতীন একসঙ্গে গল্প করলে ভালো লাগবে।”

অপলা উসামার কথার প্রতিত্তরে বললো,

” এরকম কিছু হলে রান্নাঘরের ব’টিটা আর রান্নাঘরে নয় বরং আপনার গলায় থাকবে। ডবল মার্ডা’রের দায়ে জেলে যেতে আমার কোনো প্রবলেম নেই।”

উসামা অপলার দিকে তাকিয়ে ঢোক গিললো।

বিয়ে বাড়িতে গিয়ে খাওয়া দাওয়া শেষে উসামা অপলাকে কমলার দিকে ইঙ্গিত করে বললো,

” হায় আমার না হওয়া বউ! এই রানু মন্ডলের জন্য তোমাকে রিজেক্ট করে আমি সত্যি মর্মাহত কমলা!”

অপলা উসামা ভেংচি কাটলো। উসামা আঙুল দিয়ে কমলার বরের দিকে ইঙ্গিত করে বললো,

” এই যে এটা কমলার হাসবেন্ড। কমলার সঙ্গে ওর প্রেম ছিল। হঠাৎ বাড়ি থেকে অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে ওর বিয়ে ঠিক করে দিয়েছিল। কমলা শুনে তো সেই কান্নাকাটি। আমাকে ফোন করে বলতেই আমি সেই কায়দা করে ওই মেয়ের সঙ্গে কমলার হাসবেন্ডের বিয়ে ভেঙেছি। ফোন করে ওই মেয়েটার নামে ধুম ধারাক্কা ব’দনাম করেছি। বলেছি মেয়ে পাগল, মেয়ের মাথায় সমস্যা। বছরে ছয় মাস ভালো থাকলে ছয় মাস আবার পাগল থাকে। শুনে কমলার শাশুড়ী সঙ্গে সঙ্গে সেই বিয়ে ভেঙে দিয়েছে। হা হা হা!”

উসামার মুখে এসব কথা শুনে অপলা কৌতুহলী হয়ে কমলার বরের বেশে থাকা পুরুষটির দিকে তাকাতেই চমকে উঠলো। একি! রোদ্দুর এখানে কী করছে!

চলবে…