#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ২৮ (প্রথমাংশ)
উসামা অফিস থেকে ফিরে দেখলো অপলা বাড়িতে নেই। জেসমিনের কাছে শুনতে পেল অপলা ওপরে গেছে। উসামা ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হলো। ফুলহাতা শার্ট পাল্টে টিশার্ট পড়লো। এরমধ্যেই অপলা শাড়ির আঁচল প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে ঘরে ঢুকলো। উসামা পেছন থেকে অপলাকে দেখে তাঁকে ইঙ্গিত করে বললো,
” আপেল আপেল!
কেমন আপেল?
পঁচা আপেল! ”
অপলা নিজের নামের এরূপ ব্যঙ্গ শুনে উসামাকে ভেংচি কাটলো। উসামা অপলার শাড়ির আঁচল টেনে ধরে তাতে মুখ মুছলো। জেসমিন অকস্মাৎ অপলার নাম ধরে ডাকলো। অপলা ”জি মা” বলে রুমের বাইরে জেসমিনের কাছে গেল। জেসমিন অপলাকে ভালো করে একবার পরখ করে দেখলেন। তাঁর চোখে ধুলো দেওয়া এতটা সহজ নয়। অপলাকে স্পষ্ট ভাষায় বললেন,
” আমার তোমাকে কিছুদিন যাবত একটু অন্যরকম লাগছে। আমি শিওর না কিন্তু আমার সন্দেহ হচ্ছে। সত্যি করে বলো তো আমি যা ভাবছি তেমন কিছু কী?”
অপলা লজ্জায় মাথা নত করে ফেললো। জেসমিন অপলার মৌনতা দেখেই সবকিছু বুঝে ফেললেন। অপলাকে কাছে টেনে বললেন,
” তোমার কর্তাবাবু জানেন কী?”
অপলা মাথা দু’পাশে নেড়ে না বোঝালো। জেসমিন ফের বললো,
” তুমি একটু সাবধানে চলাফেরা করো। প্রথম কয়েকটা মাস একটু বেশিই সাবধান থাকতে হয়। আমি শুরু থেকেই কেমন একটু সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু, আমি তেমন পাত্তা দেইনি। ভেবেছিলাম তোমাদের বিয়ের একবছর হতেও আরো কিছুদিন বাকি। এত তাড়াতাড়ি হয়তো তুমি কনসিভ করবে না। অবশ্য যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। আর শোনো মা তোমার কিছু খেতে ইচ্ছে হলে আমাকে বলবে। মোটেও লজ্জা পেয়ো না। এই অবস্থায় কত কিছু যে খেতে ইচ্ছে হয়! অখাদ্যকেও সুস্বাদু বলে মনে হয়। আবার সাধারণ খাবার দেখলেও বমি পায়। জানো, উসামা পেটে থাকাকালীন আমার বালু চাবাতে ইচ্ছে করতো। তোমার বাবা শুনে খুব হাসতো। এতকিছু ফেলে শেষে কিনা বালু!”
অপলা মনে মনে ভাবলো সেই সময়ে তাঁর শাশুড়ী মায়ের বালু খেতে ইচ্ছে হয়েছিল বলেই উসামা আজ এমন আধ-পাগলা হয়েছে। কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের কী বালু খাওয়ার সাধ জাগে?
জেসমিন আরো অনেককিছু বললো অপলাকে। তবে সে সেভাবে কোনো জবাব দিলো না। লজ্জায় তাঁর মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিলো। বাবুটা বাবার মতো দুষ্ট;মাকে বারবার লজ্জায় ফেলে!
অপলা রুমে ঢুকতেই উসামা তাঁকে নিজের কাছে টেনে নিলো। শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। অপলা ছাড়া পাওয়ার জন্য গাইগুই করলো। উসামা সেসবের ধারই ধারলো না। কপালের সঙ্গে কপাল ঠেকিয়ে বললো,
” আপনার রাগ কমেছে ম্যাডাম?”
অপলা উসামাকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিয়ে বললো,
” ইস! কী বিচ্ছিরি গন্ধ! আপনার শরীর থেকে এত বাজে গন্ধ আসছে কেন? আমার শরীর গুলিয়ে আসছে।”
উসামা তড়িঘড়ি করে বললো,
” মানে? তোমার নাক পঁচে গেছে নাকি? আমি তো একটু আগেই ফ্রেশ হলাম। রুমেও এসি চলছে। শরীরে ঘাম নেই তবুও গন্ধ কোথায় পাও তুমি?”
অপলা নাকে হাত দিয়ে বললো,
” মোটেও না। আপনি নিজে শুকে দেখুন। কেমন চিকাম’রা গন্ধ! ছ্যাহ!”
উসামা নিজের বাহুমূল শুঁকে দেখলো। গন্ধ তো দূরের কথা উল্টো কড়কড়ে পারফিউমের ঘ্রান আসছে। উসামা মুখ কুঁচকে বললো,
” তোমার হয়েছে কী অপলা? যা বুঝলাম তোমাকে নাক, কান, গলার বিশেষজ্ঞ ডক্টরের কাছে নিয়ে যেতে হবে। আমার সব বিষয়ে নাক গলাতে গলাতে এখন তোমার নাকের ইন্তেকাল ঘটেছে। সেদিনই তো বাসিমুখের আমিকে চুমু খেলে। তখন তো সব ঠিকঠাকই ছিল।”
অপলা কটমট করতে করতে উসামার দিকে তাকালো। ফের বললো,
” হুহ! আমার ভারি বয়ে গিয়েছিল আপনাকে বাসিমুখে চুমু খাওয়ার! আমি তো বিছানার পাশ কেটে হেঁটে যাচ্ছিলাম। আপনি তো আমাকে হাত চেপে ধরে কাছে টেনে নিয়ে আমার অতবড় সর্বনাশ করলেন।”
উসামা কিছু বললো না। বিছানার এক কোনে গিয়ে শুয়ে পরলো। চোখজুড়ে তাঁর কেবল ক্লান্তি। অপলা বিছানার সামনে দাঁড়িয়ে কেমন উসখুস করতে লাগলো। উসামাকে যে ব্যাপারটা কীভাবে জানানো যায়! খুব লজ্জা লাগছে তাঁর! এই অস’ভ্য মানুষটা বাবুর কথা শুনলেও তাঁকে ক্ষ্যাপাবে যে!
খাবার টেবিলে অপলা খুব আশা করে বসে রইলো হয়তো জেসমিন উসামাকে সবটা খুলে বলবো। কিন্তু, সেরূপ কিছুই হলো না। উসামা আগে আগে খেয়ে উঠে চলে গেল। তাঁর নাকি শরীর ভালো লাগছে না। জেসমিন খাওয়া শেষে উঠে গেলে অপলা আরেক দফায় নিরাশ হলো। এই বাড়ির মানুষগুলো আসলেই কোনো কাজের না। অপলা টেবিল গুছিয়ে রুমে গেল৷ উসামা বিছানায় আধোঘুম অবস্থায় শুয়ে রয়েছে। ড্রিম লাইটের আবছা আলোয় উসামাকে এলোমেলো লাগছে।অপলা এবার খুব সাহস করলো। বিছানায় উঠে উসামার সামনে গিয়ে বললো,
” শুনুন আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিল।”
উসামা ভাঙা ভাঙা স্বরে বললো,
” বলে ফেলো।”
অপলা ঠোঁট কামড়ে বললো,
” বিছানাটা খুব ছোট; তিনজন মানুষের জায়গা হবে না। একটা বড় বেড কিনতে হবে।”
উসামার চোখ বুজে আসছে। সে সবকিছু ঠিকভাবে ঠাহর করতে পারলো না। অপলাকে শুধু জবাবে বললো,
” কিনে দেবো।”
অপলা মুখ কুঁচকে ফেললো। গাধাটা কিছুই বুঝতে পারেনি। অপলা পুনরায় বললো,
” শুনুন! একটা জরুরি কথা আছে।”
উসামা নিদ নিদ কন্ঠে বললো,
” শুনছি তো। আমি সব শুনছি; কী বলবে বলো। বিছানা নিয়ে কী যেন বলছিলে।”
অপলা এক মিনিট সময় নিলো। ঢোক গিলে বললো,
” আপনি বাবা হবেন।”
উসামা চমকে উঠে বসলো! মাথাটা কয়েকবার ঝাঁকালো। চোখ বড় বড় করে বললো,
” কী বললে? আমি কী ঘুমের ঘোরে উল্টাপাল্টা কিছু শুনলাম? কী যেন বেডের কথা বলছিলে না? এরমধ্যে আর কোনো কিছু বলেছিলে নাকি?”
অপলা শাড়ির আঁচলের নিচ থেকে প্রেগন্যান্সি কিটটা বের করলো। সোজা করে সেটা উসামার সামনে তুলে ধরলো। উসামা মুখে হাত দিয়ে বসে রইলো। এটা কী চমক ঘটলো তাঁর সঙ্গে? অপলা সঙ্গে সঙ্গে মুখে আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললো। উসামা অপলার হাত ধরে তাঁকে বুকে টেনে নিলো। উসামার তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব পুরোপুরি কেটে গেছে। উসামা খেয়াল করলো তাঁর বুকের মাঝে কেমন যেন ভেজা ভেজা অনুভব করলো। অপলা বিনা শব্দে কেঁদে যাচ্ছে। উসামা তাঁকে কোনো বাঁধা দিলো না। উসামা নিজেও অনুভব করলো তাঁর চোখ কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছে। একহাতে অপলাকে জড়িয়ে ধরে আরেকহাতে উসামা চোখ মুছলো। এই পাঁজি মেয়েটাকে একদমই দেখানো যাবে না চোখের পানি। দুজন দুজনের মতো বুক ভাসাতে লাগলো।
চারিপাশ কেমন যেন মৌন! উসামা ভেজা গলায় অপলাকে বললো,
” আমাদের বাবু ছেলে হবে নাকি মেয়ে হবে অপলা?”
অপলা উসামার বুকের মাঝে মুখ গুঁজে রইলো। কোনো জবাব না পেয়ে উসামা পুনরায় বললো,
” আচ্ছা, ছেলে হোক কিংবা মেয়ে। আমরা কিন্তু আমাদের বাবুর খুব ইউনিক নাম রাখবো। আমি নিজেকে অনেক আগেই ফলওয়ালা হিসেবে সমর্পন করেছি। আমাদের বাবুর নাম শুরু হবে ফলের নামে। যদি ছেলে হয় তাহলে নাম রাখবো; আনরস চৌধুরী আঙুর। আর মেয়ে হলে নাম রাখবো; বেদানা চৌধুরী পেয়ারা।”
অপলা উসামার বুকে মৃদু কামড় দিয়ে বললো,
” এসব কেমন নাম? আমাদের বাবুর নাম পেয়ারা, আঙুর? স্কুলে সবাই আমাদের বাবুর নাম নিয়ে মজা করবে।”
উসামা একটু ভেবে বললো,
” তা ঠিক। তাহলে ফলের বিষয়টা বাদ। আমাদের বাবুর নাম সবজির নামে রাখবো। ছেলে হলে নাম রাখবো; পাতাকপি চৌধুরী পটল। আর মেয়ে হলে টমেটো চৌধুরী সিম।”
অপলা কটমট করতে করতে উসামার দিকে তাকালো। বাবুর এমন অদ্ভুত নাম শুনে তাঁর রাগ হচ্ছে। উসামার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে একের পর এক উদ্ভট নামের হিসাব করে যাচ্ছে। অপলা পেটে হাত দিয়ে মনে মনে ভাবলো,
” দুনিয়াতে এসেও তোর শান্তি নেই রে বাবু। তোর বেআক্কল বাবা তোকে আজগুবি নামে ডেকে জ্বা’লিয়ে মা’রবে।”
চলবে…
#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ২৮ (শেষাংশ)
আজকাল অপলার শরীরটা খুবই খারাপ যাচ্ছে। পায়ে পানি উঠে; শরীর আগের চেয়ে ভারী হয়েছে। আগের মতো দ্রুত সে হাটঁতে পারে না। খাওয়ার রুচি নেই বললেই চলে। খাবার দেখলেই শরীর গুলিয়ে আসে। উসামা বেচারাও আজকাল বেশ তটস্থ থাকে। অপলার মেজাজ তুঙ্গে চড়ে থাকে। কাল রাতেই তো বিছানায় ঘুমানো নিয়ে এক দফা ঝগড়া হলো। অপলা ভারী শরীর নিয়ে হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমাতে চেয়েছিল। উসামা সেই আবদার মেনেও নিয়েছিল। কিন্তু, অপলা নিজেই কেমন বেঁকে বসলো। কাঁথা, বালিশ দিয়ে উসামাকে ফ্লোরে শুতে পাঠিয়ে দিয়ে বললো,
” বাবু আজকে তাঁর মায়ের সঙ্গে একা একা বিছানায় ঘুমাবে। আপনি আজকে নিচে শোবেন। যদিও একথা বাবু বলেছে আমাকে। আমি কিন্তু কিছু বলিনি।
উসামা বিনাবাক্যে মুখ ভোঁতা করে নিচে শুয়ে পরলো। অপলা হাত, পা ছড়িয়ে পুরো বিছানা নিজে একা দখল করে ঘুমালো। উসামা ঘাড় উঁচু করে কয়েকবার পলক ফেলে অপলাকে দেখলো। অপলা তখন দু’পা ভাজ করে গভীর তন্দ্রায়। অগত্যা উসামা বালিশে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পরলো। তবে, মধ্যরাতে টুং টাং আওয়াজ পেয়ে উসামা চোখ মেলে তাকালো। অপলা দেওয়ালে ভর দিয়ে কোমরে হাত দিয়ে হাঁটছে। উসামা ঘুমু ঘুমু গলায় বললো,
” ঘুমাওনি?”
অপলা জবাবে বললো,
” আপনার সন্তান আপনার মতোই হয়েছে। আমার শান্তি তাঁর সহ্য হয় না। সারাদিন ভদ্রই থাকে। রাতে ঘুমাতে গেলেই সে ডিস্কো ডান্স শুরু করে।”
এই সেই আলাপ করতে করতে কখন যে ভোর হয়ে গেছিলো। উসামা তা টেরও পায়নি।
শায়েলা অপলার জন্য এক গাদা আচার বানিয়ে রোদে শুকাতে দিয়েছে। অপলা একটু পরপর আচারের বয়াম বারান্দা থেকে এনে বের করে আচার খায়। আর শায়েলা তৃপ্ত মনে তা চেয়ে চেয়ে দেখে। এরমধ্যে আজলান আর মিলা এসেছিল একবার। অপলার জন্য ব্যাগভর্তি জিনিসপত্র নিয়ে। অপলার সঙ্গে দেখা করেই চলে গেছে। উসামা আর জেসমিন অনেক করে অনুরোধ করেছিল একটা রাত থাকার জন্য। আজলানের অফিসে বাহানা দিয়ে তাঁরা চলে গেছে।
জেসমিন ঘন্টার পর ঘন্টা বসে বসে বাবুর জন্য কাঁথা সেলাই করে৷ উসামা যদিও বলেছে যে,
” আজ-কাল ডায়াপারের যুগ। কাঁথা দিয়ে কী হবে? অযথা এত পরিশ্রম করো না মা। তোমার শরীরটাও তো তেমন ভালো না।”
কিন্তু, জেসমিন সেসব মানতে নারাজ। নতুন বাবুর জন্য সে কাঁথা সেলাইয়ে মহা ব্যস্ত।
উসামা বাবুর জন্য খেলনা কিনে ঘর ভর্তি করে ফেলেছে। শায়েলা অনেকবার উসামাকে বলেছে,
” বাবা, বাবু হওয়ার পর এসব মনভরে কিনে নিও৷ এখন এসব করলে বাবুর নজর লাগবে।”
উসামা সে-সব কথা কানেও তুলে না। সেদিনই তো অফিস থেকে বাড়ি আসার পথে বাবুর জন্য অনেকগুলো সফট টয় কিনে এনেছে সে।অপলা এসব বিষয়ে রাগারাগি করতে চাইলেও করতে পারে না। প্রথম বাচ্চা বিধায় সবার আদর আহ্লাদ একটু বেশিই। অপলারও ইচ্ছে হয় বাবুর জন্য জামাকাপড় কিনে রাখার। কিন্তু, অপলা জানে না কী কিনবে৷ বাবু ছেলে নাকি মেয়ে সেটাই তো জানে না সে। মেয়ে বাবু হলে লাল, নীল ফ্রক পরবে। আর ছেলে বাবু হলে রম্পার স্যুট পরবে।
অপলার মায়ের কথা বেশ মনে পরে। মা যদি থাকতেন পাশে এই সময়টা অপলার জন্য আরো বেশি সুখের হতো। জেসমিন অপলাকে অবহেলা করেন তা ঠিক নয়। জেসমিন নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা করেন। কিন্তু, অপলার মন অন্যদিকে পরে থাকে। মায়ের হাতে ভাত খাওয়া হয় না কয়েক বছর হলো। অপলার খুব ইচ্ছে হয় মায়ের হাতে দু’নলা ভাত খেতে। দুপুরে খাবার টেবিলে খেতে বসে অপলা ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো। জেসমিন নিজেও একজন মা। তাঁকে আর কিছু মুখে বলে বোঝাতে হলো না। অপলাকে নিজের হাতে তুলে খাইয়ে দিলেন। অপলা অনেকদিন পর পেটপুরে খেলো। বাবু পেটে আসার পর থেকে খাওয়া দাওয়ার ওপরে কেমন যেন অভক্তি কাজ করে।
অপলা খাওয়া শেষে রুমে গিয়ে এসি ছেড়ে বসলো। জেসমিন টেবিল পরিস্কার করছে। অপলার শরীর দিয়ে প্রচন্ড ঘাম ঝড়ছে। অপলা হঠাৎ টের পেল তাঁর পেটে প্রচন্ড ব্যাথা করছে। ভেজা ভেজা অনুভব করলো। যন্ত্রণায় অপলা গগনবিদারী চিৎকার করে উঠলো। জেসমিন দৌড়ে এসে অপলার অবস্থা দেখে দ্রুত উসামাকে ফোন করে বললেন,
” বাবা অপলার পানি ভেঙে গেছে। লেবার পেইন উঠেছে তুই জলদি আয়। অপলাকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে।”
অপলা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। উসামা সময় বিলম্ব না করে চট জলদি বাড়িতে এলো। অপলাকে নিয়ে হসপিটালে গেল। শায়েলা, মমো আর জেসমিন খানিকবাদে এলো। শায়েলা বারবার ভয়ে আল্লাহর নাম নিতে লাগলো। অপলার বাবা ভাইকে খবর দেওয়া হয়ে গেছে। কয়েক ঘন্টা প্রচন্ড চিন্তা ও হতাশায় কাটলো সকলের। নার্স বের হয়ে উসামার হাতে সাদা তোয়ালেতে মোড়ানো একটা পুতুলের মতো সুন্দর বাবু তুলে দিয়ে বললো,
” কনগ্রাচুলেশন্স স্যার। আপনার একটা ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে।”
উসামা কাঁপা কাঁপা হাতে মেয়েকে কোলে তুলে নিলো। মমো শায়েলার ফোন দিয়ে এত সুন্দর মুহূর্তটা ক্যামেরায় ধারন করে রাখলো। উসামা মেয়ের কপালে ছোট্ট করে চুমু খেলো। মেয়ের চুলগুলো হয়েছে তাঁর মায়ের মতো। ঘোড়ার লেজের মতো সিল্কি! উসামা শান্ত গলায় বললো,
” আমার ওয়াইফ কেমন আছে?”
নার্স জবাবে বললো,
” আপনার ওয়াইফ ভালো আছেন। ওনার এখনও জ্ঞান ফেরেনি। এনেস্থিসিয়ার ঘোর কাটেনি।”
উসামা লক্ষ্য করলো তাঁর চোখ ভিজে যাচ্ছে। ছলছলে চোখে মেয়ের দিকে সে তাকিয়ে রইলো। নার্স ফের উসামার কাছ থেকে মেয়েকে নিয়ে গেল। বাবুকে গোসল করিয়ে অক্সিজেন দেওয়া হবে। উসামা অপলার কাছে গেল। মেয়েটা চোখ বুজে ঘুমিয়ে আছে। অপলা খুব সুন্দর একটা মুহূর্ত মিস করে গেল। বোকা মেয়ে!
অপলার জ্ঞান ফিরতেই সে মেয়েকে কোলে তুলে নিলো। আজব বিষয় দশ মাস মেয়েকে পেটে ধরলো সে। অথচ মেয়েকে তাঁর বাবার মতো দেখতে। সাদা ধবধবে গায়ের রং। চোখ, নাক, ঠোঁটও বাবার মতো। নেহাতই চুলগুলো অপলার মতো নাহলে কেউ বিশ্বাসই করতো না এটা যে অপলার মেয়ে। উসামা মেয়ের গালে আবারও চুমু খেলো। ভাবুক দার্শনিকের ন্যায় বললো,
” আমাদের মেয়ের জন্য আমি একটা পারফেক্ট নাম খুঁজে পেয়েছি। যদিও এটা আমি তোমাকে আগে বলিনি। মনে মনেই রেখেছিলাম; ভেবেছিলাম মেয়ে হলে এটাই রাখবো।”
অপলা মেয়েকে কোলে নিয়ে বললো,
” কী? ওসব ফলমূলের নাম একদম মুখেও আনবেন না।”
উসামা মেয়ের হাতদুটো ধরে বললো,
” মেহরুবা চৌধুরী সিমি। মেহউইশের সঙ্গে মিল রেখে মেহরুবা। মাঝখানের নামটা আমার। তোমার নাম ফলের নামে তাই মেয়ের নাম আমি ফলের নামে রাখবো না। আমার মেয়ের নাম হবে সবজির নামে;সিম থেকে সিমি।”
অপলা ক্লান্ত শরীরেও মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলো। নামটা খারাপ নয় কিন্তু! মেহরুবা চৌধুরী সিমি!
” আমার ভাগ্নী তাঁর খালার মতো সুন্দরী হবে। রূপে গুনে পারদর্শী! এলাকার সব ছেলেরা ওর পেছনে ঘুরবে। তাই না মা?”
অপলা মমোর কথা শুনে তাঁর দিকে তাকালো। শান্ত গলায় বললো,
” নিজে তো হয়েছিস একটা লুচি পরোটা! আমার মেয়ের দিকে এখন নজর দিয়েছিস। আমার মেয়ে তোর মতো লাড্ডু হবে না। পড়াশোনা বাদ দিয়ে সারাদিন শুধু আজগুবি চিন্তাভাবনা! ”
মমো অপলার কথার কোনো গুরুত্ব দিলো না। বাবুর গালে, কপালে চুমু খেতে ব্যস্ত সে। অপলা বাবুকে মমোর কাছে দিয়ে রুমে গেল। বারান্দার রোদের তাপে তাকানো যাচ্ছে না। বাবুকে বাসায় আনার পর থেকে জেসমিন আর শায়েলা সারাদিন বাবুকে বারান্দার রোদে কোলে নিয়ে বসে থাকে।
রুমে এসে বসতেই মেয়ের কান্নার বিকট আওয়াজে অপলা ছুটে গেল। মমোর হাত থেকে মেয়েকে কোলে তুলে নিলো। মেয়েকে একটু কোলছাড়া করলেই কান্নাকাটি শুরু করে সে। অপলা মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘরে গিয়ে বসলো। উসামাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
” এত কষ্ট করে মেয়েকে আমি পেটে ধরলাম। শেষে মেয়ে হলো কার মতো? তাঁর গুনবান বাপের মতো! শুধু চেহারা নয় আচার আচরণও বাবার মতোই। সারাদিন শুধু চিৎকার! মেয়ের বাপ যেমন সারাদিন প্যাঁক প্যাঁক করে। মেয়েও হয়েছে তেমন! আমি ভেবেছিলাম আমার মেয়ে তাঁর মায়ের মতো ভদ্র সভ্য হবে। কিন্তু না! আপনার ডুপ্লিকেট পয়দা করে আমি এখন চরম অশান্তিতে আছি।”
উসামা এগিয়ে এসে বললো,
” মেয়ে আমার মতো হয়েছে এটা সত্যি। তাই বলে তুমি আমাকে হিংসা করতে পারো না আপেল! আমার মেয়ে তাঁর বাবার মতো সুন্দর, সুশীল সুসভ্য হয়েছে। মায়ের মতো ম্যানারলেস হয়নি। আমি এতে খুবই প্রাউড ফিল করছি। ইউ পঁচা আপেল ম্যানারলেস লেডি!”
অপলা মেয়ের দিকে তাকিয়ে অভিমানী স্বরে বললো,
” বাবু দেখেছিস তোর বাবা আমাকে ম্যানারলেস লেডি বলেছে। তুই কোনো প্রতিবাদ করবি না?”
পাঁচদিন বয়সী সিমি ড্যাবড্যাব করে মায়ের দিকে তাকালো। ফের বাবার দিকে তাকালো। মিনিটখানেক তাকিয়ে থাকার পর চোখবুঁজে পুনরায় ঘুম দিলো। তাঁর ভাবখানা এতটাই নাটকীয়; যেন সে বাবা এবং মাকে উভয়কেই ইঙ্গিত করে বলছে,
” তোমাদের ঝগড়া তোমরা মিটমিট করো গে বাপু! আমার এত খেয়েদেয়ে কাজ নেই প্রতিবাদ করবার। আমি এখন পেটপুরে খেয়ে আরাম করে ঘুমোবো।
সমাপ্ত…