#প্রতিশোধের_অঙ্গীকার
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_সাতচল্লিশ
হানিয়া তালুকদার বাড়ি থেকে বের হয়ে আবরারের আনা গাড়িতে বসে কান্নায় ভেঙে পরে। হাউমাউ করে কান্না করছে। বিয়েটা তাঁকে জোর করে দেওয়া হলেও পরবর্তীতে সে সবটা মেনে নিয়ে জাভিয়ানের সাথেই সংসার করতে চেয়েছিলো,,কিন্তু ভাগ্য তার এবারও সাথ দিলো না। এক আকাশ পরিমাণ কষ্ট নিয়ে আজ সে এই সংসার আর জাভিয়ানকে ত্যাগ করে চিরদিনের জন্য চলে যাচ্ছে। সে ভেবে পায় না তার প্রাপ্তির খাতা বারবার কেন শূন্য প্রতীয়মান হয়? কেন তার চাওয়া জিনিসগুলো স্থায়ী হয়ে তার সাথে থাকে না? এই সব কেনোর উত্তর তার কাছে নেই।
আবরার বোনের পাশে বসে তাঁকে আগলে নেয়। সবসময় হাসিখুশি থাকা বোনটার এমন কান্না আবরার মেনে নিতে পারছে না। তার এতদিনের জানা সব ভুল। হানিয়া সুখী ছিলো না জাভিয়ানের সাথে। বরং এই কয়েকটা মাস তাঁকে নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে। হানিয়া তাঁকে জাভিয়ানের কুকীর্তি সম্পর্কে কিছুই বলে নি,,বলতে চায়ও নি অবশ্য। সে এসব জানতে পেরেছে ইনায়ার কাছ থেকে। তারপর থেকে সে নিজের ভেতরে ভেতরেই হাজার বার মরণ যন্ত্রণা ভোগ করছে। তার জন্য তার আদরের বোনের আজ এই করুণ অবস্থা। তার কর্মে ফল তার বোনকে ভোগ করতে হয়েছে। কিন্তু আসলেই কি এখানে আবরারের দোষ ছিলো?
________________________
আবরারের গাড়ি এসে থামে বারো তলার একটা এপার্টমেন্টের সামনে। এর ষষ্ঠ তলায় হানিয়ারা থাকে। আবরার গাড়ি থেকে নেমে হানিয়াকে বের করে। তারপর বোনকে ধরে ধরে বাসায় নিয়ে যেতে থাকে। অতিরিক্ত কান্না ও কয়েকদিন খাওয়ায় অনিয়ম হওয়ায় হানিয়া অসুস্থ হয়ে পরেছে অনেকটা। গাড়িতে হাউমাউ করে কান্না করার জন্য মাথার ব্যথাটা আবার শুরু হয়েছে। আবরার কলিংবেল দিলে মিসেস মির্জা দরজা খুলে দেন। তারা কেউই আবরার আর হানিয়ার আগমনের কথা জানত না। মিসেস মির্জা তাদের জায়গা করে দেয় ভেতরে প্রবেশের জন্য। মি.মির্জা তখন ড্রয়িংরুমেই বসে ছিলেন। সে-ও বেশ অবাক হয়েছে এই অসময়ে ছেলে-মেয়ের আগমনে। আবরার তাদের সাথে কোন বাক্য বিনিময় না করেই হানিয়াকে নিয়ে তার ঘরে চলে যায়। হানিয়াকে বোরকা খুলে ফ্রেশ হতে বলে বের হয়ে আসে তার রুম থেকে।
ড্রয়িংরুমে এসে বাবা-মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলে–
–আমার বোনকে আমি খুব শীঘ্রই এখান থেকে নিয়ে যাবো। ততদিন ওর দায়িত্ব তোমাদের উপর দিয়ে গেলাম। বলতে পারো আমার আমানত ও তোমাদের কাছে। আমানতের খেয়ানত করবে না আশা করি।
মি. এন্ড মিসেস মির্জা ছেলের এমন কথা শুনে অবাক হয়ে যায়। তাদের মেয়েকে নাকি তাদের কাছে আমানত স্বরূপ রেখে যাচ্ছে তাদেরই ছেলে। মি. মির্জা এবার একটু রাগী কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন–
–মানে কি এসবে? আমাদের মেয়েকে তুমি আমাদের কাছেই আমানত স্বরূপ রেখে যাচ্ছো? মশকরা করছো তুমি আমাদের সাথে? আর হানিয়ার চোখ মুখ ওমন লাগছিলো কেন? আর তুমিই বা ওকে পেলে কীভাবে?
হানিয়ারা তিন ভাইবোনই তাদের বাবাকে ভীষণ ভয় পায় ছোট থেকে। কিন্তু আজ আবরারের মাঝে সেই ভয়টা কাজ করছে না। তার মন চাইছে বাবাকে কয়েকটা কড়া কথা শুনিয়ে দিতে। কিন্তু সে সেটা করে না। হাজার ভুল করুক মি. মির্জা কিন্তু সে তাদের বাবা। আবরার তার কথার পাত্তা না দিয়ে বলে–
–আমি ওকে ওই বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছি চিরদিনের জন্য। খুব শীঘ্রই ওর আর জাভিয়ানের ডিভোর্সও হতে চলেছে শুধু এইটুকু জেনে রাখো। কেনো হচ্ছে তা বললে না তুমি বিশ্বাস করবে আর না সহ্য করতে পারবে। আর আমানত বলার কারণ, পড়াশোনায় বরাবর পিছিয়ে থাকা হানিয়া তো তোমাদের কাছে সবসময়ই বোঝা লাগত। তাই আমি আমার বোনের অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত ও এখানেই থাকবে,,কিন্তু তোমাদের মেয়ে হিসেবে না আমার দেওয়া আমানত স্বরূপ। আশা করি বুঝতে পেরেছ। আর এবিষয় নিয়ে হানিয়াকে কোন প্রশ্ন করবে না। আমার বোন অনেক কিছু সহ্য করেছে,, তাই আমি তোমাদের কাছে অনুরোধ করছি যেই কয়টা দিন ও এই বাসায় থাকবে ওই কয়েকটা দিন একটু কষ্ট সহ্য করো ওকে।
লাস্টের কথাগুলো বলতে বলতে আবরারের চোখে পানি এসে পরে কিন্তু সে সেগুলোকে নিজের ভেতরেই চেপে রাখে। আবরার নিজের কথা শেষ করে হানিয়ার রুমে সামনে এসে দরজায় নক করে। হানিয়া তাঁকে ভেতরে যেতে বললে সে ভেতরে প্রবেশ করে। এদিকে তাদের বাবা-মা হতভম্ব হয়ে আবরারের কথা শুনে। তারা বুঝতে পারছে না কি এমন হয়েছে হানিয়ার সাথে যার জেরে আবার তার ডিভোর্স পর্যন্ত করাতে চাচ্ছে। মি.মির্জা নিজের রুমে গিয়ে মি.তালুকদারকে ফোন লাগায়। মি. তালুকদারের তখন ফোন ধরার মতো মানসিক অবস্থা না থাকায় সে ফোনটা ধরে না। মি. মির্জা অনেকবার তাকে কল দেয় কিন্তু সে রিসিভ করে না কোন কল। তারপর সে জাভিয়ানকে ফোন লাগায়। কিন্তু তার ফোনও বন্ধ বলছে। বন্ধ বলবেই বা না কেনো? জাভিয়ানের ফোনের যে অকাল মৃত্যু হয়েছে।
___________________
তালুকদার বাড়ির পরিবেশ আজ কেমন একটা যেনো। কয়েকজনের মনে খুশিরা দোলা দিচ্ছে তো কয়েকজন দুঃখবিলাস করছে। মিসেস তালুকদার ও সোহার মনে খুশিরা মেলা বসিয়েছে। অকৃতজ্ঞ মিসেস তালুকদার হানিয়ার চলে যাওয়ায় বেশ খুশি হয়েছে। এবার সে নিজের ছেলের সাথে ভাগ্নীকে বিয়ে দিতে পারবেন। অথচ এই অযোগ্য,, মিডেল ক্লাস মেয়েটাই যে তার মেয়েকে সুস্থ সবল করে তাদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে সেটার জন্য তার বিন্দুমাত্র কৃতজ্ঞতা নেই।
তারা দু’জন ব্যতীত বাড়ির সকলের মনটা আজ ভয়াবহ রকমে খারাপ। খারাপ হবেই না কেনো? বাড়ির সবচেয়ে চঞ্চল,, নিবেদিত প্রান যে আজ চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়েছে। মি. তালুকদার হানিয়া চলে যাওয়ার পরপরই নিজের স্টাডি রুমের দোর লাগিয়ে বসে আছেন। রোজি বেগমও নিজের ঘরের দরজা লাগিয়ে কান্না করছেন। কুলসুমেরও একি অবস্থা। বাদ বাকি রইলো হানিয়ার জীবনের একসময়ের সবচেয়ে কাছের মানুষ,, মনের মানুষ তার অবস্থান বাড়ির কারোর খেয়াল নেই। সেও নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে বসে আছে। মিসেস তালুকদার কয়েকবার তার দরজায় নক করলেও জাভিয়ান কোন রেসপন্স না করায় সে নিরাশ হয়ে নিজের রুমে চলে যায়।
জাভিয়ান অশ্রুশিক্ত চোখে ফ্লোরে বসে আছে। হাতে তার একটা ভাঙ্গা ফটো এলবাম। সেখানে একজনের রমণীর হাস্যোজ্জ্বল ছেঁড়া ছবি। ছবিটা তার আর হানিয়ার বিয়ের ছবি ছিলো। হানিয়াই কাল ছবিটা ছিঁড়ে ফেলেছে। জাভিয়ানের সাথে নিজেকে আর কোথাও বেধে রাখতে ইচ্ছুক নয় যে সে এই ছবিটাও যেন সেই কথাই বলছে। জাভিয়ানের এখন নিজের প্রতি ভীষণই আফসোস হচ্ছে। যদি একবার সবটা নিজ থেকে যাচাই-বাছাই করত তাহলে হানিয়া হয়ত আজ তার সাথে থাকত। জাভিয়ান এখন যেদিকেই তাকাচ্ছে সেদিকেই অন্ধকার দেখছে। হানিয়াকে নিজের জীবনে বা এই সংসারে ফিরিয়ে আনার কোন উপায় দেখছে না। সে নিজেই সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। কার কাছে যাবে জাভিয়ান? কার কাছে গেলে হানিয়াকে ফিরে পাবে সে?
____________
আবরার হানিয়ার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবারো রওনা দিয়েছে রাজশাহীর উদ্দেশ্য। হুট করে হানিয়া তাকে ঢাকায় আসতে বলায় অফিস থেকে দুই দিনের ছুটি নিয়ে এসেছে। আসা যাওয়া করতেই তার একদিনের বেশি সময় লেগে যাবে। আবরার চাচ্ছে হানিয়াকে নিয়ে রাজশাহীতে একেবারে শিফট করতে। তার বাবাই যথেষ্ট হানিয়ার জীবনটা বিষিয়ে দিতে সেটা আবরার খুব ভালো করে জানে এবং মানেও। আসার সময় আবারও বলে এসেছে বাবা-মাকে হানিয়াকে যাতে এসব বিষয় নিয়ে কোন জেরা বা প্রশ্ন না করে।
____________
মাঝে কেটে যায় দু’টো দিন। হানিয়া নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছে সবকিছু থেকে। সবকিছু তার কাছে বিষাক্ত লাগছে। জীবনের প্রথম ভালোবাসার মানুষটির থেকে সীমাহীন কষ্ট আর ধোঁকা পেয়ে সে কিছুতেই নিজেকে সামতালে পারছে না। ইনায়া আজ এসেছে তাঁকে নিয়ে বাহিরে যাবে বলে। আইডিয়াটা আবরারই তাঁকে দিয়েছে। ইনায়া সকাল সকাল হানিয়াদের বাসায় এসে জোর করে তাঁকে কলেজে নিয়ে যায়। দু’টো ক্লাস শেষ হওয়ার পর পনেরো মিনিটের ব্রেক দেওয়া হয়,,তারপর আসে আদিয়াত।
আদিয়াত ইনায়ার কাছ থেকে সবটাই জানতে পেরেছে। ক্লাসে ঢুকেই সে হানিয়ার দিকে তাকায়। হানিয়ার মলিন মুখটা তার বুকে খুবই সুক্ষ্ম একটা পীড়া দেয়। তার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা আজ অনেক মিস করছে আদিয়াত। ক্লাস চলাকালীন পুরোটা সময় আদিয়াত লুকিয়ে চুরিয়ে হানিয়াকে দেখেছে। ক্লাসের সময় শেষ হয়ে যাওয়ার পর আদিয়াত শেষ বারের মতো হানিয়াকে দেখে ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে যায়।
ইনায়া তার স্বভাব অনুযায়ী বকবক করছে। কথা বলতে বলতে তারা কলেজের বাহিরে চলে আসে। ইনায়া আজ ঠিক করেছিলো হানিয়াকে নিয়ে বিকেল পর্যন্ত ঘুরবে। তারপর বাসায় যাবে। কিন্তু তার সেই প্ল্যানে এক বালতি পানি ঢেলে দাঁড়িয়ে আছে তারই প্রিয়তম স্বামী। ডা. এহসানের আজ ডিউটি না থাকায় ইনায়াকে নিয়ে ঘুরার ইচ্ছে পোষণ করে। ইনায়া তাকে একটা ধমক দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দিতে চাইলে হানিয়া উল্টো তাকে ধমকিয়ে এহসানের সাথে পাঠিয়ে দেয় ঘুরতে। ডা. এহসান তাকে-ও তাদের সাথে যাওয়ার অফার করলে হানিয়া তা নাকচ করে দেয়। তারা স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত সময়ে তার না যাওয়াই উচিত বলে সে মনে করেছে। ইনায়া তাঁকে জোর করলে হানিয়া মিথ্যা অজুহাত দিয়ে তাদের থেকে বিদায় নিয়ে বাসস্ট্যান্ডের দিকে হাটা দেয়।
আনমনে রাস্তায় হাঁটছিলো ইনায়া তখনই তার সামনে এসে উপস্থিত হয় একজন। হানিয়া চোখ তুলে তার দিকে তাকালে দেখতে পায় তার একসময়ের প্রিয় মানুষটি এসে উপস্থিত হয়েছে তার সামনে। এলোমেলো জাভিয়ানকে দেখে হানিয়ার কপালে কয়েকটা ভাজ পরে। তাও সে জাভিয়ানকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে জাভিয়ান তার হাত ধরে আটকে দেয়। অস্থির কণ্ঠে জাভিয়ান তাকে বলে–
–হানি,,একটু কথা শুনো প্লিজ। একটু কথা বলার সুযোগ দাও আমায়।
হানিয়ার ভেতরটা কষ্ট ও রাগে ফেটে গেলেও উপরে একদমই শান্ত। হানিয়া শান্ত কণ্ঠে জাভিয়ানকে বলে–
–হাত ছাড়বেন নাকি চেচিয়ে লোকজোর করবো?
জাভিয়ান হাতটা তো ছাড়েই না বরং আরো শক্ত করে চেপে ধরে বলে–
— না ছাড়বো না। আমার কথাটা একটু শুনো। আমার ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে তোমার সাথে কথা বলার জন্য।
–হাত ছাড়ুন মি. তালুকদার।
–হানি…..
হানিয়া এবার নিজের ভেতরের রাগটা আর চেপে রাখতে পারে না। ঝটকা দিয়ে নিজের হাত জাভিয়ানের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে হাঁটা দেয়। জাভিয়ান দৌড়ে তার কাছে আবার হাত টেনে ধরলে হানিয়া এবার তার দিকে ফিরে কষিয়ে একটা থাপ্পড় লাগায়। চিৎকার করে বলতে থাকে–
–আমার কাছে কি হ্যাঁ? শান্তি দিবেন না আমায় আপনি একটুও? এবার কি মরে গেলে তারপর শান্তি পাবো? বলেছি না আপনার সাথে কোন সম্পর্ক নেই আমার। তাও এমন দেবদাস চেহারা নিয়ে আমার সামনে এসে কি প্রমাণ করতে চাচ্ছেন আপনি? আর কোনদিন যদি আমার হাত ধরার দুঃসাহস দেখিয়েছেন তাহলে সেদিন সত্যি সত্যিই লোক দিয়ে গণধোলাই খাওয়াবো। সময় থাকতে শুধরে যান মি.তালুকদার।
জাভিয়ান নিজের বাম গালে হাত দিয়ে হা করে হানিয়ার কথাগুলো শুনে। হানিয়ার এমন রুদ্রাণী রূপ সে আজই প্রথম দেখলো। এ যেন এক নতুন হানিয়া,,যাকে ভাঙা তো দূরের কথা ছুঁতে গেলেই ঝলসে দিচ্ছে নিজের রূপ দ্বারা।
শব্দসংখ্যা~১৪৯০
~~চলবে?
#প্রতিশোধের_অঙ্গীকার
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_সাতচল্লিশ(বর্ধিতাংশ)
–ভাইয়া,,হানিয়া সুইসাইড করেছে।
কথাটা বলেই সোনিয়া হাউমাউ করে কেঁদে দেয়। আবরারের হাত থেকে ফোন পরো যেতে নিলে সে কোন মতো সেটা সামলে নেয়। আবরার ভাঙ্গা গলায় বলে–
–শ্বাস চলছে নাকি…..
আর বলতে পারে না। কান্নাগুলো একদম কণ্ঠনালীতে এসে জমা হয়েছে। বোন টাকে বাঁচাতে পারলো না বোধহয় আর। সমাজ আর তাঁদের আশেপাশের মানুষ বাঁচতে দিলো না। সোনিয়া আবরারের প্রশ্ন শুনে আরো জোরে কেঁদে উঠে। জোড়ের বোন তার,,সেই বোনটা কতটা কষ্ট আর অবহেলা পেয়ে আজ এই পদক্ষেপ নিয়েছে সেটা সোনিয়া একটু হলেও বুঝতে পারে। সে হানিয়ার নাকের কাছে তার দুই আঙুল এনে শ্বাসপ্রশ্বাস চলছে কিনা চেক করে। চলছে শ্বাস। কিন্তু খুবই আস্তে। সোনিয়া নিজেকে সামলে বলে–
–ভাই চলছে শ্বাস। কিন্তু অনেক আস্তে আস্তে ফেলছে।
কথাটা বলে আবারো ডুকরে কেঁদে উঠে সে। আবরার এবার ভেঙে পরতে চায়। শুক্র-শনিবার অফিস বন্ধ থাকায় সে রাজশাহী থেকে ঢাকায় ফিরছিলো কিন্তু ভোরবেলায় সোনিয়া তাকে অস্থির হয়ে কল লাগিয়ে জানায় হানিয়া কাল সন্ধ্যার পর থেকে রুম থেকে বের হয়নি। ফজরের নামাজ পড়ার জন্য সোনিয়া ডাকতে আসলে তখনও খুলে না। নামাজ শেষ করে সে আর তাদের মা আবারও দরজা ধাক্কায়,,হানিয়াকে বলে দরজা খুলতে কিন্তু তখনও খুলে না। এতে করে তারা চিন্তায় পরে গেলে সোনিয়া ভাইকে কল লাগিয়ে ঘটনা জানায়। আবরার তৎক্ষনাৎ তাদের পাশের ফ্ল্যাটের একজন প্রতিবেশী আর দারোয়ানকে কল করে তাদের বাসায় এসে হানিয়ার দরজা ভাঙতে বলে। তারা তাই করে,দরজা ভাঙা শেষ হলে তারা উপস্থিত সকলে হানিয়ার নিস্তেজ শরীর আর রক্তে রঞ্জিত দু’হাত দেখে বুঝতে পারে হানিয়া কত বড় একটা কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছে। আবরার পুরোটা সময় লাইনে ছিলো। এমন একটা সংবাদ পেয়ে এসি গাড়িতে বসেও ঘেমে একদম চুপসে গেছে। বহু কষ্টে নিজেকে সামলে সোনিয়াকে বলে–
–এম্বুল্যান্সে কল কর। আমি রাস্তায় আসছি,,জ্যাম না থাকলে আমিই ফিরে নিয়ে যাবো। ততক্ষণে শ্বাস নেওয়া বন্ধ না করলেই হয়।
কথাটা বলতে বলতে আবরারের চোখ বেয়ে কয়েক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পরে। সোনিয়া কলটা কেটে এম্বুল্যান্সে কল লাগায়। তার মা হানিয়ার পাশে বসে বিলাপ করে কাঁদছে আর তাদের বাবা স্তব্ধ হয়ে হানিয়ার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না হানিয়া এত বড় একটা স্টেপ নিয়েছে।
এম্বুল্যান্স আসার আগেই আবরার এসে পৌছায়।সে বাসার অনেকটা কাছাকাছিই ছিলো আর এতো সকালে জ্যাম না থাকায় ১৫ মিনিটেই এসে পৌঁছে গেছে। লিফটের সাহায্যে তাড়াতাড়ি করে নিজেদের ফ্ল্যাটের সামনে এসে পৌঁছালে দেখতে পায় তাদের বিল্ডিংয়ের অনেকই তাদের ফ্ল্যাটে এসে ভীর জমিয়েছে আর তাদের ফ্ল্যাটের দরজাটা হা করে খোলা। আবরার চঞ্চল পায়ে বাসার ভেতর প্রবেশ করলে মানুষের গুঞ্জনের পাশাপাশি তার মায়ের আহাজারিও কানে এসে পৌঁছায়। আবরার কারো দিকে না তাকিয়ে হানিয়ার রুমে আসলে দেখতে পায়,, তার মা হানিয়ার একপাশে বসে কাঁদছে কয়েকজন মহিলা তাঁকে ধরে রেখেছে। সোনিয়াও হানিয়ার পাশে বসে কাঁদছে। হানিয়ার দিকে নজর দিলে দেখতে পায় একদম শান্ত পুতুলের মতো ঘুমিয়ে আছে। তাট দু’হাত দুই দিকে রাখা,, এবং হাতে রক্তলাল কাপড় নজরে পরে। আবরার আরেকটু এগিয়ে আসলে দেখতে পায় হানিয়ার বেডের একপাশ ও ফ্লোরের অনেকটা অংশে রক্ত পরে আছে। ছোট থেকেই আবরার আর হানিয়া রক্ত দেখতে পেতো না। ব্লাড ফোবিয়া আছে তাদের। কিন্তু আজ বোনের এতো রক্ত দেখে আবরার ভয় পায় না বরং নিজেকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় লুজার মনে হয়। বোনকে এই নষ্ট সমাজ থেকে রক্ষা না করতে পারার কারণে। না সমাজ না,, সমাজ তো এখনো জানে না তার বোনের ডিভোর্সের কথা। বরং তাদের জন্মদাতা পিতাই এমনটা করেছে বলে তার মনে হচ্ছে। সে কাঁপা কাঁপা পায়ে হেটে হানিয়ার বেডের সামনে এসে এক হাঁটু গেড়ে বসে। বোনের গালে হাত রাখলে অনুভব করে শরীরটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। আবরার কান্নামাখা গলায় বোনের উদ্দেশ্য বলে–
–আরেকটু সহ্য করতি। আমি বলেছিলাম তোকে নিয়ে যাবো এবাড়ি থেকে। সবার থেকে দূরে নিয়ে যেতাম তোকে। যেখানে কেউ তোকে কষ্ট দিতো না,নিজের স্বার্থের জন্য ব্যবহার করত না। আরেকটু অপেক্ষা কি করতে পারতিস না তুই?
আবরারের প্রশ্নের কোন জবাব আসে না। আবার আর সময় অপচয় না করে বসা থেকে দাঁড়িয়ে পরে তারপর আলতো করে হানিয়াকে কোলে তুলে নেয়। রুম থেকে বের হওয়ার সময় রুমের ভেতরেই এক কর্ণারে মি.মির্জাকে নজরে পরে। তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলে–
–আপনাদের মেয়ে না আমার আমানত হিসেবে রেখে গিয়েছিলাম ওকে। তাও আজ ওর এই অবস্থা। আজ দ্বিতীয় বারের জন্য ওকে এই বাড়ি থেকে নিয়ে যাচ্ছি। বেঁচে থাকলে ওকে নিয়ে আমি সারা জীবনের জন্য এই শহর ত্যাগ করবো। আর মরে গেলে ওর সাথে আমাকেও হারাবেন আপনারা। কথাটা মনে রাখবেন।
কথাটা বলে আবরার গটগট করে চলে যায় হানিয়াকে নিয়ে। সোনিয়াও দৌড় লাগায় ভাইয়ের পেছন পেছন। মি. মির্জা তখনও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
____________________
হানিয়াকে হসপিটালে আনার পর ডাক্তাররা তাঁকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানান হানিয়ার শরীর থেকে প্রায়ই ৬০% রক্ত বের হয়ে গেছে। আর সেই সাথে সে একটা বিশাল পরিমাণের ঘুমের ঔষধও নিয়েছে। কোন ঔষধ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি নিলে সেটা যে একপ্রকার বিষ হয়ে যায় তা আমরা সবাই জানি। ডাক্তাররা তাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করছে বলে জানান। হানিয়াকে কম করে হলেও ৬-৮ ব্যাগ রক্ত দেওয়া লাগবে। হসপিটাল থেকে মাত্র দুই ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করা গেলেও বাকি রক্ত হানিয়ার পরিবারকে ব্যবস্থা করতে বলেন ডাক্তাররা। আবরার পাগলের মতো চেনা পরিচিত সকলের কাছে রক্তের কথা বলছে।
এর মধ্যে ইনায়াকে দেখা যায় দৌড়ে আসতে। গতকালের মতো আজও সে সকালে হানিয়াকে নিতে তাদের বাসায় গিয়েছিলো। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাদের প্রতিবেশীদের কাছ থেকে এই ঘটনা শুনে ছুটে এসেছে হসপিটালে। তার সামনে ডা.এহসানও এসেছে। ইনায়া কাঁদতে কাঁদতে অবস্থা খারাপ করে ফেলেছে নিজের। আবরার তাঁদের দু’জনকে হানিয়ার কন্ডিশন সম্পর্কে জানায়। তারা দু’জনও সব জায়গায় খোঁজ করতে থাকে রক্তের।
______________________
স্পর্শ নাস্তা করে ড্রয়িংরুমে বসেছে। তার মা আর সোহা তার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলছে। স্পর্শের তাদের দু’জনকে কেনো যেনো ভালো লাগছে না। তারা নিজেদের মতো বকবক করছে। এক পর্যায়ে তারা দু’জনই স্পর্শের বিরক্তি টের পেয়ে উঠে পরে সেখান থেকে। তারা চলে গেলে তার বাবা আর মনি এসে তার পাশে বসে। দু’জনের মনই খারাপ। তাদের দেখাদেখি কুলসুমও এসে তাদের পাশ দিয়ে বসে থাকে। হুট করে কুলসুম স্পর্শকে বলে–
–আপা ভাবীরে একটা কল দেন না। কতদিন হইলো হের লগে কতা হয় না।
রোজি বেগমও কুলসুমের কথায় সায় দেয়। ফোনটা আরো আগেই কেনা হয়েছে তার। হানিয়া নিজেই চেনা পরিচিত সব নাম্বার স্পর্শের ফোনে সেভ করে দিয়েছিলো। স্পর্শ তার বাবার দিকে তাকালে মি. তালুকদারও মাথা নাড়িয়ে তাঁদের কথায় সম্মতি দেয়। স্পর্শ তার ফোন দিয়ে হানিয়াকে কল লাগায়। কিন্তু হানিয়া রিসিভ করে না। পরপর আরো কয়েকবার ফোন লাগায় কিন্তু তাও হানিয়া রিসিভ করে না। তারপর সোনিয়ার নাম্বারে কল লাগায়। সেটাও রিসিভ হয় না। শেষে ইনায়াকে কল লাগায়। দুই বারের সময় ইনায়া রিসিভ করে। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে ইনায়া তাঁকে সালাম দিলে স্পর্শের কপালে কয়েকটা ভাজ পরে। সে সালামের জবাব নিয়ে ইনায়াকে বলে–
–কি হয়েছে তোমার ইনায়া? কাঁদছো কেনো? আর হানিয়া কি তোমার সাথে আছে? ওকে কতবার কল দিলাম কিন্তু একবারও রিসিভ করলো না।
ইনায়া কান থেকে ফোনটা সামনে এনে দেখে স্পর্শের নাম্বার। সে কণ্ঠে কঠোরতা এনে বলে–
–হানিয়া রিসিভ করার মতো অবস্থাতে নেই তাই রিসিভ করে নি। আদৌও আর কখনো রিসিভ করতে পারবে কিনা তাও জানা নেই আমার।
–কেন? কি হয়েছে ওর?
–কিছু হয়নি। শুধু মাত্র জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আছে বর্তমানে। আপনার ভাইকে কিন্তু অবশ্যই খবরটা দিবেন আপু। তার জন্য তো খুশির সংবাদ এটা।
হানিয়ার স্বাস্থ্যের কথা শুনে স্পর্শ বিচলিত হয়ে উঠে। সে অস্থির কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে–
–খোলাসা করে বলো ইনায়া। হানিয়ার কি হয়েছে? আর ও জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে মানে?
–সুইসাইড করেছে হানিয়া। বাঁচবে কিনা ডাক্তাররা গ্যারান্টি দিতে পারছে না। হাতের রগ কাটার কারণে প্রচুর ব্লাড লস হয়েছে,,আমরা সবাই হন্য হয়ে ওর গ্রুপের ব্লাড খুঁজছি।
কথাটা শুনে স্পর্শ হাত থেকে ফোনটা পরে যায়। অন্য সবার মতো সে-ও বিশ্বাস করতে পারছে না যে হানিয়া এমন একটা কাজ করেছে। অন্যদিকে তার পাশে উপস্থিত বাকি তিনজন তার কথা এবং কাজে অবাক হয়ে যায়। রোজি বেগম তাঁকে ঝাঁকালে সে ধ্যানে ফিরে। রোজি বেগম স্পর্শকে জিজ্ঞেস করে–
–কি হয়েছে হানিয়ার? আর ইনায়া কি বললো যে তোর হাত থেকে ফোনটা পরে গেলো? বল না।
স্পর্শ উপস্থিত সকলের মুখের দিকে একবার করে তাকায়। সকলেই উদগ্রীব হয়ে আছে হানিয়ার সম্পর্কে জানার জন্য। স্পর্শ তাদের বলে–
–হানিয়া সুইসাইড করেছে। অবস্থা ভালো না। ডাক্তাররা গ্যারান্টি দিতে পারছে না তার হেল্থ সম্পর্কে।
সকলে বাকরুদ্ধ হয়ে স্পর্শের কথা শুনে। কেউ কিছু বলার আগেই অন্য একটি কাতর কন্ঠের আর্তনাদ শোনা যায়–
–কি বললো তুই পুতুল? হানিয়া সুইসাইড করেছে?
সকলে ব্যক্তিটির দিকে তাকালে দেখতে পায় উষ্কখুষ্ক চুল,,বিধস্ত মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জাভিয়ান। প্রশ্ন সেই করেছে। স্পর্শ ভাইয়ের কাছে এগিয়ে এসে বলে–
–ইনায়া তো তাই বললো।
জাভিয়ানের মন-মস্তিস্ক কোনটাই কথাটা নিতে পারে না। হাত-পায়ে কাঁপন ধরে টাল না সামলাতে পেরে পরে যেতে নিলে স্পর্শ জাভিয়ানকে ধরে ফেলে।
–ভাই কি হয়েছে তোর?
বাকি সকলেও তার কাছে এসে তাঁকে ধরে সোফায় বসিয়ে দেয়। কুলসুম এক গ্লাস পানি এনে স্পর্শকে দিলে সেটা স্পর্শ খাইয়ে দেয় জাভিয়ানকে। নিচে থেকে স্পর্শ আর বাকি সকলের জোরে কথা বলার আওয়াজ শুনে মিসেস তালুকদার ও সোহাও তাদের ঘরে ছেড়ে নিচে চলে আসে। মিসেস তালুকদার তাদের জিজ্ঞেস করে–
–কি হয়েছে? এত চিৎকার চেঁচামেচি কেনো?
কেউ তার প্রশ্নের উত্তর দেয় না,, বলা চলে দেওয়ার আগ্রহ পায় না। জাভিয়ান নিজেকে সামলে বলে–
–কোন হসপিটালে আছে হানিয়া?
–সেটা তো বলো নি ইনায়া। মেয়েটা কাঁদছিল,, কান্নার কারণে কথাও বলতে পারছিলো না।
–আর কি বলেছে হানিয়া সম্পর্কে?
–কন্ডিশন ভালো না। ব্লাড লাগবে কয়েক ব্যাগ কিন্তু হানিয়ার গ্রুপের ব্লাড পাওয়া যাচ্ছে না।
রোজি বেগম আর কুলসুম কান্নায় ভেঙে পরে। মেয়েটা তাদের ভীষণ প্রিয় ছিলো, কাছের মানুষও ছিলো। মি. তালুকদারও ধপ করে বসে পরেন সোফায়। তার বারবার মনে হচ্ছে আজ তার কারণেই হানিয়ার এই অবস্থা। না তিনি হানিয়া-জাভিয়ানের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে মির্জা সাহেবের কাছে যেতেন আর না তাদের বিয়ে হতো। বিয়েটা না হলে এত কিছুও হতো না।
কিছুক্ষণ পর স্পর্শ বলে–
–বাবা আমাদের কি একবার যাওয়া উচিত নয় হানিয়াকে দেখতে?
মি. তালুকদার এবার নিজেকে সামলাতে পারেন না। নিজের শরীর সোফায় এলিয়ে দিয়ে চোখে হাত রেখে কান্না করে দেন। কাদতে কাঁদতে বলে–
–কোন মুখে যাবো বল তুই? ওই মেয়েটার এই অবসর জন্য তো আমিই দায়ী। আমার পরিবারের মানুষ গুলো দায়ী। কোন মুখ নিয়ে ওকে দেখতে যাবো?
সকলে অবাক হয়ে যায় তার কান্নার দেখে। মিসেস তালুকদারও হা হয়ে যান। এত বছরের সংসারে সে গুটিকয়েক বার স্বামীকে কাঁদতে দেখেছেন। সেই গুটিকয়েক বারের মধ্যে আজ একদিন। সামান্য বাহিরের একজন মেয়ের জন্য তার শক্তপোক্ত স্বামীটা এতো ভেঙে পরেছেন। হানিয়ার জন্য তার মনে আরো ক্ষোভ তৈরি হলো। সে এগিয়ে এসে স্বামীর পাশে বসে তাকে শান্ত করতে করতে বলে–
–একটা বাহিরের মেয়ের জন্য এতোটা ভেঙে পরলেন স্পর্শের বাবা? দেখেন গিয়ে কোন অকাজ কুকাজ করতে গিয়ে ধরা পরেছে তাই লোকলজ্জায় এসব করেছে। ওই মেয়ের তো চরিত্রের এমনিতেও ঠিক নেই।
মি. তালকদার এবার রক্তিম চোখে স্ত্রীর দিকে তাকান। রাগে হিসহিসিয়ে বলে–
–বাচ্চারা না থাকলো এখান আমি এতো বছরে যেটা না করেছি সেটা করে দিতাম। কষিয়ে তোমায় একটা লাগাতে পারলে আমার বুকের ভেতরের যন্ত্রণাটা কম হতো।
সকলে এবার আরেক দফায় চমকে যায়। উপস্থিত সকলে জানে মি. তালুকদার তার স্ত্রীকে কতটা ভালোবাসেন। সেই ব্যক্তি নাকি ছোটদের সামনে এমন একটা কথা বললেন নিজের স্ত্রীকে। মিসেস তালুকদার এবার নিজেও রেগে গিয়ে বলেন–
–ওই বাহিরের মেয়েটার জন্য আজ আপনি আমায় এই কথাটা বলতে পারলেন স্পর্শের বাবা?
–হ্যাঁ পারলাম। তুমি এটারই যোগ্য। আর কি বাহিরের মেয়ে বাহিরের মেয়ে লাগিয়ে দিয়েছো। হানিয়া-জাভিয়ানেট এখনো ডিভোর্স হয়ে যায় নি। আর আমি বেঁচে থাকতে হবেও না। আমি প্রয়োজনে ওকে নিজের আরেক মেয়ে করে নিজের কাছে রেখে দিবো। তাও ওকে চিরদিনের জন্য এই বাড়ি থেকে সম্পর্ক চুকাতে দিবো না।
–কি এমন করেছি আমি যার জন্য আপনি আমায় এই কথাটার যোগ্য মনে করলেন?
–তুমি কি মনে করেছো আমি কিছু না জেনেই এমন চোটপাট করছি? ভুলে গেলে আমার ফোন দিয়ে কিন্তু তুমি কথা বলেছো হানিয়ার বাবার সাথে।
মিসেস তালুকদারের মুখ এবার চুপসে যায়। চোরের মতো এদিক ওদিক তাকাতে থাকে। স্পর্শ বাবার কাছে এসে বলে–
–কি বলছো তুমি এসব বাবা? মা কি কথা বলেছে আঙ্কেলের সাথে?
–কাল আমি ফোন বাসায় রেখেই আসরের নামাজ পড়তে মসজিদে গিয়েছিলাম। একেবারে মাগরিবের নামাজ পড়ে বাসায় ফিরি। এসে দেখি তোর মা বেশ হাসি হাসি মুখ করে বসে আছে। তখনই আমার একটু সন্দেহ হয়। রাতে একজনকে কল দেওয়ার জন্য ফোন নিলে কল লিস্টে হানিয়ার বাবার নাম্বার দেখে চমকে যাই। দেখি ১৫মিনিট কথা বলা হয়েছে তার সাথে,, কিন্তু হানিয়া ও বাড়ি যাওয়ার পর একদিনও তাদের সাথে আমার কথা হয়নি। কি কথা হয়েছে জানার জন্য রেকর্ডার অন করলে যা শুনি তা আমি নিজের মুখেও উচ্চারণ করতে পারবো না। (ফতুয়ার পকেট থেকে নিজের ফোন বের করে রেকর্ডার চালু করে সেন্টার টেবিলের উপর ফোনটা রেখে বলে) নে তোরাই শুনে নে।
কথাটা বলে মি. তালুকদার রেকর্ডার অন করে দেয়। সকলে শুনতে পায় মিসেস তালুকদারের জঘন্য কাজটার কথা। সে হানিয়ার বাবাকে এমন কোন খারাপ কথা নেই যা বলেনি। বেশির ভাগই মিথ্যাে কথা। হানিয়াকে খারাপ চরিত্রের মেয়েও বলেছেন। তাদের শিক্ষা,, যোগ্যতা,,স্টাটাস সব নিয়ে বিশ্রী ভাবে বলেছেন। লাস্টে বলেছেন “এমন মেয়ে আমার ঘরে থাকলে আমি ওকেসহ নিজেও দড়ি কলসি গলায় বেঁধে নদীতে ঝাপ দিতাম।” কথাটা বলে কলটা কেটে দেয়। সকলে রেকর্ডিংটা শুনে কথা বলা ভুলে যায়। একটা মানুষ কতটা খারাপ হলে, কতটা অকৃতজ্ঞ হলে এমন জঘন্য একটা কাজ করতে পারে। জাভিয়ান-স্পর্শ হতভম্ব দৃষ্টিতে মিসেস তালুকদারের দিকে তাকিয়ে থাকে। যেই মেয়েটা কিছুদিন আগে নিজ দায়িত্বে তাদের মেয়েকে সুস্থ করে তুললো সেই মেয়ের জন্য তার মনে এতো ক্ষোভ? এত বিদ্বেষ?
স্পর্শ মায়ের কাছে এসে বলে–
–যার বাবাকে তুমি এত খারাপ খারাপ কথা বললে সেই মেয়েটার জন্যই কিন্তু আজ তোমার মেয়ে সুস্থ সবল হয়ে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে,এটা জানার পরও তুমি এমন একটা কাজ কীভাবে করতে পারলে আম্মু?
মিসেস তালুকদার উত্তর দেওয়ার মতো কোন শব্দ খুঁজে পায় না। কেন যেনো সে একদম শুরু থেকেই হানিয়াকে দেখতে পারে না। আবরার যে স্পর্শকে ছেড়ে চলে গেছে এটা জানার পর আরো ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে তার মনে হানিয়ার জন্য। স্পর্শ কান্নামাখা গলায় বলে–
–জানো আম্মু এই মেয়েটা আমার এতো জ্বালা,,এত আঘাত সহ্য করেছে যে আমার মনে হয় ওর জায়গায় তোমরা কেউ থাকলে আমায় হয়ত এ্যাসাইলামেই দিয়ে আসতে। আমায় একদম বাচ্চাদের মতো যত্ন করে সারিয়ে তুলেছে। আমার অসুস্থতার পেছনে যে দায়ী তাঁকেও সকলের সামনে এনেছে। যথা যোগ্য শাস্তির ব্যবস্থাও করেছে। সেই মানুষটার জন্য তোমার মনে এতো কেন ক্ষোভ আম্মু?
মিসেস তালুকদার হালকা রাগী গলায় বলে–
–ওর ভাইয়ের জন্যই তো তুই অসুস্থ হয়েছিলি।
–না আম্মু। আবরারের জন্য আমার কিছুই হয়নি। বরং সাফাতের জন্য হয়েছে। সেদিন তো সব প্রমাণ সহ শুনলে,,দেখলে তাও এই কথা কিভাবে বলছো তুমি?
মিসেস তালুকদার নিরুত্তর থাকে। জাভিয়ান টলমল পায়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। স্পর্শের কাছে এসে বলে–
–হানিয়ার কাছে যাবো চল। গাড়িতে বসে ইনায়ার থেকে হসপিটালের নামটা জানা যাবে।
কথাটা বলেই জাভিয়ান দৌড়ে রুম থেকে নিজের গাড়ির চাবিটা নিয়ে নিচে আসে। স্পর্শকে নিয়ে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় মি. তালুকদারও বলেন তাদের সাথে যাবে সেও। রোজি বেগম আর কুলসুমও যেতে চাইলে তাদের নেওয়া হয় না। পরিস্থিতি বুঝে তারপর তাঁদের নিয়ে যাওয়া হবে।
_________________
হানিয়াদের বাসার কাছের একটা হসপিটালে তাঁকে নেওয়া হয়েছে। ইনায়ার থেকে হসপিটালের নাম জেনে তারা সেখানে এসে উপস্থিত হয়। গাড়ি থেকে বের হয়ে হসপিটালে প্রবেশের সময় দেখতে পায় হানিয়ার বাবা-মা’ও এসেছেন। তারা সকলে একসাথে হসপিটালে প্রবেশ করে। রিসেপশনিস্টের কাছ থেকে হানিয়া সম্পর্কে জেনে তারা সেখানেই যায়। ইমার্জেন্সি বিভাগে রাখা হয়েছে তাঁকে।
সেখানে আবরার,, সোনিয়া আর ইনায়াকে বসে থাকতে দেখা যায়। সকলে তাদের কাছে এগিয়ে যায়। স্পর্শ গিয়ে ইনায়াকে ডাক দিলে উপস্থিত তিনজনই তাদের দিকে তাকায়। সোনিয়া গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে। ইনায়া আর আবরার তাদের সকলকে দেখে প্রচন্ড রেগে যায়। উপস্থিত সকলে স্বার্থপর,,বেইমান,, নিষ্ঠুর। তার বোনকে সীমাহীন কষ্ট দিয়েছে এরা।
আবরার ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁদের সকলের উদ্দেশ্য প্রশ্ন করে–
–আপনারা এখানে কি করছেন? দেখতে এসেছেন আমার বোনটা কি মরে গেছে নাকি এখনো শ্বাস চলছে? চলে যান আপনারা সবাই। কাউকে লাগবে না আমার বোনের জন্য। বেঁচে থাকলেও খবর পাবেন মরে গেলেও খবর দেওয়া হবে। আসুন আপনারা।
শব্দসংখ্যা~২৪০০
~চলবে?
#প্রতিশোধের_অঙ্গীকার
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_আটচল্লিশ
আবরার গুটিগুটি পায়ে কেবিনে প্রবেশ করে। বেডে শুয়ে থাকা অসুস্থ,দুর্বল মানুষটির কাছে ভাইয়ের ক্লান্তি মাখা মুখটা একটুও ভালো লাগে না। আবরার তার দিকে তাকাচ্ছেই না। আবরার হানিয়ার বেডের পাশে বসে কিন্তু তাও তার দিকে তাকায় না। হানিয়া ক্যানোলা লাগালো হাতটা বাড়িয়ে ভাইয়ের হাতটা ধরার চেষ্টা করে,,কিন্তু ধরতে পারে না। দুর্বল হাতটা ভাইয়ের হাত স্পর্শ করার আগেই বেডের কর্নারে পরে গিয়ে হালকা ব্যথা পায়। ব্যথা পেয়ে হানিয়ার মুখ দিয়ে “আহ” শব্দটি বের হলে আবরার তড়িঘড়ি করে বোনের দিকে তাকিয়ে অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করে–
–কি হয়েছে বোন? কোথায় ব্যথা করছে? খারাপ লাগছে?
আবরার হানিয়ার পরে যাওয়া হাতটা নিজের হাতে নিয়ে দেখে ক্যানোলায় রক্ত এসে পরেছে। আবরার হানিয়ার হাতটা ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে কেবিনের বাহিরে যায়,,মিনিটের ব্যবধানে একজন নার্সকে নিজের সঙ্গে করে নিয়ে আসে। নার্সটি হানিয়ার ব্যথা পাওয়া হাতের ক্যানোলাটা খুলে আরেক হাতে লাগাতে গেলে,,হানিয়া দূরে সরে যায়। আবরার আর নার্সটি তার এমন কাজে ভ্রু কুঁচকে তাকালে হানিয়া বলে–
–আমার সাথে কথা না বললে আমি লাগাবো না ঐটা।
আবরার কর্কশ সুরে বলে–
–মেজাজ খারাপ করবি না। তাড়াতাড়ি হাত দে। স্যালাইন এখনো বাকি আছে অনেকটা।
হানিয়াও জেদ ধরে বলে–
–তাহলে তুমি আমার সাথে কথা বলবে?
–আমি কথা বলার কে তোর? আমার কোন মূল্য আছে তোর কাছে? সেদিন এত বুঝিয়ে গেলাম। ফিরে এসে কি দেখতে হলো আমাকে? তোর অচেতন মুখ আর রক্তাক্ত হাত জোড়া? এই তুই আমার কথার মূল্য দিলি?
হানিয়া মাথা নিচু করে নেয় ভাইয়ের কথা শুনে। সে-ও বা কি করতো? তার জন্মদাতা পিতা নিজে তাকে বলেছে মরে যেতে। মরার কথা সে কখনোই মাথায় আনে নি,,কিন্তু নিজের বাবার মুখে ওমন কথা শুনে তার মাথায় কিসের যেন একটা ভুত চেপে বসলো। তাই তো রাতে সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর আনুমানিক রাত ১টার দিকে সে ওই কান্ডটা ঘটিয়েছে। ভেবেছিলো সে না থাকলে সকলের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু তা আর হলো কই? উল্টো সকলের সমস্যা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
হানিয়াকে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে থাকতে দেখে আবরারের রাগ হয়। শুরু থেকেই তো তার বোনটার কোন দোষ নেই,,তারপরও দিন শেষে তাকেই অপরাধী হতে হয়। আবরার এগিয়ে এসে বোনের হাতটা নিজের হাতে নেয়,,তারপর নার্সে ইশারা করে ক্যানোলাটা লাগাতে। নার্স তার কাজ করে,, হানিয়া এবার আর কোন দ্বিরুক্তি করে না। নার্স তার কাজ শেষ করে চলে গেলে পুরো কেবিন জুড়ে পুনরায় নিস্তব্ধতার মেলা বসে।
হানিয়া আবরারকে বলে–
–আমাকে উঠিয়ে বসাও। শুয়ে থাকতে থাকতে পিঠ ব্যথা করছে।
আবরার তার কথা শুনে চোখ গরম করে তাকালে হানিয়া ইনোসেন্ট একটা চেহারা করে তার দিকে তাকায়। এতেই যেন কাজ হয়। আবরার বেডের পেছনের হার্ডবোর্ডের সাথে একটা বালিশ দিয়ে তারপর হানিয়াকে আধশোয়া করে বসিয়ে দেয়। নিজে হানিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে–
–ক্ষুধা পেয়েছে তোর? খাবি কিছু?
–হুম।
–কি খাবি বল? ভাই নিয়ে আসছি।
হানিয়া তার বত্রিশটা দাঁত দেখিয়ে বলে–
–আইসক্রিম খাবো ভাই।
আবরার অবাক হতে যেয়েও হয় না। এমন কান্ড তার সাথে আরো একবার হয়েছে। ছোট থাকতে একবার গ্রামে গিয়ে প্রতিবেশী বাচ্চাদের সাথে খেলতে গিয়ে নিজের যাতা অবস্থা করে এসেছিলো। হাত-পা ছিলে কি এক অবস্থা। তাঁদের মা মেয়েকে আদরের পরিবর্তে উল্টো আরো দু’টো লাগিয়ে দিয়েছিলো। আবরার তখন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাড়িতে এসে বোনের এমন করুণ অবস্থা দেখে তার ভীষণ খারাপ লাগে। আর এই খারাপ লাগাটাকে আরো বাড়িয়ে দিতে রাতে হানিয়ার ১০৪° জ্বরও এসেছিলো। কিচ্ছু খাওয়ানো যাচ্ছিল না তাকে। পরে আবরার এসে জিজ্ঞেস করে সে কি খেতে চায় তখন জ্বরে অর্ধ অচেতন হানিয়া বলে আইসক্রিম খাবে। ওটা না কিনে দেওয়া পর্যন্ত সত্যি সত্যিই সে কিছু খায় নি। আইসক্রিম ভীষণ প্রিয় হানিয়ার। আজও তাই হলো।
আবরার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে–
–আচ্ছা দিবো এনে। এমনিতে কি খাবি? আইসক্রিম খেলে তো আর পেট ভরবে না।
–কেন বেশি করে খেলে তো পেট-মন দুটোই ভরবে।
আবরার কড়া চোখে তাকিয়ে অনেকটা ধমক দিয়ে বলে–
–হানিয়াআআআ।
–জ্বি ভাইইইইইইইই।
হানিয়াও আবরারের মতো টেনে টেনে জবাব দেয়। পরবর্তীতে দুই ভাইবোনই হেঁসে দেয় অনেকটা উচ্চস্বরে। কেবিনের বাহিরে উপস্থিত সকলে অবাক হয়ে যায় ভাইবোনের হাসির আওয়াজ শুনে। জাভিয়ান সেই শুরু থেকে তাদের ভাই বোনের খুনসুটি দেখছে কেবিনের দরজায় লাগানো ছোট গোল গ্লাসটা দিয়ে। আজ প্রায় একমাস বা তারও বেশি দিন পর জাভিয়ান হানিয়াকে হাসতে দেখলো। নিজের বুকের ভেতরও একটা আনন্দ অনুভব করে সে।
এরই মধ্যে একজন নার্স হানিয়ার জন্য খাবার নিয়ে আসে। হসপিটালের আধা সেদ্ধ খাবার দেখে হানিয়ার খাওয়ার ইচ্ছেই চলে যায়। একবার তো বলেই ছিলো সে খাবে না এই খাবার,,এর পরিবর্তে আবরার এমন ভাবে তাকিয়েছে তার খাওয়ার ইচ্ছে সুরসুর করে চলে এসেছে। খাওয়া শেষে আবরার জানায় হানিয়াকে দু’একদিনের মধ্যেই হসপিটাল থেকে ছুটি দিয়ে দিবে। কথাটা শুনে হানিয়ার হাসি হাসি মুখটা চুপসে যায়। আবরারের নজরে পরে বিষয়টা। আবরার এতক্ষণ তাঁকে সুইসাইড সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস না করলেও এবার সে না জিজ্ঞেস করে পারে না। সে বোনের হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে–
–সেদিন কি হয়েছিলো হানিয়া? বাবা তোকে কি বলেছিলো যার কারণে তুই এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিলি? আমাকে এ টু জেড সব বলবি।
হানিয়া মলিন হেঁসে বলে–
–কি দরকার ভাই সেসব শুনে। বাদ দাও না।
–দরকার আছে কি নেই সেটা তোর না জানলেও চলবে। তোকে বলতে বলেছি তুই বল।
হানিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করে।
হানিয়ার সুইসাইডের দিন~~~
হানিয়ার ক্লাস দুপুরে আগেই শেষ হয়ে গেলেও সে বাসায় ফিরেছিলো বিকেলের দিকে। এসে শাওয়ার নিয়ে নামাজ পড়ে একটু শুয়ে ছিলো। অনেকটা ঘুমিয়েও পরেছিলো তখনই তার মা এসে মেয়েকে শোয়া থেকে উঠিয়ে পরপর ৩-৪টা থাপ্পড় মারেন। হুট করে এমন একটা ঘটনা ঘটায় হানিয়া কিছুই বুঝতে পারে না। থাপ্পড় মারার পর তার মা তার চুলের মুঠি ধরে বলতে থাকেন–
–এই কারণে বুঝি তোর সংসার করতে মন চায় না এখন আর? এই কারণে ছাড়াছাড়ি করতে চাচ্ছিস? এই তুই এমন বারো ভা** হলি কবে থেকে? স্বামী রেখে তোর অন্য পুরুষের কাছে যাওয়া লাগবে কেন হ্যা? এত জ্বালা কেন শরীরে তোর?
হানিয়া তার মায়ের কথা বা কাজ কিছুই বুঝতে পারছে না। আবার তার চুলের মুঠি এতো শক্ত করে ধরায় মাথা ব্যথাও শুরু হয়েছে। সে মায়ের হাত থেকে চুল ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলে–
–আম্মু ব্যথা লাগছে মাথায়। ছাড়ো,, আর কি বলছো এইসব? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
–বুঝতে পারছিস না। চল বাহিরে। তোর বাবা বুঝাবে সব।
কথাটা বলে সে হানিয়ার চুলের মুঠি ধরেই টেনে তাকে ড্রয়িংরুমে এনে ধাক্কা দিয়ে ফ্লোরে ফেলে দেয়। হানিয়া হাতে পায়ে ব্যথা পেলেও সেদিকে পাত্তা দেয় না। ফ্লোর থেকে উঠে দাড়িয়ে তার বাবাকে প্রশ্ন করে–
–আব্বু আম্মু এমন করছে কেন আমার সাথে? কি করেছি আমি?
মি. মির্জা থমথমে গলায় বলে–
–জানো না কি করেছো?
–নাহ। বলো কিসের শাস্তি দিলো আম্মু আমাকে?
–দু’টো চড় দেওয়াতেই তোমার শাস্তি মনে হচ্ছে। আমার তো তোমাকে নিজের হাতে গলা টিপে মেরে ফেলতে মন চাচ্ছে। আমার ওরশজাত হয়ে তুমি এমন চরিত্রের অধিকারী কিভাবে হতে পারলে?
হানিয়া বাবার মুখে এমন কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে যায়। কি এমন করেছে সে যার কারণে তার বাবা-মা দুজনেই তাকে এমন ভর্ৎসনা করছে? সে ভাঙা গলায় বলে–
–বাবা।
–খবরদার তোমার ওই নোংরা মুখ দিয়ে আমায় বাবা বলে ডাকবে না। তোমার মতো নষ্টা চরিত্রের মেয়ের বাবা আমি নই। আজ থেকে তুমি আমার কাছে মৃত। যে মেয়ে স্বামী থাকা সত্বেও বহিরাগত হয় সেই মেয়ে থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। এই তুমি এই বাসায় না এসে কোন গাড়ি বা রেললাইনে মাথা দিতে পারলে না। তাহলে আমার বাসাটা অপবিত্র হতো না তোমার সংস্পর্শে।
বাবারা মেয়েদের মনে সবসময় একটা বিশেষ জায়গায় থাকে। বাবারাও মেয়েদেরকে একটু বেশিই ভালোবাসে। কিন্তু হানিয়ার ভাগ্যে ছোট থেকে এসবের কিছুই জুটেনি। ছোট থেকে সে তার বাবার থেকে শুধু তুচ্ছতাচ্ছিল্যই পেয়ে এসেছে। অন্যান্য বাবারা তাদের কন্যা সন্তানদের যদি একটু ধমক দিয়েও কথা বলেন তাহলে কন্যার চেয়ে বেশি কষ্ট বাবারাই পান। কিন্তু সেখানে হানিয়ার বাবা আজ তাকে কতগুলো বিষাক্ত কথা শুনিয়ে দিলো। তাঁকে মরে যাওয়ার জন্য নানা পন্থাও বলে দিলো। হানিয়ার জীবনটা এমনিতেই তিক্ততায় ভরপুর সেখানে এসে আরো একটা তিক্ততা যোগ হলো। তার বাবা তার মৃত্যু কামনা করছে। ছোট থেকেই সে তার বাবার চাওয়া ইচ্ছে গুলে তেমন একটা পূরণ করতে পারে নি। আজ মনে হলো এই ইচ্ছেটা পূরণ করা যাক। যদি বাবা তার কাজ টায় খুশি হন। সে তার রুমে প্রবেশের পূর্বে একটা কথাই বলে–
–নিজের জীবন দিয়ে হলেও তোমার বাসার পবিত্রতা ফিরিয়ে দেবো। কথা দিলাম।
তারপর নিজের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। মি.মির্জার মেজাজ অত্যধিক খারাপ হওয়ায় সে বাসার বাহিরে চলে যান। আর মিসেস মির্জা সোফায় বসেই কাঁদতে থাকে। সোনিয়া তখন বাসায় ছিলো না তাই এসবের কিছুই জানে না সে।
বর্তমান~~
কথাগুলো বলতে বলতে হানিয়ার চোখে পানি এসে পরে। আবারও সে ব্যর্থ হলো বাবার ইচ্ছে পূরণ করতে। পূরণ করতে পারলো না তার দেওয়া কথা। তার জীবনটাই ব্যর্থ। আবরার এগিয়ে এসে বোনকে জড়িয়ে ধরে। হানিয়াও ভাইকে জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কেঁদে উঠে। যতসময় যায় তার কান্নার আওয়াজ বাড়তে থাকে। সে কাঁদতে কাঁদতে বলে–
–ভাই আমি মির্জা আর তালুকদার কোনবাড়িতে যাবো না। তুমি আমায় অনেক দূরে কোথাও পাঠিয়ে দাও। যেখানে আমায় ভালোবাসার মানুষ থাকবে,,আমার কথা চিন্তা করার মানুষ থাকবে,, আমায় বুঝবে,, নিজেদের সিদ্ধান্ত গুলো আমার উপর চাপিয়ে দিবে না এমন জায়গায় আমায় পাঠিয়ে দাও ভাই। আমি আর এই শহরে থাকতে চাই না। এই শহরের মানুষ গুলো বড্ড স্বার্থপর ভাই। তারা শুধু নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত থাকে,, প্রতিশোধ পূরণে এরা সদা মত্ত। আমি আর টিকতে পারছি না এই স্বার্থপরদের মাঝে,,আমার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
হানিয়ার কান্নার শব্দ বাহিরে বসে থাকা সকলের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। এই কান্না শুধু শব্দ নয়,,বরং গভীর বেদনা আর এক অসমাপ্ত কষ্টের ধ্বনি, যা চারদিকে বিষাদের ছায়া বয়ে এনেছে। আবরার অনেক কষ্টে হানিয়াকে শান্ত করে। কাঁদার কারণে হানিয়ার আরো দুর্বল হয়ে পরলে ডাক্তারের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়।
হানিয়া ঘুমিয়ে পরলে আবরার কেবিনের বাহিরে চলে আসে। আজ সে তার বাবার কাছে জবাব চাইবে। কেন সে তার বোনকে এত কষ্ট দেয় ছোট থেকে? বাহিরে তাদের বাবা-মা,, সোনিয়া আর মি. তালুকদার,, জাভিয়ান-স্পর্শ বসে আছে। আবরার বের হতেই মিসেস মির্জা ছুটে তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করেন–
–ওর কি হয়েছে আবরার? কাঁদছিলো কেন ওমন করে?
আবরার মায়ের কথার জবাব না দিয়ে বাবার সামনে এসে দাঁড়ায়। কোন ভনিতা ছাড়াই মি.মির্জাকে প্রশ্ন করে–
–কিসের উপর ভিত্তি করে হানিয়াকে ওইদিন বাজে বাজে কথা বলেছিলেন?
মি.মির্জা নিরুত্তর থাকেন। তার কাছ থেকে কোন জবাব না পেয়ে আবরার আবার বলে উঠে —
— আমি আপনাকে কিছু একটা জিজ্ঞেস করেছি বাবা। সেটার উত্তর দেন। নাহলে আমি আমার বোনকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবো,,হাজারো খুঁজেও তখন আমাদের পাবেন না।
মিসেস মির্জা ছেলের এমন কথায় ভয় পেয়ে যান। ছেলে তার শান্তশিষ্ট হলেও জেদ প্রচন্ড। সত্যি সত্যিই যদি এমনটা করে ফেলে। সে আবরারের কাছে এসে বলে–
–যা বলেছে ও তো ওইসবেরই যোগ্য। ওর জন্য তোর বাবাকে কত অপমানিত হতে হয়েছে জানিস? জাভিয়ানের মা ওর কুক্রীর্তির কথা না বললে তো আমরা জানতেই পারতাম না। আর তুইই বা কেমন ভাই? নিজের বোনের দোষ জেনেও তার হয়ে কথা বলছিস। তোর কি উচিত ছিলো না বোনকে বুঝানো?
মায়ের কথা শুনে আবরারের কপালে ভাজ পরে। সে মাকে বলে–
–কি বলেছে মিসেস তালুকদার যার জন্য তোমরা আমার বোনকে রেললাইনে মাথা দিয়ে মরতে বলেছো?
আবরারের এমন কথা শুনে সোনিয়া,, মি.তালুকদার,, জাভিয়ান এবং স্পর্শ হতভম্ব হয়ে যায়। নিজের বাবা-মা’ই যদি সন্তানকে মরার পন্থা বাতলে দেয় তাহলে সেই সন্তানের বাচার কোন আগ্রহ বা ইচ্ছে থাকে? তার উপর হানিয়ার মেন্টালি ডিপ্রেসড। এতো অবহেলা,,অবজ্ঞা,, কষ্ট সহ্য করতে না পেরেই তো হানিয়া এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই ব্যাপারটা বুঝতে তাদের একটুও অসুবিধা হয় না।
মিসেস মির্জা সেদিন স্বামীর পাশে বসে ছিলেন এবং সে মিসেস তালুকদারের বলা কথা গুলোও শুনেছিলেন। সেগুলোই আজ ছেলেকে জানায়। আবরার বাকরুদ্ধ হয়ে যায় মিসেস তালুকদারের হিপোক্রেসি দেখে।
আবরার মায়ের কথা শুনে তারপর হুট করে হেঁসে দেয়। সকল অবাক হয়ে যায় তার এমন কাজে। হাসতে হাসতে পাশে রাখা সিটগুলোতে বসে পরে। হাসি থামিয়ে থমথমে গলায় বলে–
–একবারও ওকে বা আমায় জিজ্ঞেস করেছিলেন এই সম্পর্কে?
এতক্ষণে মি.মির্জা মুখ খুলেন। সেও থমথমে গলায় বলে–
–জিজ্ঞেস করার কি আছে? মিসেস তালুকদার কি আমাদের মিথ্যে বলবেন? যদি মিথ্যে বলেও থাকেন তাহলে এতে তার লাভ কি?
আবরার তালুকদার বাড়ির লোকদের দিকে তাকায়। তাঁদের উদ্দেশ্য করে বলে–
–আপনারাই সত্যিটা বলুন আমাদের বাবাকে। সে আমার বললে হয়ত আমার কথাও বিশ্বাস করতে না পারে।
মি. তালুকদার এগিয়ে এসে মি.মির্জাকে বলেন–
–আমার স্ত্রী আপনাদের যা বলেছে তা সবই মিথ্যা বেয়াই সাহেব। আর ও শুরু থেকেই হানিয়াকে মানতে পারে নি,,কারণ ও ওর বোনের মেয়েকে জাভিয়ানের সাথে বিয়ে দিতে চেয়েছিলো কিন্তু আমি হানিয়ার সাথে বিয়ে ঠিক করে ফেলি ওর অমতে। সেই থেকে শায়লার মনে হানিয়ার জন্য ক্ষোভ তৈরি হয়।
মি. এন্ড মিসেস মির্জা আরসাল তালুকদারের কথা শুনে হতভম্ব হয়ে যায়। নিজের সন্তানকে তাহলে কি তারাই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছেন?
শব্দসংখ্যা~১৯২৫
~~চলবে?