প্রতিশোধের অঙ্গীকার পর্ব-০৩

0
617

#প্রতিশোধের_অঙ্গীকার
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_তৃতীয়

[আজকের পর্বের ৮০% সত্য। তাই বলবো পর্বটা পড়ে নিজেদের অনুভূতিটুকু জানাতে]

আমরা বাঙ্গালী নারী। আমরা সবকিছুর ভাগ দিতে পারলেও স্বামীর ভাগ মরে গেলেও কাউকে দিতে পারি না। কিন্তু হানিয়াকে এই কাজটা জীবিত অবস্থাতেই করতে হচ্ছে। তারই চোখের সামনে তার সদ্য বিয়ে করা বর তার তথাকথিত খালাতো বোনকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে বসে আছে,, কিন্তু সে চেয়েও কিছুই বলতে পারছে না।

তাদের বিয়ের সাতদিন পার হয়ে গেছে। এই সাতদিনে হানিয়া সাত হাজার বার ম//রেছে। তাকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে দেওয়ার জন্য সব প্রস্তুতিই জাভিয়ান ও তার মা নিয়ে রেখেছে। হুম,,ঠিকই বলছি,,হানিয়ার শাশুড়ীও এক অজানা কারণে হানিয়াকে দেখতে পারে না। তারা মা-ছেলে কারণে অকারণে তার উপর হাত উঠায়,,অপমান-অপদস্ত করে। কেন করে হানিয়ার তা অজানা।

বিয়ের পর সব মেয়েই বাপের বাড়ি যায়,,যাকে একেক অঞ্চলে একেক নামে অভিহিত করা হয়। আমাদের এইদিকে “ফিরানি” বলে। কিন্তু হানিয়ার ভাগ্যে তাও হয় নি। সেইদিন জাভিয়ান তাকে ওভাবে ফেলে চলে যায় ফ্রেশ হতে। তারপর ফ্রেশ হয়ে এসে কোনদিকে না তাকিয়ে চলে যায় বাহিরে। ফিরে দু’দিন পর তাও তার এই দূরসম্পর্কের খালাতো বোনকে সাথে নিয়ে। বিয়ের পর প্রথমবার বাবার বাড়িতে স্বামী ছাড়া গেলে সকলেই বাকা চোখে দেখবে বলে সে আর যায় নি।তার বাবা-মাও এই বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি। বাবা-মা বলছি কেন,,মূলত তার বাবাই অনাগ্রহী।

তাদের বিয়ের পরের দিন তার বাবার বাড়ির সকলে এসেছিলো তাদের নিয়ে যেতে,,তারা যখন রওনা হবে তখন তাদের খেয়াল হয় জাভিয়ান তো নেই। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও যখন জাভিয়ান আসে না তখন জাভিয়ানের বাবা আরসাল তালুকদার তাকে ফোন করে বলে বাড়ি আসতে আর হানিয়ার সাথে তার বাবার বাড়ি যেতে। জাভিয়ান তাকে মানা করে দেয় এবং বলে ফোন তার শ্বশুরের কাছে দিতে। আরসাল তালুকদার তাই করে। জাভিয়ান হানিয়ার বাবার সাথে কি এমন বলেছে তা শুধু তারাই বলে,, কিন্তু কথা শেষ হওয়ার পর হানিয়ার বাবা আকরাম মির্জা বলে হানিয়া তাদের সাথে যাচ্ছে না। এমনকি যাওয়ার আগে মেয়েকে আলাদা ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলে–

–” হানিয়া তোমার এখন বিয়ে হয়ে গিয়েছে,,স্বামীর বাড়িই এখন থেকে তোমার সব। তোমার স্বামী বা শ্বশুর বাড়ির কারো কাছ থেকে জানি আমি তোমার নামে কোন কমপ্লেইন না শুনি। তোমার উপর ডিপেন্ড করছে আমাদের দেওয়া শিক্ষার মর্যাদা। ভুলেও কখন তাদের কথার অবাধ্য হবে না,,তাহলে ওই বাড়ির দরজা তোমার জন্য চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। তারা তোমাকে মারুক,,কাটুক যাই করুক না কেন মুখ বন্ধ করে সহ্য করবে। একসময় দেখবে তারা তোমাকে ঠিকই ভালোবাসা নিয়ে আগলে নিয়েছে। আরেকটা কথা মনে রাখবে,,বাবা-মা সন্তানদের কখনো খারাপ চায় না।”

কথাগুলো তিনি বলতে গেলে এক প্রকার আদেশ করেই বলেন। হানিয়া বরাবরের ন্যায় চুপ করে সব শুনে এবং মেনে নেয়। যেমনটা সে মেনে নিয়েছিলো এই বিয়েটাকে। হানিয়ার বাবা একদম সেকালের মানুষ। তার চিন্তা-ভাবনা পুরো সেকালের। সে সবসময় মেয়ে-বউকে দাবিয়ে রাখতে পছন্দ করেন। নিজের সিদ্ধান্ত সবসময় পরিবারের উপর চাপিয়ে দেন। তেমনি ভাবে এই বিয়েটাও চাপিয়ে দিয়েছিলেন সে হানিয়ার উপর।

একসময়ের ভীষণ চঞ্চল,,ছটফটে,,প্রানবন্ত মেয়েটি বাবার একটা সিদ্ধান্তের জন্য প্রতিনিয়ত ধুঁকে ধুঁকে ম//রছে। ছোটবেলা থেকেই সে ভীষণ হাসি-খুশি একটা মেয়ে। হানিয়ারা তিন ভাই বোন। দু’বোন এক ভাই আর বাবা-মা নিয়ে তাদের সুখের সংসার। সে আর তার বোন সোনিয়া জমজ। সোনিয়া তার থেকে ১৫ মিনিটের ছোট। পড়াশোনার দিক দিয়ে সে বরাবরই একটু পিছিয়ে,,কিন্তু তার ভাই-বোন দু’জনেই আবার টপ করে সবসময় পড়াশোনায়। এই নিয়ে হানিয়াকে কম কথা শুনতে হয়নি তার বাবার। কিন্তু সে মনে করত সবাইকে দিয়ে যেমন সবকিছু হয় না তেমনি হানিয়াকে দিয়েও পড়ালেখাটা একটু কমই হয়। তার ভাইবোনের মতো ব্রিলিয়ান্ট না হলেও সে কিন্তু একেবারে খারাপ স্টুডেন্ট না। পরীক্ষায় মেধাক্রম সবসময় দুই-তিনের মধ্যে থাকে সে। তাও তার বাবা এতে সন্তুষ্ট নন। তার ভাই ইন্জিনিয়ারিং শেষ করে একটা বড় কোম্পানিতে চাকরিরত আছেন দু’বছর ধরে।

এইচএসসিতে সে কয়েক পয়েন্টের জন্য জিপিএ ফাইভ মিস করে। তখন তার বাবা-মা তার পাশে থাকবেন কি তারা আরো তার দোষত্রুটি বের করতে ব্যস্ত। বাবা-মায়ের এমন বিরূপ আচরণ আর আশেপাশের মানুষদের কথায় ত্যক্ত হয়ে সে ডিপ্রশনে চলে গিয়েছিলো তার এডমিশন সময়টায়। যার কারণে ভালো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ও চান্স হয় না তার। কিন্তু তার বোন আবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো সাবজেক্টে চান্স পেয়েছে। এরপর থেকে সে যেনো তার বাবার আরো অপ্রিয় হয়ে গিয়েছে। তার বাবা এতোই রেগে যান সেই সময়টায় তিনি বলেই দেন হানিয়াকে আর পড়াবেন না বিয়েই দিয়ে দিবেন,,কিন্তু তার ভাই-বোনের সাপোর্টের কারণে সে যাত্রায় বেচে যায়। পরবর্তী হানিয়া ন্যাশনাল ভার্সিটিতে ভালো সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশোনা করছিলো। ভালোই উন্নতি হয় তার পড়ালেখায়।

হানিয়ার ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল এক্সামের শেষ দিন,, পরীক্ষা দিয়ে বাসায় এসে দেখে তার মা-বোন আর খালামনি ভীষণ ব্যস্ত। কারণ জিজ্ঞেস করলে বলে আজ তাকে দেখতে আসবে। হানিয়া প্রথমে ভেবেছিলো শুধু তো দেখতেই আসবে,,দেখতে আসলেই তো বিয়ে হয়ে যায় না। কিন্তু ছেলে পক্ষ যখন তাঁকে রিং পরিয়ে যায় তখন সে বুঝতে পারে বাবার সাথে আগে থেকেই সব কথা হয়ে আছে আর তার বাবাও তাকে না জানিয়ে তার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে। সেই বার সে প্রথমবারের মতো বাবার কথার উপর কথা বলেছিলো,,বিনিময়ে তাকে মা–রও খেতে হয়েছিলো কিন্তু তাও সে বলেছিলো সে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করবে না। আসলে ছোট থেকে বাবার এতো হেয়-অবহেলায় ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে হানিয়ার ভেতর একটা জেদ তৈরি হয় কিছু করার। সে চেয়েছিলো সে একজন ম্যাজিসট্রেট হবে। সে অনুযায়ী পড়ালেখাও করছিলো কিন্তু তার সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেলো তার বাবার জন্য।

তার বাবা যখন বুঝলো মেয়ে এবার সহজে মানবে না তখন সে এক ভয়াবহ রকমের সিদ্ধান্ত নেয়। সে হানিয়াকে বলে–

–আমি পাত্রপক্ষকে বিয়ের পাকা কথা দিয়ে ফেলেছি এখন যদি তুমি আমার কথার খেলাফ করো তাহলে আমি তোমার মাকে তালাক দেবো।

তার বাবা এতোটাই নাক উঁচু স্বভাবের যে নিজের কথা রাখার জন্য নিজের স্ত্রীকে ছাড়ার কথাও দু’বার ভাবেন নি। হানিয়া তার এই কথায় স্তম্ভিত হয়ে শুনেছিলো। শেষ বয়সে এসে মাকে যাতে নিজের সংসার ছাড়তে না হয় তাই সে নিজেকে এবং নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে দেয়। বিয়ে করে বউ হয়ে আসে এই শ্বশুর বাড়ি নামক জাহান্নামে।

______________________

বেলকনিতে দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে এতক্ষণ ধরে এই সকল স্মৃতি চারণ করছিলো হানিয়া। তখনই তার ডাক পরে ঘর থেকে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেতরে যায়। জাভিয়ান ও সোহার (জাভিয়ানের খালাতো বোনে) সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সাথে সাথে গরম কফিটা ছুঁড়ে মারে জাভিয়ান তার দিকে। নিজের মুখের উপর যাতে গরম কফিটা না পরে তাই সে একপাশে মুখ করে মুখের সামনে ডান হাতটা রাখে,,ফলস্বরূপ কফিটা গিয়ে পরে তার হাতে। সাথে সাথে উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ হাত লালবর্ণ ধারণ করে। হানিয়া না চাইতেও তার মুখ দিয়ে হালকা আওয়াজ বের হয়ে আসে।

–আল্লাহ গোো।

তার এই আর্তনাদ জাভিয়ানকে যেন খুশি করে তুলে। সে হানিয়াকে বলে–

–এটা কি বানিয়ে এনেছ? তোমার কাছে একটা হট কফি চেয়েচিলাম আর তুমি কিনা ঠান্ডা পানির মতো কফি এনে দিয়েছ। তোমার সাহস দেখি দিনদিন বাড়ছেই। ওহ্হ,, বুঝতে পেরেছি অনেকদিন কোন ডোজ পরে না তো তাই এই অবস্থা। তা লাগবে নাকি আজ এক ডোজ?

জাভিয়ান ডোজ দ্বারা কি বুঝাতে চেয়েছে হানিয়া খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে তাই তো ভয়ে তার শরীরে কাঁপন ধরে গেছে। পরশু রাতেও জাভিয়ান তাকে বেধর পিটি//য়েছে। কেন মে//রেছে??জাভিয়ান অফিস থেকে এসে কফি চেয়েছিলো,,কিন্তু হানিয়া রান্না ঘরে ব্যস্ত থাকায় কফিটা দিতে লেট হয়েছিলো এই কারণে তাকে এমন ভাবে মে//রেছিলো যে,,ব্যথায় হানিয়ার জ্বর এসে গিয়েছিলো। জাভিয়ানের এহেন কথা আর হানিয়ার এমন ভয় পাওয়া দেখে জাভিয়ানের পাশে বসে থাকা সোহা কিটকিটিয়ে হেসে দেয়। হানিয়াকে তার কাছে এখন একটা জোকার লাগছে। জাভিয়ানও হাসে কিন্তু তার হাসির কোন শব্দ হয় না। সে সোহাকে নিজেট সাথে আরেকটু চেপে ধরে বলে–

–পাচঁ মিনিট সময় দিলাম তার মধ্যে যদি আমাদের জন্য কফি না নিয়ে আসো তাহলে আজ তোমার কপালে কি যে আছে তা আমি নিজেও জানি না। নাউ,, গেট লস।

জাভিয়ানের কথা শোনার সাথে সাথে হানিয়া দৌড়ে দেয় রান্নাঘরের দিকে। যেতে যেতে শুনতে পায় জাভিয়ান আর সোহার ব্যঙ্গাক্ত হাসি,,যেটা কিনা তাকেই উদ্দেশ্য করছে তারা।

হানিয়া কফি বানিয়ে নিয়ে এসে দেখে জাভিয়ান কোথাও যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে আর সোহা কাউচে বসে ফোন চালাচ্ছে। হানিয়া এক কাপ কফি সোহাকে দেয় আরেক কাপ নিয়ে এগিয়ে যায় জাভিয়ানের দিকে। কাঁপা কাঁপা হাতে জাভিয়ানের দিকে কফির কাপটা এগিয়ে দিয়ে বলে–

–আপনার কফি।

জাভিয়ান আয়নার সামনে দাড়িয়ে তৈরি হচ্ছিল বলে আগেই হানিয়ার উপস্থিতি দেখেছে। সে সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে বলে–

–এখন আর লাগবে না। নিজের কফি নিজেই গেলো।

জাভিয়ানের কথা শুনে সোহা আবার হেসে দেয়। হানিয়া কষ্টে-অপমানে মাথা নিচু করে ফেলে।ইতিমধ্যে তার চোখে অশ্রুরা এসে ভীর করেছে কিন্তু সে সেটি অশ্রুগুলোকে আবদ্ধ করে রাখে নিজের আখিঁতেই।
জাভিয়ান পুনরায় বলে–

–আজ রাতে ফিরতেও পারি আবার নাও ফিরতে পারি। মম-কে জানিয়ে দিও। আর হ্যাঁ,,ডেড ফোন দিলে যদি আমার নামে কোন প্রকার কান ভাঙ্গানি দিয়েছ তাহলে তোমার যে কি হবে হানিইইইইইইইই।

হানিয়ার নামটা ব্যঙ্গ করে বলে জাভিয়ান। হানিয়া একটু মাথা উচু করে দেখে জাভিয়ান তার দিকেই হালকা ঝুঁকে আছে,,মুখে তার চিরাচরিত বাকা হাসি।

জাভিয়ান তার সামনে থেকে সরে সোহার কাছে এসে তার হাত ধরে বসা থেকে উঠায়। তারপর সোহার কোমর জড়িয়ে ধরে বের হয়ে যায়।

~চলবে?