#প্রতিশোধের_অঙ্গীকার
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_একান্ন
হানিয়া রাগে হাত মুঠ করে বসে আছে নিজের রুমে। কলিংবেলের ক্রমাগত আওয়াজে কানটা ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে,, তাও সে ঘাপটি মেরে নিজের রুমে বসে আছে। আরো মিনিট দশেকের মতো বেল বাজতে বাজতে আওয়াজটা হঠাৎই থেমে যায়। হানিয়া তখনও ধম মেরে বসে আছে।
হঠাৎই বেলকনি থেকে কারো গলার আওয়াজ শোনা যায়। রাতুল তাঁকে ডাকছে। এবার হানিয়ার মাথায় খুন করার মতো রাগ চেপে বসে। বড়বড় শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করে। হাত বাড়িয়ে বেডের উপর রাখা বাটান ফোনটা তুলে নেয়। ফোনটা আবরারের। হানিয়া সারাদিন বাসায় একা একা থাকে বলে এই ফোন টায় নিজের একটা সিম লাগিয়ে দিয়ে গেছে আবরার,, যাতে হানিয়ার কোন সমস্যা হলে তাকে ফোন দিতে পারে। হানিয়া ফোনটা ঘেঁটে একটা নাম্বার বের করে সেটায় কল লাগায়। সেকেন্ডের ব্যবধানে কলটা রিসিভ হয়। হানিয়া ব্যক্তিটিকে কিছু বলার পূর্বেই ব্যক্তিটি নিজেই বলা শুরু করে–
–হানিয়া,,তুই বললি দুপুরের ঔষধ খেয়ে আসবি। আর আসলি না। রাতুলকে পাঠালাম তোকে ডাকার জন্য তাও এলি না। কি হয়েছে তোর? শরীর খারাপ লাগছে বেশি? দরজাটা খুল একটু কষ্ট করে তাহলে,,আমায় ভেতরে আসতে দে।
তখন জাভিয়ানের সালামের জবাব দেওয়ার পর হানিয়া তার সাথে আর একটাও বাক্য বিনিময় করেনি। বরং তার সামনেই সায়মাকে বলে–
–আপা,,আমার দুপুরের একটা ঔষধ আছে। ওটা নিয়ে আসছি।
কথাটা বলেই হনহনিয়ে বাসায় এসে পরে। তারপর থেকে সেই যে নিজের রুমে এসে বসেছে কোন নড়চড় ছাড়াই আধাঘন্টা পাড় করে দিয়েছে। হানিয়া আধাঘন্টা হয়ে যাওয়ার পরও আসছে না দেখে সায়মা এখন ফোন দিয়ে উপরিউক্ত কথাটা বলে।
হানিয়া সায়মার এমন অস্থিরতায় কোন রিয়েক্ট করে না। বিশ্বাস করতে পারে না আজকাল কাউকে। নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষ কোন কিছু যে করতে পারে তা হানিয়ার থেকে ভালো আর কে জানে। হানিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে–
–শরীর খারাপ লাগছে আপা। আপনারা লাঞ্চ করে নেন। কাজের খালা সকালে যা বানিয়েছিলো তা দিয়েই আমি দুপুরের লাঞ্চ সেড়ে নিবো। এখন আর ভালো লাগছে না,, বিকেলে বা রাতে একবার এসেন।খাবার খেয়ে একটু ঘুমাবো। রাখছি,, আল্লাহ হাফেজ।
এক শ্বাসে কথাগুলো বলে সায়মাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কলটা কেটে দেয় হানিয়া। হানিয়ার এহেন কাজে সায়মা অবাক হয়ে ফোনটা কানে ধরে রাখে। আজ প্রায় ছয়দিন মেয়েটার সাথে নিয়মিত দেখা হচ্ছে,, কথা হচ্ছে কিন্তু কখনো এমন ব্যবহার করে নি। মনে হলো সে সায়মার সাথে কথা বলতে ইচ্ছুক নয়। কিন্তু কেনো? একটু আগেও তো ভালোই হেঁসে হেঁসে কথা বলছিলো,, কাজ করছিলো হঠাৎ কি হলো আবার?
সায়মা বিপরীত সোফায় বসা জাভিয়ান মাথা নিচু করে বসে ছিলো। তার বুঝতে বাকি নেই হানিয়ার এমন ব্যবহারের কারণটা কি। জাভিয়ান মাথা তুলে সায়মার দিকে তাকায়। রাতুল বেলকনি থেকে এসে পরেছে ততক্ষণে। রাতুল একটা সিঙ্গেল সোফায় বসে গা এলিয়ে দেয়। হতাশ হয়ে বলে–
–হানিয়া তো দরজা খুললো না আপু। বেলকনি থেকেও ডাকলাম,,আসলোই না। ফোন দিয়েছিলে তুমি? কিছু বললো?
সায়মা ফোনটা কান থেকে নামিয়ে ভাইদের উদ্দেশ্য বলে–
–আমি না হানিয়াই দিয়েছে। বলল শরীর খারাপ লাগছে। আসবে না এখন আর। বিকেলে বা সন্ধ্যায় আমায় গিয়ে দেখে আসতে বললো।
হানিয়ার শরীর খারাপ লাগছে শুনে জাভিয়ান অস্থির হয়ে যায়। সে অস্থির কণ্ঠেই জিজ্ঞেস করে–
–কি হয়েছে ওর? বেশি খারাপ লাগছে শরীর? তাহলে আমরা সবাই গিয়ে এখনি একবার দেখে আসি চলো সায়মাপু।
সায়মা জাভিয়ানের এমন অস্থিরতা দেখে অবাকই হয়। রাতুলও টাষ্কি খেয়ে যায়। বাহ,,এতো ভালোবাসা তো যে শরীর খারাপ শুনে এমন অস্থির হয়ে পরেছে। সায়মা আর রাতুলের অবাক চাহনি দেখে জাভিয়ান থতমত খেয়ে যায়। বুঝতে পারে তার এমন অস্থিরতা দেখানোটা ঠিক হয়নি। তার আপু যদি একবার জানতে পারে জাভিয়ান হানিয়ার সাথে কি কি কান্ড করেছে তাহলে হানিয়া তাকে পুলিশে না দিলেও সায়মা অবশ্যই অবশ্যই তাঁকে পুলিশে দিবে। সে এমন পুরুষ অনেক বেশি ঘৃণা করে যারা কিনা নিজেদের স্ত্রীদের গায়ে হাত তুলে। ছোট বেলা এ নিয়ে সায়মা এক বিশাল কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছিলো। সে-ও স্বাক্ষী ছিলো সায়মার ওই ঘটনার। তারপর একদিন সায়মা তাঁকে ডেকে নিয়ে গিয়ে সুন্দর করে বুঝিয়ে ছিলো একজন পুরুষের জীবনে নারীর অবদান কতটা। কতটা কষ্ট করে একজন মেয়ে সন প্রসব করে,,কতটা কষ্ট বুকে চেপে একজন মেয়ে তার জন্মস্থান বাবার বাড়ি ছেড়ে শুধুমাত্র একজন অচেনা পুরুষের ভরসায় তাদের বাড়ি আসে। জাভিয়ান তখন নাইন পড়ুয়া ছাত্র। সায়মা তাকে অনেক আদর করত,,তাই সে যখন জাভিয়ানকে এসব বুঝিয়েছিলো জাভিয়ানও কথা দিয়েছিলো সে তার মা-স্ত্রীর সাথে সবসময় ভালো ব্যবহার করবে। কিন্তু সে সেই কথা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। সায়মা যদি জানতে পারে হানিয়া তার বিয়ের সাত মাসে জাভিয়ানের থেকে কতটা কষ্ট পেয়ে তাকে ত্যাগ করে এসে পরেছে তাহলে সায়মা না তাকে এখনি বের করে দেয় বাসা থেকে।
জাভিয়ান ঠোঁট দিয়ে জিভ ভিজিয়ে বলে–
— না মানে আপু,,হঠাৎ উনার কি হলো? আসলাম পরে তো ভালোই দেখতে পেলাম। হুট করে বাসায় যেয়ে অসুস্থ হয়ে পরলো। রাতুল বললো বাসায় নাকি একা মেয়েটা। তাই বললাম আর কি।
রাতুল ভ্রু কুঁচকে বলে–
–আমি কখন বললাম হানিয়া বাসায় একা?
এই রে! ধরা বোধহয় জাভিয়ান এবার পরেই গেলো। রাতুলের কথা শুনে সায়মা অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়। এউ ফাঁকে জাভিয়ান চোখ বড়বড় করে বুঝায় বিষয়টা হ্যান্ডেল করতে। রাতুল তার ইশারা বুঝতে পেরে নিজেই আবার হুড়মুড়িয়ে বলে–
–ওহ্হ,, হ্যাঁ হ্যাঁ বলেছিলাম।
সায়মা তার দুই ভাইয়ের এমন উল্টাপাল্টা কান্ডে বিরক্ত হয়। সে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়,, ডাইনিং টেবিলের কাছে যেতে যেতে জাভিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলে–
–জাভিয়ান,,যা রাতুলের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়। দুপুর পেরিয়ে বিকেল হতে চললো। (রাতুলকে উদ্দেশ্য করে বলে) রাতুল তুইও যা। ফ্রেশ হয়ে আয়। আমি খাবার বাড়ছি।
জাভিয়ান বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। আমতাআমতা করে বলে–
–উনি খাবেন না?
সায়মা কপালে ভাজ ফেলে বলে–
–উনি কে আবার?
–তোমার প্রতিবেশী।
–হানিয়া?
জাভিয়ান মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। সায়মা বলে–
–ও বলেছে ওর বাসায় নাকি রান্না করা আছে,,ওটা খেয়েই নাকি একটু ঘুমাবে। তারপরও তোদের খাওয়া হলে আমি গিয়ে একবার ডেকে আসবো। তোরা যা,,ফ্রেশ হয়ে আয় তাড়াতাড়ি।
জাভিয়ান আর কি বলে অজুহাত দিবে বুঝে পায় না। সে মন খারাপ নিয়েই চলে যায় রাতুলের রুমে। রাতুলও জাভিয়ানের ব্যাগপ্যাকটা নিয়ে রুমে ঢুকে পরে।
__________________________
অনেকটা মন খারাপ নিয়েই জাভিয়ান খাওয়াদাওয়া শেষ করে। মনটা খারাপ থাকায় তেমন একটা খেতেও পারে নি। সায়মা তাকে জোর করেও বেশি খাওয়াতে পারে নি। অজ্ঞাত সায়মা হতাশ হয়ে এক বাটি পায়েশই এনে দেয় জাভিয়ানকে। পায়েশ দেখে জাভিয়ান মানা করতে পারে না। খাবারটা যে তার ভীষণ প্রিয়। সে বাটি থেকে এক চামচ মুখে নিয়ে মুগ্ধ হয়ে যায়। পরাপর কয়েক চামচ খেয়ে সায়মা বলে–
–বাহ আপু। পায়েশটা তো দারুন হয়েছে। তুমি তো আগে পায়েশ বানাতেই পারতে না। মনে আছে,,ছোট বেলায় আমাকে আর রাতুলকে লবণ দেওয়া পায়েশ খাইয়েছিলে?
সায়মা অতীতের এই লবণ দেওয়া পায়েশেরঘটনা মনে পরে হেঁসে দেয়। ছোট বেলায় তাদের বাড়ি আর জাভিয়ানদের বাড়ি একি এলাকায় ছিলো। সায়মা কিছু স্পেশাল বানালে তাঁদের দৌড়ে নিয়ে যেত জাভিয়ানদের বাসায়। জাভিয়ানদের বাসার ক্ষেত্রেও তাই হতো। ভীষণ মিলমিশ ছিলো তাদের দুই পরিবারের মধ্যে। সায়মা হেঁসে বলে–
–আজও পারি না রে ভাই।
–তাহলে পায়েশটা কি রেস্টুরেন্টে থেকে অর্ডার দিয়ে এনেছো?
–নাহ। হানিয়া বানিয়েছে।
জাভিয়ান তখন মাত্রই আরেক চামচ পায়েশ মুখে তুলেছিলো,, কিন্তু সায়মার মুখে হানিয়ার পায়েশ বানানোর কথা শুনে পায়েশটা তার তালুতে উঠে যায়। কাশতে কাশতে জাভিয়ানের জান যায় যায় অবস্থা। সায়মা তাকে তাড়াতাড়ি করে পানি এনে খাওয়ায়। মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে–
–আস্তে খাবি না। কেউ কি নিয়ে যাচ্ছে তোর থেকে তোর পায়েশ। বড় হয়েছিস শুধু হাতে পায়েই।
জাভিয়ান অনেক কষ্টে নিজেকে সামলায়। তারপর আবার বাটিটা হাতে নিয়ে গোগ্রাসে গিলতে থাকে পায়েশ। আজ কতগুলো দিন পর সে তার বধূয়ার রান্না খেতে পারছে। প্রথমবার মুখে দিতেই সে কিছুটা ধরতে পেরেছিলো। কিন্তু সে ভাবতেও পারেনি ভাগ্য তার এতোটা সহায় হবে। আবারও হানিয়ার হাতের রান্না খাওয়ার সৌভাগ্য হবে। হানিয়া ঠিকই বলত, জাভিয়ানের ভাগ্য বরাবরই তার পক্ষে,,ভীষণ দয়াবান। অন্যদিকে হানিয়া? তার ভাগ্যে শুধু কষ্ট,, লাঞ্ছনা,,অবহেলা পেতে হয়েছে। জাভিয়ানের এখন তার ভাগ্যের কাছে একটাই চাওয়া,,জীবনে শেষবারের মতো হানিয়াকে পুনরায় যাতে ফিরে পায়। নিজের জীবন দিয়ে আগলে রাখবে।
হানিয়ার হাতের রান্না পেয়ে জাভিয়ান পরপর তিন বাটি পায়েশ খায়। রাতুল আর সায়মা হতভম্ব হয়ে যায়। পায়েশ জাভিয়ানের প্রিয় হলেও কখনো এতগুলো খায় নি। তাছাড়া সে যথেষ্ট স্বাস্থ্য সচেতন। সবসময় ব্ল্যাক কফি খায় চিনি ছাড়া। নিয়মিত জিম না করলে নাকি অসুস্থ বোধ করে। সেই জাভিয়ান নাকি এক বসায় তিন বাটি পায়েশ খেয়ে ফেলেছে। বিষয়টা অবাক করার মতোই। জাভিয়ান তৃপ্তি সহকার খেয়ে উঠে পরে। রুমে ঢোকার আগে বলে যায়–
–আপু রাতেও আমায় কিন্তু পায়েশটা দিবে।
_________________
পরপর কয়েকবার বেল দেওয়ার পরও যখন হানিয়া দরজা খুলে না তখন আবরার মনে করে হয়ত এখনও সায়মাদের বাসায় আছে সে। নিজের ফ্ল্যাটে না ঢুকে পা ঘুরিয়ে সায়মাদের ফ্ল্যাটের দিকে যায়। দু’বার বেল বাজানোর পরই সায়মা এসে দরজা খুলে দেয়। হাস্যোজ্জ্বল মুখে সালাম বিনিময়ের পর আবরার সায়মাকে বলে–
–আপা হানিয়াকে একটু ডেকে দেন। সারাদিন ওর সাথে কথা হয়নি,,অস্থির লাগছে।
আবরারের কথা শুনে সায়মা অবাক না হয়ে পারে না। সে অবাক হয়েই বলে–
— হানিয়া তো সেই দুপুরেই বাসায় চলে গেছে আবরার ভাই। ওর নাকি শরীর ভালো লাগছিলো না তাই আমাদের সাথে লাঞ্চও করে নি। আমি,, রাতুল কয়েকবার ডেকেছিলাম তাও আসে নি।
আবরার হতভম্ব হতেও ভুলে যায়। শরীর খারাপ করছিলো হানিয়ার। বেশি খারাপ করেছে কি যার কারণে বেড থেকে উঠে দরজাটা পর্যন্ত খুলতে পারছে না তার বোনটা। আবরার সায়মার কথার কোন প্রতিউত্তর না করে নিজের ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে অনবরত কলিংবেল দিতে থাকে আর হানিয়াকে ডাকতে থাকে। সায়মাও তার পেছন পেছন যায়। আবরার বেশ জোরে জোরে বলতে থাকে–
–হানিয়া,,এই হানিয়া।বোন দরজাটা খুল। বেশি খারাপ লাগছে শরীর? কষ্ট দরজাটা খুলে দে। ভাই তোকে এখনি হসপিটালে নিয়ে যাবো।
সায়মাও বিষয়টা কিছুটা আচ করতে পেরে সেও আবরারের সাথে ডাকতে থাকে হানিয়াকে। তাদের৷ উচ্চস্বরে ডাকাডাকির আওয়াজে রাতুল-জাভিয়ান ও আরেক ফ্ল্যাটের মানুষও বের হয়ে আসে রুম থেকে। রাতুল সায়মাকে কি হয়েছে জিজ্ঞেস করলে সায়মা হানিয়ার দরজা না খোলার ঘটনাটা জানায়। জাভিয়ানও ভয় পেয়ে যায় এমন কান্ডে। আবরারের উপস্থিতির কথা ভুলে গিয়ে সেও তাদের সাথে ডাকতে থাকে। পরিচিত একটা কণ্ঠ পেয়ে আবরার পাশ ফিরে তাকালে জাভিয়ানকে দেখতে পায়। এতক্ষণের ভয়টা যেন নিমিষেই রাগে পরিণত হয়।সে দরজা নক করা বাদ দিয়ে জাভিয়ানের উদ্দেশ্য বলে–
–তুমি এখানে কি করছো?
জাভিয়ান অস্থির হয়ে বলে–
–আমায় নিয়ে পরে ভাবলেও চলবে ভাইয়া। এখন বেশি জরুরি হলো দরজাটা খোলা। আপনার কাছে ফ্ল্যাটের কোন ডুপ্লিকেট চাবি আছে? ওটা দিয়ে তাহলে খুলতে পারতেন নাহলে দরজাটা ভেঙে ফেলি।
জাভিয়ানের কথাটা আবরারের মাথায় টনিকের মতো কাজ করে। সে তার অফিস ব্যাগের ভেতর থেকে একটা চাবি বের করে,তারপর সেটার সাহায্যে দরজা খুলে সকলে ভেতরে প্রবেশ করে। আবরার আর জাভিয়ান দু’জনই সকলে একপ্রকার দৌড়ে হানিয়ার রুমে প্রবেশ করে। আবরার রুমে প্রবেশ করে দেখে বেডের উপর হানিয়া শুয়ে আছে আর বেডের পাশের টেবিলে ঔষধের বক্স খোলা। তার মানে এখান থেকে ঔষধ বের করা হয়েছে। আবরারের বুক ভারী হয়ে যায়। তার মন একটাই কথা বলতে থাকে–
–জাভিয়ানকে দেখে কি হানিয়া আবার নিজের ক্ষতি করে ফেললো?
আবরার তাড়াতাড়ি করে হানিয়ার পাশে বসে হানিয়ার নাকের সামনে তার দু’টো আঙুল ধরে শ্বাসপ্রশ্বাস চলছে কিনা চেক করার জন্য। হ্যাঁ চলছে। এবার আবরার হানিয়ার গালে আলতো চাপড় মেরে তাঁকে ডাকতে থাকে–
–হানিয়া এই হানিয়া। উঠ। কি হয়েছে তোর? শরীর কি বেশি খারাপ লাগছে?
বেশ কয়েকবার ডাকার পর হানিয়া চোখ খুলে তাও বহু কষ্টে। ভীষণ ঘুম পাচ্ছে তার। কোনমতে টেনেটুনে চোখ খুলে ঘুম জড়ানো কন্ঠে ভাইকে বলে–
–ভাই ভীষণ ঘুম পাচ্ছে আমার। তুমি যেয়ে খেয়ে নাও। আমি পরে উঠে খেয়ে নিবো।
আবরার আবারো তাঁকে চাপড় মেরে বলে–
–তোর নাকি শরীর খারাপ করছিলো? উঠ,,ডাক্তারের কাছে যাবো তোকে নিয়ে।
হানিয়া চোখ বন্ধ রেখেই বলে–
— এখন লাগছে না। দুপুরে লাগছিলো তাই শাওয়ার নিয়েছিলাম সময় নিয়ে। তারপর মাথা ব্যথা বাড়ায় ঘুমের ঔষধ নিয়েছি।এখন লাগছে না খারাপ। ডিস্টার্ব করো না ঘুমাতে দাও।
–ঘুমের ঔষধ? কয়টা নিয়েছিলি?
হানিয়া হাত উঠিয়ে দু’টো আঙুল দেখায়।মানে দু’টো ঔষধ নিয়েছিলো সে,,তাই তো এমন মরার মতে ঘুমাচ্ছে। আবরার হাফ ছেড়ে বাঁচে। শুধু সেই নয়,,উপস্থিত সকলে বড় করে শ্বাস ফেলে। এতক্ষণ মনে হচ্ছিল সকলের শ্বাস আটকে রেখেছিলো। আবরার সকলকে নিয়ে হানিয়ার রুম থেকে বের হয়ে যায়। সকলের উদ্দেশ্য ক্ষমা চায় তাদের ডিস্টার্ব করার জন্য। অন্য ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীর বের হয়ে চলে যায় নিজেদের রুমে। ড্রয়িংরুম একটু ফাকা হলে এবার আবরারের নজর পরে জাভিয়ানের উপর। সে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিয়ে জাভিয়ানকে জিজ্ঞেস করে–
–এবার কি আমার বোনটাকে কবরে পাঠিয়ে তারপর শান্ত হবে তুমি? কেনো এসেছো এখানে? আর তুমি জানলেই বা কি করে এই ঠিকানা?
জাভিয়ানকে এমন ভর্ৎসনা করায় সায়মা চোখজোড়া বড়বড় হয়ে যায়। আজ এই দুই ভাইবোনের হলো টা কি? অন্যদিকে জাভিয়ান এই ভয়টাই পাচ্ছিল।
শব্দসংখ্যা~১৮৭৫
~চলবে?
#প্রতিশোধের_অঙ্গীকার
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_বাহান্ন
সায়মা চোখ বড়বড় করে আবরারের লাল মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে আছে। আজ প্রায়ই দু’বছর হতে চললো তাদের চেনা জানার,, কিন্তু স্বল্পভাষী আবরারকে কখনো এমন রেগে যেতে দেখে নি। তার স্বামীও মাঝে মধ্যে আবরারের ধৈর্যশীলতা,,কঠোর পরিশ্রম,, সুন্দর ব্যবহারের প্রশংসা করেন তার কাছে।সেই আবরার নাকি আজ এত রেগে গেলো তার ভাইকে দেখে। সে কি কোন মতে জাভিয়ানকে চিনে যার জন্য এমন রাগ? সায়মা কৌতূহল চেপে না রাখতে পেরে আবরারকে প্রশ্নই করে ফেলে–
–আবরার ভাই, আপনি কি জাভিয়ানকে চিনেন কোনভাবে?
আবরার জাভিয়ানের দিকে চোখ রেখেই বলে–
–জ্বি,,খুব ভালোভাবেই চিনি মি. তালুকদারকে।
–কিন্তু কিভাবে?
–তার আগে আপনি এটা বলুন,, ও আপনাদের ফ্ল্যাট থেকে বের হলো কেন? কে হয় মি. তালুকদার আপনাদের?
–ও আমার মামাতো ভাই। আপন না,, আমার মায়ের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে।
–কিহহহ?
–হ্যাঁ,, কিন্তু তুমি এতো অবাক হলে কেন আবরার?
–আপনি তাহলে এতদিন হানিয়াকে অপরিচিতের মতো ট্রিট করলেন কেন? সবটাই কি তাহলে ভাইয়ের জন্য করা নাকি আপা?
আবরারের এহেন প্রশ্নে সায়মা কিছুই বুঝতে পারে না। হানিয়া তো তার জন্য অপরিচিতই। আর ভাইয়ের জন্যই বা সে কি করলো?
সায়মা আবরারকে বলে–
–আমি তোমার কথা কিচ্ছু বুঝতে পারছি না আবরার। যদি একটু খোলাসা করে বলতে তাহলে ভালো হতো। জাভিয়ানকে তুমি কিভাবে চিনো? আর তার প্রতি এতো রেগেই বা আছো কেন?
–ওয়েল বলছি। হানিয়ার সাথে যে মি. জাভিয়ান তালুকদারের বিয়ে হয়েছে এটা কি আপনি জানতেন না আপা?
আবরারের কথাটা শুনে সায়মা হতভম্ব হয়ে যায়। সে জানতই না জাভিয়ানের যে বিয়ে হয়েছে। সে অবাক হয়েই বলে–
–জাভিয়ানের যে বিয়ে হয়েছে এটাই তো আমি আজ জানতে পারলাম।
সায়মার কথা শুনে আবরারের কপালে ভাজ পড়ে। এতক্ষণে রাতুল পেছন থেকে সামনে এসে বলে–
–হ্যাঁ আবরার ভাইয়া। আপু জানে না জাভিয়ান ভাইয়ার বিয়ে সম্পর্কে। জাভিয়ান ভাইয়ার বিয়ে যখন হয়েছিলো তখন আপারা এব্রোড ছিলো। ফিরে আসার পরও তাদের জানানো হয়নি। আমাদের পরিবার থেকে ভাইয়ার বিয়েতে শুধু আমিই গিয়েছিলাম,, তাই প্রথমদিন হানিয়া ভাবীকে দেখার পরই চিনতে পেরে যাই। তারপর ভাবীর ওমন অবস্থা দেখে আমি ভাইকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। আর ভাইয়া আমার কাছ থেকেই ভাবীট কথা জানতে পেরে এখানে এসেছে।
এবার আবরার আর সায়মার কাছে সবটা পরিষ্কার হয়। কি সায়মার একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। সে জানতে চায় জাভিয়ানের উপর আবরার এতো রেগে আছে কেন? দুপুরে হানিয়া জাভিয়ানকে দেখে অপরিচিতর মতো ব্যবহারই না করেছিলো কেনো? আর হানিয়া সুইসাইড করার চেষ্টা করেছিলো কেনো? সে কোন ভণিতা ছাড়াই আবরারকে জিজ্ঞেস করে–
–কিন্তু আবরার ভাই আপনি জাভিয়ানের উপর এতো রেগে আছেন কেন? আর হানিয়া জাভিয়ানের সাথে না থেকে আপনার সাথেই বা থাকছে কেন? একটু বলবেন প্লিজ।
সারাদিন অফিসে গাধারখাটুনি খেটে বাসায় ফিরে এতো ঝামেলা পোহাতে কারই বা ভালো লাগে। আবরার সায়মাকে সোফায় বসতে বলে নিজেও আরেকটা সোফায় বসে পরে। জাভিয়ান ও রাতুলও বসে পরে। আবরার সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বলে–
–আপনার গুণধর ভাইয়ের কিছুই দেখি জানেন না আপা। থাক আমিই বলছি তার কীর্তি গুলো।
এরপর আবরার তার জানা সব বলতে থাকে। হানিয়াকে বিয়ের পর অত্যাচার করা,,স্পর্শেকে খুঁজে বের করা থেকে শুরু করে সবটা সে বলতে থাকে সায়মা আর রাতুলকে। আবরার জাভিয়ানের অত্যাচারের কথা জানতে পেরেছে ইনায়া থেকে। হানিয়া যেহেতু ইনায়াকে সব বলতো,, স্পর্শকে সকলের সামনে আনার আগের দিন হানিয়ার সাথে জাভিয়ানের করা ব্যবহার আর নকল ছবিগুলোর কথা ইনায়াকে জানায় কুলসুমের ফোনের মাধ্যমে। জাভিয়ানের অন্যসব কিছু ইনায়া সহ্য করলেও হানিয়ার চরিত্র নিয়ে কথা বলাটা ইনায়া সহ্য করতে পারে নি। সে সেই রাতেই সোনিয়ার থেকে আবরারের নাম্বার নিয়ে সবটা জানায়। এছাড়া আবরার কয়েকদিন আগের মিসেস তালুকদারের করা কাজটার কথাও তাদের বলে।
তারা দু’জন জাভিয়ানের কর্মকান্ডের কথা শুনে কথা বলতে ভুলে যায়। জাভিয়ান রাতুলকেও তার কীর্তির কথা বলেনি। সব বলা শেষ হলে আবরার চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। রাগে তার ইচ্ছে করছে জাভিয়ানকে কয়েকটা লাগিয়ে দিতে। বাবা আর ভাইদের একটু বেশি টান থাকে ঘরের মেয়ে সন্তানের প্রতি। তাদের বাবার হানিয়ার প্রতি তেমন টান না থাকলেও আবরার তার বোন দু’টোকে সব সময় আগলে রাখত। বোনেরা যা চাইত তা যেভাবেই হোক এনে তাদের সামনে উপস্থিত করত। হানিয়াকে তার বাবা সোনিয়ার মতো ভালো না বাসায় সে একটু বেশিই খেয়াল রাখত তার। সেই বোন টাকে সামনে বসা ভদ্রতার মুখোশ পরা অভদ্রলোকটা কতটা কষ্ট দিয়েছে যে হানিয়া সেগুলো না সইতে পেরে মরার কথাও চিন্তা করেছে।
হুট করে একটা থাপ্পড়ের আওয়াজে আবরার চোখ খুলে তাকায়। দেখতে পায় সায়মা অগ্নি চক্ষু নিয়ে জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। আর জাভিয়ান গালে হাত দিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। রাতুলও অবাক হয়ে একবার সায়মা আরেকবার জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। সায়মা জাভিয়ানের টি-শার্টের কলার ধরে বসা থেকে উঠিয়ে দাঁড় করায়,তারপর তাঁকে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে–
–এই তুই না আমায় কথা দিয়েছিলি কখনো কোন মেয়েকে অসম্মান করবি না,,তাহলে নিজের বিবাহিতা স্ত্রীর প্রতি এত নিষ্ঠুর হতে পারলি কীভাবে তুই? বল,,কীভাবে পারলি?
জাভিয়ান কোন উত্তর দিতে পারে না। সায়মা রেগে আরো ২/৩ টা থাপ্পড় মারে। কেউ কিছু বলে না। বলতে পারে না তাঁকে। আবরার বসা থেকে উঠে তাদের কাছে এসে বলে–
–আপা মি. তালুকদার যা ঠিক মনে করেছে তাই করেছে। তার বোনের প্রতিশোধ আমার বোনের উপর নিয়েছে। ভালো কথা। এবার আমি যা ভালো মনে করবো তাই করবো। এবং আশা করি এতে মি. তালুকদার বা তাদের পরিবারের কোন অমত থাকবে না। থাকলেও আমি মানছি না।
তিনজনই আবরারের কথা শুনে তার দিকে প্রশ্নবোধক চাহনি নিয়ে তাকায়। তাদের দৃষ্টির মানে বুঝতে পেরে আবরার নিজেই বলে–
–আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি হানিয়া আর মি. তালুকদারের ডিভো করাবো। হানিয়াও এটাই চায়। এবং এটাই তাদের দু’জন আর দুই পরিবারের জন্য ভালো হবে। আমাদের মেয়ের সাথে কি আপনাদের ছেলের সাথে মানায় বলেন? আমরা কই আর আপনারা কই? আমরা মিডেল ক্লাস ফ্যামিলির লোক আর আপনারা। হাহ্।
আবরারের কথা শুনে সায়মা,,রাতুল আর জাভিয়ান আহত হয়। সায়মা এই বিষয় সম্পর্কে কিছু চেয়েও বলতে পারছে না। তার ভাইয়েরই তো দোষটা বেশি। অন্য একজনের প্ররোচনায় একটা মেয়েকে এমন কষ্ট দিয়েছে এর সাফাইয়ে কিছু বলা যায়? বললেও নিজের বিবেককে অপমান করা হবে। সে শুধু একটা কথাই বলে–
–তোমরা যা ভালো মনে করো তাই করো।
কথাটা বলে সে আবরারের ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে যায় চোখে পানি নিয়ে। আবরার জাভিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলে–
–অনুরোধ রইলো এবার আমার বোনকে নিজের মতো করে বাঁচতে দিন আর আপনিও নিজের মতে করে বাঁচুন। বহুত কিছু সহ্য করেছে আমার বোন,, যেটা তার করার কথা ছিলো না।
জাভিয়ান এগিয়ে এসে হাত জোড় করে চোখে পানি আর ভাঙা ভাঙা গলায় বলে–
–ভাইয়া আমাকে শেষবারের মতো সুযোগ দিন। কথা দিচ্ছি,, বেঁচে থাকতে ওর চোখে আর কখনো অশ্রু আসতে দিবো না। ওকে ছাড়া আমি অচল ভাইয়া প্লিজ আরেকবার ভরসা করে দেখুন।
আবরার প্যান্টের পকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে বলে–
— মনে করুন,,আপনি যা করেছেন তার ৫০% পার্সেন্ট আপনার পুতুলের সাথে হলো। আপনি সেটা সহ্য করতে পারবেন তো? সত্যি করে ভেবে বলুন তো।তারপর আমার কাছে আরেকটা সুযোগ চাইবেন।
আবরারের কথাটা শুনে জাভিয়ানের কথা বন্ধ হয়ে যায়। সে কল্পনা করে দেখে,, স্পর্শর সাথে এর সামান্য আচঁ পরলেও তার মাথা খারাপ হয়ে যাবে। সইতে পারবে না তার পুতুলের প্রতি হওয়া সেই সব নিষ্ঠুর কাজ। নিজের বোনের সাথে ওমন নিষ্ঠুরতার কথা কল্পনা করে জাভিয়ান কেঁপে উঠে। অপরাধবোধে জাভিয়ানের মাথা আপনাআপনিই নিচু হয়ে যায়। মুখ দিয়ে কোন কথা বের হয় না। আবরার জাভিয়ানের নিচু মাথা আর চুপ করে থাকতে দেখে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে–
–আপনার বোন আপনার কাছে পুতুল,,আপনার বোনের কষ্ট আপনার বুকের রক্তক্ষরণের কারণ হয় আর আমার বোন? আপনার বোনের প্রতি তো এমন কিছুই হয়নি,, আমি আমার জীবনের সব মোনাজাতে চাইব সে যেন আমার বোনের মতো কষ্টের অধিকারী না হয়। কিন্তু আপনিই বলুন জাভিয়ান,,আপনার বোনের প্রতি এইসবের কিছুই হয়নি কিন্তু আপনি শুধু কল্পনা করেই কেঁপে উঠছেন। আর আমার বোন? আমার বোন তো সাতটা মাস এসব সহ্য করেই আপনার সাথে ঘর করেছে। জানেন তো জাভিয়ান,, শ্বশুড় বাড়িতে একটা মেয়ের সবচেয়ে বড় সাপোর্ট সিস্টেম হয় তার স্বামী। একটা মেয়ের স্বামী ঠিক তো,, তার ইহকাল পরকাল দুই জগতই সুন্দর। একজন স্বামী তার স্ত্রীকে যেমন দুনিয়া ও আখিরাতে জান্নাত দেখাতে পারে তেমনি ওই স্বামীই কিন্তু স্ত্রীর জাহান্নামের কারণ হতে পারে। আপনি আমার বোনের জন্য জান্নাত না হলেও স্বস্তির কারণটা তো হতে পারতেন। এতদিন তার সাথে সংসার করলেন একবারও কি মনে হয়নি মেয়েটা আসলেই কি এমন? আপনি কিভাবে পারলেন নিজের স্ত্রীকে একহল ভর্তি মানুষের সামনে গায়ে হাত তুলতে? কীভাবে পারলেন নিজের পরিবারের ছোট-বড় সকলের সামনে তাঁকে চরিত্রহীন বলতে? এসবের প্রশ্নের উত্তর যেদিন দিতে পারবেন সেদিন আরেকটা সুযোগ চাইবেন। এবার আপনি আসতে পারেন আমার বাসা থেকে।
শেষের কথাগুলো বেশ গম্ভীর গলায় বলে আবরার। জাভিয়ানের কাছে আবরারের কোন প্রশ্নের সঠিক উত্তর নেই। তাই সে মাথা নিচু করে সেখান থেকে চলে আসে।
____________________________
সকালে হানিয়ার ঘুম ভাঙে আবরারের গলার আওয়াজে। কাল রাতে আবরারও কিছু খায় নি। হানিয়ার ঘুম ঘুম ভাবটা এখনো অনেকটা রয়ে গেছে। আবরার তাকে জোর করে ঘুম থেকে উঠিয়ে ফ্রেশ করিয়ে নাস্তা করায়। নিজেও করে তারপর অফিসের উদ্দেশ্য বের হয়ে যায়। হানিয়ার ঘুম থাকায় সে আবারও ঘুমিয়ে পরে।
হানিয়ার ঘুম ভাঙে দুপুর একটায়। চারদিকে আজানের শব্দে পরিবেশ শান্ত হয়ে আছে। হানিয়া শোয়া থেকে উঠে শাওয়ার নিয়ে বের হয়ে ভেজা জামা কাপড় মেলতে বেলকনিতে চলে যায়। জামাকাপড় রোদে দিয়ে রোদে দাঁড়িয়েই চুল মুছতে থাকে। চুল মুছতে মুছতে তার কেমন অস্বস্তি হতে থাকে। মনে হয় কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে। হানিয়া চুল মুছা শেষ লরে আনমনে পাশের বেলকনির দিকে তাকালে কালকের সেই ভয়াবহ রাগটা পুনরায় ফিরে আসে। কেনো? কারণ জাভিয়ান তালুকদারের দৃষ্টি যে তার দিকেই তাক করে রাখা। জাভিয়াম শুধু তাকিয়ে আছে না,,রীতিমতো হা করে গিলে খাচ্ছে হানিয়াকে। হানিয়া পা চালিয়ে সেখান থেকে চলে আসতে নিলে জাভিয়ান হুড়মুড়িয়ে তাকে ডেকে উঠে —
–হানি প্লিজ যেও না। তোমার সাথে আমার একটু কথা ছিলো। প্লিজ আম……
জাভিয়ান তার কথা শেষ করতে পারে না তার আগেই হানিয়া রুমে ঢুকে সজোরে দরজাটা লাগিয়ে দেয়। এতো জোরে আওয়াজটা হয় যে জাভিয়ান কেঁপে উঠে। জাভিয়ানের বুঝতে বাকি থাকে না হানিয়ার রাগের গভীরতা। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেখানেই বসে পরে এইভেবে যদি হানিয়া আবারও আসে বেলকনিতে।
__________
কালকের মতে আজ আর হানিয়া বেশিক্ষণ রাগ করে বসে থাকে না। মূলত বসে থাকতে পারে না। প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে তার। সে ডাইনিং টেবিলের কাছে এসে দেখে দুপুরের রান্না করাই আছে। সকালেই রান্নার খালা করে রেখে গেছে। সে খাবার বেড়ে খেতে থাকে। খাওয়া শেষ হলে ঔষধ খেয়ে বসে বসে ভাবতে থাকে এবার তার কি করা যায়। কোন কাজের কথা মাথা না আসায় সে তার বাটান ফোন তুলে কল লাগায় ইনায়াকে। ইনায়ার থেকে জানতে পারে,, সামনের মাসে তাদের মিডটার্ম এক্সাম হবে। সকল টিচাররা পুরো দমে পড়াচ্ছে। ঘন্টা দুয়েক কথা বলে তারপর ফোন রাখে হানিয়া। বই খাতা না থাকায় পড়ালেখাও করতে পারছে না। সে ভাবে আরো কয়েকটা দিন যাওয়ার পর ঢাকায় চলে যাবে। এই ইয়ারটা শেষ করে লাগলে পরবর্তী ইয়ারের সে রাজশাহী এসে পরবে ভাইয়ের কাছে একেবারে। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখে বিকেল সাড়ে চারটা বাজে।
আবারো একা একা অনুভব হয়। তাই সে সিদ্ধান্ত নেয় ফ্ল্যাটটা একটু ঝাড়াঝাড়ি করা যাক। যথেষ্ট পরিষ্কার হওয়া সত্বেও হানিয়া কাজটা করতে চায়। কারণ সে সময় কাটানোর মতো কোন কাজ পাচ্ছে না। একবার ভেবেছিলো সায়মাদের ফ্ল্যাটে যাবে,,কি ঐ ফ্ল্যাটে আজ জাভিয়ানও অবস্থান করছে কথাটা মাথায় আসার সাথে সাথে এই ভাবনাটাও বাদ দেয়। নিজের রুম ঠিকঠাক করে সে আবরারের রুমে যায়। তার রুমটা বেশ গোছানো। গোছানো জিনিস কি আবার গোছানো যায়? হানিয়া আবরারের রুমের স্টাডি টেবিলের উপর কয়েকটা মোটা মোটা উপন্যাসের বই দেখতে পায়। উপন্যাসের বই তার ভালো না লাগলেও বর্তমানে সময় কাটানোর জন্য এর চেয়ে ভালো কিছু তার কাছে নেই। টেবিল থেকে একটা উপন্যাসের বই তুলে নিয়ে। কিছুটা রহস্যময় নামটা। কৌতূহল হওয়ায় চেয়ার টেনে সেখানেই বসে পড়তে শুরু করে। পড়তে পড়তে হুট করে বইয়ের ভাজ থেকে একটা ভাজ করা কাজ বের হয়ে আসে। হানিয়া ভাবে কাগজটা হয়ত আবরারের জরুরি তাই সে সেটা আরেকটা বইয়ের কাজে রাখতে গিয়ে আবার কি মনে করে কাগজটা খুলে দেখা শুরু করে। কাগজ টায় চোখ বুলানোর পর সেখানের লেখাগুলো দেখে সে অবাক হয়ে যায়। ডান চোখ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে কাগজটার উপরে পরে। ভাগ্যের প্রতি তার আরো একবার অভি করতে ইচ্ছে হয়।
শব্দ সংখ্যা~১৮১৮
~~চলবে?
#প্রতিশোধের_অঙ্গীকার
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_বাহান্ন (বর্ধিতাংশ)
আবরারের আজ ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বেজে গেছে। তার লেট হচ্ছে দেখে হানিয়া একবার ফোনও করেছিলো। আবরার জানায় নতুন একটা প্রজেক্ট হাতে নেওয়ায় কাজের প্রেশারটা একটু বেশিই। হানিয়া নিজেই হালকা পাতলা নাস্তা বানিয়ে ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছে।
আবরার বাসায় এলে তাঁকে ফ্রেশ হতে বলে হানিয়া নাস্তা আনতে যায়। আবরার ফ্রেশ হয়ে এলে হানিয়া তাঁকে খাবারটা দিয়ে পাশে বসে থাকে। তার খাওয়া শেষ হলে,,হানিয়া এবার বের করে আসল জিনিস। হানিয়া একটা ভাজ করা কাগজ আবরারের দিকে এগিয়ে দেয়। আবরারের কপালে ভাজ পরে হানিয়ার কাগজ এগিয়ে দেওয়া দেখে। সে হানিয়াকে জিজ্ঞেস করে–
–এটা কীসের কাগজ বোন?
হানিয়া বলে–
–নিজেই খুলে দেখো।
আবরার কাগজটা হাতে নিয়ে কয়েকবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে তারপর কাগজটা খুলে দেখা শুরু করে। একটা চিঠি,, তাও আবরারে জন্য লেখা এই চিঠি। আবরার আগ্রহ নিয়ে পড়া শুরু করে চিঠিটা। সেটায় লেখা ছিলো–
আবরার সাহেব।
কি বলে শুরু করবো বুঝে উঠতে পারছি না। বলার যে কোন মুখ রাখি নি। একটা কথাই বলতে চাই, মাফ করে দিয়েন আমায়। আমার আগমনে আপনার জীবনটা তছনছ হয়ে গেছে। আমি যদি সারাটা জীবন আপনার গোলামী করি তাও আপনার ঋণ শোধ হবে না। ধন্যবাদ দিয়ে আপনাকে ছোট করতে চাইবো না,,শুধু এটা জানাতে চাই আমি সারাটা জীবন আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো আমাকে আমার ভালোবাসার মানুষটির সাথে মিলিয়ে দেওয়ার জন্য। এটা দোয়া করি,, আপনিও যাতে আপনার মনের মানুষটিকে খুব শীঘ্রই পেয়ে যান।
ইতি
আপনার দুই বছরের লোক দেখানো বউ।
আবরার চিঠিটা পড়ে বুঝতে পারে এটা এশাই তাঁকে লিখেছে। সে মাথায় একটু চাপ দিয়ে মনে করার চেষ্টা করে এশা এই চিঠিটা কবে দিয়েছিলো। হ্যাঁ,,মনে পরেছে। প্রায় দুই মাস আগে কোর্টের বাহিরে এশা একটা কাগজ দিয়েছিলো। সেইদিনই এশার সাথে তার শেষ দেখা হয়েছিলো,, কারণ সেদিন তাদের ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিলো আর এশাকে তার বয়ফ্রেন্ড ফাহিম নিজের সাথে নিয়ে গিয়েছিলো। আবরার ভেবেছিলো সময় করে পড়ে নিবে চিঠিটা কিন্তু ভুলে গিয়েছিলো। কিন্তু আজ হঠাৎ করে হানিয়া এই চিঠি কোথা থেকে পেলো?
আবরার ভীষণ অবজ্ঞা করে চিঠিটা হাতেই দুমড়েমুচড়ে ফেলে। তারপর হানিয়ার দিকে তাকিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে–
–তুই এটা কই পেলি?
হানিয়া শান্ত স্বরে বলে–
–তোমার রুম গুছাতে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখি রুম অলরেডি গুছানো। তাই স্টাডি টেবিল থেকে একটা বই নিয়ে পড়তে শুরু করি। সেই বইয়ের ভেতরেই এটা পেয়েছি।
–ওহ্হ।
হানিয়া এবার শক্ত চোখে আবরারকে জিজ্ঞেস করে–
–ওহহ? ওহ্হ বলে কি বুঝাতে চাচ্ছো? ঘটনাটা প্লিজ আমায় বলবে? এসবের মানে কি ভাই?
–শুনতেই হবে তোর? না শুনলে হয় না?
হানিয়া তার চোয়াল শক্ত করে বলে–
–নাহ।
আবরার এবার বলতে শুরু করে তাঁদের বিয়ের রাতের ঘটনা থেকে ডিভোর্সের আগ পর্যন্ত সব কথা। এশার প্রেমিক থেকে শুরু করে সব সবটা বলতে থাকে। হানিয়া যতই শুনছে ততই তার বাবার উপর রাগ জমা হচ্ছে। তার ভাইয়ের জন্য এমন চরিত্রের মেয়ে বাবা পছন্দ করেছিলো যে কিনা বিয়ের আগেই নিজের সতিত্ব বিসর্জন দিয়েছে। এই একজনের সিদ্ধান্তে আজ চার চারটা জীবনে এলোমেলো হয়ে পরেছে। হানিয়ার খুব করে ইচ্ছে করছে তার বাবাকে এসব শোনাতে। কিন্তু নাহ। সে চায় বিষয়টা আবরার নিজেই জানাক।
আবরার তার কথা শেষ করে দেখে বোনের চোখে পানি। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বলে–
–চোখ মুছ। কথায় কথায় এতো কাঁদার কি আছে রে ভাই?
কথাটা কৌতুক সুরে বললেও হানিয়ার মুড নেই এখন কৌতুক করার। সে আবরারকে বলে–
–বিচ্ছেদই যদি লিখা হয় শেষে,, তবে শুরুটা কেন হয় রঙিন স্পর্শে ভাই?
আবরার চোখ বন্ধ রেখেই বলে–
–“হয়তো জীবন শেখায় শুরু আর শেষের মাঝখানে এক অমলিন রেশ।”
তার চোখ মুছে আবরারকে বলে–
–স্পর্শ আপুকে এখনো ভালোবাসো,,তাই না ভাই?
আবরার কোন উত্তর দেয় না। চুপ করে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। হানিয়া কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও যখন ভাইয়ের থেকে উত্তর পায় মা, তখম আবারও জিজ্ঞেস করে–
–ভাই বলো না। ভালোবাসো আপুকে?
আবরার চোখ খুলে তাকায়। হানিয়া লক্ষ্য করে আবরারের চোখ হালকা লাল। কান্না আটকে রাখতে প্রচন্ড চেষ্টা করছে আবরার। সে মলিন হেসে বলে–
— “ভালোবাসা কি ভুলবার জিনিস? যাকে হৃদয় থেকে ভালোবাসা যায়, তাকে ভোলা অসম্ভব।
তাকে ভুলতে চাওয়াই স্মৃতির আলো নিভিয়ে দেওয়ার নামান্তর।”
আবরারের কথা শুনে হানিয়ার বুঝতে বাকি থাকে না তার হৃদয়ের সুপ্ত অনুভূতির কথা। আবরার বসা থেকে উঠে নিজের রুমে চলে যায়। হানিয়া ভাইয়ের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
____________________
মি. এন্ড মিসেস তালুকদারের সম্পর্কটা ইদানীং ভালো যাচ্ছে না। মি. তালুকদার স্ত্রীর সাথে কথা বলা প্রায়ই ছেড়েই দিয়েছেন। মিসেস তালুকদার বিষয়টা নিয়ে তেমন একটা পাত্তা দিচ্ছেন না। তার মতে, সে যা করছে তা তাদের সন্তান আর পরিবারের ভালোর জন্যই করছেন।
সবাই রাতের খাবার খেয়ে মাত্রই শুয়েছে। মি. তালুকদারের একটা অভ্যাস, সে ঘুমানোর আগে কম করে হলেও ১০ পৃষ্ঠা বই পড়বেনই। এটা না করলে নাকি তার ঘুম ভালো হয় না রাতে। মিসেস তালুকদার ফ্রেশ হয়ে এসে বেডে উঠে বসেন। ছেলেটার জন্য তার চিন্তা হচ্ছে। দুইদিন ধরে ঢাকার বাহিরে গেছে,,কই গেছে সে জানে না। ননদকে সে জিজ্ঞেস করেও তেমন সদুত্তর পাননি। এখন স্বামীকে জিজ্ঞেস করতে চাইছেন,,কিন্তু স্বামীর গম্ভীর মুখ দেখে কথা বলার সাহস পাচ্ছেন না।
মি. তালুকদার আড়চোখে স্ত্রীর উসখুস টের পাচ্ছেন কিন্তু আগ বাড়িয়ে কিছুই বলছেন না। কিছুক্ষণ পর মিসেস তালুকদার সাহস জুগিয়ে বলেই বসে–
–এই যে শুনছেন??
মি. তালুকদার নিরুত্তর হয়ে বইয়ের পাতায় চোখ বুলাচ্ছে। মিসেস তালুকদার আবারো তাকে ডেকে উঠেন–
–স্পর্শর বাবা!! আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিলো।
মি. তালুকদার বইয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই বলেন–
–কান খোলা আছে,,বলো শুনছি।
স্বামীর এমন অবজ্ঞা ভালো লাগে না মিসেস তালুকদারের। এর জন্যও তার অবচেতন মন হানিয়াকেই দোষী সাবস্ত করে। মিসেস তালুকদার এবার কোম ভণিতা ছাড়াই বলে–
–আমি ভাবছি,,এবার জাভিয়ান ঢাকায় ফিরলে ওর আর সোহার আকদের ডেট ফাইনাল করবো।
মিসেস তালুকদারের এই কথায় যেনো মি. তালুকদারের মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দেয়। বইটা ঠাশ করে বন্ধ করে রেগে হিসহিসিয়ে বলে–
–বিবাহিত ছেলেকে আবার বিয়ে দিয়ে কি জেলের ভাত খাওয়াতে চাইছো গুষ্টি শুদ্ধো সবাইকে?
স্বামীর এমন রাগ দেখে মিসেস তালুকদার থতমত খেয়ে যান। কিন্তু সেটা বুঝতে না দিয়ে নিজেও তেজ নিয়ে বলে–
–বিবাহিত এখন আছে কিন্তু কিছুদিন পর তো ডিভোর্সি হয়ে যাবে। তখন বিয়েটা দিয়ে দিবো ওদের।
–এই বিয়ে জীবনেও হবে না। হানিয়াই এই বাড়ির একমাত্র পুত্র বধূ থাকবে। তুমি ভালো করেই জানো আমাদের পরিবারে দ্বিতীয় বিয়ের প্রথা নেই। কথাটা যাতে দ্বিতীয় বার বলা লাগে না। রাত অনেক হয়েছে, নিজেও ঘুমাও আমাকেও ঘুমাতে দাও।
কথাটা বলে মি. তালুকদার নিজের বালিশে শুয়ে পরেন। মিসেস তালুকদার তার কথা শুনে নিজে নিজেই রাগে গজগজ করতে থাকেন কিছুক্ষণ,, তারপর ধপ করে শুয়ে পরেন। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে মনে মনে বলে–
–তোমাদের এই প্রথা তো আমিই ভাঙবো আমার ছেলে দিয়ে। শুধু দেখতে থাকো।
_______________________
কেটে যায় আরো কয়েকটি দিন। এই কয়েকদিনে জাভিয়াম তার সবটা দিয়ে চেষ্টা করেছে হানিয়ার সাথে কথা বলার। কিন্তু হানিয়া তাঁর দিকে একবারের জন্যও তাকায় নি। জাভিয়ান আসায় হানিয়া সায়মাদের বাসাতেও যায়নি এই কয়েকদিন। আহনাফ আর সায়মাই আবরারের ফ্ল্যাটে এসে তাদের সাথে দেখা করে গেছে।
সময়টা এখন সন্ধ্যা সাতটা। হানিয়া আর আহনাফ নুডুলস খাচ্ছে আর ডোরেমন দেখছে। সায়মা আর তার বরের সাথে একটু ডাক্তার দেখাতে গিয়েছে। রাতুল আর জাভিয়ান কোথায় গেছে তা হানিয়ার জানা নেই। হঠাৎই কলিংবেল বেজে উঠে। হানিয়া আহনাফকে তার কোল থেকে নামিয়ে দরজা খুলতে যায়। এইসময় আবরার ফিরে তাই সে লুকিং গ্লাসে কে এসেছে তা না দেখেই দরজা খুলে দেয়। কিন্তু দরজার বাহিরে দুই উজবুককে দেখে হানিয়ার ফুরফুরে আকাশে উড়তে থাকা মেজাজটা ধিরিম করে মাটিতে এসে পরে। রাতুল আর জাভিয়ানকে দরজার বাহিরে দাঁত কেলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেজাজটা বড্ড চটে যায়। দাতটা অবশ্য কেলাচ্ছে রাতুল, জাভিয়ানের ঠোটে হালকা হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হানিয়া কোনদিক চিন্তা ভাবনা ছাড়াই তাদের মুখের উপরই দরজাটা ঠাশ করে লাগিয়ে দেয়।
হানিয়ার দরজা লাগিয়ে দেওয়ায় জাভিয়ান আর রাতুল থতমত খেয়ে যায়। রাতুল জাভিয়ানের দিকে ঠোঁট উলটে তাকালে দেখতে পায় জাভিয়ানের মুখটায় আধার নেমে এসেছে। রাতুল হতাশা ভুলে কয়েকবার কলিংবেল বাজায় কিন্তু হানিয়া দরজা খুলে না। অগত্যা রাতুল সায়মাকে ফোন দিয়ে হানিয়ার দরজা না খোলার বিষয়টা জানায়। সায়মা রাতুলের ফোন কেটে হানিয়াকে কল লাগায়।
হানিয়া সায়মার কল রিসিভ করলে সে জানতে পারে,,সায়মা তাদের দু’জনকে ভুলে বাসার চাবি না দিয়েই ডাক্তারের কাছে চলে গেছে। এখন তারা এসে বাসায় প্রবেশ করার সময় বিষয়টা খেয়ালে আসে। তাই সে হানিয়াকে রিকুয়েষ্ট করে বলে,, তাদের দু’জনকে নিজেদের ফ্ল্যাট বসায়। তারা দু’জনই এখানের তেমন কিছুই চিনে না। বিকেলে জাভিয়ানের একটা কাজ ছিলো বিধায় দুই ভাই বের হয়েছিলো। সায়মারা ঘন্টা এক কি দুইয়ের মধ্যে ফিরে আসবে। সায়মার কথাটা শুনে হানিয়া শান্ত সুরে বলে–
–একা খালি একটা ফ্ল্যাট আমি দুইজন ছেলেকে ঢুকালে আশেপাশের মানুষ কি সেটা ভালো চোখে দেখবে?
উত্তরে সায়মা বলে–
–দু’জন ছেলের মধ্যে একজন তোর হাসবেন্ড হানিয়া। তোদের এখনো ডিভোর্স হয়ে যায় নি আর তোরা এখনো সমাজের চোখে স্বামী-স্ত্রী। আরেকজন ছেলে তোর দেবর। রাতুলের কথা বাদ দিলাম, কিন্তু সমাজের দৃষ্টিতে জাভিয়ানের কাছেই তুই সবচেয়ে বেশি সেফ হানিয়া।
জাভিয়ানের কাছে নাকি হানিয়া সেফ!!! হানিয়া কথাটা শুনে ফোনটা কানে রেখেই হেসে দেয়। সায়মা বুঝতে পারে এই হাসিতে কতটা কষ্ট,, বেদনা,, তাচ্ছিল্য মিশে আছে। সায়মা নিজে থেকেই বলে–
–আবরার ভাই তো এইসময় এসে পরে।
–আসতে বোধহয় লেট হবে।
–একটু ম্যানেজ করে নে না লক্ষীটি। আমি রাখছি,, আমার ডাক পরেছে।
হানিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে–
–আচ্ছা। আল্লাহ হাফেজ।
–আল্লাহ হাফেজ।
সায়মা ফোনটা কান থেকে ফোনটা নামিয়ে কিছু একটা ভাবতে থাকে। তার স্বামী এসে তার পাশে বসেন। আস্তে করে স্ত্রীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে চোখের ইশারায় ভরসা দেন। তারপর দু’জনেই বসা থেকে উঠে ডাক্তারের কেবিনের দিকে হাঁটা দেয়।
অন্যদিকে হানিয়া মাথায় ভালো করে কাপড় দিয়ে দরজাটা খুলে দেয়। তারপর সোফা থেকে আহনাফকে কোলে তুলে অন্য হাতে নুডুলসের বাটি নিয়ে তার জন্য বরাদ্দকৃত রুমটির দিকে হাঁটা দেয়। আহনাফ তাঁকে প্রশ্ন করে–
–মাম্মাম,, লালুত আল জাভ উকানে কি কচ্চে?
আহনাফ রাতুলকে লালুত আর জাভিয়ানকে সংক্ষেপে জাভ বলে ডাকে। রাতুল আর জাভিয়ান দরজা খোলার শব্দে বুঝতে পারে হানিয়া তাঁদের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে। তারা কোন সংকোচ ছাড়াই বাসায় প্রবেশ করে। দরজা দিয়ে রাতুল আর জাভিয়ানকে প্রবেশ করতে করতে শুনে আহনাফ হানিয়াকে উপরিউক্ত প্রশ্নটি করেছে।
হানিয়া নিজের ঘরে প্রবেশ করতে করতে বলে–
–বাসায় তো আম্মু নেই। তোমার দুই মামা একা থাকতে ভয় পাবে,,তাই আমাদের ফ্ল্যাটে এসেছে। এখন চলে তো বেলকনিতে গিয়ে তারা গুনবো আমরা। জানো আজ অনেেেেক গুলো তারা উঠেছে আকাশে।
–তত্তি?
–হ্যা,,বাবা সত্যি। আমরা তারা গুনবো,,চাঁদ দেখবো আর ইয়াম্মি ইয়াম্মি নুডুলস খাবো। ঠিক আছে বাচ্চা?
–ওকে মাম্মাম।
এতক্ষণে জাভিয়ান আর রাতুল বাসায় প্রবেশ করে সোফায় বসেছে আর চুপচাপ হানিয়াদের কথপোকথন শুনে। হুট করে রাতুল বলে উঠে–
–হানিয়া ভাবী আমাদেরও ক্ষুধা পেয়েছে। আমাদের কিছু খেতে দাও না।
একে তো তাদের দেখে হানিয়ার মেজাজ চটে আছে,,দুইয়ে রাতুল তাকে আবারও ভাবী বলে সম্বোধন করলো। হানিয়া ঘর থেকেই উত্তর দেয়–
— এটা কারো শ্বশুর বাড়ি না যে,, তাদের সব ফরমায়েশ পূরণ করা হবে। ডাইনিং টেবিলে পানির জগ আর গ্লাস রাখা আছে। ওটা বিসমিল্লাহ বলে খেয়ে নেন।
কথাটা কাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে তা বুঝতে কারো বাকি থাকে না। জাভিয়ান একটা হতাশা মিশ্রিত শ্বাস ফেলে চুপচাপ টিভি দেখতে থাকে। মিনিট দশেক পর আবারও কলিংবেলের আওয়াজ শোনা যায়। হানিয়া ঘর থেকে বের হয়ে আসার আগেই জাভিয়ান উঠে দরজাটা খুলে দেয়। আবরার এসেছে। খুশি মনে বাসায় ফেরা আবরারের মুখে আধার নেমে আসে যখন কিনা সে জাভিয়ানকে দরজাটা খুলতে দেখে। জাভিয়ান তার মুখভঙ্গি দেখে বুঝতে পারে সেও হানিয়ার মতোই অখুশি তাকে দেখে। মনে মনে ভাবে–
–আমাকে দেখে এদের দুই ভাই বোনের মুখই বাংলার পাঁচের মতে হয়ে যায় কেন? দিনদিন কি যৌবনের উজ্জ্বলতা কমে যাচ্ছে নাকি আমার? কমলেও অবাক হবো না। বিয়ের সাতমাস হয়ে যাচ্ছে আর বউ এখনো কুমারী। ছ্যাহ্ জাভিয়ান ছ্যাহ্।
জাভিয়ানের ধ্যান ভঙ্গ হয় আবরারের বাজখাঁই গলার ধমকে। আবরার দরজার সামনে দাড়িয়েই জাভিয়ানকে জিজ্ঞেস করে–
–আপনি? আপনি আমার ফ্ল্যাটে কি করছেন মি. তালুকদার? ওয়েট ওয়েট, আমার অনুপস্থিতিতে আমার বোনের কোন ক্ষতি করতে আসেন নি তো আপনি আবার?
আবরারের এমন প্রশ্নেে জাভিয়ানের মনটা ভেঙে কতগুলো টুকরো হয়েছে তা শুধু জাভিয়ানই জানে। জাভিয়ান বিষন্ন, ভগ্নহৃদয়ে নিয়ে আলতো স্বরে বলে–
–খারাপ হয় ছিলাম হয়ত কিন্তু সেটা সাময়িক সময়ের জন্য। এখন তার মধ্যে আমার রুহ বন্দি। নিজেই এসে দেখুন কিছু করেছি কি না আপনার বোনের।
আবরার জাভিয়ানকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। সোফায় বসা রাতুলের দিকে না তাকিয়েই মিষ্টির প্যাকেটটা ডাইনিং টেবিলের উপর রেখে হানিয়ার নাম ধরে ডাকতে থাকে। হানিয়া ভাইয়ের গলার আওয়াজ পেয়ে আহনাফসহ বাহিরে আসে। বাহিরে এসে আবরারকে জিজ্ঞেস করে–
–কি হয়েছে ভাই? এতো জোরে জোরে ডাকছ কেনো?
আবরার বোনের কাছে এসে তার হাত-পা ছুইয়ে দিয়ে জানতে চায়–
–জাভিয়ান তোর কোন ক্ষতি করেনি তো?
হানিয়া ভাইয়ের প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেলেও তৎক্ষনাৎ নিজেকে সামলে বলে–
–নাহ ভাই। কিছু করে নি। তুমি শান্ত হয়ে বসো। আমি পানি নিয়ে আসছি তোমার জন্য।
আবরার সোফায় বসে পরে,,হানিয়া আহনাফকে সোফায় বসিয়ে পানি নিতে ডাইনিং টেবিলের কাছে আসে। জাভিয়ান শান্ত চোখে তার রমণীকে দেখতে থাকে। পানি নেওয়ার সময় মিষ্টির প্যাকেট দেখে হানিয়া বলে–
–ভাই,,মিষ্টি কেন?
আবরারে হাতে পানি দিয়ে প্রশ্নটি করে হানিয়া। আবরার পানি পান করে,, হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলে–
–আমার প্রমোশন হয়েছে হানিয়া।
উপস্থিত সকলে আবরারের কথায় খুশি হয়ে যায়। হানিয়া খুশি মনে ভাইকে অভিনন্দন জানায়। রাতুল আর জাভিয়ানও তাকে অভিনন্দন জানায়। হানিয়া আবরারকে ফ্রেশ হতে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে চলে আসে রান্নাঘরে। চুলায় চা-কফির জন্য পানি বসিয়ে আবারো কম সময়ে বানানো যায় এমন কিছু তৈরি করতে থাকে। বিশ মিনিটের মধ্যে হানিয়ার নাস্তা তৈরি হয়ে যায়। আবরারও ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে এসেছে। হানিয়া আবরারের সাথে জাভিয়ান আর রাতুলকেও নাস্তা দিয়ে পুনরায় নিজের রুমে চলে আসে
এশারের আজানের সময় জাভিয়ানরা চলে যাশ তাদের ফ্ল্যাট থেকে। তারা সকলে চলে যাওয়ার পর হানিয়া রাতের খাবার গরম করতে থাকে। দুই ভাইবোন রাতের খাবারের পর্ব শেষ করে যখন একটু ফ্রি হয়ে বসে তখন আবরার তাঁকে আরেকটা চমকে যাওয়ার মতো কথা জানায়। সে হানিয়াকে ব’লে —
–আমার প্রমোশন হয়েছে ঢাকার অফিসে। মানে সেখানকার ম্যানেজার পদে আমায় নিযুক্ত করা হয়েছে। সামনের মাসে আমায় ঢাকায় সিফট হতে হবে।
হানিয়া এবার ভালোই চমকে যায়। সে ভেবেছিলো কি আর ভাগ্য তাকে নিয়ে যাচ্ছে কোথায়। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে–
–আমারও তোমায় একটা কথা জানানোর ছিলো।
–কি?
–আমার সামনের মাসের তিন তারিখ মিডটার্ম এক্সাম আছে। এটা এটেন্ড না করলে ফাইনাল এক্সামের সময় সমস্যা করবে কলেজ থেকে। আমিও ভাবছিলাম ঢাকায় চলে যাবো। এই ইয়ারটা ঢাকায় কম্পিল্ট করে নেক্সট ইয়ার এখানে এসে পরবো। এখন তো তোমার ট্রান্সফার হয়ে গেছে।
হানিয়ার কথা শুনে আবরার বুঝতে পারে হানিয়া ওই শহরে আর থাকতে চাচ্ছে না। কেনোই বা চাইবে? ওই শহর তাকে কষ্ট ব্যতীত আর কি দিয়েছে? হানিয়া আবরারকে বলে–
–তুমি চিন্তা করো না। আমি ম্যানেজ করে নিবো। কিন্তু একটা কথা জেনে রেখো,,আমি কারো আশ্রিতা হয়ে থাকবো না আর।
–মানে? আশ্রিতা বলতে কি বুঝাতে চাইছিস?
–আশ্রিতাই তো। বিয়ের পর মেয়ে শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়ি ঠাই নিলে তাকে তো সমাজ আশ্রিতাই বলে। আমি জীবনে অনেক অপবাদ পেয়েছি। চরিত্রহীন,,মিডেল ক্লাস,,নষ্টা কয়দিন পর হয়ত ডিভোর্সি ট্যাগটাও জুড়ে যাবে নামের পাশে। সব অপবাদ সইলেও আশ্রিতা ডাকটা শুনতে পারব না আমি। আর এই বিষয়ে আমি কারো কোন কথা শুনতে নারাজ। তালুকদার বাড়ির সাথে আমার সুতো কেটে গেছে চিরজীবনের জন্য,, মির্জা বাড়ির দিকে ফিরে তাকাতেই আমার ভয় লাগে। এখন যা করার আমি নিজেই করবো। অন্যের জন্য না নিজের জন্য বাঁচবো আমি। নিজেকে ভালোবাসবো।
হানিয়ার কথায় সীমাহীন দুঃখ,,অভিমান আর আত্মনির্ভরশীলতার আভাস পায় আবরার। সেও চায় হানিয়া নিজের জন্য বাঁচুক,, নিজেকে ভালোবাসুক,,নিজের জন্য কিছু করুক। আবরার হানিয়ার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে–
–আমায় সবসময় তোর পাশে পাবি ইনশা আল্লাহ।
শব্দসংখ্যা~২৩০০
~চলবে?