প্রতিশোধের অঙ্গীকার পর্ব-৫৮ এবং প্রথম অংশের শেষ পর্ব

0
398

#প্রতিশোধের_অঙ্গীকার
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_আটান্ন
#বিচ্ছেদ_নাকি_নতুন_কিছুর_সূচনা।

সকলে মিসেস তালুকদারকে খুঁজতে খুঁজতে হয়রান। সারা সেন্টারের কোথাও নেই। এইদিকে দুই জোড়া কাপল স্টেজে এসে উপস্থিত হয়েছে। দু’টো রাজকীয় সোফায় স্পর্শ-আবরার আর জাভিয়ান-সোহাকে বসানো হয়েছে। চারজনের মনেই আলাদা এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছে। স্পর্শের মনে একটা কথাই বারবার নাড়া দিচ্ছে আজ সারাজীবনের জন্য সে তার ভালোবাসার মানুষটির হয়ে যাবে। অন্যদিকে আবরারের মনে ভালো খারাপ দুটো অনুভূতিই ঘিরে রয়েছে। ভালোবাসার মানুষটিকে নিজের করে পেলেও তার জন্যই তার বোনকে ডিভোর্সি হতে হচ্ছে। এতদিন হানিয়ার ডিভোর্সের জন্য চিল্লাপাল্লা করলেও আজ সেই ডিভোর্সের জন্য নিজেকেই দোষারোপ করছে আবরার।

সোহার মনে কাজ করছে ভয়,,সংশয় আর উত্তেজনা। এই তিন অনুভূতি সোহাকে নাস্তানাবুদ করে ফেলেছে। আর এইদিকে আমাদের জাভিয়ানের মনোভাব বুঝা বড্ড দায় হয়ে পরেছে। বেটা মুখটা এমন স্বাভাবিক করে রেখেছে যে এর মনের হাল বুঝা কারো সাদ্ধ্য নেই। কাজী এবার বিয়ে পড়ানোর জন্য তাড়া দিলো হৈ-হুল্লোড়ের মেতে থাকা সেন্টারটা নিশ্চুপ হয়ে যায়। স্পর্শ তার বাবাকে ইশারায় নিজের কাছে ডাকলে মি. তালুকদার হন্তদন্ত হয়ে মেয়ের কাছে এসে জিজ্ঞেস করে–

–কি হয়েছে মা? কোন সমস্যা হচ্ছে?

–না বাবা কোন সমস্যা হচ্ছে না। আম্মু কই? এখন বিয়ে পড়ানো হবে। আম্মুকে ডেকে নিয়ে আসো তাড়াতাড়ি।

মি.তালুকদার চিন্তিত গলায় বলেন —

–তোমার আম্মু তো কোথাও নেই মা। এই একটু আগে আমায় মেসেজ করে বললো তার নাকি প্রেশার ফল করেছে তাই বাসায় চলো গিয়েছে।

স্পর্শ মায়ের অসুস্থতার কথা শুনে অস্থির হয়ে যায়। সে অস্থির গলায় বলে–

–বাবা মায়ের কি শরীর বেশি খারাপ?

মি. তালুকদার মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে তাঁকে শান্ত করার জন্য বলেন–

–না মা। তোমার আম্মুর একটু প্রেশার ফল করেছে। জানোই তো বেশি কাজের চাপ নিতে পারে না তাই হয়ত। তুমি চিন্তা করো না। বিয়েটা পড়ানো শেষ হলেই আমি বেরিয়ে পরছি বাসার জন্য। তুমি বিয়ে টায় মনোযোগ দাও মা।

স্পর্শ অশ্রুশিক্ত চোখে করুণ গলায় বাবাকে বলে–

–আম্মু থাকবে না আমার বিয়েতে বাবা?

মেয়ের এমন করুণ গলায় করা প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারে না মি. তালুকদার। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে–

–সবার সব চাওয়া তো পূরণ হয় না আম্মা। তোমার এটাও হয়ত হবে না। ভাগ্যে যা আছে তা আলহামদুলিল্লাহ বলে মেনে নাও।

স্পর্শর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরে। মি. তালুকদার মেয়ের চোখের পানি সহ্য করতে পারছেন না,,বিধায় তাড়াতাড়ি করে স্টেজ থেকে নেমে এক কোণায় গিয়ে রুমাল দিয়ে চোখটা মুছে ফেলেন। মি. তালুকদার যেতেই স্পর্শ নিজের হাতে এক পুরুষালী হাতের স্পর্শ পায়। ঘাড় ঘুড়িয়ে ডানে তাকালে দেখতে পায় তার প্রিয়তম,,কিছুক্ষণ পর হতে চলা তার জীবনসঙ্গী তাকে চোখের ইশারায় কাঁদতে মানা করছে। আবরার নিজের শেরওয়ানির পকেট থেকে রুমাল বের করে স্পর্শর চোখটা মুছিয়ে দেয় ভীষণ যত্ন করে। আবরারের এমন যত্ন দেখে কাজিন মহল “ওহ্হ হোো” বলে চেচিয়ে উঠে।

মিনিট পাঁচেক পর কাজী বিয়ে পড়ানো শুরু করে। প্রথমে স্পর্শ-আবরারের বিয়ে পড়ানো হবে। তারপর জাভিয়ান আর সোহার। মহান রাব্বুল আলামিনের কালাম পড়ে,, ইসলামি রীতিতে স্পর্শ-আবরার পরস্পরকে ইহকাল ও পরকালের জন্য হালাল করে নেয় তিন কবুলের মাধ্যমে। তিনবার কবুল বলে ধর্মীয় রীতিতে আর ম্যারিজ রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করার মাধ্যমে সামাজিক ভাবে আজ থেকে তারা স্বামী-স্ত্রী বলে স্বীকৃতি পায়। বহু কষ্ট,,চোখের পানির পর আজ তারা এক হতে পেরেছে,, কথাটা মনে হতেই আবরার রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন শেষ করার সাথে সাথেই দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হুহু করে কেঁদে দেয় সকলের সামনে। সকলের তার এমন কান্নায় ভরকে গেলেও পরবর্তীতে বুঝতে পারে এটা খুশির কান্না।

স্পর্শ আবরারের গা ঘেঁষে বসে তাঁকে শান্ত করায়। কিছুটা সময় নিয়ে আবরার নিজেকে শান্ত করে। তারপর কাজী এগিয়ে যায় জাভিয়ান-সোহার দিকে। জাভিয়ান ঘাড় এদিকসেদিক ঘুরিয়ে কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে খুঁজতে থাকে। উহুম,,নেই সে রমণীটি। আসে নি কি তাহলে? কথাটা মনে হতেই নিজেকে নিজেই এক ভয়ংকর গালি দেয় জাভিয়ান। একঘন্টা আগেও তো দেখা হলো সেই রমণীর সাথে। বাক্যালাপ হলো দু’জনের মধ্যে দীর্ঘ সময়। কি হয়েছিলো জানতে চান? তাহলে শুনে আসি এক ঘন্টা আগের ঘটনাটা।

এক ঘন্টা আগে~~

হানিয়া সেন্টারের পেছনের বাগানে দাঁড়িয়ে আছে। আর ঘন্টাখানেক পরই সে আর জাভিয়ান চিরকালের জন্য আলাদা হয়ে যাবে,,কথাটা মনে পরতেই তার বুকে প্রচন্ড ব্যথা হচ্ছে। চোখ ফেটে অশ্রুরা বের হওয়ার অনুমতি চাচ্ছে। নিজেকে সামলানো কঠিন হয়ে পরছে হানিয়ার জন্য। গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে তার। কিন্তু সে চুপচাপ হয়ে আছে। একদম শান্ত নদীর মতো।

হঠাৎই একটা পুরুষালী গলার গম্ভীর ডাকে হানিয়া থমকে যায়। ডাক’টা তার পরিচিত এবং একজন মানুষই হানিয়াকে এই নামে ডাকতো। হানিয়া আনমনে মুখ দিয়ে বের হয়ে আসে সেই ব্যক্তিটির নাম–

–জাভিয়ান।

হ্যাঁ,,জাভিয়ানই। হানিয়া পেছন ফিরে তাকাচ্ছে না দেখে জাভিয়ান নিজেই হেঁটে হানিয়ার সামনে এসে দাঁড়ায়। আবছা আলোয় হানিয়ার থমথমে মুখটা দেখে জাভিয়ানের বুকটা কেমন একটা চাপ পরে। জাভিয়ান হালকা হেঁসে বলে —

–কি করছিলে এখানে? এমন আঁধারে একা একা নিস্তব্ধ এই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে ভয় করছিলো না তোমার?

হানিয়া জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে হঠাৎই গেয়ে উঠে–

–“একলা একা একলা আমি একলা ভালো থাকি।”

জাভিয়ান চমকে যায় বিষাদ মাখা কণ্ঠে হানিয়ার এই এক লাইন শুনে। বুকে খানিকটা কাঁপনও ধরিয়ে দেয়। হানিয়া তার কণ্ঠে এতোটা বিষাদ। কেনো? তারা চিরকালের জন্য আলাদা হয়ে যাচ্ছে এই কারণে? কিন্তু সিদ্ধান্তটায় সবচেয়ে বেশি সমর্থন করেছিলো হানিয়া নিজেই। তাহলে এখন এতো বিষাদ কেনো হানিয়ার কণ্ঠে? বিষাদের জায়গায় উচ্ছ্বাস থাকার কথা নয় কি?

হানিয়া বলে–

–লাইনটা দ্বারা কি বুঝলেন?

জাভিয়ান কোন উত্তর দেয় না। হানিয়ার থেকেই শুনতে চাচ্ছে সে। জাভিয়ান চুপ করে আছে দেখে হানিয়া নিজেই বলে–

–আমিই বলছি। এর মানে হলে “আমি একা, একাকিত্ব আমার নিজের বেছে নেওয়া সঙ্গী। যে একবার নিঃসঙ্গতার হাত ধরে, সে আর ভয়ের পথ চেনে না।
হারানোর শঙ্কা ঝরে পড়ে, অপেক্ষা বিলীন হয় রয়ে যায়।”

জাভিয়ান তাকিয়ে থাকে হানিয়ার চোখের দিকে। হানিয়াও আজ কোন দ্বিধাদ্বন্দ ছাড়াই তাকিয়ে দেখছে তার প্রণয়ের প্রথম পুরুষকে। যে কিনা একটু পরই অন্যের হয়ে যাবে। মন ভরে দেখে নিচ্ছে। জাভিয়ান হানিয়ার চোখে চোখ রেখে জবাব বলে উঠে —

–তোমার এই একাকিত্বের জীবনে আমায় এককোনায় রাখলে কি বড্ড বেশি ক্ষতি হয়ে যেতো হানি?

হানিয়া চোখে চোখ রেখে হেসে উঠে। কথা ঘোরানোর জন্য বলে–

–বউকে স্টেজে বসিয়ে রেখে এখানে কি করছেন আপনি? স্টেজে চলে যান আর কিছুক্ষণ পরেই হয়ত আপনাদের বিয়ে পড়ানো শুরু হবে।

জাভিয়ান চোখ সরিয়ে নেয় হানিয়ার থেকে। বড্ড বেশি রাগ লাগছে মেয়েটার উপর। ভেতরে ভেতরে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে কিন্তু বাহিরের অন্যকে কথার বান দিয়ে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। না,, সে যেটা করেছে ঠিকই করেছে। একটু শাস্তি তো হানিয়ারও পাওনা। বিচ্ছেদের অনলে নিজেকে যেমন পুড়ছে জাভিয়ানকেও পোড়াচ্ছে। জাভিয়ানের পাশে সোহাকে দেখে গুমরে গুমরে মরছে কিন্তু স্বীকার করতে নারাজ সে। কেঁদে কেটে ইনায়ার কাছে নিজের মনের কথা জানাতে পারে কিন্তু যার জন্য এই কান্নাকাটি তাকেই সাহস করে বলতে পারছে না। জাভিয়ানের এখন এতো মেজাজ খারাপ হচ্ছে যে ঠাটিয়ে একটা চড় দিতে মন চাচ্ছে। কিন্তু তার সাহসে কুলচ্ছে না,,পাঠক সমাজ যে তার এই হাত চালানোর স্বভাবের কারণে ভীষণ ক্ষুদ্ধ হয়ে আছে।

পাঁচদিন আগে যখন ইনায়া তাকে হানিয়ার একটা ভিডিও পাঠালো তখনই সে ঠিক করে নিয়েছিলো বিয়ের ঝামেলা মিটে যাওয়ার পর এই মেয়েকে একটা থাপ্পড় হলেও সে দিবেই। এতে পাঠক সমাজ তাকে ভয়ংকর গালি দিলেও সে মাথা পেতে মেনে নিবে। ইনায়ার পাঠানো ভিডিওটায় সে দেখতে পেয়েছিলো জ্বরে অচেতন হানিয়ার কান্নামাখা গলার আকুতি। অচেতন হানিয়া ইনায়ার হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে জাভিয়ানকে চেয়েছিলো। আরে কতশত আকুতি ইনায়ার কাছে। কিন্তু সবটাই হানিয়া অচেতন অবস্থায় করেছে। বলা হয়ে থাকে,,অচেতন অবস্থায় মানুষ মনের কথা গুলোই বলে ফেলে। হানিয়াও তাই করেছে।

পাঁচদিন আগে হুট করেই হানিয়ার গা কাঁপিয়ে ভয়াবহ জ্বর আসে। এমন জ্বর হানিয়ার বিশ বছরের জীবনে খুব কমই এসেছে। হানিয়া তখন হোস্টেলেই। ভাইয়ের বিয়েতেও বাসায় যায় নি সে। তার পাশের বেডের একজন মেয়ে তার এতো জ্বর দেখে ঘাবড়ে যায়। হানিয়ার পরিবারের লোকদের ফোন করতে চাইলে হানিয়া নিষেধ করে দেয় তাকে। সে চায় না তার এই সামান্য অসুস্থতার কারণে একটা শুভ কাজে বাধা পরুক। মেয়েটা অনেক জোর করার পর হানিয়া ইনায়ার নাম্বার দেয় মেয়েটাকে। মেয়েটা ইনায়াকে সংক্ষিপ্ত ভাবে সবটা খুলে বললে ইনায়া তড়িঘড়ি করে ডা.এহসানকে নিয়ে হানিয়ার হোস্টেলে এসে উপস্থিত হয়। গার্লস হোস্টেল হওয়ায় সেখানকার দায়িত্বরত মহিলা ডা.এহসানকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয় না। বলে ডা. প্রবেশ করতে হলে মেয়ে ডা. আনে যেনো তারা। অগত্যা ডা.এহসান বাহিরেই দাঁড়িয়ে থাকে আর তার এক ফিমেল কলিগকে ফোন দিয়ে ডেকে আনে। ইনায়া অবশ্য আগেই চলে গিয়েছিলো। তখন অচেতন হানিয়া ইনায়াকে এসব বলেছিলো। ইনায়া সেটা নিজের ফোনে ভিডিও করে রেখেছিলো।

হানিয়ার গলার আওয়াজে জাভিয়ানের ধ্যান ভাঙে। হানিয়া তাকে বলছে–

–যান স্টেজে গিয়ে বসুন। আপনার হবু বউ যে আপনার অপেক্ষা করছে।

জাভিয়ান একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলে–

–তা তো যাবোই। তার আগে এই বউয়ের ইচ্ছেটা পূরণ করে নেই। বউ আমার কাছে প্রথম বার কিছু একটা চেয়ে সেটা তাকে না দেওয়া পর্যন্ত আমি যে শান্তি পাচ্ছি না।

হানিয়ার জাভিয়ানের কথা বুঝতে বাকি থাকে না। জাভিয়ান নিজের শেরওয়ানির পকেট থেকে একটা ভাজ করা পেপার আর পেন বের করে। পেপারটা খুলে সেটা হানিয়ার দিকে বাড়িয়ে দেয়,,সাথে পেন টাও। মুখে হাসি বজায় রেখেই বলে–

–তোমার ইচ্ছেটা তাড়াতাড়ি পূরণ করতে গিয়েও করতে পারলাম না হানি। দুঃখিত তার জন্য।

হানিয়ার কাছে কথাগুলো কটুক্তিই লাগলো। ইচ্ছে পূরণ করতে পারলো না কিভাবে? এই তো তাদের বিচ্ছেদের জন্য সব ব্যবস্থা করেই তো ফেলেছে। শুধু দুইজনের দুটো স্বাক্ষর তারপর তারা ইহকাল পরকাল দুই জগতের জন্যই একে অপরের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। কথাটা মনে পরতেই হানিয়ার চোখজোড়া ভিজে উঠে। ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের কান্না আটকায়। কাঁপা কাঁপা হাতে পেপার আর পেনটা নিজের হাতে তুলে নেয়।

গলা স্বাভাবিক করার জন্য কয়েকবার খাঁকারি দেয়, তাও গলাটা অবস্থা যা কে তাই থেকে যায় হানিয়ার। ভাঙা গলা নিয়েই বলে–

–পরে সাইন করে কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি।

জাভিয়ান হন্তদন্ত হয়ে বলে–

–না না পরে করা যাবে না। এখনি করো। আমার আবার এই পেপার্স এডভোকেট আঙ্কেলকে দিতে হবে। সে তো আজ বিয়েতে আসছে তখনই দিয়ে দিবো।

হানিয়া চোখ তুলে জাভিয়ানকে একবার দেখে নেয়। কত তাড়া তাঁর মুক্তি পাওয়ার। ঠিক আছে সে-ও আর অপেক্ষা করাবেন না। পেছনের একটা দেওয়ালে পেপারটা রেখে দু’টো পৃষ্ঠায় ঘচাঘচ সাইন করে জাভিয়ানের হাতে ধরিয়ে দেয় পেপারটা। থমথমে গলায় বলে–

— স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা। এবং শুভ বিবাহ।

জাভিয়ানের মনের ভেতরে থাকা ভয়টা একেবারে শেষ হয়ে যায়। চমৎকার একটা হাসি দিয়ে পেপারটা নিজের হাতে তুলে নেয়। পেপারটা পুনরায় পকেটে ভরে রেখে হানিয়াকে ক্রস করে যাওয়ার সময় হুট করে হানিয়ার কানের কাছে কিছুটা ঝুঁকে বলে–

— সরি বাট নট নট সরি এইটুকু পাওনা তুমি। জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ বধূয়া।

কথাটা বলে শিষ বাজাতে বাজাতে চলে যায়। হানিয়া নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে জাভিয়ানের যাওয়া দেখে।

বর্তমান~~

কাজী সাহেব জাভিয়ান আর সোহার বিয়ের জ যাবতীয় তথ্যগুলো লিখছিলেন,, সেই ফাঁকে হঠাৎ কোথা থেকে আহনাফ দৌড়ে আসে জাভিয়ানের কাছে। জাভিয়ানের হাতে একটা চিঠির মতো কাগজ দিয়ে তাঁকে একটু ঝুকতে বলে। জাভিয়ান আহনাফের কাছে একটু ঝুঁকে এলে আহনাফ তার কানে কানে বলে–

–হানি মাম্মাম দিয়েতে এতা। পলে কুলে দেকতে বলেতে।

কথাটা শেষ করেই যেমন ঝড়ের গতিতে এসেছিলো তেমনি তুফানের গতিতে চলে যায়। এইদিকে জাভিয়ানের কপালে কয়েকটা ভাজ পরে। এই তো একটু আগেই হানিয়ার সাথে দেখা হলো তখন তো খোঁচা মারা কথা ছাড়া কিছুই বললো না। এখন চিঠিতে লিখে আবার কি জানালো? জাভিয়ান চিঠিটা খুলবে তখনই কয়েকটা উত্তেজিত গলার আওয়াজে চিঠি পড়ার বিষয়টা ভুলে যায়। চিঠিটা পকেটে ভরে সামনে তাকালে তার অধর কোনে একটা হাসি ফুটে ওঠে।

সামনে তাকিয়ে দেখতে পায় জাভিয়ানের পি.এ. রাশেদ সোহার বয়ফ্রেন্ড জয়ের কলার ধরো টানতে টানতে স্টেজের সামনে এনে ফেলেছে। পেছনে কয়েকজন পুলিশ আরো কয়েকটা বখাটে ছেলেদের ধরে নিয়ে আসছে। জাভিয়ান তাদের থেকে চোখ ঘুরিয়ে পাশে বসা সোহার দিকে তাকায়। দেখতে পায় সোহা হতভম্ব হয়ে হা’ করে বিষয়টা দেখছে। এমনটা যে হবে সে কস্মিনকালেও কল্পনা করেনি। জাভিয়ান তার আরেকটু কাছে গিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বল–

–ইউর গেম ইজ ওভার না হওয়া মিসেস জাভিয়ান তালুকদার।

সোহা মুখটা হা’ করেই জাভিয়ানের দিকে তাকায়। জাভিয়ান তাকে উদ্দেশ্য করে একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বসা থেকে উঠে হেটে স্টেজের মধ্যখানে আসে। স্টেজের পাশে একজনকে কিছু একটা ইশারা করতেই একটা ছেলে একটা মাইক দেয় তার হাতে। জাভিয়ান মাইকে বলতে শুরু করে–

— আপনারা যারা দু’টো বিয়ে দেখার জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন তাদেরকে দুঃখভরাক্রান্ত মনে জানাতে হচ্ছে যে,,দ্বিতীয় বিয়েটা হচ্ছে না। আপনাদের একটা বিয়ে দেখেই সন্তুষ্ট হতে হবে।

উপস্থিত সবার মাথার উপর দিয়ে যায় জাভিয়ানের কথাগুলো। মি. তালুকদার ছেলের কাছে এগিয়ে এসে বলে–

–কি বলছো তুমি এসব? তোমার মাথা ঠিক আছে তো? আর রাশেদের সাথে এই ছেলেটা কে? পুলিশই বা কি করছে? হেয়ালি বাদ দিয়ে বলবে সবটা?

মি. তালুকদার যে রেগে গেছে তা তার কথার তেজেই বুঝা যাচ্ছে। জাভিয়ানও এবার হেয়ালি বাদ দিয়ে সিরিয়াস হয়ে উপস্থিত অতিথিদের উদ্দেশ্য করে বলে–

–আজকের বিয়ের কার্যক্রম এই পর্যন্তই। আপনারা সকলে খাওয়া দাওয়া করে যাবেন। এটা আমাদের ফ্যামিলি টাইম।

জাভিয়ানদের তরফ থেকে তেমন কেউ না আসলেও সোহাদের তরফ থেকে অনেক দূর দূরান্তের অতিথিরাও এসেছিলো বিয়েতে। তাদের উদ্দেশ্য করেই জাভিয়ান কথাগুলো বলে। খাওয়াদাওয়ার দিকে খেয়াল রাখা দু’জন লোক অতিথিদের খাওয়ার পেন্ডেল নিয়ে যায়। হলরুম টায় থেকে যায় জাভিয়ানের পরিবার,, হানিয়ার পরিবার আর সোহার পরিবার।

জাভিয়ান আবারও বলা শুরু করে–

–বিষয়টা বুঝতে হলো আপনাদের কয়েকটা ভিডিও ফুটেজ ও অডিও রেকর্ড শুনতে হবে। আশা করি সবাই ধৈর্য ধরে দেখবেন ও শুনবেন।

সকলে মাথা নাড়িয়ে তার কথার সম্মতি দেয়। জাভিয়ান একজনকে ইশারা করতেই লোকটি একটা টেবিল ও একটা ল্যাপটপ এনে স্টেজে রাখে। জাভিয়ান দের যেই সোফায় বসানো হয়েছিলো তার পেছনে একটা বড়সড় জায়গা জুড়ে সাদা কাপড় দেওয়া আছে। সেটাতেই প্রজেক্টরের মাধ্যমে ভিডিও ফুটেজ দেখানো হয়। ভিডিওর শুরুতে দেখা যায় সোহা জয়ের সাথে সেই আবাসিক হোটেলটায় ঢুকছে। দু’জনে বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে হাঁটছে। জাভিয়ান ভিডিও’র টাইমিং বাড়িয়ে দিলে দেখা যায় তারা প্রায় তিন ঘন্টা পর ঐ হোটেল থেকে বের হয়ে আসছে।

জাভিয়ান ভিডিওটা স্টপ করে পুনরায় তাদের প্রবেশের সময়কার ফুটেজ চালু করে বলে–

–একটা জিনিস খেয়াল করুন। সোহা হোটেলে প্রবেশের সময় এক ড্রেস পরে প্রবেশ করছে আর বের হওয়ার সময় আরেক ড্রেস। আরেকটা জিনিস দেখেন, সে আর এই ছেলেটি (জয়কে দেখিয়ে) কেমন ঘনিষ্ঠ হয়ে ভেতরে প্রবেশ করছে। এতোটা ঘনিষ্ট তো স্বামী-স্ত্রীও হয় না পাবলিক প্লেসে। এখন আমি বিষয়টা ক্লিয়ার করছি,,সোহা আর এই ছেলে যার নাম জয় তারা দীর্ঘ দিন ধরে প্রেমের সম্পর্কে আছে। তাদের সম্পর্কটা এতোটাই গভীর যে তারা এই হোটেলে নিয়মিত রুমডেটে যায়।

এই কথা শুনে সোহার বাবা ভয়াবহ রেগে যায়। সে তেড়ে জাভিয়ানের সামনে এসে বলে–

–মুখ সামলে কথা বলো জাভিয়ান। তোমার সাহস কি করে হয় আমার মেয়ের সম্পর্কে এসব বলার?

জাভিয়ান একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলে–

–আমার সাহস ঠিক কতটা আপনি ভালো করেই জানেন আঙ্কেল। আর আপনার কি মনে হয় আমি এসব আমার মনগড়া কথা বলছি? তাহলে বলবো,,আপনি ভুলের স্বর্গে বাস করছেন।

–সামান্য এই ড্রেস পাল্টানোর জন্য তুমি আমার মেয়ের নামে এতো বড় অপবাদ কিভাবে দিচ্ছো? এটা মনগড়া নয়তো কি?

–আজ বুঝলাম আপনার মেয়ে এই বয়সেই এতো কেন বিগড়ে গিয়েছে। সোহার এতো অধঃপতনের জন্য দোষটা আমি সম্পূর্ণ আপনাকে দিবো আঙ্কেল। যাই হোক,,আজ আপনাকে দোষী করার দিন না। আজ আপনার মেয়ের আসল রূপ দেখানোর জন্য আপনাদের এসব বলা।

জাভহয়ান এবার সোহার বাবার থেকে চোখ সরিয়ে রাশেদের দিকে তাকিয়ে বলে–

–ওকে আনাও।

রাশেদ কাউকে একটা ফোন করে। মিনিট পাঁচেক পর একটা জয়ের বয়সী একটা ছেলে প্রবেশ করে হলে। জাভিয়ান তাকে বলে–

–যা জানো সব বলো।

ছেলেটা বলতে থাকে–

–জয় আমার ছোট বেলার বেস্টফ্রেন্ড। ও গত বছর থেকে সপ্তাহে দুই দিন হলেও সোহাকে আমার হোটেলে নিয়ে এসে রুমডেট করে। হোটেলটা আমার না আমার বাবার। সে অসুস্থ হয়ে পরায় আমি দায়িত্ব নিয়েছি। শুরুতে আমি মানা করলেও জয় আমায় অনেক পীড়াপীড়ি করায় আমি রাজি হয়ে যাই। (হাতে একটা রেজিস্ট্রার খাতা দেখিয়ে বলে) এই খাতায় আমাদের হোটেলের সব গেস্টদের নাম এন্ট্রি করা হয়। এটা চাইলে আপনারা দেখতে পারেন। এছাড়া হোটেলে ইন্ট্রেসে এবং বিভিন্ন ফ্লোরে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে যেটা কিনা আমার কথা প্রমাণে সাহায্য করবে।

জয়ের বন্ধু খাতাটা পুলিশের কাছে দিয়ে দেয়। পুলিশ খাতাটা নিয়ে সবটা চেক করে। তারপর সোহার বাবার দিকে তাকিয়ে বলে —

–উনি যা বলছে সব সত্য।

জাভিয়ান আবারও বলা শুরু করে–

–শুধু তাই নয় আঙ্কেল আপনার মেয়ে আপনাকে নানাভাই বানাতে চলেছে। দুই মাসের প্রেগন্যান্ট সে। এবং অপেক্ষা রাখে না এই সন্তানের বাবা জয়।

জাভিয়ানের এই কথায় যেন সকলের মধ্যে বো”মা বিস্ফোরণে মতো কাজ করে। জাভিয়ানের এতক্ষণের কথা ও প্রমাণে সকলেই নিমিষেই তার কথা বিশ্বাস করে ফেলো। সোহার বাবার বুঝতে বাকি থাকে না জাভিয়ান সত্যি বলছেন। সে মেয়ের দিকে তাকিয়ে ধপ করে নিচে বসে পরে। সোহার মা তাড়াতাড়ি করে এসে স্বামীর পাশে বসেন। মি.তালুকদার নিজের কৌতূহল সামলে না রাখতে পেরে বলেই বসেন–

–তাহলে সে এসব গোপন করে তোমার সাথে বিয়ের পীড়িতে বসছিলো কেন? এতোই যদি ভালোবাসে তাহলে তাকে কেন বিয়ে করলো না?

–ভালো প্রশ্ন করেছো বাবা। এটার উত্তরও দিচ্ছি তার আগে একটা অডিও রেকর্ডিং শুনো।

জাভিয়ান এবার নিজের ফোনটা বের করে অডিও রেকর্ড অন করে ফোনটার সামনে মাইক ধরে,, যাতে সকলেই শুনতে পায়। সবাই শুনতে পায় একটা ছেলে বলছে–

–শুনো সোহা,, তুমি আজই গিয়ে তোমার খালামনির সামনে নাটক করে তালুকদার বাড়ি থেকে বের হয়ে আসতে চাইবে। একটু কান্নাকাটিও করবে। বুড়ি যেই পরিমাণ ভাগ্নীকে ভালোবাসে,, সে নিশ্চিত তোমায় আটকাবে আর তোমার এমন কান্নার কারণ জানতে চাইবে। তখন তুমি তোমার চালটা চালবে। তুমি বলবে,,তোমার বাবা বিয়ে ছাড়া এতোদিন সেই বাড়িতে তোমার থাকাটা মেনে নিচ্ছে না। এছাড়া উনি উনার বন্ধুর ছেলের সাথে বিয়ের কথাবার্তা বলছে।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তোমার বাবা তোমার বিয়ে দিতে চান। এটা শুনলে বুড়ি নিশ্চয়ই তাড়া দিবে তোমাদের বিয়ের। বুঝতেই তো পারছো,, যত তাড়াতাড়ি তোমার সাথে জাভিয়ানের বিয়েটা হবে তত তাড়াতাড়ি আমরা তাদের সম্পত্তি নিজের নামে করার প্ল্যানে এগিয়ে যাবো। একবার তালুকদার প্রপার্টিজ আমাদের নামে হয়ে গেলে তুমি আর আমি পালিয়ে অন্য কোন দেশে চলে যাবো। তারপর আমাদের সুখের সংসার পাতবো। বুঝেছো জান কি করতে হবে তোমায়?

এবার সোহার কন্ঠ শুনা যায়। সে বলে–

–তা আর বলতে। তুমি দেখোই না কালই আমাদের বিয়ের পাকা কথা শুনলে বলে তুমি।

কথাটা বলেই সোহা আর জয় উচ্চস্বরে হেসে উঠে। সকলে হতভম্ব হয়ে যায় রেকর্ডিংটা শুনে। জাভিয়ান রেকর্ডিংটা অফ করে নিজেই বলা শুরু করে–

–আশা করি আপনাদের কাছে সবটা ক্লিয়ার হয়েছে। সোহা কিভাবে আম্মুর ব্রেন ওয়াশ করে এই বিয়েটা করছিলো আশা করি বুঝতে পেরেছেন। এই রেকর্ডিংটা আমায় রাশেদের বোন অবনী দিয়েছে যে কিনা ওই হোটেলেই পার্টটাইম জব করে। একদিন সোহা আর জয়ের রুমে খাবার দিতে গেলে সে কিছুটা শুনে ফেলে তারপর কয়েকটা দিন তাদের অজান্তেই একটু খোঁজ খবর নিয়ে আমায় জানায় বিষয়টা এবং রেকর্ডিংটা শুনায়। ওহ্হ আরেকটা কথা,,তার শুধু এইটুকু করেই শান্ত হয়নি,,আজ যখন আম্মু কাজী সাহেব আসার আগে সোহার রুমে গিয়েছিলো তখন আম্মু হয়ত সোহাদের প্ল্যান সম্পর্কে কিছু জেনে যায়। আম্মু আমাদের এই বিষয়টা জানালে চাইলে সোহা তার মাথায় আঘাত করে অজ্ঞান করে ফেলে। পরবর্তীতে জয়কে কল করে আম্মুকে লুকিয়ে এখান থেকে তাদের গোপন আস্তানায় নিয়ে যায়। দুর্ভাগ্য বসত আম্মুকে যখন ওরা সেন্টারের একটু দূরে ওদের পার্ক করা গাড়িতে তুলছিলো তখন রাশেদ দেখে ফেলে। ও তৎক্ষনাৎ গাড়িটার পিছু নেয় এবং সেখানে যাওয়ার পর আমায় ফোন দিয়ে জানায় বিষয়টা। তখন আমি পুলিশের সহায়তা আম্মুকে উদ্ধার করে রাতুলের মাধ্যমো হসপিটালে পাঠিয়ে দেই আর আমি এখানে রয়ে যাই সোহা আর জয়ের কীর্তি ফাঁস করতে।

মিসেস তালুকদারকে হসপিটালাইজড করা হয়েছে শুনে তালুকদার বাড়ির লোক চিন্তিত হয়ে পরে। মি. তালুকদার ছেলেকে জিজ্ঞেস করে–

–তোমার আম্মু ঠিক হয়েছে তো? তার কন্ডিশন এখন কেমন,?

–সেটা সম্পর্কে এখমো খোঁজ নেওয়া হয়নি। এই ঝামেলা শেষ করেই হসপিটালে যাবো।

জাভিয়ান কথা শেষ করে চুপ করে থাকে। হুট করেই থাপ্পড় মারার শব্দে সকলের ধ্যাণ ভঙ্গ হয়। সকলে দেখতে পায় জাভিয়ানের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সোহাকে তার বাবা থাপ্পড়ের উপর থাপ্পড় মারছে। সোহার মা তাকে থামাতে চাইলে ভদ্রলোক স্ত্রীকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে পুনরায় মারতে থাকে। থাপ্পড় মারার এক পর্যায়ে সে সোহার গলা চেপে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে–

–যেই হাতে একদিন তোকে হাঁটা শিখিয়েছি সেই হাত দিয়েই আজ তোকে মেরে ফেলবো। আমার ভালোবাসার এই প্রতিদান দিলি? কিসের কমতি রেখেছিলাম যে এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলি? জাভিয়ান দের মতো টাকা পয়সা না থাকলেও কম তো ছিলো না যার কারণে এতো লোভি হয়ে এই কাজটা করবি। কেন সকলের সামনে আমার মাথা হেট করে দিলি? তোর মতো সন্তান বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো।

কথাটা বলতে বলতে সোহার বাবা হাতের চাপ বাড়িয়ে দেয়। সোহা ছটফট করতে থাকে বাবার হাত থেকে বাঁচার জন্য। জাভিয়ান আর মি. তালুকদার সোহার বাবার কাছাকাছি থাকায় তারা দৌড়ে এসে তাকে ঝাপটে ধরে সরানোর চেষ্টা করে। বয়স্ক ভদ্রলোকটা গায়ে এতো শক্তি কোথা থেকে আসলো বুঝা গেলো না যখন সবাই দেখলো জাভিয়ান আর মি.তালুকদার মিলেও তাকে সোহার থেকে দূরে সরাতে পারছে না। আবারও তাড়াতাড়ি করে এসে তাঁকে সোহার থেকে সরানোর চেষ্টা করে।তিনজনে অনেক কষ্টে তাকে সরাতে সক্ষম হয়। সোহার চোখ প্রায়ই উল্টে গিয়েছিলো।

স্পর্শ তাঁকে ধরে এনে সোফা টায় বসিয়ে দেয়। একজন এসে এক গ্লাস পানি দিয়ে যায়। সোহা সেটা খেয়ে থম মেরে বসে থাকে। কথা বলার মতো কোন মুখ নেই তার আজ। জাভিয়ান এই ঝামেলা তাড়াতাড়ি শেষ করে প্রেয়সীকে নিয়ে মায়ের কাছে যাবে।আজ নিশ্চিত মা তার বউকে মেনে নিতে দু’বার ভাববে না। সে পুলিশকে বলে–

–ইন্সপেক্টর আমি সোহা আর জয়ের বিরুদ্ধে মামলা করতে চাই। আশা করি কি কি করতে হবে আপনার জানা আছে।

ইন্সপেক্টর মাথা নাড়ায়। তারপর জয়,, তার সাঙ্গপাঙ্গ আর সোহাকে নিয়ে যায় থানায়। সোহার বাবা জাভিয়ান আর মি.তালুকদারের কাছে এসে হাত জোড় করে বলে–

–আমার মেয়ের করা কৃতকর্মের জন্য আমি মাফ চাইছি। আসলে জাভিয়ান ঠিকই বলেছে,,আমার জন্য আজ ওর এই পরিণতি। একটা মাত্র সন্তান তাকে সবটা দিয়ে আগলে রেখেছিলাম। আমার সেই ভালোবাসার প্রতিদান আজ এভাবে পেলাম। আমি তোমাকে বলবো না সোহাকে জেলে দিও না। ওর শাস্তি প্রয়োজন।

মি.তালুকদার সোহার বাবার হাতটা নামিয়ে দেন। সেও কন্যা সন্তানের বাবা। কন্যা সন্তান যে একজন পুরুষের কতটা ভালোবাসার সন্তান যে হয়েছে সে জানে। সোহার বাবা বলার মতো আর কোম করা খুঁজে পায় না। সে মাথা নিচু করে সেন্টার থেকে বের হয়ে যায়।

সকলে এখনো একটা ঘোরের মধ্যে আছে। এইটুকু একটা মেয়ে কত জঘন্য একটা প্ল্যান করেছিলো ভাবতেই সবাই শিউরে উঠছে। জাভিয়ান বাকি সকলের দিকে তাকিয়ে বলে–

–আজ তালুকদার বাড়ির কন্যা মির্জা বাড়ি যাবে আর মির্জা বাড়ির কন্যা পুনরায় তালুকদার বাড়ি ফিরবে এবং তাও সসম্মানে।

আবরার জাভিয়ানের কথায় অসম্মতি জানিয়ে বলে–

–হানিয়া কি চায় সেটা আশা করি আপনি জানেন মি. তালুকদার। আর আপনিই তো সেদিন বললেন এই বিয়ের দিনই আপনাদের ডিভোর্স হবে। এছাড়া আমি সন্ধ্যায় সেন্টারের পেছনের গার্ডেনে দেখলাম আপনি হানিয়াকে একটা পেপারে সাইন করাচ্ছিলেন। নিশ্চয়ই ডিভোর্সের পেপার ছিলো সেটা।

জাভিয়ান আবরারের কথা শুনে হেঁসে দেয়। শকুনের চোখ তার শালার। বোনের আশেপাশে একটু ভিড়লেই সেটা সাথে সাথে তার নজরে পরে যায়। জাভিয়ান তার শেরওয়ানির পকেট থেকে পেপারটা বের করে আবরারের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ব’লে —

–নিজের দেখে নিন।

আবরার পেপারটা হাতে নিয়ে সেটা খুলে দেখতে থাকে। পেপারটায় নজর লুকিয়ে তার যেন হুশ উড়ে যায়। সে অবাক হয়ে জাভিয়ানের দিকে তাকায়। স্পর্শ আবরারের হাত থেকে পেপারটা নিয়ে নিজেও পড়ে। মি.তালুকদার এসে স্পর্শকে জিজ্ঞেস করে–

–কি লেখা আছে এটায় স্পর্শ?

স্পর্শ বলে–

–এটায় লেখা আছে হানিয়া জীবদ্দশায় কোনদিন জাভিয়ানকে ডিভোর্স দিতে পারবে না এমনকি জাভিয়ানও না। যদি জাভিয়ান ডিভোর্স দেয় হানিয়াকে তাহলে সে তার সম্পত্তির ৭০% হানিয়াকে দিতে বাধ্য থাকবে।আর হানিয়া যদি দেয় তাহলে সে জাভিয়ানের সম্পত্তির সমপরিমাণ টাকা জাভিয়ানকে দিতে বাধ্য থাকবে।এই সম্মতিতে তারা দু’জনই এই পেপারে সাইন করেছে।

এমন জটিল শর্তের কথা শুনে সবার মাথায় যেন প্যাচ লেগে যায়। জাভিয়ান আবরারের কাছে এসে ধরা গলায় বলে–

–একটা সুযোগ দিয়ে দেখেন ভাইয়া। এবার যদি কথার খেলাফ হয়,,যদি হানিয়ার চোখ দিয়ে সুখের অশ্রু ব্যতীত দুঃখের অশ্রু গড়ায় তাহলে আমি নিজে ওকে আপনার হাতে তুলে দিবো। সব অপরাধীকেই তো আরেকটা করে চান্স দেওয়া হয় ভালো হওয়ার জন্য। আমাকে এই লাস্ট বার দেন।

জাভিয়ানের চোখে অশ্রুদের মেলা বসেছে। আবরার নিজে একজন প্রেমিক পুরুষ হয়ে আরেকজন প্রেমিক পুরুষের চোখের চাহনি খুব সহজেই বুঝে যায়। সে জাভিয়ানকে বলে–

–এটাই শেষ সুযোগ দিলাম। কিন্তু আমি হানিয়ার উপর আমার মতামত চাপিয়ে দিতে চাই না। আমি চাই তুমি নিজে তাকে তার থেকে হাসিল করে নাও।

জাভিয়ানের মুখের একটা হাসি ফুটে। হানিয়াকে হানিয়ার থেকে কিভাবে হাসিল করতে হয় সেটা জাভিয়ান খুব ভালো করেই জানে। কিন্তু ভাগ্য যে তার জন্য অন্য কিছু নির্ধারণ করে রেখেছে। স্পর্শ জাভিয়ানের পায়ের কাছ থেকে একটা চিঠির মতো কাগজ উঠিয়ে নিজের হাতে নেয়। কাগজটার উপর জাভিয়ানের নাম দেখে সে জাভিয়ানকে বলে–

–ভাই এটা তোর?

জাভিয়ান বোনের দিকে তাকিয়ে দেখে সেই যে হানিয়া আহনাফের মাধ্যমে একটা চিঠি পাঠিয়েছিলো সেটা। জাভিয়ান চিঠিটা হাতে নিয়ে বলে–

–হ্যাঁ আমার। আর এটা হানিয়া পাঠিয়েছিলো আহনাফের হাত দিয়ে।

–একি জায়গায় থেকে আবার অন্যদের মাধ্যমে চিঠি। কি লিখেছে এটায় হানিয়া?

স্পর্শ প্রশ্ন করে ভাইকে। জাভিয়ান বলে–

–জানিনা দেখছি দাঁড়া।

কথাটা বলে জাভিয়ান চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করে। চিঠিটা পড়ার মিনিট দুয়েক পর জাভিয়ান ধপ করে নিচে বসে পরে। সবাই হকচকিয়ে যায়। স্পর্শ ভাইয়ের পাশে বসে বলে–

–কি হয়েছে ভাই? চিঠিতে কি লেখা ছিলো?

জাভিয়ান স্তব্ধ হয়ে চিঠিটা স্পর্শের দিকে বাড়িয়ে দেয়। স্পর্শ লেখতে পায়,,গুটিগুটি অক্ষরের হানিয়া লিখেছে–

আমার প্রথম প্রণয় পুরুষ,,

অবাক হচ্ছেন হঠাৎ করে আমার কাছ থেকে চিঠি পেয়ে তাইনা? আসলে এই চিঠির কথা গুলো সামনাসামনি বলার মতে না। আপনি যখন এই চিঠিটা পড়বেন তখন আমি এই শহর ছেড়ে অজানার পথে রওনা হয়ে গিয়েছি। আপনাকে এবং আমার আশেপাশের সকলকে মুক্তি দিয়ে আমি চলে যাচ্ছি দূর অজানায়। আপনাকে মুক্তি দেওয়া যতটা না কঠিন ছিলো তার চেয়েও হাজার গুন বেশি কঠিন হবে আপনাকে অন্য কারোর হতে দেখে। আমি বরাবরই দুর্বল চিত্তের অধিকারী। আমার এতো সাহস নেই আপনাকে অন্যের নামে কবুল বলতে দেখবো। তাি চলে যাচ্ছি আমি আপনাদের সকলের থেকে বহুদূরে। আমায় যদি কোনদিন এক মুহূর্তের জন্যেও ভালোবেসে থাকেন তাহলে খোঁজার চেষ্টা করবেন না।

ভালে থাকবেন আমার ভালোবাসা অন্য কারো ভালোবাসা হয়ে। আপনার সংসার আমার কল্পনার চেয়েও বেশি সুন্দর ও সুখের হোক। আমি আজীবন এই দোয়াই করে যাবো।

ইতি
আপনার অপ্রিয় বধূয়া

শব্দসংখ্যা~৩৯০০।
সমাপ্ত/চলবে??