প্রতিশোধের অঙ্গীকার পর্ব-০৫

0
566

#প্রতিশোধের_অঙ্গীকার
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_পঞ্চম

জাভিয়ান যখন বাসায় পৌঁছালো ঘড়ির কাটায় তখন রাত বারোটা বাজে। এক দুই ফোটা করতে করতে এখন তুমুল বেগে বৃষ্টি হচ্ছে। হানিয়া তখনও জেগে তার জন্য অপেক্ষা করছে। নিচ থেকে যখন গাড়ির হর্নের আওয়াজ আসলো তখন সে দৌড়ে বেলকনিতে যায়। গিয়ে দেখতে পায় জাভিয়ান টলমল পায়ে ভেতরে ঢুকছে। ড্রিকস করে এসেছে যে এই বিষয়ে সে নিশ্চিত। একমনে ভাবে নিচে গিয়ে জাভিয়ানকে নিয়ে আসবে কিন্তু পরক্ষণেই মনে পরে জাভিয়ান তাকে বলেছিলো তার কোন বিষয়ে নাক না গলাতে। তাই সে আর যায় না।

জাভিয়ানের কাছে ডুপ্লিকেট চাবি থাকায় ওটা দিয়ে দরজা খুলে বাসার ভেতরে প্রবেশ করে। তারপর সিড়ি বেয়ে নিজের রুমে ঢুকে। ঘরটা হালকা অন্ধকার। হানিয়া পাওয়ার লাইট অফ করে ড্রিম লাইট জ্বালিয়ে রেখেছে। জাভিয়ানের অবচেতন মন হানিয়াকে খোঁজে। পুরো ঘরে চোখ বুলিয়ে যখন হানিয়াকে পায় না তখন সে বেলকনির দিকে এগিয়ে যায়। হুম,,পেয়েছে সে হানিয়াকে। কিন্তু এই মেয়ে এতো বৃষ্টির মধ্যে বেলকনিতে কি করছে?? কথাটা ভেবে জাভিয়ানের ভ্রুজোড়া কুঁচকে যায়। কিন্তু এই প্রশ্নটা সে মুখে করে না। মনের কথা মনেই চেপে পুনরায় পা চালিয়ে বেডের কাছে চলে যায়। তারপর বাহিরের কাপড় না খুলেই ধপ করে শুয়ে পরে।

হানিয়া ঘরে ফিরে আরো মিনিট দশেক পর। বৃষ্টির বেগ আগের থেকে আরো বেড়েছে তাই চলে এসেছে। এসেই জাভিয়ানকে এলোমেলো ভাবে শোয়া অবস্থায় দেখতে পায়। বেলকনির দরজায় হেলান দিয়ে বুকে দু’হাতে ভাজ করে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে তার অতি সুদর্শন নিষ্ঠুর বরকে,,যে কিনা হানিয়ার ঘুম হারাম করে নিজে দিব্যি নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। জাভিয়ান উপুড় হয়ে শুয়ে আছে।জাভিয়ানের মুখটা তার দিকেই কাত করে রাখা তাই সে সহজেই তার মুখোশ্রী দেখতে পারছে।

হানিয়ার মন ভরে দেখা হয়ে গেলে সে জাভিয়ানের কাছে আসে। বেডে তার মাথার কাছে বসে। পুরো মুখটায় হাত বুলিয়ে আদর করে। বিয়ের পর আজ প্রথম সে জাভিয়ানের এতো কাছে। বিশ্বাস হয়? না হলেও কিছু করার নেই,,কারণ তার আর জাভিয়ানের সম্পর্কটা তো আর দশটা স্বাভাবিক সম্পর্কের মতো না। হাত বুলিয়ে কিছুক্ষণ আদর করে তারপর নিজের মুখটা আস্তে ধীরে এগিয়ে নিয়ে আসে জাভিয়ানের মুখের কাছে। খুবই সাবধানের সহিত প্রথম ভালোবাসার পরশ দেয় তার অর্ধাঙ্গকে। পরশটা ছিলো খুবই নির্মল,,পবিত্র। বেশ কিছুক্ষণ নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে রাখে সে জাভিয়ানের কপালে। তারপর জাভিয়ানের কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বলে–

–ওহে নিষ্ঠুর অর্ধাঙ্গ আমার,,আমি কেন এতো বেহায়া,,বলতে পারেন? বিয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত মা//র ছাড়া কিছুই জোটেনি আমার কপালে তাহলে আমার মনে কেন আপনার জন্য ভালোবাসার বীজ বপন হলো?? দিন যত যাচ্ছে এই বীজ ততই নিজ মহিমায় একটু একটু করে বাড়ছে। কেন হচ্ছে এমন? আপনি কি আমার এই ভালোবাসা ডিজার্ভ করেন??

নাহ অপর পক্ষ থেকে কোন জবাব আসে না। হানিয়া জানে নিজের প্রশ্নগুলোর জবাব পাবে না তাও সে এই বোকামি করছে। করতে ভালো লাগছে তার। কারণ সে তো আর জাভিয়ান জাগ্রত অবস্থায় তাকে এই প্রশ্নগুলো করতে পারবে না,,তাই তার ঘুমন্ত অবস্থায় একটু না হয় করলো বোকামি। হানিয়া তার ঠোঁট জাভিয়ানের কানে ছুঁইয়ে সরল আসে। জাভিয়ান তখনো গভীর ঘুমে। হানিয়া উঠে জাভিয়ানকে ভালো করে শুইয়ে দিয়ে তার জুতা আর শার্ট খুলে দেয়। তোয়ালে ভিজিয়ে এনে মুখ,,হাত-পা ভালো করে মুছিয়ে দিয়ে পায়ের কাছে রাখা চাদর দিয়ে ঢেকে দেয় তার শরীর। তারপর জাভিয়ানের বেডের থেকে একটু দূরে বিছানা করে শুইয়ে পরে। মনে মনে দোয়া করে একদিন যাতে জাভিয়ান নিজ থেকে তাকে তার বুকে নিয়ে ঘুমায় এবং এই দিনটা যেনো তাড়াতাড়িই আসে। এই সব কিছু ভাবতে ভাবতেই সে ঘুমিয়ে পরে।

রাত যখন সাড়ে তিনটা তখন হালকা গোঙানির আওয়াজে হানিয়ার ঘুম ভেঙে যায়। প্রথমে সে কিছু বুঝতে পারে না,,কে এতো রাতে গোঙাচ্ছে। ঘুমটা হালকা ছাড়লে সে বুঝতে পারে জাভিয়ান গোঙাচ্ছে। সে ধরফরিয়ে উঠে শোয়া থেকে। জাভিয়ানের কাছে গিয়ে তার পাশে বসে ডাকতে থাকে–

–এই শুনছেন?? কি হয়েছে আপনার?? গোঙাচ্ছেন কেনো? এই শুনুন না…..

কথাটা বলতে বলতে সে জাভিয়ানের গায়ে হাত দিলে দেখে গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। হানিয়া জাভিয়ানের কপাল-গাল চেক করে দেখে হ্যা জাভিয়ানের প্রচন্ড জ্বর এসেছে। সে তড়িঘড়ি করে উঠে দাড়ায়,, কাবার্ড থেকে একটা টি-শার্ট এনে পড়িয়ে দেয়। তারপর ওয়াশরুমে গিয়ে মগে করে পানি আর একটা রুমাল এনে তার মাথায় পট্টি দিতে থাকে। জাভিয়ানের চুলগুলোতে হাত রাখলে বুঝতে পারে মাথায় বৃষ্টির পানি পরেছে যার কারণে জ্বর এসেছে। অসময়ের বৃষ্টি,, জ্বর তো আসবেই। হানিয়া প্রথমে বিচলিত হলে এখন এতোটা অস্থির না সে। অসুখ-বিসুখ বা খারাপ সময়ে বিচলিত হলেই অবস্থা আরো খারাপের দিকে চলে যায়। তাই সে মাথা ঠান্ডা করে জাভিয়ানের মাথায় ঠান্ডা পানির পট্টি দিতে থাকে। অনেকক্ষণ লাগিয়ে পট্টি দিয়েও যখন কাজ হয় না তখন সে পুনরায় ওয়াশরুমে গিয়ে তোয়ালে ভিজিয়ে এনে জাভিয়ানের শরীর মুছিয়ে দিতে থাকে। জাভিয়ানের সাথে এতো তোর ঝোপ করায় তার ঘুমটা হালকা হয়ে যায়। সে জ্বরের ঘোরেই বলে–

–মেয়ে তুমি এম..ন কেন? এতো মা//রি,,তু..চ্ছ অবহেলা করি তাও আমার সেবা করছো?

হানিয়া জাভিয়ানের মুখের কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এসে বলে–

–কাছের মানুষ,,, মনের মানুষগুলোর জন্য আমি হানিয়া চরম পর্যায়ে বেহায়া হতে পারি। একটু না হয় হলাম বেহায়া আপনার জন্য,, বিনিময়ে আপনাকে পেলাম,,আপনার মন পেলাম।

জাভিয়ান অনেকটা জ্বরের ঘোরে থাকায় হানিয়ার কথা শুনতে পেলো কি মা বুঝা গেলো না। সে পুনরায় ঘুমিয়ে পরে। হানিয়া বাকি রাতটুকু তার সেবা করতে করতেই কাটিয়ে দেয়। হানিয়া চাইলেই তাকে জ্বরের ঔষধ দিতে পারতো,,কিন্তু তাকে একবার ডাক্তার বলেছিলো জ্বর হওয়ার তিনদিন পর্যন্ত কোন প্রকার ঔষধ না নিতে। লাগলে একটু পরপর শরীর,, হাত-পা মুছিয়ে দিতে তাও যেন ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া রোগীকে ঔষধ না দেওয়া হয়। সে কথা মাথায় রেখেই হানিয়া জাভিয়ানের মাথায় পট্টি দিতে থাকে আর হাত-পা ভেজা তোয়ালে দিয়ে মুছে দিতে থাকে।

__________________________

সকাল ১০ টা~~

হালকা রোদের তাপে জাভিয়ানের ঘুমটা ছুটে যায়। বেলকনির দরজা খোলা থাকায় সেখান থেকেই সূর্যের কিরণ এসে জাভিয়ানের মুখে পরছে। একটু মোচড়ামুচড়ি করে জাভিয়ান নিজের ঘুমটা তাড়ায়। তারপর ফ্রেশ হওয়ার উদ্দেশ্য উঠে দাঁড়ায়,,কিন্তু মাথাটা হঠাৎই ঘুরে যায়। সে তাল সামলাতে না পেরে পরে যেতে নিলে কোথা থেকে হানিয়া এসে তাকে দু’হাত দিয়ে আগলে নেয়।

–আরে আরে কি করছেন?? দূর্বল লাগছিলো তো আমাকে ডাক দিলেন না কেন? আজব তো! চলেন আমি দিয়ে আসছি ওয়াশরুম পর্যন্ত।

জাভিয়ান চোখ বড়বড় করে হানিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা তাকে ধমক দিয়ে কথা বলছে কন্ঠে আবার প্রখর অধিকার। হানিয়া নিজেই আবার বলে–

–বেশি খারাপ লাগছে? তাহলে আপনি এখানে বসুন আমি পানি আর প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে আসছি। ঘরে বসেই মুখটা ধুয়ে নিয়েন।

জাভিয়ান গম্ভীর গলায় বলে–

–কেন? আমার কি বড় কোন এক্সিডেন্ট হয়েছে যে আমি ঘরে বসে মুখ ধুবো?

বিরক্তিতে হানিয়ার মাথার তালু গরম হয়ে যায়।এজন্যই বলে যেচে কারো ভালো করতে নেই।। সে খেক করে বলে–

— না আপনার আবার কি হবে? ফ্রেশ হয়ে খেয়ে আমাকে এক দফা পিটিয়ে নিয়েন তাহলেই হলো। পুরোনো জাভিয়ান তালুকদার ইজ ব্যাক।

জাভিয়ান একটু বেশিই অবাক হচ্ছে আজ। মেয়েটা এতো কথা বলছে কীভাবে? আগে তো তাকে দেখলেই কেমন ভয়ে কুঁকড়ে থাকতো আর আজ কিনা নিজ থেকেই তাকে কতো গুলো কথা শুনাচ্ছে। তার ভাবনার মাঝেই হানিয়া তাকে ধরে ধরে ওয়াশরুমে নিয়ে যায়। তাকে ওয়াশরুমে ঢুকিয়ে দিয়ে বলে–

–আপনি কি নিচে যেয়ে ব্রেকফাস্ট করতে পারবেন নাকি উপরে নিয়ে আসবো?

–নাহ নিচে গিয়েই করবো।

–আচ্ছা।

কথাটা বলেই হানিয়া নিচে চলে যায়। জাভিয়ান আস্তে ধীরে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে আসে। কাল রাতের খাবার খায়নি সে,,তার উপর আবার জ্বর। ভীষণ দূর্বল লাগছে। শুধু শুধু ভাব দেখিয়ে বলেছিলো নিচে যাবে এখন মনে হচ্ছে বসা থেকে দাড়ালেই পুরো দুনিয়া ঘুরছে। তাও সে টুকটুক করে নামে নিচে। সিঁড়ির মাঝামাঝিতে আসার পর নিচ থেকে হানিয়ার কান্নার আওয়াজ পায়। কেন যেনো তার বুকে একটা চাপ খায়। একটু আগেও কত প্রফুল্লভাবে তার সাথে কথা বলছিলো,,ভালোই লাগছিলো তার। এইটুকু সময়ের মধ্যে আবার কি হলো যে হানিয়া এমন আওয়াজ করে কাদছে? জাভিয়ান জানে হানিয়া বেশি ব্যথা বা কষ্ট না পেলে আওয়াজ করে কাঁদে না,,নিঃশব্দে কাঁদে। তাহলে কি তার মম বা সোহা তাকে এমন কিছু করেছে বা বলেছে যার কারণে সে এমন আওয়াজ করে কাঁদছে??

সে আর কিছু না ভেবে দ্রুত পা চালিয়ে নিচে নামে। নিচে নেমে তার মাথা যেনো আরো ঘুড়ে যায়। সেই সাথে প্রচন্ড গরমও হয়। রাগে যেনো তার মাথা
ফে//টে যাবে যেকোন সময়। তারই চোখের সামনে একজন অচেনা পুরুষ তারই বাসায় এসে তারই বিয়ে করা বউকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এটা কি কোন পুরুষের পক্ষে সহ্য করার মতো বিষয়?? সে গটগট পায়ে তাদের কাছে এগিয়ে এসে হানিয়াকে টান দিয়ে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে এক হাত দিয়ে আরেক হাত দিয়ে হানিয়াকে জড়িয়ে ধরা যুবকটির শার্টের কলার চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলে–

–আপনার সাহসের তারিফ না করে পারছি না মি.। আমারই বাসায় এসে আমারই বউকে জড়িয়ে ধরে আছেন। বুকের পাটা তো আপনার বিশাল।

জাভিয়ানের এই কাজটা এতোটাই তাড়াতাড়ি হয়েছে সবটা সকলের মাথার উপর দিয়ে যায়। হানিয়া চোখজোড়া রসগোল্লার মতে বড়বড় করে তাকিয়ে জাভিয়ানকে দেখছে। উপস্থিত বাকি সবাই তাই।

~চলবে..?