প্রতিশোধের অঙ্গীকার পর্ব-০৭

0
528

#প্রতিশোধের_অঙ্গীকার
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_সপ্তম

কেটে যায় আরো এক মাস। এই দিনগুলোতে জাভিয়ান হানিয়াকে আগের মতো না মা/রলেও খুব একটা ভালো ব্যবহার যে করেছে তাও না। হানিয়াকে না মা/রার কারণ হলো জাভিয়ানের বাবা বিদেশ থেকে ফিরে এসেছে,,আর সে বাবার সামনে হানিয়াকে মা/রতে পারে না। একদিন হানিয়াকে ছোট একটা ভুলের কারণে জাভিয়ান ওকে বকছিলো তখন তার বাবা আরসাল তালুকদার দেখে ফেলে তাকে সে কি বকা দেয়। সেই সাথে বাড়ির সবাইকে বলে হানিয়ার সাথে যাতে কেউ খারাপ ব্যবহার না করে,,মা/রা তো দূরের কথা। হানিয়ার কোন ভুল হলে তাকে যেনো সে ভুলটা শুধরানোর সুযোগ করে দেয় আর কেউ যদি পরবর্তীতে তার সাথে খারাপ ব্যবহার করেন তাহলে তাকে দেখে নিবেন সে। এই কারণেই জাভিয়ান আর তার মা যতক্ষণ আরসাল তালুকদার বাড়িতে থাকে ততক্ষণ বেশি একটা কিছু করতে পারে না হানিয়াকে। কিন্তু যখন সে থাকে না তখন তো…….

সোহা চলে গেছে নিজের বাড়ি। মন চাইলেই সে এসে বেড়িয়ে যায় আবার মন চাইলেই চলে যায়।
একদিন রাতে জাভিয়ান আর হানিয়া ঘুমিয়ে ছিলো। রাত তখন তিনটা। জাভিয়ানের ফোনটা সশব্দে বাজতে শুরু করে। জাভিয়ান ঘুমের ঘোরে ফোনটা তুলে কানে তুলে। হানিয়ার ঘুমটাও ভেঙে গেছে ততক্ষণে। জাভিয়ান ফোন কানে লাগানোর মিনিট দুয়েক পর অপর প্রান্ত থেকে এমন কিছু শুনতে পায় যার কারণে সে লাফ দিয়ে শোয়া থেকে উঠে পরে। সেই সাথে ভীষণ ঘামতেও শুরু করে। হানিয়া তাকে এমন অস্থির হতে দেখে জাভিয়ানের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে–

–অ্যাঁই কি হয়েছে? এমন অস্থির হয়ে গেলেন কেন?

জাভিয়ান হানিয়ার কথার জবাব দেয় না। সে ফোনটা কানে লাগিয়েই বলে–

–আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি।

জাভিয়ানের এহেন কথা শুনে হানিয়া চমকে যায়। কোথায় যাবে সে এতো রাতে? জাভিয়ান কল কেটে বেড থেকে উঠে দাঁড়ায়। হানিয়া তাকে জিজ্ঞেস করছে সে এতো রাতে কই যাবে কিন্তু জাভিয়ান তাকে কোন উত্তরই দেয় না। সে নিজের মতো ওয়াশরুমে গিয়ে মুখে পানি দিয়ে এসে গাড়ির চাবি নিয়ে চলে যায় বাহিরে। হানিয়া এতো বার জিজ্ঞেস করলো কিন্তু সে একটা টু শব্দও নিজের মুখ থেকে বের করেনি।

হানিয়া বেলকনিতে দাড়িয়ে দাড়িয়ে তার যাওয়া দেখলো। একটা কথাই ভাবছে,,কই গেলো এতো রাতে মানুষটা এমন করে? আর ফোনই বা করেছিলো কে?

_____________________________

রাত পেরিয়ে সকাল হয় কিন্তু জাভিয়ানের কোন খোজ নেই। বাসার সবাই তাকে নিয়ে চিন্তায় পাগল হয়ে যাচ্ছে। হানিয়ার শ্বাশুড়ি তো তাকে বকা দিতে দিতে বলে–

–কেমন বউ তুমি? স্বামী রাত-বিরেতে বাইরে চলো যাচ্ছে,, কই যাচ্ছে তা তুমি জানো না। তাকে আটকাতেও পারো না। এমন বউ থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। আপনাকে(আরসাল তালুকদারের দিকে তাকিয়ে বলে) বারবার বলেছিলাম এই মেয়ে আমাদের পরিবারের যোগ্য না,,তাও আপনি আমার একটা কথাও শুনলেন না। একেই আমার জাভিয়ানের বউ করে আনলেন,,এখন দেখলেন তো ও কেমন জাভিয়ানের প্রতি উদাসীন।

শায়লা তালুকদার জানেন তার ছেলে কেমন। হানিয়া যদি তাকে কিছু জিজ্ঞেস করে তার উত্তর যে জাভিয়ান দেবে না সেটাও ভালো করেই জানেন কিন্তু তাও সে এতো গুলো কথা হানিয়াকে শুনিয়ে দিলেন। হানিয়া,,রোজি বেগম আর আরসাল তালুকদার এতক্ষণ শুধু তার বকবকানি শুনছিলো,,কিন্তু এই পর্যায়ে আরসাল তালুকদার মুখ না খুলে আর পারলেন না। সে হালকা রাগ আর ভীষণ বিরক্তি নিয়ে বলেন–

–আহ্,,কি শুরু করলে শায়লা। ওর দোষটা কই এখানে একটু বলবে? তুমি চিনো না তোমার ছেলেকে? তোমার কি মনে হয় তোমার ছেলে কারো ধার ধারে? আমি তোমাকে নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি হানিয়া তোমার ছেলেকে এতো রাতে বাহিরে যেতে নিষেধ করেছিলো কিন্তু তোমার ছেলেই শুনে নি। আর বললে না হানিয়া এই তালুকদার পরিবারের যোগ্য না,,একদিন এই তুমিই বলবে হানিয়ার চেয়ে যোগ্য মেয়ে আর কেউ না।

রোজি বেগম ভীষণ খুশি হন ভাইয়ের কথা শুনে। শায়লা বেগম পয়েন্ট মতো কথা না খুজে পেয়ে মিথ্যামিথ্যি রাগ দেখিয়ে নিজের ঘরে চলে যায়। আরসাল তালুকদার হানিয়ার সামনে এসে তার মাথায় হাত রেখে বলেন–

— তোমার শাশুড়ী মায়ের কথায় কিছু মনে করো না মা। এতোদিন ধরে দেখছ,, বুঝতেই পারছ উনি বুঝে কম চিল্লায় বেশি।

কথাটা বেশ মজার স্বরেই বলেম যার দরুন হানিয়া আর রোজি বেগম হেসে দেয়। আরসাল সাহেব নিজেও হেসে দেয়। সে বলে–

–এখন ব্রেকফাস্টটা করে নাও।আমাদের সবাইকে তো ধরে বেধে করালে নিজে তো করলে না। এখন যাও নিজেও করে নাও। জাভিয়ানকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। সে তাড়াতাড়িই চলে আসবে।

হানিয়া মিনমিনিয়ে বলে–

–বাবা আমি উনি আসলে করি? প্লিজ। আমার গলা দিয়ে খাবার নামবে না।

আরসাল তালুকদার হানিয়ার চিন্তার বিষয়টা বুঝতে পারে। তাই সে আর বেশি ঘাটায় না বিষয়টা। নিজের রুমে চলে যায়।

_______________________

জাভিয়ান ফিরতে ফিরতে সময়ের কাটা যেয়ে পৌঁছায় বিকেল তিনটায়। জাভিয়ানকে বেশ উসকোখুসকো লাগছে। হানিয়া তাড়াতাড়ি করে তার জামাকাপড় বের করে দিলে সে তা নিয়ে ফ্রেশ হতে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে আসলে হানিয়া তার জন্য খাবার নিয়ে আসে। জাভিয়ানকে খাবারের প্লেটটা দিতে গিয়ে দেখে তার হাতে বড়সড় একটা বেন্ডেজ। হানিয়া অস্থির হয়ে বলে–

–একি আপনার হাত কাটলো কিভাবে?

–বেখেয়ালি থাকায় কেটে গিয়েছে। তুমি দাও প্লেটটা আমার কাছে।

–একটু খেয়াল করে কাজ করবেন না। আর এখন খাবেনই বা কিভাবে?

জাভিয়ান বেশ ক্লান্ত থাকায় বেশি কথা বাড়াতে চায় না। সে বলে–

–তাহলে তুমিই খাইয়ে দাও।

–আমি..?

–হ্যাঁ তুমি। খাইয়ে দিলে তাড়াতাড়ি দাও নাহলে মাম্মামকে ডাকো।

–মনি তো ঘুমাচ্ছে।

–তাহলে তুমিই দাও। নাহলে চামচ আনো। বেশি কথা বলতে ইচ্ছে করছে না,,মাথা ধরেছে।

হানিয়া প্লেটের দিকে তাকিয়ে দেখে আজ রান্নায় মাছ হয়েছে। এখন যদি সে সে চামচ এনে দেয় তাহলে চামচ দিয়ে জাভিয়ান মাছ কিভাবে খাবে? তাই সে সিদ্ধান্ত নেয় সেই খাইয়ে দিবে। সে জাভিয়ানের সামনে প্লেটটা রেখে ওয়াশরুমে গিয়ে হাতটা ধুয়ে আসে। তারপর ভাত মাখিয়ে লোকমা ধরে জাভিয়ানের সামনে।

জাভিয়ান ভেবেছিলো হানিয়া তাকে খাইয়ে দিবে না। কিন্তু হানিয়া যখন ভাতের লোকমা তার মুখের সামনে ধরলো না চাইতেও তার মনটা কেন জানি খুশিতে ভরে উঠে। হানিয়া বলে–

–ভাতটা মুখে নিন। আর বিসমিল্লাহ বলবেন কিন্তু শুরুতে।

জাভিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলে–

–তোমার কি আমাকে বাচ্চা মনে হয় যে এই সামান্য কথাটাও আমি জানবো না?

কথাটা বলে জাভিয়ান বিসমিল্লাহ বলে লোকমাটা মুখে নেয়। হানিয়া তাকে একটা ভেঙচি দিয়ে আবার লোকমা ধরে। দূর্ভাগ্যবসত তার এই ভেঙচি দেওয়াটা জাভিয়ান দেখে ফেলে। দ্বিতীয় লোকমটা যখন মুখে নেয় তখন সে হানিয়ার হাতে বেয় জোরে একটা কামড় দেয়। হানিয়া ব্যথায় বলে–

–আহ্। কামড় দিচ্ছেন কেন?

–ভেঙচি কাটলে কেন? তোমার ভাগ্য ভালো হাতে কামড় দিয়েছি ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছে তাই,, নাহলে যেটা দিয়ে ভেঙচি কাটলে ওটাতেই কামড়টা পরত।

হানিয়া ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। কথাটা সে কানে শুনলেও মস্তিষ্ক বিষয়টা সাথে সাথে বুঝতে পারে না। কয়েক সেকেন্ড পরে সে বিষয়টা বুঝতে পারে। আর সেই সাথে তার মধ্যে এক আলাদা শিহরণ বয়ে যায়। ভাতের প্লেট ধরে রাখা হাতটা হালকা কেঁপে উঠে। জাভিয়ান তাকে এমন স্তব্ধ হয়ে থাকে দেখে বলে–

–কি হলো? তাড়াতাড়ি দাও,,আমি খেয়ে ঘুমাবো। বিকেলে একবার অফিসে যাবো।

হানিয়া এবার কাঁপা কাঁপা হাতে খাইয়ে দিতে থাকে। খাওয়া শেষ হয়ে গেলে হানিয়া তার মুখ ধুয়ে দেয়। এটো প্লেট নিয়ে ঘর থেকে বের হবে এমন সময় জাভিয়ান তাকে পেছন থেকে ডাক দেয়।

–হানি…..

এই প্রথম জাভিয়ান একটু সুন্দর করে তাকে ডাকল।কিন্তু “হানি”? হানিয়া ভ্রু কুঁচকে তার দিকে ফিরে বলে–

–হানি কে? হানিয়া আমার নাম,,ডাকলে পুরোটা ধরে ডাকবেন।

জাভিয়ান তার এমন রেগে যাওয়া দেখে অবাক হয়ে যায়। সেই সাথে মজাও পায়। সে বুঝতে পারে হানিয়া তার নামের শর্টফর্মটা পছন্দ করছে না। সে হানিয়াকে রাগাতে বলে–

–হানি তুমিই। আর আমি তোমাকে হানি বলেই ডাকব। যাই হোক,,যার জন্য ডেকেছিলাম সেটা শুনো।

হানিয়া দাত কিড়মিড়িয়ে বলে–

–বলেন পতিদেব! আর কি সেবা করতে পারি আপনার?

–বিয়ের পর তো একবারও নিজের বাবার বাড়ি যাও নি। তা যেতে চাও ও-বাড়িতে?

বিয়ের পর বাবার বাড়ি যেতে চায় না এমন মেয়ে খুজে পাওয়া মনে হয় কঠিন। হানিয়াও তাদের মধ্যে একজন। সে খুশি হয়ে বলে–

–হ্যাঁ যেতে চাই তো। আপনি নিয়ে যাবেন আমাকে?

–আমি যেতে পারব না কিন্তু তোমাকে যাওয়ার পারমিশন দিচ্ছি। চাইলে কিছুদিন থাকতে পারো।

জাভিয়ানের এই কথাটা শুনে হানিয়ার সব খুশি কর্পূর ন্যায় উড়ে যায়। সে মুখটা কালো করে বলে–

–আচ্ছা থাক আমারও তাহলে যাওয়া লাগবে না।

কথাটা বলে সে চলে যাচ্ছিল জাভিয়ান তাড়াতাড়ি করে তার কাছে এসে তার হাত টেনে ধরে তাকে নিজের দিকে ঘুরায়। তারপর বলে–

–যাবে না কেন? যেতে হবে তোমাকে।

–কেন যাবো? বিয়ের পর প্রথম বার বাবার বাড়ি যাবো তাও বরকে ছাড়া। হাহ্,,এর চেয়ে ভালো না যাওয়া।

জাভিয়ান ভেবে দেখে কথাটা ঠিকই বলেছে হানিয়া। বিয়ের পর প্রথমবার হানিয়া যাবে বাবার বাড়ি,,সে যদি না যায় তাহলে এটা নিয়ে অনেক কথা হবে। মির্জা বাড়ি আর তার বাবাও এটা নিয়ে সন্দেহ করতে পারে। তাই সে না চাইতেও বলে–

–আচ্ছা ঠিক আছে,,আমিও যাব কিন্তু একদিনের বেশি থাকতে পারব না কিন্তু।

–মাত্র একদিন। দুই-একটা দিন বেশি থাকলে কি এমন মহা ভারত অসুদ্ধ হবে?

জাভিয়ান এবার রেগে গিয়ে বলে–

–যাও তোমার যাওয়াই লাগবে না। ভাবলাম বিয়ের পর একবারও যাওনি তাই যাওয়ার সুযোগ করে দিলাম,,কিন্তু আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম মানুষকে বসতে দিলে খেতে চায়,খেতে দিলে শুতে চায়।

কথাটা বলে জাভিয়ান হানিয়াকে ছেড়ে বেডে গিয়ে ধুপ করে শুয়ে পরে। হানিয়া ভাবে,, থাক পাগলকে ক্ষেপানো ঠিক হবে না। জাভিয়ান একদিন পরেই চলে আসবে নে,, সে না হয় কিছুদিন থেকে যাবে। সে জাভিয়ানকে বলে–

–আচ্ছা আচ্ছা সরি। আপনি একদিনই থাকুন তাও থাকবেন কিন্তু।

জাভিয়ান হানিয়ার কথাটা শুনে বালিশে মুখ গুজেই একটা বাকা হাসি দেয়। হানিয়ার যে এখন এই বাড়িতে থাকাটা সম্ভব না। অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ আছে তার এবং তার জন্য হানিয়াকে এই বাড়ির বাহিরে পাঠাতে হবে তাকে। সে বালিশে মুখ গুজে বলে–

–আজকে রাতের মধ্যে প্যাকিং করে রেখো। আর এখন যাও,,আমি ঘুমাবো।

–আচ্ছা।

কথাটা বলে হানিয়া দরজা একটু চাপিয়ে দিয়ে নিচে চলে যায়। বোকা হানিয়ার মাথা এটা আসলো না জাভিয়ান কেন এতো তড়িঘড়ি করে তাকে বাপের বাড়ি পাঠাচ্ছে??

~~চলবে?