প্রতিশোধের অঙ্গীকার পর্ব-০৮

0
562

#প্রতিশোধের_অঙ্গীকার
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_অষ্টম

জাভিয়ান বিকেলে ঘুম থেকে উঠে অফিসে যায়। রাত নয়টার দিকে ফিরেও আসে। রাতে ডিনারের সময় সে সকলের সামনে বলে–

–আমি ভাবছিলাম আমাদের বিয়ের পর তো হানিয়া একদিন ওদের বাড়িতে যায় নি,,তাই কাল ওকে আমি ওদের বাড়িতে নিয়ে যাব। আমি একদিন থেকে চলে আসব। ও না হয় কিছুদিন থাকল। তোমরা কি বলো?

আরসাল তালুকদার বলেন–

–বাহ্। এতদিনে তাহলে তোমার বুদ্ধিসুদ্ধি হলো। যাই হোক,,তুমিও কয়েকদিন থেকে যেয়েও হানিয়ার সাথে।

–নো পাপা। নতুন একটা ডিল হাতে নিয়েছি ছুটি নিলে ওটায় প্রবলেম হবে।

–ওটা না হয় আমি দেখে নিলাম।

–তোমার শরীর এমনিতেই ভালো না। আমি তোমাকে এটার পারমিশন দিতে পারছি না।

জাভিয়ান কিছুটা গম্ভীর হয়েই কথাটা বলে। হানিয়া চুপচাপ জাভিয়ান আর তার শ্বশুরের কথপোকথন শুনছে। জাভিয়ানের শেষের কথা টায় তার একটু হাসি পায় কিন্তু তার চেয়েও বেশি ভালো লাগায় মনটা ভরে যায়। বাবার প্রতি কতটা কনসার্ন সে।

আরসাল তালুকদার ভ্রু কুচকে বলে–

–আমি তোমার বাবা আর তুমি কিনা আমার অফিসে আমাকেই যেতে পারমিশন দিবে না।

জাভিয়ান খেতে খেতে বলে–

–হ্যাঁ দিবো না। নিজের অফিসের দিকে তো অনেক যত্ন করলে এতগুলো বছর এখন শরীরের দিকে একটু যত্ন নাও। তোমার কিছু হলে তোমার বন্ধু,, ডাক্তার আঙ্কেল তো বকা গুলো আমাকে দেয় তোমাকে না।

আরসাল তালুকদার এই পর্যায়ে হেসে দেয়। কথাটা অবশ্য জাভিয়ান সত্যিই বলেছে। তার বন্ধু আবিদ হোসেন,, বাল্যকালের বন্ধু। পেশা একজন হার্ট সার্জেন। আরসাল তালুকদার ও তালুকদার পরিবারের যাবতীয় চিকিৎসা সেই করে থাকেন। বছর দুয়েক আগে কোন একটা কারণে মি.তালুকদারের বড়সড় একটা হার্ট অ্যাটাক হয়,,বাঁচার চান্স খুব কমই ছিলো তখন। আল্লাহর রহমতে সেই বার বেঁচে যান সে,,কিন্তু ডাক্তাররা বলে দিয়েছেন তাকে কাজের চাপ একদমই না নিতে,,পারলে এবার অবসরে যেতে।কিন্তু কাজ পাগল আরসাল তালুকদার সেটা কি করে করতে পারে,,কাজ তার জন্য এক প্রকার নেশা। এই নেশার কারণেই মাঝে মধ্যে বেশ অসুস্থও হয়ে পরেন,,তখন আবিদ সাহেব বন্ধুকে তো কিছু বলেন না কিন্তু সব রাগ ঝাড়েন জাভিয়ানের উপর। মূলত এই কারণেই জাভিয়ান ওই কথাটা বলেছে।

আরসাল তালুকদার বলেন–

–ঠিক আছে।তুমি যা ভালো মনে করো তাই করো।

রোজি বেগমেরও কোন আপত্তি নেই।কিন্তু এত ভালো কিছু সহ্য হলো না শায়লা বেগমের। সে কর্কষ গলায় বলে–

–ও যাচ্ছে যাক,,তোমার যাওয়ার কি কোন দরকার আছে জাভিয়ান? তুমি ওখানে গিয়ে থাকতে পারবে? যেই মিডেল ক্লাস পরিবার ওদের দেখলাম বিয়ের সময়,,একটা এসিও তো নেই সেখানে। তুমি ওখানে গিয়ে অসুস্থ হয়ে যাবে বেটা।

শায়লা বেগমের কথা শুনে হানিয়ার মনটা খারাপ হয়ে যায়। সে চুপচাপ রান্না ঘরে চলে যায় একটা বাহানা দিয়ে। সকলেই তার মন খারাপ বিষয়টা বুঝতে পারে। আরসাল তালুকদার একটু রেগে গিয়ে বলেন–

–এই কথাগুলো না বললে কি হচ্ছিল না? এতো চিপ মেন্টালিটি কেন তোমার শায়লা? জাভিয়ান সব দিক ভেবেই তো যাচ্ছে তার শ্বশুর বাড়ি,,তাহলে তুমি শুধু শুধু ওই কথাগুলো বললে কেন? দেখলে তো মেয়েটা মনটা খারাপ হয়ে গেলো।

শায়লা বেগম রবি সিমের থেকেও বেশি তেঁজে জ্বলে উঠে আরসাল তালুকদারের কথা শুনে। সে খানিকটা চিৎকার দিয়ে বলে–

–কি? আপনি আমাকে ওই মেয়েটার জন্য চিপ মেন্টালিটির মানুষ বললেন? কি ভুল বলেছি আমি বলেন? ওরা তো মিডেল ক্লাসই,,একটা এসি পর্যন্ত নেই। সেখানে গিয়ে যদি জাভিয়ান অসুস্থ হয়ে যায় তখন তাকে কে দেখভাল করবে?

জাভিয়ান এতক্ষণ চুপ থাকলেও এখন কেন জানি আর চুপ থাকতে পারে না। সে তার মাকে বলে–

–মম একটা কথা বলো তো,,এই নভেম্বর মাসের মাঝামাঝিতে তুমি কয়দিন রাতে এসি ছেড়ে ঘুমাও?

জাভিয়ানের এই একটা কথায় শায়লা বেগমের সব চিৎকার চেচামেচি বন্ধ হয়ে যায়। ঠিকই তো,,এই নভেম্বর মাসের মাঝামাঝিতে এসি কি আসলেই লাগে,,যেখানে একটি গভীর রাত হলেই ফ্যানটাও বন্ধ করে কাঁথা বা পাতলা কম্বল গায়ে দেওয়া লাগে। যদিও গ্রাম অঞ্চলের কথা আলাদা।সেখানে তো সন্ধ্যার পরপরই ভীষণ শীত জাপ্টে ধরে।

শায়লা বেগম কথা বলছে না দেখে জাভিয়ান নিজেই বলে–

–আশা করি তুমি তোমার জবাব পেয়ে গেছ। আর আরেকটা কথা বললে না,,আমি অসুস্থ হলে আমার দেখভাল করবে কে? এটার জবাবও আমিই দিচ্ছি। তোমার তো আমাদের নিয়ে কখনোই এতো মাথা ব্যথা ছিলো না,,আমাদের অসুখ-বিসুখ হলে মাম্মামই আমাদের দেখভাল করত। আমরা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত সে তার রাতের ঘুম হারাম করে আমাদের পেছন লেগে থাকত। আর এখন তো আবার আমার বউ আছে। তারা দু’জন থাকতে আশা করি তোমাকে আর আমার দেখভাল করার জন্য চিন্তা করতে হবে না। হানি আর মাম্মামই আমার জন্য যথেষ্ট।

জাভিয়ান হানিয়ার হয়ে কথা বলায় আরসাল তালুকদার আর রোজি বেগম ভীষণ অবাক হয় সেই সাথে খুশিও হন। হানিয়াও রান্নাঘরের আড়াল থেকে জাভিয়ানের কথাগুলো শুনছিলো। সে এতোই বেশি খুশি হয়েছে যে তার চোখ দিয়ে পানি পরা শুরু হয়ে যায়। এই প্রথম জাভিয়ান তার পক্ষ নিয়ে কথা বললো।

শায়লা বেগমেও বেশ অবাক হয়ে যায় জাভিয়ানের এমন কথা শুনে। ছেলে দেখি তার আরেক সুরে কথা বলছে। সে অবাক হয়ে বলে–

–বাহ,,এক-দেড় মাসেই বউ পাগল হয়ে গেলে।এখন থেকেই বউয়ের সাপোর্টে কথা বলছ,,আর কয়েকদিন পরে তো বউ ছাড়া আর কারো কথাই শুনবে না।

জাভিয়ান এবার প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে যায়। সে খাওয়া ছেড়ে উঠে যায়। নিজের রুমে যাওয়ার আগে বলে যায়–

–সরি টু সে আমি কারো সাপোর্টে কথা বলছি না। শুধু মাত্র তোমার ভুল গুলো ধরিয়ে দিলাম আর তোমার আমার প্রতি হওয়া অহেতুক টেনশন দূর করে দিলাম। এটা যদি তুমি কারো সাপোর্টে কথা বলা মনে করো এটা তোমার ভুল ধারণা।

কথাগুলো বলেই জাভিয়ান চলে যায়। আরসাল তালুকদারের খাবার হয়ে যাওয়ায় সে-ও চলে যায়। রোজি বেগম আরেকটা প্লেট খাবার বেড়ে হানিয়ার জন্য নিয়ে যায়। ডাইনিং টেবিলে শুধু থেকে যায় শায়লা বেগম,, যে কিনা এখন রাসেল ভাইপারের মতো রাগের অদৃশ্য ফণা তুলে ফোঁস ফোঁস করছে।

_______________________

হানিয়া তার ডিনার শেষ করে বেশ অনেকটা সময় রোজি বেগমের কাছে বসে ছিলেন। ঘরে ফিরে যখন তখন রাত প্রায় সাড়ে বারোটা। ঘরে ফিরে দেখে জাভিয়ান ঘুমিয়ে পরেছে। সে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসে। তারপর ভীষণই সাবধানতা সহিত জাভিয়ানের কাছে গিয়ে তার পাশে বসে। হানিয়া এই কয়েকদিনে খেয়াল করেছে,,জাভিয়ান বেশিরভাগ সময় বুকে ভর দিয়ে ঘুমায়। ঘুমন্ত জাভিয়ানকে হানিয়ার কাছে এতটা কিউট লাগে যে তার ইচ্ছে হয় জাভিয়ানের গাল দুটো টেনে লাল করে দিতে। পরক্ষণেই মনে পরে এই কাজটা করার মতো দুঃসাহস তার নেই।

হানিয়া জাভিয়ানের চুলে নিজের আঙ্গুল ডুবিয়ে দিয়ে হালকা করে চুলগুলো টেনে দিতে থাকে। জাভিয়ান যেনো বেশ আরাম পায়। বেশ কিছুক্ষণ চুল টেনে দেওয়ার পর হানিয়া নিজের মুখ জাভিয়ানের মুখের কাছে নিয়ে আসে। জাভিয়ানের মুখে উপর হানিয়ার গরম নিশ্বাস আছড়ে পরে। জাভিয়ানের পুরো মুখ টায় চোখ বুলায় হানিয়া। তারপর সে তার মুখটা আরেকটু কাছে নিয়ে জাভিয়ানের কপালের একপাশে একটা গভীর ভাবে চুমু দেয়। এই কাজটা করতে সে ভীষণ ভালোবাসে কিন্তু কাজটা করতে পারে সে কালেভদ্রে। কারণ বেশিরভাগ দিনই জাভিয়ান অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থেকে কাজ করে আর হানিয়া তার আগেই ঘুমিয়ে পরে। সকালে উঠেও করতে পারে না।

জাভিয়ানের কপাল থেকে ঠোঁট সরিয়ে হানিয়া তার মুখটা নামিয়ে আনে জাভিয়ানের মুখের কাছে। তারপর জাভিয়ানের চোখজোড়ায়ও ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। ভীষণ আস্তে বলতে গেলে কিছুটা ফিসফিসিয়ে বলে,–

–এতোটা কেন আসক্তিতে পরে যাচ্ছি আমি দিনদিন আপনার প্রতি? আপনি কি এর প্রতিদান স্বরূপ আমার থেকেও দ্বিগুন ভালোবাসা দিবেন আমাকে? জানি না আমি কিছুই,, তাও আমি আপনার প্রতি আসক্ত হয়ে পরছি। আমার জীবনের প্রথম পুরুষ কিনা আপনি তাই আপনার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য কিছুটা বেহায়াও হয়ে উঠছি। খুব জলদি আমাকে আপন করে নেন,,নাহলে সময় গেলে সাধন হবে না প্রিয়তম।

কথাটা বলে হানিয়া জাভিয়ানের কপালে আরেকবার ঠোট ছুঁইয়ে উঠে পরে। কাবার্ড থেকে বালিশ আর কাঁথা নিয়ে চলে যায় সোফায়। এখন আর ফ্লোরে বিছানা করে ঘুমাতে পারে না,,ঠান্ডা লাগে ভীষণ তাই সোফাতেই ঘুমায় সে।

হানিয়া শুইয়ে পরেছে বুঝতে পেরে জাভিয়ান আস্তে করে চোখ খুলে তাকায়। হানিয়া যখন তার চুল টেনে দিচ্ছিল তখনই তার ঘুমটা ছুটে যায়। যেদিন সে ড্রিংকস করে ফিরেছিলে সেদিনের কথা গুলো না শুনলেও আজ সে হানিয়ার সব কথাই শুনেছে। আর কথাগুলো শুনে সে বেশি একটা অবাক হয় নি। কারণ সে জানত হানিয়া একদিন না একদিন তাকে ভালোবাসবেই। সেও এটাই চাচ্ছিল। কিন্তু জাভিয়ান তো তাকে ভালোবাসার বদলে ভালোবাসা দিবে না।বরং এক আকাশ সমান কষ্ট দিয়ে তাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিবে। ভালোবাসার বদলে দেবে ঘৃণা করার কারণ।হানিয়াকে একবার দেখে জাভিয়ান আবার চোখ বন্ধ করে নেয়। কিছু সময়ের ব্যবধানেপুনরায় সে ঘুমিয়ে পরে।

~চলবে?