#প্রতিশোধের_অঙ্গীকার
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#Season_2
#পর্ব_অন্তিম(প্রথমাংশ)
হানিয়া মুখ ফুলিয়ে তাকিয়ে আছে ড্রাইভ করতে থাকা জাভিয়ানের দিকে। লোকটার গুরুগম্ভীর মুখটা তার একটুও ভালো লাগছে না। হানিয়া এগিয়ে এসে জাভিয়ানের বাহুতে খোঁচাতে শুরু করে কিন্তু জাভিয়ান কোন রেসপন্স করে না। সামনের দিকে তাকিয়ে ড্রাইভ করতে থাকে।
হানিয়া অসহায়বোধ করে। প্রিয় মানুষটির অভিমান তাঁকে আহত করছে। হানিয়া করুণ কণ্ঠে ডেকে উঠে–
—জাভিয়ান,, আমার সাথে কথা বলছেন না কেন? তাকান আমার দিকে।
হানিয়া জাভিয়ানের চোয়াল ধরে তার দিকে ঘুরানোর চেষ্টা করে কিন্তু জাভিয়ান মুখ শক্ত করে রেখেছে। জাভিয়ান প্রচন্ড রেগে আছে সেই সাথে অভিমানও করেছে। লোকটার ভালো চাইতে গিয়ে এখন হানিয়া ফেঁসে গিয়েছে। হানিয়া হাল ছেড়ে দেয়। সিটে শরীর এলিয়ে দিয়ে কয়েক ঘন্টা আগের কথা ভাবতে থাকে।
_____________________
কয়েক ঘন্টা আগে~~
জাভিয়ান তার প্রজেক্টের সব কাজ আগেই শেষ করে ফেলেছিলো। যার কারণে ক্লায়েটরা আসার পরপরই তারা মিটিং শুরু করে দেয় এবং দেড় ঘন্টার মধ্যে খুবই সুন্দর ভাবে মিটিং শেষ করে। ক্লায়েটদের জাভিয়ানের প্রজেক্ট খুবই ভালো লাগে এবং তারা ডিলটা ফাইনাল করে।
জাভিয়ান তার বাবা-মাকে ডিল ফাইনাল হওয়ার কথা জানিয়ে হানিয়াকে ফোন দেয় খবরটা জানানোর জন্য। তারা টুকটাক কথা বলার পর জাভিয়ান হানিয়াকে জিজ্ঞেস করে–
—তোমাদের বাস এখন কতদূর? যেতে কতক্ষণ লাগবে আর?
জাভিয়ানের এই প্রশ্নে হানিয়া হকচকিয়ে যায়। সে যদি এখন জাভিয়ানকে জানায় তারা এখনো বাসের জন্য অপেক্ষা করছে তাহলে পাগলটা ক্লান্ত শরীর নিয়েই দৌড়ে আসবে তাঁকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। তাই সে সিদ্ধান্ত নেয় জাভিয়ানকে মিথ্যে কথা বলবে।
হানিয়া আমতাআমতা করে বলে–
—প্রায়ই মাঝ রাস্তায় এসে পরেছি। আর ঘন্টা দুয়েক লাগবে যেতে।
হানিয়ার আমতাআমতা করে কথা বলায় জাভিয়ানের কপালে ভাজ পরে। এরমধ্যে হানিয়া রুমানা(কলিগ) এসে জিজ্ঞেস করে সে কার সাথে কথা বলছে। হানিয়া জানায় তার হাসবেন্ডের সাথে। রুমানা বলে সে জাভিয়ানের সাথে সেদিন ভালো করে পরিচিত হতে পারে নি এখন যেহেতু ফ্রি’ই বসে আছে এখন না হয় হওয়া যাক পরিচিত। হানিয়া তার সাথে জাভিয়ানের কথা বলিয়ে দেয়। কথা বলার এক পর্যায়ে রুমানা মজা করে বলে–
— তা ভাইয়া হানিয়ার সাথে ঝগড়া হয়েছে নাকি যার ম্যাডাম মুখ গোমড়া করে বসে আছে?
জাভিয়ান বলে–
—না আপু। হয়ত পরিবার ছেড়ে চলে যাচ্ছে তাই মনটা খারাপ। তার সাথে ঝগড়া? আমার ঘাড়ে একটাই মাথা আপু।
ফোনটা লাউডস্পিকারে দেওয়া ছিলো বলে হানিয়াও জাভিয়ানের সব কথা শুনতে পায়। জাভিয়ানের কথাটা শুনে রুমানা হেঁসে দেয়। এর মধ্যে হঠাৎই সোহাগ এসে বলে–
—রুমানা-হানিয়া বাস স্টপেজে পৌছাতে আরো ১৫/২০ লাগবে। তোমরা লাঞ্চটা করে নিবে নাকি গাড়িতে বসেই করবে?
সোহাগের কথা শুনে হানিয়ার চোখ বড়বড় হয়ে যায়। সে যে ধরা পরে যাচ্ছে। রুমানা বলে–
—হানিয়া তো খাবার খেয়ে ট্র্যাভেল করতে পারে না। আমারও সেম। আমরা এখন কিছু খাবো না। বাসে বসে হালকা পাতলা কিছু একটা খেয়ে নিবো আমরা।
—আচ্ছা। তোমরা বসে থাকো,, বাস আসলে তোমাদের ডেকে নিয়ে যাবো।
—আচ্ছা সোহাগ ভাই।
কথা শেষ করে সোহাগ চলে যায়। এদিকে ফোনের অপর পাশে থাকা জাভিয়ান সবটাই শুনে নেয়। বাস স্টপেজে আসবে মানে? এখনো কি আসে নি? হানিয়া যে বললো তারা অর্ধেক রাস্তায় ক্রস করে ফেলেছে। জাভিয়ান তার কৌতূহল দমাতে না পেরে জিজ্ঞেসই করে ফেলে–
—বাস স্টপেজে আসবে মানে? আপনারা এখন কোথায়?
রুমানা সহজ সরল মনে বলে দেয়–
—আমরা বাস স্টপেজে বসে বাসের অপেক্ষা করছি। বাস আসতে লেট হয়েছে ভাইয়া।
ব্যস। হানিয়ার ছলচাতুরী ফাঁস হয়ে যায়। কথাটা শুনে জাভিয়ানের প্রচন্ড রাগ হয় সাথে অভিমানও। হানিয়া কেন তাঁকে মিথ্যে বললো? সে দিয়ে আসলে কি বেশি ক্ষতি হয়ে যেতো?
জাভিয়ান থমথমে গলায় বলে–
—আপু হানিয়াকে ফোনটা একটু দিবেন? ওর সাথে একটা কথা ছিলো।
—অবশ্যই। এই নেন আপনার মিসেসের সাথে কথা বলুন।
রুমানা ফোনটা হানিয়াকে দিয়ে দেয় আর নিজে চলে যায় চা আনতে। হানিয়া একটা শুকনো ঢোক গিলে ফোনটা কানে ধরে। “হ্যালো” বলার আগেই জাভিয়ানের গম্ভীর কণ্ঠের নির্দেশ শুনতে পায়। জাভিয়ান বলে–
—মিথ্যে বললে কেনো? এটার জবাবদিহিতার জন্য প্রস্তত থাকো। চট্টগ্রাম পৌঁছেই তোমাকে এর জবাব দিতে হবে। আর আমি আসছি,,আমার সাথে যাবে তুমি।
কথাটা বলেই জাভিয়ান খট করে ফোনটা কেটে দেয়। হানিয়া ভয়ার্ত মুখ নিয়ে বসে থাকে।
___________________________
বসে থাকতে থাকতে কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিলো হানিয়ার মনে নেই। কারো একজনের ডাকাডাকিতে তার ঘুমটা ভেঙে যায়। চোখ খুলে নিজেকে জাভিয়ানের বাহুতে শোয়া দেখে মনটা খুশি হয়ে যায় তার। লোকটার রাগ বোধহয় ভেঙে গিয়েছে। হানিয়া খুশি খুশি মনে জাভিয়ানের দিকে তাকালে দেখতে পায় এখনো সে মুখটা গম্ভীর করে রেখেছে। তার মানে রাগ ভাঙেনি।
জাভিয়ান হানিয়ার দিকে না তাকিয়েই বলে–
—সামনে একটা ছোট রেস্টুরেন্ট আছে। হালকা পাতলা কিছু খেয়ে নাও। তারপর আবার ঘুমিও।
কথাটা বলে সে গাড়ি থেকে বের হয়ে আসে। হানিয়া বের হয় না। সে গো ধরে বসে থাকে। যে তার সাথে কথা বলে না হানিয়াও তার কথা শুনবে না। হানিয়া বের হচ্ছে না দেখে জাভিয়ান হানিয়ার পাশের গাড়ির দরজা খুলে তাঁকে বের হয়ে আসতে বলে। জবাবে হানিয়া বলে–
—খাবো না। যে আমার সাথে কথা বলে না আমিও তার কথা শুনতে বাধ্য না।
হানিয়ার কথা শুনে জাভিয়ান আরো রেগে যায়। শব্দ করে গাড়ির দরজা লাগিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় কই যেনো। হানিয়া মন খারাপ করে গাড়িতেই বসে থাকে। কিছুক্ষণ পর জাভিয়ান ফিরে আসে,,হাতে তার কিছু প্যাকেট। হানিয়া আঁড়চোখে তাকিয়ে দেখে খাবার কিনে এনেছে।
জাভিয়ান গাড়িতে বসে খাবার গুলো হানিয়ার দিকে বাড়িয়ে দেয়। হানিয়া এমন একটা ভাব করে যেন সে ব্যতীত গাড়িতে আর কেউ নেই। জাভিয়ান হানিয়ার এমন কাহিনি দেখে রেগে বলে–
—কাহিনি শেষ হলে খাবারটা নাও। মেজাজ খারাপ আছে কিন্তু আমার।
হানিয়া তার কথায় কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় না। জাভিয়ান আবারও কিছু বলার জন্য মুখ খুলবে হঠাৎই হানিয়া তার বেল্ট খুলে ধপ করে জাভিয়ানের কোলে এসে বসে পরে। জাভিয়ান হানিয়ার এমন কাজে থতমত খেয়ে যায়। মুখটা আগের মতো গম্ভীর করেই বলে–
—আমার কোলে কি? যাও নিজের জায়গায় যাও। এখন এত ভালোবাসা আসছে কোথা থেকে? মিথ্যে বলার সময় মনে ছিলো না?
হানিয়া জাভিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে আহ্লাদী গলায় বলে–
— ঐ জামাই! প্লিজ রাগ করে থাকবেন না৷ আমি তো আপনার কথা ভেবেই মিথ্যে বলেছিলাম। আপনি ক্লান্ত শরীর নিয়ে আবার এতদূর ট্র্যাভেল করবে তাই মিথ্যে বলেছিলাম। আমি বুঝতে পারি নি আপনার এত খারাপ লাগবে।
জাভিয়ান হানিয়ার সব কথাই শুনে। রাগটা তার পরে গিয়েছে হানিয়ার এত আহ্লাদ দেখেই। কিন্তু সে দেখতে চায় হানিয়া তার রাগ ভাঙানোর জন্য আর কি কি করতে পারে। সে মুখটা গম্ভীর করেই বসে থাকে।তার গম্ভীর মুখ দেখে হানিয়া ধরে নেয় জাভিয়ানের রাগ এখনো ভাঙেনি। সে জাভিয়ানের রাগ ভাঙানোর জন্য তার গালে একটা পাপ্পি দেয় তারপর বলে–
—এই নিন আদর করে দিলাম তাও রাগ করে থাকবেন না প্লিজ।
জাভিয়ান কোন কথা বলে না। হানিয়া অপর গাল টিতেও পাপ্পি দেয়। নাহ এবারও কিছু হয় না। জাভিয়ান হানিয়ার এমন কান্ডে মনে মনে হেঁসে খু**ন হচ্ছে। লাস্ট একটা ডোজ দেওয়ার জন্য সে হানিয়াকে বলে–
—আমি কি বাচ্চা যে এমন পাপ্পি-ঝাপ্পি দিচ্ছো?
—পাপ্পি কি? এটা না আদর?
—জ্বি না এটাকে পাপ্পি বলে। যা বাচ্চাদের দেওয়া হয়।
—তাহলে আদর কোনটা? যেটা বড়দের দেওয়া হয়।।
জাভিয়ান নিজের একটা আঙ্গুল দিয়ে তার ঠোঁটের দিকে ইশারা করে বলে–
—এখানে যেই পাপ্পি দিবে সেটাকে আদর বলে এবং এটা বড়দের জন্য।
হানিয়া জাভিয়ানের কথা বুঝতে পেরে যায়। বেটা তাঁকে অসহায় পেয়ে সুযোগের সৎ ব্যবহার করছে। হানিয়া অসহায় গলায় বলে–
—আমরা রাস্তায় জাভিয়ান। কেউ দেখে ফেললে?
—উইন্ডো গুলো লক করা আর বাহির থেকেও তেমন একটা দেখা যায় না গাড়ির ভেতরে সেটা তুমি ভালো করেই জানো। অহেতুক অজুহাত দিয়ে লাভ নেই। দিতে হলে দাও নাহয় নিজের জায়গায় গিয়ে ঘুমাও আবার। তোমার গন্তব্য আসলে ডেকে দেওয়া হবে।
হানিয়া জাভিয়ানের এমন কাটকাট কথা শুনে একটু কষ্ট পায়। কি আর করার! পাগল বরের মুখে হাসি না দেখলে তার মনটাও যে শান্ত হবে না। থাক দিয়েই দেই একটা। কথাটা ভেবে হানিয়া তার একহাত নিয়ে রাখে জাভিয়ানের ঘাড়ের পেছনে আরেক হাত দিয়ে তার পুরুষালী চোয়াল ধরে দু’জনের ওষ্ঠ এক করে দেয়। জাভিয়ান দু’হাত দিয়ে হানিয়ার কোমড় চেপে ধরে তালে নিজের আরো কাছে নিয়ে আসে। সময় নিয়ে একে অপরকে বড়দের আদর দিতে থাকে।
বেশ কিছুক্ষণ হয়ে যাওয়ার পর যখন তাদের নিশ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছিল তখন জাভিয়ান হানিয়ার ঠোঁটকে নিজের ঠোঁট থেকে মুক্তি দেয়। মুক্তি পেয়ে হানিয়া জাভিয়ানের ঘাড়ে মুখ গুঁজে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক করতে থাকে। জাভিয়ান তাকে সময় দেয় স্বাভাবিক হওয়ার।
হানিয়া স্বাভাবিক হয়ে এলে জাভিয়ান তাঁকে নিজের মুখোমুখি বসায়। কঠোর গলায় বলে–
—আর কখনো আমার থেকে কিছু লুকাবে?
—না।
—মিথ্যে বলবে?
—না।
—তোমার ছোট বড় সকল কথা আর সমস্যা আমায় বলবে?
—বলবো।
—ওয়াদা করলে?
—করলাম।
হানিয়া কথা শেষ করে অসহায় মুখে জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে থাকে। জাভিয়ান হানিয়াকে আর অপেক্ষা করায় না। তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে তাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নেয়। হানিয়া সেই অবস্থাতেই জাভিয়ানকে প্রশ্ন করে–
—আপনি আর রেগে নেই তো?
—এত কিছু করার পরও কি কেউ রেগে থাকতে পারে?
জাভিয়ানের প্রশ্নই হানিয়ার উত্তর দিয়ে দেয়। তারা গাড়িতে বসেই খাওয়াদাওয়া করে আবার রওনা হয়। এবার গাড়ি চালানোর ফাঁকে ফাঁকে জাভিয়ান টুকটাক দুই একটা কথা বলছে। বাকি রাস্তাটা তারা ভালোভাবেই পার করে।
_____________________
হানিয়া তার ফ্ল্যাটের তালা খুলে নিজে আগে প্রবেশ করে জাভিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলে–
—আমার ছোট্ট নিবাসে আপনার স্বাগতম মি.জাভিয়ান তালুকদার।
জাভিয়ান হাসি মুখে বাসায় প্রবেশ করে বলে–
—ধন্যবাদ মিসেস তালুকদার।
জাভিয়ান ঘাড় ঘুড়িয়ে ফিরিয়ে ফ্ল্যাটটা দেখতে থাকে। একরুমের একটা ফ্ল্যাটে হানিয়া থাকে। কিচেন,, ড্রয়িং-ডাইনিং নিয়ে বেশ ভালোই গুছানো একটা বাসা। ছোট ফ্যামিলির জন্য সুন্দর হবে বাসাটা।
হানিয়া বাসায় এসে বোরকা খুলে ঘর পরিষ্কার করতে লেগে পরে। একমাস ছিল না সে বেশ ভালোই ধুলোবালি জমেছে। হানিয়াকে এসেই কাজে লেগে পরতে দেখে জাভিয়ান বলে–
—একটু রেস্ট নিয়ে নিতে। এসেই লেগে পরলে কাজে।
হানিয়া ঘর ঝাড়ু দিতে দিতে বলে–
—ডাস্টে প্রবলেম হয় আমার। আপনি রুমে যান। ফ্রেশ হয়ে নেন। ততক্ষণে আমার এসব ঝাড়াঝাড়ি হয়ে যাবে।
—ফ্রেশ হয়ে পরবো কি? সাথে তো কিছুই আনলাম না।
জাভিয়ানের প্রশ্ন শুনে হানিয়ার চলতে থাকা হাতটা থেমে যায়। তারপর কি মনে করে আবার কাজ করতে করতে বলে–
—আপনি ফ্রেশ হতে যান। দেখি কি করা যায়। কিছু না পেলে আমার কয়েকটা টি-শার্ট আছে সেখান থেকে একটা পরে নিবেন। আর একটা শাড়িকে লুঙ্গির মতো পেঁচিয়ে বসে থাকবেন। সিম্পলের মধ্যে গর্জিয়াস ড্রেস হয় যাবে।
—অ্যাঁ………?
শব্দসংখ্যা–১৫২০
~চলবে?
#প্রতিশোধের_অঙ্গীকার
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#Season_2
#পর্ব_অন্তিম(শেষাংশ)
জাভিয়ান শাওয়ার নিয়ে টাওয়াল পেঁচিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয় ভীতু মনে। তখন হানিয়ার কথা শুনে জাভিয়ান তব্দা খেয়ে যায়। এক বাক্যে বলে দেয় সে এসব ড্রেস পরবে না আর না ফ্রেশ হবে। কিন্তু হানিয়া তাকে ধমকেধামকে শাওয়ারে পাঠিয়ে দিয়েছে। হুমকিস্বরূপ বলেছে–
—ধুলোবালি মাখা গায়ে আমার ধারে কাছেও আসবেন না। হয় শাওয়ার নিন না হয় আজ ড্রয়িংরুমেই থাকবেন।
জাভিয়ান একবার ভেবেছিলো মার্কেটে গিয়ে নিজের জন্য শপিং করে নিয়ে আসবে, কিন্তু হানিয়া তাও করতে দেয় নি। ঠেলেঠুলে ওয়াশরুমে ঢুকিয়ে দিয়েছে।
জাভিয়ান ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দেখে বেডের উপর একসেট ড্রেস রাখা। ব্ল্যাক কালারের টি-শার্ট আর গ্যাবাডিং প্যান্ট। বেশ সুন্দর দেখতে। জাভিয়ান কাপড় গুলো সেখানে রেখেই হানিয়াকে ডাকতে ডাকতে রুমের বাহিরে চলে আসে।
হানিয়া তখন কিচেনে টুকটাক ধোঁয়াপাকলা করছিলো। জাভিয়ানের ডাক শুনে সে কিচেন এপ্রোনে হাত মুছতে মুছতে তার সামনে এসে দাঁড়ায়। ব্যস্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে–
—কি হয়েছে? ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছেন কেন?
ষাঁড় বলায় জাভিয়ানের ভালো লাগে না। মুখটা গোমড়া করে বলে–
—আমায় ষাঁড় বলতে পারলে তুমি হানি?
—হ্যাঁ পারলাম। এখন বলুন কি জন্যে ডেকেছেন?
—রুমে দেখলাম ড্রেস রাখা বেডের উপর। ওগুলো কি আমার জন্য? আমার জন্য হলে এত তাড়াতাড়ি ড্রেস আনলে কোথা থেকে?
—পাশের বাসার একজনের থেকে ধার এনেছি এক বেলার জন্য। বেছে বেছে সবচেয়ে পুরানো ড্রেস গুলো দিতে বলেছি। চলুন দেখি আপনার গায়ে লাগে নি কাপড় গুলো।
ঝাড়ি দিয়ে কথাগুলো বলে হানিয়া রুমের দিকে হাটা দেয়। আসার পর থেকে হানিয়ার একটার পর একটা ঝাড়ি খাচ্ছে জাভিয়ান। তখন সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছিলো না জাভিয়ান,, এখন হানিয়া করছে।
জাভিয়ান হানিয়ার পেছন পেছন আসলে হানিয়া তার হাত ধরে বেডে বসিয়ে দেয়। তারপর নিজেই টি-শার্টটা হাতে তুলে পরিয়ে দেয় জাভিয়ানকে। প্যান্টটা জাভিয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে–
—ট্রাউজার কেনা নেই। এটা আজকে রাতের জন্য পরুন। কাল সকালে তো চলেই যাবেন। আমি আপনার ড্রেস গুলো ধুয়ে আজ রাতের মধ্যেই শুকিয়ে দিবো নে।
জাভিয়ান প্যান্ট পরতে পরতে হানিয়ার লম্বা ভাষণ শুনে। কাল হানিয়াকে এখানে ছেড়ে চলে যেতে হবে শুনে জাভিয়ানের মনটা খারাপ হয়ে যায়।
জাভিয়ান হানিয়াকে জিজ্ঞেস করে–
—ভালো করে একটা কথা বলো তো।
হানিয়া তাকে রাগানোর জন্য ইচ্ছে করে বলে–
—হ্যাঁ,, এখন তো আমার কথা ভালো লাগে না। পেয়ে গেলে তো কদর কমে যায়। সেই অবস্থা হয়েছে আমার এখন। বলেন কি বলবেন?
জাভিয়ান চোখ সরু সরু করে হানিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। কথাটা তার একদমই পছন্দ হয়নি যে তা তার তাকানো দেখেই অনুমান করতে পারে হানিয়া। হানিয়া জোড়াতালি হাসি দিয়ে বলে–
—মজা করছিলাম। বলেন কি বলতে হবে।
—এত জলদি এই কাপড় পেলে কীভাবে?
জাভিয়ানের মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে মেজাজ তার চোটে আছে। এখন উল্টাপাল্টা জবাব দেওয়া মানে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারা। হানিয়া তাই সত্যি কথাই বলে দেয়। সে বলে–
—এগুলো আমার ফার্স্ট ইনকামের টাকায় কেনা কাপড়। শুধু আপনার জন্য না আমি সকলের জন্যই কিনেছিলাম। দিতে পারবো না জেনেও কিনেছিলাম। মনের শান্তির জন্য।
জাভিয়ান শান্ত দৃষ্টিতে হানিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। কেমন মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে তার। জাভিয়ানের জামা কাপড় পরা শেষ হলে হানিয়া তাঁকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে দেখতে থাকে।
হানিয়ার মনে হয়, জাভিয়ানের বয়স বাড়ছে না আরো যেনো কমছে। পেশিবহুল হাতে টি-শার্টের হাতাটা শক্তপোক্ত ভাবে এটে রয়েছে,, সিনা টানটান করে গম্ভীর মুখে দাড়িয়ে থাকা পুরুষটিকে হানিয়া অসম্ভব ভালোবাসে। হানিয়া জাভিয়ানের মুখ থেকে চোখ সরিয়ে এনে তার এডামস অ্যাপেলে দৃষ্টি নিবন্ধন করে। মুহূর্তেই সে অনুভব করে তার গলাটা শুঁকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। প্রচন্ড তেষ্টা পেয়েছে তার।
হানিয়া হাত বাড়িয়ে জাভিয়ানের এডামস অ্যাপেলটা স্পর্শ করে। পুরো শরীরে আলাদা এক শিহরণ বয়ে যায়। হঠাৎই তড়িঘড়ি করে সে হাত সরিয়ে রুম থেকে বের হয়ে আসতে নিলে জাভিয়ান খপ করে তাকে ধরে ফেলে নিজের বাহুতে আগলে নেয়। হানিয়া হালকা উচ্চস্বরে বলে–
—আরে আরে কি করছেন? আমার শরীরে ঘাম তো। ছাড়ুন।
জাভিয়ান নিজের মুখটা হানিয়ার কানের কাছে এমন কিছু বলে যা শুনে হানিয়ার পা থেকে মাথা অব্দি সিড়সিড়িয়ে উঠে। লজ্জায় বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। নিজের এই লজ্জা লুকাতে ছটফট করতে থাকে হানিয়া জাভিয়ানের থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য। জাভিয়ান তার লজ্জা বুঝতে পেরে হেঁসে উঠে। মুখ এগিয়ে এনে রাখে হানিয়া ঘাড়ে। টুকরো টুকরো আদর দিয়ে হানিয়াকে উত্যক্ত করতে থাকে। হানিয়া শুরুতে ছটফট করলেও একসময় শান্ত হয়ে সেও উপভোগ করতে থাকে স্বামীর ভালোবাসা।
তারা যখন একে অপরকে নিয়ে ব্যস্ত তখনই তাদের ধ্যাণ ভঙ্গ করতে বেজে উঠে কলিংবেল। ক্রমাগত বেল বাজার শব্দে জাভিয়ান বিরক্ত হয়ে ছেড়ে দেয় হানিয়াকে। হানিয়া ছাড়া পেয়ে রুম থেকে বের হতে হতে বলে–
—খাবার অর্ডার দিয়েছিলাম,, সেটাই বোধহয় এসে পরেছে।
কথাটা শুনে জাভিয়ান হানিয়ার হাত ধরে পুনরায় আঁটকে দেয়। আদেশের সুরে বলে–
—ফ্রেশ হতে যাও। আমি দেখছি।
জাভিয়ানের আদেশ। হানিয়া না পালন করে পারে বুঝি? তাই তো সে জামাকাপড় নিয়ে চলে যায় ওয়াশরুমে আর জাভিয়ান যায় দরজা খুলতে।
দরজা খুলে যা আশা করেছিলো হলো তার বিপরীতটা। রাহাত এসেছে। হাতে তার বড় খাবারের ট্রে। জাভিয়ানকে দরজা খুলতে দেখে রাহাতেরও হাসি হাসি মুখটা চুপসে যায়। সে ভেবেছিলো হানিয়া খুলবে বোধহয়।
জাভিয়ান গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করে–
—তুমি রাহাত হঠাৎ এসময়? আর হাতে এটা কি?
রাহাত জোড়াতালির একটা হাসি দিয়ে বলে–
—আমরা হানিয়ার পাশের বিল্ডিংয়ে থাকি। আমাদের বাড়ি ওটা। আর হাতে এগুলো খাবার। আম্মুকে নাকি হানিয়া ফোন করে বলেছিলো সে বাসায় এসেছে। এতদূর থেকে ট্র্যাভেল করে আসার পর আবার রান্না করবে,,এটা ভেবে হানিয়ার জন্য আম্মু পাঠিয়েছে এগুলো।
—ওহহ্। আসো ভেতরে আসো।
জাভিয়ান রাহাতকে ভেতরে প্রবেশের জায়গা করে দেয়। রাহাত ভেতরে প্রবেশ করে খাবারের ট্রে’টা মিনি ডাইনিং টেবিলে রাখে। তারপর জাভিয়ানের দিকে ফিরে বলে–
—আসি তাহলে এখন।
—বসে যাও কিছুক্ষণ। তুমি কি সেইদিনের ব্যবহারের জন্য রেগে আছো? রেগে থাকলে আমি সরি। আসলে বুঝোই তো,, বউকে যদি কোন পরপুরুষ জড়িয়ে ধরে তখন স্বামীর কেমন লাগে।
জাভিয়ান রাহাতকে পরপুরুষ বলায় সে বেশ আহত হয়। সে তো আপন পুরুষ হতে চেয়েছিলো হানিয়ার জীবনে কিন্তু আমরা যা চাই তা কি সবসময় পূরণ হয়?
রাহাত হাসি মুখে বলে–
—না না। আমি রেগে নেই।
—তাহলে বসো কিছুক্ষণ।
কি আর করার। বসে পরে রাহাত। তারা দু’জন মিলে কথা অফিসিয়াল বিষয়ে কথা বলতে থাকে। কিছুক্ষণ পর হানিয়া মাথায় টাওয়াল পেঁচিয়ে ঘর থেকে বের হতে হতে বলে–
—জাভিয়ান আজ কিন্তু আপনি আমায় খাইয়ে দিবেন? আমার ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। আর বুকে নিয়েও ঘুমাবেন। প্রতিদিন আমার বুকে ঘুমান, আজ আমি আপনার বুকে ঘুমাবো।
হানিয়া খেয়াল করেনি যে রাহাত এসেছে। নিজের মতো কথা বলতে বলতে সে বাহিরে এসে রাহাতকে দেখতে পেলে আরো একদফা লজ্জা পায়। আজ যেনো সে লজ্জা পেতে পেতেই দিন শেষ করবে। সে দৌড়ে আবার রুমে চলে যায়।
অন্যদিকে হানিয়ার এমন কথা শুনে কষ্টরা যেনো আরো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রাহাতকে। হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে তার। অসহনীয় এই কষ্ট থেকে একটু পরিত্রাণের জন্য সে বসা থেকে উঠে বসে। জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি করে বলে–
—দেখেছো আম্মু আমায় একটা কাজ দিয়েছিলো আর আমি এখানে বসে তোমার সাথে গল্প করতে বসে গিয়েছি। তাড়াতাড়ি যাই নাহলে পিঠে ছাল থাকবে না।
কথাটা বলে হুড়মুড়িয়ে বাসা থেকে বের হয়ে আসে।জাভিয়ান সবটা বুঝতে পেরেও চুপ থাকে। সে একজন প্রেমিক পুরুষ হয়ে আরেকজন প্রেমিক পুরুষের চোখের ভাষা খুব সহজেই ধরে ফেলেছিলো সেদিনই। কিন্তু তার যে কিছুই করার নেই এ বিষয়ে।
______________________
দেখতে দেখতে আরো ছয় মাস চলে যায়। দিনগুলো বেশ সুন্দর করেই কাটছে। হানিয়া চট্টগ্রাম আর জাভিয়ান ঢাকায়। দূরত্বটা মেনে নেওয়া কঠিন হলেও কিছু যে করার নেই। প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাভিয়ান চট্টগ্রাম যায় হানিয়ার কাছে, রাতটা তার সাথে কাটিয়ে খুব সকাল সকাল রওনা হয় ঢাকার উদ্দেশ্যে। শুক্রবার পুরোটা দিন ঢাকায় পরিবারের কাছে কাটিয়ে আবার শনিবার বিকেলের দিকে রওনা হয় তারা চট্টগ্রামের উদ্দেশ্য। ঢাকা-চট্রগ্রাম করতে করতেই দিন কাটছে হানিয়া জাভিয়ানের।
জাভিয়ান আগের থেকে আরো বেশি আসক্ত হয়ে পরেছে হানিয়ার প্রতি। দিন যত যায় তার পাগলামি যেনো আরো বাড়ে। বাসায় হানিয়াকে ছাড়া মন না টিকলেই সে গাড়ি নিয়ে রওনা হয়ে করে তার সুখের কাছে। ঘন্টার পর ঘন্টা জার্নি করে যখন সে হানিয়ার কাছে পৌছে তাঁকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নেয় তখন তার মনে হয়,, এই শান্তিটুকুর জন্য সে সব করতে পারবে।
আজও হুট করেই জাভিয়ানের মনটা বড্ড অস্থির হয়ে আছে। লাস্ট যখন হানিয়ার সাথে কথা বলেছিলো তখন তার কণ্ঠটা কেমন দূর্বল শুনাচ্ছিলো। গতকালও হানিয়া বলেছিলো তার ঠান্ডা লেগেছে হঠাৎ করে এর জন্য গলা এমন শুনাচ্ছে। হানিয়ার অসুস্থ শুনে জাভিয়ান তার কাছে আসতে চাইলে হানিয়া ধমকে ধামকে মানা করে দেয়। কাল সারা রাত ছটফট করেছে জাভিয়ান,,আজ অফিসেও কাজ করতে পারে নি ঠিকমতো। তার মনে হচ্ছে হানিয়ার শুধু ঠান্ডা লাগেনি। অন্য কোন অসুখ হয়েছে। নিজের মনের শান্তির জন্য জাভিয়ান হানিয়াকে না জানিয়েই তার কাছে যাচ্ছে।
প্রায় অনেকটা রাস্তা এসে পার করে ফেলেছে। আর ঘন্টা খানেকের রাস্তা বাকি। তারপর সে পৌঁছে যাবে তার সুখপাখির কাছে। অন্যদিকে জাভিয়ানের ভাবনাই সঠিক। হানিয়া অফিস থেকে ফেরার পর জ্বরের কবলে পরে। হঠাৎই গা কাপিয়ে জ্বর আসে তার। মিসেস চৌধুরী মাঝে মধ্যেই সন্ধ্যার দিকে হানিয়ার সাথে আড্ডা দিতে আসে। আজও এসেছিলো। হানিয়া তার জন্য দরজা খুলে দিলে মিসেস চৌধুরী তার চোখমুখ দেখেই বুঝে যায় সে অসুস্থ।
তারপর থেকেই ভদ্রমহিলা লেগে পরে হানিয়ার সেবায়। একদম মায়ের মতো আগলে নিয়ে হানিয়াকে যত্ন করতে থাকে। খাবার খাইয়ে দেয় নিজের হাতেই। তারপর ঔষধ খাইয়ে তাকে শুইয়ে দিয়ে হানিয়ার মাথায় জলপট্টি দিতে থাকে। এমন সেবাশুশ্রূষায় ঘন্টা দুয়েকের মাঝেই হানিয়ার গা ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে যায়।
ভদ্রমহিলা হানিয়ার সাথেই আজ থাকতে চেয়েছিলো কিন্তু হানিয়া তাকে অনেক বলেকয়ে বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে। কারণ মি.চৌধুরী এখনো বউকে ছাড়া রাতে থাকতে পারেন না। একদিন কথায় কথায় মিসেস চৌধুরী বলেছিলেন কথাটা।
রাত দশটা বাজে। হানিয়া শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখনই তার ফোনটা বেজে উঠে। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে তার পাগল বর কল দিয়েছে। হানিয়া সেটা দেখে জিভে একটা কামড় দেয়। সেই বিকেলে লাস্ট কথা হয়েছিলো তাদের তারপর বাসা এসে সে অসুস্থ হয়ে পরেছিলো।
হানিয়া ফোনটা রিসিভ করে সালাম দেয়। জাভিয়ান সালামের জবাব নিয়ে অস্থির গলায় বলে–
—হানি নিচে আসো তো তাড়াতাড়ি।
জাভিয়ানের কথাটা শুনে হানিয়ার কপালে ভাজ পরে। এত রাতে নিচে যাবে কেন সে? প্রশ্ন সে জাভিয়ানকে করেই বসে।
—এত রাতে নিচে যাবো কেন?
—গেইটে তালা দেওয়া। তালা খুলে আমায় পিক করতে আসবে।
—আপনি কোথায়?
—তোমার বাসার নিচে।
দাঁতে দাঁত চেপে বলে জাভিয়ান। এই কথা শুনে হানিয়ার চোখ বড়বড় হয়ে যায়। দৌড়ে বেলকনিতে গিয়ে দেখে জাভিয়ান গাড়ির সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার বাসার সামনে। হানিয়ার চিত্ত মুহূর্তেই চঞ্চল হয়ে উঠে। ছটফটাতে শুরু করে জাভিয়ানের বাহুডোর হামলে পরার। হানিয়ার কানে তখনও ফোন লাগানো। জাভিয়ান হ্যালো হ্যালো করছে। হানিয়া নিজেকে সামলে শুধু একটা কথাই বলে–
—আসছি।
কথাটা বলে দৌড়ে ঘরে আসে। ঘরে সে একটা লেডিস টি-শার্ট আর প্লাজু পরে ছিলো। সেটার উপরেই নামাজের বড় হিজাবটা পরে চাবি নিয়ে দৌড় লাগায় নিচে যাওয়ার জন্য। কিসের অসুস্থতা আর কিসের দূর্বলতা জাভিয়ানকে দেখে সব পালিয়েছে।
হানিয়া কেঁচি গেইটের তালা খুলে দৌড়ে গিয়ে হামলে পরে জাভিয়ানের বুকে৷ জাভিয়ানও শক্ত করে তাঁকে ঝাপটে ধরে নিজের সাথে। দু’জনের সারাদিনের ক্লান্তি,, অস্বস্তি,, অস্থিরতা সব যেন একে অপরের সংস্পর্সে এসে দূর হয়ে গেছে। হানিয়া যেই এলাকায় থাকে সেটা একটু শান্ত ও নিরিবিলি হওয়ায় লোকলজ্জার তেমন একটা ভয় নেই।
জাভিয়ান হানিয়ার হিজাবের উপর দিয়ে তার মাথায় চুম্বন করে।এসে শান্তি মেয়েটাকে বুকে নিয়ে। হানিয়া জাভিয়ানের বুক থেকে মাথা তুলে বলে–
—না বলে এত রাতে আসলেন কেনো?
—সারপ্রাইজ দিলাম পাখি। খুশি হয়েছো?
হানিয়া হেঁসে দিয়ে বলে–
—ভীষণ, ভীষণ,, ভীষণ খুশি হয়েছি।
হানিয়ার হাসি দেখে জাভিয়ানও হেঁসে দেয়। তারপর তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। হানিয়ার কপাল তখনও স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে একটু বেশি ছিলো। জাভিয়ান হানিয়ার শরীরের অস্বাভাবিক তাপমাত্রা দেখে তার কপালে হাত রেখে চেক করতে থাকে। হ্যাঁ,,জ্বর জ্বর ভাব। মুখ টার দিকে তাকালে ল্যাম্পপোস্টের হালকা আলোতে দেখতে পায় হানিয়ার মলিন মুখটা।
জাভিয়ান হানিয়ার দু’গালে হাত রেখে অস্থির কণ্ঠে বলে–
—জ্বর এসেছে বোধহয় তোমার। বেশি খারাপ লাগছে জান?
—সন্ধ্যায় এসেছিলো জ্বর এখন আলহামদুলিল্লাহ ঠিক আছি। চিন্তা করবেন না। বাসায় চলুন এখন।
হানিয়া জাভিয়ানের হাত টেনে নিয়ে যেতে চাইলে জাভিয়ান শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হানিয়া পেছনে তাকিয়ে বলে–
—কি হলো আসুন।
—নাহ,, তুমি চলো। ডাক্তার দেখিয়ে নিয়ে আসি।
হানিয়া জাভিয়ানকে দুই হাত দিয়ে টেনে ধরে নিয়ে যেতে যেতে বলে–
—আসুন তো পাগল লোক। সবসময় বেশি বেশি।
তারা দু’জন ভেতরে চলে যায়। তাদের দু’জনকে দূর থেকে লক্ষ্য করে রাহাত। বুকের মধ্যে অসম্ভব যন্ত্রণা হচ্ছে কিন্তু তার বাহিরটা দেখে কেউ ভেতরের খবর জানতে পারবে না। ভালোবাসলেই যে পেতে হবে এমন তো কোন কথা নেই। থাক না কিছু অপূর্ণতা। তার ভালোবাসার মানুষটা তো ভালো আছে। সেটাই অনেক।
___________
জাভিয়ান এসেছে দেখে হানিয়া রান্না বসায়। জাভিয়ান বার বার করে নিষেধ করছে এত ছুটোছুটি না করতে কিন্তু কে শুনে কার কথা। মাংশের তরকারি রান্না করে ডিপে রাখা আছে সেটাই বের করে গরম করবে আর ভাত রান্না করবে। এই টুকু করতে আর কি এমন কষ্টের।
জাভিয়ান ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে হানিয়ার রান্না অলরেডি শেষ। জাভিয়ানকে বসিয়ে নিজে তার মাথা মুছিয়ে দেয়। তারপর হাত ধুয়ে এসে নিজে খাইয়ে দিতে থাকে জাভিয়ানকে। জাভিয়ান খেয়াল করে হানিয়ার হাত কাঁপছে। সে হানিয়ার হাতটা ধরে থামিয়ে দেয়। অসহায় হয়ে বলে–
—তোমার হাত কাঁপছে হানি,,আমায় দাও। আমি খেয়ে নিচ্ছি।
হানিয়া জাভিয়ানের হাতটা ছাড়িয়ে নেয়। তারপর আরেক লোকমা বানিয়ে মুখের সামনে ধরে বলে–
—উহুম। আমার কাজ আমায় করতে দেন নাহলে শান্তি পাবো না।
জাভিয়ান আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ খেয়ে নিতে থাকে।
____________________
মাঝরাতে ভীষণ অস্বস্তির কারণে হানিয়ার ঘুমটা ভেঙে যায়। কেমন হাসফাস লাগছে। ছোট্ট একটা যুদ্ধ করার মাধ্যমে নিজেকে জাভিয়ানের বুক থেকে সরাতে সক্ষম হয়। গা গুলাচ্ছে দেখে দৌড়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। গিয়ে বেসিন ভরে বমি করে দেয়। বমি করার পর একটু ভালো লাগলেও এবার মাথা ঘুরাচ্ছে অনেক। মনে হচ্ছে মাথা ঘুরে এখনি পরে যাবে।
না পারতে অনেক কষ্টে ওয়াশরুমের দরজা খুলে জাভিয়ানকে ডাকে। জাভিয়ানের ঘুম পাতলাও না আবার গভীরও না। ২/১ বার ডাকার পর জাভিয়ানের ঘুমটা ভেঙে যায়। ওয়াশরুম থেকে হানিয়ার ডাক শুনে দৌড়ে তার কাছে যায়। হানিয়া তাঁকে বলে–
—আমায় ধরে ধরে একটু বেডের কাছে নিয়ে চলুন। মাথা ঘুরাচ্ছে আমার।
কথাটা শোনা মাত্র ঝট করে কোলে তুলে নেয় জাভিয়ান হানিয়াকে। হানিয়াকে কোলে তোলার পর জাভিয়ান অনুভব করতে পারে হানিয়ার শরীর প্রচন্ড গরম। এর মানে আবারও জ্বর এসেছে হানিয়ার। জাভিয়ান হানিয়াকে শুইয়ে দিয়ে একটা পাতলা কাথা গায়ে দিয়ে দেয়। তারপর বাকিটা সময় তার সেবাশুশ্রূষা করতে করতেই কাটিয়ে দেয়।
_____________________
মাঝরাতে যেই হানিয়ার গা কাঁপানো জ্বর এসেছিলো সে সকাল সাতটা বাজতে না বাজতেই ঘুম থেকে উঠে ব্রেকফাস্ট বানাতে দৌড়াদৌড়ি করছে। প্রায় সব হয়ে এসেছে,, শুধু রুটিটা ভেজে তারপর জাভিয়ানকে ডাক দিবে।
হানিয়া একবার রুটি বেলে তো আরেকবার তাওয়ায় রুটি ভাজতে থাকে। এমনটা করলে তাড়াতাড়ি হয় তার মতে। এরমধ্যে সে অনুভব করে একজোড়া পুরুষালী হাত তার কোমড়ের দুইপাশ দিয়ে এসে তার পেট জড়িয়ে ধরেছে। আর পুরুষ টির মুখ এসে ঠায় নিয়েছে হানিয়া ঘাড়ে। হানিয়ার চলতে থাকা হাতজোড়া থেমে যায় এমন স্পর্শে। পা টলমল করতে থাকে। রুটির চুলার আচ বন্ধ করে নিজের সম্পূর্ণ ভার পেছনের ব্যক্তিটির গায়ে ছেড়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়।
জাভিয়ান হানিয়ার ঘাড়ে তার নাক স্লাইড করতে করতে হাস্কি গলায় বলে–
—একটা কথা শুনছো না তুমি আমার। এর পরিণতি কি হতে পারে ভেবে দেখেছো?
—কি হতে পারে? মারবেন বুঝি?
—উহুম। মারবো না কিন্তু কাদাঁবো। কিন্তু কান্নাটা দুঃখের হবে না,, হবে সুখের। আর তোমার অবস্থান হবে আমার বুকের নিচে।
কথাটা হানিয়ার কর্ণকুহুরে প্রবেশ করার সাথে সাথে হানিয়ার পায়ের তলা সিরসিরিয়ে উঠে। বাম হাত দিয়ে খামচে ধরে জাভিয়ানের একটা হাত। ইদানীং জাভিয়ান যেন বেশিই বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে। না তার মুখের লাগাম থাকে আর না কাজে কর্মের। হানিয়া বলে–
—আরেকটু বাকি আছে। আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন একসাথে ব্রেকফাস্ট করবো।
—আমায় দেখিয়ে দাও কীভাবে করতে হয়। বাকিটা আমি করছি।
—রুটি বেলতে পারবেন না আপনি। এর চেয়ে…..
জাভিয়ান হানিয়ার কাঁধ কামড়ে ধরে বেশি একটা জোরে না হলেও তেমন আস্তেও ধরেনি। হানিয়া ব্যথায় “আহ” বলে উঠলে জাভিয়ান দাঁত ছেড়ে দেয়। সেই জায়গায়টায় খুচরো কিছু আদর দিতে থাকে। কিছুক্ষণ পর হানিয়াকে পাশে দাঁড় করিয়ে নিজেই বাকি কাজগুলো করতে থাকে। পারফেক্ট না হলেও তেমন খারাপও হয় না।
_________________________
সময় এখন সাঝবেলা। হানিয়া হাতে একটা রিপোর্ট নিয়ে বসে আছে স্তব্ধ হয়ে। একহাত তার পেটে। সে সেখানে বেড়ে উঠা কাউকে অনুভব করার চেষ্টা করছে। তার আর জাভিয়ানের ভালোবাসার অস্তিত্ব এই পেটটায় বেড়ে উঠছে।
গত দু’মাস পিরিয়ড মিস হওয়ায় সন্দেহ বসত পরশু প্রেগ্ন্যাসি টেস্ট করাতে দিয়েছিলো। রিপোর্টটা একটু আগে তার অফিসে দিয়ে গেছে। আজ একদিনে দু’দুটো খুশির খবর পেয়ে হানিয়া যেন কথা বলতেই ভুলে গেছে।
হানিয়ার ধ্যাণ ভাঙে তার ফোনের রিংটোনের আওয়াজে। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে জাভিয়ানের কল। হানিয়া রয়েসয়ে কলটা রিসিভ করে কানে লাগায়। অপর পাশ থেকে শুনতে পায় জাভিয়ানেট অস্থির হওয়া গলার কিছু প্রশ্ন। জাভিয়ান জিজ্ঞেস করছে–
—হানি,, এতক্ষণ লাগে ফোন রিসিভ করতে? খারাপ লাগছে? অফিস ছুটি হয়নি? আমি নিচে দাঁড়িয়ে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
হানিয়া ধীরে সুস্থে জবাব দেয়–
—একটু বিজি ছিলাম তাই রিসিভ করতে দেরি হয়েছে। খারাপ লাগছে না আমার। আর অফিস ছুটি হয়েছে, আসছি আমি।
—আচ্ছা আসো।
হানিয়া ফোনটা কেটে দেয়। সকলের থেকে আরো একবার বিদায় নিয়ে চলে আসে। জাভিয়ান হাতিয়ার হাতে কয়েকটা বুকে দেখল এগিয়ে আসে তার দিকে। নিজের হাতে সেগুলো তুলে নেয়। তারপর দু’জন এসে গাড়িতে বসে পরে। জাভিয়ান জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে হানিয়ার দিকে তাকালে হানিয়া সিটে গা এলিয়ে দিয়ে বলে–
—বাসায় যেয়ে বলছি।
জাভিয়ান আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ গাড়ি স্টার্ট দেয়। বাসায় এসে হানিয়া মাথার হিজাবটা খুলে বসে থাকে থম মেরে। হানিয়ার এমন নিস্তব্ধতা জাভিয়ানের কোন কালেই পছন্দ ছিলো না। আজও তার ব্যতিক্রম হয় না। সে হানিয়ার সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পরে। হানিয়ার একহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে–
—কি হয়েছে আমার সুখপাখি? বেশি খারাপ লাগছে? ডাক্তারের কাছে যাই না চলো।
হানিয়া চোখ তুলে জাভিয়ানের দিকে তাকায়। হানিয়ার চোখে পানি দেখে জাভিয়ানের যেন মাথা খারাপ হয়ে যায়। অস্থির হয়ে বলে–
—এই জান,, বেশি খারাপ লাগছে? কোথায় খারাপ লাগছে জান? বলো আমায়।
হানিয়া কোন জবাব দেয় না। উপরন্তু জাভিয়ানকে হালকা ধাক্কা দিয়ে নিচে বসিয়ে দেয়,,তারপর সেও জাভিয়ানের কোলে বসে তার ঘাড়ে মুখ গুঁজে কাদতে থাকে। জাভিয়ান এত প্রশ্ন করছে কিন্তু একটাও জবাব দেয় না। কিছুক্ষণ কাঁদার পর নিজেকে একটু হালকা মনে হয়। তখন জাভিয়ানের কাঁধ থেকে মুখ উঠিয়ে জাভিয়ানের দিকে তাকায়। লোকটার চোখ জোড়াও লাল হয়ে এসেছে। অল্পবিস্তর অশ্রুদের আনাগোনাও আছে।
হানিয়া জাভিয়ানের কপালে,,চোখেমুখে,, থুতনিতে এলোপাতাড়ি চুমু দিয়ে ভরে দিতে থাকে। জাভিয়ান হানিয়ার এমন কাজে থতমত খেয়ে যায়। তারপর তাঁকে ছেড়ে উঠে যেতে লাগলে জাভিয়ান তার হাত ধরে বলে–
—কোথায় যাচ্ছো আবার?
— আসছি। আপনার জন্য সারপ্রাইজ আছে।
হানিয়া হাতটা ছাড়িয়ে নেয়। তারপর তার ব্যাগ থেকে দু’টো খাম বের করে পুনরায় জাভিয়ানের কোলে এসে বসে পরে। দু’টো খাম দুই হাতে নিয়ে বলে–
—একটায় আমার অর্জন আছে আরেক টায় আপনার। কোনটা আগে দেখতে চান?
জাভিয়ান হানিয়ার এমন কথা শুনে কনফিউজড হয়ে যায় দোনামোনা মনে বলে–
—আগে তোমার অর্জনটাই দেখি।
হানিয়া বাম হাতের খামটা জাভিয়ানের হাতে তুলে দেয়। জাভিয়ান সেটা খুলে পড়তে থাকে। একটু পর ভীষণ উল্লাস নিয়ে বলে–
— কনগ্র্যাচুলেশনস হানি। আমি জানতাম তুমি পারবে। আই এম সো প্রাউড অফ ইউ জান।
কথাটা বলতে বলতে জাভিয়ান হানিয়ার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। হানিয়া তা সাদরে গ্রহণ করে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেনে হানিয়ার ঢাকায় বদলি হয়েছে। সামনের মাস থেকে সে ঢাকায় থাকবে। জাভিয়ান কিছুক্ষণ তাঁকে আদর করে বলে–
—এবার আমার অর্জনটা দেখি। কিছু না করেও কি এমন অর্জন করলাম।
হানিয়া দ্বিতীয় খাম টাও জাভিয়ানের দিকে বাড়িয়ে দেয়। জাভিয়ান সেটা খুলে পড়তে থাকে। পড়া শেষ হলে স্তব্ধ হয়ে হানিয়ার দিকে তাকায়। হুট করে চোখে হাত রেখে শব্দ করে কেঁদে দেয়। হানিয়াও তার বুকে আছড়ে পরে কাঁদতে থাকে।
বেশ কিছুক্ষণ কাঁদার পর জাভিয়ান হানিয়াকে নিজের সামনে নিয়ে এসে হানিয়ার মতো এলোপাতাড়ি আদর দিতে থাকে। আজকের মতো খুশি হয়ত সে কখনোই হয় নি। হানিয়া তাকে প্রশ্ন করে–
—আপনি খুশি তো জাভিয়ান?
জাভিয়ান শিক্ত গলায় বলে–
—আজকের মতো এত খুশি আমি আর কখনো হয়েছি বলে মনে পরে না। ধন্যবাদ জান আমার জীবনে এসে আমার জীবনটাকে এত সুন্দর করে তুলার জন্য।
জাভিয়ান হানিয়াকে কোলে তুলে বেডে শুইয়ে দেয়। তারপর তার পেটের কাছে এসে সেখান থেকে শাড়ি সরিয়ে সেখান টায়ও এলোপাতাড়ি আদর দিতে থাকে। এখানটায় যে তাদের ভালোবাসার অস্তিত্ব বেড়ে উঠছে। কত শত কথা,,পাগলামি হানিয়া যে দেখলো জাভিয়ানের। লোকটা এতটা খুশি হবে হানিয়া তা কল্পনাও করতে পারে নি।
_____________
সাত মাসের ভরা পেট নিয়ে হানিয়া ডিউটি শেষ করে অফিসের কলিগদেট থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়ে। জমজ সন্তানের জননী হতে যাওয়া হানিয়াকে বিশেষ বিবেচনায় একমাস আগেই মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়া হয়েছে। হ্যাঁ,, তাদের ঘরে আলো করে দু’টো জান আসতে চলেছে।
হানিয়ার এক মেয়ে কলিগ তাকে নিচ পর্যন্ত ছেড়ে দেয়। হানিয়া গেটের কাছে এসে দেখে তার পাগল বর এসে হাজির। হানিয়াকে দেখে জাভিয়ান তাড়াতাড়ি করে তার কাছে আসে। মেয়ে কলিগটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে হানিয়ার হাতটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে গাড়ির দিলে হাটা দেয়।
______________________
অস্থির জাভিয়ানের অস্থির আণ্ডাবাচ্চা সময়ের আগেই পৃথিবীতে ল্যান্ড করার তাড়া দিয়েছে। নয় মাসের শুরু দিকেই হানিয়ার প্রসব বেদনা উঠে। মাঝরাতে তালুকদার আর মির্জা বাড়ির সকলে এসে উপস্থিত হয়েছে ঢাকার এই প্রাইভেট হসপিটালে। সকলের মাঝে আনন্দ আর ভয় দু’টো অনুভূতিই কাজ করছে।
সকলের ভয়কে দূর করতে গলা ফাটিয়ে কেঁদে দুটো সদ্যজাত জান জানান দেয় তারা পৃথিবীতে এসে পরেছে। বাচ্চাদের কান্না শুনে সকল স্বস্তি পেলেও জাভিয়ান হানিয়ার খবর জন্য তখনও অস্থির হয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর দু’টো নার্স দু’টো তুলোর দলাকে জাভিয়ানের কাছে নিয়ে এসে বলে–
—কনগ্র্যাচুলেশনস স্যার। আপনি দুই পুত্র সন্তানের জনক হয়েছেন। বাচ্চারা আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছে। এই নিন বাবুদের। ওদের মা আপনার কোলে আর তার ভাইয়ের কোলে বাচ্চাদের সর্বপ্রথম দিতে বলেছেন।
আবরার কথাটা শুনে তাড়াতাড়ি করে পেছন থেকে সামনে এসে হাত বাড়িয়ে একটা বাবুকে কোলে নেয়। জাভিয়ান অপর বাবুটিকে কোলে নেওয়ার আগে জিজ্ঞেস করে–
—আমার বউ কেমন আছে সিস্টার? আমি কি ওর সাথে দেখা করতে পারি?
—উনিও আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছেন। আপাতত ঘুমাচ্ছেন। তাকে ক্লিন করে কেবিনে দেওয়া হবে একটু পর। উনার ঘুম ভাঙা আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে আপনার স্যার।
—আচ্ছা।
নার্সের থেকে ছেলেকে নিজের কোলে তুলে নেয়। এ যেন দ্বিতীয় জাভিয়ান তালুকদার। জাভিয়ান ছেলের কপালে চুম্বন করে। আবরারের কোলে থাকা ছেলের কপালেও দেয়। তারপর দু’জনের কানে আজান দেয়।
________________
মাত্র একজন নার্স এসে জাভিয়ানকে বলে গিয়েছে হানিয়ার ঘুম ভেঙেছে এবং সে তার সন্তানদের ও তাদের বাবাকে দেখতে চাইছে। জাভিয়ান বাবু দু’টোকে দুই কোলে নিয়ে প্রবেশ করে কেবিনে।
হানিয়া শুয়ে শুয়ে দেখতে থাকে তার ভালোবাসাদের আগমন। একজীবনে হানিয়ার আর কিছু চাওয়ার বা পাওয়ার নেই। একসময় যতটা কষ্ট সহ্য করেছিলো আজ তার থেকেও বহুগুণ সুখে সে আছে। জাভিয়ান বাবুদের হানিয়ার দুই পাশে শুইয়ে দেয়। তারপর নজর দেয় হানিয়ার দিকে। নরমাল ডেলিভারিতে দু’জন সন্তান হওয়া কম কথা না। হানিয়ার চুপসে যাওয়া মুখটায় জাভিয়ান তার দৃষ্টি স্থির করে। সময়ের ব্যবধানে মুখটা ভরিয়ে দিতে থাকে তার ভালোবাসার উষ্ণ পরশে।
বাবা-মায়ের এই ভালোবাসা সহ্য হয় না তাদের বড় পুত্রের। গলা ফাটিয়ে পুনরায় কেঁদে উঠে। তার দেখাদেখি ছোট জনও কেঁদে দেয়। জাভিয়ান হানিয়ার কাছ থেকে সরে এসে বলে–
—আসতে না আসতেই আমার অধিকারে হস্তক্ষেপ। হিংসুটে কোথাকার।
হানিয়া হেসে দেয় জাভিয়ানের কথায়। জাভিয়ানকে বলে তাদের হয়ত ক্ষুধা পেয়েছে তাই কাঁদছে। জাভিয়ান হানিয়াকে উঠিয়ে আধশোয়া করে বসায়। তারপর বাবুদের ফিডিং করাতে সাহায্য করে।
_____________________
বাবুদের জন্মের সাতদিন পর তাদের মাথা ন্যাড়া করে আকিকা করানো হয়। তাদের নাম রাখা হয় জাহান তালুকদার হামজা আর জায়িন তালুকদার হায়াত। স্বামী সন্তান নিয়ে হানিয়ার দিনকাল ভালোই কেটে যাচ্ছে।
__________________________
তিনবছর পর~
দেখতে দেখতে আরো কতগুলো বছর কেটে যায়। সময়ের পরিক্রমায় কিছু নতুন জীবনের আগমন ঘটেছে তো কিছু জীবন বিদায় নিয়েছে। হানিয়া-জাভিয়ান,, আবরার-স্পর্শ,, ইনায়া-এহসান,, আদিয়াত-আফরা সকলে দাম্পত্য জীবন সুখী আছে নিজেদের সঙ্গীদের নিয়ে।
ইনায়া আর আফরা পুনরায় কন্যা সন্তানের জননী হয়েছে। বাবুরা তিনমাসের পিঠাপিঠি। স্পর্শর কিছু ইন্টার্নাল সমস্যার কারণে সে আর মা হতে পারেনি। এক পুত্র সন্তানকে নিয়েই তারা সুখী আছে। দুষ্টু আশিয়ান বয়স বাড়ার সাথে সাথে শান্ত হয়ে যাচ্ছে। আগের থেকে অনেক কম দুষ্টমি করে।
______________
ক্লান্ত শরীর নিয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে হানিয়া। ইদানীং একটু বেশিই ক্লান্ত লাগছে তার। সন্দেহ হচ্ছে নতুন কারো আগমনের। কিট নিয়ে এসেছে সাথে করে। দেখা যাক কি হয়।
হানিয়া আসার কিছুক্ষণ পরই জাভিয়ান আসে। ছেলেদের আদর করে নিজের রুমে চলে আসে। হানিয়াকে সোফাতেই ঘুমিয়ে থাকতে দেখে মায়া হয়। মুখ চোখ দেখে অনায়াসে বুঝে যায় হানিয়ার ক্লান্তির কথা। হানিয়ার কাছে এগিয়ে এসে আস্তে করে কোলে তুলে নেয়। উদ্দেশ্য বেডে শুইয়ে দেওয়া। কিন্তু এতো আস্তে করে কোলে নেওয়ার পরও হানিয়ার ঘুম ভেঙে যায়৷ হানিয়ার ঘুম ভেঙে গিয়েছে দেখে জাভিয়ান তাকে সহ ওয়াশরুমে চলে আসে ফ্রেশ হতে।
পরেরদিন সকাল~~
জাভিয়ান অফিসের জন্য রেডি হতে হতে খেয়াল করে হানিয়া কাজ করতে করতে হাসছে। কাহিনি বুঝতে পারে না সে একটু পরে হানিয়া নিজেই থেকেই তার কাছে এসে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে কিটটা বাড়িয়ে দেয়। প্রেগ্ন্যাসি কিটে জ্বলজ্বল করতে থাকা দাগ দু’টো জানান দিচ্ছে তারা আবার প্যারেন্টস হতে চলেছে। জাভিয়ান আগেরবারের মতো এবারও ভীষণ খুশি হয়।
_______________________
নয়মাস পর~~
একটা তীক্ষ্ণ কান্নার আওয়াজে ওটির বাহিরে অপেক্ষমান সকলের কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার জোগাড়। পাশ দিয়ে যাওয়া একজন ডাক্তার বলেই বসে–
—নিশ্চিত মেয়ে বাবু হয়েছে।
ডাক্তারটির কথাই সঠিক হলো। বহুবছর পর তালুকদার বাড়িতে নতুন এক রাজকন্যার আগমন ঘটেছে। কিছুক্ষণ পর একজন নার্স একটা তোয়ালে তে করে একটা বাবু নিয়ে আসে। জাভিয়ান হানিয়ার খোঁজ নেওয়ার পর বাবুর দিকে তাকালে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। এ যেনো বৃষ্টিতে ভেজা এক স্নিগ্ধ ফুল। দুধে-আলতা গাল,,বড়বড় চোখের পাপড়ি আর রক্তিম ঠোঁট দু’টো দেখে জাভিয়ানের মন প্রশ্ন করে উঠে –
—এ কোন পরী আমার ঘরে আসলো।
একে একে সকলে বাবুকে কোলে নিয়ে আদর করে। আশিয়ানের কোলেও বাবুকে দেওয়া হলে বাবু আবার গলা ফাটিয়ে কেঁদে দেয়। আশিয়ান বিরক্ত হয়ে তাড়াতাড়ি করে বাবুল মায়ের কোলে দিয়ে দেয়। বাবুদের তার পছন্দ হলেও এই বাবু টাকে কেন যেনো তার পছন্দ হয়নি।
________
পরেরদিন হানিয়া ও বাবুকে বাসায় নিয়ে আসা হয়। জাহান আর জায়িন বোনকে পেয়ে মহাখুশি। দুই ভাইয়ের যেনো এক জান এই মেয়ে।
সাতদিন পর বাবুর নাম রাখা হয় জেসমিন তালুকদার হায়া। আকিকার অনুষ্ঠান শেষ করে সকলকে বিদায় দিয়ে জাভিয়ান রুমে এসে দেখে হানিয়া হায়া’কে ফিডিং করাচ্ছে। জাভিয়ান গায়ে ধুলোবালি থাকায় তাদের কাছে না গিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায় ফ্রেশ হতে।
শাওয়ার নিয়ে এসে দেখে মেয়ে তার খেয়েদেয়ে আবার ঘুম। হানিয়া বাবুকে শুইয়ে দিয়ে জাভিয়ানের কাছে এসে তার মাথা মুছে দেয়। মাথা মুছানো শেষ হলে জাভিয়ান হানিয়াকে কোলে তুলে বেলকনিতে এসে দোলনায় বসে হানিয়াকে নিজের কোলে বসিয়ে নেয়। পায়ের সাহায্যে আলতো দুলতে দুলতে স্নিগ্ধ,, শান্ত পরিবেশ উপভোগ করতে থাকে।
হানিয়া জাভিয়ানের দিকে ফিরে তার গালে চুম্বন করে। দাঁড়ি ওয়ালা গাল টায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে–
—ধন্যবাদ আমার জীবনে আসার জন্য। এতো ভালোবাসা দেওয়ার জন্য। আপনার তিনটে সন্তানের মা বানানোর জন্য। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ।
জাভিয়ান হানিয়ার কপালে চুম্বন করে বলে–
—আপনাকেও ধন্যবার ম্যাডাম এই পাথর বুকে ভালোবাসার ফুল ফোটানোর জন্য। আমার ঘরে আলো করার জন্য। আরেকটা সুযোগ দেওয়ার জন্য।
হানিয়া হেসে জাভিয়ানের বুকে মাথা রাখে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দুইজন বলে উঠে–
—আলহামদুলিল্লাহ আমাদের এত সুখী করার জন্য।
শব্দসংখ্যা~৪০৫৫
সমাপ্ত।