#প্রতিশোধের_অঙ্গীকার
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#Season_2
#পর্ব_০৫
ট্রেনিং চলাকালীন পুরোটা সময় আজ হানিয়া মুখ লটকিয়ে রেখেছিলো। সবসময় সবার সাথে মুখে মিষ্টি হাসি নিয়ে কথা বলা হানিয়ার এমন গোমড়ামুখ তার কলিগদের কাছে বিস্ময়ের বিষয়। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করলেও বলছে না কিছুই। রুমানাও সকাল থেকে তাঁকে ঐ হোটেল ছেড়ে আসার কারন জিজ্ঞেস করে করে মাথা খেয়ে ফেলেছে,, কিন্তু হানিয়া যেন আজ ভালো করে কারো প্রশ্নেরই জবাব দিবে না বলে ঠিক করেছে।
বিকেল পাঁচটার দিকে তাঁদের ছুটি দেওয়া হয়। আজ হানিয়া তার আরেকটা টিম মেম্বার্সদের সাথে অন্য হোটেলে যাবে। ট্রেনিংয়ে এসে এমন হোটেল চেঞ্জ করা সহজ বিষয় ছিলো না তাও সে অনেক কষ্টে ম্যানেজ করেছে। হানিয়া তার টিম মেম্বার্সদের সাথে বের হয়ে তাদের জন্য বরাদ্দকৃত মিনিভ্যানে চড়ে বসে। সকলে বেশ ফ্রি মাইন্ডের। হাসি,, মজা করেই রাস্তা পার করছে। সকলের এই হাসি মজার মধ্যে হানিয়াকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে তার এক কলিগ সোহাগ জিজ্ঞেস করে–
—কি হয়েছে হানিয়া তোমার? আজ সকাল থেকেই তোমাকে চুপচাপ দেখছি। কোন বিষয় নিয়ে চিন্তিত নাকি তুমি?
সোহাগের প্রশ্নে সকলে হাসাহাসি থামিয়ে হানিয়ার দিকে তাকায়। সকলের চোখেই জানার আগ্রহ। হানিয়া মেকি হাসি দিয়ে বলে–
—তেমন কিছু না সোহাগ ভাই। একটু ক্লান্ত লাগছে।
—উহুম। তোমার মুখ এই কথা বললেও চোখ তো বলছে আরেক কাহিনী। সেখানে পুরোটাই বিষাদময় দেখাচ্ছে। কাউকে ছেড়ে আসার কষ্ট নুইয়ে পরছে বারবার। সমস্যা না থাকলে আমাদের খুলে বলতে পারো তোমার সমস্যা গুলো। যদি আমরা কিছু পরামর্শ দিয়ে তোমার সাহায্য করতে পারি।
সকলেি সোহাগের কথায় সম্মতি দিয়ে উঠে। হানিয়া বলে–
—তেমন কিছু না। জার্নিটা আমার সাথে সুট করে না,,ক্লান্ত আমি তাই এমনটা লাগছে।
সবাই বিশ্বাস করলেও সোহাগের বিশ্বাস হয় না। সে মানুষ চিনতে ভীষণ পটু। সহজেই চোখ দেখে মানুষের মনের অবস্থা বলে দিতে পারে। হানিয়ার মন খারাপ দেখে সোহাগ প্রস্তাব দেয়–
—প্রতিদিন তো ট্রেনিং শেষে হোটেলেই ফিরে যাই,,চলো আজ একটু ঘুরাঘুরি করা যাক। সামনেই একটা পার্ক আছে ঐখানেই যাওয়া যাক। কি বলো সবাই? কাল তো ফ্রাই ডে,,তেমন ঝামেলাও হবে না।
সবাই হৈহৈ করে উঠে তার কথা শুনে। কিছুক্ষণ পর তাদের গাড়ি পার্কটার সামনে এসে পৌঁছালে তারা সবাই নেমে পরে। হানিয়া পার্কটা চিনে। কলেজ আর ভার্সিটি লাইফে এখানে তার বহুবার আসা হয়েছে। সকলে গাড়ি থেমে নেমে এদিক সেদিক হাটাহাটি করতে থাকে। কয়েকজন আবার ফাস্টফুড খেতে থাকে। তাদের সকলের থেকে ব্যতিক্রম অবস্থায় থাকে হানিয়া। একটা বেঞ্চে চুপ করে বসে থাকে সে। সোহাগ এসে তার পাশে বসে। হানিয়া তাকে দেখে সৌজন্য সূচক হাসি দেয়। সোহাগ পুনরায় আগের প্রসঙ্গ তুলে। জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে তার। হানিয়া এবারও কিছুই বলে না।
হানিয়ার বারবার এমন ইগনোর করে যাওয়ায় সোহাগ সিদ্ধান্ত নেয় আর জিজ্ঞেস করবে না। সোহাগে ভীষণ ক্ষুধা লেগেছে। পার্কের বাহিরে একটা ঝালমুড়ি ওয়ালাকে দেখে তার ঝালমুড়ি খেতে মন চায়। সে হানিয়াকে অফার করে তার সাথে ঝালমুড়ি খাওয়ার। ক্ষুধা হানিয়ারও পেয়েছে তাই সে সোহাগের অফার এক্সেপ্ট করে তার সাথে চলে আসে পার্কের বাহিরে ঝালমুড়ি ওয়ালার কাছে।
ঝালমুড়ির প্যাকেট হাতে নিয়ে খেতে খেতে তারা হাঁটতে থাকে। সোহাগ ছেলেটা অন্যকে হাসাতে ওস্তাদ। সে এমন এমন ফানি কথা বলছে যেটা শুনে হানিয়া না হেঁসে পারে না। তাদের ঝালমুড়ি খাওয়া শেষ। লাস্টের মুঠে হানিয়া একটা মরিচ খেয়ে ফেলে। মরিচ বা ঝাল জাতীয় কিছুই খেতে পারে না হানিয়া ছোট থেকেই। এলার্জি আছে তার। মরিচ মুখে পরায় হানিয়ার হঠাৎই শ্বাস কষ্ট হতে শুরু করে। সোহাগ তার এমন অবস্থা দেখে হকচকিয়ে যায়। তারা সবাই নিজেদের ব্যাগগুলো গাড়িতে রেখে গাড়ি লক করে এসেছে। সাথে শুধু পার্স আর ফোন। সোহাগ হানিয়াকে একসাইডে দাড় করিয়ে রাস্তার অপর পাশে যায় হানিয়ার জন্য পানি আর ঠান্ডা কিছু আনার জন্য।
এর মধ্যেই হঠাৎই একটা বড় মাইক্রোভ্যান এসে হানিয়ার সামনে থামে। সেখান থেকে দু’জন মেয়ে বের হয়ে হানিয়াকে টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুলে শো করে গাড়ি চালিয়ে চলে যায়। আশেপাশের পথচারীরা এসে তাদের আটকানোর আগেই গাড়িটা চলে যায়। সোহাগও রাস্তার অপর পাশ থেকে ঘটনাটা প্রত্যক্ষ করে। সে আসার আগেই যা ঘটার ঘটে গেছে।
______________________
–আশিয়ান,,এই আশিয়ান। কই তুই? আয় আমার সামনে আয়। চাপকে তোর পিঠের ছাল তুলে নিজের মনটা শান্ত করি।
একটা স্কেল হাতে ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে কথাগুলো বলছিলো স্পর্শ। স্কুল থেকে নালিশ এসেছে ছেলেটার নামে। তার এক মেয়ে ক্লাসমেটের চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলেছে। মেয়েটার দোষ শুধু এইটুকু যে মেয়েটা বসার কোন জায়গা না পেয়ে আশিয়ানের পাশে বসেছিলো,, তাই আশিয়ান এমনটা করেছে।
নিত্য নতুন দিন স্কুল থেকে এমন নালিশ আসায় স্পর্শ ত্যক্ত বিরক্ত। আজ একটা হেস্তনেস্ত করেই তবে দম নিবে সে। দো’তালা বাড়িটার সবগুলো রুমই দেখা শেষ তার। বাকি আছে এই বাড়ি আর তালুকদার বাড়ির বিশেষ মানুষটির রুম আর তার শ্বশুর শ্বাশুড়ি রুম। স্পর্শ কি মনে করে আগে শ্বশুড় শ্বাশুড়ির রুমটায় যায়। হানিয়ার জন্য বরাদ্দকৃত রুমটির দরজার হ্যান্ডেল পর্যন্ত আশিয়ানের হাত পৌছায় না কথাটা স্পর্শের মনে আছে। তাই ঐরুমের দিকে আর যায় না।
শ্বশুর শ্বাশুড়ি রুমে এসে দেখে তারা দু’জনই পাশাপাশি বসে আছে একদম রোবটের মতো। বিষয়টা বেশ সন্দেহ জনক লাগে। সে রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলে–
—আশিয়ান এখানে এসেছে?
মি. এন্ড মিসেস মির্জা আমতাআমতা করে না করে দেয়। তাদের এই আমতাআমতাই স্পর্শের মনে সন্দেহের বীজ বপন করে। সে একটু পরীক্ষা করে দেখার জন্য বলে–
—ওহহ্,,আমি ভেবেছিলাম ওর জন্য আনা চকলেট গুলো এখন দিবো। এরপরে দিলে তো রাতে আর ডিনার করতে চাইবে না। থাক,, আমিই না হয় খেয়ে ফেলবো চকলেট গুলো।
চকলেটের কথা শুনে দুষ্টু আশিয়ান দাদা-দাদীর পেছন থেকে লাফ দিয়ে বের হয়ে আসে। তারপর লাফাতে লাফাতে বলে–
—আম্মু আম্মু আমি এই যে। দাও চকলেট দাও।
–কাছো আসো সোনা বাবা দিচ্ছি।
আশিয়ান ভোলাভালা মনে মায়ের কাছে চকলেটের খাওয়ার আশায় গেলেও খায় স্কেলের বারি। ভ্যা ভ্যা করে কাঁদতে শুরু করে দেয় মায়ের খেতে মার আর ধোঁকা খেয়ে। স্পর্শ আরেকটা দেওয়ার প্রস্তুতি নিতেই মিসেস মির্জা আশিয়ানকে স্পর্শর সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে আসে। নাতিটা তার বড্ড আদরের। স্পর্শ শ্বশুড়িকে নালিশ দিয়ে বলে–
—আম্মা আপনাদের আশকারা পেয়ে আজ এমন বাদর হয়েছে। নিত্যদিন ওর স্কুল থেকে কম্পেলন আসে ওর বাদরামীর জন্য।
নাতিকে আদর করতে করতে বলে–
—একটু আকটু এই বয়সে সবাই করে। তার জন্য মারবে তুমি? এটা তে ভারি অন্যায়। আহারে আমার দাদুটা কাঁদে না।
–একটু আকটু আম্মা? আজও একজনের চুল টেনে ছিড়ে ফেলেছে। এটাকে একটু আকটু মনে হয় আপনার কাছে?
মি. এন্ড মিসেস মির্জাও এমন কথা শুনে হকচকিয়ে যায়। এইটুকুন একটা ছেলে চুল ছিঁড়ে বাড়ি ফিরেছে। মিসেস মির্জা ইশারা করে বুঝায় সে বুঝিয়ে বলবে এমনটা না করতে। স্পর্শ যেন এখন চলে যায়। স্পর্শর আর কি করার আছে। ছেলেকে তাদের রুমেই রেখে চলে যায় কিচেনে। সন্ধ্যার নাস্তা বানাতে।
_________________________
পিটপিট করে চোখ খুলে তাকায় হানিয়া। চোখের পাতায় মনে হয় হাজার টন ওজন ভাড় করে আছে। বহু কষ্টে টেনে টেনে চোখটা খুলে। মাথাটাও অসম্ভব ব্যথা আর ঝিমঝিম করছে। মাথায় একহাত চেপে ধরে শোয়া থেকে উঠে বসে। চারদিকে অন্ধকারে ঢেকে থাকায় বুঝতে পারছে না নিজের বর্তমান অবস্থাটা। কিন্তু সে যে নরম বিছানার উপর বসে আছে তা ভালো করেই টের পেয়েছে। হাতড়ে হাতড়ে বেড থেকে নিচে নামে। পা টলছে তার।
হঠাৎই তার মনে পরে সোহাগের সাথে পার্কের বাহিরে হাটার সময় দু’টো সান্ডাপান্ডা টাইপ মহিলা হানিয়াকে জোর জবরদস্তি করে গাড়িতে তুলে নেয়। গাড়িতে হানিয়া বেশ ছটফট করায় সামনের সিটে বসে এক পুরুষের নির্দেশে তাকে কিছু একটা নাকের সামনে রুমাল জাতীয় কিছু একটা ধরে। তারপর হানিয়ার আর কিছু মনে নেই। এর মানে ঐ রুমালে ক্লোরোফোম ছিলো। কিন্তু কে এমনটা করলো হানিয়ার সাথে এটাই সে বুঝে উঠতে পারছে না।
হঠাৎই বাহির থেকে কতগুলো পুরুষালী গলায় হাসির আওয়াজ পায়। হানিয়ার পিলে চমকে উঠে। লোকগুলো কারা? তারা কেন হানিয়াকে কিডন্যাপ করেছে? তারা কি হানিয়ার থেকে কোন প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এমনটা করেছে? এসব প্রশ্নই হানিয়ার মস্তিষ্কে কিলবিল করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রতিশোধের কথা ভাবতে ভাবতে হানিয়ার মনে পরে,, ঢাকায় আসার আগে সে যখন চট্টগ্রাম ছিলো তখন সে ঐখানের একটা চালের আড়তে অভিযান চালিয়েছিলো।
আড়ত মালিক কয়েক টন চাল ন্যায্য দামে বিক্রি না করে খুচরা বাজারে একপ্রকার কৃত্রিম সংকট তৈরি করছিলো। লোকটির উদ্দেশ্য ছিলো এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করার মাধ্যমে সরকারের ঠিক করে দেওয়া দামের চেয়েও কয়েকগুন বেশি দামে সে তার চাল বাজারজাত করবে। করেও ফেলেছিলো অনেকটা। কিন্তু হানিয়া অভিযান চালালে তার এসব কুকীর্তি ফাঁস হয়ে যায়।
হানিয়া তাঁকে এমন সংকট তৈরির জন্য কয়েক লাখ টাকার জরিমানা ও ছয়মাসের জন্য তার ব্যবসায়ের লাইসেন্স ক্যান্সেল করে দেয়। লোকটি হানিয়াকে ঘুষের অফার করলে হানিয়া তাঁকে “বাংলাদেশ দণ্ডবিধি,১৮৬০(ধারা ১৬১,১৬৫,১৬৫(A))” অনুযায়ী তিনমাসের কারাদণ্ড এবং পুনরায় অর্থদণ্ড দেয়। লোকটাকে যখন পুলিশ গাড়িতে ওঠাচ্ছিল তখন লোকটা হানিয়াকে হুমকি দিয়ে বলেছিলো–
—এর পরিণাম কতটা ভয়াবহ হবে সেটা আপনি চিন্তাও করতো পারছেন না ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবা। আমি না হয় জেলে থাকবো,,বাহিরে আমার ছেলেরা কিন্তু আপনাকে এত সহজে ছেড়ে দিবে না।
হানিয়া তখন তার কথা এতোটা গায়ে লাগায় নি। এই পেশায় মাঝে মধ্যে এমন হুমকি ধামকি সাধারণ বিষয়। তাহলে কি সেই লোকই হানিয়াকে কিডন্যাপ করিয়েছে? তাদের উদ্দেশ্য কি হানিয়ার বড় কোন ক্ষতি করা? প্রশ্নটা মাথায় আসতেই হানিয়ার পুরো শরীর হিম ধরে যায়। হানিয়া ভাবাভাবি বাদ দিয়ে তাড়াতাড়ি করে রুমের লাইটের সুইচ খুঁজতে থাকে। কিছুক্ষণ খোঁজার পর পেয়েও যায়। তাড়াতাড়ি লাইট জ্বালিয়ে পুরো রুমটায় একবার চোখ বুলায়। বেশ সুন্দর আর পরিপাটি করা একটা রুমে তাঁকে রাখা হয়েছিল।
আভিজাত্যপূর্ণ রুমটা দেখে হানিয়ার মাথায় আবার একটা প্রশ্ন আসে–
—প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য যারা কিডন্যাপ করে তারা ভিক্টিমদের এতো সুন্দর রুমে রাখে? মুভিতে তো দেখেছি কেমন বিশ্রী সব জায়গায় রাখা হয় ভিক্টিমদের। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র।
দরজা খোলার আওয়াজে হানিয়ার আত্মা শরীর ছেড়ে বের হয়ে আসতে চায়। কি করে নিজেকে বাঁচাবে ভাবতে ভাবতে চোখ যায় একটা ফ্লাওয়ার ভাসের দিকে। তেমন ভারী বা আত্নরক্ষার জন্য যথেষ্ট না হলেও ফ্লাওয়ার ভাস’টা হাতে তুলে নেয়। তারপর দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরে।
লোকটি দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলে হানিয়া পেছন থেকে লোকটার মাথায় বারি দেয়৷ লোকটা ব্যথায় মাথার পেছনটা চেপে ধরে নিচে বসে পরে। হানিয়া ফ্লাওয়ার ভাস’টা হাতে নিয়েই দৌড়ে রুম থেকে বের হয়ে আসে। কিন্তু ড্রয়িংরুমে এসে বসে থাকা কয়েকজনকে দেখে হানিয়ার চোখ রসগোল্লার মতো বড়বড় হয়ে যায়। হাত থেকে ফ্লাওয়ার ভাস’টাও পরে যায়।
শব্দসংখ্যা~১৫০০
চলবে??
#প্রতিশোধের_অঙ্গীকার
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#Season_2
#পর্ব_০৬
ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে হানিয়া। আবরারের চোখেও অল্প বিস্তর পানির উপস্থিতি আছে। রাশেদ আর জাভিয়ান নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে আজ। রাশেদ তার মাথার পেছনে আলু হয়ে যাওয়া জায়গায় বরফ ডলতে ডলতে ভাই বোনের এই মিলন দেখছে। জাভিয়ানের কাছে শুরুতে বিষয়টা খুশির কারণ হলেও সময় গড়ানোর সাথে সাথে তার মেজাজও ভালোর দিক থেকে খারাপের দিকে গড়াচ্ছে।
এক ঘন্টা হতে চললো হানিয়া কাঁদছে আবরারকে ধরে। এত কান্না করলে পরবর্তীতে শরীর খারাপ করবে না? এছাড়া হানিয়ার চোখের পানি তার সহ্য হয় না এখন। চাই সেটা সুখের হোক বা দুঃখের। জাভিয়ান না পারতে বলেই দেয়–
—এখন একটু থামো। আর কত কাঁদবে? পরে শরীর খারাপ করবে তো।
হানিয়া কি জাভিয়ানের কথা শোনার মানুষ। সে তার মতো নাক টানতে টানতে কাঁদা চালিয়ে যায়। জাভিয়ান আবরারের দিকে অসহায় চোখে তাকালে আবরার বুঝতে পারে জাভিয়ানের তাকানোর মানে। তাই সে হানিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে–
—আর কাঁদে না বনু। কান্না থামা।
হানিয়া নাক টানতে টানতে বলে–
—থামছে না তো।
হানিয়ার এমন বাচ্চামো কথায় রাশেদ একটু শব্দ করে হেঁসে দেয়। জাভিয়ানেরও হাসি পেয়েছিলো কিন্তু অনেক কষ্টে চেপে যায়। আবরারও এতবড় বোনের এমন বাচ্চামো দেখে হেঁসে দেয়। হানিয়ার মাথায় কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে তাঁকে শান্ত করে।
হানিয়া শান্ত হলে আবরার জাভিয়ানকে কিছু একটা দেওয়ার ইশারা করে। জাভিয়ান তার দিকে একটা পেপার বের করে আবরারের দিকে বাড়িয়ে দেয়। আবরার পেপারটা একহাতে মেলে আরেক হাত দিয়ে হানিয়ার একটা হাত চেপে ধরে বলে–
—এখন যা বলবো তা শান্ত হয়ে শুনবি।
হানিয়া মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়। আবরার পেপারটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে–
—দেখ তো এই পেপারে সাইনটা তোর নাকি?
হানিয়া পেপারটা নিজের হাতে তুলে নেয় তারপর সাইন করা জায়গাটা দেখে। হ্যাঁ এটা তারই সাইন। ডেট ঐদিনের যেদিন জাভিয়ান-সোহার বিয়ে ছিলো। তারপর পুরো পেপারটায় একবার চোখ বুলায়। পেপারটা পড়ার পর তার চোখ বড়বড় আকার ধারণ করে। হানিয়া আবরারকে অনেক উত্তেজিত হয়ে বলে–
—ভাই সাইনটা তো আমার কিন্তু আমি আমার সজ্ঞানে এমন কোন কন্ট্রাক্ট পেপারে সাইন করি নি। তাহলে কি আমার সাইন কোনভাবে নকল করা হয়েছে?
—নাহ বোন এটা তোরই সাইন এবং তুইই এই পেপারে নিজে সাইন করেছিস।
—কিন্তু কবে সম্ভব ভাই? আমার তো এমন কোন পেপারে সাইনের কথা মনে পরছে না।
—বিষয়টা আমি তোকে ক্লিয়ার করছি। যেদিন জাভিয়ানের সোহার সাথে বিয়ে ছিলো সেদিন সেন্টারের বাগানে জাভিয়ান তোকে একটা পেপার সাইন করিয়ে ছিলো না?
—হ্যাঁ। কিন্তু ওটা তো আমাদের ডিভোর্স পেপার ছিলো।
—নাহ্। ওটা ডিভোর্স পেপার না বরং এই কন্ট্রাক্ট পেপারটা ছিলো। ডিভোর্সের নাম করে জাভিয়ান তোকে এই পেপারে সাইন করিয়ে ছিলো।
হানিয়া হতভম্ব হয়ে যায় আবরারের কথা শুনে। ঐদিনে সাইন করা পেপারটা যদি ডিভোর্সের না হয় তার মানে দাঁড়ায় সে আর জাভিয়ান এখনো হাসবেন্ড ওয়াইফ। তাদের ডিভোর্স হয়নি। জাভিয়ান তাহলে কাল সত্যই বলছিলো।
কিন্তু এমন দুই নাম্বারি কাজ করার কারণটা কি? হানিয়া প্রশ্নটা নিজের মধ্যে চেপে না রেখে করেই ফেলে। সে আবরারকে জিজ্ঞেস করে–
—আর কি কারণে তোমার আদরের শালা এমন দুই নাম্বারি কাজটা করলো? যেখানে সে সবার সামনে আমায় ডিভোর্স দেওয়ার কথা বলেছিলো। নাকি তার ঘরে একজন আর বাহিরে একজন রাখার উদ্দেশ্য ছিলো?
হানিয়ার শেষ কথায় জাভিয়ানের পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যায়। জাভিয়ানকে আর কত নিচে নামাবে এই মেয়ে? অতীতের ভুলের মাশুল কি তার দেওয়া শেষ হবে না এই জীবনে আর? আবরার আর রাশেদেরও হানিয়ার কথাটা পছন্দ হয় না। আবরার হানিয়ার কথায় বিরক্ত হয়ে বলে–
—তুই বরাবর বেশি বুঝিস বলে আজ তোর আর জাভিয়ানের জীবন থেকে পাঁচটা বছর নষ্ট হয়ে গেছে। সেদিন যদি অনুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতি আজ তোদের একটা সুন্দর গোছানো সংসার থাকত।
—কি বেশি বুঝি আমি? যা বুঝি ঠিকই বুঝি। আর অপেক্ষা করতে বললে এমন একটা ঘটনার দেখার জন্য যেটা কোন স্ত্রীর পক্ষেই মেনে নেওয়া সম্ভব হতো না। আমার স্বামী আমায় ডিভোর্স দিয়ে আরেকজনকে বিয়ে করছিলো, এটা দেখার জন্য আমায় অপেক্ষা করতে বললে তুমি আমায়? সে না হয় আমায় ভালোবাসে নি,,কিন্তু তুমি জানতে না আমি তাঁকে ভালোবেসেছিলাম। তুমি জানতে না আমার তাঁকে ছেড়ে আসার পর আমার মেন্টাল হেলথ কেমন হয়ে গিয়েছিলো? আমি সুইসাইড করেছিলাম কেন জানতে না? আব্বু-আম্মুর ঐসব কথা যতটা আমায় প্রভাবিত করেছিলো সুইসাইড করতে, তাকে ছেড়ে আসাও ঠিক সমান ভাবে প্রভাবিত করেছিলো। এসবই তুমি জানতে। তাহলে তুমি কীভাবে বললে আমায় অপেক্ষা করতে পুরো অনুষ্ঠান শেষ পর্যন্ত দেখার জন্য? তুমি পারতে এমনটা করতে নিজের ভালোবাসার মানুষের সময়?
হানিয়া বসা থেকে দাঁড়িয়ে গিয়ে অনেকটা জোরে জোরেই কথাগুলো বলে। বেশ উত্তেজিত হয়ে পরেছে সে। জাভিয়ান এক ধ্যানে হানিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। সে জানতো না ঐ সময়ে হানিয়া এমন ট্রমার মধ্য দিয়ে গেছে যে। এতটা ভালোবাসে হানিয়া তাকে সে কখনো কল্পনাই করতে পারে নি।
আবরার হানিয়ার হাত ধরে তাঁকে বসানোর চেষ্টা করে। হানিয়া এক প্রকার ফুঁসছে। আবরার তাকে শান্ত করার জন্য বলে–
—না পারতাম না আমি। এবার একটু শান্ত হয়ে বস।শুন আমার পুরো কথাটা।
হানিয়া আবরারের হাত ছাড়িয়ে দিতে দিত বলে–
—কোন কথা শুনতে চাই না। তুমি তোমার শালার হয়ে ওকালতি করতে এসেছো,, তাই না? আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না। আমাদের ডিভোর্স হয়নি বলে আমি এখন ঢ্যাং ঢ্যাং করে তার সাথে সংসার করতে চলে যাবো? সে যখন আমার একার ছিলো তখনই আমার ভাগ্যে সংসার জুটেনি,,এখন তো আবার ভাগীদার আছে। আমি মরে যাবো তাও সতীনের সংসার করবো না। আমায় যেতে দাও এখান থেকে। তাঁকে তার মতো সংসার করতে বলো,,আমায় আমার মতো বাঁচতে দাও।
—আর যদি বলি তোর সংসারে তুই ব্যতীত আর কোন ভাগীদার নেই? তাহলে তো করবি?
—মানে? সোহা ওর স্বামী-সংসার ছেড়ে কই গেছে? সোহার সাথেও ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে উনার? মি.তালুকদারের মা যেতে দিলো তার বাড়ির আর তার ছেলের যোগ্য বউকে?
—যে কখনো ছিলোই না সে আবার ছেড়ে যাবে কিভাবে? তোর স্বামী,,তোর সংসার তোরই আছে। সেখানে আজ পর্যন্ত কেউ ভাগ বসাতে পারে নি।
—মানে কি? একটু খোলাসা করে বলো।
আবরারের এবার রাগ হয়। বলতেই তো চেয়েছিলো,, কিন্তু নিজেই তো চিল্লাচিল্লি করে বিষয়টা জটিল করে ফেলেছে। আবরার রাগী গলায় বলে–
—খোলাসা করেই তো বলতে চেয়েছিলাম,,তুই দিচ্ছিস বলতে? পুরো কথা না শুনে তো লাফানো তোর অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাচ্ছে হানিয়া।
হানিয়া আবরারের কথা শুনে বাঁকা চোখে তাকায়। লাফালো কই সে? আজব তো!
আবরার তাঁকে ধমক দিয়ে বলে–
—বস এখানে। আমার পুরো কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত একটা কথা বলবি না।
হানিয়া ধমক খেয়ে চুপচাপ বসে পরে। এই পুরোটা সময় রাশেদ আর জাভিয়ান চুপ করে থাকে। আবরার হানিয়াকে সেদিন ঘটে যাওয়া সব ঘটনা খুলে বলে। কিভাবে সোহা মিসেস তালুকদারের ব্রেন ওয়াশ করে বিয়েটা করছিলো আর জাভিয়ানের ডিভোর্স পেপার নাম দিয়ে এই কন্ট্রাক্ট পেপারে সাইন করানো,, সবটা বলে সে হানিয়াকে।
(যারা সোহার ঘটনা জানেন না তারা সিজন ওয়ানের লাস্ট পর্বটা পড়ে নিয়েন। নাহলে এই পর্বের অধিকাংশ কথাই বুঝতে পারবেন না)
সবটা শুনে হানিয়া থম মেরে বসে থাকে নিচের দিকে তাকিয়ে। আবারো তার সাথে ধোঁকা হয়েছে। ধোঁকা দেওয়া ব্যক্তিটি আগের জনই। এই লোকটা আর কত ধোকা এবং কষ্ট দিবে হানিয়াকে? হানিয়াকে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা বুঝানোর জন্য ফেইক ডিভোর্সের নাটক করা। কেন আগের দেওয়া যন্ত্রণা,, কষ্ট গুলো বুঝি কম হয়েছিলো?
আবরার হানিয়াকে বলে–
—জাভিয়ান তোকে বুঝাতে চেয়েছিলো ডিভোর্স দিবো কথাটা বলা যতটা সহজ দিয়ে দেওয়া ততটা সহজ না। আর বিষয়টা তোর জন্য সারপ্রাইজ হিসেবে রাখতে চেয়েছিলো,,কিন্তু তার আগেই তুই আমাদের সকলকে সারপ্রাইজ দিয়ে হারিয়ে গেলি এতগুলো বছরের জন্য। দোষটা যেমন জাভিয়ানের তেমনি তোরও। যে সময়টা চলে গেছে সেটা তো আর ফেরানো যাবে না,,কিন্তু একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ আর সংসার তোদের জন্য অপেক্ষা করছে। আমি বলবো,,যা হয়েছে ভুলে গিয়েছে তোরা নতুন করে সবটা শুরু কর। এই কয়েক বছরে জাভিয়ান কিন্তু কম সাফার করেনি তোর জন্য।
হানিয়া হাটুর উপর দু’হাতের কনুই রেখে তাতে মাথা ঠেকিয়ে বসেছিলো। সে অবস্থাতেই একদম শান্ত গলায় বলে–
—আর আমার সাফার করার কি হবে? আমি যে তার সাথে বিয়ে হওয়ার পরের দিন থেকে আজ পর্যন্ত সাফার করছি। তার একটা সিলি কাজের জন্য আমি এই কয়েকবছর মরণ যন্ত্রণা ভোগ করেছি তার কি হবে? নিজের পরিবার আপনজনের কাছ থেকে দূরে থেকেছি শুধুমাত্র তাঁকে অন্যের সাথে সংসার করতে দেখতে পারবো না বলে,,এর কি হবে?
উপস্থিত তিনজন পুরুষের মধ্যে কেউ হানিয়ার প্রশ্নের জবাব দিতে পারে না। আবরার হানিয়াকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলে–
—আমি বললাম তো যেই সময়টা চলে গেছে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব না। কিন্তু তোরা নতুন করে সবটা শুরু করতে পারিস।
হানিয়া মাথা তুলে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে–
–তোমার কি মনে হয় সবটা এতোটা সোজা? আমি ভুলতে পারবো সব এত সহজে?
—ভুলতে পারা সহজ নয়। কিন্তু চেষ্টা তো করতে পারিস। আর সবচেয়ে বড় কথা তোরা এখনো দুইজন দুইজনকে পাগলের মতো ভালোবাসিস। নাকি ভালোবাসিস না জাভিয়ানকে এখন আর? তাই সংসার করতে চাইছিস না? নতুন কেউ এসেছে তোর জীবনে?
হানিয়া কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে থাকে।আসলে সে থমকে গেছে প্রশ্নটা শুনে। ভালোবাসে না আবার কেমন প্রশ্ন? জাভিয়ানকে ভালোবেসেই তো হানিয়া দিনদুনিয়ার সব ছেড়ে নিজেকে নিজেই নির্বাসন দিয়েছে। এতকিছুর পরও তাকে নাকি বলা লাগবে সে জাভিয়ানকে ভালোবাসে কি না।
আবরারের প্রশ্নে হানিয়া নিস্তব্ধতা জাভিয়ানের মনকে ক্ষতবিক্ষত করছে। তাহলে কি সত্যিই হানিয়া জাভিয়ানকে আর ভালোবাসে না? নতুন কেউ এসেছে হানিয়ার জীবনে?
আবরার আবার প্রশ্ন করে–
—জবাব দিচ্ছিস না কেন? বল ভালোবাসিস কি না জাভিয়ানকে?
হানিয়া নিজের এলোমেলো অনুভূতি গুছিয়ে উপস্থাপন করতে পারছে না। কোথাও একটা থামিয়ে দিচ্ছে তাকে বারবার। এদিকে জাভিয়ান ধরেই নেয় হানিয়া জাভিয়ানকে আর ভালোবাসে না। হানিয়ার নিস্তব্ধতা তাকে মরণ যন্ত্রণা দিচ্ছে। এতদিন হানিয়ার ফিরে আসার অপেক্ষায় সে বেঁচে ছিলো। ভেবেছিলো হানিয়াকে খুঁজে পেলে তাকে সবটা বুঝিয়ে পুনরায় নিজের জীবনে নিয়ে আসবে। কিন্তু আজ যেন সব অপেক্ষার অবসান ঘটে। ভালোবাসা বিহীন সংসার একটা গোরস্তানের মতো। সেখানে মানুষ তো থাকে কিন্তু তাদের অনুভূতি থাকে না। সে তো এমন সংসার চায় না। তাই সে তৎক্ষনাৎ একটা সিদ্ধান্ত নেয়।
জাভিয়ান বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। তারপর দৌড়ে সেই রুমটায় চলে যায়,,যেই রুমটায় কিছুক্ষণ আগে হানিয়াকে রাখা হয়েছিলো। সেই রুমটায় গিয়ে দরজা লক করে দেয়। রাশেদও তার পেছন পেছন ছুট লাগায় কিন্তু সে রুমে ঢোকার আগেই জাভিয়ান দরজা লাগিয়ে দেয়।
আবরার আর হানিয়াও জাভিয়ানের এমন কাণ্ডে কিছুটা ভরকে যায়। রাশেদ দরজায় নক করতে করতে বলে–
—স্যার কি হলো? এভাবে উঠে এলেন কেনো? আর দরজাই বা লক করলেন কেনো? স্যার দরজা খুলুন।
জাভিয়ান নিজেকে আঘাত করার জন্য কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে বলে–
—তুই চলে যা রাশেদ। আমায় একা ছেড়ে দে,,একদম একা।
—হ্যাঁ ছেড়ে দিবো একা। কিন্তু তার আগে দরজাটা খুলুন।
—না আমি খুলবো না। আমায় হানিয়া আর ভালোবাসে না রে,, ওর জন্য আমি এতবছর বেচে ছিলাম আজ ওকে পেয়েও পেলাম না। ও আমার নেই আর। আমার হানি,,আমার বধূয়া আমার নেই আর। ওকে ছাড়া আমি কিভাবে বাঁচবো? বল তুই। আমার বেচে থাকার সব কারণ আজ শেষ। ওকে বলে দিস ও মুক্ত। এই জাভিয়ান তালুকদারের ছায়া আর ওর উপর পরবে না কোনদিন। ওকে মুক্তি দিয়ে চলে যাচ্ছি আমি।
রাশেদ জাভিয়ানের কথা শুনে ঘাবড়ে যায়। জাভিয়ানের এলোমেলো আর উন্মাদের মতো বলা কথাগুলো তার মনে ভয় ঢুকিয়ে দেয়। সে জোরে জোরে দরজায় বারি দিতে দিতে বলে,–
—স্যার উল্টা পাল্টা কিছু করার কথা ভুলেও চিন্তা করবেন না।
জাভিয়ান উন্মাদের মতো হাসতে হাসতে বলে–
—উল্টাপাল্টা কিছু করবে না তো। শুধু সকলকে মুক্তি দিয়ে নিজেও মুক্তি নিবো এতো সব যন্ত্রণা থেকে।
এতক্ষণে আবরার আর হানিয়াও বন্ধ দরজার সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে। রাশেদ আবরারকে দেখে বলে–
—ভাইয়া স্যার বোধহয় আবার উল্টাপাল্টা কিছু করার চিন্তা করছে। আমাদের উচিত হবে দরজাটা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করা।
হানিয়ার পিলে চমকে যায় রাশেদের কথা শুনে। জাভিয়ান আবার উল্টাপাল্টা কিছু করবে মানে?
হানিয়া রাশেদকে জিজ্ঞেস করে–
—আবার বললেন কেন ভাইয়া? সে কি এর আগেও কিছু করেছে?
রাশেদ হানিয়ার দিকে ফিরে বলে–
—হ্যাঁ ম্যাম। আপনি চলে যাওয়ার পর স্যার একপ্রকার উন্মাদ হয়ে পরেছিলো। বেশ কয়েকবার সুইসাইড করার ট্রাই করে। একবার তো অবস্থা অনেক খারাপ হয়ে গিয়েছিলো,,আইসিউই তে ১০ দিন রাখতে হয়েছিলো। তার মেন্টাল অবস্থা অনেক খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। তার পাগলামি এতটাই বেড়ে গিয়েছিলো যে ডাক্তারটা তাঁকে মেন্টাল অ্যাসাইলামে দেওয়ার কথা বলেছিলো। কিন্তু বড় স্যার বাসায় রেখেই তার ট্রিটমেন্ট করায়। এখনো তার ঔষধ নেওয়া লাগে নিয়মিত।
রাশেদের থেকে এসব জেনে হানিয়া স্তব্ধ হয়ে যায়। আবরার কয়েকবার জাভিয়ানকে ডাকে কিন্তু এবার জাভিয়ান কোন সাড়াশব্দ করে না। হঠাৎই রুম টার ভেতরে পুরো শান্ত নিস্তব্ধ হয়ে যায়। বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজনই ভয় পেয়ে যায়। আবরার আর রাশেদ তাড়াতাড়ি করে কাঁধ দিয়ে ধাক্কা দিয়ে দরজা ভাঙতে থাকে।
অনেক চেষ্টার পর তারা দরজাটা ভাঙতে সক্ষম হয়। রুমের ভেতরে প্রবেশ করে তাদের তিনজনের আত্মা উড়ে যাওয়ার জোগার হয়। হানিয়া চিৎকার দিয়ে বলে উঠে–
—জাভিয়ানননননন…….
শব্দসংখ্যা~১৮৯৫
~~চলবে?