#প্রতিশোধের_অঙ্গীকার
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#Season_2
#পর্ব_৮
মির্জা বাড়িতে আজ চাঁদের হাট বসেছে। সোনিয়া এসেছে তার স্বামী-সন্তানসহ। তিন বছরের আমায়াকে দেখতে একদম তার খালামনি মানে হানিয়ার মতো লাগে। তালুকদার বাড়ি থেকে মি.এন্ড মিসেস তালুকদার,, কুলসুম ও রোজি বেগম-আদিব মাহবুব এসেছেন। এছাড়া ইনায়া-এহসান এবং তাদের প্রায় পাঁচ বছর বয়সের পুত্র সায়ান ও দুই বছরের মেয়ে সায়না আর আদিয়াত তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এসেছে। আদিয়াত এক ছেলের জনক,,যার নাম আফিফ এবং সে আশিয়ানের বয়সী।
বাবার মতো স্বল্প ভাষী আফিফই শুধু এক জায়গায় বসে আছে ভালো বাচ্চার মতো। আর বাকি বিচ্ছুগুলো বাড়ির মধ্যে ঝড় তুলে ফেলেছে। সকলের বড় সায়ান তাদের থামাবে কি সেও তাদের সাথে ঝড় তুলে ফেলছে। আর এই বিচ্ছু বাহিনীর নেতৃত্বে আছে আবরারের একমাত্র গুণধর পুত্র আশিয়ান। জুম্মার নামাজ পড়েই তারা সকলে এসে পরেছে এ বাড়িতে। গতকাল রাতে আবরার সকলকে একপ্রকার হুমকি দিয়ে বলেছে আজ আসতে। আর লাঞ্চটাও তাদের বাসায় করবে সবাই। কারণ জিজ্ঞেস করা হলে সে বলে একটা সারপ্রাইজ আছে তাদের জন্য।
এসে থেকে সবাই আবরারকে সারপ্রাইজের কথা জিজ্ঞেস করতে করতে পাগল করে ফেলেছে কিন্তু আবরার মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছে। সকলের প্রশ্নে অতিষ্ট হয়ে আবরার একসাইডে গিয়ে ফোন লাগায় জাভিয়ানকে। জাভিয়ান তখন জুম্মার নামাজ পড়ে বাসায় আসলে দেখতে পায় হানিয়ার জন্য অনলাইনে অর্ডার করা ড্রেসগুলো এসে পরেছে। সেগুলোই নিয়েই একেবারে বাসায় ফিরছে। লিফট থেকে বের হয়েছে তখনই আবরার তাকে ফোন দেয়। জাভিয়ান ফোন রিসিভ করলে,, সালাম বিনিময় শেষ করার পর আবরার তাকে জিজ্ঞেস করে–
—তোমরা কোথায়? সবাই এসে পরেছে? আমার মাথা খেয়ে ফেলছে প্রশ্ন করতে করতে।
—ভাই আর আধাঘন্টা অপেক্ষা করেন আমরা আসছি।
—তাড়াতাড়ি আসো। রাখছি।
—আল্লাহ হাফেজ।
জাভিয়ান কল কেটে কলিংবেলে বাজায়। কিছুক্ষণ পর হানিয়া এসে খুলে দেয়। জাভিয়ান তড়িঘড়ি করে ভেতরে প্রবেশ করে দরজাটা লাগিয়ে হানিয়াকে নিজের কাছে টেনে আনে। তারপর কপালের মধ্যিখানে নিজের ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দেয়। ওষ্ঠের স্পর্শ সেখানে স্থায়ী হয় বেশকিছুটা সময়। হানিয়াও সাদরে তা গ্রহণ করে। কিছুক্ষণ পর জাভিয়ান সরে এসে ব্যাগ গুলো এগিয়ে দিয়ে বলে–
—এখানে কিছু ড্রেস আছে। সালওয়ার সুট,, শাড়ি,, বোরকা সব আছে। তোমার যেটা পছন্দ হয় সেটা পরো।
হানিয়া জাভিয়ানের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখে কম করে হলও ৫/৬ টা শপিংব্যাগ। হানিয়া ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে না খুলেই বলে–
—আপনিই বলেন কি পরবো?
জাভিয়ান আলতো হেঁসে বলে–
—তোমার যেটা ইচ্ছে।
—উঁহুম,,আপনি বলেন কোনটা পরবো? শাড়ি নাকি সালওয়ার সুট?
জাভিয়ান গালে হাত দিয়ে সোফার দিকে যেতে যেতে বলে–
—তুমি যখন শাড়ি পরো তখন আমার মাথায় নেশা চড়ে যায়। তার উপর আচঁলটা কাঁধে তুলে যখন কথা বা কাজ করো তখন তোমার উন্মুক্ত কোমড় দেখে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়। নিজেকে কন্ট্রোল করা বড্ড দায় হয়ে পরে। (সোফায় ধপ করে বসে,, নিজের মাথা দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে ডানে বায়ে ঝাঁকি দিয়ে বলে) নাহ বাবাহ্ নিজের জন্য নিজে কুয়ো খুঁড়তে চাই না। একটা ইমপোর্টেন্ট কাজে যাবো,,সেখানে যদি তোমার মোহনীয় রূপ দেখে আমি কন্ট্রোললেস হয়ে পরি? এর চেয়ে ভালো হয় সালওয়ার সুট পরো,,তার উপরে বোরকা পরবে। ঠিক আছে? নাকি তোমার সমস্যা হবে?
হানিয়া চোখ ছোট ছোট করে জাভিয়ানের এত বড় বর্ণনা শুনছিলো। না লোকটার মাথায় যে সমস্যা হয়ে গেছে এটা সিউর। আগের জাভিয়ান কখনোই এত কথা বলত না। যার ভালোর জন্য,, সুখের জন্য হানিয়া নিজের সব ত্যাগ করলো সেই এখন উন্মাদ। তাও কিনা হানিয়ার জন্য? হানিয়ার ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসতে চায়। জাভিয়ান তার থেকে উত্তর জানার জন্য অধির আগ্রহে চেয়ে আছে দেখে হানিয়া তার দিকে এগিয়ে যায়। জাভিয়ানের একদম কাছে গিয়ে হুট করে তার মুখের দিকে ঝুকে এসে নাকের ডগায় আলতো করে কামড় দিয়ে হাসতে হাসতে বলে–
—কোন সমস্যা নেই জনাব। আমি সব কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারি। আপনি ওয়েট করেন আমি আসছি রেডি হয়ে।
হানিয়া কথাটা বলে হেলতে দুলতে চলে যায় রুমে। জাভিয়ান নিজের নাকের ডগায় হাত দিয়ে হা করে তাকিয়ে আছে। সে এত আদর,,ভালোবাসা কিছুরই আশা করেনি। ভেবেছিলো হানিয়াকে খুজে পেলে তাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। পোড়ায়নি এমন না,,কিন্তু তার ধারণার চেয়ে বেশ কম। কাল থেকে সে অনুধাবন করতে পারছে হানিয়া তাঁকে ভীষণ ভালোবাসে। এতোটা ভালোবাসা হয়ত জাভিয়ানও বাসতে পারেনি হানিয়াকে। কিন্তু আর না,,সেও তার কাজ-কর্মে,,আদর যত্নে,,স্নেহ দিয়ে হানিয়াকে আগলে রাখবে। সেও হানিয়াকে হানিয়ার মতোই ভালোবাসবে। এতো বছরের কমতি হয়ত পূরণ করা যাবে না,, কিন্তু বাকিটা জীবনে এতোটা ভালোবাসবে যাতে সে এই কয়েক বছরের দুঃখ,, কষ্ট ভুলে যায়। নিজের কাছে নিজেই ওয়াদা করে জাভিয়ান।
_________________________
জাভিয়ানদের গাড়ি মির্জা বাড়ির সমানে এসে থামে। জাভিয়ান ঘাড় ঘুড়িয়ে তার বুকে শুয়ে থাকা হানিয়ার দিকে তাকায়। বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পরেছে। জাভিয়ানের খারাপ লাগছে তাঁকে ডাকতে,, কিন্তু কিছু করার নেই। অনেকগুলো মানুষ তাঁদের জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে যে।
জাভিয়ান হানিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ডেকে উঠে–
—হানি,, উঠো বউ। এসে পরেছি আমরা।
হানিয়া পিটপিট করে চোখ খুলে তাকায়। রাস্তায় ভীষণ জ্যাম থাকায় সে ঘুমিয়ে পরেছিলো। কাঁচা ঘুম থেকে উঠার কারণে তার মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গেছে,, সাথে চোখও লাল হয়ে আছে। হানিয়া মাথা তুলে আশেপাশে তাকালে চিনতে পারে না কিছুই। জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে–
—আমরা কোথায় এসেছি জাভিয়ান?
জাভিয়ান হানিয়ার হিজাব ঠিক করে দিতে দিতে বলে–
—তোমার বাপের বাড়ি আর আমার শ্বশুড় বাড়ি।
হানিয়া বুঝতে পারে না তার কথা। এটা তো তাদের বাসা না। সে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে থাকে। জাভিয়ান তার কৌতূহল বুঝতে পেরে বলে–
—তোমার পরিবার এখানে সিফট করেছে আর এই বাড়িটা আবরার ভাই বানিয়েছে। তুমি চলে যাওয়ার বছর দুয়েক পর সে চাকরিটা ছেড়ে বিজনেস স্টার্ট করে। বছর ঘুরতেই না ঘুরতেই বিজনেসে লাভ দেখা দেয়। দেড় বছর আগে তারা এখানে সিফট করেছে। আর আজ আমরা সবার সাথে দেখা করতে এসেছি। আমাদের দুই পরিবার,, তোমার ক্লোজ ফ্রেন্ডরাও এসেছে।
ভাইয়ের সাফল্যের কথা শুনে হানিয়া মনটা খুশিতে নেচে উঠে। কিন্তু সকলের সাথে দেখা করার কথায় তার মুখটা কালো হয়ে যায়। কিচ্ছু ভুলেনি সে। আদৌও ভুলতে পারবে কিনা জানা নেই। জীবনের কঠিন সময়গুলোতে যাদের সবচেয়ে বেশি জরুরি ছিলো তারাই হানিয়াকে মৃত্যুর উপায় বলে দিয়েছিলো।হোক আরেকজনের কথায় কিন্তু তারা তো হানিয়ার বাবা-মা ছিলো। ছোট থেকে পেলেপুষে বড় করেছিলো তাঁকে,, তারা কিভাবে আরেকজনের কথায় কেন সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই জঘন্য সব কথা বলেছিলো হানিয়াকে? দুনিয়ায় সকলের দেওয়া দুঃখ সহ্য করা গেলেও বাবা-মায়ের থেকে পাওয়া দুঃখ সহ্য করা যায় না। সে গায়েব হওয়ার আগ পর্যন্ত তার বাপের বাড়িতে আর পা রাখেনি। আজও রাখতে চাইছে না। হানিয়া চোখমুখ শক্ত করে বলে উঠে–
—দেখা করবো ভালো কথা কিন্তু বাড়িতে না। কোন রেস্টুরেন্টে দেখা করতে পারতাম। আমি যেতে চাই না এ বাড়িতে।
জাভিয়ান হানিয়ার কথা শুনে বেশ আহত হয়। মেয়েটা অতীতে সকলের থেকে কষ্ট পেয়েছে শুধুমাত্র তার এবং তার পরিবারের জন্য। সেসব দিন ভুলবার মতে না। জাভিয়ান মনে করে হানিয়া তাঁকে ক্ষমা করে দিয়ে আপন করে নিয়েছে এটা তার ভাগ্য। জাভিয়ান ড্রাইভিং সিটের দিকে তাকিয়ে দেখে ড্রাইভার বসে আছে। সে ড্রাইভারকে বলে–
—রফিক,, বাহির থেকে একটু ঘুরে আসো।
জাভিয়ানের ড্রাইভার রফিক বিনা বাক্য ব্যয়ে চলে যয বাহিরে। ড্রাইভার চলে গেলে জাভিয়ান হানিয়ার মুখোমুখি হয়ে বসে। হানিয়ার হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে সেখানে বেশ কয়েকটা চুমু দেয়। তারপর তার চোখে চোখ রেখে বলে–
— জানো দোষটা কোন কালেই তোমার ছিলো না। তুমি নির্ভেজাল,,স্বচ্ছ একটা মানুষ ছিলে। সকলকে মন উজার করে ভালোবাসা দিতে। কিন্তু দেখো সেই তুমিই কত সাফার করলে। জীবনে সকলের কাছে কষ্ট পেয়ে ঘরে ছাড়লে। কার জন্য? এই আমার জন্য। আমার আগমন তোমার সুন্দর,, স্বাভাবিক জীবনটা তছনছ করে দিয়েছে। আমার থেকে মুক্তি নিয়ে এসেও শান্তি পেলে না। আমার মায়ের করা জঘন্য কর্মের কারণে তোমার বাবা-মা থেকেও কষ্ট পেয়েছ। মৃত্যুর দুয়ার পর্যন্ত ঘুরে এসেছো। তোমার জীবনের এতো দুঃখ,,কষ্ট,, ঝামেলার একমাত্র কারণ এই আমাকে যদি ক্ষমা করে নিজের করে নিতে পারো তাহলে তারা তো তোমার বাবা-মা। তোমায় এই সুন্দর পৃথিবীতে এনেছে,, আদর ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছে। তারা যেটা করেছে সেটা অজ্ঞতাবসত করেছে,,তাঁদের যেটা বুঝানো হয়েছে তাই করেছে। এখানে তাঁদের কোন দোষ ছিলো না জান। সম্পূর্ণ দোষ আমার মায়ের ছিলো।
হানিয়া এতক্ষণ চুপ করে জাভিয়ানের কথা শুনছিলো। কিন্তু জাভিয়ানের শেষের কথায় জবাব না দিয়ে পারে না সে। সে বলে–
—এক হাতে তালি বাজে না জাভিয়ান। মিসেস তালুকদার বললো আর তারা বিশ্বাস করে ফেললো? আপনিই তো বললেন, তারা আমায় আদর ভালেবাসা দিয়েছে বড় করেছে। তো তারা জানত না তাঁদের মেয়ের চরিত্র কেমন? একজন বললো আর কোন যাচাই বাছাই বা জিজ্ঞেস করা ছাড়াই তারা ডাইরেক্ট একশনে নেমে গেলো। আমার কঠিন সময়গুলোতে নিজের ছায়া ব্যতীত আর কাউকে পাশে পায়নি আমি। আপনি বললে আমি যাবো এই বাড়িতে কিন্তু সত্যি বলতে আমার মন টানছে না। সীমাহীন ভালোবাসার বিনিময়ে সবসময় কষ্টই পেয়েছি।
—আমায় ক্ষমা করতে পারলে তাদের পারবে না? অতীতের কথা যতই মনে রাখবে ততই কষ্ট পাবে। সকলে তোমায় কষ্ট দেওয়ার শাস্তি পেয়েছে। আমি তোমায় হারিয়ে উন্মাদ-পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। আমার মা আমার অবস্থা দেখে ব্রেন স্টোক করে একপাশ প্যারালাইজড হয়ে হুইলচেয়ারে বসা আজ। কারো সাহায্য ছাড়া চলতে পারে না। তোমার বাবা তুমি হারিয়ে যাওয়ার শোকে পরপর দু’বার হার্ট অ্যাটাক করেছেন। হার্টের অবস্থাও নাজুক। তোমার মা-ও তোমার আর তোমার বাবার শোকে অসুস্থ হয়ে পরেছেন। আমাদের সবাইকে উপর ওয়ালা শাস্তি দিয়েছেন। এবার কি আমরা ক্ষমা পেতে পারি না? আমি তোমায় জোর করবো না। কিন্তু বৃদ্ধ মানুষ গুলোর সুখ যে এখন তোমার মধ্যে আটকে আছে। তারা তোমার ফেরার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষার প্রহর গুনছে। বাবা-মা তার সন্তানকে নিজেদের বুকে ফিরে পাওয়ার জন্য প্রতিদিন চোখের পানি ফেলছে। তালুকদার বাড়ির প্রতিটি বস্তু,, তোমার ফেলে আসা সংসার তোমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে।তুমি ছাড়া আমরা সবাই কতটা অসহায় সেটা শুধু আমরা জানি। তোমার কি এখন উচিত হবে না,,তাদের কাছে ফিরে যাওয়া? তাদের অপেক্ষার প্রহর শেষ করা?
হানিয়ার চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরে। মন চাইছে তাদের কাছে ফিরে যেতে কিন্তু মস্তিষ্ক বলছে না যেতে। হানিয়া মনের কথা শুনে বরাবরই ঠকেছে। হানিয়াকে চুপ করে থাকতে দেখে জাভিয়ান হতাশ হয়। বিষয়টা আগে তাঁকে সময় নিয়ে বুঝানো উচিত ছিলো কিন্তু সে চেয়েছিলো সারপ্রাইজ দিতে।
জাভিয়ান হানিয়ার একটা হাত ছেড়ে দিয়ে পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোন বের করে ড্রাইভারকে কল লাগায়।কল রিসিভ হলে জাভিয়ান বলে–
—গাড়িতে আসো। বাসায় ব্যাক করবো আমরা।
কথাটা বলে কল কেটে দেয়। হানিয়া কিছুক্ষণ সময় নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে বলে–
—আমি যাবো এই বাসায়। তাঁদের অপেক্ষার প্রহর শেষ করতে চাই আমি।
জাভিয়ান হানিয়ার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে–
—টেক ইউর টাইম জান। আমি বুঝতে পারছি একদিনেই এতবছরের কষ্ট ভুলতে পারা সম্ভব নয়। আমরা আরেকদিন আসবো। আজ চলো চলে যাই।
—না আমি আজই যাবো। শুভ কাজে দেরি করতে নেই। চলুন চলুন।
তাড়া দিয়ে বলে হানিয়া। জাভিয়ান হেঁসে দিয়ে তার দু’গালে হাত রেখে মাথায় চুমু দিয়ে বলে–
—চলো যাওয়া যাক। তোমার জন্য কয়েকজন সারপ্রাইজও আছে।
—সারপ্রাইজ আবার কয়েকজন হয় কিভাবে?
—আগে ভেতরে তো চলো আমার বধূয়া। গেলেই দেখতে পারবে।
জাভিয়ান প্রথমে নিজে বের হয়ে তারপর হানিয়াকে বের হতে সাহায্য করে। তারপর দুইজনই ভেতরে চলে যায়। কলিংবেলে প্রেস করে তারা দাঁড়িয়ে থাকে দরজা খোলার অপেক্ষায়। একজন হেল্পিং হ্যান্ড এসে দরজা খুলে দেয়। তার পেছন পেছন আশিয়ানও এসেছিলো। দুষ্টুটা লাফালাফি করে হাঁপিয়ে যাওয়ায় পানি খেতে এসেছিলো। কলিংবেলের আওয়াজে সেও পেছন পেছন আসে। দরজা খুলে বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা তার প্রিয় ব্যক্তিটিকে দেখে খুশি হয়ে যায়। তার মামু এসেছে। মামুর পাশে একজন মহিলাকে দেখে তার কপালে কয়েকটা ভাজ পরে। মহিলা টিকে তার চেনা চেনা লাগছে। মাথায় একটু জোর দেয় মনে করার জন্য। আরে হ্যাঁ,, মনে পরেছে তার। এটা যে তার বড় মাম্মাম।
সে বাড়ির সবার কাছ থেকে শুনে এসেছে তার বড় মাম্মাম নাকি তাঁকে অনেক ভালো। সে নাকি দূর দেশে আছে তাই আশিয়ানের সাথে দেখা বা কথা বলতে পারে না। আজ বড় মাম্মাম এসেছে। নিশ্চয়ই তাঁকে অনেক ভালোবাসবে। সে “বড় মাম্মাম” বলে দৌড়ে গিয়ে হানিয়াকে জড়িয়ে ধরে। হানিয়া বাসার ভেতরে প্রবেশ করেছিলো হঠাৎই আশিয়ান এসে কোমড় জরিয়ে ধরায় থমকে যায়। তার চিৎকার শুনে বাকি বাচ্চা আর বড়রা সবাই রুম থেকে বের হয়ে আসে। বাকি বাচ্চারাও হানিয়াকে খুব ভালো করে চেনে। তাদের বাবা-মা প্রায়ই হানিয়ার ছবি দেখিয়ে তার কথা বলে।
বাবা-মায়ের থেকে এই ব্যক্তিটির এত এত প্রশংসা শুনতে শুনতে হানিয়া অজান্তেই তাদের প্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা সবাই আশিয়ানের মতো একেকজন খালামনি, আন্টি বলে দৌড়ে এসে তার কোমড় জড়িয়ে ধরে। হানিয়া হতভম্ব হয়ে যায় এমনটা। এত বড় সারপ্রাইজ পাবে সে আশা করেনি। জাভিয়ান তার কানে ফিসফিসিয়ে বলে–
—বলেছিলাম না কয়েকজনে সারপ্রাইজ আছে। কেমন লাগলো সারপ্রাইজ গুলো?
~চলবে?
শব্দসংখ্যা~১৮৬০
#প্রতিশোধের_অঙ্গীকার
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#Season_2
#পর্ব_৯
বাচ্চারা এতদিন হানিয়ার কথা তাদের বাবা-মায়ের কাছে শুনতে শুনতে নিজেদের অজান্তেই হানিয়াকে তাদের প্রিয় ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম একজন বানিয়ে ফেলেছে। তারা হানিয়াকে দেখার পর থেকে একদম চিপকে একেকজন বসে আছে তার সাথে। দুইজন তার কোলে বসে আছে তো একজন তার পেছনে গিয়ে গলা ধরে আছে। বাকিরাও তার কাছ ছাড়া হতে নারাজ। বাচ্চাদের বাবা-মায়েরা এতদিন পর প্রিয় একজন পেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে একটু কান্নাকাটি করবে কি বিচ্ছুদের জ্বালায় কথা বলারও সুযোগ পাচ্ছে না।
আশিয়ান হানিয়ার পেছনে গিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে দাড়িয়ে আছে। সে অবস্থাতেই বলে–
—বড় মাম্মাম,, তুমি এতদিন কই ছিলে? আমাদের কথা একটুও মনে পরেনি তোমার?
হানিয়া ঘাড় ঘুড়িয়ে আশিয়ানের গালে চুমু দিয়ে বলে–
—আমি তো জানতাম না আমার জন্য এতো গুলো সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে। তাহলে তো আমি কবেই এসে পরতাম আব্বা।
এর মধ্যে আফিফ পাশ থেকে বলে উঠে–
—হানি আন্টি,,তুমি আশিয়ানকে আদর করছো শুধু আমাদের করছো না।
আফিফের কথা শুনে আশিয়ান রেগে গিয়ে বলে–
—আমার মাম্মাম তোকে আদর করবে কেন? তোর মাম্মাম যখন তােকে আদর করে তখন আমি আদর চাই?
আফিফ হানিয়ার একটা হাত জড়িয়ে ধরে বলে–
—তোর মাম্মাম আমারও আন্টি। আমাকেও আদর করবে তাই।
আশিয়ান হিংসুটে না হলেও তার পরিবারের কেউ সে ব্যতীত অন্য কাউকে আদর করলে তার সহ্য হয় না। এবারও তার ব্যতিক্রম হয় না। সে আগের থেকেও বেশি রেগে গিয়ে বলে–
—না আমার মাম্মাম শুধু আমায় আদর করবে। তোদের কাউকে করবে না।
বাচ্চারা সকলে আশিয়ানের রাগ সম্পর্কে অবগত। রেগে গেলে মারামারি করে আঘাত দেওয়া এবং পাওয়া দুটোরই রেকর্ড আছে তার। আফিফ তার সাথে কথা না বাড়িয়ে ছলছল চোখে হানিয়াকে প্রশ্ন করে–
—আন্টি তুমি আমাদের আদর করবে না? শুধু আশিয়ানকে আদর করবে?
সব বাচ্চারা হানিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে উত্তরের আশায়। হানিয়া হেঁসে দেয় আফিফের কথা শুনে। মিষ্টি হেসে বলে–
—আমার কি একটা আব্বা নাকি? আমার তিনটা আব্বা আর দুটো আম্মা। সেই হিসেবে সবাই তো আদর ডিজার্ভ করে তাই না?
সবাই তার কথা শুনে খুশি হয়ে যায়। হানিয়া একে একে সবার দুই গালে আদর দেয়। তাদের আদর দিতে দেখে জাভিয়ানের মধ্যে সুপ্ত হিংসাত্মক আত্মাটা ঠেলে বের হয়ে আসতে চায়। জাভিয়ান মনে মনে বলে–
—আগে যদি জানতাম আমার আদরে তোরা ভাগ বসাবি,,তাহলে জীবনেও আনতাম না। দেখো দেখো,,কেমনে একেকজন আমার আদরে ভাগ নিচ্ছে।
জাভিয়ানের এখন ওদের সাথে ঝগড়া করতে মন চাচ্ছে নিজের আদরে ওদের ভাগ বসানোয়।সােনিয়া,,স্পর্শ,, ইনায়া আর আদিয়াত হা হয়ে হানিয়াকে দেখছে। তারা এখানে বিশ্বাস করতে পারছে না হানিয়া ফিরে এসেছে যে। এরই মধ্যে আবরার তার বাবা-মাকে নিয়ে আসে। কুলসুম পাঠানো হয়েছিলো মি. এন্ড মিসেস তালুকদার ও রোজি বেগম এবং আদিব সাহেবকে ডাকতে। তারাও এসে পরেছে। বয়োজ্যেষ্ঠরা সকলে একই সাথে নিচে নামে। নিচে এসে তারা বাচ্চাদের সাথে হাস্যোজ্জ্বল হানিয়াকে দেখে অবাক হয়ে যায়।
হানিয়া বাচ্চাদের সাথে কথা বলতে বলতে তার চোখ যায় সিঁড়ির দিকে। মুহূর্তেই তার হাসি হাসি মুখটা চুপসে যায়। হানিয়ার হাসি মুখটা মলিন হতে দেখে জাভিয়ান হানিয়ার চাহনি অনুসরণ করে সেও সেইদিকে তাকায়। সিড়ির দিকে তার বাবা-মা আর শ্বশুর-শ্বাশুড়িকে দাড়িয়ে থাকতে তার বুঝতে বাকি থাকে না হানিয়ার মুখটায় মলিন হওয়ার কারণ। সে নিজের জায়গা থেকে উঠে হানিয়ার কাছে আসে।হানিয়ার কোলে থাকা আমায়া ও সায়নাকে নিজের কোলে তুলে নেয়। তারপর হানিয়ার দিকে তাকিয়ে স্বল্প আওয়াজে বলে–
—যাও হানি।
হানিয়া বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গুটিগুটি পায়ে বাবা-মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মি.এন্ড মিসেস মির্জা চোখে পানিতে টইটম্বুর। গড়িয়ে পরার অপেক্ষা শুধু। হানিয়া কাঁপা কাঁপা গলায় বলে–
—কেমন আছো আব্বু আম্মু তোমরা?
ব্যস,,এই একটা কথারই যেনো অপেক্ষা ছিলো তারা। হানিয়ার গলার স্বর শুনে তারা নিশ্চিত হয়ে যায় এটাই তাদের হারিয়ে যাওয়া মেয়ে। মি. মির্জা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কেঁদে দেয়। মিসেস মির্জা শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদতে থাকে। মি.মির্জা কাঁদতে কাঁদতে বলেন–
—আমাকে মাফ করে দে রে মা। আমি তোকে অনেক কষ্ট দিয়েছি,,তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছি। সবার থেকে বেশি কষ্ট দিয়েছি আমিই তোকে,,সবকিছুর জন্য মাফ করে দে মা।
সমাজ বলে পুরুষ মানুষ কাঁদে না। পুরুষদের চোখের পানি নাকি দূর্লভ বস্তু। কিন্তু হানিয়া দেখেছে পুরুষদের চোখের। তার জীবনের দু’জন গুরুত্বপূর্ণ পুরুষকে সে কাঁদতে দেখেছে তাও আবার তারই জন্য। তাকপ হারানোর ভয়ে। বাবা-মায়ের চোখের পানির কারণ কোন সন্তানই হতে চায় না যদি না সেটা শুধু আনন্দের হয়।
হানিয়াও তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে বাবার বুকে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে বলে–
—না আব্বু এসব বলো না। আমার ভাগ্যে ঐসব লেখা ছিলো তাই আমি তা পেয়েছি। তুমি প্লিজ কান্না করো না। তুমি অসুস্থ হয়ে পরবে।
মি.মির্জা কি আর থামেন। এতবছর ধরে বয়ে বেড়ানো সব কষ্ট বের করে তারপর শান্ত হন। অনেকক্ষণ কান্না করার কারণে শরীরটা নেতিয়ে পরেছে। তাঁকে সোফায় এনে বসানো হয়। হানিয়া বাবাকে ছেড়ে মায়ের কাছে যায়। তার মা-ও তাঁকে বুকে নিয়ে অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করে। উপস্থিত সকলের চোখে পানি এসে যায় তাদের এমন আবেগঘন ঘটনার সাক্ষী হয়ে।
পরপর কুলসুম,, রোজি বেগম এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে। সবশেষে হানিয়া যায় মি. এন্ড মিসেস তালুকদারের কাছে। মি. তালুকদার হানিয়ার মাথায় হাত রেখো বলে–
—এতক্ষণে বুঝি এই বাবার কথা মনে পরলো?
—আপনাদের তো ভুলই নি তাহলে মনে পরার কথা আসছে কেন বাবা?
হানিয়ার কথা শুনে মি. তালুকদার প্রসন্ন মনে হাসি দেয়। তারপর প্রশ্ন করে–
—অভিমান কি কমেছে? নিজের বাড়ি কি ফিরে যাবে নাকি এখনো আমাদের উপর অভিমান করে বাড়িঘর,,নিজের সংসার ছেড়ে থাকার ইচ্ছে আছে আরো?
—ঘরবাড়ি ছাড়ার ইচ্ছে আপাতত নেই কিন্তু এখন যে আমার উপর আরো বড়বড় দায়িত্ব আছে।
তার কথা শুনে জাভিয়ান বাদে সকলের কপালে ভাজ পরে যায়। স্পর্শ তো জিজ্ঞেসই করে ফেলে–
—কিসের দায়িত্বের কথা বলছো তুমি হানিয়া?
—সমাজ গঠনের দায়িত্ব ভাবী। সমাজ থেকে দূর্নীতি,, অরাজকতা দূর করার মহান দায়িত্ব এখন আমার উপরে।
সকলে অবাক হয়ে যায় তার কথা শুনে। স্পর্শ বলে–
—মানে?
এর জবাব এবার জাভিয়ান দেয়। সে তার কোলে থাকা আমায়া আর সায়নাকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে নিজে সকলের সামনে এসে বলে–
—তোর ননদ যেনতেন মানুষ না রে পুতুল। ম্যাডাম এখন বিসিএস ক্যাডার। চট্টগ্রামে এতদিন লুকিয়ে ছিলো,, ঢাকায় এসেছিলো প্রশিক্ষণ নিতে। প্রশিক্ষণের পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পাবে।
সকলে হা হয়ে যায় জাভিয়ানের কথা শুনে। একা একটা মেয়ে ভিন্ন জেলায় গিয়ে এতকিছু করে ফেলেছে,, কথাটা তাঁদের সকলের জন্য বিস্ময়ের ব্যাপার। সকলে তার এমন সাফল্যে যেমন অবাক হয় তেমন খুশিও হয়। অবশেষে মান অভিমান শেষ করে সকলে আবার এক হয়ে যায়। অসুস্থ মিসেস তালুকদারও তার কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চায়।
হানিয়াকে আদিয়াত স্যার তার ওয়াইফের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। সকলে একসাথে দুপুরের লাঞ্চ করতে বসে বিকেল তিনটায়। এতক্ষণ কান্নাকাটি,, মাফ চাওয়াচাওয়ি এসব করতে করতে এত দেরি হয়ে গেছে। মি. তালুকদার হানিয়াকে তার পাশে বসিয়ে নিজের হাতে খাইয়ে দেয়।
এরপরের সময়গুলো চমৎকার কেটেছে সকলের। বিকেলে বড়রা সবাই ছাঁদে আড্ডা দিয়েছে যখন বাচ্চারা সবাই ঘুমে ছিলো। মির্জা বাড়িতে আসার পর থেকে জাভিয়ান তার বউকে এক মিনিটের জন্যও একা পায়নি। জাভিয়ান শুধু তক্কেতক্কে আছে কখন সুযোগ পাবে আর কখন হানিয়াকে নিয়ে চিপায়
যাবে।🤭
ভাগ্য বোধহয় তারউপর একটু প্রসন্ন হয়। হানিয়া যখন সকলের জন্য চা-কফি বানানোর জন্য নিচে নামে জাভিয়ানও সুযোগ বুঝে নিচে এসে পরে। সকলে বিষয়টা বুঝতে পেরে আড়ালে মুখ লুকিয়ে হাসে। আদিয়াত জাভিয়ানের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিয়ে পাশে বসা মেয়েটার দিকে তাকায়,, যে কিনা তার বাচ্চার মা।
আফরা সকলের কথা শুনছে আর হাসতে হাসতে আদিয়াতের বাহুতে এসে পরছে। আদিয়াত আফরার দিকে তাকায়। মনে মনে উপরওয়ালা কাছের ধন্যবাদ জানায় আফরাকে তার জীবনসঙ্গী হিসেবে দেওয়ার জন্য। মেয়েটার পাগলা করা ভালোবাসায় আজ আদিয়াতও হুশ হারিয়েছে। সে অস্বীকার করে না যে হানিয়ার জন্য কোন অনুভূতি তার ছিলো না,,কিন্তু সেটা ভালোবাসা নামক অনুভূতি যে নয় এটা সে নিশ্চিত। হানিয়া চলে যাওয়ায় তার একটু খারাপ লাগলেও জাভিয়ানের উন্মাদনা তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছে সে হানিয়াকে ভালোবাসে নি। বরং এই পাগল মেয়েটাকে ভীষণ ভীষণ ভালোবাসে। তাকে ভালোবাসতে বাধ্য করেছে এই মেয়েটা। নিজের পাগলামি,, যত্ন আর ভালোবাসা নিয়ে সে আদিয়াতকে জয় করে নিয়েছে।
আদিয়াত সামনের দিকে তাকিয়েই আলগোছে নিজের বাম হাতটা আফরার পেছন দিক দিয়ে নিয়ে তার শাড়ি ভেদ করে উন্মুক্ত কোমড় আঁকড়ে ধরে। আফরার হাসি হাসি মুখটা দুম করে নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো বুঁজে যায়। এত বছরের সংসারে এখনো সে কেঁপে উঠে আদিয়াতের আলতো স্পর্শে। শিহরণ বয়ে যায় সাড়া শরীর ও মনে। হালকা করে কাপতে থাকা শরীর ঘুরিয়ে সে আদিয়াতের দিকে তাকায়। প্রখর ভালোবাসাময়, মোহাচ্ছন্ন চোখ দুটোর দিকে তাকাতেই আফরার পুরো কায়া আরো একবার কেঁপে উঠে।
আদিয়াত আফরার কোমড় টেনে নিজের আরেকটু কাছে নিয়ে আসে। সকলের অগোচরে আফরার কানের কাছে ঝুঁকে এসে বলে–
—আমার আফিফের আম্মুকে ভীষণ ভালোবাসতে মন চাইছে। তার এমন মোহনীয় রূপ আমার হৃদয়কে ঝলসে দিচ্ছে। অবাধ্য,, লাগামহীন হতে মন চাইছে। বাসা যাওয়ার অপেক্ষা শুধু । তুমি আজ শেষ জানপাখি।
আদিয়াত তার কথা শেষ করে আফরাকে চোখ টিপ মেরে একটু সরে বসে কিন্তু কোমড় ছাড়ে না। অন্যদিকে আদিয়াতের মোহময় কণ্ঠে এমন ভয়ংকর হুমকি শুনে আফরা শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠে। বিশেষ মুহূর্তে আদিয়াতের পাগল করা স্পর্শ আর আদরের কথা মনে পরে লজ্জায় আরো নেতিয়ে যায় মেয়েটা। ফর্সা গাল গুলো পাকা টমেটোর মতো লাল হয়ে উঠে। লজ্জায় হাসফাস করতে করতে এদিক সেদিক তাকিয়ে লজ্জা কমাতে চাইলে ধরা খেয়ে যায় ইনয়ার কাছে।
ইনায়া আফরার এমন লাল লাল গাল দেখে হড়বড়িয়ে প্রশ্ন করে বসে–
—আফু তোর কি বেশি গরম লাগছে? গাল গুলো এতো লাল হয়ে গিয়েছে কেন?
সকলে কথা বলা থামিয়ে আফরার দিকে তাকালে আফরা এতে আরো লজ্জা পেয়ে যায়। আদিয়াত বিষয়টা বুঝতে পেরে হালকা হেঁসে আফরার কোমড় ছেড়ে দেয়। আফরা আমতাআমতা করে বিষয়টা কাটিয়ে দেয়।
_____________________
হানিয়া একমনে চুলায় থাকা চায়ের দিকে নজর দিয়ে রেখেছে। হয়ে এসেছে,,এখন যদি চোখ একটু এদিক সেদিক করে তাহলেই পরে যাতা অবস্থা হয়ে যাবে। এরই মধ্যে জাভিয়ান হুড়মুড়িয়ে কিচেনে ঢুকে নিঃশব্দে দরজা লাগিয়ে দেয়। তারপর বিড়াল পায়ে হেঁটে হানিয়ার পেছনে এসে উপস্থিত হয়। খপ করে হানিয়ার কোমড় দু’হাতে দিয়ে ধরে তার হালকা ঘামে ভেজা ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে দেয়।
হঠাৎই কেউ একজন এমন করে জড়িয়ে ধরায় হানিয়া ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু পরমুহূর্তেই জড়িয়ে ধরা ব্যক্তিটির স্পর্শ চিনতে পেরে শান্ত হয়ে যায়। একহাত নিয়ে জাভিয়ানের চুলের ভাজে রেখে বিলি কেটে দিতে দিতে বলে–
—কি চাই জনাবের? আড্ডা ছেড়ে কিচেনে কেন?
—যা চাই তা নিয়ে নিচ্ছি আমি। আপনি আপনার কাজ করেন।
—এভাবে কেউ কাজ করতে পারে?
—তাহলে এটা যে কাজ করছে তার দোষ। আমি এখানে আপনার কোন সাহায্য করতে পারলাম না ম্যাম।
জাভিয়ানের এমন এলোমেলো কথা শুনে হেঁসে দেয়। হানিয়া যখন চোখ বন্ধ করে স্বামীর ভালোবাসা নিতে ব্যস্ত তখনই ঘটে যায় একটা দূর্ঘটনা। চায়ের বলক উঠে সব চা পরে যায়। হানিয়ার বাম হাতটা গ্যাসের কাছে ছিলো বিধায় গরম চায়ের কিছুটা তার হাতেও এসে পরে। যন্ত্রণায় হানিয়ার মুখ দিয়ে “আহ” জাতীয় শব্দ বের হয়ে আসে।
এমন ভালোবাসা পূর্ণ সময়ে হানিয়ার ব্যথাতুর শব্দে জাভিয়ান হকচকিয়ে যায়। সে তো কোন বাইট বা হানিয়া ব্যথা পায় এমন কিছু করেনি। হানিয়া ঠিক কি কারণে এমন শব্দ করলো দেখার জন্য হানিয়ার ঘাড় থেকে মুখ তুলে তাকে প্রশ্ন করে–
—কি হয়েছে? ব্যথা পেয়েছো?
টাটকা গরম গরম চা হাতের উপর পরায় যন্ত্রণায় হানিয়ার চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে আসে। হানিয়ার চোখে পানি দেখে জাভিয়ান বিচলিত হয়ে যায়। অস্থির হয়ে বলে–
—এই হানি? ব্যথা পেয়েছো আমার কাছ থেকে? নাকি আমার স্পর্শ ভালো লাগছে না? এই কাঁদছো কেন তুমি? কোথায় খারাপ লাগছে?
প্রশ্ন করতে করতে হঠাৎই জাভিয়ানের নজর যায় হানিয়ার বাম হাত টায়। চুলার পাশে থাকা যন্ত্রণায় জর্জরিত হাত টায় নজর পরতেই জাভিয়ানের বুক কেপে উঠে। সে চুলার আচ নিভিয়ে দিয়ে হানিয়াকে টেনে নিয়ে সিংকের নিচে নিয়ে ট্যাপ অন করে হাত টায় ঠান্ডা পানি দিতে থাকে।
হানিয়া জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে দেখে জাভিয়ানের মুখটা লাল হয়ে গিয়েছে। লোকটা যখন কান্না আটকাতে চায় তখনই এমনটা হয় হানিয়া জানে। হানিয়া তাকে স্বান্তনা দিয়ে বলে–
—তেমন কিছু হয়নি। এইটুকুতে কিছু হয় না। আপনি বিচলিত হবে না জাভিয়ান।
জাভিয়ান হানিয়ার হাতে পানির ছিটা দিতে দিতে বলে–
—আমার জন্য এমনটা হয়েছে। আমার মাধ্যমেই তুমি বারবার ব্যথা পাও। আমি তোমার জন্য আনলাকী হানিয়া।
হানিয়া বোধহয় এই প্রথম জাভিয়ানের মুখের নিজের পুরো নামটা শুনলো। বিষয়টা তার একটুও ভালো লাগে না। জাভিয়ানের মুখে তার নামের শর্টফর্মটাই ভীষণ লাগে হানিয়ার। হানিয়া জাভিয়ানের থেকে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে জাভিয়ানকে নিজের দিকে ঘুরায়। তারপর জাভিয়ানের এক গালে হাত রেখে বলে–
—এটা একটা এক্সিডেন্ট। আপনি কেন শুধু শুধু নিজেকে দোষারোপ করছেন? আর কে বললো আপনি আমার জন্য আনলাকী? ইউ আর মাই লাকীচার্ম। ডোন্ট বি স্যাড জামাই। আই এম ওকে।
হানিয়ার কথার জবাবে জাভিয়ান আর কিছু বলে না। কুলসুমকল ডেকে সকলকে চা-কফি দিতে বলে হানিয়াকে নিয়ে রুমে চলে আসে। হানিয়ার হাতে বার্নারক্রিম লাগিয়ে থম মেরে বসে থাকে। হানিয়া শত চেষ্টা করেও তার মুড আর অন করতে পারে না।
_____________________
মাঝরাত~~
ঘুমের ঘোরে হানিয়া পাশের জায়গায় হাত রাখলে জায়গাটা খালি পায়। চোখ বন্ধ রেখেই হাতড়াতে থাকে কাঙ্ ব্যক্তিটিকে। জাভিয়ানকে পাশে না পেয়ে হানিয়া চোখ খুলে তাকায়। শোয়া থেকে উঠে বসে ওয়াশরুমের দিকে তাকায়। ওয়াশরুমের লাইট অফ দেখে বেড ছেড়ে বেলকনিতে গিয়ে দেখে। না সেখানেও নেই। লোকটা এতো রাতে গেলো কই?
জাভিয়ানকে খুঁজতে খুজতে হানিয়া নিচে আসলে কিচেনের লাইন জ্বলতে দেখে। বিষয়টা তার কপালে চিন্তার ভাজ ফেলে। সে পা চালিয়ে কিচেনে গেলে যা দেখে তাতে তার হুঁশ উড়ে যায়। জাভিয়ান একটা মাঝারী সাইজের পাতিলে ফুটন্ত গরম পানিতে নিজের বাম হাত দিয়ে রেখেছে। বাম হাতটা পানির পাতিল থেকে উঠালে জাভিয়ানের হাতের অবস্থা দেখে হানিয়ার কলিজাসহ কেঁপে উঠে। ফোসকা পরে হাতটার বিশ্রী অবস্থা হয়ে গেছে। জাভিয়ান ডান হাতটা পানির পাতিলে দিবে তখনই হানিয়া দৌড়ে এসে তাকে থামিয়ে দেয়। কাঁপতে থাকা গলায় জিজ্ঞেস করে–
—কি করছেন এসব?
জাভিয়ান একটা অদ্ভুত হাসি দিয়ে বলে–
—তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য নিজেকে শাস্তি দিচ্ছি হানি।
শব্দসংখ্যা~২০৫০
~চলবে?
[বানানে ভুল থাকতে পারে। রিচেক দেওয়া হয়নি। ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স 🖤🤍]