প্রথম ভালোবাসার সুর পর্ব-০১

0
360

#প্রথম_ভালোবাসার_সুর❤️
#লেখনীতে:অনুসা_রাত(ছদ্মনাম)
#সূচনা পর্ব

-“আমার কপাল পুড়ছে গো!আমার পোলায় বন্ধ্যা মেয়ে বিয়ে করে আনছে!কে কোথায় আছো গো!এই অলক্ষ্মী কে দূর করো।আমার সামনে থেকে সরাও একে।”

ঘরের দরজায় বসে অঝোরে কাঁদছেন আর বিলাপ করছেন শেহনাজ পারভীন।মেহের সেদিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে বসে আছে।তার চঞ্চল আঁখিজোড়ায় চঞ্চলতা আর নেই!সেই সতেজ হাসিটা মিলিয়ে গেছে।কিছু বলার মত ভাষা তার নেই।কিইবা বলবে সে?শক্ত হয়ে গেছে। শেহনাজ পারভীন কে উঠানোর চেষ্টা করতে করতে একজন মহিলা বলতে লাগলেন,

-“থাক আপা!এখন কেঁদে লাভ আছে?বলছিলাম সময় থাকতে থাকতে আমার অঙ্কিতার সাথে আরবাজের বিয়েটা দিয়ে দাও।”

শেহনাজ পারভীন মাথায় হাত দিয়ে কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে বললেন,

-“তোর কথাটাই শোনার দরকার ছিল রে বোন।তাহলে আজ আমার এই অধঃপতন দেখতে হত না।”

সেই মধ্যবয়স্ক মহিলাটি দরজার কাছে এগিয়ে এসে মেহেরকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন,

-“এই মেয়ে,তোমারও কি কোনো লজ্জা সরম নেই?
জানো যে কোনোদিন বাচ্চা দিতে পারবে না,তবুও একজনের গলায় ঝুলে গেলে।”

ওনার কথা শেষ হতেই মেহেরের গাল বেয়ে পানি পড়তে লাগলো।চোখজোড়া ভিজে যাচ্ছে। আর সহ্য করা যাচ্ছে না।ওই মহিলাটি আরো কত কথাই শোনাচ্ছে তাকে।ওনার কথার মাঝেই মেহেরের শ্বশুর শাহীন খান এসে ওনাকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন,

-“আহ!থামো এবার নাজমা।”

সেই নাজমা নামক মহিলাটি এবার থেমে গেলেন।তবে মিনমিন গলায় বললেন,

-“আমি ভুল তো কিছু বলছি না দুলাভাই।আপনি বিয়ে করিয়ে এনেছেন, এনেই কাজ শেষ।কপাল তো পুড়লো আমার বোনের। আমার আরবাজের।”

শাহীন খান নাজমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,

-“সে কথা তোমার না ভাবলেও চলবে।”

-“দেখলি আপা?দুলাভাই আমাকে আপন ভাবে না।ঘরের মানুষ ভাবে না।”(ন্যাকাকান্না করে)

শেহনাজ পারভীন কান্না করতে করতে শাহীন খানের দিকে এগিয়ে গিয়ে রাগ নিয়ে বলতে লাগলেন,

-“এই লোকটা! এই লোকটা আমার ছেলের জীবনটা নষ্ট করে দিলো।বিয়ের দাওয়াত খেতে গেছিল।দাওয়াত খেতে গিয়ে বিয়ে করিয়ে নিয়ে চলে এসেছে।এই অলক্ষ্মীটার বিয়ে ভেঙেছে আর আমার আরবাজের ঘাড়ে এসে পড়েছে।”

-“তাই বল আপা।এজন্যই তো আরবাজের গলায় ঝুলে গেছে।বিয়ে ভেঙেছে তাই আর না করেনি,সুযোগ পেয়ে ঝুলে গেছে।তার মধ্যে বড়লোক বাড়ির ছেলে।কি সাংঘাতিক দেখেছিস?”

এ ধরণের নানারকম কথা বলছে নাজমা বেগম আর শেহনাজ পারভীন। শাহীন খান কোনোমতে সেটাকে সামাল দিচ্ছে। মেহের চুপচাপ বিছানার মধ্যিখানে বসে আছে।আর চোখের পানি ফেলছে।আজ তার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল জায়ানের সাথে।তার জেঠাতো ভাই।
কিন্তু বিয়ের মাঝখানে হঠাৎ করেই জায়ানের মা এসে একটা হুলস্থুল বাঁধিয়ে দিলেন। জায়ানকে নিয়ে যেতে লাগলেন আর তার মা আটকাতে গেলে এমন এমন সব কটু কথা শোনালেন যা মনে পড়তেই মেহেরের চোখ দিয়ে অঝোরধারা বইছে। কানের মধ্যে বাজছে সেই কথাগুলো,

-“এমন মেয়ে কে বিয়ে করবে কে?কাউকে পাওনি বলে ভেবেছ আমার ছেলের ঘাড়ে ঝুলিয়ে দেবে? ভাগ্যিস ঠিক সময়ে আমি সবটা জানতে পেরেছিলাম।লজ্জা করে না?কথা লুকিয়ে মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছ। এই বন্ধাকে কে বিয়ে করবে?মুখপোড়া, অলক্ষ্মী।একে যে ঘরে ঢোকাবে তার ঘরের আলো নিভলো বলে।”

মেয়েলি গলা শুনে মেহেরের ভাবনায় ছেদ পড়লো।একটা মেয়ে এসে ঢুকেছে তার ঘরে।এই মেয়েটিকে সে চিনে।শাহীন খানের ছোট মেয়ে মীরা। মীরার সাথে তার অনেকবার দেখা হয়েছে। কেননা শাহীন খান তার বাবার বন্ধু।তবে আরবাজের সাথে তার বাসায় দেখা হয়নি।সেই মানুষটা কেনো দিন তাদের বাসায় আসেনি।তবে এই বাসায় দেখা হয়েছিল ।এক দুবার বেড়াতে এসে ব্যস্ত আরবাজের সাথে দেখা হয়েছে ঠিকই তবে কোনোদিন কথা হয়নি।
মীরা এসে মেহেরের পাশে বসতে বসতে বললো,

-“আপু,তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে? ”

মেহের নিচের দিকে তাকিয়েই নাক বোধক মাথা নাড়াল। মীরা মেহেরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,

-“তোমার চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে তুমি যে কাঁদছো,আর সেটাই তো স্বাভাাবিক।মায়ের হয়ে কি যে বলব বুঝতে পারছি না।আপাতত বাবা অনেক কষ্টে মা কে ঘরে নিয়ে গেছে। হয়ত ধীরে ধীরে মায়ের ব্যবহারে পরিবর্তন আসবে।তুমি প্লিজ কেঁদো না।হঠাৎ করে সবটা হওয়ায় ঘর-টর সাজানো হয়নি।এদিন টা নিয়ে সবারই কত স্বপ্ন থাকে।”

মেহের কিছু বলতে যাবে তার আগেই দরজা খুলে প্রবেশ করলো আরবাজ।মীরা উঠে দাঁড়িয়ে বললো,

-“আচ্ছা তবে আমি আসি।”

বলেই বের হয়ে গেলো। আরবাজ দরজা আটকে এসে দাঁড়িয়ে গেলো আয়নার সামনে।ভাবলেশহীন ভাবে নিজের মত করে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বলে উঠলো,

-“মিস মেহের।”

মেহের চোখ তুলে তাকালো আয়নার দিকে।এক সুদর্শন পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে।লোকটা এতটা ফর্সা না,শ্যামলা গড়ন,তবে ওনার চুলগুলো বেশ সুন্দর। হয়ত জীম করে,দেখেই বোঝা যাচ্ছে।কেননা দেয়ালে টাঙানো লিছু ছবিতে সে বেশ মোটাসোটা ছিল।আর এখনের টাঙানো কিছু ছবিতে সে বেশ ফিট।তাকে শার্ট খুলতে দেখে মেহের চোখ সরিয়ে বললো,

-“জ্বী?”
-“ঘুমাচ্ছেন না কেন?”
-“আ..আসলে…”
-“আপনার জন্য নিশ্চয়ই আলাদা বিছানা পাতা হবে না।সোফায় শুয়ে পড়ুন।”
-“না আসলে…”
-“সারাদিন হয়ত ধকল গেছে,ঘুমিয়ে পড়ুন।”

মেহের বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।আরবাজ ততক্ষণে টি-শার্ট পড়ে ফেলেছে।মেহের ওর সামনে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলো,

-“আপনি এতটা স্বাভাবিক আছেন কি করে?”
-“অস্বাভাবিকের কি আছে?”
-“বিয়ে করেই ঝামেলা মিটে গেল?”
-“মানে!”(ভ্রু কুঁচকে)
-“মানেটা বুঝতে পারছেন না?আপনার মা আমাকে কতকিছু শোনাচ্ছে। আমি বলেছিলাম আমাকে বিয়ে করে দয়া দেখাতে?”

বলতে বলতে মেহের কেঁদে ফেললো আবারো।আরবাজ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে মেহেরের মুখ পানে।সে শক্ত গলায় বলে উঠলো,

-“তোমার সাহস কি করে হয় আমার সাথে এভাবে কথা বলার।”
-“আপনি…”
-“লিসেন!বাবার কথায় তোমায় বিয়ে করেছি,তোমার তো কৃতজ্ঞ থাকার কথা।তুমি উল্টে গলা বাড়িয়ে কথা বলছো।বেয়াদব।এই ব্যবহারের কারণেই হয়ত তোমার কপালের এই দশা।”(রাগের চোটে)
-“হুহ কপাল”

বলতে বলতে মেহের কেঁদে ফেললো।
কান্নার কারণে মেহেরের গলা আটকে আসছে।তুতলিয়ে তুতলিয়ে বলছে,

-“আ..আমার কপাল খ..খারাপ ব..বলেই না আজ এভাবে জ..জায়ান বিয়েটা ভেঙে দিল।আ..আমি কি ইচ্ছে করে ব..বন্ধ্যা….”

এতটুকু বলতেই আরবাজ সামনে থেকে সরে গেল।মেহেরের দিকে পিঠ করে আছে সে।বেশ বিরক্তি নিয়ে গম্ভীর গলায় সে বলে উঠলো,

-“আমি এসব কিছু শুনতে চাচ্ছি না।আমার এত সময় নেই।”

মেহের বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। এসব কি বলছে আরবাজ?মেহেরের কথা শোনার মত তার সময় নেই?তাহলে মেহের কার সাথে কথা বলবে?বিয়ের পর তো স্বামীই আপন হয়।এখানো আরবাজ ছাড়া তো তার আর কেউ নেই।আরবাজ আর কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করলো না।এতকিছু বলার মত সময় তার নেই।তাইতো সে বিছানার একপাশে গিয়ে শুয়ে পড়লো।আর বলতে লাগলো,

-“আমি কারোর সাথে বেড শেয়ার পছন্দ করি না।তুমি চাইলে সোফায় ঘুমাতে পারো।নয়ত নিচে অনেক জায়গা আছে।”

মেহের এসে বিছানার পাশে ফ্লোরে বসে পড়লো।বিছানার কোণে থাকা তার ফোনটা অনবরত ভাইব্রেট করছে।আরবাজ সেটা নিয়ে মেহেরের কোলে ফেলে বললো,

-“স্টপ দিস ননসেন্স।আমার সকালে অফিসে যেতে হবে।”

মেহের কিছু বললো না।আরবাজ পিছন ফিরে শুয়ে পড়লো।মেহেরের মা শাপলা বেগমের কল এসেছে। মেহের কলটা ধরে কানে দিতেই তার মা বলে উঠলো,

-“কখন থেকে কল দিচ্ছি রে মা।চিন্তায় আমাদের সকলের অবস্থা খারাপ।তোর বাবা বললো তোর শ্বাশুড়ি নাকি…”

এতটুকু শুনতেই মেহেরের আবারো চোখ জলে ভরে এলো।মেহনাজ পারভীন তার মা-বাবা কে নিয়ে কম কথা তো বলেননি।সেসব কথা মনে পড়ে আরো কষ্ট হচ্ছে। শাপলা বেগম মেয়ের অবস্থা টা বুঝতে পেরে বলতে লাগলেন,

-“মা রে,সহ্য করে নে।কোনো টু শব্দ ও করিস না।তোর কপালে ছিল লেখা,কি আর করবি।তোর শ্বশুর বড় ভালো মানুষ। আমাদের এত বড় অপমান-লান্ছনা থেকে বাঁচালেন। আর আরবাজ কত ভালো একটা ছেলে।বাবার এক কথায় বিয়েতে রাজি হয়ে গেছে। মানুষের মত মানুষ হয়েছে।”

মেহের মায়ের কথা শুনে বিছানায় শুয়ে থাকা আরবাজের দিকে তাকালো। লোকটা কি তাকে দয়া করলো?স্বামীর ভালোবাসা কি তবে তার ভাগ্যে আসলেই নেই।শাপলা বেগম মেয়েকে এটাওটা বোঝালেন।বললেন যেন শ্বশুরবাড়িতে তার শ্বাশুড়ির কথা কানে নিয়ে বসে না থাকে,এসব শুনতেই হবে।
মেহের চুপচাপ সবটা শুনলো।কখন যে ঘুমিয়ে গেল টেরও পেল না।আজানের শব্দে তার ঘুম ভাঙলো।
তাকিয়ে দেখলো সে খাটে হেলান দিয়ে নিচে বসে ঘুমিয়ে গেছিলো।চোখ গুলো ফুলে গেছে কান্নার কারণে।মাথায়ও ব্যাথা!আরবাজ বিছানায় উপুড় হয়ে ঘুম!
মেহের উঠে গিয়ে গোসল করে নিলো। তার কাপড়ের ব্যাগ থেকে শাড়ি বের করে পড়ে নিল।ফজরের নামাজ আদায় করে মোনাজাতে দু হাত তুলে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো,

-“হে আল্লাহ!জানি না আমার কোন পাপের শাস্তি আমি জগতেই পাচ্ছি।আমি জানি না আমি কি পাপ করেছি যাতে করে তুমি আমাকে ‘মা’ ডাক শোনা থেকে বঞ্চিত করেছ।এত অপমান,অবহেলা লাঞ্ছনা আমাকে সহ্য করতে হচ্ছে। আরো হয়ত সহ্য করতে হবে।আমার স্বামী আমাকে তার বাবার কথায় বিয়ে করেছে,
কতদিনই বা রাখবে এই বন্ধ্যা কে।”

মেহেরের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।আবারো বলতে লাগলো,

-“তবে নিশ্চয়ই তুমি উত্তম পরিকল্পনা কারী।নিশ্চয়ই তুমি যা করছো আমার ভালোর জন্যই।আমি তোমার উপর ভরসা করে আছি আল্লাহ।দেখা যাক আমার জীবনের নতুনভাবে রঙ লাগে কিনা।”

এভাবে আরো নানান কথা বলে মেহের মোনাজাত শেষ করলো।নামাজ শেষ করে কিছু সময় কোরআন শরিফ পড়লো।তারপর উঠে চলে গেলো ঘর থেকে বের হয়ে। এদিকে মেহের যেতেই আরবাজ উঠে বসলো।ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলো,

-“বিয়ে করেছি বলে আমার ঘরে যা ইচ্ছে তাই করছে।আমার ওয়াশরুম ব্যবহার করছে!”

মেহের রান্নাঘরে ঢুকার কিছু সময়ের মধ্যেই হঠাৎ মেহনাজ পারভীন এসে চেচামেচি শুরু করে দিলেন।আর বলতে লাগলেন,

-“বের হ আমার রান্নাঘর থেকে।বন্ধ্যা মেয়ে একটা।আজ বড় বউমা বাসায় আসবে।আমার বড় বউমা এই রান্না করা খাবার কিছুতেই খাবে না।ওর ছয় মাস চলছে। এত বড় রিস্ক নিতে দিব না।বের হ অলক্ষ্মী।তোর ছায়াও পড়তে দিব না।”

চলবে কি?