#প্রথম_ভালোবাসার_সুর❤️
#লেখনীতে:অনুসা_রাত(ছদ্মনাম)
#পর্ব:১৯
শপিং শেষ করে রাতে বাসায় ফিরে আসে আরবাজ,মীরা আর আনিয়া।মেহেরকে যেতে বলেছিল কিন্তু মেহের ঘরে চুপচাপ বসে আছে।তাই আর কেউ বিরক্তও করেনি।কালকে সাধের অনুষ্ঠান।তাই তো নাজমা বেগম আর শেহনাজ পারভীন মিলে ঘর-দোর পরিষ্কার করাসহ আরো রান্না-বান্নার আয়োজন করছেন।আরবাজ ঘরে ঢুকে দেখতে পেলো মেহের চুপচাপ বিছানার মাঝখানে বসে আছে মাথা নিচু করে।
বারবার নাক টানছে।চোখগুলো ফুলে গেছে। আরবাজ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে মেহেরের পাশে বসলো।
মেহের চোখ তুলে তাকালো আরবাজের দিকে।আরবাজের বুকটা কেমন ধক করে উঠলো।মেহেরের চোখগুলো লাল হয়ে আছে।আরবাজ শান্ত গলায় বললো,
-“খেয়েছ?”
মেহের কিছু না বলে চুপ করেই রইলো।শেহনাজ পারভীনের বলা সেই কথাগুলো মেহেরের মাথায় এখনো ঘুরছে।আরবাজ আবার বললো,
-“মেহের?খাওনি এখনো?”
আরবাজের নরম গলা শুনে মেহেরের চোখ আবারো ভরে এলো।অতি আদর পেলে যেমন মানুষের চোখ ভরে আসে।ঠিক তেমন কান্নার সময় কেউ এমন প্রশ্ন করলে চোখে তো পানি আসবেই।আরবাজ মেহেরের পিঠে হাত দিলো।আরবাজের স্পর্শে মেহের কেঁপে উঠে। আরবাজ বলতে লাগলো,
-“কান্না তোমাকে মানায় না মেহের।”
আরবাজের মনে আছে,মেহের তার বাবার বাসায় ঠিক কতটা হাসি-খুশি থাকে।আরবাজকে কম তো জ্বালায়নি।কিন্তু এ বাসায় আসতেই তার আবারো কান্না শুরু। আরবাজ মেহেরের হাত ধরে টেনে বললো,
-“চলো খেয়ে নেবে।”
মেহের আরবাজের দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,
-“না আমি যাব না।”
-“চলো বলছি।”
-“না যাব না আমি।আমার কথা শুনতে ভালো লাগে না আরবাজ।”
আরবাজ মেহেরের হাত টেনেও নিয়ে যেতে পারছে না। মেহের কান্না করছে।আরবাজ শেষমেশ মেহেরকে কোলে তুলে নিলো।মেহেরের কান্না থেমে গেল।অবাক হয়ে বললো,
-“কি করছেন টা কি আপনি!”
-“শশশ চুপ।”
আরবাজ কোলে নিয়ে রুমের বাইরে যেতেই মেহের চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল।বাইরে সবাই টেবিলে বসে আছে।মেহের মিনমিন করে বলছে,
-“প্লিজ নামিয়ে দিন আমাকে।”
আরবাজ কোনোরকম পাত্তা দিচ্ছে না।টেবিলের সামনে গিয়ে দেখতে পেলো সবাই বসে আছে টেবিলে।শুধু আয়শা আর শরিফ নেই।আয়শাকে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে পাঠিয়ে দিয়েছে নাজমা বেগম।আর তারা সবাই বসে কিসের যেন লিস্ট করছে।আরবাজকে এভাবে আসতে দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল।আনিয়া অবাক হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।আর মীরা তো মুচকি মুচকি হাসছে। আরবাজ মেহেরকে চেয়ারে বসিয়ে দিতে দিতে বললো,
-“মীরা,মেহেরের জন্য খাবারের প্লেটটা আমি মাত্র রেখে এসেছি। নিয়ে আয় তো।”
মীরা মাথা নাড়িয়ে চলে গেল।আরবাজ চেয়ার টেনে মেহেরের পাশে বসলো।মেহের চুপচাপ মাথা নিচু করে আছে।এই লোকটা তার মান-সম্মান খেয়ে দিল।
শেহনাজ পারভীন বেশ রাগ নিয়ে বললেন,
-“এসব কি আরবাজ!”
আরবাজ কোনোরকম কথা না বলে হাত ধুয়ে নিল।মীরা খাবার টা সামনে দিয়ে গিয়ে বসে পড়লো আনিয়ার সাথে।আনিয়াকে ইশারা করে বললো বসতে।আনিয়া বসে পড়লো।আরবাজ ভাত মেখে মেহেরের সামনে ধরলো।মেহের বলতে লাগলো,
-“আ..আমি এ..একা খেতে পারব।”
-“হা করো।”
মেহের একবার শেহনাজ পারভীন আর নাজমা বেগমের দিকে তাকালো।ওনারা লজ্জায় কিছু বলতেও পারছেন না।মেহের ঢোক গিলে হা করলো।আরবাজ খাইয়ে দিচ্ছে মেহেরকে।মীরা সেটা ভিডিও করছে।আর আনিয়াকে বলছে,
-“হোয়াট আ সিন।”
আনিয়া বাঁকা হেসে বললো,
-“এগুলা আমরা ফেবুতে আপলোড দিব।”
নাজমা বেগম বলতে লাগলেন,
-“আরবাজ তোর কি লজ্জা টজ্জা সব লোপ পেয়েছে? আর এই মেয়ে,তোমারও কি লজ্জা-সরম লোপ পেয়েছে?”
আরবাজ নাজমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললো,
-“খালুর নাম্বারটা দিও তো খালামণি।”
-“কেন?”
-“কল দিয়ে জিজ্ঞেস করব তোমায় কোনোদিন খাইয়ে দিয়েছিল কিনা।”
আনিয়া আর মীরা হেসে উঠলো।নাজম বেগম দমে গেলেন।শেহনাজ পারভীন বলে উঠলেন,
-“এসব কি বলছিস আরবাজ।লজ্জার মাথা খেয়েছিস?”
-“আমার নিজের বউকে খাইয়ে দিতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না বা লজ্জাও হচ্ছে না।তোমাদের লজ্জা লাগলে উঠে যেতে পারো।”
শেহনাজ পারভীন রাগ নিয়ে বললেন,
-“আরবাজ!নিশ্চয়ই এই মেয়েটা কিছু বলেছে তোকে।এই মেয়ে।কি বলেছো ওকে আমার নামে?”
আরবাজের খাওয়ানো শেষ হলো।হাত ধুয়ে মেহেরকে পানি দিয়ে বললো,
-“আর খাবে?”
মেহের না বোধক মাথা নাড়ালো।তারপর শেহনাজ পারভীন কে বললো,
-“আমি কি বলব আন্টি?”
-“তাহলে এমন করছে কেন ও?জাদুটোনা করেছ?”
আরবাজ উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
-“মা,আমি না অন্ধ নই।আর এই মেয়ে এই মেয়ে কাকে বলছ?ও এই বাড়ির একমাত্র বউ।আমার স্ত্রী।ওর নাম মেহের।”(দাঁতে দাঁত চেপে)
নাজমা বেগম অবাক হয়ে বললেন,
-“এতটা বদল।”
-“বদল না খালামণি।যেটা সত্যি আমি সেটাই করছি।তোমরা একের পর এক অন্যায় করে যাবে আর আমি সেটা দেখব এটা তোমরা কিভাবে ভাবলে?”
শেহনাজ পারভীন কান্নারত গলায় বললেন,
-“তুই তোর মায়ের সাথে এভাবে কথা বলছিস আরবাজ।তাও এই মেয়েটার জন্য। আমার ছেলেটার মাথাটা ওয়াশ করে ফেলেছে গো।আমি বলেছিলাম বাপের বাড়ি যেতে হবে না।নিয়ে গিয়ে মাথাটা খেয়েছে।”
মেহের কিছু বলতে যেয়েও বলতে পারছে না।তার সামনে আরবাজ শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেহেরকে আর কিছু বলতে হলো না।আরবাজ নিজেই প্রতিবাদ করলো,
-“দেখো মা, অন্যায় মানে অন্যায় ই।তুমি ওকে কথা শোনাতে কখনোই ছাড়ো না।কেন মা?তুমি তো এমন ছিলে না।আমি তো মাঝে মাঝে অবাক হই আর ভাবি এসব কথা কে তোমার মাথায় ঢুকালো।”
একথা বলে নাজমা বেগমের দিকে তাকালো আরবাজ।নাজমা বেগম আমতাআমতা করে বললেন,
-“আ..আমার দিকে ত..তাকাচ্ছিস কেন?”
-“নাহ।তুমি আবার ভেবো না যে তোমায় বললাম।”
শেহনাজ পারভীন এবার কাঁদতে কাঁদতে শাহীন খান কে জোরে জোরে ডাকছে,
-“কই গো দেখে যাও।ঘরে এক কালসাপ নিয়ে আসছো।আমার ছেলেটাকে নিয়ে গিয়ে বশ করে ফেলেছে। এখন আমার ছেলে আমাকে কথা শোনায়।তোমাকে ত বলে লাভ নেই।তুমি তো বশ হয়েই আছো।”
আরবাজ মেহেরের হাত ধরে ঘরে নিয়ে যেতে যেতে বললো,
-“চলো তো মেহের।এসব ড্রামা আর আমার ভালো লাগছে না মায়ের।”
বলে চলে যাচ্ছে। আর শেহনাজ পারভীন টেবিলে বসে বসে কাঁদছেন।আরবাজ যেতে যেতে মেহের পিছন থেকে বলল,
-“উনি কাঁদছেন আরবাজ।আপনি এভাবে কেন বললেন?”
আরবাজ থেমে গেল।পিছনে না ঘুরেই বললো,
-“আর মা!কালকে আমি আর মেহের বাসায় থাকছি না।”
নাজমা বেগম অবাক হয়ে বললেন,
-“কেন?কাল তো অনুষ্ঠান।অবশ্য তুই তো ছেলে মানুষ।আচ্ছা না থাক।”
-“আমি ছেলে তার জন্য না খালামণি।যেখানে আমার বউয়ের মর্যাদা নেই সেখানে আমিও থাকব না।”
বলে আরবাজ চলে গেল।নাজমা বেগম দাঁড়ানো থেকে চেয়ারে ধপ করে বসে পড়লেন। মীরা আনিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,
-“ভাবী কি জাদু করলো বলোতো?এতটা বদল।”
আনিয়া মুচকি হাসলো শুধু।কিছু বললো না।
আরবাজ মেহেরের হাত টেনে বিছানায় বসিয়ে দিলো।তারপর দরজা লাগিয়ে মেহেরের সামনে বারবার পায়চারী করতে লাগলো।মেহেরের মনে হলো আরবাজ তার রাগ কন্ট্রোল করছে।মেহের ঢোক গিলে বললো,
-“কি হয়েছে আপনার?”
আরবাজ মেহেরের দিকে কিছুসময় শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলো। আচমকা মেহেরকে বিছানায় আধশোয়া ভাবে চেপে ধরে বললো,
-“আমি জানি না আমার কি হয়েছে। আসলেই কি জাদু করেছ তুমি?”
মেহের চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো।আচমকা আরবাজের এতগুলো রূপ বেচারি হজম ই করতে পারছে না।আরবাজের গভীর নিঃশ্বাস মেহেরের চোখে-মুখে আছড়ে পড়ছে।আরবাজের চোখ গেল মেহেরের ওষ্ঠজোড়ায়।বেচারি কেঁদে কেটে চোখে ঠোট ফুলিয়ে ফেলেছে।আরবাজের কেমন ঘোর কাজ করলো।মেহের কিছু বলতে নিচ্ছিলো কিন্তু বলবার আগেই মনে হলো মেহেরের মুখ বন্ধ হয়ে গেল।কি হচ্ছে সেটা বুঝতে মেহেরের ১০ সেকেন্ড সময় লাগলো। আর বোঝার সাথে সাথে আরবাজ তার ঠোঁট সরিয়ে নিলো।মেহের চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে।বুকের ভিতরটা কেমন করছে।আরবাজ তৎক্ষনাৎ সরে গিয়ে বললো,
-“আ..আব আ’ম সরি।”
বলে গিয়ো তাড়াতাড়ি করে বিছানার একপাশে গিয়ে শুয়ে পড়লো অন্যদিকে ফিরে।যথাসম্ভব নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।মেহেরের জন্য সে এক্ষুণি কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছিল।মেহের এখনো বুঝতে পারছে না যে কি হলো।আরবাজ কি মেহেরকে কিস করলো?
লজ্জায় মেহেরের কান-গাল গরম হয়ে গেলো।ঘাড় ঘুরিয়ে আর আরবাজকে দেখার সাহস হলো না।
চুপচাপ বিছানার কোণে শুয়ে কাঁথা দিয়ে এপাশ-ওপাশ বিল্ডিং করে ফেললো।মানে কাঁথার ভিতর চলে গেল।
আরবাজ অনুভব করছে মেহেরের অস্তিত্ব। এখনো ঠোঁট জোড়া ভিজে আছে।আরবাজ চোখ বন্ধ করে ফেললো।নিজেকে কোনোরকম শান্ত করলো।মনে পড়ে গেল আজ যে সে মেহেরের হয়ে কথা বলেছে।মনের মধ্যে ভালোলাগা কাজ করলো।নাহ!সে এতটা খারাপ না।ভাগ্যিস আনিয়া তাকে সবটা বললো।বুঝালো!আরবাজ কিছু সময়ের জন্য অতীতে চলে গেল।আজ যখন তারা শপিং এ গেছিল।তখন আনিয়া আরবাজকে বলছিল,
-“দেখো আরবাজ!আজ আমি মেহেরকে দেখলাম কিরকম ভাবে অপমান করলো খালামণি। তুমি কিছু বলতে গিয়েও বললে না।কেন বললে না আরবাজ?
আন্টি তোমার বড়। তাই বলে কি উনি ভুল করতে পারেন না?নিঃসন্দেহে ওনার কর্মকান্ড ভুল।তোমার উচিত প্রতিবাদ করা।তুমি বললে না?রেস্টুরেন্টে আজ ওই মহিলাটাকে যোগ্য জবাব দিয়েছ।ঠিক তেমন।সেই মহিলা ভুল।তোমার মা ও কিন্তু ভুল।একটা বাচ্চাই তো সব না।তোমার মায়ের কাজগুলো ভুল।মেহের একা একটা মেয়ে।হয়ত উত্তরও দিতে পারে না।অনেক ওভাররিয়েক্ট করেন খালামণি। তেমার উচিত ওর পাশে থাকা।অন্তত বন্ধু হিসেবে।”
-“আমি জানি মায়ের কাজগুলো ভুল।আর আজ আমার সবচেয়ে খারাপ লেগেছিল।আমি সুযোগ খুঁজছিলাম কথাগুলোর জবাব দেয়ার।”
-“সুযোগের অপেক্ষা করো না।পরে দেরী হয়ে যাবে।মেয়েরা বেশিই আবেগী।যদি অপমানের চোটে খারাপ কিছু….”
আরবাজের বুকটা ধক করে উঠলো।কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে ভাবতে লাগলো সে।আসলেই সে বড় অন্যায় করে ফেলেছে।প্রথম থেকেই মেহেরের পাশে থাকার দরকার ছিল।কিন্তু এই ভুল সে আর করবে না।
এবার তার মায়ের উপর জবাব টা দিতেই হবে।তার মাকে বোঝাতে হবে যে উনি ভুল।
চলবে…..