প্রথম ভালোবাসার সুর পর্ব-০২

0
255

#প্রথম_ভালোবাসার_সুর❤️
#লেখনীতে:অনুসা_রাত(ছদ্মনাম)
#পর্ব:০২

মায়ের চেঁচামেচি শুনে ঘর হতে বের হয়ে এলো আরবাজ।ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে চোখ ডলতে ডলতে ড্রয়িংরুমে এসে উপস্থিত হলো।শেহনাজ পারভীন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মেহেরকে নানানরকম কথা শোনাচ্ছেন। আর মেহের চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

-“তোমাকে আমি নিষেধ দিচ্ছি,আমার রান্নাঘরে ভুল করেও ঢুকবে না।”
-“আন্টি আমি তো চা করতে….”(মিনমিন করে)
-“চুউউপ!তোমার এত সাহস।মুখে মুখে কথা বলো।”

মেহের চুপ হয়ে গেলো।আরবাজ চুপ করে দাঁড়িয়ে বিষয়টা দেখছে।কিছু বলতে নিবে তার আগেই শাহীন খান এসে উপস্থিত হলেন।আর শেহনাজ পারভীন কে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন,

-“কি হয়েছে টা কি?সকাল সকাল এত চেচামেচি।”
-“চেচামেচি করব না?এই অলক্ষ্মী মেয়েটা আমার রান্নাঘরে ঢুকে গেছে।”
-“ভালো ভাবে কথা বলো।অলক্ষ্মী আবার কি?”
-“এ্যাহহ!ভালো ভাবে কথা বলবো।কি বলবো ভালোভাবে?আমার কপাল যা পুড়ার তা তো পুড়লোই।”

বলতে বলতে রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন।মেহের চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।শেহনাজ পারভীন জোরে জোরে বাসনকোসন বের করছেন আর বলছেন,

-“কত সাধ ছিল!একমাত্র ছেলের ধুমধাম করে বিয়ে দিব।সে গুড়ে বালি।আমার কপালে কি আর এত সুখ সয়?”

আরবাজ বিরক্তি নিয়ে মুখ দিয়ে ‘চ’ শব্দ করে নিজের ঘরে চলে গেল।মীরা ঘর থেকে বের হয়ে বাবা আর মেহেরের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বললো,

-“কি হয়েছে বাবা?এত চেচামেচি কেন?”
-“…..”
-“মা আবার শুরু করেছে?”

শাহীন খান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।মীরা চুপচাপ গিয়ে মেহেরের পাশে দাঁড়িয়ে গেল।শাহীন খান এগিয়ে গিয়ে মেহেরকে উদ্দেশ্য করে ধীর গলায় বলতে লাগলেন,

-“তোর সম্মান রক্ষার্থে আর ভালো করতে আমি তোকে আরবাজের সাথে বিয়ে দিয়েছিলাম।কিন্তু আমি জানি না তোর ভালো করতে গিয়ে তোকে বিপদে ফেলে দিয়েছি কিনা।শেহনাজ যে এমন করবে এটা আমি ভাবিনি রে মা।তোর এই অপমানের জন্য দায়ী আমিই।পারলে আমাকে মাফ করে দিস।”

বলেই উনি নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।মীরা মেহেরের কাঁধে হাত দিয়ে বললো,

-“মন খারাপ করো না মেহের আপু। ওহ সরি!মেহের ভাবী!”

বলেই হালকা হাসলো।মেহের মীরার দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলো।মীরা বলতে লাগলো,

-“মায়ের কথাগুলো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো তো।স্বামী ঠিক তো সব ঠিক!ভাইয়া তো আর তোমাকে কিছু বলেনি তাই না!”

মীরার কথা শেষ হতেই মেহের গভীর ভাবনায় চলে গেলো। গতকালকে রাতের কথা আরবাজের ব্যবহারের কথা মনে পড়ে গেলো।কেমন যেন লোকটা!আজকেও ওনার সামনে এতগুলো কথা বলার পরেও উনি কিছু বললেন না।উনি যদি বিয়েতে মত নাই দেবেন তাহলে আগে কেন বললেন না?
কেন বিয়ে করলেন আর কেনই বা মেহেরকে এসব সহ্য করতে হচ্ছে! মীরার ঝাঁকুনিতে মেহেরের ঘোর কাটলো।মীরা হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে বললো,

-“ভাবী?কই চলে গেলা?”
-“হ..হ্যা?কই না।”
-“চলো ঘরে যাই।”
-“আসলে…”
-“কি?”
-“আন্টি একা…”
-“মা তো তোমায় রান্নাঘরে যেতে না করেছে।তাহলে তুমি যাবে কেন?একাই করতে দাও সব।”
-“তা কিভাবে হয়।আমি নতুন বউ হয়ে….”
-“বাদ দাও।চলো তো।”

বলতে বলতে মেহেরকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো নিজের ঘরের দিকে।
মেহেরের মনে নানান চিন্তাভাবনা দানা বাঁধছে। কি থেকে কি হয়ে গেলো।কতকিছু ভেবে রেখেছিল সে।
এত আনন্দ! সব এক নিমেষে শেষ।জায়ান তো তাকে ভালোবাসে বলেই বিয়ে করতে চেয়েছিলো।মেহের তো গিয়ে বলেনি তাকে বিয়ে করতে।জায়ান নিজেই তার কাছে এসেছিল।তাহলে তার মা যখন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল তখন কিছু বলেনি কেন?এই তার ভালোবাসা?
ভালোবাসা কি এমন হয়?
মীরা ওয়াশরুমের দরজা খুলে বের হলো।মেহেরকে বিছানায় রেখে গেছিল সে।ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললো,

-“ভাবী?এত কি যে ভাবছো তুমি!”

মেহের চুপচাপ মাথা নিচু করে আছে।মীরা মেহেরের সামনে দাঁড়িয়ে মেহেরের মাথাটা তুলে বললো,

-“আবার কাঁদছো নাকি দেখি তো।উমম…কই না তো।”
-“কান্না শুকিয়ে গেছে।”(তাচ্ছিল্য হেসে)
-“বেশ ভালো হয়েছে। চলো তোমাকে সাজাই।”

মেহের ভ্রু কুঁচকে বললো,

-“কেন?”
-“কেন মানে?আজ তোমার বিয়ের দ্বিতীয় দিন।তুমি সাজবে না?আজ তো তুমি তোমার নিজের বাড়িতে যাবে।”
-“না মানে…”

মেহের কি বলবে বুঝতে পারছে না।তাদের বিয়েটা তো এত ধুমধাম করে বা লোক জানিয়ে হয়নি।
আরবাজের যে বিয়ে হয়েছে তা পাড়া-মহল্লার মানুষ জানে কিনা তাও সন্দেহ।এত রাত করে এসেছে!
আরবাজের মা তো তাকে বাড়ির বউ হিসেবে মানেই না।
তাহলে কি ভাবে তাকে আর আরবাজকে….
এতটুকু ভেবেই মেহের দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। মীরা মেহেরকে ঝাঁকুনি দিয়ে বললো,

-“উফফ!আবার ভাবনায় চলে গেলো।”

বলতে বলতে মীরা তার সাজার জিনিসপত্র নিয়ে এসে মেহেরের সামনে বসে গেলো।মেহের নাকচ করে বললো,

-“না না আমি সাজব না।”
-“ওমা কেন?”
-“এখন কি সাজার সময়?”
-“তাহলে কখন সময়?”
-“এই না তুমি এত বুঝো,আমাকে বুঝাও।তাহলে এটা বুঝতে পারছো না যে বাড়ির এই সিচুয়েশনে সাজার মত ওয়ে নেই। ”
-“কেন নেই ভাবী?বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে তোমার প্রথম সকালটা স্পেশাল হবে এটাই তো স্বাভাবিক। সব মেয়েরই এটা স্বপ্ন। কিন্তু আমার মা সেটা ভেস্তে দিচ্ছে। এটা আমি কি করে হতে দিই।”
-“ওনার ব্যবহারটাও হয়ত স্বাভাবিক। আজ অন্য কেউ হলেও হয়ত এটাই করতেন।”
-“আর আমার সাথে হলে?”
-“ছি এসব বলতে হয় না মীরা।তোমার কেন এমন হবে।
আল্লাহ না করুক।”
-“এমন হলে মা কি দূর দূর করত?করত না।আমি যে তার মেয়ে।তাহলে তোমায় বেলায়….”

এতটুকু বলতেই নাজমা বেগম এসে উপস্থিত হলেন দরজার সামনে।মীরাকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন,

-“কিরে,এখানে সাজাতে বসেছিস।তোর মা হাত পুড়িয়ে রান্না করেছে।তোকে খেতে ডাকছে।”
-“আসছি।”

নাজমা বেগম গেলেন না।বরং ঘরে ঢুকে পড়লেন।আর বলতে লাগলেন,

-“নতুন বউ রান্না ঘরে না গিয়ে সাজতে বসেছে।এমনিই তো শ্বাশুড়ি দেখতে পারে না।এসব করলে শ্বাশুড়ির মন জয় করবে কিভাবে?”

মেহের মাথা নিচু করে ফেললো।মীরা হালকা হাসলো।তারপর বললো,

-“মা ই তো রান্নাঘরে যেতে বারণ করেছে ভাবীকে। ”
-“তাই বলে কি যাবে না?আমার আপার বয়স হয়েছে। সে কি আগুনের সামনে রান্না করতে পারে?”

মেহের হঠাৎ কি ভেবে যেন বলে বসলো,

-“এতদিন কে করেছে রান্না তাহলে?”

বেচারি এতটা ভেবে বলেনি কথাটা।মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগায় করে ফেলেছে।নাজমা বেগম চোখ বড় বড় করে বললেন,

-“সেই কৈফিয়ত কি আমি তোমায় দিব নাকি?আমার বোনই করেছে রান্না।ও ছাড়া কে করবে।”

মেহের ঢোক গিললো।মহিলা এত অস্বাভাবিক ভাবে বলছে কেন!নাজমা বেগম ঘর থেকে বের হতে হতে ‘আপা’ ‘আপা’ বলে বলে ডাকছে।মেহের ঢোক গিলে বললো,

-“মীরা?আমি কি ভুল কিছু বলে ফেলেছি?”
-“কই না তো।”(হেসে)
-“তাহলে উনি এমন করছেন কেন?”
-“যা ইচ্ছে করতে দাও।”

মেহেরকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে এসে উপস্থিত হলো মীরা।আরবাজ বাদে সবাই খাবার টেবিলে বসে।নাজমা বেগম কি যেন ফুসুরফুসুর করছেন শেহনাজ পারভীনের সাথে।শাহীন খান এসব দেখে বললেন,

-“এবার কি খাবার পাব?”

শেহনাজ পারভীন কিছু না বলে রুটি দিচ্ছেন প্লেটে।
মীরা টেবিলের কাছে যেতে যেতে বললো,

-“আমারো অনেক খিদে পেয়েছে মা।”

বলতে বলতে মেহেরকে তার পাশে বসিয়ে দিলো। শেহনাজ পারভীন ভ্রু কুঁচকে বললেন,

-“ওকে এখানে বসিয়েছিস কেন?ও কি এখানে খাবে নাকি?”

শাহীন খান এবার শেহনাজ পারভীনের দিকে ক্রোধ নিয়ে তাকিয়ে বলে উঠলো,

-“খাবার টেবিলে ঝামেলা হলে আমি কিন্তু এখন ঘর থেকে বের হয়ে যাব শেহনাজ।মানুষ কে মানুষ হিসেবে ভাবতে শিখো।ও কে?কি করেছে তোমায় ও?
কেন খেতে পারবে না এখানে?”
-“আমি কি একবারো বলেছি খেতে পারবে না?”
-“তোমার কথা শুনে তো তাই মনে হচ্ছে। এখন একটু চুপ করো।খেতে দাও।”

নাজমা বেগম বলতে লাগলেন,

-“বাদ দে আপা।খেতে বস।”
-“তোরাই খা।আজ আর খাবার ঢুকবে না আমার গলা দিয়ে।”

বলেই চলে গেলেন।নাজমা বেগমও ‘আপা’ ‘আপা’ বলতে বলতে পিছনে যাচ্ছেন।শাহীন খান পানি খেয়ে বলে উঠলেন,

-“এক নতুন নাটক শুরু করেছে বাসায়।মেয়েটাকে শান্তি দিচ্ছে না।”

মীরা মেহেরকে খাবার বেড়ে দিলো।মেহের কিভাবে খাবে?তার কি এই খাবার গলা দিয়ে নামবে?খিদেও মরে গেছে সেই কখন।গতকাল দুপুরে নিজের বাসায় খেয়েছিল।এরপর থেকে একটু পানিও পেটে পড়েনি।

-“খেয়ে নাও মা।লজ্জা পেয় না।”

শাহীন খানের কথা শুনে মেহের কি বলবে বুঝতে পারছে না।এমন সময় আরবাজ এসে উপস্থিত হলো।
ফর্মাল গেটআপে এসে টেবিলে তার বাবার পাশে বসে পড়লো।কারোর দিকে তাকানোর সময় তার নেই।টেবিলে বসে নিজের মত রুটি তুলে নিয়ে খাওয়া শুরু করে দিল।

-“অফিস যাচ্ছো নাকি?”
-“হ্যা বাবা।”
-“আজ তোমার যেতে হবে না।”

আরবাজের হাত থেমে গেলো।ভ্রু কুঁচকে তার বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,

-“কেন বাবা?”
-“কেন মানে!তোমার নতুন বিয়ে হয়েছে। আজ তোমার বউমা কে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার রিতী রয়েছে।তুমি কিনা বের হয়ে যাচ্ছো।”
-“আমাকে যেতে হবে বাবা।কাজে আমি ফাঁকি দিতে পারব না।”(গম্ভীর গলায়)
-“ফাঁকি দিতে বলছি না।ছুটি নাও।”
-“আমি আমার একটা ছুটি নষ্ট করব কেন বাবা?”
-“আমি বলেছি তাই।আজ শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার রিতী আছে শুনো নি?”

আরবাজ চুপ হয়ে গেল।এত কথা বলার ইচ্ছে বা সময় কোনোটাই তার নেই।এত কথা বলা তার পছন্দও না।
বাবা যে কেন তার কাজে এত বাঁধা দিচ্ছে সেটাও সে বুঝতে পারছে না।শেষমেশ চুপ থাকতে না পেরে বলে উঠলো,

-“বাবা তুমি শর্তের কথা ভুলে যেও না।”
-“….”
-“তুমি কিন্তু বলেছিলে যে তোমার কথা শুনলে আমার কথাও তুমি মেনে নেবে।”
-“এসব কথা এখন কেন?”
-“তাহলে কখন বলব বাবা?”(ভ্রু কুঁচকে)

শাহীন খান কিছু বললেন না।মেহের চুপচাপ তাদের কথা শুনলো।এতটুকু বুঝলো যে আরবাজ আর শাহীন খান দুজনই একই ধাচের।একই রকম গম্ভীর।কিন্তু কিসের শর্তের কথা যে হচ্ছে এটা বুঝতে পারলো না সে।আর বুঝতেও চাইল না।
মীরাকে উদ্দেশ্য করে আরবাজ বলে উঠলো,

-“মা কোথায়?”
-“ঘরে।”
-“খাবে না?”
-“না খেয়ে চলে গেছে।”

আরবাজ মেহেরের দিকে একনজর তাকিয়ে বললো,

-“এটাও নিশ্চয় এই মেয়েটার জন্যই।”

চলবে….