#প্রথম_ভালোবাসার_সুর❤️
#লেখনীতে:অনুসা_রাত(ছদ্মনাম)
#পর্ব:০৩
মায়ের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে আরবাজ বলে উঠলো,
-“তুমি খাওনি এখনো মা?”
শেহনাজ পারভীন তখন বিছানায় বসে কান্না করছেন আর পাশেই নাজমা বেগম বসে আছেন।শেহনাজ পারভীন আরবাজের কথার কোনো উত্তর না দিলেও নাজমা বেগম বলে উঠলেন,
-“দুলাভাই খেতে দিল কই আমার আপাকে।”
আরবাজ তার খালার কথার কোনো জবাব দিল না।অন্যের কথা শুনে কিছু বলা তার পছন্দ না। সে নিজেই তার মায়ের মুখ থেকে সবটা শুনবে।তাইত সে তার মায়ের সামনে বসে বলে উঠলো,
-“এই নাও খাবার এনেছি,খেয়ে নাও।”
-“আমার খাওয়া নিয়ে তোদের এত ভাবতে হবে না।”
-“কেন ভাবতে হবে না মা?”
-“ভাববি কেন?আমি কে?আমাকে কি তোরা গুরুত্ব দিস নাকি?”(নাকিকান্না কেঁদে)
-“এসব কি বলছো তুমি মা!তোমায় গুরুত্ব দিব না?এটা হতে পারে?”
বলতে বলতে রুটি ছিড়ে মায়ের মুখের সামনে ধরলো আরবাজ।শেহনাজ পারভীন মুখ ঘুরিয়ে বলে উঠলেন,
-“খাব না আমি। তুই তোর বাপ আর তোর বউকে খাওয়া।”
-“তুমি আগে খাও! ”
-“বললাম তো খাব না।”
-“কেন মা?কি হয়েছে? ”
-“তোর বাবা আমাকে যা নয় তাই বলে ওই মেয়েটার জন্য। ওই মেয়েটার জন্য আমাদের মধ্যে ঝগড়া হয়।”
-“….”
-“ওর জন্য কি এখন বুড়ো বয়সে আমরা আলদা হয়ে যাব?”
-“কিসব বলছ মা।”
-“যা সত্যি তাই।তোর বিয়ে দেয়ার আগে আমায় একবারো কল করেছিল তোর বাবা?জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনবোধ করেছিল?আমার অবস্থা টা বুঝ।আমিও তো একটা মা।”
-“আচ্ছা!কি করলে খাবে তুমি?”
-“আমি যা বলব তা কি তুই করতে পারবি?”
-“হ্যা বলে দেখো।”
ততক্ষণে মীরা এসে মায়ের ঘরে ঢুকেছে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাহিনী দেখছে।শেহনাজ পারভীন চোখ মুছে বলে উঠলেন,
-“তুই ওই মেয়েটাকে নিয়ে ওর বাপের বাড়ি যাবি না।”
আরবাজ ভ্রু কুঁচকে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো।শেহনাজ পারভীন আবার বলে উঠলেন,
-“আমি চাই না পাড়া-প্রতিবেশীরা এই বিয়ের খবর জানুক।দু-এক টা পরিবারে খবর লিক তো হবেই,ওটা সামলানো যাবে।তবে পুরো মহল্লায় ছড়িয়ে যেন না যায় সেই ব্যবস্থা করতে হবে।”
শেহনাজ পারভীনের সাথে তাল মিলিয়ে নাজমা বেগম বলে উঠলেন,
-“হ্যা,নাহলে আরবাজের লাইফে একটা দাগ লেগে যাবে।”
আরবাজ কিছু সময় কি যেন ভাবলো।আসলে তার বাবা তাকে এমনভাবে আদেশ দিয়েছে যে সে ওখানেও না করতে পারেনি।আর এখন তার মা তাকে রিতীমত বাধ্য করছে।মীরা এসব দেখে বিরবির করে বলতে লাগলো,
-“যেতে দিবে না সরাসরি বললেই হত।নাটক করার কি দরকার ছিল।আমার মা যে হঠাৎ এতটা পাল্টে যাবে আমি ভাবতেও পারিনি।”
কথাটা বিরবির করেই মীরা ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
আরবাজ কিছু সময় ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
-“আচ্ছা!তুমি যা বলবে তাই হবে।এবার খেয়ে নাও।”
শেহনাজ পারভীন বেশ খুশি হলেন।খুশি মনে খাবার খেয়ে নিলেন। নাজমা বেগমও বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন,
-“আরবাজের মত ছেলে হয় না!লাখে একটা!”
শেহনাজ পারভীন খাওয়া শুরু করলেন।
হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠতেই নাজমা বেগম বলতে লাগলেন,
-“মনে হয় বউমা রা এসে গিয়েছে!”
শেহনাজ পারভীন খাবারের প্লেট হাতে তুলে নিতে নিতে বললেন,
-“চলো চলো।”
উনি খাবারের প্লেট সমেত ই বের হয়ে গেলেন।পিছনে নাজমা বেগমও যাচ্ছে।আরবাজের একটা কল আসায় ও সেখানে দাঁড়িয়েই কথা বলতে লাগলো।মূলত অফিসে না যাওয়ার বিষয়ে তার একটা দরকারি কল এসেছে।
এদিকে ঘর থেকে বের হয়ে নাজমা বেগম দরজা খুললেন।দরজার বিপরীতে থাকা অন্তঃসত্বা মেয়েটিকে উদ্দ্যেশ্য করে হাসিমুখে বললেন,
-“বউমা!কেমন আছো?”
মেয়েটি হাসিমুখে একবার তার পাশে দাঁড়ালো হাসবেন্ডের দিকে তাকালো,পুনরায় নাজমা বেগমের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বললো,
-“এইত মা চলছে।”
শেহনাজ পারভীন এগিয়ে এসে বলতে লাগলেন,
-“আরে আরে ভিতরে এসো।শরিফ বাবা ভিতরে আয়।আয়শা,বউমা এসো।”
আয়শা আর শরিফ হাসিমুখে ঘরে ঢুকলো। ছয়মাসের অন্তঃসত্ত্বা আয়শাকে সোফায় বসিয়ে নাজমা বেগম আর শেহনাজ পারভীন সামনের চেয়ারে বসে পড়লেন।শেহনাজ পারভীন মীরাকে উদ্দেশ্য করে ডাকতে ডাকতে বললেন,
-“মীরা?তোর ভাবী এসেছে। পানি নিয়ে আয় তো।”
মীরা তখন মেহেরের সাথে বসে বসে কথা বলছিলো।মেহেরের এখন মেন্টালি সাপোর্টের খুব দরকার।
এমন সময় ডাক পড়ায় সে ঘর থেকে বের হলো।
মেহেরও বের হবে ভাবলো,একা একা সে কিইবা করবে।কিন্তু ঘর থেকে বের হতেই ধাক্কা লাগলো আরবাজের সাথে।হয়ত সে মীরার কাছে এসেছিল।কপালে টক্কর লাগায় মেহের বেশ ব্যাথা পেলো
এত শক্ত কপাল বলে কথা!মেহের কপালে হাত ঘষতে ঘষতে বললো,
-“ইশশ!দেখে চলতে পারেন না আপনি?”
-“তুমি এ ঘরে কি করছো?”
-“যাই করি না কেন।”
-“মীরার ঘরেই সকাল থেকে বসে আছো।কি ফন্দি আঁটছো?”
আরবাজের ত্যাড়ামার্কা কথা শুনে মেহেরের রাগ হলো।এমনিতেই তো রাগ ছিল শ্বাশুড়ির উপর।বেশ রাগ নিয়েই দাঁতে দাঁত চেপে সে বলে উঠলো,
-“ঘরে বসে বসে ফন্দি আঁটার মত মেয়েমানুষ আমি না।
সেটা আপনার পরিবারেই বেশি হয় হয়ত।”
আরবাজ বুঝলো না যে কথাটা তার মাকে উদ্দেশ্য করেই বলা হয়েছে।তাই ভ্রু কুঁচকে বললো,
-“মানে?”
-“কিছু না।”
আরবার আর কিছু না বলে মীরার ঘরে ঢুকলো। ততক্ষণে মেহের সেখান থেকে চলে গেছে।ড্রয়িংরুমে এসে দেখতে পেলো পরিবারের সবাই সেখানে উপস্থিত শুধু সে আর আরবাজ বাদে।আর শাহীন খান কিছু একটা বলছে।কথাটা এমন,
-“হুট করেই সবটা হয়ে গেছে বুঝলি শরিফ।এখন আমি চাইছি যদি আবারো অনুষ্ঠান করে বউভাত দিয়ে দেয়া হয় তাহলে তো ভালোই।সবার জানাজানি হবে তবে পজিটিভলি।আর আজ তো যাবেই বাপের বাড়িতে।”
ঠিক তখনই মীরা এসে মেহেরের পাশে দাঁড়িয়ে বললো,
-“এইযে এটা হলো নতুন ভাবী।”
মেহের সবাইকে সালাম দিলো।আয়শা শরিফের দিকে তাকিয়ে কি যেন ইশারা করলো।তারপর হালকা হেসে মেহেরকে উদ্দেশ্য করে বললো,
-“খালুমশাই!ভাবী তো মাশাল্লাহ সুন্দরী আছে।ভাবী?এদিকে আসুন না।”
মেহের কি বলবে বুঝতে পারছে না।মীরা পাশ থেকে বললো,
-“এটা নাজমা খালার ছেলের বউ।মা অনেক আদর করে।শরিফ ভাইয়াকে নিজের ছেলের মত ভাবে।তাই আয়শা ভাবীরও খাতির বেশি।যাও..”
বিরবির করে বলা কথাগুলো মেহের শুনলো।পা বাড়িয়ে যেতে নিবে এমন সময় শেহনাজ পারভীন বলে উঠলেন,
-“তুমি ওদিকে যাবে কেন?এতক্ষণ ধরে সবটা শুনেছি বলে কি যা ইচ্ছে তাই করবে?তুমি ওর কাছে যাবে না।”
শাহীন খান ভ্রু কুঁচকে বললেন,
-“কেন শেহনাজ?”
-“কেন মানে!দেখছ না বউমা অন্তঃসত্ত্বা।”
-“তাতে কি হয়েছেটা কি?”
আয়শাও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-“তাতে কি হয়েছে খালামণি।আমি নতুন বউকে দেখব না?আমি কি কাছে গিয়ে দেখব?”
-” না না তোমার উঠতে হবে না।”
নাজমা বেগম আয়শার পাশে বসতে বসতে বললেন,
-“একটা কাহিনী আছে অনেক বড়।পরে বলছি তোমাকে।”
-“কাহিনী যাই হোক না কেন মা।আমি অন্তঃসত্ত্বা বলে আমার কাছে আসবে না এটা কেমন নিয়ম?আপনারাও তো পাশে বসে আছেন।”
-“আমরা আর ও কি এক হলাম?”(ভ্রু কুঁচকে)
শাহীন খান হেসে ফেললেন।সাথে মীরাও।হাসতে হাসতে বললেন,
-“তাহলে কি তোমরা মেয়ে না?”
বেশ ভারী ভারী কথা হচ্ছে সেখানে।শেহনাজ পারভীন কিছু বলতে যাবেন তার আগেই আরবাজ এসে উপস্থিত হলো।আর কিছু বলার সুযোগ ও পেলেন না।
আরবাজ এসে শরিফের সাথে কুশল বিনিময় করে আয়শাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
-“ভাবী?প্রিন্স নাকি প্রিন্সেস?”
-“আল্লাহ যা দেয় ভাই।”
-“আমার কিন্তু প্রিন্স লাগবে।”(হেসে)
সবাই আবারো হাসি তামাশায় মেতে উঠলো।মেহেরকে নিয়ে বেঁধে যাওয়া একটু আগের কুরুক্ষেত্র টা চাপা পড়ে গেলো।মীরা এসে ততক্ষণে ফিসফিস করে মেহেরকে আয়শার ব্যাপারে সব বলছে।শাহীন খান আরবাজকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
-“তোমরা রেডি হচ্ছো না কেন?যাবে না?”
-“না বাবা,যাবো না।”
শাহীন খান ভ্রু কুঁচকে তাকালেন আরবাজের দিকে।আরবাজ বেশ স্বাভাবিক ভাবেই বলেছে কথাটা।
নাজমা বেগম আর শেহনাজ পারভীন বেশ খুশি হলেন।দুজনে চোখাচোখি করে বেশ ইশারায় কথাও বলে নিলেন।
-“কেন যাবে না?”
শেহনাজ পারভীন এবারে বললেন,
-“আমি বলেছি তাই যাবে না।কেন যাবে?”
-“কেন যাবে মানে?ওদের বিয়েটা কোনো বিয়েই না।”
-“এতগুলো মানুষের সামনে কবুল বলে বিয়ে করেছে।আর তুমি বলছো বিয়েই না।”
-“বিয়েটা কি ছেলেখেলা নাকি।ওই মেয়ে আর ওর পরিবার ফাঁসিয়ে বিয়ে করিয়েছে।”
-“আমিই প্রস্তাব দিয়েছিলাম ওদেরকে শেহনাজ।”
এভাবে এক কথা দু কথায় ওরা ঝগড়া শুরু করে দিচ্ছে। আরবাজ আর শরিফ চেষ্টা করছে দুজনকে থামানোর।একটা সময় আরবাজের হঠাৎ করে মনে পড়লো তার মায়ের বলা কথাটা।তারমানে কি সত্যিই মেহেরের জন্য তার বাবা-মায়ের ভিতর এতটা দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে? একটা বাইরের মেয়ের জন্য তারা কেন সাফার করবে?
চলবে…..