প্রিয়অপ্রিয়ের সংসার পর্ব-৫৪+৫৫+৫৬+৫৭

0
215

#প্রিয়অপ্রিয়ের_সংসার
#লেখিকা_তামান্না(আল রাইয়ান)
#পর্ব_৫৪_৫৫ (অপ্রত্যাশিত অভিযোগ খু’নী😔)

“শেহরীনা মামুনি তোমার মা কোথায় গেল জানো কী! তার কাছে স্টোর রুমের চাবি আছে বললেন সিদ্দিক ভাইজান। দেখো তো তোমার মা কোনো ভাবে রান্নাঘরের মধ্যে আটকে আছেন কি-না!”

নাছির উদ্দিন চিন্তিত হয়ে শেহরীনার কাছে কথাটা বলে ফেলেন। যাবত একঘণ্টা ধরে স্ত্রীর খোঁজ করছেন। না পেয়ে শেষমেশ নির্লজ্জের মত নিজের মেয়ের কাছেই জিজ্ঞেস করে বসেন। শেহরীনা মৃদু হেসে বলে,
‘বাবা আপনি তো মাকে চোখে হারাচ্ছেন। চাবি খোঁজা তো বাহানা মাত্র!’
‘দিবো একটা পঁচা মেয়ে। খুব পেঁকে গিয়েছো তাই না!’
শেহরীনা ফিক করে হেসে দিলো। সে মাথা নেড়ে বাবার প্রশ্নাতীত রক্ষার্থে রান্নাঘরে গেল। কিন্তু বাবুর্চিদের সঙ্গে দুয়েক কাজের মহিলা ছাড়া আর কাউকে নজরে পড়ল না তার। সে এবার উৎকণ্ঠা নিয়ে রান্নাঘরের দরজা পেড়িয়ে বের হতেই কারো সাথে ধাক্কা খেয়ে যায়‌। অপর ব্যক্তি পড়তে নিলেও শেহরীনা সঠিক সময়ে আঁকড়ে ধরে বাঁচিয়ে নেয়।
‘ক্ষমা করবেন খেয়াল করিনি..।’
যৌগিক বাক্য সম্পূর্ণ করার পূর্বেই দেখল ধাক্কা লেগেছে তার নিজের মায়ের সঙ্গেই। রূপালি বেগম ও ইতস্ততবোধ করলেন। হুট করে মেয়ে সামনে চলে আসবে বলে ধারণা করেননি। মায়ের অস্থির, ভয়ার্ত চেহারা দেখে শেহরীনা বুঝল তার মায়ের সঙ্গে কোনো ঘটনা ঘটেছে নিশ্চয়ই! সে মায়ের কাঁধ জড়িয়ে তৎক্ষণাৎ অতিথিদের চোখের আড়ালে নিজের রুমে এনে দরজা আটকে দেয়। রূপালি বেগম এখনো ভীতি হয়ে আছেন। তার মনমাঝারে সেই বাড়ির মেঝেতে থাকা র’ক্তের দাগ চোখের মধ্যে আবছায়া হয়ে ভাসছে। মা কে ঘাবড়াতে দেখে শেহরীনা টেবিলে থাকা জার থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে তা মায়ের দিকে এগিয়ে দিলো। রূপালি বেগম তৎক্ষণাৎ পানি নিয়ে ঢকঢকে খেয়ে নেন। জোরালো এক দম ছেড়ে শান্ত হলেন তিনি। শেহরীনা মায়ের মুখখানা স্বাভাবিক হয়েছে বুঝতে পেরেই মায়ের পাশে ঘেঁষে বসে শুকনো অধর জ্বিভ দিয়ে ভিজিয়ে শীতল চাহনি ফেলল।
রূপালি বেগম মেয়ের প্রশ্নাতীত নজর ধরতে পারলেন। তিনি স্বেচ্ছায় বলে দেন।

“মা আমি তোর বা.. ঐ জা’নো’য়ার এর বাড়িতে গেছিলাম।”

শুনেই আকস্মিক উত্তেজিত হয়ে গেল শেহরীনা।

“কী কী বললেন মা! মা আপনি ঐ ঐ বাড়িতে গেছিলেন! কেনো মা কেনো গিয়েছিলেন! ঐ বাড়ি অভিশপ্ত জানেন না আপনি!”

মেয়ের অস্থির চিত্ততা দেখে তিনি নিজেও বিচলিত হয়ে গেলেন। মেয়েকে সামাল দিতে জড়িয়ে নিতে গেলে শেহরীনা ছিটকে দূরে সরে যায়। মাথা চেপে ধরে বিড়বিড় করে বলে উঠে,

ওও ঐ বাড়ি অভিশপ্ত, আমার সন্তান কেড়ে নিয়েছে। ঐ বাড়িতে কেনো গিয়েছিলেন আপনি মা! আআপনি কোনো ভাবে…।”

মুখে হাত চেপে ধরল শেহরীনা। রূপালি বেগম হতভম্ব হয়ে গেলেন। মেয়ের মানসিক অবস্থা বিগড়ে যাচ্ছে দেখে জড়িয়ে নিতে চাইলে শেহরীনা তার মায়ের পানকৃত গ্লাসটি মেঝেতে ছুড়ে মা’রে। তিনি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেন। মেয়ে তার পূর্ণ কথা শুনতেই নারাজ! শেহরীনা চিল্লিয়ে উঠতে নিলে কেউ তাকে চট করে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নেয়। এতে অশান্ত শেহরীনা মুহূর্তেই শান্ত হয়ে গেল। সারোয়ার কে দেখে রূপালি বেগম এর কলিজায় যেনো পানি এলো। তিনি কৃতজ্ঞ ভরা দৃষ্টিতে জামাইবাবুর দিকে তাকান। সারোয়ার চোখের আশ্বাস দিয়ে মৃদু গলায় বলে,
‘মা আপনাকে বাবা খুঁজছেন। জলদি যান আমি শেহরীনা কে নিয়ে আসছি।’
রূপালি বেগম জামাইবাবু কখন এলো, কেমনে এলো তা নিয়ে মাথা ঘামালেন না। মেয়ের সোহাগ তার সঙ্গে আছে এতেই তিনি স্বস্তি ভরা শ্বাস ফেলে রুমের দরজা খুলে বেরিয়ে যান। যাওয়ার পূর্বে অবশ্য ভিড়িয়ে দেন। সারোয়ার শেহরীনা কে বিছানার উপর বসিয়ে তার দুগাল আঁকড়ে ধরল। শেহরীনা এখনো চোখজোড়া বড় বড় করে আছে। সাইকোলজিক্যাল দৃষ্টিতে দেখলে শেহরীনার উপর ভীষণ বাজে প্রভাড় পড়েছে সন্তান হারানোর! তা সারোয়ার আপন দৃষ্টিতে অনুধাবন করতে পারছে। তবে এর নিশ্চয়তা কতটুকু জানা নেই তার!

“চিন্তা করো না কৃষ্ণবউ। আমি থাকতে তুমি কখনো ঘোরের মধ্যে গুলিয়ে যাবে না। এই হৃদয়ে প্রাণ থাকবে যতদিন ততদিন আমি তোমাকে ভুলিয়ে রাখব সকল আসন্ন বিপদ থেকে।”

মনের গহীনে নিজের সাথে পণ করল সারোয়ার। শেহরীনা কে বাস্তবিক জগতে ফিরিয়ে আনতে তার অধরজোড়ায় নিজেকে ডুবিয়ে নেয়। শেহরীনা চমকে যায়। পরক্ষণে তার আপন পুরুষের ছোঁয়া পেয়ে নির্মল হয়ে এলো তার হৃদস্পন্দন। সারোয়ার চোখ বুঁজে থাকা অবস্থায় স্ত্রীর স্পর্শ এর গভীরতা ধরতে পারল। শেহরীনা নিজ থেকেই সাড়া দিচ্ছে। তবে সে চাইছে না আজ গভীর ছোঁয়ায় আবদ্ধ হতে! তাদের মৃত সন্তানের জন্য দোয়ায় সামিল হবে তারা। বিধেয় সে তার ছোঁয়া বিচ্ছিন্ন করে নিলো। শেহরীনার কপাল কুঁচকে এলো। ভ্রু জোড়া নাড়িয়ে ‘কী হয়েছে’ ইঙ্গিত করল। সারোয়ার তার স্ত্রীর আনচান ভাব পূর্ণ মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হেসে বলে উঠল।

“বউয়ের বুঝি চুমু খাওয়ার শখ মিটেনি। সে কী আর মাহফিলে অংশ গ্রহণ করবে না! এখনি আদর কী খেয়ে নিতে মন চাইছে!”

চোখজোড়া ডিমের মত বড় হয়ে গেল শেহরীনার। মাথার মধ্যে দলা পাকিয়ে পুরো ঘটনা অর্থাৎ স্মৃতি শক্তি ফিরে পেয়েছে মত ফট করে দাঁড়িয়ে গেল শেহরীনা। আমতা আমতা করে সারোয়ার এর হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। সারোয়ার ভ্রু কুঁচকে তাকায়। কিঞ্চিৎ মুহূর্ত পূর্বেও চুম্বন করার জন্য অতিষ্ঠ হচ্ছিল মেয়েটা‌। যেই না মাহফিল এর কথা স্মরণ করিয়ে দিলো ওমনিতে পাল্টি খেল। মুখ বাঁকিয়ে বলে,
‘পালিয়ে যাচ্ছো না তাড়িয়ে দিচ্ছো!’
‘যেইটা আপনি ভাবেন। তবে এখন কিছু হবে না। ছাড়েন অনেক কাজ বাকি আছে। আর মা..।’
রূপালি বেগম এর কথা মাথায় আসতেই মিইয়ে গেল শেহরীনা। সারোয়ার ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে ফিচেল হেসে বলে,

“চিন্তে করো না কী হয়েছে তা! মাহফিল শেষ হওয়ার পর আস্তেধীরে জানা যাবে। এখন নিজেকে স্বাভাবিক করে বাহিরে চলো। সবাই অপেক্ষা করছে।”

শেহরীনাও আর ঘাঁটল না। মাথা নেড়ে স্বামীর সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল। দূর থেকে একজোড়া নিষ্প্রাণ চোখের মালিক তাদের কে দেখতে পেল। তাদের যাওয়া দেখেই চোখ ফিরিয়ে নেয়।

“তুমি আমার নিষিদ্ধ প্রিয় নারী। আমি অভিমান থেকে অভিযোগ করা বন্ধ করে দিয়েছি। পথচলা প্রান্তে আর যাই হোক তোমার দিকে ফিরিয়ে তাকাব না।”

‘এই চলো, চলো ঐ যে আঙ্কেল আন্টি কে দেখা যাচ্ছে।’
তনুদির কথায় কায়েসাম তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। দুজনে প্রবেশ করে। তাদের পিছু পিছু এসেছেন রুফিয়া সাইমুম এবং ইদরিব সাবেক। রুফিয়া সাইমুম অনুশোচনায় দগ্ধ হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। ছেলের মুখ থেকে শেহরীনার করুন ঘটনা শুনেছেন। যার কারণে তার মনে অনুশোচনায় কম নয়। ছেলে বাড়িতে ফিরে এলেও তার মুখোমুখি হয়ে টু শব্দ অব্দি করল না। এক মায়ের কাছে ছেলের নিশ্চুপ থাকা যেনো বড্ড অসহায়জনক। ইদরিব সাবেক কে দেখতে পেলেন মোঃ আবু সিদ্দিক। শেহরীনার ভার্সিটির অধ্যক্ষের ব্যাপারে জেনে ছিলেন তিনি। বিধেয় চিনতে অসুবিধা হলো না তার। হাস্যোজ্জ্বল মুখে এগিয়ে কোলাকুলি করেন। ইদরিব সাবেক সংবর্ধনা গলায় বলেন,

“ভাইজান আপনার ছেলের নামে অনেক শুনেছি।‌ যেখানে বাবাই এতটা প্রতিষ্ঠিত সেখানে ছেলে যে দ্বিগুণ হবে না তা ভাবাও অন্যায়। মাশাআল্লাহ আপনাদের বাড়ি যেনো সবসময় হাসিখুশি থাকুক।”

‘জ্বি ভাইজান আপনাদের ও। আপনার ছেলে আর ছেলের বউ আসেনি!’
‘জ্বি এসেছে ভেতরেই গেছে।’
‘ওহ তাহলে পরিচয় হয়ে নেওয়া যাবে। আসুন না আপনারা দাঁড়িয়ে আছেন কেনো!’

ইদরিব সাবেক এবং তার সহধর্মিণী কে সাদরে গ্রহণ করেন মোঃ আবু সিদ্দিক। রূপালি বেগম ও নাছির উদ্দিন এর সঙ্গে এসে ইদরিব সাবেক এর সঙ্গে কুশল বিনিময় করে নেন।লেখিকা_তামান্না(আল রাইয়ান)
বাড়ি ভরপুর হয়ে গেলে সারোয়ার ভীড়ের মধ্যে থেকে পাশ কেটে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল ময়দানে। সেখানে মিউজিক বক্স এবং মাইক এর ব্যবস্থা করা আছে। তার লাগিয়ে মাইক হাতে নিলো। ময়দানে থাকা কাজের লোকদের চোখের ইশারায় ফ্যান চালু করার ইঙ্গিত দেয়। তারা ফ্যান চালু করে দেয়। গরম , গুমোট হওয়া পরিবেশ যেনো ধীরে সুস্থে শীতল হতে লাগল। প্রায় ১৫টা ফ্যান এর ব্যবস্থা করেছেন মোঃ আবু সিদ্দিক। নাছির উদ্দিন ও কম নয়। তিনিও ১০টা স্ট্যান্ড ফ্যানের ব্যবস্থা করেছেন। সারোয়ার ইমাম সাহেব এর খোঁজ করল জাফরান থেকে। জাফরান ভালো দক্ষ ইমাম সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করে মাহফিল এ আসতে বলেছে। সারোয়ার এর জিজ্ঞাসাবাদে বলে উঠল।
‘ইমাম সাহেব চলে এসেছেন। গাড়ি আসছে বাহিরে। যাই আমি নিয়ে আসি।’
সারোয়ার মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। ইমাম সাহেবের সঙ্গে দুজন সঙ্গি এসেছেন তাদের কেও তারা সাদরে গ্রহণ করে নেন। সারোয়ার সময় ব্যয় করল না বেলা ঘনিয়ে যাচ্ছে। আসরের আগে তারা মাহফিল শেষ করতে চাইছে। মাইক হাতে নিয়ে সারোয়ার সবার উদ্দেশ্যে বলে,
‘দয়া করে আপনারা আসন গ্রহণ করুন। ইমাম সাহেব চলে এসেছেন। আস্তে ধীরে দোয়া মাগফিরাত আরম্ভ হবে।’
শালীন কথায় তারা আসন পেতে বসে যায়।
মাহফিলের সময়…
রূপালি বেগম শুভ সময়ে মেয়ে এবং জামাইবাবু ছাড়া অন্য কাউকে কিছু ভুলেও বলেননি। দোয়া মাহফিল আরম্ভ হলে দীর্ঘ এক লম্বা সময় ধরে তারা ছোট এক নিষ্পাপ প্রাণের জন্য দোয়া চাইল। তারা মাহফিল শেষে একেকজন জুম্মার নামাজ আদায়ে দাঁড়িয়ে যান। মেয়েগণ একসাথে ময়দানের অন্যপাশে। ত্রিশ মিনিট পর নামাজ শেষে ইমাম সাহেব হাত তুলে দোয়া করেন। মুসল্লিগণ ইমামের সহিতে নামাজ শেষ করে নেয়। শেহরীনা রীতিমত দু’হাত তোলা অবস্থায় কাঁদছিল। সারোয়ার নির্বিকার। আজ প্রথম সে তার স্ত্রী কে সামলে অথবা আগলে নেয়নি। কাঁদুক বাচ্চার জন্য কাঁদা কষ্টের নয়! সওয়াবের বটে। সারোয়ার নিজেও বাবা হওয়ার অনুভূতি হতে বঞ্চিত হয়েছে।

“ইয়া মাবুদ আপনি আপনার বান্দার দিক থেকে কখনো চোখ ফিরিয়ে নেন না। যতবার আপনার বান্দা হারিয়েছে, ততবার আপনি হাত ভরে দিয়েছেন। ইয়া মাবুদ, ইয়া রহমান আমি আর আমার স্ত্রীর অগণিত পাপ হয়ে থাকলে ক্ষমা করার মালিক আপনি‌ আল্লাহ! আমাদের মাথার থেকে পাপের বোঝা কমিয়ে শীতল অন্তর, শীতল প্রাণ দান করুন। এই পবিত্র দিনে দোয়ার মাহফিল দ্বারা আমরা আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে আপনাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করছি। আমাদের হাতে কিছু নেই মাবুদ, কিছুই নেই। মাবুদ আপনি আমাদের উপর চোখ তুলে তাকান। আমাদের মাথায় আপনার রহমতে হাত বাড়িয়ে দেন। আমিন।”

সারোয়ার প্রার্থনা করে নিজ শরীরের সঙ্গে স্ত্রীর কপাল ছুঁয়ে ফুঁ দিল। শেহরীনার কান্নাও থেমে গিয়েছে প্রায়। মেয়েটা আজ কালো স্টোন বসানো সাদা খিমার পড়েছে। স্নিগ্ধ এক মুসলিম নারীর রূপ তার মধ্যে ফুটে উঠেছে। মেয়েটার মুখখানা যেনো পূর্বের চেয়েও নূরানী লাগছে। সে নিজেও আজ মাদ্রাসার পুরুষদের পোশাক জোব্বা এবং টুপি পরেছে। তার জোব্বার মাথাটা আবার বড় অর্থাৎ একটা স্কার্ফ এর মত ঝুলিয়ে রাখা। সেই স্কার্ফটি ঝুলিয়েই রাখল। কারণ তার মাথায় টুপি আছে। স্নিগ্ধা নারীর ভেতরকার বেদনা সে বুঝে। কেননা সেই তো মা। তার গর্ভেই তো এসেছিল ছোট প্রাণটি! সেই প্রাণ হারিয়ে ফেলার অনুভূতি খুব কষ্টদায়ক। সারোয়ার শেহরীনা কপালে চুমু দিয়ে বুকে জড়িয়ে রাখল। পুরো পরিবেশে পিনপতন নিরবতা। ইমাম সাহেব বসা থেকে উঠে ধীমি পায়ে হেঁটে শেহরীনা আর সারোয়ার এর কাছে এসে তাদের মাথা ছুঁয়ে দোয়া দিলেন। তাদের হাতে কুরআন মাজিদ এর কিতাব উপহার স্বরূপ দিলেন। শেহরীনা সাদরে গ্রহণ করে সবার উদ্দেশ্যে বলে,

“আপনাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অনুগ্রহ করে সবাই আসন পেতে বসুন।”

শেহরীনার শালীন কথায় একে একে সবাই পাটিতে হাঁটু গেড়ে আদবের সহিতে বসে গেলেন। মোঃ আবু সিদ্দিক এবং নাছির উদ্দিন পরপর বার্বুচিদের সহায়তায় বড় বড় পাতিলখানা উম্মুক্ত ময়দানে এনে রাখেন। শেহরীনা মহিলাগণের কাছে গিয়ে আদবের সহিতে খাবার পরিবেশন করছে। সারোয়ার তার বাবা-শ্বশুরের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছে। কায়েসাম ও বসে নেই। তার অনুভূতি কে মাটি চাপা দিয়ে সেও সামিল হয়েছে। কেননা তার প্রিয় এক নারীর গর্ভের সন্তান ছিল মৃত প্রাণটি! যাকে সে সময়ের অবজ্ঞায় বাঁচাতে পারেনি। যদি পারতো তবে এক মায়ের থেকে তার কোল হারাতে হতো না। কায়েসাম খাবারের বাটি রেখে বিরতি সমেত উঠানে চলে এলো। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল পদ্মিতার প্রতিচ্ছবি।
সেই তো ছিল যার মাধ্যমে সে শেহরীনা অব্দি পৌঁছে ছিল। পদ্মিতা গাঁ ঢাকা দিলেও কায়েসাম এর চোখ ফাঁকি দিতে পারেনি। সেদিন ছিল প্রচণ্ড গরমের দুপুরবেলা। পদ্মিতার ঝলক একবার দেখেছিল ফার্মেসিতে। কায়েসাম সেই ফার্মেসির থেকে তার মা রুফিয়া সাইমুম এর জন্য মেডিসিন কিনতে এসেছিল। মেডিসিন কেনার সময়ে পদ্মিতা রাগের গলায় ফোনে গা*লিগা*লাজ করছিল শোয়াইব মিলদাজ কে।

“মেয়েটা অপয়া, মুখপুড়ী। তার আবার জ্বর আসলেও কী যায় হ্যাঁ! বুঝি না বাপু তোমার আবার বাপ নামক আলগা পিরিতি কেন জাগতেছে!”

“তোমার থেকে এডভাইস শুনতে বসে থাকিনি আমি। আমার মেয়ের শরীর অসুস্থ বলেছি না তোমাকে। এখনিই ওষুধ কিনে আনো। খালি নিজের সুবিধা ভাবো। আমার মেয়ের কিছু হলে তোমাকে ছেড়ে কথা বলব না বলে দিলাম।”

শোয়াইব মিলদাজ ও কড়া গলায় ফোনের অপরপাশে থেকে কথা শুনিয়ে রেখে দিয়েছিলেন। যার ফলস্বরূপ পদ্মিতাও চালাকি করে ফার্মেসির থেকে‌ গর্ভপাত করানোর জন্য পিল কিনে নিয়ে ছিল। তখনো কায়েসাম সন্দেহান ছিল। সে পিছু করতে চেয়েও পারেনি সেদিন। কারণ পদ্মিতা তার চোখের সামনেই হারিয়ে গিয়ে ছিল। হারানোর সূত্রপাত ঘটে হঠাৎ ট্রাফিক সিগন্যাল চালু হওয়ায়। পদ্মিতা রাস্তা পার করে ফেললেও কায়েসাম পারেনি। বিধেয় সে হারিয়ে ফেলেছিল। তারপর তার সময় হয়নি। সে খোঁজ পেলেও তার হাত থেকে মূল্যবান সময়টি হারিয়ে যায়। পারেনি সে তার প্রিয় নারীর কোল রক্ষা করতে! এ নিয়ে তার আক্ষেপ রয়ে যাবে দ্বিতীয়বার।

“আমি তোমায় হৃদয় থেকে মাটি চাপা দিলাম কৃষ্ণকুমারী। তোমার দুঃখের দিনে একপল তাকাওনি। কারণ আজকের দিন তোমার কাছে শোকের দিন। এ শোক আমি কাটিয়ে কাটিয়ে হাঁফিয়ে গিয়েছি। তাই আমি চাই তুমি নিজেকে সামলে উঠো। এই দোয়া আমার চিরজীবন রয়ে যাবে।”

“এই জামাই এখানে একলা দাঁড়িয়ে কী করছো হুম!”

কায়েসাম এর ধ্যান ভাঙ্গে মিষ্টি কণ্ঠের কারণে। মুখ ফিরিয়ে দেখে তনুদি হাস্যোজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে আছে। মেয়েটার স্নিগ্ধ চাহনি দেখে কায়েসাম তার মনের ভাবনা কে মাটির মধ্যে খুঁড়ে ফেলল। ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে হাসি ঝুলিয়ে বলে,

“তোমাকে ছাড়া আমি একলা খেতে পারি না জানো না!”

লাজুক হাসল তনুদি। সে নিজেও খেতে পারছিল না। মন‌ বলছে, কায়েসাম তার অপেক্ষায় থাকবে। বিধেয় সে মেয়েদের ভীড় থেকে উঠে উঠানে এসে যায়। এসে যে, কায়েসাম কে পেয়ে যাবে তা তার ধারণাতীত ছিল। মনের খুশিতে আটখানা হয়ে কায়েসাম এর হাত ধরে তারা উঠানে একটা জায়গা করে বসল। গোধূলী লগ্নে সূর্য অস্তমিত হবার সময় আরম্ভ হয়েছে। স্বামী স্ত্রী এ মিলবন্ধন দেখে রুফিয়া সাইমুম স্বস্তি পেলেন। শেহরীনা দূর থেকে দেখতে পেয়ে তৃপ্তির হাসল।
‘মাশাআল্লাহ আপনাদের একসাথে দেখে সত্যিই মনের বোঝা কম হয়।’
‘তাই বুঝি মিসেস সিদ্দিকী!’
‘হুম আপনি জানেন উনি…।’
‘পাস্ট ডাজেন্ট ম্যাটার। লিভ দ্যা পাস্ট ফরএভার। আইম ইউর প্রেজেন্ট এন্ড ফিউচার লেট মি অলওয়েজ ইন ইউর লাইফ।’
‘আপনি ছাড়া আমি ভাবতেও ভয় পায়। আপনি না থাকলে বোধোদয় আমি ম..।’
‘যখন তখন মরার কথা মুখে আনবে না কৃষ্ণবউ। তুমি যেমন আমি বিনা অচল তেমন তুমি বিনা আমি অচল। স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন হলো অটুট বন্ধন। দেওয়া-নেওয়ার মালিক, রিজিকদাতা হলেন আল্লাহ! বান্দা কে কখনো তার অতীত নিয়ে আফসোস করতে নেই। কারণ আল্লাহ বান্দা কে তার ধারণার চেয়েও অধিক দিতে ভালোবাসেন।’

শেহরীনা আবেগী হয়ে গেল ভীষণ। সারোয়ার তার হাত আগলে উঠানের অন্যপাশে গিয়ে বসল। তাদের সামনে পুকুর। পুকুরের মধ্যে গোধূলি লগ্নের আবছায়া আলো ছড়িয়ে চারিপাশ ঝিকিমিকি করছে। সারোয়ার স্ত্রী কে বসিয়ে রেখে নিজে গেল খাবার আনতে।
অন্যত্রে, তনুদি গেল জল আনার জন্যে। শেহরীনা আর কায়েসাম একে অন্য থেকে প্রায় কয়েক মিনিটের দূরত্বে বসে আছে। কায়েসাম দেখল গোধূলির লগ্নে ফুটে উঠা এক লগ্নি কন্যা! খিমার পরিহিত স্নিগ্ধ নারী।

“যবে যবে তোমায় দেখি তবে তবে কেনো এ হৃদয় কেঁপে উঠে। কেনো অতিষ্ঠ করে দেয় জিজ্ঞেস করার জন্য যে, কেনো তুমি আমার হলে না! খুব কী বেশি চাওয়া হয়েছিল তা!”

পরক্ষণে কায়েসাম পিঠ ঠেকিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

“এ জমিন দিনকে দিন আমার জন্য অসহ্য হয়ে উঠছে। পারব না আমি তোমায় অন্যের সাথে দেখে বাঁচতে। জমিনটাও বেঈমানি করছে আজকাল! হুটহাট চলে আসো তুমি আমার কল্পনায়, অভিমানে।”

তনুদি এবং সারোয়ার ফিরে আসল। কায়েসাম তাদের দিকে একপলক দেখে ঘাড় ঘুরিয়ে আড়পলক শেহরীনার দিকে চাইল। তাচ্ছিল্যের হেসে নিজ মন কে ধিক্কার জানিয়ে ম্লান কণ্ঠে বিড়বিড়ে বলে,
‘গল্পটা অন্যরকম হলেও পারতো, আমার কাব্যে তুমি থাকলেও পারতে। যদিওবা তুমি চাইতে তাহলে কল্পনায় সাজিয়ে রাখতাম।’

“এই জামাই খাইয়ে দাও।”

তনুদি বসে পড়ল। সে ভাত মেখে লোকমা তুলে ধরে। তনুদি লোকমাটা মুখে পুরে পানি খাইয়ে দিলো স্বামী কে।
সারোয়ার পরম আবেশে মুগ্ধতা নিয়ে স্ত্রীর যত্ন নিচ্ছে। শেহরীনার কোল খালি তবুও সে সুখ সুখ অনুভব করছে সারোয়ার এর সঙ্গে। আচ্ছা সে তো ভুলেই গিয়ে ছিল তাদের বিবাহ সময়কাল কতটা পেড়িয়ে গেল! ভাবা যায় প্রায় এক বছরের কাছাকাছি হতে চলেছে। দিন কাল পেরিয়ে গেলেও হিসেব করার সময় অব্দি হয়ে উঠেনি তাদের। সারোয়ার এর আহ্লাদ দেখে শেহরীনার মনে অতীত ভেসে উঠল। সারোয়ার ও একই ভঙ্গিতে তাকিয়ে খেয়ে খেয়ে বলে,

“কখনো ভেবেছিলে এই রিজেক্ট করা পাত্রকেই একদিন মন দিয়ে বসবে। শুধু যে মন তা নয় রীতিমত আঁকড়ে ধরতে পাগলামি করবে!”

শেহরীনার গালে লালাচে আভা চলে এলো। লোকমা গিলতে গিয়েও যেনো চর্বণ করতে পারছে না। সারোয়ার লোকমা তুলে দিয়ে পুনরায় বলে,

“মন থেকে তবে ভালোবেসেই ফেললে!”

“স্বামী নামক পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছি। সেখানে ভালোবাসা শব্দটা দীর্ঘায়িত করে না, করে আমাদের মধ্যকার বিশ্বাস। বিশ্বাস আছে বলেই আমি অন্ধ চোখেও আপনার কে অনুভব করতে পারি। এই বিশ্বাসের তোড়টা আপনার কাছেই বন্দি! এজন্যই মনে হয় আমি আর কারো কথায় পটেনি।”

সারোয়ার একরাশ আনন্দে হেসে উঠল। স্ত্রীর ফাজলামি বুঝতে পেরে নিজেও দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে,

“হাহা হা তাহলে নতুন কাউকে আনা যাক।”

“কী কী বললে নতুন কাউকে মানে! আমি ছাড়া অন্য মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকালে আপনা কে আমি ঘরছাড়া করে দেবো।”

“বাবাগো ভয় পেয়েছি মহারানী। খেয়ে নিন খেয়ে এই অধম কে উদ্ধার করুন।”

“আজ্ঞে মানলাম।”

খুনসুটি করে তারা খেয়ে উঠে যায়। লেখিকা_তামান্না(আল রাইয়ান)তনুদি কায়েসাম এর সাথে হাত ধুতে গিয়েছে কলপারে। সারোয়ার হাত ধুয়ে শেহরীনার কাছে এলো। বাড়ির ভেতর যেতে নিলেই তাদের কানে ভেসে আসল অনাকাঙ্ক্ষিত এক শব্দ। বিকট শব্দে এই গ্রাম্য পরিবেশে পুলিশের হঠাৎ আগমন যেনো অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। রূপালি বেগম ঘাবড়ে যান। তিনি তো কাউকে জানাননি। তবে পুলিশ কে খবর দিলো! ভাবনায় তলিয়ে দেখতে পারলেন না। মোঃ আবু সিদ্দিক ও অবাক। মেহমান গণের ভীড় কমেছে প্রায়। সারোয়ার শেহরীনা বুঝতে পেরেছে তাদের হঠাৎ আগমন। তবে তারাও কোনো কমপ্লেইন করেনি। পান খেতে খেতে এক অর্ধ বয়স্ক পুরুষ বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে উঠল।

“এ বাড়ির মালিক কে!”

মোঃ আবু সিদ্দিক এগিয়ে এসে বলেন,’জ্বি আমি অফিসার বলুন কী হয়েছে!’
অফিসার তিক্ষ্ম নজরে বয়স্ক লোকটির দিকে তাকিয়ে পানের পিক ফিকে মা’রল জমিনে। রাগ পেল সবার। তারা মোঃ আবু সিদ্দিক এর পেছনে এসে দাঁড়িয়ে যায়। অফিসার উত্তেজিত হলেন না। তিনি বেশ কঠোরতার সঙ্গে নিজের কাজ করছেন।

“চাচা বয়স বেড়ে গেল তবে এ কী কাজ করছেন! এ বয়সে এসে খু’ন করতে হাত কাঁপেনি আপনার!”

সবার মাথায় যেনো বাজ পড়ল। অফিসার হুট করে এসেই মোঃ আবু সিদ্দিক এর ব‌্যাপারে ভুল তথ্য দিচ্ছে কেনো বুঝল না কেউই। কথাটা শুনে তিনি নিজেও হতভম্ব। উদগ্রীব গলায় জিজ্ঞেস করেন।

“খু’ন করেছি মানে! আপনি কী বলছেন অফিসার! আমি কাকে খু’ন করেছি।”

অফিসার তাচ্ছিল্যের হেসে তার সঙ্গে আসা কনস্টেবল এর দিকে তাকিয়ে বলে,

“সাহেবের বুঝি জ্ঞান লোপ পেয়েছে। যাক এ বয়সে একটু আধটু ওমন ভুলে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। আমিই বলছি। আপনাদের বাড়ি থেকে দু-তিন রাস্তা পেরিয়ে গেলে যে বাড়িটা পড়ে। পুরনো ভাঙ্গা বাড়ি সেখানে একটা লা’শ পাওয়া গেছে। বিভৎস অবস্থা লা’শের।”

তানভির যেনো চমকে যায়। তার মাথা থেকে ব্যাপারটা বেড়িয়ে গিয়ে ছিল। ঝুটঝামেলায় সে পরীক্ষা করে দেখতে পরে ফিরেও যায়নি। তানভির গিয়ে তার স্যার এর কাছে দাঁড়াল। সারোয়ার দেখতেই তানভির বলে উঠে,

“স্যার আপনাকে বলে ছিলাম এখানে শোয়াইব মিলদাজ অথবা পদ্মিতা কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে তাদের কারোর তাজা র’ক্ত মাটিতে লেগে ছিল।”

সারোয়ার এর ভ্রু কুঁচকে আসে। কী মনে করে হঠাৎ ঘাড়ে বাঁকিয়ে পেছন তাকায়। কায়েসাম নির্বিকার রূপে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে বোঝা মুশকিল সে কষ্টে নিমজ্জিত না চিন্তিত! পরক্ষণেই মৃদু হাসল সারোয়ার।
সে গিয়ে অফিসার কে বলে,
‘কোথায় লা’শ নিয়ে চলুন।’

নাছির উদ্দিন মেহমানগণ বিদায় করে দেন। তারা একজোট হয়ে পুরনো বাড়িতে এলেন। শেহরীনা যেতে চাইনি। ঐ বাড়িটি দেখলে তার কাছে অভিশপ্ত মনে হয়। বিধেয় সে রাস্তার মোড়ে এসে ঘাপটি মে’রে বসে থাকে। ইপশিতা, রোকসানা, রূপালি বেগম এবং জাহানারা পুষ্প ও আগালেন না।
অফিসার বাড়িতে ঢুকে লা’শ পড়ে থাকা রুমে নিয়ে যান। লা’শের করুন পরিণতি দেখে কারো চোখে মায়া অথবা আফসোস জাগল না। অফিসার নাকে রুমাল চেপে লা’শের উপর ঝুকে বলেন,

“লা’শটা মনে হয় অনেক দিনের পুরনো। এ বাড়িটাও পুরনোই মনে হচ্ছে। আসবাবপত্র ঘেঁটে ও তেমন ক্লু পাওয়া যায়নি। এভাবে হ’ত্যা করাটা কারো মাস্টারমাইন্ড প্ল্যানিং ছিল। সো মিস্টার মোঃ আবু সিদ্দিক এন্ড সারোয়ার সিদ্দিক আপনারা কাইন্ডলি আপনাদের ভিক্টিম কে আমার কাছে পাঠান। এন্ড সরি টু সে আমার কারণে আপনি অপমানিত হলেন। আপনার বাড়ির কাছাকাছি প্রায়। তাই পুলিশের নজর তো বুঝেনই। অজানা হোক অথবা জানা সবাই কে সন্দেহের তালিকায় রেখে মেপে চলি।”

মোঃ আবু সিদ্দিক চুপ রইলেন। লা’শ দেখার পর কেমন যেনো তিনি গুমোট অনুভব করছেন। কেনো এই অনুভব তিনি জানেন না! তবে অনুভব করতে পারছেন এই তিনি জানেন। জড়োসরো হয়ে বসে ছিল শেহরীনা। পুলিশের কথায় সারোয়ার তাকে অস্থির করে দিতে চাইছে না। ফলে সে নিজের আইডি কার্ড দেখিয়ে বলে,

“আমিই এই কেইস নিয়ে কোর্টে যেতে চেয়ে ছিলাম। কিন্তু আমিই সেটা ক্লোজ করিয়েছি। তাই আপনাকেও ভালো সাজেশন দিচ্ছি কেইস ক্লোজড করে দিন।”

অফিসার মৃদু হাসলেন। তিনি অর্ধবয়স্ক হলেও তার তিক্ষ্ম দৃষ্টিতে তিনি ছেলের চোখের চাহনি পড়তে সক্ষম। তার সঙ্গে থাকা কনস্টেবল নাছির উদ্দিন এর এলাকার লোক। নাছির উদ্দিন এর সঙ্গে বেশ খাতির আছে তার। তিনি এসে অফিসার কানে কানে বিষয়টা খুলে বলেন। শুনে অফিসার এর মুখ থেকে কেইসটা্য গুরুত্ব কমে এলো। তিনি মাথা নেড়ে সারোয়ার এর দিকে তাকিয়ে বলেন,

“রাজি মক্কেল যেহেতু নিজেই চাইছে না। আমাদের আর কী করার! খবরের ছাপানো কথাই সত্য করে দেওয়া হবে।”

সারোয়ার মাথা নাড়ল। ঘুষহীন তাদের মাঝে কথা মিটমাট হয়ে গেল। ইদরিব সাবেক ও খেয়াল করলেন। রাত্রীপ্রহর আরম্ভ হবে! তিনি তড়িঘড়ি সবার উদ্দেশ্যে বলেন,

“ক্ষমা করবেন আজ তাহলে আসি। কালকে শনিবার আমার থেকে ভার্সিটির কাজ আছে। আর বেশিক্ষণ থাকলে বাড়ি পৌঁছাতে দেরি হতে পারে।”

ইদরিব সাবেক ইচ্ছেকৃত নিজের গাড়িটা পাঠিয়ে দিয়েছেন। ছেলের গাড়িতে বসবেন সেই আশায়! যার দ্বারা মা-ছেলের মান-অভিমানটা ভেঙ্গে যায়! তনুদিই অবশ্য এই বুদ্ধিটা তার শ্বশুরমশাই কে দিয়েছে। তিনিও বউমার কথায় আশ্বাস পেয়েছেন।

চলবে….

#প্রিয়অপ্রিয়ের_সংসার
#লেখিকা_তামান্না(আল রাইয়ান)
#পর্ব_৫৬_৫৭ (অভেদ বন্ধনে তুমিআমি🔥)

“এই জামাই তোমার থেকে নিজের বউ কে এই ভেজা শাড়িতে লাস্যময়ী রূপে দেখে আদর করতে মন চাই না হুম! এতো সুন্দরী নারী বেশে যদি অন্য কেউ তার জামাইয়ের সামনে যেতো। আমি নিশ্চিত তাকে তার জামাই আদরে আদরে ভরিয়ে দিতো। আর তুমি নিজেকে দেখো বড্ড নিরামিষ। আমিষের ছিটেফোঁটা ও নেই।”

কিছুটা রূঢ় হয়ে বলল তনুদি। পরক্ষণে কায়েসাম এর দিকে তাকিয়ে থেকে বিড় বিড়ে বলে উঠল,

“আমিষে ভরপুর পুরুষ হলে কী আজ এত মাস পেরিয়ে গিয়েও আমি মা না হয়ে থাকতাম! একটু তো আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে পারো। আমি তো তোমাকে খুব করে কাছে পেতে চাই।”

সচল চোখে চিবুক তুলে তাকাল তনুদি। না, কায়েসাম এর ধ্যান তার দিকে নেই। সে একরুক্তি, একমনে বিছানায় সটান শুয়ে থেকে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছে। ফ্যানটি বন্ধ তবুও ঐ ফ্যান কে দেখার মানে কী! তনুদির অর্ধভেজা শরীর কী তার স্বামী কে ঘায়েল করছে না! হয়ত না তাই বোধোদয় তার স্বামী তার কথায় ধ্যান দিলো না। মুখখানা সরিয়ে বেলকনির দিকে তাকাল। বর্ষণ হচ্ছে।
তনুদির পরণে আঁটসাঁট করে শাড়ি পরে রেখেছে। পরেছে বললে ভুল হবে এটা তো তার গাঁয়ে অবহেলিত হয়ে জড়িয়ে আছে শুধু! কায়েসাম একপলক পেলে চোখ সরিয়ে নিলো।তার নজরে তার স্ত্রী হলো মুগ্ধতার। নেশাময় অথবা আদরের ভাগ পাওয়ার যোগ্যতা এবং অধিকার তার এই নারীর আছে। তবুও সে হাত-পা গুটিয়ে আছে। কায়েসাম থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে মুখটা নিমিত্তে মলিন হয়ে গেল তনুদির। নিশ্চুপ হয়ে বেলকনিতে চলে যায়। রেলিং ধরে শ্রাবণ মেঘের বৃষ্টি দেখতে লাগল। হুট করেই মাঝরাস্তায় বিজলী চমকিত হয়ে বর্ষণ আরম্ভ হয়েছে। শ্বশুর শ্বাশুড়ির সামনে প্রথমেই লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে ছিল। বিধেয় তাদের সামনে অবুঝ পাগলীর মতো বর্ষণে ভেজার ইচ্ছে কে দমিয়ে নিলো। তবে জানালার ফাঁকা অংশ হতে এক-দুফুটো বর্ষণের ছোঁয়া অনুভব করে উৎফুল্ল হয়েছে তনুদি। তার মনমাতানো অনুভূতি জাগ্রত হয়েছিল, ‘এ বর্ষণে যদি তুমি আমি এক হয়ে সুখের সাগরে ভেসে যেতাম। তবে কী বেশি ক্ষতি হতো!’ এ মনো বাসনায় সুপ্ত কামনা যেনো তনুদি কে ভেতরে আনচান করে দিচ্ছে।

__
চলন্ত গাড়িতে অস্থিরচিত্ত হয়ে বসে আছে কায়েসাম। নিজেকে যথেষ্ট স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে সে। তনুদি ক্ষণে ক্ষণে স্বামীর দিকে তাকিয়ে লাজুক হাসি দিচ্ছে। স্ত্রীর লাজুক চেহারা দেখে কায়েসাম স্বস্তি পেলেও মনে মনে সে অশান্তি অনুভব করছে। করবেই না বা কেনো! তার গাড়ির গ্লাসে প্রিয় নারীর ছবিটি নেই। যেনো হুট করে হাওয়ায় মিলে গেল! তার সামনে একান্ত তার স্ত্রীর ছবিটি বিরাজমান। প্রথমত তনুদি দেখে অবাক হয়ে ছবিটি টান দিয়ে আঠা হতে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে কায়েসাম রেগে যায়। তনুদির হাত ধরে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,

“টানছো কেনো! লেগে থাকুক। শুনেছি পথ প্রান্তরে স্ত্রীর কথা স্মরণ করে যাওয়া নাকি সওয়াব এবং সুন্নাত এর কর্ম। সেই ক্ষেত্রে ছবিটি তোমার কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। যেহেতু তুমি আমার জন্য হালাল সেহেতু তোমাকে দেখে নাহয় বাকি জীবন চোখকে সংযত করে রাখব। আর চিন্তার কিছু নেই। এটা শুধু আমার চোখেই পড়বে। অন্য কারো দেখার সাধ্য নেই।”

তনুদি চমকানো দৃষ্টিতে কায়েসাম কে দেখছে। তার কথা শুনে যেনো সে আবেগে আপ্লুত হয়ে গেল। চট করে জড়িয়ে ধরল।‌পেছনের সিটে ইদরিব সাবেক এবং রুফিয়া সাইমুম মিটিমিটি হাসছেন। বউমার বাচ্চামো দেখে তাদের ভালো লাগছে। তনুদি কী ভেবে হুট করে নিজের অধর প্রসারিত করতে চাইল! এতেই ঘাবড়ে গিয়ে কায়েসাম মেয়েটার হাতের নরম চামড়ায় চিমটি কাটে। ‘আউচচ’ করে মৃদু চেঁচিয়ে তনুদি হাত চেপে ধরল। তিক্ষ্ম মুখ ফুলানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,

“এই আনরোমান্টিক এর‌ বাচ্চা! একটা কিসই করতে চেয়েছি তাতেই এত চেঁতে গেলা কেন!”

কায়েসাম হতভম্ব। চোখের ইশারায় বারংবার পেছনের দিকে ইঙ্গিত করে। তনুদির ও আবেগ গুম হয়ে বিবেক জাগ্রত হলো। ঢোক গিলে আড়চোখে পেছন দিকে তাকায়। সে কি শ্বশুর শ্বাশুড়ির সামনে তার এ কাণ্ড! ছিঃ ছিঃ ইজ্জত আর রইল না! তনুদি নিজের সিটের সাথে ঘেঁটে বসল একদম। চোখ বুঁজে নিজেকে কষিয়ে চাপড় দিয়ে চাইল।‌ অসহায় দৃষ্টিতে কায়েসাম এর দিকে তাকায়।‌ লোকটাও আরেক উল্টো মুখ ঝামটে গাড়ি চালানোতে মনোযোগ দিলো। লোকটার শান্ত মুখশ্রী দেখেও তনুদির অন্তরে প্রেমের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। তার থেকে ভীষণ প্রেম প্রেম অনুভূতি জাগছে। কায়েসাম এসবের মধ্যে কোনো হেলদোল নেই। সে আপনমনে গাড়ি চালাচ্ছে আর নিজের সাথে একভাবে যুদ্ধ করছে।

“তুমি যেমন হারিয়ে গেলে, তোমার চিহ্ন ও হারিয়ে গেল জীবন থেকে। এ বেদনা কাকে দেখাবো! কেউ কী আদৌ আমার মনের কষ্ট বুঝতে পারবে!”

তনুদি আপনমনে স্বপ্ন পুরুষ কে নিয়ে বিড়বিড় করে বিলাপ করছে।

“তুমি তবে আমায় ভালোবাসতে শুরু করলে কায়েসাম। আমি কখনো ভাবেনি এই তুমিই একদিন আমায় চাইবে। আজ যেনো আমার বিয়ের স্বার্থকতার একধাপ এগিয়েছে। এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না এই তুমি নিজ থেকে আমায় বাঁধা দিয়েছো আমারি ছবি টেনে নেওয়া থেকে!”

তনুদির তো খুশিতে পাগল হওয়ার উপক্রম। সে চাইছে কথাটা তার মায়ের সাথে ভাগাভাগি করতে। কেননা তার মা হলেন একমাত্র সাক্ষী তার প্রিয়তমের ব্যাপারে অবগত থাকা আপন ব্যক্তি। কায়েসাম বলিহারি হয়ে শেহরীনার জন্য উম্মাদ হতো ঠিক তার বিপরীতে একলা অন্ধকারে তনুদিও গুমোট অনুভবে কুঁকড়ে উঠতো। তাকে দেখে তার মা যেনো আশাহত হতেন। তিনি বারবার মেয়ের কাছে গিয়ে অনুরোধ করতেন এই বলে,

“মা আমি যাই কায়েসাম এর মায়ের কাছে গিয়ে সব খুলে বলবো! তিনি নিশ্চয় তখন তোকে একা করে দেবেন না। আমি যেমন মা, উনিও মা। তুই আর কায়েসাম একই নৌকার দুটো মাঝি! তোরা দুঘাটে একলা পাড়ি দিতে চাইছিস! যা অসম্ভব ব্যাপার। তোর উচিৎ আমায় যেতে দেওয়া। বল না মা আমি প্রস্তাব নিয়ে যায়!”

তনুদি ভেজা চোখে তাকিয়ে মা কে জড়িয়ে ধরে বলে,

“না মা কখনো না।‌ আমি চাই সে নিজ থেকে চেয়ে নিক আমায়। নাহয় আমি সংসারে পরগাছা হয়ে রয়ে যাবো। আমি তাকে চাই মা খুব আপন করেই চাই।”

তনুদির কণ্ঠস্বর কেঁপে কেঁপে উঠল পূর্বের কথা ভেবে। কান্না চোখের দৃষ্টি লুকিয়ে কোণা চোখে কায়েসাম কে দেখল। পরক্ষণে নজর সরিয়ে জানালার বাহিরে তাকায়। ছেলেটা নিজেও কী জানে! যখন সে তার মনের মানুষ শেহরীনার প্রতি আবেশে চোখের পানি দ্বারা হাহাকারে বুক ভাসাতো! অন্যত্রে তনুদি বুক ভাসিয়ে দিতো অজস্র চাপা কষ্ট নিয়ে! তা কী কখনো বুঝতে পেরেছিল কায়েসাম! কায়েসাম তো চাইলেই তার মনের কথা তনুদি কে শুনিয়ে দিতো। এতে তনুদি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের খাতিরে আশ্বাস দিতো, ভরসা দিতো। অথচ সে নিজেও অভ্যন্তরীণ মায়ায় জ্বলে পুড়ে ছাই ছাই হয়ে যেতো। এই বদ বেটা কে তা কে বুঝাবে! রুফিয়া সাইমুম ছেলের মুখখানা দেখে বুঝলেন। ছেলের মনে কোনো পেরেশানি চলছে। তিনি ইদরিব সাবেক এর কানের কাছে মুখ নিয়ে ছেলে এবং ছেলের বউমার অগোচরে লুকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলেন,
‘দেখেন না ছেলে মনমরা হয়ে আছে। তার মনে কীসের কষ্ট হচ্ছে শুনে দেখতে পারেন না! কেমন বাবা হলেন!’

ইদরিব সাবেক মজার ছলে ছেলের মাথায় মৃদু চাপড় দিয়ে বলেন,

“তোর বাপও ও এককালীন‌ রোমান্টিক জামাই ছিলো। আর তুই বাপকা বেটা হয়ে রোমান্টিক হতে পারোস না! এখন তো তোর জম্ম নিয়ে আমার সন্দেহ হচ্ছে। কোনো ভাবে আল্লাহ আমাকে মেয়ে দিতে গিয়ে ভুলে ছেলে দিয়ে ফেললেন না তো!”

রুফিয়া সাইমুম রেগে যান। ছেলে এবং ছেলের বউয়ের সামনে কী এক অহেতুক বি’শ্রী কথা বলছেন তিনি! স্বামীর বাহুডোরে চিমটি কাটেন। ‘আউচচ’‌এবার‌ যেনো সবার নজর তার উপর পড়ল। রুফিয়া সাইমুম লজ্জায় সিটির‌ সাথে চিপকে গেলেন। তনুদি তার শ্বাশুড়ির দিকে মুখ করে জিজ্ঞেস করে।

“আম্মু সত্যি কী আমার শ্বশুর খুব রোমান্টিক মানুষ ছিলেন!”

ইদরিব সাবেক শুনে গৌরবময় হয়ে সটান সিটে গাঁ হেলিয়ে দিলেন। মুখ ফুটে বলেন,

“তা নয়তো কী বউমা! জানো তোমার শ্বাশুড়ির সাথে বিয়ের এতটা বছর পেরিয়ে গেল। এখনো আমি তাকে ভয় পায়। আর এই ভয় পাওয়ার একটাই কারণ হলো! তোমার শ্বাশুড়ি আমাকে পুকুর পাড়ে গোসল করতে দেখে ফেলেছিল। আর‌ ঐ পুকুর ছিল সরকারি। সেখানের পুকুরটা পরিষ্কার করে‌ রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তোমার শ্বাশুড়ির চাচাকে। তিনি সবসময় কড়া নজরে রাখতেন যেনো কেউ পুকুরে নেমে নোংরা না করে। তো একবেলা আমি পুকুরে তোমার শ্বাশুড়ির চাচা কে না দেখতে পেয়ে মন ফুরফুরে করে নেমে যায়। তখন খেয়াল করলাম কে যেনো আমায় ঘোর ভাবে দেখছিল। মাথা ধুয়ে যখন গাঁ মুছছিলাম তখন এই পিচ্চি এসে বলে আমি কি-না পুকুর নোংরা করেছি। সেদিন তোমার শ্বাশুড়ি কে নিয়ে আরেকবার ডুব মে’রেছিলাম।”

লজ্জায় কাঁচুমাচু হয়ে গেলেন রুফিয়া সাইমুম। কায়েসাম ও চোখ পিটপিট করে মায়ের দিকে তাকাল। বাচ্চাদের সামনে লোকটা তাকে বেমালুম লজ্জায় ফেলে দেন কেনো তিনি বুঝেন না! মুখ ফুলিয়ে চোখ বুঁজে নিন তিনি। ইদরিব সাবেক চুপ হয়ে গেলেন। ফাঁকা এক ঢোক গিলতে ভুললেন না। আজ যে তার‌ কপালে শনি ঘুরছে তা নিয়ে নিশ্চিত তিনি! কায়েসাম হুট করেই হেসে ফেলল। রুফিয়া সাইমুম এর চোখজোড়া আপনাআপনি খুলে গেল। বুকের রত্ন কে হাসিমাখা চেহারায় দেখে রুফিয়া সাইমুম এর মনের পাথরের বোঝা একটু হলেও কমেছে। তিনি আলগোছে ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন। কায়েসাম মৃদু হেসে মায়ের হাতের উপর গালের ঘষা দিয়ে আদুরীয় স্পর্শ দিলো। যার অর্থ সে আর রেগে নেই!
বাড়িতে ফিরে যে যার রুমে শুয়ে পড়েছে। কায়েসাম ঘুমাতে চেয়েও পারেনি। সবার মাঝে থেকে একটুর জন্য ছবিটার কথা ভুলেও ঠিকই একলা মুহূর্তে তার মনে পড়ে গেল। এতেই অস্থির হয়ে শুয়ে পড়ে। কপালে হাত ঠেকিয়ে ধীমি নিঃশ্বাস ফেলতে লাগল।
ঘুমের ঘোরে কারো ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ পেয়ে কায়েসাম এর চোখ খুলে গেল। আশপাশ তাকিয়ে দেখল রুমটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে। মাথা আস্তে ধীরে নেড়ে উঠে বসল। বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখল তার পাশের দিক শূন্য!
‘কবে ঘুমাই গেছি মনেও পড়ছে না! কয়টা বাজে এখন!’
বিড়বিড়ে ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাল কায়েসাম। ঘড়ির ছোট কাটা তিনটার বরাবর এবং বড় কাঁটা শূন্যে অর্থাৎ বরাবর তিনটার সময় আরম্ভ হয়েছে। হামি দিয়ে ওয়াশরুমে গেল। হালকা হয়ে কায়েসাম মুখ মুছে এসে দাঁড়াল।
এদিক ওদিক তনুদির ছায়া অব্দি দেখতে না পেয়ে খানিক অবাক হলো বটে!
‘মেয়েটা এত রাতে কোথায় গেলো!’ বিছানার পাশে থাকা জারের দিকে তাকাল। জারে পানি ভরপুর। তবুও গেল কোথায়! ভাবান্তর হয়ে যেই না দরজায় হাত ছুঁতে গেল। তখনি কায়েসাম এর কানে শব্দ ভেসে এলো। ‘উম উম’ মৃদু শব্দ! তার টনক নড়ে। এই শব্দ শুনেই তো তার ঘুম ভেঙ্গেছে। আসছে কোথার থেকে শব্দটা! আকস্মিক তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল মত অবস্থা! দৌড়ে বেলকনিতে গিয়ে দেখল বেলকনির মেঝেতে ভেজা অবস্থায় জ্ঞানহীন পড়ে আছে তনুদি। কায়েসাম এর চিত্ত নড়বড়ে উঠল। তৎক্ষণাৎ ভেজা তনুদি কে কোলে নিয়েই তার গাঁ শিউরে উঠল। মেয়েটার শরীর ভেজে ঠান্ডা হয়ে গেছে যেনো কোনো এক মৃত্যু বরফপরী, লাশ! তনুদি কে ওয়াশরুমে নিয়ে গিয়ে গিজার চালিয়ে দিলো। পানি গরম হওয়া অব্দি তনুদির হাত-পা ঘেঁষে মেঝে গরম করার চেষ্টা করল। তন্মধ্যে পানি গরম হতেই সে গরম পানির ছিটকে দেয় তনুদির শরীরে। না মেয়েটার কোনো রেসপন্স নেই! তার পরণের শাড়িতে হাত দিতে গিয়েও থেমে গেল কায়েসাম। হাতজোড়া কাঁপছে তার! কখনো গভীরভাবে ছুঁয়ে দেয়নি মেয়েটিকে! এ যদিও ভুল কিছু নয়। তবে সে এখনো প্রস্তুত নয়। তনুদি কে গরম পানি দিয়ে মুখ, হাত-পা মুছে দিলো। ধীরে সুস্থে মেয়েটার জ্ঞান ফিরল। তাতেও শান্তি নেই! কপাল ছুঁতেই বুঝল জ্বর চলে এসেছে তার। দাঁতে দাঁত চেপে মেয়েটাকে বুকের মধ্যে চোখ বুঁজে কাঁপা হাতে ভেজা আঁচল সরিয়ে ফেলে দিলো বালতির মধ্যে। তনুদির নিভু নিভু চোখে দেখল তার প্রিয় পুরুষ তার সন্নিকটে দাঁড়িয়ে আছে। এ যেনো তার কাছে নিছক সুখময় স্বপ্ন! কায়েসাম জ্ঞান ফিরেছে দেখে স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে বলে,
‘তনু একটু অপেক্ষা করো। আমি তোমাকে শুকনো কাপড় দিচ্ছি। এই ভেজা কাপড় খুলে বালতিতে রাখো।’

কায়েসাম তনুদি কে দাঁড় করিয়ে দৌড়ে আলমারির কাছে গেল। আলমারি থেকে তনুদির জন্য টিশার্ট আর প্লাজা প্যান্ট বের করে তার দিকে এগিয়ে দিলো। কিন্তু তনুদির তার পুরুষের দিকে আবদ্ধ। সে এক হাতে নিয়ে তা রেখে দিলো। কায়েসাম পিছনে মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিলো তাই তনুদি কী করছে বুঝতে পারল না! তনুদি আবেগে ভাসছে! তার নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই আজ। মানুষটার সঙ্গে তার সংসারের এতটা মাস পেরিয়ে যাচ্ছে। কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রতিটা নর-নারীর মাঝেই থেকে থাকে। আলনায় ঝুলিয়ে রাখা তোয়ালে দিয়ে গাঁ মুছে নিলো। পরণে থাকা ব্লাউজ-পেটিকোট ভিজে জুবুথুবু অবস্থা! ঠোঁট কামড়ে কায়েসাম কে পেছন থেকে জড়িয়ে মুখটা পিঠে গুঁজে দিলো তনুদি। থমকে গেল কায়েসাম। মেয়েটার শীতল হাত তার বুক জড়িয়ে ধরেছে। বুকের মধ্যে যেনো কেউ হাতুড়ির পেটাচ্ছে। তনুদি তার ঠান্ডায় কোমল হওয়া অধর দিয়ে কায়েসাম কে সামনে হতে জড়িয়ে ধরল। নাস্তানাবুদ হয়ে গেল সে। মন বলছে সে তার বউ আগলে নেহ্। মস্তিষ্ক বলছে, তুই তাকে ভালোবাসিস না। মন মস্তিষ্কের বেড়াজালে পড়ে গেল সে। উম্মুক্ত করে ছাড়িয়ে নিলো নিজেকে কায়েসাম। তনুদি কাতর হয়ে কাঁদতে লাগল। কায়েসাম অস্থির হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদী গলায় জিজ্ঞেস করে।
‘কী হয়েছে কাঁদছো কেনো!’
‘আমায় আপন করে নাও না কায়েসাম! আমার আর সহ্য হচ্ছে না। আমি কী এখনো তোমার মনে জায়গা কর…।’
তনুদি থেমে গেল। সাড়া নেই কায়েসাম এর মুখ পানে। নিরবে হার মেনে সে গিয়ে কাপড় পাল্টে শুয়ে পড়ল। কায়েসাম অস্থির মন মস্তিষ্কের বেড়াজালে নেতিয়ে পড়ছে। সেও গিয়ে বিছানায় শুয়ে একজোটে তনুদির কোমর পেঁচিয়ে ধরে তার ঘাড়ে মুখ গুঁজে নিলো। তনুদি নিরবে ফুঁপাচ্ছে। আচমকা থেমে যায় তার ফুঁপিয়ে কান্না! গালে ভেজা এক অধরের স্পর্শ সে তার গালে অনুভব করছে। কায়েসাম এ প্রথম স্বেচ্ছায় কাছে এসেছে মেয়েটার। তনুদির গালে চুম্বন দিয়েছে মায়ায়, হোক না ভালোবাসা নির্মল! অনুভূতি তৈরি করিয়ে নেবে তনুদি নিজেই। সেও ঘুরে কায়েসাম কে অবাক করে তাদের অধরজোড়া আবদ্ধ করে নিলো। কায়েসাম চমকিত, পুলকিত হয়ে তাকিয়ে আছে। বন্ধ চোখে তনুদি তার প্রেমের ছোঁয়া দিচ্ছে। কায়েসাম স্বাভাবিক হলো সেও তনুদির পিঠে আলতো হাত রেখে সাড়া দিতে লাগল।লেখিকা_তামান্না(আল রাইয়ান)স্বামীর পরশে আবদ্ধ হয়ে তার উষ্ণতায় ঘুমিয়ে পড়ল। কায়েসাম এর চোখে মুগ্ধ এক নেশা। সে হেসে তনুদির চুলগুলো বিছানার পাশে লেলিয়ে দিলো। ভেজা চুল মেঝেতে থাকা কাপড় ভিজিয়ে দিক। তনুদির দিকে তাকিয়ে কায়েসাম দৃঢ় গলায় বলে,

“তোমায় আপন করব আমি তনু। ভুলে যাব আমার অতীত। তোমাকে নিয়ে আগামী সপ্তাহে ইউএস চলে যাবো। সেখানে গেলে তিক্ত অতীত আর স্মৃতি জুড়ে ঘুরে বেড়াবে না। রয়ে সয়ে থাকা নারীটির বিলীন হয়ে যাবে আগামী সপ্তাহের প্রথম রবিবার এ। হ্যাঁ তনু তোমার ইচ্ছেতে আমি তোমায় আপন করতে রাজি!”

তনুদি শুনল কী! শুনেনি শুনলে বোধোদয় উম্মাদের মত খুশিতে আপ্লুত হতো।

___
শেহরীনা শান্ত হয়ে উঠানে বসে আছে। বর্ষণ থেমে গিয়েছে অনেকক্ষণ হলো। ভোরের আলো ফুটতে চলেছে। নামাজ পড়ে সবেই এক গ্লাস দুধ খেয়ে উঠানে রোদ পোহাতে এলো। রুমের দিকে তাকাল। শুভ্র শার্ট পরিহিত অবস্থায় বাচ্চাদের মত ঘুমাচ্ছে তার জনাব! তার দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে স্নিগ্ধ সূর্য উদয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। পরিবেশটায় শীত শীতে ভাব! বর্ষণের কারণেই এই ভাবটা ছড়িয়ে আছে চৌপাশ জুড়ে।‌ এই কাঠফাঁটা রোদে সে কখনো দাঁড়িয়ে থাকতে পারতো না। হঠাৎ তার ফোনে কল এলো। শেহরীনা ফোনের স্ক্রিনে মায়ের নাম দেখে কলটি ধরল।
‘তোর শ্বশুর শ্বাশুড়ি চলে গেছে তোরা ঐ বাড়িতেই থাকবি নাকি! জামাইবাবুর কোনো কষ্ট হবে না তো!’
‘না মা আমরা থাকতে পারব। আপনার জামাইবাবুই বেশি জোর করছিল থাকতে তাও এই একদিন।’
‘আচ্ছা জামাইবাবুর কথা শুনবি। খাওয়ার চিন্তে করিস না। পাকঘরে গেলে ফ্রিজ খুললেই খাবারের জিনিসপত্র এবং কিছু খাবার বক্স করে রাখা আছে। গরম করে খাইস দুজনে।’
‘ওকে মা খেয়াল রাখব।’
সালা‌ম বিনিময় করে শেহরীনা ফোন কেটে দিলো। তখনি কেউ তাকে জোঁকের মতো পেঁচিয়ে নিলো নিজের বুকের সাথে।
‘কৃষ্ণবউ না ডেকে এখানে একলা রোদ পোহাচ্ছো কেনো হুম! জানো না তোমার শরীরের ঘ্রাণ না পেলে ঘুম হয় না আমার।’
‘ভালোই হলো এত ঘ্রাণ দিয়ে কী পেট ভরবে! নাস্তা বানাব যাও সরো তো।’
শেহরীনা দুষ্টু হেসে সারোয়ার এর পেটে চিমটি কেটে দৌড়ে রান্নাঘরে চলে গেল। সারোয়ার মৃদু আঁচ পেলেও হেসে দিলো। সেও ফ্রেশ হতে চলে যায়। আজ মেলা বসেছে। বর্ষণ মেঘের মেলা নাম দেওয়া হয়েছে এ মেলার। শেহরীনা জানালার বাহিরে অনেকক্ষণ যাবত কয়েকজন মেয়েকে তার বাড়ির দিকে মুচকি মুচকি হেসে হেঁটে যেতে দেখে ভ্রু কুঁচকে এলো তার। লাল পাড়ের শাড়ি পরে মেয়েগুলো ঢেং ঢেং করে সং সেজে তার বাড়ির সামনে দিয়েই কেনো যাচ্ছে! এ যেনো চরম সন্দেহজনক! কোমরে আঁচল গুঁজে উঠানের মধ্যে আসতেই থমকে দাঁড়ায়। প্যান্ট পরিহিত ন’গ্ন বুকে দৌড়াদৌড়ি করছে সারোয়ার। মেয়েগুলোর নজর যে তার সুদর্শন স্বামীর উপর পড়েছে তা বুঝতে তার আর বাকি নেই। আক্রোশ ভরা চোখে সারোয়ার এর দিকে তাকিয়ে নম্র কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে।

“বলি এই বাড়িটা আমাকে দেখানোর হলে রান্নাঘরে এসে ব্যায়াম করুন। বাহিরের পরগাছা আমার সহ্য হয় না।”

মুখ ঝামটা দিয়ে চলে গেল। সারোয়ার শূন্য গলায় ঢোক গিলে একপলক পেছন ফেরে তাকায়। বেখেয়ালে ব্যায়াম করার নির্দিষ্ট স্থান না পাওয়ায় উঠানকেই উত্তম স্থান হিসেবে বানিয়ে নিয়ে ছিল। এখন যে সেই ফেঁসে গেল। ঘাম মুছতে মুছতে ভেতরে এসে দেখল। তাদের বেডরুম থেকে শব্দ আসছে। সে এগিয়ে দেখল শেহরীনা ফোন হাতে নিয়ে ঘাঁটছে। ভাব এমন যেনো সে কাউকে দেখেনি।
সারোয়ার গলা বলে,
‘মেলাই যাবে কৃষ্ণ বউ!’
মেলার কথা বলতেই রাগ যেনো গলে জল হয়ে গেল শেহরীনার। তৎক্ষণাৎ সারোয়ার এর কাছে গিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে বলে,
‘সত্যি নিয়ে যাবেন!’
‘হ্যাঁ।’
‘থ্যাংকিউ জামাই। উম্মাহ্!’
‘দুপয়সার চুমুতে তোমার জামাইয়ের পেট ভরবে না গো। তার জন্যে আরো চাই এই গোঁটা তোমাকে চাই হৃদয়ের আগুন নেভাতে।’
শেহরীনা বুঝল তার স্বামীর ভেতরে নেশা জেগেছে। বিধেয় সে তাকে ধাক্কা দিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। তবে ভেতর থেকে চিৎকার করে বলে,
‘যান যান ছুছুছু কাপড় চোপড় পরে নিন আমি বোরকা পড়ে আসছি।’
সারোয়ার মাথা চুলকে হাসল। সে আলমারির থেকে পাঞ্জাবি প্যান্ট এবং তার বউয়ের জন্য ফ্রক, হিজাব বের করল।
মেলায় নিয়ে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করতে থাকে শেহরীনা। বাচ্চাদের চেয়েও বেশি বাচ্চামোর রূপে আখ্যায়িত করা যাবে তার কৃষ্ণবউ শেহরীনা কে। সারোয়ার চট করে শেহরীনা কে ধরে ভেলপুরির দোকানে নিয়ে আনল।
‘নাও ভেলপুরি গিলে শান্ত হয়ে বসো। তাও প্লিজ বসো! উড়নচণ্ডী-র মত উড়তে থাকলে কেউ যদি এই পাখিকে খপ করে ধরে ফেলে তখন!’
শেহরীনা ভেলপুরি দেখে যেনো দিন দুনিয়াও ভুলে গেল। একসঙ্গে দুটো মুখে পুরে ফেলেছে। এই নাও কাশতে লাগল মেয়েটা! সারোয়ার ধমকে উঠল। ‘আস্তে খাও কোথাও পালিয়ে যাচ্ছে না ভেলপুরি।’ শেহরীনা আস্তে ধীরে খেতে থেকে বলে,
‘এই পাখি তো তার পাখির সঙ্গেই দাঁড়িয়ে আছে। তাই কারো সাহস হবে না খপ করে ধরে ফেলার।’
সারোয়ার ঠোঁট কামড়ে তাকাল। শেহরীনা লজ্জায় অন্যদিক ফিরল। মুখে আবারো একটা ভেলপুরি পুরে নিলো। এই ফাঁকে সারোয়ার ও শেহরীনার হাত থেকে দুয়েক খেলো। বিল পরিশোধ করতে নিলে শেহরীনা বাচ্চাদের মত মুখ করে বলে,
‘আরেক প্লেট খাও না জামাই। মাত্র দুই প্লেট এনা খাইছি।’
‘কী বলছো মাশাআল্লাহ দুটো প্লেটে খেয়ে আবার খাবে! তোমার পেট সইবে তো!’
শেহরীনা চোখ রাঙিয়ে তাকায়। সারোয়ার ফিক করে হেসে আরেক প্লেট নিলো। শেহরীনা যেই আরেকটা মুখ পুরবে তখনি কেউ এসে তার হাত থেকে পুরো প্লেটটা কেড়ে নিয়ে তাকে সজোরে ধাক্কা মারল।

চলবে…..